শুধু একটা খুন নয়-ধ্বংস হয়ে গেছে পুরো একটা বিশ্ব । সাধারণ কোনো গোয়েন্দা নয়, তদন্তে নেমেছে স্বয়ং সে বিশ্বের স্রষ্টা, দেবতা কেটজালকোয়াটল । সে জানে না এ তদন্ত তাকে নিয়ে যাবে অজানা ভুবনে, দাঁড় করাবে অকল্পনীয় বিপদের মুখোমুখি, দিতে বাধ্য করবে অসম্ভব সব পরীক্ষা । ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে দেবতা, দানব, জাদু আর মৃত্যুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্রের জাল ।
তানজীম রহমানের মিথোলজিক্যাল মিস্ট্রি ‘কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য’ শুধু থৃলারপ্রেমীদেরই নয়, কিংবদন্তি আর ফ্যান্টাসিপ্রেমীদেরও সমানভাবে আকর্ষণ করবে ।
তানজীম ভাইয়ার লেখা যত পড়ছি ততই অবাক হতে হচ্ছে। কত ভ্যারিয়েশন একজনেরই লেখায়! "কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য" যে ধরণের লেখা তা বাংলা সাহিত্যে আজ পর্যন্ত কেউ লিখেননি বলেই আমার ধারণা। মিথোলজি বেজড ফ্যান্টাসি। সাথে সাসপেন্স আর ছোট ছোট টুইস্টের মিশ্রণ।
নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে গল্পের মূল প্রোটাগোনিস্ট অ্যাজটেক দেবতা কেটজালকোয়াটল। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে কেবল অ্যাজটেক মিথেই থেমে থাকেনি গল্প। পাতা উল্টানোর সাথে সাথে গল্পে এসে যোগ হয়েছে গ্রীক, জাপানিজ, নর্স মিথের রথী মহারথীরা( হেইডিস, কারন, লোকি, ওডিন, থরসহ আরো অনেকে)। সব মিলে দারুণ একটা প্লট। কেটজালকোয়াটলের সৃষ্টি করা পৃথিবীটা ধ্বংস করে ফেলে কেউ, আর তাকে খুজতেই যাত্রা করে সে। এক দেবালোক থেকে আরেক দেবালোকে চলতে থাকে সেই আততায়ীর খোজ।
একটাই আক্ষেপ, এটা নোভেলা। আরো লম্বা হলেও পড়তে বিন্দুমাত্র অধৈর্য হতাম না। :)
লেখক মহাশয় লোক হিসেবে সুবিধার না। একেবারে ডেঞ্জারাস লোক। মানে, একেবারে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকে ইনভেস্টিগেশনে নামায়া দিলো? বই শেষ করার পর আঙ্গুলগুলা অজান্তেই দাঁতের চিপায় চাপায় ঢুকে গেছে, দাঁতগুলো ঠিক আছে কি না দেখার জন্য। কি সব কাট্টাখোট্টা নাম — কেটকোয়াজল, টেজকাটলিপোকা, টোনাকাটেকুলি, টোনাকাসিউয়াটল, মিক্টলান্টেকটুলি ইত্যাদি ইত্যাদি। কাহিনীটা মোটামুটি এইরকম, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে৷ কে এবং কেন পৃথিবী ধ্বংস করেছে তা জানতে তদন্তে নামে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা কেটকোয়াজল। বইতে লেখক বিভিন্ন ইউনিভার্স ব্যাবহার করেছে। এতে আছে অলিম্পিয়ান, কামি আর নর্স মিথলজি। আর হ্যা, নীল গেইম্যানের নর্স মিথলজি বইটা যদি পড়া থাকে তবে এই বইটাকে পুরোপুরি উপভোগ করতে পারবেন। বুঝতে পারবেন ওডিন, লোকি আর থরদের। একতারা কাটার কারণ, বইয়ের ফিনিশিংটা তেমন লাগে নাই। হুট করে শেষ করে দিয়েছে। মোটামুটি ২০০ পৃষ্ঠা হলে বইটা পড়ার পর লম্বা ঢেকুর তুলতে পারতাম। তিন দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও লেখকের অভিনবত্ব দেখে এক বাড়ায়া দিলাম।
বাংলায় মিথলজিক্যাল ফ্যান্টাসি পড়তে চান? তবে এটা আপনার জন্যই।।
মিথ জিনিসটা আমার খুবই পছন্দের জায়গা হলেও অ্যাজাটেক মিথে আমি এই জীবনে কোন আনন্দ পাই নি। মূল কারন হল দেব-দেবীদের ভয়াবহ সব নাম। এই বইটা পড়ে আবার মাথা ঘুরান্টি দিছে। এক একটা দেব-দেবীর যদি নিজস্ব পৃথিবী থাকে তাহলে তো সমস্যা। যেহেতু ফ্যান্টাসি লিখেছে লেখক মনের মাধুরী মিশিয়েই লিখেছেন। এইকারনেই বোধ হয় এক অ্যাজাটেকের ভিতরে হেইডিস, লোকি কামিদের জগৎ সব কিছুই আছে।
অ্যাজাটেক দেবতা কেটজালকোয়াটলের পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এই দেবতার মতে এর পিছনে দায়ী তার ভাই ছলনার দেবতা টেজকাটলিপোকা। (প্রথমটারে আমি সংক্ষেপে জাল ডাকছি পরেরটারে পোকা) তো জাল প্রথমে পোকার পৃথিবী ধ্বংস করেছিল, জালের ধারনা পোকা বুঝি এর প্রতিশোধ নিচ্ছে। কিন্তু ভিতরে কাহিনী আলাদা। এই ও ভ্রাতৃ দেবতার পিতা-মাতার ধারনা এই অপকর্ম পোকা করে নি বাইরের কোন দেবতা আছে। অতপর নিজের পৃথিবী হারানোর শোকে পাগল জাল দেবতালোক থেকে দেবতালোকে ঘুরে বেড়িয়েছে আসল হোতাকে ধরার জন্য।
