ফ্ল্যাপে লিখা কথাঃ ভাষা, সাহিত্য, সংগীত থেকে আরম্ভ করে অভিনয়, চিত্রকলা, কারুকলা, স্থাপত্য ইত্যাদি নানা উপাদানে গঠিত সংস্কৃতির অবয়ব। ধর্ম, সামাজিক মূল্যবোধ, লোকাচার, লোকবিশ্বাস, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-আশাক, চলন-বলন, ব্যবহার্য উপকরণ এবং হাতিয়ার- সবই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে যেসব রচনা এ যাবৎ প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে এসব বিচিত্র দিক সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা করা কঠিন। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ- এসবের মধ্যে বাঙালিত্ব কোথায়, এই সংস্কৃতির সূচনা কখন থেকে, বাঙালির বৈশিষ্ট্য কী- সে সম্পর্কেও সম্যক ধারণা করা যায় না। বাঙালি সংস্কৃতি মূলত সমন্বয়বাদী। এ দেশের ধর্ম বাঙালি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। কিন্তু প্রকাশিত রচনাগুলো হিন্দু বাঙালি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। কিন্তু প্রকাশিত রচনাগুলো হিন্দু বাঙালি অথবা মুসলিম বাঙালির সংকীর্ণ সীমানা দিয়ে খণ্ডিত। রাজনৈতিক ভেদরেখাও কোথাও কোথাও আলোচনাকে ঘোলাটে এবং আবিল করেছে।
বর্তমান গ্রন্থ বাঙালি সংস্কৃতির প্রথম নিরপেক্ষ এবং পূর্ণাঙ্গ আলোচনা। সরল ভাষায় সাধারণ মানুসের জন্যে লেখা। এতে দেখানো হয়েয়ে রাজনৈতিক ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কৃতির প্রতিটি উপাদানের বিবর্তন এবং বহিঃপ্রকাশ; সেই সঙ্গে এই সংস্কৃতির গঠন ও বিকাশে ব্যক্তির অবদান। সবার ওপর আছে বাঙালি সংস্কৃতির স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য উন্মোচন।
Ghulam Murshid (Bengali: গোলাম মুরশিদ) is a Bangladeshi author, scholar and journalist, based in London, England.
জন্ম ১৯৪০, বরিশালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. এ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। পি এইচ ডি— ঐতিহাসিক ডেইভিড কফের তত্ত্বাবধানে। গবেষণার বিষয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু সমাজ সংস্কার আন্দোলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দু দশক ধরে অধ্যাপনা । মাঝখানে দু বছর কেটেছে মেলবোর্নে, শিবনারায়ণ রায়ের তত্ত্বাবধানে, পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা কর্মে। ১৯৮৪ সাল থেকে লন্ডন-প্রবাসী। | বেতার-সাংবাদিকতা এবং শিক্ষকতার অবসরে প্রধানত আঠারো শতকের বাংলা গদ্য এবং মাইকেল-জীবন নিয়ে গবেষণা। প্রধান নেশা গবেষণার— অতীতকে আবিষ্কারের । বারোটি গ্রন্থ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত বিদ্যাসাগর বক্তৃতামালার ওপর ভিত্তি করে রচিত গ্রন্থ: রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা (১৯৮১)। পিএইচ ডি. অভিসন্দর্ভের ওপর ভিত্তি করে লেখা সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও বাংলা নাটক (১৯৮৫)। মহিলাদের নিয়ে লেখা Reluctant Debutante: Response of Bengali Women to Modernization (১৯৮৩) (বাংলা অনুবাদ: সংকোচের বিহ্বলতা [১৯৮৫]) এবং রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া : নারীপ্রগতির একশো বছর (১৯৯৩)। অন্য উল্লেখযোগ্য রচনা, কালান্তরে বাংলা গদ্য (১৯৯২), যখন পলাতক (১৯৯৩) এবং বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার আদি-পর্ব (১৯৮৬)। প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২)। আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বক্তৃতা দান (১৯৯১-৯২)। ছদ্মনাম হাসান মুরশিদ। এই নামে একটি উপন্যাসও লিখেছেন।
