প্রভাবশালী এমপির ভাগ্নীর আকস্মিক আত্মহত্যা। পুলিশের যেখানে আদাজল খেয়ে তদন্তে নামার কথা, সেখানে কেস অর্ধসমাপ্ত রেখেই ফাইল ফিতাবন্দী করা হলো! কেসের দায়িত্বে থাকা পুলিশ অফিসার মির্জা শারাফের কাছে ব্যাপারটা ঘোলাটে লাগে। সূত্র হিসেবে তার হাতে আসে আত্মহত্যাকারীর ডায়েরি। নিজ দায়িত্বে তদন্ত চালিয়ে যায়। তদন্ত বন্ধের চাপ আসতে থাকে উপরমহল থেকে। আসলে কী ঘটেছিল? শারাফ কি পারবে প্রকৃত রহস্যের উদঘাটন করতে? নাকি অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে যাবে? 'চার একটি যৌগিক সংখ্যা' এর পর পাঠকের জন্য আরেকটি জমজমাট রিভেঞ্জ থ্রিলার 'বিশেষ দ্রষ্টব্য' নিয়ে এসেছেন সুলেখক রিয়াজ মোরশেদ সায়েম।
ছোটোবেলা থেকেই গল্প শুনতে শুনতে একসময় গল্প বলার ভাষাটা রপ্ত করে নিলাম। স্কুলে পড়ার সময় ব্যাংকার হতে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম অঢেল সম্পদের মালিক হতে, কিন্তু না। হয়ে গেলাম কথার মালিক। জীবনের বাঁকে বাঁকে লক্ষ্য পাল্টে গিয়েছে। শেষমেশ সব পেশার মানুষকে আমার দিকে টেনে এনেছি, গল্প শোনাবো বলে। এই যে, আপনাকে যেভাবে আনলাম। আমার জন্ম দ্বীপ এলাকায়, যেখানে সমুদ্রের জোয়ার এসে আমাকে ছুঁয়ে দেয়। আবার ভাঁটায় গন্তব্য হারাই। কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলায় ১৯৯৭ সালের ২০ জানুয়ারি রাতের মাঝামাঝি সময়ে জন্মগ্রহণ করি। বাবা ব্যবসায়ী, মায়ের পেশার শেষ নেই। কখনো ডাক্তার, কখনো ইঞ্জিনিয়ার, কখনো শিক্ষক, কখনো দরজি, কখনো গৃহিণী...। শুধু শখের জন্য লেখালেখি করি না। পেশার জন্য লিখি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। থ্রিলার আমার পছন্দের জনরা। সে জনরায় কাজ করছি, চেষ্টা করছি পাঠকদের ভালো কিছু দিতে। কবিতার পথ ধরে হাঁটা শুরু করলেও থ্রিলার আমাকে তার পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে অনুবাদ আমার প্যাশন।
আমার প্রকাশিত অন্যান্য বই-
মৌলিক : জলজ্যোৎস্নার মাখামাখি - ২০১৯ ( কবিতা ), পদ্মজলের সিঁড়ি - ২০২০ ( কবিতা ), মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন বাঙ্গালী কিশোর জীবনী - ২০২০ ( জীবনীগ্রন্থ ), চার একটি যৌগিক সংখ্যা, ২য় মুদ্রণ - ২০২১ ( থ্রিলার উপন্যাস ), বিশেষ দ্রষ্টব্য -২০২২ ( থ্রিলার উপন্যাস )।
শিশুতোষ : ১০ খন্ডে ছোটোদের নবি রাসূল - ২০২২ ( গল্পে গল্পে নবিদের জীবনী ) ৫ম মুদ্রণ, ৬ খন্ডে ছোটোদের মহানবী - ২০২২ ( গল্পে গল্পে মহানবীর জীবন )।