খুবই চমৎকার! দেবরাজদের নিয়ে রহস্যগল্প। নায়ক অ্যাজটেক দেবতা কেটজালকোয়াটল। কেউ তার সৃষ্টি ধ্বংস করে দিয়েছে। কালপ্রিটকে খুঁজতে কেটজালকোয়াটল পাড়ি জমায় গ্রিক দেবতাদের জগৎ অলিম্পিয়া, জাপানিজ দেবতা কামিদের জগৎ, নর্স দেবতাদের জগৎ অ্যাসগার্ডে! মাল্টিভার্স অফ গডস।
অসাধারন লেগেছে। বাংলায় এমন ফ্যান্টাসি খুব কমই পড়েছি। তার উপরে লেখক হরেক রকম মিথের সমাহার ঘটিয়েছেন এবং তা কাহিনীর প্রেক্ষাপটের সাথে সুন্দরভাবে মিলেও গেছে। শুধু একটাই অভিযোগ আরেকটু বড় হতে পারত গল্পটা। যেন শুরু হবার আগেই শেষ হয়ে গেল।
এত শক্ত শক্ত নাম যে পড়ার সময় মনে হচ্ছিল আমার দাঁত খুলে পড়ে যাচ্ছে, একসময় মনে করছিলাম পড়া বাদ দিয়ে দিব,কিন্তু মিথলজির উপর একটা আলাদা টান আর কাহিনীর গতিশীলতার জন্য শেষ পর্যন্ত এত সব ফ্যাসাদের মাঝখানেও যবনিকা টানলাম.
কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খাচ্ছে ছলনার দেবীকে কিভাবে দলে টেনেছিল মিকাবোশী আর লোকি?
যাই হোক উত্তর টা পাই বা না পাই কিন্তু এরকম ঝরঝরে নভেলারূপী বড়বেলার রূপকথার জন্য রেটিং:৩.৯০
কাহিনী সংক্ষেপে: কেটজালকোয়াটল একজন আজট্যাকের দেবতা। হঠাৎ করে একদিন তার তৈরি করা পৃথীবি ধ্বংস হয়ে যায় এবং ক্রোধে ফেটে পরে সে। কেটজালকোয়াটল প্রতিজ্ঞা করে যে তিনি খুঁজে বের করবে যে তার এত সুন্দর পৃথীবি ধ্বংস করেছে এবং এত মানুষের মৃত্যুর কারন হয়েছে। সে বেরিয়ে পরে তার পৃথীবি ধ্বংসকারিকে খুঁজতে। এবং তার সামনে আসতে থাকে এক এক রহস্য এবং এডভেঞ্চার।
তানজিম রহমানের "কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিববিনাশ রহস্য " একদমই অন্য রকম একটি গল্প। আমার পড়া সবচেয়ে ভিন্ন ধরনের বই। মিথলজিকাল থিমে খুবই সুন্দর উপন্যাসিকা, বিষেশ করে নতুন মিথলজিকাল চরিত্র গুলা আমাকে মজা ��িয়েছে। এবং গল্প লেখার ধরনেও নতুনত্ব আছে। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, শেষটা আরেকটু বিশদ হতে পারত। হঠাৎ করেই যে শেষ হয়ে গেল আর এত এডভেঞ্চারের পর খুব সহজেই যেন জিতে গেলো কেটজালকোয়াটল। আমি আরেকটু টুইস্ট আশা করেছিলাম। :/
আর এটা মনে হয় আমার পড়া প্রথম গল্প যার চরিত্রগুলার নাম আমি কোনদিনই মনে রাখতে পারবো না! এত্ত কঠিন উচ্চারণ! :p
জাপানিজ বইগুলোর অনুবাদ পড়ার পরে অনুভূতি এমন হয় যে, কাহিনি না যতটুকু প্যাঁচ খাওয়ায় তার চেয়েও ক্যারেক্টার নাম মনে রাখতে পাঠকের মেহনত করতে হয় তার চেয়েও বেশি। দেশিয় দিক থেকে ❛কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য❜ নভেলাটি চরিত্রের নামের দিক থেকে এই প্যাঁচকে একটু ওপরের দিকে ধাবিত করেছে। না কাহিনি প্যাঁচানো না, নাম এই এক আধটু কঠিন-ই বটে। যা-ই হোক, ইউনিক করতে গিয়ে কিছুটা কাটখোট্টা বানিয়ে ফেলেছে।
প্রথমত এই নভেলাতে কোনো মানুষের ছিঁটেফোঁটা নেই! যেহেতু লেখক মিথলজিক্যাল ফ্যান্টাসি লেখতে চেয়েছেন সেদিক থেকে তিনি ভেবে নিয়েছেন পুরোপুরি সভ্যতা ও মিথ কেন্দ্রিক সৃষ্টি করবেন। করলেনও তাই। নভেলাতে হুড়মুড় করে ঢুকেছে অ্যাজটেক থেকে শুরু করে অলিম্পিয়াস, টাইনটান, নর্স ও জাপানিজ মিথ। পাঠক একটু অবাক হতে চাইবেন! কীভাবে এই পিচ্চি উপন্যাসিকাতে লেখক এতকিছুর যোগসূত্র ঘটালেন? বেশি ভাবতে হবে না, কাহিনি খুবই সিম্পল।
অ্যাজটেক সভ্যতা কেন্দ্র করে তৈরি করেছেন দেবতাদের যুবরাজ কেটজালকোয়াটলকে। যে সৃষ্টি করেছিল পৃথিবী। কিন্তু কালক্রমে সে পৃথিবী ধূলিসাৎ করে দেয় কোনো এক দেবতা বা দানব! কেটজালকোয়াটলের কাজ সে-ই দেবতা বা দানব তাকে খুঁজে বের করা। অনেকটা অ্যাডভেঞ্চারের ফিল আসে তবে সেটা খুব সামান্য৷ এক্সুয়েলি নাম উচ্চারণ করতে করতে কাহিনি অর্ধেক পিছিয়ে যাচ্ছিল। এখন মানুষ বলবে, আমি নাম পড়তে পারি না!