ইংরেজিতে কিছু পপুলার হিস্ট্রির বই পাওয়া যায়। যেখানে খুব সংক্ষেপে আলোচনার মাধ্যমে ইতিহাস নিয়ে ভাসাভাসা জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। গোলাম মুরশিদের "হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি" এমনই একটি গ্রন্থ। ৫শ পাতায় তিনি পুরো বাঙালি জাতির সংস্কৃতি, রীতিনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনার ধারা সুখপাঠ্য নয়। লেখার মানও প্রশ্নবিদ্ধ।
ইতিহাস নিয়ে লেখা সহজ ব্যাপার না। মোটামুটি নির্মোহভাবে অতীতকথন এবং তার ব্যাখা-বিশ্লেষণ করতে পারার ওপর লেখকের সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ভর করে। সেখানেই পরাজিত হয়েছেন গোলাম মুরশিদ। তিনি কোনো তথ্যসূত্র দেন নি। তার বদলে বারবার লিখেছেন, " অনেকেই মনে করেন", " ঐতিহাসিকদের মতে" টাইপ ভিত্তিহীন শব্দবন্ধ! এই ধরনের বইয়ের তথ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। উপরন্তু মনগড়া ব্যাখা তো আছেই। যেমন,
" সাহিত্য, সংগীত, নাটকের মতো চলচ্চিত্রেও পূর্ববাংলা পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় অর্ধশতাব্দী বা তারচেয়েও বেশি পিছিয়ে থাকলো " পৃষ্ঠা ৩৯১
বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে বাজারে চালু অখাদ্যগুলোর রাজা "হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি"।
বিশিষ্ট বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী গোলাম মুরশিদ হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি নামে যে বাঙালির কথা লিখেছেন তাও ঐতিহাসিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। কারণ ইতিহাসে হাজার বছর ধরে বাংলা ও বাঙালির কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
বাঙালি সংস্কৃতি বলতে মূলত তিনি ইংরেজের প্রশ্রয়পুষ্ট উনিশ শতকীয় কলকাতাকেন্দ্রিক সংখ্যালঘু বাঙালি হিন্দুর অবদান ও সৃষ্টিকে তুলে ধরেছেন। সংখ্যাগুরু বাঙালি মুসলমানের উপস্থিতি এখানে নগণ্য।
মুরশিদ এ বইটি লিখেছেন কলোনিয়াল কলকাতার ইসলামোফোবিক সংস্কৃতিসেবী ও বুদ্ধিজীবীদের চোখ দিয়ে, যেখানে তিনি ইসলামকে এ ভূখণ্ডের জন্য এলিয়েন ও জবরদখলকারী হিসেবে প্রমাণ করার অনৈতিহাসিক চেষ্টা করেছেন। এর ফলে মুরশিদ যখন বাংলার রেনেসাঁ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ ও দেশবিভাগের আলোচনা করেন, সেখানে মূলত পশ্চিম বাংলা ও কলকাতাকে দেখি। পূর্ব বঙ্গ আসে আলোচনার অনুষঙ্গ হয়ে, মূল ফোকাসে নয়।
বাঙালির প্রণয়, পরিবারের আলোচনায়ও প্রধানত কলকাতাভিত্তিক মধ্যবিত্তের আলোচনা দেখি। আর সংস্কৃতিকেন্দ্রিক আলোচনায়ও কলোনিয়াল কলকাতার রেসিস্ট সংস্কৃতিকেই মঞ্চের ওপরে রাখা হয়। সেই হিসেবে এই বইটি সব বাংলা ভাষাভাষীর পরিচয়জ্ঞাপক হয়ে ওঠেনি।
বইখান নিয়ে নানা মুনির নানা মত দেখলাম। তবে আমার বেশ ভালোই লাগছে। এসব বই যতই চেষ্টা করা হোক না কেনো, পুরোপুরি পার্ফেক্ট হয়না। কোন না কোন একটা দিক দিয়া লেখকের অসম্পূর্ণতা থাইকা যায় কারন লেখক শুধু লেখক নন, একজন মানুষও বটে। আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে ইদানীং বেশ হাউকাউ হচ্ছে। বইটা রেকমেন্ড করলাম। পড়ুন, দ্বিমত পোষণ করুন, পাল্টা মত দিন তবু মারামারি টা হাতের বদলে কলমে হোক। সেই আহ্বান আর প্রত্যাশা টু মাই ফেলো রিডার্স।
