Jasimuddin (Bangla: জসীম উদদীন; full name: Jasimuddin Mollah) was a Bengali poet, songwriter, prose writer, folklore collector and radio personality. He is commonly known in Bangladesh as Polli Kobi (The Rural Poet), for his faithful rendition of Bengali folklore in his works.
He obtained his BA degree in Bengali from the University of Calcutta in 1929 and his MA in 1931. From 1931 to 1937, Jasimuddin worked with Dinesh Chandra Sen as a collector of folk literature. Jasimuddin is one of the compilers of Purbo-Bongo Gitika (Ballads of East Bengal). He collected more than 10,000 folk songs, some of which has been included in his song compilations Jari Gaan and Murshida Gaan. He also wrote voluminously on the interpretation and philosophy of Bengali folklore.
Jasimuddin started writing poems at an early age. As a college student, he wrote the celebrated poem Kabar (The Grave), a very simple tone to obtain family-religion and tragedy. The poem was placed in the entrance Bengali textbook while he was still a student of Calcutta University.
Jasimuddin is noted for his depiction of rural life and nature from the viewpoint of rural people. This had earned him fame as Polli Kobi (the rural poet). The structure and content of his poetry bears a strong flavor of Bengal folklore. His Nokshi Kanthar Maath (Field of the Embroidered Quilt) is considered a masterpiece and has been translated into many different languages.
Jasimuddin also composed numerous songs in the tradition of rural Bengal. His collaboration[4] with Abbas Uddin, the most popular folk singer of Bengal, produced some of the gems of Bengali folk music, especially of Bhatiali genre. Jasimuddin also wrote some modern songs for the radio. He was influenced by his neighbor, poet Golam Mostofa, to write Islamic songs too. Later, during the liberation war of Bangladesh, he wrote some patriotic songs.
Jasimuddin died on 13 March 1976 and was buried near his ancestral home at Gobindapur, Faridpur. A fortnightly festival known as Jasim Mela is observed at Gobindapur each year in January commemorating the birthday of Jasimuddin. A residential hall of the University of Dhaka bears his name.
He was honored with President's Award for Pride of Performance, Pakistan (1958), DLitt. by Rabindra Bharati University, India (1969) Ekushey Padak, Bangladesh (1976), Independence Day Award (1978).
গ্রামদেশের মানুষের "সারল্য" নিয়ে অনেকের মনে ভ্রান্ত ধারণা আছে।তাদের ধারণা গ্রামের লোকজন অত্যন্ত মহৎ হৃদয়ের; সবাই মিলেমিশে একসাথে থাকে কিন্তু গ্রামের মানুষের সাথে মিশে কি এমন ধারণা টিকে থাকবে? অত্যন্ত কুটিল, জটিল, পরশ্রীকাতর স্বভাবের মানুষের অভাব নেই গ্রামে।কিন্তু সেই প্রচারিত "সারল্য" কি পুরোটাই মিথ? সত্যি বলে কিছু নেই? আছে বৈকি! তবে অন্যভাবে। ধরেন, আপনি পাঁচঘণ্টা ঘুরে পছন্দ করে একটা শার্ট কিনেছেন। সেই শার্ট দেখাতে এসেছেন আমাকে।আমি ভালো না লাগলেও ভদ্রতা করে বলবো, "বাহ, বেশ!দারুণ মানাবে।" একই শার্ট আমার মাকে দেখাতে নিয়ে গেলে অবশ্য ঘটনা অন্যরকম হবে। মা নিখাদ বিস্ময় নিয়ে বলবে,"পাঁচ ঘণ্টা ঘুইরা এমন পচা একটা শার্ট কিনছো! " ধরেন, নিমন্ত্রণ পেয়েছি এক বাসায়। প্রচুর চর্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয়'র আয়োজন করা হয়েছে।খাওয়া শেষে গৃহকর্তা সাগ্রহে জানতে চাইলেন, "খাবার কেমন হইসে?" আমি উত্তর দিলাম, "অনেক মজার হইসে সবকিছু।" সাথে মেজোফুপা থাকলে নির্ঘাত বলবে, "মাংসটা গলে নাই ঠিকমতো। চিংড়িতে লবণ একটু কম হইসে।" এগুলো শত্রুতা করে বা কাউকে ছোট করার জন্য বলা না।তাদের ঠিক যেমন লাগে, তেমনটাই বলেন। কিছু ভালো লাগলেও কিন্তু তারা শতমুখে সেটার প্রশংসা করে লোকজনকে লজ্জায় ফেলে দ্যান। অনুভূতি প্রকাশে তারা কৃত্রিমতার ধার ধারেন না।গ্রামের ভালো মানুষ, খারাপ মানুষ সবার মধ্যেই এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়; অন্তত যেতো একটা সময়।