অনুবাদ : স্টিল লাইক অ্যান আর্টিস্ট, মূল - অস্টিন ক্লেওন (২০২২, মোটিভেশনাল) ; ম্যান'স সার্চ ফর মিনিং, মূল - ভিক্টর ই.ফ্রাঙ্কল (২০২৩, মোটিভেশনাল) ; মুরাকামির হাফ ডজন গল্প, মূল - হারুকি মুরাকামি (২০২২, গল্পগ্রন্থ), হাউ টু লাভ, মূল - থিক নাথ হান (২০২২, মোটিভেশনাল), হাউ টু ওয়াক, মূল - থিক নাথ হান (২০২৩, মননশীল), দ্য আলমানাক অব নাভাল রাভিকান্ত, মূল - এরিক জর্জেনসন (২০২৩, উদ্যোক্তা উন্নয়ন)।
উপন্যাসিকার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো আমার নিজের বাসার কাছাকাছি ঘটেছে। তাই ভালো কিছু ফ্যামিলিয়ারিটি পেয়েছি চট্টগ্রামে থাকার সুবাদে।
মির্জা শারাফ। শিক্ষকতায় যাবেন না পুলিশে থাকবেন এই নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকা একজন ২৯ বছর বয়সি এস.আই। তার উপর আছে প্রেমিকাকে বিয়ের চাপ এবং ওসি ওমর হায়দারের ধমক। এমপি সাহেবের ভাগ্নি তাকলিমার আত্মহত্যা শারাফের কাছে কেমন জানি ঠেকে।
তদন্ত কাজে নেমে শারাফ একটি ডায়রি পেয়ে যান, 'বিশেষ দ্রষ্টব্য' নামের। এই দিনলিপিটি অদ্ভুত। তাকলিমা এবং তার বান্ধবীদের একধরণের গেইমের। যে গেইমের নিয়ম মানতে গিয়ে খুব সম্ভবত তাকলিমা তাবাসসুমের করুণ পরিণতি হয়েছে।
ইনভেস্টিগেশনে নেমে মির্জা শারাফ একধরণের গোলকধাধায় ঢুকে যান। মূল কালপ্রিট যেন চোখের সামনেই কিন্তু কেন জানি তাকে ধরতে পারা যাচ্ছে না। ডায়রিটিতে বিভিন্ন মেয়ের ঐ গেইমে ঢুকে যাওয়ার পিছনে আমাদের সমাজে মেয়েদের প্রতি বিভিন্ন অন্যায়-অবিচার ফুটে উঠেছে। দেশের সমসাময়িক বিভিন্ন মূল্যবোধের অবক্ষয়ও চলে এসেছে ডায়রিতে।
কেইসের সাথে ঘটনাচক্রে নিজের ব্যক্তিগত জীবনও জড়িয়ে যায় শারাফের। আত্মহত্যার ঘটনা তার ভাইয়ের সাথেও হয়েছিল। তাছাড়া ওসি এবং এমপি সাহেবই বা কেন বারবার এই তদন্ত ধামাচাপা দিতে চান?
এয়ারপোর্ট নভেলা দ্রুতগতিসম্পন্ন লেখনির হয়ে থাকে। রিয়াজের লেখা ফাস্ট রিড ছিল তবে বেশ কিছু জায়গায় গল্পকথনের একধরণের ছন্দপতন হয়েছে। আমি সাধরণত থ্রিলার পাঠের সময় এত প্লটহোল বা মূদ্রণপ্রমাদ খেয়ালে রাখিনা। এতে পড়ার মজাটা নষ্ট হয়। তবে বইটিতে চোখে পড়ার মত ভুল বানান আছে। একইসাথে বেশ কিছু প্লটহোল যা মাথা থেকে তাড়াতে পারিনি। বইটির পিছিয়ে থাকা অংশ নিয়ে আলোচনা করছি। যারা স্পয়লারমুক্ত থাকতে চান তারা এই পয়েন্টগুলো এড়িয়ে যেতে পারেন।
১) একজন তদন্তকারি কর্মকর্তা বেশ কিছু বিষয়ে এতটা বোকা কিভাবে হন? নিজের তদন্তকাজের সিডিউল মিস করার অবস্থা হয়ে যায় তার।
২) ডায়রিটি শারাফ ঐ বাসা থেকে সবার অজান্তে সরিয়ে ফেললেন? কারো খবর হলো না?
