১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম. মনসুর আলী ও এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামানের নির্মম হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। মানবতা লংঘনকারী ঐ নির্মম হত্যাকান্ডগুলো এমন এক সময়ের ইতিহাস যাকে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠভাবে গবেষণা এবং বিশ্লেষন না করা ও তার থেকে শিক্ষা না নেবার বিষয়টিও ছিল অন্যতম এক কারণ, যে জন্যে আমরা আজও সত্যিকারের এক সভ্য রাষ্ট্ররুপে পরিগণিত হতে পারিনি। যে কারণে আজও বাংলাদেশ লাভ করেনি মানসিক স্বস্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
এই বিষয়গুলো নিয়ে নির্মোহভাবে ও যুক্তি তথ্যের আলোকে মৌলিক গবেষণা আমাদের দেশে খুব কমই হয়েছে। আজকের প্রজন্ম যারা সেই সময়টি সম্বন্ধে জানে না বা তাদেরকে আমরা সঠিকভাবে জানাতে ব্যর্থ হয়েছি বিশেষত তাদের জন্যই সেই ইতিহাসের অতি সংক্ষিপ্ত এই বর্ণনা তুলে ধরা হল।
"মধ্য গগনের সূর্যের রং অস্তগামী সূর্যের মতো লাল রঙের হয় কী করে?" অদৃশ্য থেকে কে যখন গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিল,"দেশের ওপর মহা বিপদ নেমে আসছে"।
৩ নভেম্বর, ভোরের আলো ফোটা শুরু হয়েছে। জাতীয় চার নেতা- তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীর রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে রয়েছে কারাগৃহের মাটিতে। সেই একই ভোরে জোহরা তাজউদ্দীন স্বপ্নে দেখলেন মধ্য আকাশের সূর্য থেকে টকটকে লাল রক্তের ধারা ছড়িয়ে তাজউদ্দীন আহমদকে ভিজিয়ে দিচ্ছে!
প্রচন্ড আক্ষেপ, ক্ষোভ, অক্ষমতা আর শোকের একটা দিন - ৩ নভেম্বর'১৯৭৫। আজ আবারও নতুন করে পুরানো কিছু আক্ষেপের কথা বলি।
★জেলহত্যা সংঘটিত হয়েছিল - ৩ নভেম্বর ভোররাত ৪.২০ মিনিটের দিকে। ৪.৩৫ - এ ক্যাপ্টেন মোসলেসের দল গুলি করে চলে যায়। তখনও ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী বেঁচে ছিলেন। পরে নায়েব আলী নামের এক পাহারাদার সেনাসদস্যদের একথা জানিয়ে দেয়। এরপর নায়েক এ আলীর দল ফিরে এসে ৫.২৫ - এ মনসুর আলী আর এ. এইচ. এম কামরুজ্জামানের উপর বেয়নেট চার্জ করে।
★সেদিন কালো রাতে ১ নাম্বার সেলে প্রায় কয়েক রাউন্ড গুলি করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদের গায়ে গুলি লেগেছিল তিনটা। এর কোনোটাই ভাইটাল অর্গানে লাগেনি। তিনি মারা গেছেন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টও একথাই লেখা হয়েছিল। হয়তো তৎক্ষনাৎ হসপিটালে নিতে পারলে বেঁচে যেতেন!
★তাজউদ্দীন আহমদ জেলে বসে যে ডায়েরিটি লিখেছেন তাতে যুদ্ধাহত দেশটি কীভাবে চলবে সেকথা লিখে গেছেন। ইকোনমি, ফরেন পলিসি, শিক্ষা - সবকিছু নিয়ে তাঁর স্বচ্ছ কিছু চিন্তা ছিল, সূদুর প্রসারী পরিকল্পনা ছিল। পরবর্তীতে সে ডায়েরি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
★তৎকালীন আইজি প্রিজন নুরুজ্জামান তাজউদ্দীনের কনিষ্ঠ কন্যা রিমির কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রচন্ড আক্ষেপের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, সে রাতে তাঁকে যদি জানাতো যে ঐ সামরিক ব্যক্তি চার নেতাকে হত্যা করতে এসেছে তাহলে কারাগারের নিরাপত্তার জন্য রক্ষিত ২০০ বিডিআর সদস্যের সাহায্যে গোলমাল সৃষ্টি করে তাদেরকে বাঁচানো যেত!
৩ নভেম্বর জেল হত্যার পূর্বাপর মূলত মুক্তিযুদ্ধের দলিল। একে কেবল নন ফিকশন জনরার শেলফে তুলে রাখলে ভুল হবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার আর নিজের ডায়েরির পাতা সাজিয়ে ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে দিয়েছেন শারমিন আহমদ। সাক্ষাৎকারের কথোপকথন একেবার পূঙ্খানুপুঙ্খ না ছাপিয়ে মূল ভাবকে একটু গুছিয়ে লিখলে ভালো হতো।
তাজউদ্দীন আহমদ জেলের ভেতর কংক্রিটের জঞ্জাল সাফ করে সুন্দর একটা বাগান করেছিলেন। অথচ দেশের জঞ্জাল সারানোর সুযোগ আর পেলেন না! এই আক্ষেপ আর ভুলে ভরা ইতিহাস নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে।
'১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানের নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। মানবতা লংঘনকারী ওই নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠভাবে গবেষণা এবং বিশ্লেষণ না করা ও তার থেকে শিক্ষা না নেবার কারণে আমরা আজও সত্যিকারের এক সভ্য রাষ্ট্ররূপে পরিগণিত হতে পারিনি। যে কারণে বাংলাদেশ আজও লাভ করেনি মানসিক স্বস্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এই বিষয়গুলো নিয়ে নির্মোহভাবে ও যুক্তি তথ্যের আলোকে মৌলিক গবেষণা আমাদের দেশে খুব কমই হয়েছে । আজকের প্রজন্ম যারা সেই সময়টি সম্বন্ধে জানে না বা তাদেরকে সঠিকভাবে জানাতে ব্যর্থ হয়েছি, বিশেষত: তাদের জন্যই সেই ইতিহাসের অতি সংক্ষিপ্ত এই বর্ণনা তুলে ধরা হলো।’
বইয়ের ভূমিকায় এভাবেই শুরু করেছেন লেখিকা শারমিন আহমদ। এরপর দুই মলাটে সে সময়কার নিজ ও পারিবারিক অভিজ্ঞতা, নানা জনের সাক্ষাৎকার, জেল হত্যার বিচার প্রক্রিয়া ও রায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। জানিয়েছেন একরাশ আক্ষেপ আর দুঃখের কথা।
বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর অন্যতম কলঙ্কজনক ও বেদনাময় তারিখটি হচ্ছে একই বছরের ৩ নভেম্বর। '৭৫ এর সেই টালমাটাল অস্থির সময়ে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে সপরিবারে নির্মম হত্যাকান্ডের পর ৩ নভেম্বর জেলখানায় হত্যা করা হয় জাতির সূর্যসন্তান, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও এম মনসুর আলীকে
জেলহত্যা তদন্ত কমিশনের সদস্য বিচারপতি কে এম সোবহান এবং ওই সময়ে কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ, রায়ের বাজার আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী মহসিন বুলবুল এবং সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার (অব:) আমিনুল হক বীরউত্তম প্রমুখের সাথে ১৯৮৭ সালে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ও কেন্দ্রীয় কারাগারের সার্বিক পরিস্থিতির আলোকে গবেষণামূলক আলোচ্য এ গ্রন্থটি রচিত হয়েছে।
‘মধ্য গগনের সূর্যের রং অস্তগামী সূর্যর মতো লাল রঙের হয় কী করে?’ অদৃশ্য থেকে কে যেন গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল, ‘দেশের ওপর মহাবিপদ নেমে আসছে।’
তাজউদ্দীন আহমদ এর স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীন এর দেখা সেই ভয়ানক স্বপ্নটাই যেন বাস্তব হয়ে উঠেছিল ঘুম ভাঙার পর। সাত সকালে জঙ্গি বিমানের প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তাদের। বাসার খুব নিচ দিয়ে ঘন ঘন উড়ে যেতে লাগলো জঙ্গি বিমান ও হেলিকপ্টার।
১৫ আগস্টের পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও এম মনসুর আলীসহ আরও অনেক রাজনৈতিক নেতাকে আটক করে কেন্দ্রীয় কারাগারের রাখা হয়েছিল। নিউ জেলের পাশাপাশি তিনটি রুমে তাঁদের রাখা হয়। ১ নম্বর ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদসহ আটজন বন্দী। ২ নম্বর রুমে ছিলেন এ এইচ কামারুজ্জামানসহ ১৩ জন। ৩ নম্বর রুমে ছিলেন এম মনসুর আলীসহ ২৬ জন। সেই রাতে ১ নম্বর রুমে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদকে রেখে বাকি ছয়জন বন্দীকে অন্য রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ২ নম্বর রুম থেকে এ এইচ কামারুজ্জামান ও ৩ নম্বর রুম থেকে এম মনসুর আলীকে ১ নম্বর রুমে নেওয়া হয়। এই রুমেই তাঁদের চারজনকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর পর যারা নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতো, পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া হয় তাদের।
সেইসব দিনগুলোর কথা, বিভিন্ন জনের সাক্ষাৎকারের পূর্ণ বিবরন, বিচার প্রক্রিয়া ও রায় নিয়ে লেখিকার নিজের বিশ্লেষণ নিয়েই এই বই। বইটা পড়তে গিয়ে চমকপ্রদ একটা তথ্য পেয়েছি, সেই সঙ্গে আফসোসও হচ্ছে জেলে থাকাকালীন তাজউদ্দীন আহমদ একটা ডায়েরি লেখা শুরু করেছিলেন, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নানা ইতিহাস, দেশের ইকোনমি, পলিসি নিয়ে নিজের পরিকল্পনা লিখছিলেন তিনি। দুঃখের বিষয় সেই ডায়েরিটা পরবর্তীতে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। সেই ডায়েরিটা পেলে হয়তো না জানা অনেক কথাই জানতে পারতাম আমরা। সেই সাথে পেতাম দেশকে এগি���়ে নেওয়ার জন্য তাঁর মূল্যবান পরামর্শগুলো, জানতাম দেশ নিয়ে দেখা তাঁর সুন্দর স্বপ্নগুলো।
সে সময়কার ইতিহাস ও লেখিকার পর্যালোচনা জানতে পড়তে পারেন বইটা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পারিবারসহ নির্মমভাবে নিহত হন। একই বছর ৩ রা নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম. মনসুর আলী ও এ.এইচ.এম কামরুজ্জামানের নির্মম হত্যাকান্ড ঘটে। নির্মম ও মানবতা লঙ্ঘনকারী এ হত্যাকান্ড এমন এক সময়ের যখন দল ও মতের উর্ধ্বে অবস্থান করছে একটা রাষ্ট্র। তাই এই হত্যা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা ও বিশ্লেষণ না করা অন্যতম একটা প্রধান কারণ, আর এ কারণেই হয়তো আমরা আজও সত্যিকারের এক সভ্য রাষ্ট্রে পরিনত হতে পারিনাই।
দীর্ঘ ২৯ বছর পর ২০ অক্টোবর জেল হত্যার রায়টি ঘোষিত হয় দুই বার পেছনোর পর। তবে রায়টিতে ন্যায় বিচার প্রতিফলিত হয়নি, এতে রয়েগেছে বহু ফাঁক-ফোকড়। ১৯৮৭ সালে প্রথম নিজ উদ্যোগে শারমিন আহমদ জেল হত্যাকান্ডের ওপর সাক্ষাৎকার গ্রহনের কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ এবং সেই সময় ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের অনেক সাক্ষাৎকার তিনি গ্রহন করলেও প্রকৃত অপরাধীরা হয়তো সাজা পান নাই। সেই সময়ে আদালতে সে সকল ব্যক্তিদের নাম দেওয়া হয় তাতে ছিলো নানা জটিলটা, নামের সাথে পদবির ও ঠিকানার গড়মিল থাকার কারনে সঠিক ব্যক্তিকে খুজে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তাজউদ্দীন আহমদ এর জ্যৈষ্ঠ কন্যা শারমিন আহমদ যুক্তরাষ্ট্রে সংগঠিত প্রগতিশীল ইসলামী নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিনারেত অব ফ্রিডমের সাবেক পরিচালক এবং প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। জেল হত্যার পর বাবকে নিয়ে লেখা ডায়েরি, আত্মীয়দের কাছে লেখা চিঠি, বিভিন্ন পত্রিকায় নিজের লেখা, তাজউদ্দীন আহমদ এর কাছের কিছু লোকের লেখা ও বিভিন্ন দেশ ও বাংলাদেশের পত্রিকার বিভিন্ন সময়ের লেখা ও কিছু সাক্ষাৎকার তুলে নেওয়া হয়েছে বইটিতে।
আগে-পরে কিছু বইয়ে এ ঘটনা নিয়ে পড়ে থাকলেও বইটাতে সেই সময়ের কিন্তু মানুষের বয়ান স্পষ্ট করে দিয়েছে ঘটার সত্যতা ও তার সাথে জড়িয়ে থাকা কিছু লোকের ব্যবহার। তথ্য গুলো জানা থাকলেও নতুন করে চেনা হলো আরও কিছু নতুন মুখ। বইটা শুধু ভালো বললে কম বলা হবে। তথ্যের সাথে লেখিকার অনুভূতিটা সমান ভাবে মিশে আছে।
লেখনী তেমন মন ভরায় না। তবু শারমিন আহমেদের বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ কিংবা সে সময়ের ইতিহাসের খানিকটা পাওয়া যায়। অনেক পুনরাবৃত্তি আছে। তবে জেলহত্যা দিবসের ভালো ডকুমেন্ট সাক্ষাৎকারগুলো।