সে এক অদ্ভুত সময় বাংলাতে বুঝলেন। সময়কাল 700-750 CE, বাঙালির বড় দুর্দিন চলছে, মৎস্য মারিব খাইব সুখের সময় সে নয় , বরং মাছখোর বাঙালি ডুবে আছে মাৎস্যন্যায়ে। বড় বড় মাছ অর্থাৎ কিনা সামন্ত ভূস্বামীরা গিলে খাচ্ছে ছোট ছোট মাছ অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে। কিন্তু এদেরও ওপরে আছে হাঙ্গর। এক নয় এক জোড়া ......
বিবেক - কিন্তু ভাই টেকনিক্যালি একটা তো হাঙ্গর নয় বরং ......
আমি - আচ্ছা আচ্ছা থামো তো বাপু, সেসব বলব।
তো সেই মাৎস্যন্যায়ে বাঙালির ভরসা এক মছলিবাবা। আরে থামুন তো মশাই, সবসময় রায় বাবুকে টানবেন না। ইনি হচ্ছেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, যিনি কোনো ১০৮ বাবা ছিলেন না, তিনি লোকেশ্বর, মহাযোগী, পরম শৈব।
আর কে আছে জানেন ? পদ্মসম্ভব, আচার্য শান্তরক্ষিত, গোরক্ষনাথ, জালন্ধরী পা, কাহ্ন পা, জয়াপীড় এমন কি ভাঁড়ুদত্তও। একেবারে বঙ্গ-অন্ড!
বিবেক - বঙ্গান্ড ? উয়া কি বটেক ?
আমি - (ইংরেজিতে) ডাহা!!! বঙ্গ প্লাস ব্রহ্মাণ্ড। বঙ্গ-অন্ড। নাকি বঙ্গভার্স বলব ?
বিবেক - বাংলাভার্স ই বলো ভায়া।
ঠিক বাংলাভার্স। মানে বাঙালির মধ্যযুগে যা যা নাম আপনার মনে পড়বে, তারা সবাই, শর্ত একটাই পালবংশের প্রতিষ্ঠার আগে হতে হবে। এখন আপনি বলতে পারেন যে Gorakhnāth and the Kānphata Yogīs এ যেন এনাকে একাদশ শতাব্দীর বলা হয়েছে, তাহলে তাঁর গুরু অষ্টম শতাব্দীতে কি করে? দেখুন আমরা ইতিহাস বিস্মৃত জাতি, গোরক্ষনাথের গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথ যে অষ্টম শতাব্দীর ও হতে পারে তা নিয়ে মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর জোরালো বক্তব্য আছে। আর সোজা কথা এটা ফিকশন এবং প্রথম বাংলাভার্স, অত খুঁত ধরার কিছু নেই।
তো গল্পের বিস্তৃতি বিশাল, সেই কলকেতা রানাঘাট তিব্বতের মতন। মানে তিব্বত, বঙ্গ, চীন মগধ প্রাগ্জ্যোতিষপুর , বিশাল ব্যাপার।
গল্পের শুরু তিব্বতে, এক স্পাই কেসে। তিব্বত রাজসভাতে ঝামেলা চলছে পোন ধর্মের অনুসারী অমাত্যদের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী তিব্বত সম্রাটের। পোনরা সাপোর্ট পাচ্ছে চীন থেকে , সম্রাটের ভরসা ভারতীয় বৌদ্ধরা। সেই সংঘাত নেমে এলো বাংলাতে। নানা ঝামেলার পরে রাজত্বের ভার এক রানীর হাতে। তবে আসল ক্ষমতা সচিব প্রকাশচন্দ্রের হাতে, যার আছে নানা অলৌকিক ক্ষমতা, যা সে পেয়েছে চীনের রানী যে আবার কিনা বিশাল তন্ত্র সাধিকা। আর বাংলার রানী ?? সে এক বিশাল ব্যাপার। সে মানুষ না। নাগিনী। কিন্তু তার মধ্যে আছে বাংলা এবং চীন, দুই রক্তধারাই।
কি করে ? কাট টু মহাভারত সময়কাল, পরীক্ষিত মারা গেছেন নাগদংশনে অর্থাৎ কিনা নাগবংশীয়দের আক্রমণে। জনমেজয় নাগ বংশীয়দের রাজধানী তক্ষশীলা আক্রমণ করে নাগদের প্রায় নির্বংশ করেছেন, আস্তিকের দৌলতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হলোনা তারা। তবে ব্যথিত হৃদয় আস্তিক চলে গেলেন চীনে। তাকে চিনে নিলো চীনারা। এই বঙ্গরানীর জন্মধারা সেই আস্তিকের। তার দেহে বইছে আস্তিকের রক্তধারা।
বিবেক - কিন্তু ব্রো, তুমি এত রক্ত রক্ত কেন করছ? বঙ্গনাগিনীর দেহে তো রক্ত ছিল না।
আমি - (বিরক্ত হয়ে) এটাই তোর মাথায় এলো? আস্তিকের এই এক্সাইলে তো বাংলার কোনো হাত ছিল না, তাহলে তার বংশ এসে বাংলাতে বাশঁ কেন দিলো ?? হুঁ ?
বিবেক - কেন্দ্রের চক্কান্ত বলছ ?
আমি - অরে এটাকে নিয়ে তো পারা যায় না। কেন্দ্র কোথায় দেখলি ?
তো ফিরে আসি বাংলাতে, সিমসিম করছে রাত, নালন্দা মহাবিহারের এক কক্ষে এসে জমেছেন শান্তরক্ষিত, মৎস্যেন্দ্রনাথ, গোরক্ষনাথ, পদ্মসম্ভব , জালন্ধরপা, কাহ্নপা , ভিক্ষুনী মন্দর্ভ। মানে ভেবে দেখুন। বৌদ্ধ, শৈব এবং সহজিয়া , সব্বাই মিলেছেন একসঙ্গে। আর আছেন বপ্যট, ইনিই হচ্চেন গোপালদেবের পিতা।
এরপর ঘটে নানা ব্যাপার- গোপালদেব বঙ্গে প্রথম উচ্চারণ এবং পুজো করলেন দেবী দুর্গার। দেবী চন্ডী বাংলাভার্সে এলেন দুর্গা হয়ে। আলোচনার শেষে মৎস্যেন্দ্রনাথ বেরিয়ে পড়লেন পেপ টক দিতে যাতে বাংলার অন্য সামন্তরা যেন আসন্ন বিপ্লবের বিরোধিতা না করে। আজ্ঞে হ্যাঁ , বাঙালির বিপ্লববোধের সূচনাও এই বাংলাভার্সেই হয়। বাকিরা নেমে পড়লেন প্রকাশচন্দ্র, রানী এবং তাদের ছয় প্রধান সহযোগীদের নিকেশ করতে।
বিবেক - (ফিসফিস করে) আচ্ছা তখন বাংলাতে খড়গ বংশের কেন্দ্রীয় শাসন, আছে অনেক সামন্তও, তাহলে টেকনিক্যালি মাৎস্যন্যায় কি করে চলছে ? মানে আমআদমির ওপরে অত্যাচার তো সবাই করে।
আমি - করতে পারে , কিন্তু তা বলে প্রতি পনেরো দিন অন্তর রাণী একটা সা জোয়ান পুরুষকে ছিবড়ে করে দেবে ? থামো। ছিবড়েটা আমি দৈহিক নিষ্পেষণ এবং শেষে নিষ্কাশনের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছি। আমি জানি শেষে রানী তাদের দংশন করতো। এটা কি ঠিক ?
বিবেক - কিন্তু ভেবে দেখো, ওই মাঝের পনেরো দিনে ওই অনিন্দ্যসুন্দরী রানী কিন্তু একেবারে নির্বিষ। সেটা তো .....
আমি - কি সেটা ? সেটা কি?
বিবেক - মুচকি হেসে - থাকগে ! তারপর কি হলো ?
তারপর অনেক কিছু হলো রে ভাই। প্রকাশচন্দ্রকে ক্ষমতাতে বসানো চারুদত্তকে দক্ষিণের এক অস্বাস্থ্যকর স্থানের কুটিরে বন্দি রাখা হয়েছিলাম কাহ্নপা ইত্যাদিরা গিয়ে তার পেট থেকে কথা উদ্ধার করে নিয়ে এলেন। কিন্তু এরপরে দরকার আছে রানীর মৃত্যু কি করে হবে সেটা জানা, সে আরেক রোমাঞ্চকর অভিযান, করলেন পদ্মসম্ভব , যিনি তখনো রিনপোচে হন নি তাই নানা দুষ্ট কার্য করতে বড়ই উৎসাহ পান। .... এটাই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রানীই বঙ্গ, বঙ্গই রানী .... তার পদচটিকাতে। ....
বিবেক - ওয়ান মিনিট , ওয়ান মিনিট। তারমানে কি চারুদত্ত আদি গঙ্গার পাশের ওই খানে বন্দি ছিল? কুটির বললে, তারপর বঙ্গই রানী বলছ ?
আমি ( ব্যাকুল হয়ে ) - ওরে চুপ কর রে হতচ্ছাড়া, কে শুনে ফেলে চপ করে কেটে দেবে !!!
সে যাইহোক , প্রথম বিপ্লব ঘটলো মন্দিরে, এক পুজোতে এসেছে প্রকাশচন্দ্র থেকে রানী সবাই , মন্দির চত্বরে ভিড়। সেই ভিড় থেকে হঠাৎ কে উচ্চস্বরে গালি দিল শাসকদের, তারপর আরেকজন, তারপর আরেক জন, আস্তে আস্তে সব জনতা যেন খেপে উঠলো, ক্যা ক্যা ছি ছি রবে চাদ্দিক ভরে উঠলো, আর মন্দিরে দুম করে ফাটল পলিতা বোম-কন্দুক। সেই প্রথম বাংলাতে বোমা পড়া।
বিবেক - তার মানে তোমরা বেঙ্গলিরা বরাবরই ভুষুন্ডি টাইপের। পালবংশের প্রতিষ্ঠার সময়েই বোমা পড়ে যা চীনের থেকে আনা, অথচ কতগুলো পাল প্রজন্ম পরে তিব্বত আগত বিনয়ভদ্রের কাছে এই কন্দুক দেখে আশ্চর্য্য হয়ে গেছিলেন রাজপুত্র ও আচার্য অতীশ দীপঙ্কর ।
আমি - বিপ্লবীরা তখন কি পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতো জানিস? কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল। চঞ্চল চীএ পইঠো কাল॥
বিবেকের ছোট ছোট খুঁচি খুঁচি চোখ গোল গোল হয়ে উঠলো।
কিন্তু আসল সমর হলো লালিম্বন পাহাড়ের নিচে শালিবন বিহারে। সেখানে মৎস্যেন্দ্রনাথ শালিধানের অন্নগ্রহন করছিলেন হয়তো ভর্জিত মৌরলা মাছ দিয়ে, কিন্তু খেতে দিলে না গা। প্রকাশচন্দ্র আক্রমণ করলেন। মৎস্যেন্দ্রনাথ, পদ্মসম্ভব, দেদ্দীদেবী, মন্দর্ভা, বপ্যট, এমনকি জয়াপীড় প্রবল রণে মত্ত হলেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুকরাও পিছিয়ে রইলেন না, শৈব ত্রিশুল তুলে তারাও নেমে পড়লেন ফ্রন্টে। গোপালদেব তখন রাজপ্রাসাদে, রানীর মহড়া নিচ্ছেন, চীনাংশুকে আবৃত আলোছায়া ভর্তি ঘরে। মানে যুদ্ধ দুই ফ্রন্টে।
এখন আপনি ভাববেন, মৎস্যেন্দ্রনাথ এবং প্রকাশচন্দ্র, দুজনেই তন্ত্রে এত ক্ষমতাধারী, যুদ্ধে কি না কি হলো, এদের যৌগিক ক্ষমতার টক্করে অন্যরা হয়তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। নাঃ। সে গুড়ে বালি। দুজনেই -
"রে রে পাষণ্ড দুরাচার
আজ বধিব তোরে
দিলি না খাইতে কুলের আচার "
- এই বলে হাতাহাতি তে মত্ত হলেন, এক পর্য্যায়ে প্রকাশচন্দ্র তো মৎস্যেন্দ্রনাথের চুলের মুঠি ধরে দিলেন আচ্ছা করে ঝাঁকিয়ে।
ওদিকে রাজপ্রসাদে গোপালদেব আচ্ছন্নতা থেকে জেগে উঠলেন, পাশে রানী হা ক্লান্ত হয়ে শুয়ে। আর উঠেই কিনা গোপালদেব বিকেলের দুধ চা না খেয়ে দিলেন গুলি করে।
ব্যাস। ওটাই ছিল প্রকাশচন্দ্রের লাস্ট হরক্রাক্স। আর লড়তে না পেরে ষাঁড়ের পিঠে চড়ে তিনি পগারপার।
তারপর আর কি ! আমার কথাটি ফুরোলো।
হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন হরক্রাক্স বিদ্যা আমাদের ভেতর থেকেই পশ্চিমে যায়, কেন পড়েননি মাছের পেটে রাক্ষসের প্রাণ ? এখন ভোল্ডেমর্টই প্রকাশচন্দ্র কিনা আমি বলতে পারি না। আর হ্যাঁ , আরো কয়েক শতাব্দী পরে ভারতের দক্ষিণে রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের রাজ্যে বলরাম কর্মকার যে তার স্পেশাল বিদ্যা নিয়ে গেছিলো তা এই গোপালদেবের থেকেই পাওয়া।
বিবেক - রানী তাহলে মরে গেলো ?
আমি - হ্যাঁ।
বিবেক- রানীর মুখে একটা তিল ছিল আর নাকটা একটু মিষ্টি মতন চাপা ছিল গো। কেন জানি মনে হলো এ কথাটা সবাইকে জানানো দরকার।
আমি - হতচ্ছাড়া। এই একটা গোটা উপন্যাস পড়ে তোর মনে শুধু এটুকুই লেগে থাকলো ?
কিন্তু ততক্ষনে ভোঁ করে বিবেক কোথায় যে চলে গেছে ।