এতো বড় গৌরচন্দ্রিকা দিলাম ব্যক্তি ও লেখক জসীম উদ্দীন সামান্য সম্বন্ধে ধারণা দিতে। তার ও তার লেখার মধ্যে গ্রামীণ এই সারল্য পুরোদমে আছে। যা দেখছেন, যা ভালো লাগছে, যা খারাপ লাগছে তা অবলীলায় বলছেন।আপনার খারাপ লাগুক বা ভালো, এই সারল্যই লেখকের প্রধান গুণ।তিনি অবশ্য মানুষের ভালো দিকটা দেখতেই বেশি উৎসাহী।শিশুর মতো অনুসন্ধিৎসা ও কৌতূহল নিয়ে তিনি ভ্রমণ করেছেন সৌদি আরব, লন্ডন,আইসল্যান্ড, আমেরিকা ও পশ্চিম পাকিস্তান। ভ্রমণকাহিনিতেও ঘুরেফিরে এসেছে পূর্ব পাকিস্তান। গ্রামে বিয়ের সময় কীভাবে পুরো এলাকার মেয়েরা একত্রিত হয়ে "ডালা" পাঠায় ও নিজেদের মধ্যে বন্ধন সুদৃঢ় করে তা নিয়ে একটা অপূর্ব অধ্যায় আছে।বইয়ের সব অংশ অবশ্য সমান আকর্ষণীয় নয়। বইয়ের ভূমিকা ১৯৬৯ এ লেখা। তখনও লেখক বইতে ব্যবহার করছেন "আমাদের কায়েদে আজম।" এটা একটু পীড়াদায়ক।
সবমিলিয়ে "চলে মুসাফির" পড়ে নির্মল আনন্দ পাওয়া যায়।জসীম উদ্দীন নেই।তার সারল্যও নেই।সারল্য হারাতে বসেছে গ্রামের মানুষদের মধ্য থেকেও। কারণ এই সারল্য এখন লোকসমাজে ঠিক ফ্যাশনেবল না। সবকিছু হারিয়ে যাবে, এটাই যেন নিয়তি।
পল্লী কবি জসীম উদদীন ১৯৫০ সালে মার্কিন দেশে গেছিলেন সরকারি সহায়তায়, পথিমধ্যে থেমেছিলেন বাহরাইন, লন্ডনে এবং আইসল্যান্ডে অল্প সময়ের জন্য, আবার আমেরিকার থেকে ফিরে গিয়েছিলেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে। সেই সময়ের অধিবাসীদের গল্প লিখেছিলেন সরল ভাষায় ‘চলে মুসাফির’ বইতে। এক বন্ধুর সংগ্রহে বইটি দেখা মাত্রই ধার নিয়ে একটানা পড়ে শেষ করে ছিলাম, ১২৮ পাতার কলেবরকে খুব একটা বড় বলা যায় না, কিন্তু নানা রঙবেরঙের ঘটনার আগমনে বইটি বেশ চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠেছে।
বইয়ের পাতায় পাতায় পল্লীকবির জ্ঞানতৃষ্ণা প্রকাশ পেয়েছে, বিশেষ করে যে কোন দেশের সমাজ এবং মানুষের সাথে মেশার আকাঙ্ক্ষা ও সেই সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানলাভ তাঁর ভ্রমণের মূল্য উদ্দেশ্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায় খুব সহজেই। যেমন বিলেত ভ্রমণের সময় কবি লিখেছেন 'লন্ডন ষ্টেশনে নামিয়াই বন্ধুবরদের সাথে দেখা হইল। তাদের একজনের বাসায় এরা আমার থাকার ব্যবস্থা করিয়াছে। আমি বলিলাম- তোমাদের সাথে থাকিলে তো আমি এদেশের কিছুই জানিতে পারব না। আমার এক ব্রিটিশ বন্ধু, হেলেম টেনিসন, বেথনাল গ্রিনে থাকেন তাঁর বাসায় যাইব'।
১০০% একমত, যে কোন দেশে যেয়ে তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে সেই দেশের মানুষের সাথেই মিশতে হবে, আর বিশেষ করে বাঙালী সমাজে একবার ভিড়ে গেলে দাওয়াত খেতে খেতেই পুরোটা সময় মাটি হবে। একই কাজ তিনি করেছেন মার্কিন মুলুকেও, বলেছেন ২০ দিন একটানা ভাত খাই নি, তাই আজ খেয়ে তৃপ্তি পেলাম কিন্তু এই খানা, এই ভাষা, এই সমাজ তো দেশে গেলে প্রতিদিনই পাব, তাই আপাতত এই দেশ সম্পর্কে জেনে নিই।
১৯৫০ সালে তাঁর এই অজানার প্রতি অ্যাডভেঞ্চার আমাদের অভিভূত করে বৈকি! তাঁকে চা দিতে আসা হোটেল বয়ের কাছ থেকে যখন তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাবার নিমন্ত্রণ আদায় করেন, এলিস নামে অচেনা সুন্দরীর সাথে প্রথম পরিচয়েই ট্যাক্সি চেপে অজানা শহরে যান, যে কোন নতুন শহরে যেয়ে সেখানে লেখক-গায়কদের আড্ডায় ঢুঁকে পড়েন অনায়াসে, প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলার গানের, ছড়ার। সদ্য আয়ত্তে আনা মার্কিন উচ্চারণে ঠেকে ঠেকে ইংরেজি বলতে বলতে ‘ মারো জোয়ান হেইও বুঝিয়েছেন। তাঁর সদা কৌতূহলী খোলা মনের পরিচয় পেয়ে অতি আমোদিত হয়েছি, সাধারণ অনেক ভ্রমণকাহিনীর মত সেই দেশের সাথে প্রতি অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশে কত ভাল, কত সুন্দর এই তুলনা করে বইটি আত্মঅহমিকায় বিষিয়ে তুলেন নাই। তবে পাশ্চাত্যের ভাল দিকগুলো তুলে এনেছেন তাঁর কলমে, সেই সাথে সারা পৃথিবীতেই যে ভাল মানুষ আছে, তারা নানা রূপে নানা কালে দেখা দেয়, নিঃস্বার্থ ভাবে উপকার করে প্রতিদান দেবার সুযোগ না দিয়ে চলে যায় জীবনের পথে সেই কথা বারবার বলে জানিয়েছেন লোককবির কথা-
‘নানার বরন গাভীরে ভাই একই বরন দুধ- আমি জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত!’