বাঙলা সংস্কৃতির মোটা দাগের ইতিহাস সম্পর্কে যাদের এতটুকু ধারণা নেই, তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য একটি বই। অন্যদিকে, যারা আমাদের সংস্কৃতির ইতিহাস নিয়ে নতুনতর ধারণা/ চিন্তার সন্ধান চান, তাদের অবশ্য এই বই চূড়ান্তভাবে হতাশ করবে। কারণ লেখকের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ-চিন্তন-ধারণার কোন রেখাপাত বইটিতে প্রায় অনুপস্থিত। লেখককে ধন্যবাদ দিই তার পরিশ্রমের জন্য, অনেক উৎস থেকে মসলাপাতি নিয়ে বাঙলা সংস্কৃতির ইতিহাসের একটা প্রবেশিকা তৈরি করে দেওয়ার কাজটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আমি কেনো না পড়েই ১ স্টার দিলাম? বইটার যে রিভিউ পড়েছি, এরপরে আর কোন জরুরত দেখিনা সময় নষ্ট করার। মুসলিম বাঙলা সংস্কৃতিকে অচ্ছুত জ্ঞান করে, মুসলিম রাজাদের কেবল অত্যাচারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে উনি যে প্রকৃতপক্ষে কোলকাতার বাবুদের নম: নম: পাওয়ার চেষ্টা করেছেন তা সহজেই অনুমেয়।
এই বই পড়ার জন্য আজকের চেয়ে ভাল দিন আর কি হতে পারে! সেই কয়েক বছর আগে যখন গোলাম মুরশিদ স্যার এসেছিলেন রিডিং ক্লাবে, তখন থেকেই এ বইটা পড়ার ইচ্ছা ছিল। কেন যেন এত দিনেও হয়ে ওঠেনি। এ বইয়ের বর্ণণা এত সুন্দর আর সাবলীল যে ৫২০ পৃষ্ঠার এ বিরাট বইটা পড়ার সময় একবার ও মনে হয়নি প্রবন্ধের বই পড়ছি। এ ধরণের বই পড়তে গেলেই আমার শুধু মনে হয় যে, এত ধৈর্য মানুষের কিভাবে হয়! এ বইও তার ব্যাতিক্রম নয়। বইয়ের শেষে ৮ পৃষ্ঠার (!) গ্রন্থপঞ্জী আছে যেখানে এই বই লিখতে গিয়ে উনি যত বই পড়েছেন সব গুলোর নাম দেয়া সম্ভব হয়নি!! আর জাদুঘরে গিয়ে গবেষণা করার কথা ত বাদ ই দিলাম! এ বই সব বাংগালীর ই পড়া উচিত বিশেষত এই অস্থির সময়ে যখন মানুষ সব বাংগালী সংস্কৃতি, রীতি, উৎসব, পোশাক এর মাঝেই ভিন্ন কিছুর গন্ধ খুঁজে পায়। ** এই বইমেলা থেকে কেন যেন খুব ব্যাপক হারে বাংলা বইয়ে ছাপার ভুল আমার চোখে পড়ছে। এ অসাধারণ বইটিও তা থেকে রেহাই পায়নি। খুবই দুঃখজনক।
বাঙালি জাতটা খুব বেশি পুরনো নয়। যদিও এ বইটির নামে হাজার বছর আছে, কিন্তু বইয়ের শুরুর দিকে লেখক বারবার বলে দিয়েছেন, এ জাতটার বয়স আরো কম হওয়াই সম্ভব। কেবল একটা রাউন্ড ফিগারে আনার জন্য আমরা হাজার বছর বলে থাকি। বাঙালির বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও এর সংস্কৃতি কম বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়। এর সবটা পাঁচশ আটচল্লিশ পৃষ্ঠার একটি বইয়ে তুলে আনা সহজ কাজ নয়। কিন্তু কাজটা করতে লেখক ভালই বাহাদুরি দেখিয়েছেন। এ ধরণের অন্য যে সমস্ত বই রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগের ক্ষেত্রে একটা জিনিস লক্ষ্য করা যায়; ওই বইগুলোতে লেখক হয় কেবল বাংলাদেশের, নাহলে পশ্চিমবঙ্গের, হয় হিন্দু বাঙালির, নাহলে মুসলমান বাঙালির কথাই বেশি করে লিখেছেন। কেউ উভয়ের কথা লিখলেও খানিকটা গুলিয়ে ফেলেছেন, কোনো একদিকে পক্ষপাত দেখা দিয়েছে। গোলাম মুরশিদ এদিকটা খেয়াল করেছেন, তিনি সচেতনভাবেই হিন্দু-মুসলিম, বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ সবার কথাই লিখেছেন। যখন বাঙালির যে অংশটা লাইমলাইটে এসেছে, তখন তার কথা বেশি লিখেছেন, কিন্তু অন্য অংশগুলিকেও বাদ দেন নি। লেখক যে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চেয়েছেন তাতে তিনি ষোলো আনা সফল হয়েছেন। লেখক আরো একটা দিকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পেরেছেন বলে মনে হয়েছে। আমাদের ইতিহাস লেখকরা কেউ কেউ বাঙালিকে এক কীর্তিমান, মহৎ জাতি হিসেবে প্রচার করতে চেয়েছেন, আবার কেউ একধরণের হতাশা নিয়ে বাঙালিকে অলস, অকর্মা, মেধা-বুদ্ধিশূন্য হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। গোলাম মুরশিদ এটি এড়াতে সক্ষম হয়েছেন। তাই তাঁর বইটি পড়ে ভাবোচ্ছ্বাস জাগে না, হতাশাও জাগে না। নিজের শেকড় সম্পর্কে জানতে চাইলে এটি অত্যন্ত মূল্যবান একটি বই।
