"নেপথ্যে নিমকহারাম" একটি গল্পগ্রন্থ। মোট বারটি ছোট গল্প দিয়ে বইটি সাজানো হয়েছে। বইটা প্রকাশের সাথে সাথে সংগ্রহ করেছিলাম। তবে তখন জানতাম না এটা গল্পগ্রন্থ। গল্প আমি খুব কম পড়ি কিনা। কিন্তু এই বইয়ের গল্পগুলো পড়ার সময় একটা ভাল লাগা কাজ করছিল। লেখকের উপন্যাসগুলো আমার অসম্ভব ভাল লেগেছিল, তাই হয়ত...
সবগুলো নিয়ে আলোচনা করলে রিভিউ অনেক বড় হয়ে যাবে। তাই যেগুলো পড়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছি সেগুলো একটু করে বলি...
অধর্মঃ ছেলের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত মোতালেব মিয়া এতিম মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে প্রথমে রাজি ছিল না, কিন্তু মেয়ের সহায় সম্পত্তির পরিমাণ হিসেব করে রাজি হয়ে গেল সে। জীবনেতো পাপ কম করে নাই আর এই পাপ কাটাতে হজে তাকে যেতে হবেই। কিন্তু মেয়ে দেখতে গিয়ে মেয়ের মৃত বাবা মায়ের ছবি দেখে আঁতকে উঠল মোতালেব মিয়া।।।
ফ্যাকাশে লাল ফুলঃ খেয়ালী নদীর পারের আট বছরের ছোট্ট মেয়ে কুসুম শুধু একটা লাল কুচি দেয়া হাফপ্যান্ট পরে ঘুরে বেড়ায়। একটা সুন্দর ফ্রক ছিল তার, কিন্তু খেয়ালী নদীর আপন খেয়ালে ভেসে গিয়েছে সেটা। আর একটা ফ্রক নেই বলে মির্জা বাড়ির নাতনি তাকে খেলার যোগ্য মনে করে না। বরং শহরের রিকশাচালকের মেয়ে আমেনাকে তারা খেলার বস্তু বানায়। শেষ পর্যন্ত একটা লাল ফুলের ফ্রকের আশা মিটেছিল কি কুসুমের???
চশমাঃ প্রায় দশ বছর পর দেখা হল দুজনের। না দশ বছর না, এগারো বছর তিনমাস সাত দিন। দিনগুলো কতইনা তাড়াতাড়ি চলে যায়। সেই সময় চোখের চশমা অদলবদলা করেছিল তারা ভালবাসার প্রকাশে। আর আজ???
একজোড়া জীবন্ত চোখঃ হানিফ দেখতে একদমই কুৎসিত। জন্মের সময় থেকেই ধবল ও পশমবিহীন একটা প্রানীর মত দেখতে ছিল সে। সমাজ ও পরিবারের কোথায় জায়গা না পেয়ে তার স্থান হয় রাস্তায়, ভিক্ষাবৃত্তি হয় তার পেশা। কিন্তু একজোড়া জীবন্ত চোখ তার অন্তরের সব জ্বালা দূর করে তাকে ভালবাসার মায়ায় ভরিয়ে দিল।।।
আংটিঃ সোনার গয়না বলতে মাত্র একটা আংটিই অবশিষ্ট আছে রুমালীর। বাকি সব গেছে অপদার্থ স্বামীর কল্যাণে। শেষ পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিল রুমালী। সেই টাকায় টিভি আর দিনের বাজার করল তারা। আর কয়েকদিন পর থেকেই শুরু হল আরো বিপদ। মাসের কিস্তির টাকা কোথা থেকে দিবে রুমালী। এই আংটিটাই আছে তার অতিতের এক ঘটনার সাক্ষী হিসেবে। আজ সে কি পারবে স্মৃতির একমাত্র চিহ্ন এই আংটিটা বিক্রি করতে???
নেপথ্যে নিমকহারামঃ নসিব মিয়ার গরু দুটি একদম যেন হাড্ডির দোকান। হাড়ের খাঁচার উপর কেবল চামড়ার প্রলেপ আছে শুধু। প্রবীণ গরু দুটোর সৌন্দর্য হয়তো আর নেই কিন্তু নাম টিকে গেছে-কালা আর ধলা। দিনে রাতে নসিব মিয়া তার গরুর গাড়িতে বসে থাকে যাত্রীর আশায়। এমন সময়ে তার গাড়িতে এসে উঠে এক যাত্রী...
এরকম আরো ছয়টি গল্পের (হয়তো, দুরারোগ্য দূরদর্শন, একটি শৌচাগারের আত্মকাহিনী, রমজান, শিরায় তোমার কার রক্ত ও অ-সুখ) সমাহার এই গল্পগ্রন্থটি।
ছোট গল্প আমি কোনদিনই তেমন একটা গুরুত্ব দেইনি। এই বইটা পড়ে অবাক হয়েছি বলা যায়। ছোট গল্পের মাহাত্ম্য যেন এতদিন বাদে এসে ধরা দিল আমার কাছে। এত জীবনবোধ আর মানবিকতা জড়িয়ে আছে একেকটা গল্পে ভাবতেই আমার অবাক লাগলো। মানব মনের গতি প্রকৃতি, হৃদয়ের উত্তাপ, কান্না-বেদনা সব যেন ছড়িয়ে আছে গল্পগুলোতে। পড়ার আমন্ত্রণ রইল...
ধন্যবাদ সবাইকে...