চিত্তাকর্ষক সব ব্যক্তির সাথে কবির আলাপের বিবরণের মধ্য সবচেয়ে মূল্যবান রত্নটি ছিল কবি এজরা পাউন্ডের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ। দুঃখজনক ভাবে সাক্ষাৎটি ঘটেছিল পাগলা গারদে, এজরা পাউন্ড তখন প্রায় উম্মাদ, তাঁকে চিকিৎসার জন্য রাখা হয়েছিল মানসিক হাসপাতালে, সেই অবস্থাতেও তিনি কনফুসিয়াসের অনুবাদ করছিলেন। নাৎসি সংসর্গের অভিযোগ তিনি অভিযুক্ত, ফলে তাঁর সাথে দেখা করাও ছিল বেশ কঠিন, কেবল মাত্র সেই দেশের সরকারের লোক অনুমতি দিলেই সম্ভব। যা হোক, এজরা পাউন্ডের স্ত্রী কবি জসীম উদদীনের কথা শুনে সেই ব্যবস্থা করে দিলেন। এজরা পাউন্ড বঙ্গদেশের কবিকে বেশ কিছু বই উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘ বইগুলি তো বন্ধুবান্ধবদের দেওয়ার জন্যই। তারা যখন সচল তখনই জীবন্ত। অচল বই তো মৃত। এগুলি বিতরণ করিয়া দেওয়াতেই আনন্দ।’
পরবর্তীতে এই দুই কবির মাঝে পত্রযোগাযোগ ছিল।
রসিক কবি সব দেশের তরুণীদের সম্পর্কেই সুখ্যাতি করেছেন, বিশেষ করে আইসল্যান্ডের মেয়েদের নিয়ে লিখেছেন ‘যেসব মেয়ে আমাদের খাবার পরিবেশন করল তাহারা সকলেই যেন ডানাকাটা পরী। তাহাদের মধ্যে কে কাহার চেয়ে বেশি সুন্দরী নির্ণয় করা যায় না’।
যেহেতু প্রথম ভ্রমণ ১৯৫০ সালে, সদ্য তৈরি হওয়া রাষ্ট্র জোড়া লাগা পাকিস্তান এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সম্পর্কে তাঁর মোহভঙ্গ হয় নাই তখনো, কিংবা হলেও হয়ত রাষ্ট্রযন্ত্রের সেন্সরের কারণে তা প্রকাশিত হয় নি। কিন্তু বাস্তবতা নিয়ে তাঁর চিন্তা যে দূরদর্শী এবং সূক্ষ ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৬০ এর দিকে করাচীতে লেখক সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে-
"হাজার হাজার মাইল দূরে আমাদের পূর্ব পাকিস্তান। সেইখানে আমাদের অনেক রীতিনীতি আপনাদের হইতে আলাদা। পশ্চ��ম পাকিস্তান হইতে পূর্ব পাকিস্তানে যাইয়া সেই আলাদা রীতিনীতি দেখিয়া আমাদের কোনো কোনো ভাই মনে করেন, এই পার্থক্য হিন্দু-প্রভাবের ফল। তাহারা আশা করেন এইসব পার্থক্য ভাঙ্গিয়া আমরা আপনাদের সঙ্গে আসিয়া এক হই। কিন্তু এই ধারণা ভুল। কারণ আমাদের মেয়েরা শাড়ি পরে। যখন রঙিন শাড়ি পরিয়া আমাদের মেয়েরা কলসি কাঁখে লইয়া সরষেক্ষেতের আঁকা-বাঁকা পথ ঘুরিয়া পদ্মা নদীতে পানি আনিতে যায় তখন বাঁশীর সুর বহিয়া আমাদের মনের কথা আকাশে ছড়ায়। মেয়েদের এই শাড়িকে আমরা কত ছন্দে কত উপমায়ই না রূপ দিয়েছি। সেই শাড়ি মেঘের মতো, রামধনুর মতো, ময়ূর পাখির পাখার মতো। এখন যদি কেহ বলেন এই শাড়ি বদলাইয়া আমাদের মেয়েদের ঘাগরা বা ইজের পরিতে হইবে, সেকথা আমরা শুনিব না। তেমনই আমাদের পদ্মা-যমুনা-মেঘনা নদী হইতে আমরা যে অপূর্ব ভাটিয়ালি সুর কুড়াইয়া পেয়েছি তাহাও আমরা ছাড়িব না। আপনাদের এইখানে যে অপূর্ব সিন্ধি পাঞ্জাবি আর পস্তু লোকগীতি শুনিবার সৌভাগ্য আমরা হইয়াছে তাহা আমার কানের ভিতর দিয়া মরমে প্রবেশ করিয়াছে। পার্থক্যের জন্যই মানুষ মানুষের বন্ধু হয়। আমরা ভিতরে যাহা নাই তাই আমরা অপরের নিকটে পাইয়া তাহার সঙ্গে বন্ধুত্ব করি। অনন্তকাল ধরিয়া নারী-পুরুষে যে মিলন তাহাও সেই পার্থক্যের জন্য।"
বইটির সঠিক প্রকাশ কাল বুঝতে পারলাম না, ইন্টারনেটে আছে ১৯৫২, বইতে আছে ১৯৬৬। বইটি ২০১২ সালে পুনঃপ্রকাশ করেছে পলাশ প্রকাশনী। পড়ে দেখুন পাঠক, আমাদের জল-হাওয়ার কবির চোখে বহির্বিশ্ব!