এই বইটা পড়া আমার সারা জীবনের অনেক বড় একটা অর্জন হয়ে থাকবে। বইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপারটা ছিল (আমার মতে) গোলাম মুর্শিদ সাহেবের বলার স্টাইল। বলার সময় এতো কনফিডেন্স সাধারণত এতো বিশাল এরিয়ার বইতে দেখা যায় না। এ ধরণের বইতে হয়তো, সম্ভবত, আমার জানামতে, হতে পারে, সম্ভাবনা আছে... এই ধরণের কথা বেশী থাকে। কিন্তু মুর্শিদ সাহেব এসবের ধার দিয়েও গেলেন না। উনার কথা ক্লিয়ার-কাট। প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে উনি এই বিষয়টা নিয়ে সামগ্রিক ভাবে জেনেশুনে তবেই লিখতে বসেছেন। এটা লেখকের প্রতি পাঠকের নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়, লেখককে বিশ্বাস করার মনোবল যোগায়।
বইয়ের নামঃ হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি লেখকঃ গোলাম মুরশিদ বইয়ের ধরণঃ গবেষণাধর্মী প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশনাঃ অবসর প্রথম প্রকাশঃ জানুয়ারি, ২০০৬ প্রচ্ছদঃ প্রতীক ডট ডিজাইন আইএসবিএন নম্বরঃ ৯৮৪-৪১৫-১৯০-২ পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৫৪৮ মুদ্রিত মূল্যঃ ৫০০ টাকা
সামাজিক জীব হিসেবে আমরা যা, তাই আমাদের সংস্কৃতি৷ তাত্ত্বিকভাবে এর সাথে আরেকটি যে ধারণা জড়িত রয়েছে, তা হলো সভ্যতা। তাত্ত্বিক দিক থেকে এরা একে অপরের পরিপূরক৷ সংস্কৃতি ও সভ্যতা কী, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জনপ্রিয় সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার ও পেজ বলেন, "আমরা যা, তাই আমাদের সংস্কৃতি। আর আমাদের যা কিছু রয়েছে, তাই নিয়ে আমাদের সভ্যতা।" ( Culture is what we are, and civilization is what we have) প্রতিটি জাতির যেমন নিজস্ব সংস্কৃতির আলাদা ইতিহাস রয়েছে, তেমনি জাতি হিসেবে বাঙালিদের রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ইতিহাস। সত্যি বলতে, জাতি হিসেবে আমাদের নাম ঠিক কবে থেকে, কীভাবে বাঙালি হলো, তার সুনির্দিষ্ট কোনো ইতিহাস আজো খুঁজে পাওয়া যায়নি। নানা সময়ে, নানা জাতির নৃতাত্ত্বিক সংমিশ্রণ যেমন ঘটেছে, তেমনি সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ ঘটবার ঘটনার কথাও জানা যায়। এভাবে যুগে যুগে নানা জাতি-ধর্ম-বর্ণের সংমিশ্রণে আমাদের শারীরিক অবয়ব গড়ে ওঠবার পাশাপাশি মানসিক অবয়ব সৃষ্টির চিত্রও খুব সহজেই লক্ষ্য করা যায়৷
এই সংকর জাতির সংস্কৃতির ইতিহাস নিয়ে নানা সময়ে নানা গ্রন্থ রচনা করা হলেও এতোদিন তা করা হয়েছে খণ্ড খণ্ড আকারে। পূর্ণাঙ্গ তথা সামগ্রিক ইতিহাস কোথাও পাওয়া যায় না। পাঠক সমাজের দীর্ঘদিনের সে চাহিদা পূরণ করতে সমসাময়িক কালের জনপ্রিয় গবেষক গোলাম মুরশিদ তার প্রাঞ্জল লেখনীর মধ্য দিয়ে বইয়ের পাতায় বাঙালি সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরবার প্রয়াস চালিয়েছেন। তার দীর্ঘদিনের গবেষণার ফসল উক্ত বইটি। বাঙালি সংস্কৃতি কীভাবে কালের বিবর্তনে আজকের অবস্থানে উপনীত