যে সীমাহীন ত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা এসেছিল,তা মানুষের মনে কী স্বপ্ন জন্ম দিয়েছিল, বাস্তবে তাঁরা কী পেলেন, এবং কোন আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ নির্মিত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কোন পথে গেল সেই বাংলাদেশ- সে সম্পর্কে নিরপেক্ষ ইতিহাস দুর্লভ। এ বইতে লেখক মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপরের বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি সঠিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
Ghulam Murshid (Bengali: গোলাম মুরশিদ) is a Bangladeshi author, scholar and journalist, based in London, England.
জন্ম ১৯৪০, বরিশালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. এ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। পি এইচ ডি— ঐতিহাসিক ডেইভিড কফের তত্ত্বাবধানে। গবেষণার বিষয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু সমাজ সংস্কার আন্দোলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দু দশক ধরে অধ্যাপনা । মাঝখানে দু বছর কেটেছে মেলবোর্নে, শিবনারায়ণ রায়ের তত্ত্বাবধানে, পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা কর্মে। ১৯৮৪ সাল থেকে লন্ডন-প্রবাসী। | বেতার-সাংবাদিকতা এবং শিক্ষকতার অবসরে প্রধানত আঠারো শতকের বাংলা গদ্য এবং মাইকেল-জীবন নিয়ে গবেষণা। প্রধান নেশা গবেষণার— অতীতকে আবিষ্কারের । বারোটি গ্রন্থ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত বিদ্যাসাগর বক্তৃতামালার ওপর ভিত্তি করে রচিত গ্রন্থ: রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা (১৯৮১)। পিএইচ ডি. অভিসন্দর্ভের ওপর ভিত্তি করে লেখা সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও বাংলা নাটক (১৯৮৫)। মহিলাদের নিয়ে লেখা Reluctant Debutante: Response of Bengali Women to Modernization (১৯৮৩) (বাংলা অনুবাদ: সংকোচের বিহ্বলতা [১৯৮৫]) এবং রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া : নারীপ্রগতির একশো বছর (১৯৯৩)। অন্য উল্লেখযোগ্য রচনা, কালান্তরে বাংলা গদ্য (১৯৯২), যখন পলাতক (১৯৯৩) এবং বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার আদি-পর্ব (১৯৮৬)। প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২)। আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বক্তৃতা দান (১৯৯১-৯২)। ছদ্মনাম হাসান মুরশিদ। এই নামে একটি উপন্যাসও লিখেছেন।
"তিরিশ লাখ লোকের জীবনহানি হয়েছিলো বলে যে দাবি করা হয়, তা কিংবদন্তী মাত্র।বাংলাদেশে ফিরে এসে শেখ মুজিব রেসকোর্সের ভাষণে তিরিশ লাখের কথা বলেছিলেন। তিনি হয়তো অনুমান করেই বলে থাকবেন। " পৃষ্ঠা ১৬৮
বঙ্গবন্ধু অনুমান করে তিরিশ লাখ শহীদের কথা বলেছেন তার বক্তব্যের স্বপক্ষে গোলাম মুরশিদ কোনো রেফারেন্স দেন নি। তিনি অনুমান করেছেন বঙ্গবন্ধু অনুমান করে বক্তব্য দিয়েছেন।এরপর গোলাম সাহেব কোনো কথা নাই, বার্তা নাই হামুদুর রহমান কমিশন,নিয়াজী আর সিদ্দিক সালিককে কোট করে শহীদের সংখ্যা নিয়ে (!) যদিও তিনি তাদের বক্তব্যে সরাসরি সহমত পোষণ করেন নাই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে "অনুমান" ভিত্তিক যে তত্ত্ব গোলাম মুরশিদ দিলেন তার তো কোনো সমাধান করলেন না। এটা পুরোপুরি উদ্দেশ্যপ্রণেদিত বলেই মনে হয়।