চলে মুসাফির নামের ভ্রমণকাহিনীর লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী হবেন এমনটাই আশা করেছিলাম। কিন্তু না। বইয়ের ভেতরে প্রচ্ছদের ক্রেডিট দেওয়া নেই, তবে প্রচ্ছদের হাতের লেখা দেখে বুঝলাম প্রিয় শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর কাজ।
১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আমেরিকা ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছিলেন জসীম উদদীন। করাচি থেকে যাত্রা শুরু। বিমান গোলযোগের কারণে বাহরাইনে তিন দিন যাত্রাবিরতি। আরব দেশ নিয়েও দুকলম লিখেছেন পল্লীকবি। মুসলিমদের দুর্দশা নিয়ে আফসোস করেছেন, মুসলিমদের ভ্রাতৃত্ববোধ যেন জাগ্রত হয়, সেই কামনা করেছেন।
তারপর বাহরাইন থেকে কায়রো। তবে পিরামিড দেখার সুযোগ হয়নি কবির। কায়রো থেকে লন্ডন। লন্ডনে কবি তাঁর বৃটিশ বন্ধুর বাড়ির অতিথি হয়েছিলেন। আরও কিছু ব্রিটিশ বন্ধুদের সাথে দেখা করেছিলেন। তাদের আতিথেয়তায় কবি মুগ্ধ। তিনি ব্রিটিশদের প্যারেন্টিং নিয়ে লিখেছেন, সেদেশে বাবা-মা হবার হবার আগে দম্পতিরা প্যারেন্টিং নিয়ে বইপত্র পড়ে সন্তান লালনপালনের প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। আজও আমাদের ঐ অভিজ্ঞতা থেকে শেখার আছে।
লন্ডন থেকে আমেরিকায়। ইন্ডিয়ানাপোলিসে লোকসংগীতের সম্মেলন। আমেরিকানদের শিষ্টাচারে কবি আরও বেশি মুগ্ধ। প্রায় সব মার্কিন নারীকেই অপরূপ সুন্দরী মনে হয়েছে তাঁর। সেই রমনীদের জন্য তিনি 'ডানাকাটা পরী' টার্মটা ব্যবহার করেছেন, তাদের বলেছেন আপেলের মত রাঙা। আমাদের দারিদ্র্য আর অপুষ্টিতে জর্জরিত দেশের মানুষ বলেই হয়ত ঐদেশের সুস্থ সবল মানুষ দেখে তিনি এমন আপ্লুত। সত্যি বলতে, সুস্থ মানুষ মাত্রই দেখতে সুন্দর।
আমেরিকানদের যা কিছু ভালো, সেসবের দিকেই যেন নজর পড়েছে কবি জসীম উদ্দিনের। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়োগিক জ্ঞানের দিকে জোর দেয়। সেদেশে গুণী ব্যক্তিদের মূল্যায়ন হয়। শিল্পী, সাহিত্যিকদের মূল্যায়ন হয়। যার যা যোগ্যতা, সে সেই কাজে নিয়োজিত হবার সুযোগ পায়। কাজকে তারা ছোট মনে করে না। মানুষের সাহায্য তারা এগিয়ে আসাকে কর্তব্য মনে করে, মানে আমাদের দেশে সেসব সাহায্য করাকে বদান্যতা ধরা হয়, মার্কিন দেশে সেটা স্বাভাবিক আচরণ। তারা বন্ধুভাবাপন্ন, উদার, রুচিশীল, আধুনিক। তাদের জীবন বিজ্ঞানের বিবিধ ব্লেসিং দ্বারা প্রভাবিত। পৃথিবী উপভোগের সবকিছু তাদের হাতের কাছে। তাদের কৃষিব্যবস্থা উন্নত। কৃষকরা কৃষিবিদ্যায় শিক্ষিত। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সম্পর্কিত জ্ঞান তাদের আছে। মাটির উর্বরতা সম্পর্কিত জ্ঞান তাদের আছে। উড়োজাহাজের মাধ্যমে কৃষিবিভাগ জমিতে সার প্রয়োগ করে, কীটনাশক প্রয়োগ করে।
আমেরিকা যেন সুখ-শান্তির দেশ। যেখানেই গিয়েছেন, ভালো মানুষের সান্নিধ্যে পেয়েছেন জসীম উদদীন। এতে মানুষ জসীম উদদীনের কৃতিত্বও আছে বলে মনে হয়, তাঁর আচরণে শিশুতোষ বিস্ময় প্রকাশ পায়, তিনি নিষ্পাপের মত প্রশ্ন করেন। এই সারল্য সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে আকর্ষণ করে। কবি ভীষণ সংবেদনশীল, ছোট্ট ছোট্ট মধুর আচরণ তাঁর চোখে পানি এনে দেয়, পৃথিবীর সকল মানুষকে তাঁর স্বজন মনে হয়। এছাড়া তিনি ভালো গল্প বলতে পারেন; তাঁর ইংরেজিটা যেহেতু খুব ভালো ছিল না, তিনি অঙ্গভঙ্গী আর অভিনয় করে বিদেশিদের দেশের গল্প শুনিয়েছেন। তাঁর উপস্থিতিতে আমেরিকানরাও একটা এক্সোটিক স্বাদ পেয়েছিল বলে মনে করি।
আমেরিকায় শুধু একটা স্থানে একটু গ্যানজাম ঝামেলা দেখেছেন কবি। একজন বন্ধুর সৌজন্যে নিউইয়র্কের জাতিসংঘের একটা অধিবেশনের দর্শক হবার সুযোগ পেয়েছিলেন, তখন কোরিয়া যুদ্ধের সময়; সেখানেই তিনি জাতিসংঘের অধিবেশনে যেমনটা হয় আরকি- ঝগড়া, বিষেদগার এসব দেখেছিলেন।
জসীম উদদীনের আমেরিকা ভ্রমণের সুযোগ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বলেই কিনা জানিনা, তিনি বিভিন্ন স্থানে 'পাকিস্তান' শব্দটা লিখেছেন, যেখানে পূর্ব বাংলা লিখলেই ঠিক ছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে 'পাকিস্তান' শব্দটাই তখন সঠিক, কিন্তু সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তো 'পূর্ববাংলা' বা 'বাংলাদেশ' শব্দের ব্যবহার যথার্থ। কখনও তিনি লিখেছেন পূর্ববঙ্গ, কখনও পূর্ব পাকিস্তান, কখনও শুধুই পাকিস্তান, এমনকি বাংলাদেশও লিখেছেন। তবে একটা জায়গাতে খুব কদর্য লেগেছে, নিউইয়র্কে গিয়ে এক বাঙালি বন্ধুর বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করে কবি বলছেন- “আজ দেড় মাস পরে তোমাদের বাড়িতে আসিয়া প্রথম পাকিস্তানী খাবার খাইলাম। নিজের মাতৃভাষায় কথা বলিতে পারিলাম।
পাকিস্তানি খাবার? You can't be serious, Sir! You cannot be serious!
চলে মুসাফির গ্রন্থে পাকিস্তানের করাচি, মুলতান ভ্রমণও যুক্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানি জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার বাসনায়। এই পাকিস্তান ভ্রমণের সময়কাল ভিন্ন। এই করাচি মুলতানের অধ্যায়টা কোন সময়কার এডিশনে যুক্ত করা হয়েছে বুঝতে পারলাম না, তবে ষাটের দশকের কোন এক সময়ে হতে পারে, আইয়ুব খান তখন ক্ষমতায়। ততদিনে কবি নিশ্চয় জেনে গেছেন পূর্ববাংলা স্বাধীন না, পাকিস্তানের কলোনি। তবে পূর্ব বাংলার/পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রাখার গুরুত্ব কবি ভোলেননি, পাকিস্তানের একটি লেখক সংঘের চা-চক্রে গিয়ে এ বিষয়ে একটা বক্তৃতা করেছিলেন। সেই বক্তৃতার কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যায়: হাজার হাজার মাইল দূরে আমাদের পূর্ব পাকিস্তান। সেইখানে আমাদের অনেক রীতিনীতি আপনাদের হইতে আলাদা। পশ্চিম পাকিস্তান হইতে পূর্ব পাকিস্তানে যাইয়া সেই আলাদা রীতিনীতি দেখিয়া আমাদের কোনো কোনো ভাই মনে করেন, এই পার্থক্য হিন্দু-প্রভাবের ফল। তাঁহারা আশা করেন এইসব পার্থক্য ভাঙিয়া আমরা আপনাদের সঙ্গে আসিয়া এক হই। কিন্তু এই ধারণা ভুল। কারণ আমাদের মেয়েরা শাড়ি পরে। মেয়েদের এই শাড়িকে আমরা কত ছন্দে কত উপমায়ই না রূপ দিয়াছি। সেই শাড়ি মেঘের মতো, রামধনুর মতো, ময়ূর পাখির পাখার মতো। এখন কেহ যদি বলেন এই শাড়ি বদলাইয়া আমাদের মেয়েদের ঘাগরা বা ইজের পরিতে হইবে, সেকথা আমরা শুনিব না। তেমনি আমাদের পদ্মা-যমুনা-মেঘনা নদী হইতে আমরা যে অপূর্ব ভাটিয়ালি সুর কুড়াইয়া পাইয়াছি তাহাও আমরা ছাড়িব না। আপনাদের এইখানে যে অপূর্ব সিন্ধি পাঞ্জাবি আর পস্তু লোকগীতি শুনিবার সৌভাগ্য আমার হইয়াছে তাহা আমার কানের ভিতর দিয়া মরমে প্রবেশ করিয়াছে। পার্থক্যের জন্যই মানুষ মানুষের বন্ধু হয়। আমার ভিতরে যাহা নাই তাই আমরা অপরের নিকটে পাইয়া তাহার সঙ্গে বন্ধুত্ব করি।
অন্য একটা অধ্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্যের ভাষারূপ নিয়ে আলোচনা আছে। তখনকার পূর্ব বাংলার কিছু সাহিত্যিক বাংলায় হিন্দুয়ানী উপমা বর্জন করে আরবি ফারসি উর্দু হতে উপমা অলংকার আমদানি করার পক্ষে মতামত প্রকাশ করেন। তাদের কথা, যুক্তবঙ্গের সাহিত্যের ভাষা থেকে পূর্ব পাকিস্তানি সাহিত্যের ভাষা যেন আলাদা করা যায়। কবি জসীম উদদীন এ বিষয়ে বলছেন: আমার বিশ্বাস, ইঁহারা যদি ধর্মান্ধতার এবং অতিউৎসাহের মোহে পড়িয়া দেশের অন্যান্য সাহিত্যের শত্রু হইয়া না দাঁড়ান ইঁহাদের সাধনার দ্বারাও বঙ্গ-সাহিত্যের যথেষ্ট উপকার হইবে।
হিন্দুয়ানী উপমা বর্জনকারীদের মধ্যে কিছু বদমায়েশ লোকও ছিল, যারা হিন্দু-মুসলিম বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য সুস্পষ্ট করার জন্য না, হিন্দুবিদ্বেষের জন্য সাহিত্যের নতুনধারা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। তবে পূর্ব বাংলার সাহিত্যে আরবি ফারসি উর্দু শব্দের ব্যবহার করে বাংলায় নতুন ভ্যারিয়েন্ট সৃষ্টির আইডিয়াটা মন্দ ছিল না; আমি কবির সাথে একমত, এবং মনে করি, তাঁর কথা চিরপ্রাসঙ্গিক। বাংলা ভাষায় ইংরেজি, আরবি, ফারসি, ফরাসি,... সব ভাষা থেকেই নতুন নতুন প্রয়োজনীয় শব্দ আসা প্রয়োজন। তবে কোন কালচারাল সাম্প্রদায়িকতা না ছড়িয়ে, ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে হয় ভালোবেসে। আমরা তো কোন প্রয়োজনে উপযুক্ত বাংলা শব্দ খুঁজে না পেলেই ইংরেজি শব্দ বসিয়ে দিই; এমনকি বাংলা শব্দ থাকলেও ইংরেজি শব্দটা বেশি পছন্দ হলে সেখানে ইংরেজি শব্দ চয়ন করি। বিদেশি শব্দ আমদানির নেতিবাচক দিকও আছে। কিন্তু কি করা যাবে? ভাষা প্রবাহিত হয়, মানুষ হারিয়ে যায়। এমন করেই চলে।
শিশুর সারল্য নিয়ে লেখা এক ভ্রমণ কাহিনী। এঁর লেখায় অন্তত একটি জিনিস সবসময়েই দেখেছি - কীভাবে দেশ-কাল-জাতি-ধর্ম সবকিছুর ঊর্ধে গিয়ে মানুষকে ভালোবাসা যায়, তাদের সহমর্মী হওয়া যায়। এই বিষয়ের উপর বই বেশ কিছুই পড়েছি, কিন্তু নিছক উপদেশের মত না বলে নিজের কাজ আর মানুষের সাথে সৌহার্দ্যর গল্প দিয়ে কীভাবে 'সবার উপরে মানুষ সত্য' কথাটিকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো যায় তার নিদর্শন জসিম উদদীন এর বইগুলো। তাঁর ভাষাতেই বলা যায়, 'বইটা পুরোটাই যেন একটা কবিতা' :)
