বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) এর জীবনচরিত। প্রায় ৭৮ বছর বয়সে বসে লেখা এই বইটিতে বনফুল শুনিয়েছেন তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের গল্প। স্থান পেয়েছে সাঁইত্রিশটি চিঠি। পরশুরাম খ্যাত রাজশেখর বসু থেকে শুরু করে নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ অনেকের চিঠির সংগ্রহই আছে এই বইটিতে।
Banaful/Banaphool (Bengali: বনফুল) (literally meaning The Wild Flower in Bengali) is the pen name of the Bengali author, playwright and poet, Balai Chand Mukhopadhyay (Bengali: বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়).
He was born in Manihari village of Purnia district (now Katihar District), Bihar on 19 July 1899. He was the son of Satyacharan Mukhopadhyay, a practicing physician at the village and Mrinalini Devi. He was admitted to the Sahebgunge Railway school in the year 1914. Mukhopādhyāy started a hand-written magazine named "Bikash" where his writings of the first few days were published. When one of his poem was published in a well- known magazine named Malancha, he was warned by the then head-master of the school as he feared that Balāi Chānd's literary work may spoil his education. So, Balāi adopted his pen name Banaful (the wild flower in Bengali) to hide his work from his tutor. He passed Matriculation examination in 1918 and completed his study at Hazaribag College. Then he was admitted in the Medical College and Hospital, Kolkata. During this time, he was married to Lilavati, who was studying I.A. at Bethune College, Calcutta. But before completing his medical education in Calcutta, he was transferred to Patna Medical College and Hospital due to an issued Government order. Here he was emoployed as a physician after completion of his medical education. Then he worked as a physician at Azimgaunge Hospital. He practiced Pathology at Bhagalpur. In 1968, he sold his house at Bhagalpur and settled at Salt Lake, Calcutta. This great writer took his last breath on 9 February 1979.
'পশ্চাৎপট' বনফুল খ্যাত বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় এর জীবনচরিত। জীবন সায়াহ্নে প্রায় ৭৮ বছর বয়সে এসে লেখা বই। ১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে বইটি প্রকাশিত হবার সাত মাস পরই মৃত্যুবরণ করেন বনফুল। বাংলা ব্যঙ্গসাহিত্য আবুল মনসুর আহমেদ, পরশুরাম, বনফুল, আহমদ ছফা প্রমুখ অসম্ভব গুণী সব মানুষের লেখনীতে সমৃদ্ধ। এঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মহিমায় ভাস্বর, প্রত্যেকেরই