হিসেবের কাল-বিন্দু আছে, সেটা যীশুর জন্মকাল, তাহলে পুরাণের কি কোন কাল-বিন্দু নেই? নেই। কিন্তু আদিবিন্দু আছে, সেটাকে বলা হচ্ছে মানব কল্পের আদিবিন্দু। স্বয়ম্ভর মনুকাল, পাঁচ হাজার ন’শো আটান্ন খ্রিষ্টপূর্ব। এই আদিবিন্দুর অতীতে আর কিছু নেই, থাকলেও তা ইতিবৃত্তে আসেনি। কালকূটের হাত ধরে শাম্বকে দেখার অভিপ্রায়ে পুরাণের পথে আমাদের যাত্রা শুরু এক হাজার চারশো খ্রিষ্টপূর্বাব্দে।
এ এক ভিন্ন ধরনের ভ্রমণকাহিনী, এর স্বাদ যেমন অভিনব, যাত্রাপথ তেমনি গহন। কাঁধে ঝোলা চাপিয়ে ঠেলাঠেলি করে যাওয়া নয়, তবে এ যাত্রাতেও বাঁশি বাজে, নিশান ওড়ে। এ বাঁশি প্রাণের কোথায় যেন বাজে, সুরে ডাক দিয়ে ঘরের বাহির করে নিয়ে যায়। বাস্তব থেকে কল্পনায়, সেখান থেকে পুরাণের পথে দ্বারকা নগরীতে। কৃষ্ণ এখনে প্রধান চরিত্র নয়, প্রধান চরিত্র কৃষ্ণ আর জাম্ববতী তনয় অপরুপকান্তি বীর শাম্ব। যাত্রাপথে যার আবির্ভাব দুর্যোধন কন্যা সর্বাঙ্গসুন্দরী, সর্বালংকারশোভিতা লক্ষণাকে বলপূর্বক হরণের মাধ্যমে।
শাম্বের পরিচয় দিতে গেলে বলতে হয় একবার শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছা হল শিবের মত গুণসম্পন্ন একটি পুত্রলাভের। তখন তিনি উপযুক্ত পরামর্শের জন্য এক ঋষির কাছে যান। সেই ঋষি কৃষ্ণকে বলেন যে তিনি যদি এক হাজার ফুল নিবেদন করে বহু বছর ধরে শিবের আরাধনা করেন তাহলেই শিব তুষ্ট হয়ে তাঁর মত একটি পুত্র দান করবেন। সেই পরামর্শ অনুসারে কৃষ্ণ নিভৃতে গিয়ে সারা অঙ্গে ভস্ম মেখে এবং বল্কল (গাছের ছাল) ধারণ করে শিবের আরাধনা করতে আরম্ভ করেন। সেই উপাসনায় প্রসন্ন হয়ে দেবী পার্বতী এবং শিব উভয়েই কৃষ্ণের কাছে উপস্থিত হন তাঁর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে। তখন কৃষ্ণ তাঁদের কাছে শিবের সকল গুণসম্পন্ন একটি পুত্র প্রার্থনা করলে শিব তাঁকে সেই পুত্রলাভের বর দান করেন। বর পেয়ে কৃষ্ণ গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন এবং কিছুকাল পরেই জাম্ববতীর গর্ভে জন্ম হয় শাম্বের।
তবে আমাদের যাত্রা শুরুর ঘটনার সূত্রপাত যখন দ্বারকা নগরীতে জগৎবিখ্যাত বাসুদেব, পুরুষোত্তম জনার্দন, বৃষ্ণিসিংহাবতার কৃষ্ণের সাথে দেখা করতে আসেন মুনি নারদ। এই সেই মুনি যিনি যুধিষ্ঠিরকে শিক্ষা দিয়েছিলেন রাজনীতি, অর্থনীতি, ভেদনীতি, সমাজনীতি এবং গার্হস্থ্যনীতি সমুহ। ভ্রমণ করেছেন সমগ্রবর্ষ... কিম্পুরুষবর্ষ, ইলাবৃতবর্ষ, মধ্যস্থল, অন্তরীক্ষ, ভদ্রাশ্ববর্ষ, কৈলাস কোনও জায়গা বাদ নাই। দেবতা, অসুর, দানব, গন্ধর্ব, যক্ষ, সর্প, মানব সকলের সাথে মিশেছেন, দেখেছেন জীবনযাত্রা ও ধারণ প্রনালী।