বইয়ের নাম "মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর (একটি নির্দলীয় ইতিহাস) " ২৬৪ পৃষ্ঠার এ বইতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু ৯০ পৃষ্ঠার পর আর শেষ ১৬৮ পৃষ্ঠার দিকে। মুক্তিযুদ্ধ কে খাপছাড়াভাবে উপস্থাপনে গোলাম মুরশিদের তুলনা এক পাকিস্তানপন্থীদের সাথেই চলে। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রীক কোনো তথ্যই পুরোটা দেননি লেখক,দিয়েছেন আধাআধি। রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তিকমিটি আর ইসলামী ছাত্রসংঘের কীর্তিকলাপ অতিযত্নে এড়িয়ে যাবার প্রবণতা লক্ষণীয়। একেবারে বাধ্য হয়ে দু'এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন মাত্র।
স্বাধীনতাপরবর্তী উত্তাল সময়কে তিনি ব্যাখা করেছেন স্রেফ ম্যাসকারেনহার্সের বিতর্কিত বই "লিগেসী অফ ব্লাড " থেকে (কেন এ বই বিতর্কিত জানতে পড়ুন এম আর আখতার মুকুলের "মুজিবের রক্ত লাল ")।বঙ্গবন্ধু শাসনামলের সকল দোষ বঙ্গবন্ধুর এমন সাধারণীকেন্দ্রীক তথ্যকে হালাল করার চেষ্টা করেছেন আপ্রাণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, সেসময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার দায়ভার কী শুধু বঙ্গবন্ধুর? শাসক হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই দায়মুক্তি পাবেন না কিছু বিষয়ে। কিন্তু গোলাম মুরশিদ জাসদের গণবাহিনী, সর্বহারা পার্টি আর সেনাবাহিনীর মধ্যকার চক্রান্তগুলোকে এতো হালকাভাবে উপস্থাপন করেছেন যে তা লেখকের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আর বঙ্গবন্ধু মৃত্যুপরবর্তী বাংলাদেশকে অনেকটা তাড়াহুড়া করে শেষ করেছেন গোলাম মুরশিদ ।
এই হচ্ছে গোলাম সাহেব কর্তৃক নির্দলীয় ইতিহাসকথন। দেশের কোনো এক শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস শেখানোর জন্য এটি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে(!)বুঝুন অবস্থা।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের যাদের ‘ইতিহাস’ জানার ইচ্ছা, দুঃখজনকভাবে এই বইটি থেকে তারা ইতিহাসের একরকম একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট বচন ছাড়া অন্যকিছু জানতে পারবেন না।
কেন একপেশে? বা পক্ষপাতদুষ্ট? কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। এই বইতে পলাশীর যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে প্রসঙ্গত, কিন্তু সেখানে মীর জাফর আর মীর কাশিমদের নাম অনুপস্থিত! বিশাল পরিসরে মুক্তিযুদ্ধের ‘ইতিহাস’ রচনা করা হয়েছে এই বইতে যার কোথাও গোলাম আযম, খাজা খয়ের উদ্দিনের নাম গন্ধও নেই! অবশ্য গোলাম আযমবিহীন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নির্দলীয় বলাই যায় এবং সেইহেতুই বোধকরি বইটির নাম!
এই বইটি লিখতে গোলাম মুরশিদ সবচেয়ে বেশি তথ্য সাহায্য নিয়েছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসারদের লিখিত বিভিন্ন বই থেকে (সবচেয়ে বেশি ৪৬ বার তিনি উদ্ধৃত করেছেন সিদ্দিক সালিককে)। প্রসঙ্গত, দ্বিতীয় স্থানে আছেন রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, তাঁর বই থেকে তথ্য নিয়েছেন মাত্র ১৭ বার। আবার, তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থানও দখল করেছেন পাকসেনারাই! নিয়াজী এবং রাও ফরমান আলীর বই থেকে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য নিয়েছেন ১২ বার করে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা অসংখ্য বই এবং গবেষণাকে তার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি, বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের মিথ্যাচারকে। বোধহয় একারণেই পাকি সেনার স্তুতগীত গেয়েছেন, “সিদ্দিক সালিক সেনাবাহিনীর সদস্য হলেও তাঁর খানিকটা ইতিহাস বোধ ছিলো এবং কোথাও কোথাও বেশ নিরপেক্ষ বিবরণ দিয়েছেন”।