ব্যঙ্গের আলাদা ঘরানা। এঁদের মাঝে বনফুল এর একটি বিশেষত্ব হল তাঁর ব্যঙ্গে দৈনন্দিন জীবনে আচরিত মানুষের স্বার্থপরতা, লোভ, পরশ্রীকাতরতা (ক্ষেত্র বিশেষে পরস্ত্রীকাতরতাও বটে!) ইত্যাদি অন্ধকার দিকগুলো খোলাখুলি ভাবে এসেছে। বনফুলের গল্পের চরিত্রগুলো অদ্ভুত। হাস্যকর রকম অবিশ্বাস্য তাদের কাণ্ডকীর্তি। কিন্তু চারপাশের সমাজে তাকালে আসলে এই চিত্রই দেখা যায়। মানুষ আসলেই এমনই অবিশ্বাস্য এক প্রাণী! এটা বোঝার জন্য বনফুলের বই আর এখন দেখতে হয়না, পত্রিকার পাতা উল্টালেই বোধহয় চলে। বনফুলের অনেক গল্পই আছে পড়লে মনে হয়, মানব চরিত্রের ওপর রীতিমত বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে এই জীবনচরিত যখন লিখেছেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর এই বীতশ্রদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি আরো স্পষ্ট ও শাণিত মনে হয়েছে। ব্যঙ্গশিল্পী ব্যঙ্গ করেন প্রচণ্ড কষ্টের ভিত্তিতে। এই বইয়ের অনেক জায়গাতেই তাঁর কষ্টের সেই দীর্ঘশ্বাস স্পষ্ট শোনা গেছে।
'পশ্চাৎপট' বনফুল শুরু করেছেন তাঁর জন্মবৃত্তান্ত দিয়ে। বিশ শতকের শুরুর দিকে, ১৮৯৯ সালে জন্ম তাঁর। স্থবির এক ভারতবর্ষের গল্প সেই সময়টা। সহজ সরল হিসেব নিকেশ আর চাল চলনের সময় তখন। গ্রাম্য এক ডাক্তারের ছেলে বলাই কিভাবে বেড়ে উঠছে, টুকটাক লেখালেখি করছে, ভবিষ্যতের বনফুল হবার পথে একটু একটু এগোচ্ছে, এই গল্পগুলোই এসেছে 'মণিহারী' অধ্যায়টিতে। মণিহারী তাঁর জন্মস্থান যে গ্রাম তার নাম। এরপর ধীরে ধীরে এসেছে তাঁর ডাক্তারী পড়ার গল্প, ছাত্র জীবনের সংগ্রাম, ছাড়াছাড়া ভাবে লেখালেখি করে টানাটানির সংসার চালানোর গল্প, অনেক বছর পর বনফুল হয়ে ওঠা এইসব। তাঁর জীবনের এই গল্প গুলো বুঝিয়ে দেয় লেখালেখি করাটা আসলে একটা সাধনা। যত না লেখা তার চেয়ে অনেক বেশী পড়া। অনেক বেশী সংগ্রাম। বনফুল কয়েকবারই বলেছেন এই বইয়ে, তাঁকে কেবল পাওনাদারের ধার শোধ করবার জন্যই প্রচুর লিখতে হয়েছে। এই ঋণ না থাকলে হয়তো এতো লেখা কখনোই হতনা। বনফুল ডাক্তার হিসেবেও অত্যন্ত কর্তব্যনিষ্ঠ ছিলেন। অনেক দরিদ্র রোগীকে তিনি বিনে পয়সায় চিকিৎসা দিয়েছেন বছরের পর বছর। ডাক্তার-লেখক এই দুই পরিচয়ের সীমারেখায় থেকে বনফুলকে রীতিমত হিমসিম খেতে হয়েছে প্রায়ই। ১৯৩৪ সালে মুঙ্গেরের ভয়াবহ ভূমিকম্পে সর্বস্ব হারিয়েছেন। আবার গড়েছেন সব একটু একটু করে। বনফুল ভক্ত/অভক্ত উভয়ের জন্যই দারুণ অনুপ্রেরণা হতে পারে জীবন সংগ্রামের এই আখ্যানগুলো।