➲ আখ্যান—
শুধু একটা খুন নয়-ধ্বংস হয়ে গেছে পুরো একটা বিশ্ব। সাধারণ কোনো গোয়েন্দা নয়, তদন্তে নেমেছে স্বয়ং সে বিশ্বের স্রষ্টা, দেবতা কেটজালকোয়াটল। সে জানে না এ তদন্ত তাকে নিয়ে যাবে অজানা ভুবনে, দাঁড় করাবে অকল্পনীয় বিপদের মুখোমুখি, দিতে বাধ্য করবে অসম্ভব সব পরীক্ষা। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে দেবতা, দানব, জাদু আর মৃত্যুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্রের জাল।
তানজীম রহমানের মিথোলজিক্যাল মিস্ট্রি ‘কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য’ শুধু থৃলারপ্রেমীদেরই নয়, কিংবদন্তি আর ফ্যান্টাসিপ্রেমীদেরও সমানভাবে আকর্ষণ করবে।
➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
যারা পড়েননি তাদের একটি জিনিস বলে রাখি, কেটজালকোয়াটল তৈরি করেছে অ্যাজটেক সভ্যতার দেবতার পুত্ররূপে। তাই লেখক তাদের টাইটেল দিয়েছেন ❛জালকোয়াটল❜। নামের অংশ মনে রেখে পড়ে যাবেন, তাহলে আর বেশি হ্যাপা পোহাতে হবে না। নভেলা হওয়াতে লেখক কোনো সাবপ্লটের জন্ম দিতে চাননি, তাই ব্যাকস্টোরি বা ফ্ল্যাশব্যাক থাকবে এই চিন্তা মাথায় না রেখে পড়া শুরু করবেন।
● প্রারম্ভ—
গল্প শুরু হয় অ্যাজটেক সভ্যতার দেবতা পুত্র কেটজালকোয়াটলের পিতা-মাতা অর্থাৎ দেবতাদের প্রধান রাজা-রানির সাথে কথপোকথনের মধ্যে দিয়ে। কেটজালকোয়াটল এসে তাদের জানায় যে, তার সৃষ্টি করা পৃথিবী যেখানে মানুষ থাকে; সেটা কেউ ধ্বংস করে দিয়েছে। এইবার সে-ই কেউ কে সেটা খোঁজার জন্য কেটজালকোয়াটল অনুসন্ধানে বের হয়।
নামের কারণে প্রথমে একটু ধীরগতির হতে হয়েছিল। কারণ নাম আর তাদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানাশোনা প্রয়োজনীয়। মূল কাহিনি শুরু হলেও ঢুকতে কিছুটা সময় ব্যয় হয়েছে।
● গল্প বুনন—
গল্প বুননে লেখকের যে বিশেষ পারদর্শিতা রয়েছে সেটা অল্পতে আন্দাজ করা গেছে। গল্পের ভিত্তি গড়ে তুলতে বেশি বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়োজন পড়েনি। দ্রুত প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছে, ওই সময়ের মধ্যে যতটুকু বিল্ডাপ দিয়েছে ভালোই।
● লেখনশৈলী—
লেখনশৈলী বেশ ঝরঝরে। আরাম করে পড়া গিয়েছে। নামের জায়গা বাদ দিলে বাদবাকি সবকিছু দারুণভাবে টপকে গেছে। শব্দচয়নে বিশেষ দক্ষতা লক্ষ করা গিয়েছে। ফ্যান্টাসি নির্ভর যেসব শব্দের দরকার ছিল সেগুলো সাবলীলভাবে বাক্য ঢুকিয়ে মুখরোচক করে দিয়েছে।
● বর্ণনাভঙ্গি—
কোনো ঘটনার বর্ণনা হচ্ছে ফ্যান্টাসি উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। শব্দ ও বাক্যের মেলবন্ধনে যখন কোনো ঘটনার পারফেক্ট বর্ণনা দেওয়া হয় তখন পাঠক পরিপূর্ণ তৃপ্তি পেয়ে থাকে৷ লেখক এইখানে কোনো ছাড় দেননি। প্রথমত এই উপন্যাস দেব-দেবীদের ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। তাই তাদের দৈহিক বর্ণনা ও কাজের ব্যবচ্ছেদ করতে হলে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অনেক কিছু লক্ষ রাখা উচিত। অন্যদিকে দেব-দেবীর সাথে কিছু ক্রিয়েচারও রয়েছে। তাদের দৈহিক বর্ণনা থেকে কাজের ধরন সবকিছু সবিস্তারে আলোচনা উঠে এসেছে।
প্রচলিত দিক থেকে গ্রিক মিথের হেডিস, পার্সিফোনি, ক্রোনাসের ঝলক অল্পতে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। দুটো মৃত্যুপুরীর বর্ণনা সে-ই সাথে সেখানে অধিষ্ঠিত সবকিছুর যথোপযুক্ত ব্যাখা দাঁড় করিয়েছে। লেখক ক্ষান্ত দেননি। নিয়ে গিয়েছেন নর্স মিথে। যেখানে দেবতা ওডিন-থর-লোকি নিয়ে গল্প তৈরি করেছেন। ভালাহালার বর্ণনা ও সেখানে অধিষ্ঠিত নয় রাজ্যের স্থাপনা কীভাবে হয়েছে সেটাও উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ পুরোপুরি মিথলজিক্যাল ফ্যান্টাসি তৈরি করতে সবরকম মিথের মিশাল করেছে।
কয়েকটি যুদ্ধের বর্ণনাও অল্পতে সুন্দর করে বর্ণনা করেছে। সবমিলিয়ে বর্ণনাভঙ্গির জায়গাতে লেখল নিজের মুনশিয়ানার প্রমাণ দিয়েছেন।
● চরিত্রায়ন—
যেহেতু প্রধান চরিত্রে কেটজালকোয়াটল ছিল; যে কি-না শুকতারা, আলো, দয়া, বাতাস, বুদ্ধি, ন্যায়ের ও ভোরের তারার দেবতা। এইরকম আরও বিভিন্ন দেব-দেবীর ক্ষমতা সম্পর্কে অল্পবিস্তর বাক্যালাপ করেছেন। তাদের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে চরিত্রায়নে কোনো কমতি প্রস্ফুটন করতে দেননি।
ওডিন-থর-লোকি থেকে হেডিস-পার্সিফোনি-ক্রোনাসের মতো হাই ভোল্টেজ মিথলজিক্যাল ক্যারেক্টারের সাথে কেটজালকোয়াটল মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা নজরকাড়া ছিল। যে চরিত্র যেভাবে ঠিক সেইভাবে ব্যবহারের উপযোগী করেছেন।
তবে হেডিস-পার্সিফোনির সম্পর্ক একটু অন্যরকম লাগল। ওদিকে থরের বর্ণনায় প্রথমে ভেবেছিলাম সে কোনো ক্রিয়েচার! এই দুদিক ছাড়া বাকি সবকিছু ঠিকঠাক।
● সমাপ্তি—
সমাপ্তি আহামরি না। টুইস্ট ছিল তব আন্দাজ করা যাচ্ছিল। কারণ কী সেটা পাঠক পড়লে বুঝবেন। টুইস্ট অতটা নজর না কাড়লেও গল্প আমাকে আকৃষ্ট করেছে। হয়তো আমার মিথলজি মাত্রাতিরিক্ত ভালো লাগে তাই। তবে লেখকের বিচক্ষণতার জন্য আমি সাধুবাদ জানাই৷ এইরকম ভাবে মিথের মিশেলে সহজবোধ্য গল্প খুব কম লেখতে পারে।
সমাপ্তির কারণ এবং কেটজালকোয়াটলের ফাইন্ড আউট করতে পারে প্রধান কালপ্রিট কে সেগুলোও ভালো ছিল। এই গল্প টেনে ট্রিলজি থেকে সিরিজও বানিয়ে ফেলা যাবে যদি সাবপ্লট আর ব্যাকস্টোরি নিয়ে আসে৷ শূন্য থেকে সৃষ্টি হয়ে আবার শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার মতো উপন্যাসিকা।
যারা মিথলজি পছন্দ করেন তাদের একবার হলেও পড়ে দেখা দরকার।
➢ লেখক নিয়ে কিছু কথা—
অক্টারিন বা আর্কন না ধরে তানজীম রহমানের এই গল্প কেন বেছে নিলাম জানি না৷ তবে বুঝতে পেরেছি ওনার ফ্যান্টাসিতে দক্ষতা অসামান্য। চাইব কখনও বৃহৎ পরিসরে ফ্যান্টাসি নিয়ে কাজ করুক। বাকি থাকল ওনার আলোচিত অক্টারিন ও আর্কন; সেগুলো অচিরেই পড়ে ফেলব। লেখকের জন্য শুভকামনা।
➠ বই : কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য ➠ লেখক : তানজীম রহমান ➠ জনরা : মিথলজিক্যাল ফ্যান্টাসি থ্রিলার ➠ প্রথম প্রকাশ : জুন, ২০১৬ ➠ প্রচ্ছদ : ডিলান ➠ প্রকাশনা : বাতিঘর প্রকাশনী ➠ পৃষ্ঠা : ৭৯
ভালো দিক: ১. বাংলায় প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য এমন পরিণত, জটিল অথচ গতিময় ফ্যান্টাসি পড়ার সুযোগ ক'বার হয়েছে, তা বলার জন্য হাতের পাঁচটা আঙুলও বেশি হবে। ২. আমরা গ্রেকো-রোমান, এবং হালে নর্স মিথলজি নিয়ে কিছুটা জানলেও আজটেক কিংবদন্তি আর জাপানের উপকথা মিশিয়ে এমন উপভোগ্য লেখা পেশ করা ভীষণ কঠিন। আনাড়ির হাতে এ জিনিস ক্যারিকেচারে পরিণত হবে। কিন্তু লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই ব্যাপারটা সামলেছেন।
