আমার ম্যারমেরে ঘুমকাতুরে কলেজ জীবনের প্রথম মরম ছিল ইলিয়াস। বাংলা বইয়ে সর্বপ্রথম “রেইনকোট" পড়ে ব্যাকবেঞ্চে লেগে থাকা ঝিমুনি রোগের ব্যাকডোর দিয়ে পলায়ন। তারপর একরাশ রুদ্ধশ্বাস চেপে রেখে টিফিন পিরিয়ডের অবসরে কলেজ লাইব্রেরির দিকে ছুট। এক উদভ্রান্ত উটপাখির মতো আমাকে ছুটে আসতে দেখে সুশীল পাঠাগার পাঠকেরা বেআক্কেল হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। আমার সেদিকে খেয়াল নেই। ইলিয়াস আমাকে পাগল বানিয়ে দিয়েছে ততক্ষণে। তৎক্ষণাৎ “চিলেকোঠার সেপাই” বগলদাবা করে আমি ফের ক্লাসে ফেরা। তারপর এক সপ্তাহের ঘোর! ক্লাসে, বাসে, ঘরে, খাটে, মাঠে কোথায় পড়ি নি এই বই? পুরান ঢাকা, গণঅভ্যুত্থান, ওসমান, হাড্ডি খিজির, আনোয়ার সবকিছু আমার ভেতরে সেঁদিয়ে গেছে বলতে গেলে, আমি পুরো বেদখল হয়ে গিয়েছি। আমিও ঠিক করে ফেলেছি এই বই আমি আর বেদখল হতে দেব না, কলেজের সম্পত্তি হোক, যাই হোক, আমার জিম্মায় থাকবে চিলেকোঠার সেপাই। এরপর মন আনচান, ইলিয়াস সাহেবের বাকি বইগুলোও পড়ে ফেলতে হবে। অথচ পকেটে ফুটো কড়ি নেই। তার উপর ক্লাস, কোচিং, পরীক্ষা এটা সেটা কত কী! নেই সময়ও। তবুও রোজ টিফিনে সময় করে কলেজ লাইব্রেরিতে উঁকিঝুকি মারি। ইলিয়াসের গল্পসমগ্র থেকে বেঁছে বেঁছে ছোট ছোট গল্পগুলো পড়ি। ইলিয়াসের ছোটগল্প নামে ছোটগল্প হলেই কী আর ছোট? সেসব ব্যপ্তিতে যেমন বড়, ঠিক তেমনই গাম্ভীর্যে। টিফিনের স্বল্প বিরতিতে গল্পগুলো পড়ে ফেলতে সময়ের সাথে রেস লাগাতে হয়। আর কী চমৎকার চমৎকার সব গল্প! নিরুদ্দেশ যাত্রা, উৎসব, পিতৃবিয়োগ, দুধে-ভাতে উৎপাত। আমি পড়ি আর রোমাঞ্চিত হই, বাকরুদ্ধ হই, শ্বাসরুদ্ধ হই, পড়ি আর ভাবি ফকিন্নি কলেজটা এসি লাগায় না কেন? ওদিকে লাইব্রেরিয়ান বেটা ততদিনে আমাকে চিনে ফেলেছে। নাকের ডগায় রাখা চশমার উপর দিয়ে আমার নিঃশব্দ আসা-যাওয়াতে সে তীব্র শঙ্কাজনক দৃষ্টি হানছে। অবশ্যম্ভাবী সম্ভাবনা একদিন সঠিক হল, একদিন বেটা আমার পথ আটকালো, জানতে চাইলো আমার ধার করা “চিলেকোঠার সেপাই” এর বিষয় আশয়। সেটা কী সহীহ সালামতে আছে? ভালো আছে? সুস্থ আছে? এবং সেটা কী আমি এই জন্মে ফিরিয়ে দেওয়ার আগ্রহ পোষণ করছি? অবশ্যই! হে হে! এই সপ্তাহেই দেব। পরের সপ্তাহেই দিচ্ছি। তারপরের সপ্তাহের পরের সপ্তাহেও দেওয়া হয় না আমার। তারও কতিপয় সপ্তাহ পর লক্ষ করি লাইব্রেরিতে ফিরে যাওয়ার সাহসটাই দেখি আমার মারা গেছে। আমার খাবলা খাবলা ইলিয়াসের গল্পপাঠ এক খাবলা মাংস উপড়ে নেওয়া বেদনার মতো অস্ফুট ও অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। আমি শালা এত ভীতু কেন? ভাবি আমি। আবার আমিই উত্তর করি, ভীতু তো ইলিয়াসের গল্পের