সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় (Sandipan Chattopadhyay) (২৫ অক্টোবর ১৯৩৩ - ১২ ডিসেম্বর ২০০৫) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বাঙালী সাহিত্যিক। পশ্চিমবঙ্গের হাংরি আন্দোলনের সাথে ছিলেন শুরু থেকে, যদিও পরে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর বিনয় মজুমদারের মত তিনিও সরে আসেন সেই আন্দোলন থেকে।
লিখেছেন একুশটি উপন্যাস, ষাটের অধিক গল্প, অসংখ্য নিবন্ধ। যুক্ত ছিলেন দৈনিক আজকালের সাথে, দৈনিকটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে। বাংলা সাহিত্যের 'আভাঁ-গার্দ' লেখকদের মাঝে অন্যতম তিনি। তার উল্লেখযোগ্য রচনাগুলি হল ক্রীতদাস ক্রীতদাসী (১৯৬১), সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী ও অন্যান্য গল্প (১৯৬৯), এখন আমার কোনো অসুখ নেই (১৯৭৭), হিরোশিমা মাই লাভ (১৯৮৯), কলকাতার দিনরাত্রি (১৯৯৬) ইত্যাদি। তিনি বঙ্কিম পুরস্কার ও সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের পুরস্কার জগত্তারিণী স্বর্ণপদকও লাভ করেছিলেন।
৩.৫/৫ "আমি" ও বনবিহারী কি একই মানুষ?"আমি" কেন অস্বীকার করে সে-ই বনবিহারী? অপরাধবোধ? বিপ্লবী থেকে নিজেকে পাতিবুর্জোয়া হিসেবে দেখার ফলস্বরূপ? শীর্ষেন্দু লিখিত দুটো লাইন এখানে খুবই প্রযোজ্য - "বিপ্লবের পথ কেবলই গার্হস্থ্যের দিকে বেঁকে যায়, বনের সন্ন্যাসীরা ফিরে আসে ঘরে।" গল্পের "আমি" অথবা বনবিহারী বিপ্লব করে,সমাজ বদলের স্বপ্ন দ্যাখে,জেলে যায়।একসময় নিজেই হয়ে ওঠে প্রতিক্রিয়াশীল। সমাজ বদলের স্বপ্ন তখন ফিকে হয়ে আসে।তাই কি অপরাধবোধ থেকে জন্ম নেয় অল্টার ইগো?বনবিহারী? সন্দীপনের এ লেখাটিতে উল্লম্ফন প্রচুর। পাঠক কী বুঝছে তা নিয়ে উনি বিন্দুমাত্র ভাবিত নন।লেখায় এই স্বভাবের ইতি নেতি দুই ধরনের প্রভাবই পড়েছে।ভালো লাগলো পড়ে।তবে চরিত্রগুলোর সাথে একাত্ম হতে পারলাম না।
আমি আর বনবিহারী আলাদা মানুষ কিন্তু বনবিহারী ভাবে আমরা অভিন্ন । কেন ভাবে ? আমি জানি না । হয়তো আমি যে মেয়েটিকে পছন্দ করতাম তাকে বিয়ে করেছে সে এই থিউরি মতেই , হয়তো আমার যা যা পাওয়ার কথা ঈশ্বর তাকে তাই দিয়ে দিয়েছেন এই থিউরি মতে অর্থাৎ বনবিহারীর পাওয়া হলেই আমার পাওয়া হবে । আদতে কিন্তু তা না । আমি ও বনবিহারী দুইজন সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা মানুষ । তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাকেই করতে হবে আর আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমাকে ।
সন্দীপন চাটুজ্জের সাথে পরিচয়পর্ব সেরেছি বছর দুই আগে। জনাবের ডায়েরি পাঠের মাধ্যমে। তখনই জ্ঞান হয়েছে হাঙরি আন্দোলনের সন্দীপন সিধা আদমি নন। তাঁর কলম তো ১৮০ ডিগ্রি বাঁকা।
"আমি ও বনবিহারী" নামের আশি পৃষ্ঠার উপন্যাসটি ২০০২ সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার জিতেছিল।
বনবিহারী বাবু একজন বিপ্লবী। তারই অন্যসত্তা আমি। সেই আমিকে ঘিরেই নকশাল বাড়ি আন্দোলন, বিশ্ব কমিউনিজমের নানা ঘটনা, পশ্চিমবঙ্গে বামেদের ক্ষমতারোহন এবং অতঃপর বুর্জোয়াঁ পার্টির মতো বামসরকারেরও অধঃপতন।