যথারীতি তিনিও প্রশ্ন তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে। তিনি লিখেছেন “তবে মনে হয়, তিরিশ লাখ লোকের জীবনহানি হয়েছিলো বলে যে দাবি করা হয়, তা কিংবদন্তী মাত্র। বাংলাদেশে ফিরে এসে শেখ মুজিব রেসকোর্সের ভাষণে তিরিশ লাখের কথা বলেছিলেন। তিনি অনুমান করেই বলে থাকবেন”। তারপরই লিখেছেন, “রুডলফ রামেলের অনুমান পাকিস্তান দশ লাখের চেয়েও বেশি লোককে হত্যা করেছিলো (আর.জে. রামেল, ১৯৯৬)। যদি তিরিশ লাখ অথবা দশ লাখের বেশির অনুমানে অতিরঞ্জনও থাকে, তা হলে অন্তত তিন/চার লাখ লোক যে নিহত হয়েছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ করার কারণ নেই”। অত্যাশ্চার্য ব্যাপারটা হল, বঙ্গবন্ধু আর রামেলের তথ্যকে অনুমান বলে উড়িয়ে দিয়ে ‘তিন চার লাখের’ হিসাব দিলেও এই তথ্য তিনি কোথায় পেয়েছেন তা উল্লেখ করেননি। অথচ কি নির্বিবাদে লিখে গেলেন তাঁর এই অনুমানের কথা।
গবেষক সাহেব আরও লিখেছেন, “শরণার্থী শিবিরে যে উদ্বাস্তুরা আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যেও যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহের অভাব দেখা গিয়েছিলো। কারণ, তাঁরা বেশির ভাগই গিয়েছিলেন সপরিবারে। দেশে ফেরার আগ্রহ তাদেঁর ছিলো তুলনামূলকভাবে কম”। আচ্ছা, বেশ কৌতুহল জাগানিয়া তো। কিন্তু এই তথ্যের উৎস? তাঁর মস্তিষ্ক প্রসূত! তিনি কলকাতায় সরকার ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মুজিব বাহিনীর নানাবিধ ষড়যন্ত্রের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন, কিন্তু অজ্ঞাত (নাকি নির্দলীয়!) কারণে গোলাম আযমদের ষড়যন্ত্র নিয়ে তিনি টু শব্দটি করেন না।
এই হলো প্রথমা এবং গোলাম মুরশিদ প্রণীত মুক্তিযুদ্ধের নির্দলীয় ইতিহাস! অনেক ‘গবেষণা’ করে লেখা এই ইতিহাসগ্রন্থ কোনোভাবেই ইতিহাস গ্রন্থ না, স্রেফ গোলাম মুরশিদের ব্যক্তিগত বয়ান, তারও বেশিরভাগটা তথ্য তিনি নিয়েছেন পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের কাছ থেকে।
(ব্লগার সৈয়দ নজরুল ইসলাম এর লেখা পরিমার্জন করে উপর্যুক্ত রিভিউটি লেখা হয়েছে)
গোলাম মুরশিদ যেদিন মারা গেলেন সেদিন তাঁর মৃত্যু নিয়ে এই জাতির শোক প্রকাশের চাইতেও আরো বড় দুর্যোগ দাঁড়িয়েছিল এসে দরজায়। বিস্তীর্ণ অংশ জলমগ্ন, সেদিকে ধ্যান দিতে গিয়ে তাঁর অগস্ত্য যাত্রা হলো নীরবে। এইভাবেই আকবর আলি খানও চলে গিয়েছিলেন নিভৃতে, তাঁর মৃত্যুর শোক চাপা পড়ে গিয়েছিল ব্রিটেনের রানীর মৃত্যুতে! আমি বেশ কিছুদিন ধরেই এই বইটি টুকটুক করে পড়ছিলাম৷ যদিও এটাকে নির্দলীয় ইতিহাস নাম দেয়া হয়েছে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর মূল আলোচনায় কিন্তু জাসদ এবং অন্যান্য দলগুলো তেমন করে আসেনি। বরং আওয়ামী আর পরবর্তীতে বিএনপিই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি৷ বরং আরো বলা ভালো মুজিব এবং জিয়া এই বইয়ের অনেকগুলো পৃষ্ঠা দখল করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপরের মোটামুটি দশ বছরের ইতিহাস নিয়ে একটা র্যাপিড রিডিং কেউ যদি করতে চান, মোটামুটি বস্তুনিষ্ঠ, তবে পাঠতালিকায় বইটিকে ওঠানো যেতে পারে। গোলাম মুরশিদ যথেষ্ট রেফারেন্স দিয়েই বইটি লিখেছেন। আমি ওইসময়ের সাথে বর্তমানের বেশ মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন ছোট আকারে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখছি। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা যার জন্য কিছু মুক্তিযোদ্ধা থেকে জাসদ পর্যন্ত অনেকেই দায়ী, পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর নীতিগত ভুল ইত্যাদির সাথে এই কিছুদিন আগের ঘটে যাওয়া আন্দোলন এবং এখনকার অবস্থার অনেকটাই মেলানো যায়। বড় বিপ্লবের পর দেশে নৈরাজ্যও দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়। পাশাপাশি শাসকের ভাগ্যদোষও অনেক সময় জাতির দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবার ঐতিহাসিক পালাবদলের পর দেশ একবার ভারত বলয়ে যায়, তো আরেকবার যায় মার্কিন-চীন বলয়ে। ছোট, দারিদ্র্যপীড়িত একটা দেশ হওয়ার আসলে জ্বালা অনেক।
লেখকের মতে যেসব মুক্তিযোদ্ধাগণ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই লিখেছেন তার বেশিরভাগেই নিজেদের কৃতিত্বকে বড় করে দেখিয়েছেন, ভারতীয় জেনারেলদের অধিকাংশই একই দোষে দুষ্ট, অন্যদিকে পাকিস্তানিরা তো করেছে নির্লজ্জ মিথ্যাচার। অথচ সম্পূর্ণ গ্রন্থে দেখা গেল লেখক পাকিস্তানি জেনারেল এর বয়ানকেই সবচেয়ে উল্লেখ করেছেন। "ইতিহাস রচিত হয় বিজয়ীর হাতে"-একারণেই এই পন্থা অবলম্বন করেছেন কি না তা লেখকই বলতে পারবে।
লেখকের দাবি এই গ্রন্থ নির্দলীয়(!), তবে এই গ্রন্থ যে নির্মোহ বা নিরপেক্ষ নয় তা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি। নির্দলীয় ঢং দেয়ার অভিলাষেই হয়তো তিনি গোলাম আজমের নাম এক বারও নেননি। এমনই নির্দলীয় ইতিহাসের বই এটি।
ইতিহাস রচনা না বলে মনোকল্পিত আখ্যান বলাটাও ভুল হবে না। কারণ কোন তথ্যসূত্র ব্যতিরেকেই অসংখ্য স্থানে তিনি উপসংহার টেনেছেন "মনে হয়...", "সম্ভবত....", "হয়তো...." ইত্যাদি শব্দচয়নের মাধ্যমে। তাইতো তিনি বঙ্গবন্ধুর দাবি করা ত্রিশ লাখ বা রোমেলের দাবি করা দশ লাখ শহীদের কথাকে অতিরঞ্জিত দাবি করে দাবি করেন শহীদের সংখ্যা "তিন-চার লাখ হতে পারে", এবং এই তথ্য উনি কোথা থেকে নিয়ে আসলেন এরও কোনও সূত্র নেই।
বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল যেভাবে তুলে ধরেছেন তাও মর্মান্তিক।
তাই দুই তারার বেশি দিতে পারছি না। আর কেউ যদি সবধরণের আলোচনা ভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের পর্যালোচনা মূলক ইতিহাস পাঠ করতে চান তবে বিনয় মিত্রের লেখা "মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস: সত্য, অসত্য ও অর্ধসত্য" গ্রন্থটি পড়তে অনুরোধ করব।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা । আমাদের জাতীয়তাবাদ,স্বদেশ প্রেম, মা মাতৃভূমি, বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি চূড়ান্ত অর্জিত হয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।
যে সকল তথ্য সমৃদ্ধ গ্রন্থ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সম্যহ ধারণা দেই তার মধ্যে "মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর:একটি নিদলীয় ইতিহাস" প্রথম সারির বই।