হলো, সে সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করেছেন তিনি। পাশাপাশি সংস্কৃতির নানা উপাদানভিত্তিক বিবর্তনের ইতিহাস এই আলোচনায় উঠে এসেছে। মূলত বাঙালি মানসলোকের এক পূর্ণ অবয়ব এই বইয়ের মধ্য দিয়ে দর্পণের মতো বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। এক কথায়, বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসের সামগ্রিক চিত্রটা কেমন, তা জানতে চাইলে এই বইটি আপনার জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে আমার ধারণা।
এবার আসি উক্ত বইয়ের আলোচ্য বিষয় সংক্রান্ত আলোচনায়৷ উক্ত বইটিতে গোলাম মুরশিদ বাঙালি জাতির সংস্কৃতির ইতিহাস অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন৷ উল্লেখ্য যে, এই বইতে সাহিত্যের আর দশটি বইয়ের মতো গৎবাঁধা উপায়ে মানব চরিত্র ভিত্তিক কোনো আলোচনা বা কাহিনী চিত্রণ পাঠকের চোখে পড়বে না৷ বরং বাঙালি সংস্কৃতির বিবর্তন সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনা এখানে বারবার উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে স্থান, কাল ও ধর্মভিত্তিক আলোচনা বেশি প্রাধান্য লাভ করেছে। এর পাশাপাশি সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক চিত্রও উক্ত আলোচনা থেকে কোনোভাবে বাদ যায়নি। বরং মূল আলোচনার পাশাপাশি এ আলোচনা বইটিকে আরো তথ্যসমৃদ্ধ করে তুলতে সাহায্য করেছে। এ বিষয়টি কোনো পাঠকের মনে বিরক্তির উদ্রেক ঘটাবে না বলে আমার বিশ্বাস।
এবার আসি বইটির ভাষা ও শব্দচয়ন সংক্রান্ত কথায়। বইটির আলোচ্য বিষয় অত্যন্ত কাঠখোট্টা টাইপের হলেও শব্দচয়ন তথা ভাষার প্রয়োগে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। যথাসম্ভব সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় গোলাম মুরশিদ এই ব্যাপারগুলো পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। সহজ শব্দের প্রয়োগের ফলে জটিল বিষয়গুলোও পাঠক হিসেবে আমার কাছে তেমন জটিল মনে হয়নি। পাশাপাশি জটিল ব্যাপারগুলোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট সংখ্যক জীবনমুখী উদাহরণ উল্লেখ করার কারণে জটিল ব্যাপারগুলো সহজে বুঝতে কোনো বেগ পেতে হয়নি৷ আশা করি, অন্য পাঠকদের কাছেও এই ব্যাপারটা ভালো লাগবে৷
এতক্ষণ তো বইটির নানা ইতিবাচক দিক নিয়ে কথা হলো। এবার বইটির নেতিবাচক কিছু দিক নিয়েও কথা বলা যাক। প্রথমত বইটি অনেক বেশি তথ্য ও রেফারেন্সনির্ভর হলেও বইটিতে যথেষ্ট পরিমাণে ভুল বানানের প্রয়োগ দেখা যায়, যা এমন একটি জনপ্রিয় বইয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু লেগেছে আমার কাছে। এছাড়া হার্ডকভারে মোড়া এই বইটির বাইন্ডিং কোয়ালিটিও তেমন সন্তোষজনক মনে হয়নি আমার কাছে। এই দুইটি বিষয়ে অন্য পাঠকেরাও আমার সাথে একমত পোষণ করবেন বলে আমার বিশ্বাস৷
পরিশেষে, এই কথা বলেই শেষ করতে চাই, তথ্যনির্ভর এই বইটি একজন পাঠককে হাত ধরে জ্ঞানের সুবৃহৎ রাজ্যে নিয়ে যাবে— এ কথা যেমন ধ্রুব সত্য, ঠিক তেমনি এই বইয়ের নেতিবাচক দিক চোখে পড়লে একজন পাঠক কিছুটা হলেও আশাহত হবেন— সে কথাও চিরন্তন সত্য৷ তবে ত্রুটিগুলো মাথায় রেখে বইটি পড়লে কাউকে সেভাবে আশাহত হতে হবে না বলে আমার ধারণা।