পাকিস্তান আমলে এক আন্তর্জাতিক লোক-সঙ্গীত ও লোক-সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে তিনি আমেরিকা গমন করেন। সরকার এর অর্থায়ন করেছিল। সেখানে কীভাবে গিয়েছেন, পথে পথে কী দেখেছেন, গিয়ে কোথায় কোথায় কার কার সাথে কী কী অভিজ্ঞতা হয়েছে, কী শিখেছেন, কী বলে এসেছেন এসব নিয়ে এই বই। আলাদা করে বিচার করলে এই ভ্রমণকাহিনীটি খুব যে বেশি কিছু হয়ে গেছে এমন না। বর্তমানে 'ট্যুর' ধাচের যে ভ্রমণ অভিজ্ঞতার চল হয়েছে ফেসবুকে আর ব্লগে তারই মতো; গেলাম-করলাম-খেলাম-দেখলাম টাইপ। তবে জসীম উদ্দীন নিজে তো একজন সাহিত্যের সমাদৃত ব্যক্তি। "এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে/তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।"র কবি। তিনি কোথায় খেয়েছেন, কোথায় গিয়েছেন, কোথায় থেকেছেন সেটাও আমাদের কাছে সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেই মূল্যবান।
ক্রিয়া পদগুলো সাধু ভাষার হলেও সহজে পড়া যায়। ছোট ছোট অধ্যায়ে বিভক্ত। রেটিং ৩.৫/৫
পূর্ব পাকিস্তানের সরকারের পক্ষ থেকে লোক-সঙ্গীত এবং লোক-সাহিত্য সম্মেলনের জন্য লেখক পাড়ি জমিয়েছিলেন রূপকথার দেশ আমেরিকার তেপান্তরের ভ্রমণে। যাত্রাপথে বাহরিয়ান, লন্ডনেও থাকার সুযোগ হয়েছে। সেই সময়ে লেখক যেসব মানুষের স্নেহ-মমতা-ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন, তাদের স্মৃতিচারণ হলো "চলো মুসাফির"। বইয়ে আমেরিকান কালচারের একটা ভালো চিত্র পাওয়া যায়, পাশাপাশি বাঙাল কালচারের সাথে বিশাল পার্থক্যটা। তবে দৃষ্টিকটু লেগেছে নারীদের রূপলাবণ্য নিয়ে অতিরঞ্জিত মনোভাব।
বইয়ের নাম: চলে মুসাফির লেখক: জসীমউদদীন বইয়ের ধরন: ভ্রমণকাহিনী প্রথম প্রকাশ : সেপ্টেম্বর ১৯৬৬ প্রকাশনী: পলাশ প্রকাশনী মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১২৭
ভ্রমণকাহিনী মানেই যে শুধু একটি দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে পরিচিত হওয়া তা নয়। বরং একটি ভ্রমণকাহিনীর মাধ্যমে একজন লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বেশকিছু দেশের সংস্কৃতি, সভ্যতা এবং ঐতিহ্যের এক সাবলীল বর্ণনা পাই।
পল্লীকবি হিসেবে খ্যাত লেখক জসীমউদদীনের "চলে মুসাফির" ভ্রমণকাহিনীটি সম্পর্কে জানেননা এমন মানুষ বোধহয় খুব কমই আছে। ১৯৫০ সালে সুদূর মার্কিন মুলুকে লোকসংগীত বিষয়ক এক সম্মেলনে যোগদানের সময়ে লেখকের জীবনে অনেক চমকপ্রদ এবং অবিস্মরণীয় স্মৃতির জন্ম নিয়েছিলো। সেসব স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতা অনুভূতির মিশেলে আচ্ছাদিত এই গোটা বইটি।
"বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র, নানানভাবে নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র" সুনির্মল বসুর লেখা কবিতার এই চারলাইনের গুরুত্ব আমার জীবনে অনেকখানি। মজার ব্যাপার হলো, লেখকের পুরো ভ্রমণকাহিনীটি পড়তে পড়তে আমারও তাঁকে এই পৃথিবী নামের পাঠশালার এক বাধ্য ও অনুগত ছাত্র বলে মনে হচ্ছিলো। কতটা জ্ঞানপিপাসা থাকলে অজানার পথে এভাবে সাহস নিয়ে পাড়ি জমানো যেতে পারে তার পরিচয় এই বইটি।
লেখক ঘুরেছেন বিভিন্ন দেশ, পরিচয় পেয়েছেন সেসব দেশের অধিবাসীদের আন্তরিকতা এবং বন্ধুবাৎসল্যতার। আরবে যেয়ে লেখকের ধর্মপ্রাণ মন সন্ধান পেয়েছিলো সেদেশের মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনার। তেমনই লন্ডন আমেরিকাতেও লেখক বেশকিছু অজানা অচেনা মানুষের অমায়িকতায় বেশ বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর সেই উচ্ছ্বাসের এক নির্মল ছোঁয়া যেন আমিও অনুভব করতে পারছিলাম বইটির প্রতিটি পাতায় পাতায়। পরবর্তীতে লন্ডনে থাকাকাঈন ইংরেজ বন্ধু টেনিসন ও তার স্ত্রীর আতিথেয়তার দারুণ হৃদয়স্পর্শী পরিচয় দিয়েছেন লেখক। একইসাথে লেখক মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন সভ্যতা, সংস্কৃতি নিয়ে আমেরিকার অধিবাসীদের ঔদার্যবোধ, তাদের মাঝে বিদ্যমান বন্ধুবাৎসল্যতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধসুলভ চেতনার প্রতি। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সংস্কৃতির এক অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে লোকসংগীতকে উপস্থাপনের পর সেদেশের কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের উচ্ছ্বসিত প্রশংসার প্রতি লেখকের অপরিসীম কৃতজ্ঞতার এক সুন্দর পরিচয় দান করে বইটি।
