বেশ কয়েকটা গল্প। ছোট্ট ছোট্ট বাক্য আর বড় বড় অনুভূতি। জহির রায়হানের গল্প আর মনের সাথে কথা বলবেনা তা কি করে হয়। বাংলাদেশের যে ক'জন কথাসাহিত্যিক সাবলীল ভাষায় লিখে গেছেন জহির রায়হান তাদের মধ্যে অন্যতম। হোক উপন্যাস কিংবা গল্প, তুলে এনেছেন সমাজের বিভিন্নরকম চিত্র। একুশের আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের যুদ্ধ, ধর্ম থেকে শুরু করে পলিটিক্স সব কিছুরই প্রতিফলন দেখা যায় জহির রায়হানের লেখনীতে।
এই গল্পসমগ্র টাও ব্যতিক্রম নয়। মোট একুশটা গল্পের বই লেখক শেষ করেছেন একুশের গল্প দিয়ে। আর প্রত্যেকটা গল্পে তুলে এনেছেন তৎকালীন সমাজ ব্যাবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা, মানুষের দুঃখ, কষ্ট, চাওয়া, না পাওয়া, ধর্ম, প্রেম, আর জহির রায়হানের চিরচেনা যুদ্ধ আর একুশের প্রেক্ষাপট।
দুঃখ যেন পিছুই ছাড়েনা জহির রায়হানের লেখাতে। প্রথম গল্পটাতেই দুঃখের ছাপ। লেখেন কত সহজ ভঙ্গিমায় কিন্তু সেই ছোট্ট ছোট্ট কথা গুলো দাগ কেটে যায় গভীরভাবে। "হারানো বলয়” এর কথা বলতে গেলে দেখা যায় অতীত, বর্তমান একসাথে ব্লেন্ড করে কত সুন্দর করে নিম্নবিত্ত জীবনের কষ্টের কথা বলে কত কষ্ট দিয়ে চলে গেলেন। "সূর্যগ্রহন" গল্পের দুঃখ যেন অন্য মাত্রার। এই দুঃখে হারানোর বেদনা যেমন আছে তেমনি আছে একটা প্রশান্তি। সাথে আরও অন্য গল্পগুলোতেও এই ছাপ আছে। জহির রায়হানের দুঃখ গুলো হঠাৎ আক্রমন করে মন ফাঁকা করে চলে যায়। লুকিয়ে রাখা কষ্টগুলো মনের অজান্তেই সব প্রকাশিত হয়ে দিয়ে যায় গভীর বেদনা। জহির রায়হানের লেখা থাকবে আর সাথে মানুষের কষ্ট, অসহায়ত্ব, বেঁচে থাকার লড়াই থাকবেনা এটা হয়না।
"বাঁধ", "ইচ্ছা অনিচ্ছা" গল্প গুলোর মানুষের নির্বুদ্ধিতা যেন আজও ঠিক তেমোনি আছে। ধর্মকে যারা পুর্নাঙ্গ না বুঝে জোশ দেখায় তারাই ধর্মকে সবথেকে ছোট করে ফেলে। জোশে কী আর আল্লাহ খুশী হন!! ধর্মকে না বুঝলে পীর ফকিরের পায়ে পড়া সহজ হয়ে যায়, তাদেরকে ক্ষমতার উৎস ভাবা সহজ হয়ে যায়। সেই খুকির সরল মনে জানতে চাওয়া "ব��়লোকেরা পাপ করেও জান্নাতে যাবে কিনা" এক অন্য উচ্চতায় আঘাত করে।
জহির রায়হান লিখবেন আর দেশের দুর্দশার কথা আসবেনা তা কি করে হয়। "অতি পরিচিত" গল্পের সেই হবু শিক্ষাকর্মকর্তার কথাই ধরা যাক। দেশটা আজও এদের মতো প্রেটেনশাস মানুষদেরই হাতে। আগেও এরাই ছিলো ধ্বংসের শুরুতে, আজও এরাই আছে ধ্বংসের শেষে। মাঝখানে শুধু ধ্বংসটা বেড়েছে। তাছাড়া সবই এক।
প্রত্যেকটা গল্পে একেকটা বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করেছেন লেখক। কখোনো সোজাসুজি কখোনো মেটাফোরের মাধ্যমে বলে গেছেন অনেক কথা। উপরের বিষয় গুলো ছাড়াও বলেছেন বায়ান্নর ভষা আন্দোলন, একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ, পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতার কথা, বলেছেন ধর্ম ব্যবসায়ীদের কথা, বলেছেন সারাবিশ্বের যুদ্ধের কথা, ভয়াবহতার কথা, মানুষের আকুতির কথা, মানুষের না খেতে পাওয়ার কথা, মানুষের একটু শান্তির পরশ খোঁজার কথা। জহির রায়হানকে হারিয়ে হারিয়েছি এক রত্নখনি।