হুমায়ুন আজাদের লাল নীল দীপাবলি পড়ার পর থেকেই বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস আরও বিস্তারিতভাবে জানার আগ্রহ বেড়ে যায়। হাতের কাছেই ছিল 'হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি' বইটা, কাজেই এটাই পড়া শুরু করলাম। মোট চোদ্দটি অধ্যায়ে লেখক গোলাম মুরশিদ বাঙালি জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি বর্ণনা করেছেন। যদিও বলা হচ্ছে বাঙালি জাতির বয়স হাজার বছর, তবে লেখকের মতে বয়সটা আরও কম হওয়ার কথা কিন্তু রাউন্ড ফিগারে হাজার বছর-ই বলা হয়ে থাকে। হাজার বছর বলতে যে একেবারে হাজার বছর শুরুর গোড়া থেকেই ইতিহাস বর্ণন�� করা হয়েছে এমনটাও না। ইতিহাসের অনেক কিছুই আমরা জানি না বা জানতে পারিনি কারণ সবটা লেখা হয়নি। তবে পাওয়া গিয়েছে বেশ কিছু নিদর্শন যেগুলো নিয়ে গবেষণা করে প্রাচীন বাংলার নানান বিষয় সম্পর্কে জানা গিয়েছে। ইতিহাসের যতদূর অব্দি ভালোভাবে জানা গিয়েছে ততদূর নিয়েই এই বইতে আলোকপাত করা হয়েছে। ইতিহাসের প্রতিটি বিষয় নিয়েই আলাদা আলাদা অধ্যায় রয়েছে, যার ফলে ইতিহাসের প্রতিটি উপাদান সম্পর্কেই বেশ ভালো ধারণা পাওয়া সম্ভব। রয়েছে ইন্দো মুসলিম আমলের সংস্কৃতির রূপান্তরের কথাঃ; বাংলার সমাজ ও ধর্ম, পরিবার, নারীর অবস্থান, ভাষা ও সাহি��্য; গান, নাটক ও স্থাপত্যশিল্প, চিত্র ও কারুকলার ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে বর্ণনা এবং আরও অনেক কিছু। লেখক লেখার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছেন। শুধু হিন্দু বা মুসলিম দৃষ্টিকোণ কিংবা কোনো এক নির্দিষ্ট অঞ্চলের কথা না বলে চেষ্টা করেছেন সামগ্রিক ইতিহাসকেই সংক্ষেপে তুলে আনতে। অনেক সময় ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে পক্ষপাত দেখা গেলেও এই বইতে লেখক পক্ষপাতহীন থাকতে চেষ্টা করেছেন। আমার মত যারা নিজের শিকড় সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না তাদের জন্য বইটা ভালো অপশন হতে পারে। এবার কিছু ব্যক্তিগত উপলব্ধির কথা বলি। সত্যি বলতে আমি বাঙালি ইতিহাস ও সংস্কৃতির ব্যপারে খুব বেশি জানতাম না। লাল নীল দীপাবলি ও হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি বই দুটি পড়ে নিজের শিকড় সম্পর্কে জানতে পারলাম, অন্তত মোটামুটি একটা ধারণা পেলাম। আগে হয়তোবা মুখে মুখে বলতাম যে বাঙালি হয়ে গর্ববোধ করি, কিন্তু এখন আসলেই সেই অনুভূতিটা পাচ্ছি। হয়তো আমাদের মিশ্র সংস্কৃতি, হয়তো বারবার বিদেশিদের হাতে পরাধীন থেকেছি, হয়তো আমাদের দোষের সীমা নেই। কিন্তু তবুও আমাদের সংস্কৃতি অতুলনীয়, আমাদের সত্যিই গর্ব করার মত অনেক কিছুই রয়েছে। এই যে নিজেদের সম্পর্কে জানার পরে নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ব্যপারে যে শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা জন্মায় তা অমূল্য। . বই: হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি লেখক: গোলাম মুরশিদ প্রকাশনী: অবসর মূল্য: পাঁচশ টাকা পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৫৪৮।
One of the best books I have read, without a doubt. The author charts a cultural history of Bengal and Bengalis, with a nuanced, sensitive and objective pen:- exploring politics, culture, history, attitudes to love, music, literature, architecture, arts and crafts, attire, food, temperament and much much more. The influence is also narrated with the historical perspective in mind, exploring the development throughout the centuries, the gradual development from Buddhist influence and Hindu rule, Indo-Muslim rule, Portuguese influence, British