বইটিত��� আমেরিকার সংস্কৃতির (লোকগীতি, সাহিত্য, নাটক ইত্যাদি) পাশাপাশি উঠে এসেছে সেদেশের শিক্ষাব্যবস্থার কিছু চিত্র। এক্ষেত্রে লেখক আমাদের দেশের তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নিজের মনোভাবও ব্যক্ত করতে ভোলেননি।
অবশেষে আমেরিকার পাট চুকিয়ে তিনি ফেরত আসেন পাকিস্তানের করাচিতে। সেখানে পাকিস্তান লেখক সংঘ নিয়ে লেখক তাঁর আবেগানুভূতির চিত্র উপস্থাপন করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে, এই বইটিতে লেখকের দৃষ্টিকোণ আমাদেরকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে গড়ে উঠা সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিচয় দিতে বাধ্য। একইসাথে বিভিন্ন দেশ তথা জাতির মাঝে পারষ্পরিক আন্তঃসম্পর্ক এবং তুলনামূলক পার্থক্যের চালচিত্রও উঠে এসেছে সাবলীলতার সাথে। লেখকের আবেগ ও উচ্ছ্বাসের কোন ঘাটতি ছিলনা বইটিতে৷ তবে ব্যক্তিগতভাবে মেয়েদের সৌন্দর্য নিয়ে লেখকের কিছু অতিরঞ্জিত বর্ণনায় আমি বেশ বিব্রতবোধ করেছি।
তবে হ্যাঁ, লেখকমনের ঔদার্যবোধ এবং নমনীয়তার পরিচয়ের কাছে এটুকু সমালোচনা হয়ত কিছুই নয়। কেননা তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে দেশ-জাতি-কালকে অতিক্রম করে সবাইকেই নির্মলচিত্তে ভালবাসা যায়, আপন করে নেয়া যায় ভ্রাতৃত্ববোধের বন্ধনে।
অনেক কিছুই লিখতে গিয়ে লেখেননি কিংবা পাকিস্তান সেন্সর মাথায় রেখে পাবলিশ করেছিলেন। আমার ইচ্ছে হচ্ছে মূল পাণ্ডুলিপি পড়ি। ওটাতে দারুণ কিছু পাওয়া যাবে। নিষিদ্ধ কিছু।
হতাশই হলাম। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপর জসীম উদ্দীন আর্ন্তজাতিক লোকসঙ্গীত ও লোকসাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন মার্কিন মুল্লুকে। পথে প্লেন বিকল হওয়ায় তিন দিন ছিলেন বাহরাইনে, তারপর লন্ডনে কিছুদিন কাটিয়ে আমেরিকায়। সেখানে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মেলনটি হয়েছিল। এছাড়াও নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডি.সি প্রভৃতি শহরে তিনি গিয়েছিলেন। সময় কাটিয়েছেন সেখানকার কবি, সাহিত্যিক, সঙ্গীত শিল্পী, কৃষক পরিবার, অধ্যাপক পরিবার, স্কুল শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষদের সাথেও। একটি নবীন, গরীব দেশের নাগরিক হিসেবে বিশ্বের আধুনিকতম, প্রযুক্তিতে সবচেয়ে উন্নত রাষ্ট্রে এই ভ্রমণ ছিল যেন মফস্বলের সরল লোকটির ঝাঁ চকচকে শহর দেখার মতোই। সরল জসীম উদ্দীন সেখানের যাই দেখেছেন, মুগ্ধ হয়েছেন। অবশ্য আমেরিকার সাধারণ মানুষের আন্তরিকতা, সেখানের নিত্য নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বিষ্ময় জাগাবার মতোই। মুগ্ধ করেছেন তিনি সেখানের মানুষকেও তার কবিতা, সঙ্গীত, গল্প আর সারল্য দিয়ে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্যের ধারা নিয়ে তার বিশ্লেষণ, চিন্তা ভাবনাও শ্রদ্ধা জাগাবার মতোই ছিল। একমাত্র যেটা প্রাণে লেগেছে তা হল পাকিস্তানী নেতাদের নিয়ে তার শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব। নিজেকে বাঙালির চেয়ে পাকিস্তানী পরিচয় দিয়ে তিনি বারবার গর্ববোধ করেছেন। অবশ্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ তখন কেবল শুরু হয়েছে বোধহয়। শেষ অংশে করাচি আর মূলতান ভ্রমণের কিছু বর্ণনাও আছে এই বইয়ে। আরেকটা ব্যাপার একটু দৃষ্টিকটু লেগেছে যেকোন নারীর বর্ণনায় তার রুপকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দেয়া আর একটু গায়ে পড়া মনোভাব। এই ব্যাপারটা একদমই ভালো লাগে নি। সর্বোপরি এই বই নিয়ে প্রত্যাশা আরেকটু বেশিই ছিল, তা মেটে নি।
"ঘরে ঘরে আছে পরমাত্মীয় সেই ঘর লব চিনিয়া।" রবীন্দ্রনাথের এই লাইন দুইটির মাধ্যমেই আসলে পুরা বইয়ের মর্মার্থ প্রকাশ করা যায়! জসীম উদ্দীন ছোটবেলা থেকেই শুধু একজন কবি হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।এত সুন্দর ভ্রমণ কাহিনীও যে আছে তা ভাবা হয়নি।অত্যন্ত সহজ,সরল ভাষায় জাতি,ধর্ম,বর্ণ উপেক্ষা করে তিনি সবার "মানুষ" পরিচয়টি তুলে ধরেছেন।সবাইকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের উদারতার কথা তুলে ধরেছেন।এই একটি বইয়ের মধ্য দিয়েই অনেক অসাধারণ মানুষের সাথে পরিচয় হয়ে গেলো। অসাধারণ বই!
