আমি লিখতে পারি না। কিছু লিখলেই মনে হয়, এই বাক্য না লিখলেও তো হয়, এই বাক্য তো বাহুল্য, এটি না লিখলেও তো কিছু যায় আসে না। আমার লেখা নিয়ে যখন আমি নিজেই তুষ্ট নই, পাঠক যদি ধৈর্য নিয়ে পড়েন সে আমার বড় পাওয়া। তবুও লিখি, নিজেকে সবার মাঝে বিশিষ্ট করার তাগিদে, সকলের সাথে মিলিত হওয়ার তাগিদে। একজন লেখক বহু মানুষের গভীরে পৌছুতে পারেন একথা সত্য বটে, তবে তার চেয়ে বড় সত্য এই উপলব্ধি যে, কত মানুষই না লেখক মানুষটাকে চিনতে পারে, বুঝতে পারে! কত মানুষ লেখককে একাত্ম করে নেয়। এই ক্রুয়েল জীবনে ঐটুকু অমৃতের জন্য ছুটে চলা যায়ই।
মেঘের ছায়া প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সনে। এটা শুভ্র সিরিজের দ্বিতীয় উপন্যাস। এই লেখার উদ্দেশ্য উপন্যাসটির রিভিউ লেখা। যতই সময় অতিবাহিত হচ্ছে, আমার টাইপিং মন্থরতরো হচ্ছে। আমি পূর্বের অসংখ্যবারের মতো এবারো অনুভব করছি, রিভিউটা আমি লিখতে পারব না। আমার সেই ভাষাগত দক্ষতা নেই, যে আমি মনের ভাবকে ভাষায় অনুবাদ করব- আরেকবার আবিষ্কার করলাম এই অপারগতা। আর বইয়ের রিভিউ কিভাবে লিখতে হয় তাও জানি না।
জাহেদ আর কেয়াকে হুমায়ূন যেভাবে এঁকেছেন তেমন করে কজন আঁকতে পেরেছেন আমার জানা নেই। প্রতিটি চরিত্র এত বাস্তব, এত জলভরা। এই যে জাহেদ, কেয়া, নীতু, মাহিন, রেহানা, ইয়াজুদ্দিন এরা কি আমাদের মাঝে নেই? এই সত্যটা আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, প্রত্যেকের জীবন পবিত্র। লেখক যখন কোন চরিত্রকে ধরার চেষ্টা করেন লেখেন তখন ঐ পবিত্রতাকে স্পর্শ করতে পারলে চরিত্রের প্রতি ন্যায়বিচার করা হয় । হুমায়ূন আহমেদ মনে হয় বিশ্বাস করতেন:, “I do not and cannot believe that man can be evil”.
উপন্যাস অনেক রকমের হয়। মানুষ কবিতা কেন পড়ে? ধরুন, আপনি আমি যদি কখনো “আলো অন্ধকারে যাই মাথার ভিতরে, স্বপ্ন নয় কোন এক বোধ কাজ করে” ধরুন, আপনি আমি কখনো এই বিপন্ন বিস্ময়ে স্তব্ধ হই নাই। যে লোক এই জিনিস কখনো অনুভব করে নাই সে লোক জীবনানন্দকে বুঝবে কী করে! সাহিত্যকে আমি সমাজের দর্পন মনে করি। আমরা যা দেখি, যার ভেতর দিয়ে যাই তা সাহিত্যে আসা চাই। একইসাথে, আমরা যা দেখি না নিত্যদিনের ব্যস্ততায়, অথবা এই ক্রুয়েল পৃথিবীর বীভৎসতার দরুণ শক্ত হয়ে যাওয়া হৃদয় যা অনুভব করতে পারে না; একজন কবি তা দেখেন, স্বর্ণ হৃদয় দিয়ে তা অনুভব করতে পারেন। লেখক সেইসব দিনরাত্রির ছবিটি অকৃত্রিম সততায় আঁকলে তার চেয়ে বেশি কিছু আমি চাই না৷ আমি দেখতে চাই, আমাকে দেখাও; আমি শুনতে চাই, কোথায় সে ধ্বনি যে আমাকে গল্প বলে চলবে এই কোটি কোটি জীবনের স্রোতধারার।
হুমায়ূন আহমেদ এই কাজটিই করেন। একেবারে সাধারণ মানুষও তার বই পড়ে, কারণ সে নিজেকে দেখতে পায় সেখানে৷ সে দেখে বাইরের দুনিয়ার কাছে আপাত মূল্যহীন তার জীবন হুমায়ূন আহমেদের লেখনীতে কী স্নিগ্ধ পবিত্রতায় সমুন্নত । সে জানে, তার অনুভব, তার গ্লানি-বেদনা-সংগ্রাম তার একার নয়, তার মতো অনেকেই পথে পথে হেঁটে যাচ্ছে ।
হুমায়ূন আহমেদকে অনেকেই পছন্দ করেন না৷ আজকাল দেখি অনেকে তার বইয়ের রিভিউতে ডিসক্লেইমার দিয়ে রাখেন যে তিনি হুমায়ূনভক্ত নন বা একসময় তার লেখা ভালো লাগলেও এখন ঐ লেখা তিনি মানোত্তীর্ণ মানেন না৷ দুই বা তিন স্টার দিয়ে আরো বলেন এসব হচ্ছে গড়পড়তা লেখা। এসব টিকবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেকে তো বলতেও ভয় পান তিনি হুমায়ূন আহমেদের লেখা পছন্দ করেন। আমিও মাঝে মাঝে ভয় পেতাম। এখন পাই না। কী অবনতি আমার!