খারাপ: ১) মাঝেমধ্যে গতি কমে গেছে অনেকটাই। ২) গল্পটাতে যা মশলা ছিল তাতে নভেল্লা নয়, পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস রচিত হলেই যথাযথ হত।
অদ্ভুত। খুবই অদ্ভুত একটা গল্প পড়লাম। আমি আগে কখনো চিন্তাও করতে পারিনি এরকম থিম নিয়ে কোন লেখা হতে পারে। লেখক বিভিন্ন সংস্কৃতির মিথলজিকে এক করে একটা অদ্ভুতুড়ে খিচুড়ি বানিয়েছেন। আবার সেটার রান্নাও বেশ হয়েছে বিভিন্ন মালমসলার সঠিক মিশ্রণে। আজট্যাক, অলিম্পিয়ান, জাপান আর নর্স মিথলজিকে জোড়া লাগিয়েছেন সুন্দর করে। প্রথমে পড়তে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছিলাম যে আসলে কিভাবে গল্প আগাচ্ছে। কিন্তু পরে টুক করে ঢুকে গেলাম গল্পের ভিতরে। লেখক চাইলে এর সিকুয়াল টানতে পারেন। অন্তত আমি সে আশা করব।
এ্যাজটেক পুরাণের দেবতা কেটজালকোয়াটলের কথা পড়েছিলাম অনেক ছোটবেলায়, যার প্রতীক ছিল ডানাওয়ালা সাপ। সেই দেবতা এবং পুরাণকেই জীবিত করে এনেছেন অন্যতম প্রিয় হাই ফ্যান্টাসি লেখক তানজীম রহমান। অজ্ঞাত কারণে যখন কেটজালকোয়াটলের সৃষ্ট পুরো একটা বিশ্ব ধ্বংস হয়ে গেলো, তখন বাধ্য হয়ে নিজেই তদন্তে নামল সে। পথে তাকে ঘুরতে হলো আরও অনেকগুলো দেবলোকে, মোকাবেলা করতে হলো বিভিন্ন বিপদের। তার প্রশ্নের জবাব খোজার অভিযানই এই বইয়ের কাহিনী।
তানজীম ভাইয়ের লেখা নিয়ে নতুন করে বলার কিচ্ছু নেই। আর্কন এবং অক্টারিন যারা পড়েছেন তারাই জানেন তার লেখা কত শক্তিশালী। এই নভেলাতেও আরও একবার সেই প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে কাহিনীর সমাপ্তি তেমন জমল না, যদিও শুরু থেকেই দারুণ উপভোগ করেছি। ভবিষ্যতে এমন গল্প আরও চাই।
কেটজলকোয়াটল, এজটেকের আলো, বায়ু দেবরাজ। একদিন হঠাৎ করে দেখল তার তৈরি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে সেই সাথে তার ভাই নিখোঁজ। সে বের হয়ে পড়ল, ধ্বংসের পিছনে কার হাত সেটা খুঁজে বের করতে। সে গ্রীক দেবতাদের থেকে, কামি দেবতাদের রাজ্য হয়ে নর্স দেবতাদের এসগার্ড পর্যন্ত এ রহস্যের সমাধান খুঁজতে লাগল। অসাধারন একটা মিথ্যজিকাল মিস্ট্রি তানজিম রহমানের নভেলা 'কেটজলকোয়াটল ও সৃষ্টিবিন্যাস রহস্য'। খুব সংক্ষেপে চারটা মিথলজির দেবতাদের নিয়ে গড়ে উঠেছে এ নভেলার প্লট। আমার কাছে কামি(জাপানিজ) মিথলজিটা একেবারেই নতুন। ভালো লেগেছে। তবে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে কেটজলকোয়াটলের নর্স দেবতাদের মুখোমুখি হওয়ার অংশটি। কিংবদন্তি ও মিথলজি প্রেমীরা পড়ে দেখতে পারেন। হ্যাপি রিডিং।
অ্যাজটেক জগত। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে। রাগে ফুসছেন পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা কেটজালকোয়াটল। খুজে বের করবেন তিনি কে এই কাজ করছেন। তারপর তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেবেন। এইটাই তার এখন একমাত্র উদ্দেশ্য। কারন তিনি ন্যায় বিচারেরও দেবতা। তদন্ত করতে গিয়ে তিনি জগতে জগতে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। পরিচয় হতে লাগল নতুন নতুন দেবতার সাথে এবং একই সাথে নিত্যু নতুন বিপদ আর পরীক্ষার সাথে। শেষ পর্যন্ত তিনি কি পারবেন রহস্য ভেদ করতে?
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ নিরীক্ষা ধর্মী বই। অ্যাজটেক, অলিম্পাস, কামি, নর্স মিথলোজী আরো অনেক রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে ছোট্ট একটা নভেলাতে। খারাপ লাগেনি।
অ্যাজটেক দেবরাজ কেটজালকোয়াটল তদন্তে নেমেছেন। কারণ তাঁর সৃষ্ট পৃথিবী নিঃশেষ করে দিয়েছে কেউ। "Whodunit" ঘরাণার সাথে বৃহৎ এক অ্যাডভেঞ্চারের সম্মীলন ঘটিয়েছেন তানজীম রহমান।
হরর, পুরাণ, জাদু ও কিংবদন্তির প্রতি যাদের ঝোঁক আছে তাঁরা বাংলা ভাষায় এসবের সাথে দর্শনের মিথস্ক্রিয়ায় তানজীমের গল্প-উপন্যাসের সাথে ইতিমধ্যে পাঠক হিসেবে পরিচয় লাভ করেছেন।
অ্যাজটেক থেকে শুরু করে অ্যাজটেক বায়ু / আলো / জ্ঞান / ন্যায়পরায়ণতার দেবতার এ অভিযান অন্যান্য দেবলোক কিংবা পুরাণের সাথেও রিডারের দেখা করিয়ে দেয় উপন্যাসটি। কেটজালকোয়াটলকে যেতে হয় বিভিন্ন কঠিন সব পরীক্ষার মধ্য দিয়ে।
বাংলা সাহিত্যে এরকম উপন্যাস আর কেউ রচনা করেছেন কি না আমার ঠিক জানা নেই। অলিম্পিয়ান, নর্স মিথলজির চরিত্রগুলি এবং পুরাণের বিভিন্ন জানা-অজানা উপাদান ফিকশন আকারে হাজির হয়েছে পাঠকের দরবারে।
মিথলজি নিয়ে প্রচুর নন-ফিকশন লেখালেখি তো বইয়ের বাজারে আছেই। তবে ফিকশন প্রায় সবসময় নন-ফিকশনের তুলনায় পাঠককে বেশি তাড়িত করে কারণ মানুষ একটা গল্প শুনতে চায়।
বিভিন্ন মিথলজি নিয়ে আগ্রহীদের যেমন "কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য" আকৃষ্ট করতে পারে ঠিক তেমনি একদম নবীন পাঠকের জন্য এ উপন্যাস হতে পারে পুরাণের পথে হাঁটার এক স্টার্টার প্যাক।
তানজীমের লেখনির সাথে পরিচিতদের তো নতুন করে কিছু বলার নেই। তাঁরা জানেন। পুরাণ, কিংবদন্তির সাথে সাথে স্টোরিটেলিঙে হিউমারও নিয়ে আসেন লেখক। ৯৩ পৃষ্ঠার বইটি এক বসায় শেষ করতে কোন সমস্যা হয়নি আমার।
উক্ত বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি চমৎকার। দুই মলাটের মাঝে ফাহিম আনজুম রুম্মানের বিভিন্ন অলংকরণ একটা কমিক্সের ভাইব দিয়ে গেছে।
নিরীক্ষাধর্মী লেখালেখির দিকে তানজীম রহমানের ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়াকে স্বাগত জানাই।
বই রিভিউ
নাম : কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য লেখক : তানজীম র��মান প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৫ প্রকাশক : আফসার ব্রাদার্স প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : ফাহিম আনজুম রুম্মান রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ।
অ্যাজটেকের মহাপিতা আর মহামাতার নাম টোনাকাটেকুটলি আর টোনাকাসিউয়াটল । তাদের চার পুত্র নাম যথাক্রমে কেটজালকোয়াটল জাইপটোটেক টেজটাকলিপোকা...না না টাকলি না, কাটলি হবে । টেজকাটলিপোকা আরেকজন হইলো গিয়া মিক্টলানটেকুটলি । জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন , এইখানে পৃথিবীর এই ক্লান্ত এ অশান্ত কিনারার দেশে এখানে আশ্চর্য সব মানুষ রয়েছে । আমি বলবো - এইখানে হ্যাঁ হ্যাঁ এই বইয়ে আশ্চর্য সব বিচিত্র নাম আছে যা পড়ার সময় দাঁত টাত খুইলা বের হয়ে আসতে চায় ।
•|| ফ্যান্টাসি এবং মিথ বরাবরই আমার নির্ভরযোগ্য ও পছন্দনীয় জনরা। উল্লিখিত বিষয়ের আলোকে গঠিত বই সময় নিয়ে ধীরে-সুস্থে পড়তে এবং বিস্তারিত ঘাটাঘাটি করতে যারপরনাই তুষ্ট বোধ করি। কথিত অনুভূতিগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপন্যাস হলো তানজীম রহমান ভাইয়ার -"কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য" ||•
◾সংক্ষিপ্তসার: মহাপিতা টোনাকাটেকুটলি এবং মহামাতা টোনাকাসিউয়াটল। অ্যাজটেক দেব-দেবীদের জন্মদাতা আর জন্মদাত্রী। অসীম ক্ষমতা সম্পন্ন এই দুটি আত্মার বাহক দেহ একক-অবিভাজ্য। এই পুরুষ, তো এই নারী এবং তাদের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী চার পুত্রদের একজন হলো - কেটজালকোয়াটল! যে একইসাথে অ্যাজটেকলোকের - শুকতারা, আলো, দয়া, বাতাস এবং ন্যায় বিচারের দেবতা।