কৃষ্ণের মহলে সাদরে সম্ভাষণে নারদ এবং তার সঙ্গীরা সত্যিই খুশি হলেন কিন্তু তার তীক্ষ্ণ ভ্রুকুটি চোখে একটি জিজ্ঞাসা লেগেই রইলো আর তা হল কৃষ্ণ পুত্র শাম্ব।
কৃষ্ণ পুত্রদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা রূপবান যুবা শাম্ব। কাঞ্চনের অধিক উজ্জ্বল বর্ণে পারিপার্শ্বিক সবকিছুই যেন প্রতিবিম্বিত হয়। তা সে কানন, কুঞ্জ, জলাশয়, আকাশ, পর্বত, নারী যাই হোক। তার আয়ত চোখে সর্বদা কামনার বহ্নি অনল প্রজ্বলিত হয় না, কিন্তু তার মুগ্ধ দৃষ্টিতে এমন চিত্ত জয়ী দুর্বার আকর্ষণ আছে, রমণী মাত্রই তার দর্শনে মিলন আকাঙ্ক্ষায় কাতর হয়ে উঠে।
নারদ যখন উপস্থিত হলেন তখন বর্ণাঢ্য ফুলের কেয়ারী ও লতাপাতায় আচ্ছন্ন কাননের মধ্যে রূপবান শাম্বকে দেখলেন রমণী পরিবেষ্টিত হয়ে প্রণয়োদ্দীপ্ত ভাষণে ও আলাপে ব্যস্ত। যথোপুযোক্ত সম্মান না পেয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে মহর্ষি গুরুতর অভিযোগ তুললেন পুত্র শাম্বের বিরুদ্ধে, তাও পিতার রমণী গনের বিরুদ্ধে পুত্রকে অভিযোগ করে আর সেই অভিযোগ পিতা কৃষ্ণকেই। শাম্বের সঙ্গলাভে ব্যাকুল কৃষ্ণের ষোল হাজার রমণী, আর তাতেই পিতার বিচিত্র অসূয়া অভিশাপ হয়ে নেমে এলো পুত্র শাম্বের জীবনে।
পিতার দ্বারা অভিশপ্ত হওয়া, শাপমোচন এবং মুক্তি, বহুবিধ ঘটনা তত্ত্ব তথ্যের জালে আবৃত। তবে বাহুল্য বোধ ত্যাগ করে কালকূট শুধু অভিশাপের কারণ আর শাপমোচন বিষয়কেই যথাসম্ভব সহজভাবে বলেছেন। ইতিহাসে অনেক সময়েই পরবর্তীকালের অনেক ঘটনা স্থুলহস্তাবলেপে প্রক্ষিপ্তভাবে প্রবেশ করে। অনেক ঘটনা রয়ে যায় লোক চক্ষুর অন্তরালে, অনেক পার্শ্ব চরিত্র হারিয়ে যায় মূল চরিত্রের আলোকচ্ছটায়। শাম্ব উপন্যাসে এমনি এক চরিত্রের কথা বলা হয়েছে যে অতি দুঃসময়েও বিশ্বাস হারায়নি, দৈহিক ও মানসিক কষ্টের ভিতর দিয়ে যাবার সময়েও চেষ্টা করেছে নিরন্তর উত্তীর্ণ হবার। শাম্ব এক সংগ্রামী চরিত্র, যার উত্তরণকে কালকূট দেখিয়েছেন শ্রদ্ধার সঙ্গে, যার যাত্রার পথকে নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ভৌগলীক অবস্থান, তথ্য, উপাত্ত, পরিসংখ্যানের আলোকে, পাশাপাশি বেদ পুরাণের অবস্থানকে দেখিয়েছেন কালের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে।