হৃদয়ের এ কূল, ও কূল, দু কূল ভেসে যায়, হায় সজনি,
উথলে নয়নবারি।
যে দিকে চেয়ে দেখি ওগো সখী,
কিছু আর চিনিতে না পারি॥
পরানে পড়িয়াছে টান,
ভরা নদীতে আসে বান,
আজিকে কী ঘোর তুফান সজনি গো,
বাঁধ আর বাঁধিতে নারি॥
রবি বাবুর এই উপন্যাসটি তাঁর সাহিত্যজীবনের শেষ পর্যায়ের রচনা এবং এটি তাঁর অন্যতম বিতর্কিত ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসমৃদ্ধ উপন্যাস। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৪ সালে, যখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন উত্তাল ছিল। এই প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যিক রোমান্টিকতা ও দার্শনিক বোধকে একত্রিত করে এক অনন্য উপন্যাস রচনা করেন, যেখানে প্রেম, আদর্শবাদ, হিংসা ও বিপ্লবের দ্বন্দ্বময় সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্ররা হল অতীন, ইন্দ্রনীলা, শশাঙ্ক ও দিবাল। এটি মূলত স্বদেশপ্রেমী একদল তরুণ বিপ্লবীর জীবন ও তাদের রাজনৈতিক আদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। অতীন ও ইন্দ্রনীলার মধ্যকার প্রেম এই উপন্যাসের অন্যতম চালিকাশক্তি। অন্যদিকে, শশাঙ্ক ও দিবালের মতো চরিত্ররা বিপ্লবী দলের আদর্শ ও পথনির্দেশনা প্রদান করে। কিন্তু এই বিপ্লবের পদ্ধতি ও লক্ষ্য নিয়ে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়।
‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রেম ও রাজনীতির মধ্যকার টানাপোড়েন। ইন্দ্রনীলা একাধারে প্রেমময়ী নারী এবং আদর্শবাদী বিপ্লবী। তাঁর প্রেমের প্রতি একাগ্রতা ও দেশপ্রেমের প্রতি সমর্পণ উপন্যাসে এক জটিল দ্বৈততা সৃষ্টি করেছে। রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখিয়েছেন, কীভাবে রাজনৈতিক আদর্শ মানুষকে মানবিক আবেগ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, আবার বিপরীত দিক থেকে প্রেমও কখনো কখনো বিপ্লবী চেতনাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
উপন্যাসটি হিংস্র বিপ্লবের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। শশাঙ্কের মতো চরিত্ররা অস্ত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতা আনতে চায়, যেখানে অতীন মূলত আদর্শগত এক মানবতাবাদী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে, হিংসার মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা মানবতাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই প্রসঙ্গে ‘চার অধ্যায়’ গান্ধীবাদী অহিংস আন্দোলনের প্রতি রবীন্দ্রনাথের সমর্থনকেও ইঙ্গিত করে।
ইন্দ্রনীলা চরিত্রটি উপন্যাসে একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। তিনি শুধুমাত্র নায়িকা নন, বরং এক আত্মপ্রত্যয়ী নারী, যিনি নিজের পথ নিজেই খুঁজে নিতে চান। তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীর ভূমিকা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বরাবরের মতোই সচেতন ছিলেন, এবং এই উপন্যাসেও তিনি নারীর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
‘চার অধ্যায়’-এর ভাষা রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য উপন্যাসের তুলনায় সংক্ষিপ্ত ও সংহত। এটি কাব্যিক বর্ণনার চেয়ে সংলাপ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বেশি সমৃদ্ধ। তাঁর উপন্যাসে সাধারণত যে প্রশান্ত কাব্যময়তা দেখা যায়, এখানে তা অপেক্ষাকৃত কম; পরিবর্তে তীক্ষ্ণ সংলাপ ও নাটকীয় পরিস্থিতির মাধ্যমে পাঠককে ভাবনার মধ্যে নিমগ্ন করা হয়েছে।
উপন্যাসটির সমাপ্তি ট্র্যাজিক এবং এক অর্থে অনিবার্য। এতে রবীন্দ্রনাথ হিংসার অন্তঃসারশূন্যতা এবং মানবিক প্রেমের অবিনশ্বরতাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তবে অনেক সমালোচক মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ এখানে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সরলীকৃত করেছেন এবং তাঁর দার্শনিক ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাস্তব বিপ্লবের চিত্রায়ণে কিছুটা দূরত্ব রয়ে গেছে।
‘চার অধ্যায়’ একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উপন্যাস, যেখানে রবীন্দ্রনাথ প্রেম, বিপ্লব, আদর্শবাদ ও মানবতাবাদের এক জটিল মিশ্রণ সৃষ্টি করেছেন। এটি কেবলমাত্র একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং সমকালীন ও ভবিষ্���ৎ রাজনীতির জন্যও এক মূল্যবান শিক্ষণীয় সাহিত্যকর্ম।
এমন কেউ বোধকরি নেই যিনি এই উপন্যাসটির পাঠ করেননি। তবুও কেউ থেকে থাকলে অবিলম্বে সংগ্রহ করে পড়ে ফেলুন। নিজেকে চিনবেন।
হৃদয় আপনি উদাস, মরমে কিসের হুতাশ--
জানি না কী বাসনা, কী বেদনা গো--
কেমনে আপনা নিবারি॥