মেয়েরা নিজের শরীর সম্পর্কে প্রথমে কিছুই জানে না, যেদিন জানতে পারে সেদিনই দেবীত্ব বিসর্জন দিয়ে শুধু মেয়ে হয়ে যায় । মেয়ে তো অনেক দেখা হল, এবার কিছুদিন দৈব সংসর্গে আত্মাকে শুদ্ধ করে নেওয়া যাক । (আত্মপ্রকাশ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)
বই: আত্মপ্রকাশ
ঘরানা(Genre): আত্মজৈবনিক(?) উপন্যাস
লেখক: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
প্রচ্ছদ: সুবোধ দাশগুপ্ত
প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড
প্রকাশকাল: নভেম্বর ১৯৬৬
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৪০
মলাট মূল্য: ১০০ টাকা
ব্যক্তিগত রেটিং: ৩.২৫/৫
গুডরিডস রেটিং: ৩.৮৬ (৭৮ টি রেটিং)
কাহিনি সংক্ষেপ: উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম সুনীল । শৈশবেই সে পরিবারের সাথে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুরে চলে আসে । তারপর সেখানেই কাটে তার শৈশব, কৈশোর । কলেজে অধ্যয়নকালীন অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের সাথে মনোমালিন্যের জের ধরে কলকাতা চলে আসে সে । এইসবই আমরা জানতে পারি উপন্যাসের কথক ‘আমি’র স্মৃতিচারণ থেকে । পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতেই পারছেন, চরিত্রের একটি নাম থাকলেও, এটি মূলত উত্তম পুরুষে তথা কেন্দ্রীয় চরিত্রের বয়ানে লেখা একটি উপন্যাস । ‘আত্মপ্রকাশ’ পূর্ববাংলার এক ‘রিফিউজি ছোড়া’র কলকাতা শহরকে চিনে নেওয়ার উপন্যাস । ‘আত্মপ্রকাশ’ কলকাতা শহরের বুকে কয়েকজন ছন্নছাড়া যুবকের প্রতিনিয়ত সমাজে প্রচলিত প্রথা ভাঙার উপন্যাস । ‘আত্মপ্রকাশ’ ব্যক্তি সুনীলের আত্মপ্রকাশের আখ্যান ।
উপন্যাস নিয়ে লেখকের কিছু উক্তি:
১. ‘…এরকম সাবলীল ও যথেচ্ছভাবে অনেকখানি লেখার পর হঠাৎ আমার মনে হল, এ যা লিখে যাচ্ছি, গল্পের মাথামুণ্ড নেই, এ কী সত্যি পাঠযোগ্য? নাকি নিতান্তই ভাবালুতা? অথবা সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায় গর্বস্রাব? পাঠকরা যদি বলেন, এ সব এলোমেলো গদ্যপ্রবাহের কী মানে হয়?’ (অর্ধেক জীবন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পৃষ্ঠাঃ ২৯০)
২. ‘…জোর করে ঢুকিয়ে দিলাম একটা উপকাহিনি । পূর্ববঙ্গের এক অভিনেত্রীর ঘটনাটি অন্যের মুখে শোনা, আমার নিজের অভিজ্ঞতার নির্যাস নয় বলেই বেশ কৃত্তিম, এবং আত্মপ্রকাশ উপন্যাসের সেই অংশটিই সবচেয়ে দুর্বল । (অ. জী., পৃষ্ঠাঃ ২৯০-২৯১)
৩. ‘ ‘দেশ’ শারদীয় সংখ্যা প্রকাশের সময় আমি লজ্জায় ও আতঙ্কে কিছুদিন লুকিয়েছিলাম কলকাতার বাইরে । উপন্যাসটির জন্য নিন্দা ও প্রশংসা দুইই জুটেছিল তবে, নিন্দা, বিরূপ সমালোচনা, এবং কটুক্তিই বেশি । (অ. জী., পৃষ্ঠাঃ ২৯১)