বনফুল তাঁর গল্পের ব্যঙ্গের উপাদানগুলো পেয়েছেন তাঁর নিজের জীবন থেকেই। বাঙালি বাঙালিকে দেখতে পারেনা, এটা পুরনো কথা। বনফুল এই কথাই আবার শুনিয়েছেন। ডাক্তারী কাজের সূত্রে তিনি বিহারী অধ্যুষিত এলাকা ভাগলপুরে থাকতেন, বাঙালির শহর কলকাতা থেকে অনেকটা দূরে। সেখানে যখন তাঁর বাড়ী হল, গাড়ী হল, বাঙালি বন্ধুরা ঈর্ষাপরায়ণ হলেন সবচেয়ে বেশী। তারা তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গেলেন সবার আগে। অথচ ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন ভাষার বিহারীরা তাঁকে আপন করে নিয়েছিলো। বনফুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছেন, "ভাগলপুরের অবাঙ্গালিদের স্মৃতিই আমার মনে রঙিন এবং মধুর হইয়া আছে। প্রেমের চাবি দিয়া সব তালাই খোলা সম্ভব। বাঙ্গালিদের উন্নাসিকতা এবং ভুয়া উচ্চমন্যতা বাঙ্গালিদের বৃহত্তর বিহারী-সমাজ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া রাখিয়াছে" বাঙালিদের বিষয়ে এই মন্তব্য মর্মান্তিক কিন্তু অনস্বীকার্য। বাঙালির চাটুকার স্বভাব এবং বাঙালি পরিচয়ে লজ্জা নিয়ে বলেছেন "ইংরেজ আমলে বাঙ্গালী অনেক চাকরী পাইতো, বস্তুতঃ ইংরেজের খোশামোদ করিয়া সে-ই শাসনকার্য চালাইত। এখন চাকা ঘুরিয়া গিয়াছে, এখন সে বড় দরিদ্র। সে দারিদ্র্যের প্রভাব তাহার মহত্ত্বকে নীচুতায় পরিণত করিয়াছে। বাঙ্গালী আজ অন্তঃসারশুন্য বাহাড়ম্বর বজায় রাখিতে গিয়া মিথ্যাচারী হইয়া পড়িয়াছে। অন্তর্দ্বন্দ্ব, পরশ্রীকাতরতা, ঔদ্ধত্য, আত্ন-বিজ্ঞাপন, মিথ্যাভাষণ আজ তাহাদের মধ্যে প্রকট। পুরাতন মহত্ত্ব, মনীষা লোপ পাইতেছে। নতুন মহত্ত্ব ও মনীষা জন্মগ্রহন করিতেছেনা। এই চোঙ প্যান্ট, হাফশার্ট পরা ট্যাঁস সমাজে বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ বা রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করিতে পারেনা।" মনে কতটা কষ্ট থাকলে এই কথা গুলো কলম দিয়ে বেরোয়, অভিজ্ঞতা কতটা তিক্ত হলে একই ভাষার ভ্রাতৃপ্রতিম মানুষগুলোকে চোখা কথার বল্লম দিয়ে খোঁচাতে হয়, তা নির্ণয় করবার অতীত।
বনফুলদের সেই সময়টা বাংলা সাহিত্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, পরশুরাম, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্তম্ভেরা সব এই সময়েরই মানুষ, এবং তাঁরা একে অপরের খুবই কাছের বন্ধু ছিলেন। তারাশঙ্কর বনফুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। প্রিয় লেখক তারাশঙ্কর এর চমৎকার কিছু গল্প বনফুল এখানে বিবৃত করেছেন যা বলে দেয় তারাশঙ্কর তাঁর সাহিত্যের সমান ভয়ানক উঁচু মনের মানুষও ছিলেন। বনফুলের বাসায় সাহিত্য সভায় এই মানুষগুলো সব এক হতেন। ভাবতেই অবাক লাগে, এতগুলো গুণী ব্যক্তিত্ব একসাথে, এঁরা কেউ কারো চেয়ে কম যান না। অথচ একে অপরের কী সুহৃদ! বর্তমানের ২০১৩ সালের যে সমাজ আমি চিনি, যেখানে এক ডাক্তার আরেক ডাক্তারকে গরুর ডাক্তার ঠাউরান, এক বুদ্ধিজীবী আরেক বুদ্ধিজীবীকে পুরীষ মস্তিষ্ক প্রমান করে বাহবা কুড়াতে চান, এক ফুঁয়ে কোটি মানুষের বিশ্বাসকে উড়িয়ে দিয়ে সমগ্র মানবজাতির 'উত্তরণের' দ্বার খুলে দিতে চান সে সমাজে বনফুলের সেই সাহিত্য সভার গল্প খুব বেমানান, অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য মনে হয়। বনফুলের এই জীবনচরিত বড় হীনমন্যতা দিয়ে গেলো, বাঙালি আমাকে।