৩) ৪০ পৃষ্ঠায় শ্রাবণী ভয়ে বুকে থুথু ছুড়েছেন। ভালো কথা। তবে 'একদলা থুথু' কেউ কি ছুড়েন?
৪) একই পেইজে তাকলিমার ভাই জোরে হেসে উঠলেন। অথচ তার-ই বোন কয়েকদিন আগে না আত্মহত্যা করেছে! তাছাড়া কিছুটা সন্দেহ নিয়েই তো শ্রাবণীকে প্রশ্ন করেছিল মাসুদ।
৫) 'সাদিয়া কি আপনার আপন মেয়ে? উপস্থিত সবাই চমকে ওঠে শারাফের দিকে তাকায়। এমনকি শারমিন আক্তার নিজেও। একটু বিব্রতবোধ করলেও পেশাদারিত্বের জায়গায় সে অনড়।' পৃষ্ঠা - ১০৭।
এরকম ব্যক্তিগত প্রশ্ন সবার সামনে জিজ্ঞেস করে শারাফ কি ধরণের পেশাদারিত্ব দেখালেন?
৬) ১১২ এবং ১১৩ পৃষ্ঠায় শারাফের মত তদন্তকারি কর্মকর্তাকে তাকলিমার মা এক প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, " এটা তোমার না জানলেও চলবে বাবা। তুমি আমাকে বলো, নওশীনের বাসায় কেন গেলে? আর ও কি এসবের সাথে জড়িত।"
একজন ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের প্রশ্ন কি এভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায়? তার উপর আবার ভিক্টিমের মা পাল্টা প্রশ্ন করছেন।
৭) পুরো গল্পে চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে প্রমিত ভাষায় কথা বলতে গেলে যে আঞ্চলিক একটি টান চলে আসে তা একদম অনুপস্থিত। ইন ফ্যাক্ট, আমার মনে হয়েছে চট্টগ্রামে কেউ চাঁটগাইয়া ভাষা বলেন না। স্টোরিটেলিং এ আমার মতে এই বিষয়টি আসলে আরো ভালো হত।
উল্লেখিত আমার ক্রিটিকসমূহ আশা করি লেখক স্পোর্টিংলি নিবেন। শেষের দিকে ডায়রি নিয়ে প্রচুর প্যাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে। পাঠককে মনে হয় আরো অন্যভাবে কনফিউজ করা যেত, এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত।
তবে রিয়াজ মোরশেদ সায়েমের সহজাত লেখনিশক্তি এতকিছুর মাঝেও বেশ ক'বার উঁকি দিয়েছে। যথাযথ প্রয়োগের অভাবে একটি এয়ারপোর্ট নভেলা যা অনেক ভালো কিছু হতে পারতো তা মিস করে গেল। লেখকের প্রতি শুভকামনা। শেষ করছি প্রিয় কিছু লাইন দিয়ে।
"ওপরে সাদা মার্কার দিয়ে লেখা 'বিশেষ দ্রষ্টব্য' , এখানে তাকলিমার জীবন সাজানো। সাজানো জিনিসে অপরিচিত হাত পড়লে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তাই হাত দিবেন না।"
বই রিভিউ