চরিত্ররাও। কোথায় ভীতু? ঐ যে “রেইনকোট” এর নুরুল হুদা! আস্ত ভীতু এক কেমিস্ট্রির প্রফেসর, থুক্কু লেকচারার। তারপর ধর গিয়ে “প্রেমের গপ্পো” গল্পের জাহাঙ্গীর। এই লোককে চাপাবাজ বলা যায়, আবার ভীতুও বলা যায়, কারণ চাপাবাজরা ভীতু হয়। তারপর “জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল” গল্পের লালমিয়া তো বিশুদ্ধ ভীতুর তালিকায় পড়ে। এই তিন গল্পে দেখা যায় তিন রকমের ভীতুকে। একজন কপটচারী, একজন হঠকারী, আরেকজন স্রেফ ভীতির চক্রবুহ্যে আটকে পড়া মানুষ। তাই বোঝা যায়, ভীতু মানুষ বিভিন্ন রূপে ধরা দেয় ইলিয়াসের গল্পে। তারা বার বার খাবি খায় বর্তমান আর অতীতে। “প্রেমের গপ্পো” আর “জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল” গল্প দুটির বর্ণনায় অতীত ও বর্তমান মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। অতীত বর্তমানকে ছাপিয়ে যায় কখনও কখনও। অতীতের স্মৃতিসমূহকে ইলিয়াস ব্যবহার করেন বর্তমানের অন্দরে ঢোকার চাবির মতো। প্রতিটা চরিত্রের আদ্যপান্ত আমরা তাই কীভাবে যেন জেনে যাই অতটা না জেনেও। ভীতু চরিত্র ছাড়াও আছে ধর্মের বর্মধারী লোকজন। এদের মধ্যে পড়ে “জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল” গল্পের লালমিয়া, নাজির আলী, “কান্না” গল্পের আফাজ আলী, “রেইনকোট” গল্পের প্রিন্সিপাল। “কান্না” গল্পটার প্রতিক্রিয়া আসলে ব্যক্ত করার ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। ইলিয়াসের ট্রেডমার্ক হল মিলমিশ। আগে দেখেছি অতীত বর্তমানের মিলমিশ। “কান্না” গল্পের পরিসমাপ্তিতে আমরা দেখি সমান্তরাল ভাবে চলা দুটো তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার মিলমিশ। এই গল্পটা আমার অসম্ভব প্রিয়। তবে তার চেয়ে বেশি প্রিয় “ফোড়া”। এই গল্পটা কেন আমার সবচেয়ে প্রিয় তার সঠিক কারণ আমি ঠিক খুঁজে পাই না। কারণ কী এই গল্পে একটা মার্কামারা ভীতুর অভাব? নাকি ইলিয়াসের ট্রেডমার্ক মিলমিশ টেকনিকের লাগামটা খানিক আটকে রাখা? নাকি এর আন্ডাররেটেড তকমা? আসলে একজন পাঠকের ভেতর পর্যন্ত ছুঁয়ে যাওয়ার পাথওয়ে কিছু কিছু গল্প শুধুমাত্র এর গল্পের জোরেই খুঁজে পায়। “ফোড়া” গল্পটা আমার পড়া ইলিয়াসের সবচেয়ে ইন্টারেক্টিং গল্পের একটা। হয়তো এই ইন্টারেকশনটাই ভালো লাগার কারণ।
প্রথমে ভেবেছিলাম, ইলিয়াসের সাথে আমার পরিচয়ের গল্পটা সংক্ষেপে খানিক বলব, তারপর কিছু বলব এই বইটা নিয়ে। এত দীর্ঘ হয়ে যাবে ভাবি নি। কেউ সম্পূর্ণটা পড়ে থাকলে ধন্যবাদ।
পুনশ্চঃ সেই চিলেকোঠার সেপাই আজও আমার দখলে আছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে গেলে এবার আমি সেটা ফিরিয়ে দিয়ে আসব। কসম!