বনফুলের সাথে পরিচয় হয়েছিল তার গল্পের মাধ্যমে। আর টেনেটুনে দুটো একটা উপন্যাস পড়েছিলাম। ওটুকু নিয়েই সন্তুষ্টচিত্তে কালাতিপাত করছিলাম। কয়েকদিন আগে একবন্ধু জানালেন বনফুলের আত্মজীবনী আছে পশ্চাৎপট নামে। এটা পড়তে শুরু করে আরো কিছু ঘাটাঘাটি করলাম। ফলাফল হিসেবে অবগত হলাম যে তিনি লেখালেখির শুরু কবিতা দিয়ে করলেও এরপর লিখেছেন অসংখ্য উপন্যাস ও নাটক। যাহোক পশ্চাৎপটে আসি। জীবনীর জীবন শুরু হয়েছে একদম ছোট্টবেলা থেকে। বাবা ডাক্তার হওয়ার সুবাদে চেনাজানা লোকের সংখ্যা ছিল অগণ্য। তারা প্রায়শই বাড়িতে চলে আসতেন তখন ছোট্ট বলাইয়ের সাথে তাদের আলাপ হতো। এমন অনেক বিচিত্র মানুষের কথা জীবনীতে তুলে ধরেছেন তিনি। ছোট্টবেলা, স্কুলে পড়তে যাওয়া, হোস্টেলে থাকা, পত্রিকায় প্রথম কবিতা ছাপা হওয়া, ছদ্মনামের আশ্রয় নেওয়ার কারন, কলেজে পড়া, সেখানকার শিক্ষক ও বন্ধুদের নিয়ে বেস ডিটেলস লিখেছেন, এরপর পাটনায় মেডিকেলে পড়তে যাওয়া। একদিকে তিনি আমাদের প্রিয় বনফুল আরেকদিকে তিনি ড. বলাইচাঁদ। জীবনের দুদিক নিয়েই লিখেছেন বইটিতে।
পাঠকজীবনে নানা স্তর থাকে। শৈশব-কৈশোরে মানুষ যে ধরনের বই পড়ে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে রুচিবোধটা আরো উন্নত হয়, পালটে যায় অনেকক্ষেত্রে। সেরকমই একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তরে আমার পরিণত পাঠক হিসেবে যাত্রার প্রথমদিকের একটি গল্প ছিল নিমগাছ। একটা গল্প, কয়েকটা লাইনের একটা গল্প যে মানুষকে কতটা নাড়া দিতে পারে সেটা ওই নিমগাছ আমায় বুঝিয়ে দিয়েছিল। আরো একটি গল্প তীব্রভাবে বিচলিত করেছিল, সেটি পাঠকের মৃত্যু। এরপরই বইকে আরো বেশি আঁকড়ে ধরা আমার। পাঠকসত্তাটিকে সদা সজীব রাখার এক প্রয়াস, জীবনের নানান দুশ্চিন্তার মাঝে বিশুদ্ধ বাতাস আমার ঐটুকুই। সেই বনফুল ওরফে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, যিনি পেশাগত জীবনের দিক দিয়েও আমার অগ্রজ, তাঁর এই আত্মজীবনীর সন্ধানটি আমি কোন একটা বইয়ের গ্রুপেই পাই। এরপরই বাতিঘরে ধরনা, আর বরাবরের মতোই সেটা তারা যতদিনই লাগুক এনে হাজির করে আমার কাছে। বইয়ের গ্রুপগুলো আর এই বাতিঘরের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। যাই হোক, আসি মূল আলোচনায়। বনফুলের অনেক লেখা আমি পড়ে ফেলেছি, বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু তাঁর ছোটগল্পের মতো এতো ভালো সম্ভারও আমি কম পেয়েছি। তাই তাঁর ডাক্তারি জীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সাহিত্যিক জীবন সম্পর্কে জানার একটা আগ্রহ আগে থেকেই ছিল। শৈশবে লেখকের বাড়িটির যে প্রকৃতি আর বর্ণনা, আহা! যেন নিজেই উপস্থিত হয়ে গেলাম। নানা ধরনের পোষ্য ছিল বাড়িতে। কুকুর, পাখি সবই। মায়ের নিরাপদ আশ্রয়, প্রশ্রয়ের সাথে সাথে পেয়েছেন চিকিৎসক বাবার সমর্থন। মেডিকেল কলেজের জীবনটা এখনকার