rule and Anglicization, followed by the period of decolonization. It is rare to see a book that is genuinely so objective, as most books available in West Bengal seem to be from solely the bhadrolok standpoint, while similar circumstances must prevail in Bangladesh. It is as if the two communities have taken a stance, as the author himself notes, that they are the sole representative of 'Bengaliness'. The author is quite impartial in admitting the failures and achievements on both sides of the divide. There are also very good discussions on art, architecture and literature and the various influences that shaped them. The masses are also not left out and sustained comparisons with the more privileged strata are drawn. Bengal's position as a frontier province seems to have shaped much of its culture, with it adopting a more indigenized form of Aryan culture, the flourishing of Buddhist culture with its challenges to Brahmanism, indigenized Sufi Islam instead of a more orthodox Sunni Islam, leading to the development of a truly syncretic tradition. The emphasis was more on local peculiarities instead of orthodoxy, as evidenced for instance in the patronage a lot of rulers extended to the Bengali language and Prakrit instead of the more orthodox Sanskrit and Arabic.
It is truly a lovely book, worth buying in the hardcover edition and delving into repeatedly. For a holistic overview of Bengali culture in English, it is sans pareil.
Many reviewers are telling that references not given, which is true. But, I never felt that wihout these reference the book lost its value! The presentation of the content is excellent. The content never looked biased and straight to the point. Moreover, readers will never lose interest to read further at any point. A complete overview can be outlined from the book, very valuable. The Bengalis must read this book.
বিশাল বই বিধায় একবসায় শেষ করা হয় নাই, সময় নিয়েই পড়েছি। এক মলাটে এতো কম্প্রিহেন্সিভ বই বাংলার ইতিহাস সাহিত্য নিয়ে খুব বেশি মনেহয় নেই। এতোগুলো টপিক, এতো ভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে একবইতে লেখার এমনিতেই দুঃসাধ্য, তবুও কোনো সময় বিরক্ত বোধ করিনাই। সুযোগ হলে আবার শুরু থেকে পড়বো।
One of the most comprehensive books that tracks the rise of Bengal, on both sides of the border, into a distinct identity. Author has an unbiased outlook befitting a scholar. Given the vast canvas that the author has chosen, completing the book within a reasonable timeframe is a challenge.
বেশ ভাল এক বই। এক মলাটে এত সুন্দর সবিস্তারে বাংলার ইতিহাস বর্ণনা করেছে এমন দ্বিতীয় কোন বই মাথায় আসছে না। বইটি বেশ সুখপাঠ্য। content, writing সবকিছুর মান দেশীয় অধিকাংশ বইয়ের চেয়ে ভাল।
An excellent comprehensive book on Bangla history, old & contemporary literature, language, arts, & music. It was & is a reading pleasure because of the author's genius! I have used it as a reference book.