পল্লীকবি জসীম উদদীন। আমাদের সকলের কাছেই উনি কবি হিসেবে পরিচিত। অধিকাংশই উনার কবিতা পড়েছেন পাঠ্য হিসেবে বা কবিতা ভালোবেসে। আমি আজ উনার একটি বই সম্পর্কে বলবো, তবে সেটি অবশ্যই কবিতার বই নয়, উনার লেখা একটি ভ্রমণ কাহিনী। বইটির নাম চলে মুসাফির।
ভ্রমণ কাহিনী হচ্ছে, আপনি কোথাও ঘুরতে গেলে কিভাবে গেলেন, কি কি দেখলেন, সেই স্থানের ক্রিস্টি-কালচার, মানুষের জীবন যাত্রা সম্পর্কে গল্প আকারে তুলে ধরাই হল ভ্রমণ কাহিনী।
সাল ১৯৫০। সরকারী সহায়তায় কবি জসীম উদদীন মার্কিনমুলুকে ঘুড়তে গিয়েছিলেন। যাত্রাপথে তিনি বাহরাইন, লন্ডন এবং আইসল্যান্ডে অল্প সময়ের জন্য থেমেছিলেন। সেখানে থেকে আমেরিকা গিয়ে আবারও ফিরে এসেছিলেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে। সেই সময় তার যাত্রাপথের অভিজ্ঞতা গুলোই অত্যন্ত সরল ভাষায় তিনি তার ‘চলে মুসাফির’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন।
মাত্র ১২৮ পৃষ্ঠার এই বইটিতে তিনি অধিবাসীদের গল্প বলেছেন, সাথে ঐ অঞ্চলের বর্ণনা যা আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
কবি ছিলেন জ্ঞান পিপাসু। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ সম্পর্কে জানার আগ্রহ বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় প্রতিফলিত হয়েছে। বইটি পড়লে তাঁর ভ্রমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সাম্যক ধারণা লাভ করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। কিছু বাঙ্গালী বন্ধুদের বাসায় উনার থাকার বন্দোবস্ত করা হলেও উনি বৃটিশ বন্ধুদের বাসায় থাকতে চেয়েছিলেন। এর কারন হলো বৃটিশদের সাথে থাকলে তিনি তাদের দৈনন্দিন জীবন, ইতিহাস, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবেন, আর এটাই ছিলো তার ভ্রমনের মূল উদ্দেশ্য। তিনি পুরোপুরি ভাবে সেই সমাজের সাথে মিশে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন আমি এই সমাজ, এই খাবার, এই মানুষ গুলোকে দেশে গেলেও পাবো, তাই আপাতত বিদেশীদের সাথে নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে চাই, তাদের সমাজ, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার এর থেকে ভালো সুযোগ আর দ্বিতীয়বার পাবো না।
কবির এই অজানাকে জানার এডভেঞ্চার আমাকে মুগ্ধ করে। তিনি অজানাকে জানার জন্য এলিস নামের এক মেয়ের সাথে প্রথম পরিচয়েই বেরিয়ে পড়েন অজানা শহরের সৌন্দর্য দেখতে। সেখানে লেখকদের আড্ডায় প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলা ভাষার, বাংলা ছড়ার। সেখানে অনেক বিখ্যাত ব্যাক্তির সাথে কবির আলাপ হয়। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিলো কবি এজরা পাউন্ডের সাথে তাঁর সাক্ষাতটি। দুঃখজনক হলেও যখন তাঁদের এই সাক্ষাতটি হয় তখন এজরা পাউন্ড ছিলেন বদ্ধ উন্মাদ, তাই তাদের দেখাটি পাগলা গারদেই হয়েছিলো। এজরা পাউন্ড বাংলার পল্লীকবিকে বেশকিছু বই উপহার দিয়ে বলেছিলেন
“বইগুলি তো বন্ধুবান্ধবদের দেওয়ার জন্যই। তারা যখন সচল তখনই জীবন্ত। অচল বই তো মৃত। এগুলো বিতরণ করিয়া দেওয়াতেই আনন্দ”।
আমাদের পল্লীকবি অত্যন্ত রসিক মানুষ ছিলেন। লেখার ধাপেধাপে তার সেই রসিকতর প্রমান মেলে। তিনি তার ভ্রমনকৃত সব দেশের তরুণীদেরই সৌন্দর্য বর্ননা করেছেন। আইসল্যান্ডের তরুনীদের সম্পর্কে কবি বলেন
“যেসব মেয়ে আমাদের খাবার পরিবেশন করিলো, তাহারা সকলেই যেনো ডানাকাটা পরী। তাহাদের মধ্যে কে কাহার চেয়ে বেশী সুন্দরী নির্ণয় করা যায় না”।
সবশেষে একটি কথাই বলবো, আমাদের কবির চোখে বিদেশকে দেখতে, জানতে বইটি পড়ে দেখতে পারেন। মনে হবে যেনো নিজেই দেখছেন। #HAPPY_READING
পূর্ব পাকিস্তানের সরকারের সহায়তায় ১৯৫০ সালে লেখক আমেরিকা যান সাহিত্য সম্মেলনে। লন্ডন, আমেরিকা, করাচির নানা জায়গায় ঘুরে, নানান লোকের সাথে মিশে প্রচুর আনন্দ ও তথ্য নিয়ে দেশে ফেরেন। আর সেসবই তিনি লিখে ফেলেন ভ্রমণ কাহিনি " চলে মুসাফির " নামে। বইটাতে বেশ কিছু শিরোনাম দিয়ে বিভিন্ন জায়গার ঘটনা ও অনুভূতি লিখেছেন।