থেকে অনেক বেশি আলাদা ছিল তখন। পঠনপাঠনের পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। যেটুকু বুঝলাম সময় বেশি ছিল বলে চাপটা কম ছিল। লেখক সাহিত্যচর্চার অনেক সুযোগ পেয়েছিলেন। মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালের ক্লার্কদের দৌরাত্ম্য অবশ্য আদি-অকৃত্রিম। লেখকের অভিজ্ঞতার সাথে এখানে বেশ মিল পেলাম। ইংরেজ অধ্যাপক বা বাঙালী সকলেরই বেশ স্নেহধন্য ছিলেন তিনি। সেটা পড়ালেখা আর কাব্যচর্চা উভয়ের জন্যই। বারবার এসেছে শিক্ষক বনবিহারী মুখোপাধ্যায় এর কথা, যাঁর অবদান লেখকের জীবনে নানা দিক দিয়েই রয়েছে। বনফুলের মা ছিলেন আটপৌরে গৃহবধূ এবং ভক্তিশীলা। তাঁর জীবনের কয়েকটি অলৌকিক ঘটনার বিবরণ সত্যিই বিস্ময়কর। স্ত্রী লীলাবতীর কথা অনেকবারই বলেছেন, যিনি না থাকলে নির্বিঘ্নে সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হত না তাঁর পক্ষে। একজন বুদ্ধিদীপ্ত পাঠিকাও ছিলেন লেখকঘরণী। ভাগলপুর, পাটনা, কলকাতা সব জায়গাতেই প্র্যাকটিসের পাশাপাশি লেখালেখি চলত। প্রবাসী, ভারতবর্ষে ছাপা হয়েছে অসংখ্য ব্যঙ্গকবিতা। শ্রীমধূসুদন নাটক পড়ে স্বয়ং শিশির ভাদুড়ি এই নাটকে অভিনয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেন, যদিও অন্য একজনকে কথা দেয়া থাকায় পরবর্তীতে এর ছায়া অবলম্বনে নিজ রচিত মাইকেল নাটকে অভিনয় করেন শিশির ভাদুড়ি। শনিবারের চিঠির সজনীকান্ত দাসের সাথে লেখকের ছিল গভীর বন্ধুত্ব। মোহিতলাল মজুমদার, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর এঁরাও ছিলেন সুহৃদের তালিকায়। গ্রন্থ-পরিশিষ্টে এঁদের বনফুলকে লেখা চিঠির সংযোজনটা ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। বুদ্ধদেব বসুদের রবীন্দ্রবিরোধিতাকে সুনজরে দেখতেন না বনফুল। রবীন্দ্রনাথের প্রতি ছিল প্রগাঢ় ভক্তি। উপন্যাস, কবিতা, গল্প অনেক লিখে গিয়েছেন বনফুল। নাটকের সংখ্যাও কম নয়, টুকরো স্মৃতিচারণ/স্মৃতিকথাও লিখেছেন বেশ। রবীন্দ্রনাথের চোখে তিনি ছিলেন পরবর্তী যুগের একজন শ্রেষ্ঠ লেখক। পশ্চাৎপট অনেক কিছুই নতুন চোখে দেখাল, বনফুলকে চিনতে সাহায্য করল, আগ্রহ জাগানিয়া আরো কিছু বইয়ের সন্ধান দিল। বইটির সাথে কাটানো সময় সত্যিই মূল্যবান।
বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের (বনফুল) "নিমগাছ" অথবা "পাঠকের মৃত্যু"র মতো গল্পগুলো পড়েনি এমন পাঠক হয়ত খুব কম। বনফুলের ছোটগল্প দিয়েই পরিচয় তার সাথে। এমন না যে অনেক বেশি পড়েছি তার লেখা। পড়া বলতে সেই ছোটগল্প। উপন্যাস অথবা কবিতা পড়া হয়নি।
"পশ্চাৎপট" বনফুলের আত্মজীবনী। ৭৮ বছর বয়সে লেখা এই আত্মজীবনী। জীবনের শেষ দিকে এসে অধিকাংশ লেখক বা সাহিত্যেকের যে আত্মজীবনী আমরা পাই তাতে স্মৃতি হাতড়ে ফেরার রাজপথে আমরা প্রায়শই একই গলির দেখা পাই। কিছুটা রিপিটেশন এবং এলোমেলো কথামালার সম্ভার। আশ্চর্যজনকভাবে পশ্চাৎপট যে সব থেকে মুক্ত। দারুন ভাবে ধারাবাহিক এবংঙ রিপিটেশনের ছায়াটুকু যেন পড়েনি ফেলে আসা জীবনের মোলায়েম আলোর আঁচে।