অজস্র প্রতিপত্তির অধিকারী এই দেবতার নির্মিত পৃথিবীর অকস্মাৎ বিপর্যয় ঘটে। এবং বিপর্যয়ের মূল হোতা অনুসন্ধানে নামেন ক্ষমতাধারী স্রষ্টা স্বয়ং "কেটজালকোয়াটল"। নাতিদীর্ঘ এই নভেলা জুড়েই ছিলো গল্পের মূল প্রোটাগনিস্ট অ্যাজটেক দেবতার জয়জয়কার। বীরদর্পে গতি-শক্তি-জ্ঞান এর উপর নির্ধারিত ও অনিবার্য পরীক্ষা ত্রয়ান্তে একে একে উন্মোচিত হতে থাকে দেবতা, দানব, জাদু আর মৃত্যুর আড়ালে প্রচ্ছন্ন থাকা ষড়যন্ত্রের জাল।
অ্যাজটেকলোক থেকে গ্রিক দেবতাদের জগৎ অলিম্পিয়া, জাপানিজ দেবতা কামিদের জগৎ এবং নর্স দেবতাদের জগৎ অ্যাসগার্ডলোকে পারি জমান এই ক্ষমতাধর দেবরাজ। এক জগৎ থেকে আরেক জগতে আবির্ভাবের স্বতন্ত্র পন্থাগুলো বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম। উল্লিখিত জগৎ ত্রয়ের দেবরাজরাও ( হেইডিস, কারণ, লোকি, ওডিন, থর...) উঠে এসেছেন গল্পের বর্ণনায়।
সর্বোপরি, পৌরাণিক রহস্য, Mythology based Fantasy, সাসপেন্স আর ছোট ছোট টুইস্টের মিশেলে তৈরি এক অদ্ভুৎ সৃষ্টিবিনাশ রহস্যের উপাখ্যানে কেটজালকোয়াটল এর সৃষ্টির বিনাশকারী আততায়ী কে খুঁজে বেড়ানোর রোমাঞ্চকর এই অভিযানে আপনাকে স্বাগতম !!!
অ্যাজটেক, অলিম্পিয়ান, জাপানি কামি, এসগার্ড এই সমস্ত পুরাণের গুটিকয় দেব দেবীদের নিয়ে মজার গল্প৷ মূল নায়ক কেটজালকোয়াটল। কে যেন চক্রান্ত করে তার তৈরী করা পৃথিবী ধ্বংস করে রেখে গেছে। কেটজালকোয়াটল নেমেছে সেই রহস্য উন্মোচন করতে।
এই লেখকের তৈরী করা কনভার্সেশন গুলি আমার পড়তে ভালো লাগে৷ বিভিন্ন বই থেকেই। এই বইতে মজার মজার অংশ তো ছিলোই। তবে সবচেয়ে চমৎকার বইয়ের শেষপাতাতে অন্ধকারের দেবতা মিকাবোশি আর কেটজালকোয়াটলের শেষ কনভার্সেশন।
বইমেলা থেকে গরম গরম কেনা বই। মেলা থেকে মিরপুরের আন্তরিক দূরত্ব বেশ সাহায্য করেছে বইটা শেষ করতে! সাধারণত বস্তুদের জন্য বরাদ্দ বিশেষণে বোঝানো যাচ্ছে না- খুব শান্ত-শিষ্ট লক্ষী একটা বই!
অক্টারিন আর আর্কন পড়ে আগেই লেখকের ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম। এই বইটা পড়ে মুগ্ধতা আরও বাড়ল। কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য-এরকম লেখা বাংলা ভাষায় আগে কেউ লিখেছেন কিনা জানা নেই। তবে নি:সন্দেহে বলা যায়, বাংলাতেও যে মিথলজি ভিত্তি করে ফ্যান্টাসি লেখা যায় চমৎকার ভাবে, লেখক তানজীম রহমান তা প্রমাণ করে দিয়েছেন।
মিথলজি সম্পর্কে আমার জ্ঞান সীমিত—কিছু দেবতাদের নাম জানা আর ভাসাভাসা কিছু ধারণার মধ্যেই আটকে ছিলাম। সেই হালকা ধারণা নিয়েই পড়ে ফেললাম তানজীম রহমানের "কেটজালকোয়াটল ও সৃষ্টিবিনাশ রহস্য"।
মিথ নিয়ে এর আগে এমন ব্লেন্ডিং দেখেছিলাম 𝐍𝐞𝐢𝐥 𝐠𝐚𝐢𝐦𝐚𝐧 এর 𝐀𝐦𝐞𝐫𝐢𝐜𝐚𝐧 𝐆𝐨𝐝𝐬 -এ, যেখানে কাহিনী ছড়িয়ে ছিল পৃথিবী জুড়ে। কিন্তু কেটজালকোয়াটল-এর গল্প বিস্তার লাভ করেছে দেবলোকে।
নাম থেকেই বোঝা যায়, গল্পটি মূলত অ্যাজটেক দেবতা কেটজালকোয়াটলকে ঘিরে। কিন্তু এখানেই লেখক মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। তিনি কেবল অ্যাজটেক মিথে সীমাবদ্ধ রাখেননি এই গল্প। বরং ছোট্ট এই বইটিতেই মিশ্রণ ঘটিয়েছেন জাপানি কামি, নর্স আর নর্ডিক মিথোলজির উপাদান। এক কথায়—একের ভেতর চার।
দেবতাদের নামগুলো বেশ জটিল, মনে রাখা কঠিন।তবে গল্পের কাঠামো বেশ সরল । খুব বেশি জটিলতা বা মাথা ঘামানোর মতো কিছু নেই। পৃথিবী ধ্বংসের পেছনের রহস্যটি শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা ধরে রাখলেও, কাহিনিতে জটিলতার ‘মাল-মসলা’ একটু কমই লেগেছে আমার কাছে।
সত্যি বলতে, এইটুকু পড়ে মনটা পুরোপুরি ভরেনি। কাহিনির পটভূমি, চরিত্র এবং মিথলজির মিশ্রণ দেখে মনে হচ্ছিলো আরও বিস্তৃত পরিসরে গেলে গল্পটা অনেক বেশি গভীরতা পেত। লেখকের ধারণা ও প্লটে যে সম্ভাবনা ছিল, সেটার পূর্ণ প্রকাশ পায়নি এত ছোট্ট পরিসরে। বইটা শেষ করার পরও একটা আফসোস রয়ে গেছে মনে। কেন তিনি আরেকটু বিস্তারিতভাবে লিখলেন না !