বই : বিশেষ দ্রষ্টব্য লেখক : রিয়াজ মোরশেদ সায়েম প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০২২ প্রকাশনা : অক্ষরবৃত্ত প্রচ্ছদ : সজল চৌধুরী জঁরা : রিভেঞ্জ থ্রিলার রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
বই : বিশেষ দ্রষ্টব্য জনরা: রিভেঞ্জ থ্রিলার লেখক : রিয়াজ মোরশেদ সায়েম পার্সোনাল রেটিং: ৪.৬/৫
"লেখকের লেখা পড়ে তার জীবন সম্পর্কে জানা যায়।"
কথাটা কে বলেছিলো মনে নেই। কথাটা আসলেই এমন ছিলো কী না তাও মনে নেই। তবে বিশেষ দ্রষ্টব্য পড়ে কিন্তু আমি লেখক রিয়াজ মোরশেদ সায়েম সম্পর্কে কিছু বিষয় ধারণা করতে পারছি।
তার বিসিএস নিয়ে অভিজ্ঞতা, শহরের দূষণে তার মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ সহ আরো বেশ কয়েকটা বিষয়ের ছায়া আমি লেখার মধ্যে পেয়েছি।
যাই হোক, বইয়ের কথা বলি। বইটি মূলত কিশোর অপরাধকে ঘিরে বেশ কিছু গল্প, কিছু বাস্তব ঘটনা আর অনেকখানি সাসপেন্স নিয়ে লেখা হয়েছে। গল্পের প্রথমে সবকিছু বুঝে উঠতে একটু কষ্ট হচ্ছিলো। প্যারালালভাবে দুই-তিনটা ঘটনা (খুব স্বল্প সময়ের জন্য) বলায় ধরতে একটু কষ্ট হচ্ছিলো। তবে থ্রিলার গল্পে এটা খুব স্বাভাবিক।
সত্যি কথা বলতে আমি 'ক্রিটিকসদের মতো' বইয়ের ভুল ধরার চেষ্টা করছিলাম। কষ্ট হয়নি, বেশ কয়েকটি বড়োসড়ো ভুল ধরেছি। সাধারণ পাঠকরা (যেমন আমি) হুট করেই ধরে ফেলবে না এমন ভুল। ভেবেছিলাম রিভিউতে সেই বিষয়গুলো লিখবো। কিন্তু পরে দেখা গেলো সেই ভুলগুলো নিয়েই আমাকে চরমভাবে ভুল প্রমাণ করা হয়েছে। মোটকথা আমার চিন্তা-ধারণা নিয়ে সুন্দরভাবে খেলেছেন লেখক।
শেষের টুইস্টটা আমি আসলেই নিতে পারিনি। চোখ ট্যারা হয়ে গিয়েছিল। তবে একদম শেষে এসে একটু কেমন যেনো খাপছাড়া লাগলো। আর মাঝে মাঝে (২-৩ জায়গায়) কিছু অপ্রয়োজনীয় তথ্য, বর্ণনা গল্পের ফ্লো একটু ডিম করে দিচ্ছিলো। তাই ৪.৬/৫। নাহলে ৫/৫ পাওয়ার যোগ্য দাবিদার এই বইটি।
অনেকদিন ধরেই পড়বো ভাবছিলাম বইটা, লেখকের পড়া প্রথম বই হবে বলে আগ্রহী ছিলাম পড়তে, অবশেষে বইটা দেখতে নিয়ে পড়ে শেষ করে ফেললাম। ভালোই লেগেছে, খারাপ না, লেখকের লেখার ভুল ধরার মতো দুঃসাহস দেখাতে চাইনা। তবে একটা জায়গায় ভুল ছিলো, ১০৯ পৃষ্ঠার একটা লাইনে লিখা ছিলো - "নওশীনের মৃত্যুর তিন দিন আগে শ্রাবণীর সাথে গিয়েছিল"। এখানে নওশীনের এর জায়গায় তাকলিমার নাম হওয়ার কথা ছিল, এরক�� হওয়ার কথা ছিল যে "তাকলিমার মৃত্যুর তিন দিন আগে নওশীন শ্রাবণীর সাথে গিয়েছিল"।