বইটির প্রথম দিকে ৪৭ এর পূর্ববর্তী সময়কার অর্থাৎ ইংরেজদের শাসনামলে বঙ্গীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় ইতিহাসটি খুবই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। ৪৭ এর পরবর্তী সময় পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব বাংলার সাধারণ জনগণের উপর পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবকে তিনি ফুটিয়ে তুলেন। তাছাড়া ৪৮ থেকে ৫২ ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট, ১৯৬২ শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬ ছয় দফা ১৯৬৮ এর সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর সাধারণ নির্বাচন এবং একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তি অর্থাৎ বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় ঘঠনা প্রবাহ বর্ণনা করে। এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়কার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড এবং পরবর্তীতে তিন তিনটি অভ্যুত্থান এবং এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ ইত্যাদি বিষয় ফুটে উঠেছে।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বইটিতে বিভিন্ন তথ্য এলোমেলো মনে হয়েছে যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের পরিবর্তে তিনি মনে করতেন ৪-৫ পাঁচ লাখ শহীদ হয়েছিলেন তাছাড়া বইটিতে পাকিস্তানি বিভিন্ন লেখকের বই থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে এবং ৭৫ এর গঠনা প্রবাহ এন্থনি মাসকেরেনহাঁস এর বই বাংলাদেশ রক্তের ঋণ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। পরিশেষে বলা যেতে পারে বইটি কি আদৌ নির্দলীয় তার সচেতন পাঠকই বুঝতে পারবেন?
লেখকের নিজস্ব মতামত এই বইয়ে প্রাধান্য পেয়েছে, কোন প্রামাণ্য দলিল নয়। অনেকক্ষেত্রেই উনি শিশুসুলভ ভুল যুক্তি/নিজস্ব মন্তব্য তুলে ধরেছেন। শুধু একটা উদাহরণই দেব- উনি লিখেছেন যে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নাকি কিংবদন্তী ছাড়া আর কিছু নয়, রামেলের এক বইয়ে লেখা ১০ লাখ শহীদ হতে পারে, পাকিস্তানের গঠন করা এক কমিশনের মতে মাত্র চল্লিশ হাজার নাকি মারা গিয়েছিল, আর লেখকের মতে অন্তত তিন চার লাখ মারা গিয়েছেন, উনি এই তিন চার লাখের হিসাব কেমনে পেলেন প্রশ্ন রাখলাম, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ না করে সেসময় কলকাতায় আনন্দবাজারের চাকুরি করার সময় মনে হয় উনি শহীদের সংখ্যার ট্যাব রাখছিলেন আধ্যাত্মিক কোন ক্ষমতার সাহায্যে।
আর বইয়ের শিরোনাম বিভ্রান্তিকর, লেখক সবার দোষ খুঁজে পেলেও একশ্রেণীর কোন দোষ খুঁজে পাননি, সেটা বামপন্থিদের, এবং 'অদ্ভুতভাবে' তার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বামপন্থিদের দৃষ্টিভঙ্গিরও 'অদ্ভুত' মিল রয়েছে, তাই এই বইয়ের শিরোনাম 'একটি বামপন্থিয় ইতিহাস'হলেই বোধহয় যথার্থ হত।
বাংলায় মুসলমানদের আগমনের পর থেকে পঁচাত্তরের অস্থিতিশীল সময়ের এক আখ্যান এই বই। এ বইয়ের অসাধারণ হচ্ছে, যথাসম্ভব নির্দলীয় দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে ইতিহাসের চরিত্রগুলোকে বিশ্লেষণ। ভালো মানুষ সময়ের স্রোতে ইতিহাসের কাছে খারাপ হয়ে যায়, কখনো বা খারাপ মানুষ হয়ে যায় জনপ্রিয়, কাছের মানুষ। এ বই পড়তে গেলে বাংলাদেশের জন্মের কিছু অজানা নির্মম ইতিহাস পড়তে গেলে মন খারাপ যাবে। যাই হোক, যারা পড়েন নি তারা অসাধারণ একটা বই পড়া থেকে বঞ্চিত হবেন। সবাই বই পড়ার শুভেচ্ছা।
The whole picture of the history is not reflected. Nothing mentioned about Golam Azam, the head of the rajakars during the war of independence of Bangladesh. Reference of many facts are controversial.