অ্যাজটেক দেবতা কেটজালকোয়াটলের পৃথিবী ধ্বংস করে দিয়েছে কে যেন। তাই হুডানইট স্টাইলে তদন্ত শুরু করে সে। অভিযানে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল এমনকি দেবলোকের প্রান্তের পানশালাও বাদ থাকে না। অ্যাজটেক, নর্স, কামি আর অল্প একটু অলিম্পিয়ান মিথলজি নিয়ে কাহিনী। দেবতা এবং দেবলোকের নামগুলো সম্পর্কে পরিচিত নন যারা, তাদের কাছে এটা একটা ক্র্যাশ কোর্স হতে পারে!
ওডিনের সাথে কেটজালকোয়াটলের র্যাপ ব্যাটল অংশে মজা পেয়েছি। ঐখানকার তিনটা টাস্কই দারুণ ছিল। আলো এবং বাতাসের দেবতা কেটজালকোয়াটলের অ্যাকশন সিকোয়েন্সের বর্ণনা পড়তে অ্যানিমে অ্যানিমে লেগেছে। 'রেকর্ড অফ রাগ্নারক' ধাঁচের একটা অ্যানিমে বানিয়ে ফেলা যাবে এই কাহিনীকে একটু বাড়িয়ে চাড়িয়ে।
ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় রোমাঞ্চকর অভিযান আর বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্রগুলো বাদে কাহিনী মোটামুটি সোজাসাপ্টা। টেজকাটলিপোকা তার নতুন অভিযানে ভজঘট পাকিয়ে আবার কেটজালকোয়াটলের কাছে এসেছে, এরকম একটা সিক্যুয়েল থাকলে ভালো হত।
আমার লেখকের পড়া তিনটা বইয়ের মধ্যে এটা সবচেয়ে ভাল লেগেছে। লেখকের অন্যসব বইয়ের মত এটার প্লটও অভিনব। পড়ে উপভোগ করেছি। তবে বইয়ে কিছু জায়গা আছে যেটা চোখে পড়ার মতন। এক জায়গায় লেখা আছে, 'ক্রোনাস হচ্ছে অলিম্পিয়ান মহাদেব জিউসের বাবা।' ব্যাপারটা কেমন যেন লাগল। ক্রোনস খালি জিউসের না পোসাইডন, হেডিস সহ কারও একাধিক গ্রীক দেবতা এবং দেবীর বাবা। গল্পের সাথে রেলেভেন্ট নয় এই তথ্যটা। রেলেভেন্ট হলে এই তথ্যটাকে ফেব্রিকেট করার কারণটা বুঝতাম। তাছাড়া কম বেশি বানান ভুল আছে কয়েক জায়গায়। উৎসর্গপত্রেই 'সম্পূর্ণ' বানান ভুল। এটার একটা সার্কাসটিস এলিমেন্ট আছে। উৎসর্গপত্র পড়লে পাঠক বুঝতে পারবে।
বড্ড দ্রুত শেষ হয়ে গেলো। গল্পের শুরুটাও খাপছাড়া, হঠাৎ হঠাৎ কিছু একটা হয়ে যাচ্ছে এরকম। একটু ধৈর্য্য ধরে যদি সঠিক বিন্যাসে লেখা যেত, তাহলে পড়ে আরাম পাওয়া যেত। কারণ, উপাদান ভালোই ছিল। মিথলজিকাল - ফ্যান্টাসি কমই আছে বাংলায়। সেখানে তানজীম রহমান আমার প্রিয় লেখক। একটু হতাশই হলাম। শুধু অ্যাকশন দৃশ্য নিয়ে কিছু বলার নেই। আগের মতই এখানে স্বচ্ছন্দ লেখক।
বাংলা সাহিত্য হিসেবে একেবারে অন্য রকম একটা নভেলা। মূলত বাংলা সাহিত্যে ফ্যান্টাসি জনরাটা বেশ underrated. সেখানে এমন মিথলজি বেসড ফ্যান্টাসির কথা তো চিন্তাই করা যায় না। সুতরাং বলতে হবে লেখক খুবই সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। শুভকামনা লেখকের জন্য।