হুতোম প্যাঁচার নকশা: ঊনবিংশ শতকের কলকাতার সামাজিক ব্যঙ্গচিত্র
বাংলা নবজাগরণের সময়কালে সাহিত্য-সংস্কৃতির এক বিশেষ ধারা গড়ে উঠেছিল, যার কেন্দ্র ছিল কলকাতা নগরী। ইংরেজ শাসনের প্রভাবে নগর-অভিজাত সমাজে একদিকে যেমন নতুন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়েছিল, অন্যদিকে জন্ম নিচ্ছিল অযথা আড়ম্বর, নকল-সংস্কৃতি ও সামাজিক দ্বিচারিতা। এই পরিপ্রেক্ষিতেই কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০–১৮৭০) তাঁর অমর রচনা হুতোম প্যাঁচার নকশা প্রকাশ করেন (১৮৬১)। এই গ্রন্থকে একদিকে বাংলা ব্যঙ্গসাহিত্যের প্রথম শক্তিশালী দলিল বলা যায়, অন্যদিকে এটি এক জীবন্ত সামাজিক নথি।
কালীপ্রসন্ন সিংহ ছিলেন জমিদার পরিবারের সন্তান, যাঁকে সমসাময়িকরা ‘প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সমপর্যায়ের’ ধনকুবের বলেই অভিহিত করতেন। কিন্তু বিলাসী জীবনে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতিতে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তাঁর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য অবদান হলো মহাকাব্য মহাভারত–এর পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদ (১৮৬০–৬৬), যা তিনি বিনামূল্যে বিতরণ করেছিলেন। এই অনুদান তাঁকে বাংলা সাহিত্যের চিরস্থায়ী বন্ধু করে রেখেছে। একই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত রসবোধ ও পর্যবেক্ষণশক্তি তাঁকে ব্যঙ্গরচনার পথে চালিত করে।
রচনার সাহিত্যিক প্রকৃতি
হুতোম প্যাঁচার নকশাকে উপন্যাস বলা যায় না; এটি আসলে এক ধরনের সামাজিক ব্যঙ��গচিত্র (satirical social sketch)। পাশ্চাত্যের সঙ্গে তুলনা করলে একে জনাথন সুইফটের The Battle of the Books (১৭০৪) কিংবা চার্লস ডিকেন্সের Sketches by Boz (১৮৩৬)-এর ধারায় ফেলা যায়। এখানে কাহিনি-নির্ভর গাঁথুনি নেই; বরং বিভিন্ন ঘটনার নকশা একত্র হয়ে গড়ে তুলেছে শহুরে জীবনচিত্র।
স্বতন্ত্র আবিষ্কার: চলিতভাষার ব্যবহার
কালীপ্রসন্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো চলিতভাষায় গদ্য রচনা। উনিশ শতকের পূর্বভাগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্তের সাধুভাষার গদ্য পাঠকের জন্য ছিল জটিল ও আড়ষ্ট। কালীপ্রসন্ন সেই শৃঙ্খল ভেঙে আনলেন রাস্তার ভাষা, লোকপ্রবচন, এমনকি স্ল্যাং। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বিদ্রূপ করে লিখেছেন—“আজকালকার বাবুরা সাহেবি কেতা করতে গিয়ে অদ্ভুত কাণ্ড করে—মাথায় টাক, গায়ে ধুতি, কিন্তু পকেটে ঘড়ি। ঘড়িটা আবার ছ’পয়সার।” (সিংহ, ১৮৬১, পৃ. ২২)। এই উদাহরণ কেবল রসাত্মক নয়; এতে বাবু-সংস্কৃতির ভণ্ডামির নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে। গ্রন্থটির প্রতিটি অংশে উনিশ শতকের কলকাতা ধরা পড়েছে স্পষ্টভাবে। নবাবুদের বাহার দেখানো, ইংরেজি শেখার ব্যর্থ প্রয়াস, নারীদের গৃহবন্দিত্ব, নিম্নবিত্তের দৈনন্দিন সংগ্রাম—সবকিছুই এখানে চিত্রিত। যেমন ইংরেজি শেখার প্রহসনে তিনি লিখছেন: “একজন বাবু সাহেবকে বলছেন—আই অ্যাম কামিং ফ্রম গঙ্গাজল টু সী-শোর।” (সিংহ, ১৮৬১, পৃ. ৪৭)। এর মধ্যে রয়েছে হাস্যরস, আবার একই সঙ্গে অন্ধ অনুকরণের করুণ চিত্র। এ কারণে এই রচনা কেবল সাহিত্য নয়, সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রেও প্রামাণ্য দলিল।
এই গ্রন্থের বিশেষ সৌন্দর্য হলো এর নিরপেক্ষতা। হুতোম প্যাঁচা কোনো নৈতিক বক্তা নয়; তিনি কেবল পর্যবেক্ষক। পাঠককে তিনি হাসান, কিন্তু বিচার করতে বাধ্য করেন না। বরং পাঠক নিজেই উপলব্ধি করেন সমাজের অন্ধকার দিক। এই পদ্ধতিতে রচনাটি দার্শনিক নিরপেক্ষতার একটি বিশেষ অবস্থান দখল করে। উনিশ শতকের বাংলা ব্যঙ্গসাহিত্য মূলত প্রহসনধর্মী ছিল। কিন্তু কালীপ্রসন্নের ব্যঙ্গ সূক্ষ্ম, বিদ্রূপাত্মক এবং বহুস্তরীয়। বাবুরা নিজেরাই নিজেদের কৌতুকের উৎস হয়ে ওঠেন। এভাবে তিনি এমন এক বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরস গড়ে তুলেছিলেন যা আধুনিক বিদ্রূপসাহিত্যের সঙ্গে তুলনীয়। আজও যখন আমরা তাঁর বাবু-সংস্কৃতির নকলচর্চা পড়ি, তখন কেবল উনিশ শতকের কলকাতা নয়, আমাদের সমকালীন সমাজের প্রতিচ্ছবিও দেখতে পাই।
হুতোম প্যাঁচার নকশা কেবল একটি হাস্যরসাত্মক গ্রন্থ নয়; এটি একাধারে ইতিহাস, সমাজচিত্র ও সাহিত্যিক বিপ্লব। কালীপ্রসন্ন সিংহ ভাষাকে সাধারণ মানুষের মুখে ফিরিয়ে দিয়ে, ব্যঙ্গের মাধ্যমে সমাজকে আয়নায় দেখিয়ে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারা সূচনা করেছিলেন। তাঁর এই কাজকে বাংলা ব্যঙ্গসাহিত্যের অগ্রদূত বলা যায়, আর তাঁর রসাত্মকতা আজও পাঠককে নতুনভাবে ভাবায়।
রেফারেন্সঃ
১। সিংহ, কালীপ্রসন্ন। হুতোম প্যাঁচার নকশা। কলকাতা: ১৮৬১।
২। মজুমদার, আশুতোষ। বাংলা গদ্যের ইতিহাস। কলকাতা: সংস্কৃতি প্রকাশনী, ১৯৫৮।
৩। চৌধুরী, নীহাররঞ্জন। বঙ্গভাষার ইতিবৃত্ত। কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৯৮৫।
৪। Ray, Niharranjan. Bangalir Itihas: Adi Parba. Kolkata: Dey’s Publishing, 1979.