তার ছোটগল্পের সম্ভার, সেই গল্পের আকার এবং রস এতটাই বিস্তৃত যে পাঠককে মুগ্ধ করে রাখে যুগের পর যুগ। খুব সংক্ষিপ্ত আকারেই তিনি লিখতে পারতেন দারুন সব ছোটগল্প। যার ফলে তিনি "পোষ্টকার্ড ছোটগল্পকার" হিসাবেও পরিচিত পাঠক মহলে। যদিও সাহিত্যিক জীবনে ছোটগল্প নয়, বরং একজন কবি হিসেবেই তার শুরু। শুরুতে শুধু কবিতাই লিখতেন।
পশ্চাৎপট আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে তার শৈশব থেকে শুরু করে কর্ম-জীবন, সাহিত্যিক জীবন এবং পারিপার্শ্বিক সকল কথা। পিতা ছিল গ্রাম্য ডাক্তার। তিনিও ডাক্তারি পাস করেন। তার ভাইদের মধ্যেও অনেকে ডাক্তার। জীবনের ৪০ বছর প্যাথলজিষ্ট হিসাবে কাজ করেছেন। তার মধ্যেই চলত অবিরাম সাহিত্য-চর্চা। আধুনিক চিন্তাভাবনার অধিকারী এবং ডাক্তার হয়েও হয়ত কিছু কিছু জায়গায় তিনি রয়ে গেছেন কিছুটা কুসংস্কার ঘেঁসা। নাকি সেটা সেই সময়ের-দাবী বলে এড়িয়ে যাব ঠিক জানিনা। তবে সেটা বিশেষ কোন কিছু হয়ে থাকবে না অবশ্যই।
সজনীকান্ত দাস (শনিবারের চিঠি) একটা বিশাল অংশ জুড়ে আছেন বনফুলের জীবনে। পশ্চাৎপট উঠে এসেছে তার কথা অনেকবারই প্রাসঙ্গিকভাবে। এসেছে আরও অনেক নামী-দামী সাহিত্যিকদের কথা। তার সাহিত্যিক-জীবনে স্ত্রী লীলাবতীর অবদান অনস্বীকার্য। তাই তার কথাও এসেছে অনেকবার। পশ্চাৎপট বইটা প্রচ্ছদ অথবা অন্য বাহ্যিক আড়ম্বর কম। কিন্তু প্রাণহীন না, বরং দারুনভাবেই উপভোগ্য।
তবে "পশ্চাৎপট" আত্মজীবনীতে কোথাও যেন একটা টোন ছিল যেটা বনফুলের নিজের ভূমিকাকে ফোকাস করে লেখা বেশি। নিজের ভূমিকাকে পুরো বইয়ে প্রধান করে দেখানোর একটা প্রচ্ছন্ন প্রচেষ্টা ছিল। উন্নাসিক না অবশ্যই।
জংলিবাবু ওরফে বনফুল ওরফে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় কিভাবে বনফুল হয়ে উঠলেন, কেন সেই ছদ্মনাম ব্যবহারের দরকার পড়ল সেই কাহিনিও চমকপ্রদ। একই সাথে তার জীবনে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু অলৌাকক ঘটনারও বিস্তারত বর্ণনা আছে পশ্চাৎপট বইয়ে। পশ্চাৎপট বনফুলতে নতুন আঙ্গিকে চেনার, জানার ও বোঝার এক দারুন প্ল্যাটফর্ম। আত্মজীবনীর প্রতি যে তীব্র মোহ, ভালোলাগা সেটার প্রেক্ষিতে পশ্চাৎপট মোটেও হতাশ করেনি, বরং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ্য। বরং বইয়ের শেষ বনফুলকে লেখা বিভিন্ন সাহিত্যিকদের ৪০টির মতো চিঠির সংযোজন পাঠকদের জন্যে তো বাড়তি পাওনা।
অটোবায়োগ্রাফি পড়ার আনন্দ অন্যরকম। নিজেকে লেখক মনে হয়। আগে তো জানতামই না বনফুল উপন্যাস লিখেছিলেন। গুডরিডসে দেখি বনফুলের অনেক বই, তারপর একে একে জঙ্গম,ডানা,স্থাবর,অগ্নীশ্বর,তৃণখন্ড, বৈতরণী তীরে,ভূবন সোম এবং সর্বশেষ এই পশ্চাৎপট আজ পড়ে ফেললাম। বনফুলকে পড়া আমার জন্য এনলাইটেনমেন্ট হিসেবে কাজ করে। এখনো যেগুলো পড়া হয়নি, আশা করছি শ্রীঘ্রই পড়ে নেব।