পাঠ প্রতিক্রিয়া: ‘আত্মপ্রকাশ’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর প্রথম উপন্যাস । ‘দেশ’ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক সাগরময় ঘোষের অনুরোধে (কিংবা আদেশে) তিনি এই উপন্যাস রচনা করেছিলেন ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর লেখনী নিঃসন্দেহে চমৎকার; কিন্তু একটা উপন্যাসের প্রাণ এর কাহিনি । কাহিনি বা প্লট ভালো না হলে শুধু লেখনী দিয়ে সেই উপন্যাস বেশিক্ষণ পাঠককে মুগ্ধ করে রাখতে পারে না । এই উপন্যাসটিতে সেই অর্থে বাধাধরা কোনো কাহিনিই নেই । বরং লেখকের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতাগুলোই ছন্নছাড়াভাবে ফুটে উঠেছে সমগ্র উপন্যাসজুড়ে । আরও এসেছে প্রধান চরিত্র সুনীলের নিজের জীবন নিয়ে ভেতরকার দ্বৈরথ ও দ্বন্দ্বের কথা । আর যুক্ত হয়েছে পূর্ববঙ্গের এক নায়িকার গল্প ।
উপন্যাসটার প্রায় পুরোটা জুড়েই প্রধান চরিত্র সুনীল ছাড়া ছাড়া ভাবে তার অতীত, বর্তমানের কথা বলে যায় । উপরিউক্ত ‘উপন্যাস নিয়ে লেখকের কিছু উক্তি’ পড়লেই বোঝা যায়, লেখক নিজেই এই উপন্যাস নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান ছিলেন । লেখক তার লেখা নিয়ে নিজেই সংশয়ে থাকলে সেই লেখা ভালো হবে না, এটা মোটামুটিভাবে প্রথাসিদ্ধ । এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি; উপন্যাসটা খুব একটা ভালো হয়নি । উপন্যাসের তিনটা প্রধান নারী চরিত্র যমুনা, সরস্বতী আর মনীষা । এই চরিত্রগুলোও সেই অর্থে কোনো পূর্ণতা পায়নি । বরং এসে এসেই কেমন চলে গেছে । উপন্যাসের ‘সুনীল’ এদের যতটুকু দেখেছে, ততটুকুই এসেছে । এই কারণে যমুনা হয়ে উঠেছে ‘দেবী’, মনীষা ‘ছলনাময়ী’, আর সরস্বতী চরিত্রটিকে যে লেখক ঠিক কি বিশেষণ দেবেন, তা তিনি নিজেই বুঝে উঠতে পারেননি । অনেকেই বলবেন, উত্তম পুরুষে লেখা উপন্যাসগুলো তো এমনই হয়; কথক যেভাবে চরিত্রকে দেখেন, যতটুকু দেখেন ততটুকুই ফুটে ওঠে । আমি বিনীতভাবে এই ধারণার সাথে দ্বিমত পোষণ করি । উত্তম পুরুষে লেখা উপন্যাসে অপ্রধান চরিত্রগুলোর ভেতরকার কথাও লেখক তার কলমের আঁচড়ে বের করে আনতে পারেন, যদি তার লেখনীতে যথেষ্ট মুনশিয়ানা থাকে । কিংবদন্তী লেখক হুমায়ূন আহমেদ এর প্রথম তিনটি উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, আর ‘অচিনপুর’ই এর প্রমাণ । কিন্তু আত্মপ্রকাশে লেখক এই জায়গাটিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, কিংবা তিনি সেই চেষ্টা করতেই চাননি ।
কাহিনিতে যুক্ত বীণা��� বোন নূরজাহান বেগম এর উপকাহিনিও আমি ঠিক বুঝলাম না । হুট করে তাকে আনাই বা হলো কেন, আবার হুট করে এই নূরজাহান বেগমের ছেলের জের ধরেই কাহিনি কেন শেষ করে দেওয়া হলো-পুরো বিষয়টাই আমার কাছে অস্পষ্ট এবং ধোঁয়াটে লেগেছে ।
সবমিলিয়ে বলতে হয়, লেখক এই উপন্যাসটি যেন লিখতে হবে বলেই লিখেছেন । প্রকাশকের অনুরোধে ঢেঁকি গেলায় এটা ‘কাহিনি’ হয়েছে বটে, তবে উপন্যাস কতটুকু হয়েছে, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে । আর মূলত এই কারণেই, না এই উপন্যাস হয়েছে ‘জীবনধর্মী’, না হয়েছে ‘সমকালীন’ । আবার ‘আত্মজৈবনিক’ও ঠিক বলা যায় না । কারণ লেখক নিজেই লিখেছেন, ‘...কিন্তু সুনীল নাম নাম দিয়ে আমি বোঝাতে চেয়েছি যে এটা আমার জীবনের ঘটনা । কিন্তু আত্মজীবনী নয় ।’(তথ্যসূত্র: অ. জী. পৃঃ ২৯০ ।)
তাই বলব, কেউ এই উপন্যাসটি পড়া শুরু করলে, শুধু পড়ার জন্যই পড়বেন । কিছু আশা করে বা লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলে বিশাল প্রত্যাশা নিয়ে পড়তে বসা মনে হয় ঠিক হবে না ।