রূপক আকারে অনেক কথা লিখেছেন সন্দীপন৷ বামপন্থাকে একদিকে যেমন সমর্থন করেছেন, অপরদিকে আক্রমণ করেছেন বামপন্থীদের। তাদের পুঁজিবাদী মানসিকতার।
নকশালবাড়ি আন্দোলন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টি হয়েছে এক উপধারা। সেই ধারার স্বাদ গ্রহণ করতে সুযোগ করে দিয়েছে পৃথিবীশ্রেষ্ঠ এক বিপ্লবীর দেশ, আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের বিজয় উদযাপনের অংশ হিসাবে এই সাহিত্যধারা নিয়ে খ্যাতনামা উপন্যাস সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের 'আমি ও বনবিহারী' উপহার দিয়েছেন একজন সমর্থক।
এই উপন্যাসে বিন্যাস, গঠন, চরিত্রের ব্যবহার প্রথাগত লেখনী থেকে বেশ আলাদা। প্রাণ ও বনবিহারী দুজন একই চরিত্র এবং দুজন বিপরীত চরিত্র। একজন সংশোধনবাদী কমিউনিজমে সাম্যবাদী মুখোশ পড়ে হয় বুর্জোয়া আরেকদন সশস্ত্র বিপ্লবের পথে হয় নিঃসঙ্গ, পরাজিত কিন্তু সন্তুষ্ট।
চারুচন্দ্র মজুমদার ছিলেন নকশাল বাড়ি আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ। কিন্তু সে কৃতত্ব উনি কখনো গ্রহণ করেননি। শ্রীকাকুলামের গড়ে তুলেছিলেন কৃষক শ্রমিক সমন্বিত ৩৫০ গ্রাম জুড়ে ভারতবর্ষের প্রথম সাম্যবাদী লাল মুক্তাঞ্চল। কালের যাত্রায় সে বিপ্লব আজ ন্যায় প্রতিন্যায়ের দাঁড়িপাল্লায় প্রশ্নবিদ্ধ কিন্তু বুর্জোয়ার চামড়ায় সাম্যবাদের ভাঁড়ামোয় কলঙ্কিত নয়।
সেই বিপ্লবের পথে প্রাণ যোগ দেয় রবীন্দ্রনাথের ভাষায় হয়তো সেই মৃত্যুহীন প্রাণ নিয়েই। আর বনবিহারী সংশোধনবাদকে সিঁড়ি বানিয়ে অথচ সাম্যবাদকে পিষে মাড়িয়ে যাত্রা করে অর্থ ও ক্ষমতার এক চূড়া থেকে অন্য চূড়ায়। প্রতিভা প্রাণ ও বনবিহারীর মাঝে প্রাণকে ত্যাগ করে। সশস্ত্র বিপ্লব আর সংশোধনের মাঝে প্রতিভা নিশ্চয়তাকে গ্রহণ করে। কিন্তু যে নিশ্চয়তা বিষাক্ত সাপের গর্ভের নিষিক্ত হয়শ ছোবল সে একবারে না প্রতিনিয়ত মারে। মানুষের সে উপলব্ধি হতে বড্ড দেরি হয়ে যায়।
উপন্যাসটি বেশ ছোট। কিন্তু এর গভীরতা, এর সততা পৃষ্ঠাসংখ্যা থেকে অনেক দীর্ঘ। প্রতিটা চরিত্র নিয়ে আলাদা করে লেখা যায়। বিশ্লেষণ করা যায়। উপচরিত্রগুলোও নিজের অল্পস্থানে প্রচণ্ড সক্রিয়তা দেখিয়ে চলে যায়। নকশাল বাড়ি আন্দোলন সাহিত্য নিয়ে নাড়া দিয়ে গেল লেখাটা। ধন্যবাদ বিশেষ আর্জেন্টাইন সেই ভক্তকে যিনি আমাকে এই উপন্যাসটি পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আর সাথে ছিল ভীষণ সুন্দর এই বুকমার্ক।
সন্দীপনের লেখার সাথে পরিচয় না থাকলে পড়ার সময় মেজাজ গরম হতে পারে। কাহিনি ক্যাঙারুর মতো লাফিয়ে কোথা থেকে কোথায় যাবে সেটা বুঝতেই শেষ পাতায় চলে যাবেন। বেশি সমস্যা হবে চরিত্রগুলোর আগামাথা ধরতে। নকশালবাড়ি আন্দোলন নিয়ে রচিত এই উপন্যাসিকাতে যথারীতি তার ট্রেডমার্ক যৌনতার দেখাও মিলবে।
নক্সাল (এম এল) আমি আর সিপিএম বনবিহারী (এম) উভয়ের সম্মন্ধেই যথেষ্ট মোহভঙ্গ হওয়ার কারণে উপন্যাসটির আঙ্গিকের নতুনত্ব ছাড়া আর কিছুই লাভ করতে পারলাম না শেষমেশ।