মাঝরাত; পুকুরের জলে অর্ধেক ডুবে আছে সে। জোছনার আলো; ঝিঁঝির ডাক; আন্তনগর ট্রেনের ছুটে যাওয়ার ঝিকঝিক শব্দ। মাছের ঝাঁক সাহসী হয়ে গায়ে গা ঘেষে চলে যায়, মাঝেমাঝে আলতো করে ঠোকর দেয়; সব মিলিয়ে এক অপার্থিব অনুভূতি। সময় যে গড়িয়ে কখন প্রায় ভোর হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই তার।
হঠাৎ মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে তার, চারপাশ যেন প্রচন্ডবেগে ঘুরছে। অসংখ্য মুখ; অসংখ্য স্মৃতি; ঝড়ের বেগে চারপাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। কী হচ্ছে এসব? আলোকচ্ছটার মতো ঘটনাপ্রবাহ তার চোখের উপর আছড়ে পড়ছে যেন।
স্বপ্না অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিলয়ের দিকে, নাকের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম, ক্ষণেক্ষণে ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠছে; কি যেন বলতে চায় সে, কিন্তু লজ্জার বাধা অতিক্রম করতে পারছে না। স্বপ্নার খুব ইচ্ছে করছে নিলয়ের বুকে নাক ডুবিয়ে লম্বার করে একটা ঘ্রাণ নিতে। থ্যাবড়া নাকে একটা কামড় দিয়ে আরও থ্যাবড়া করে দিতে। ছি! ছি! এসব সে কী ভাবছে? নিজেকে বাজে মেয়ে মনে হয় তার; আবার ভালো লাগার একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে মন জুড়ে। ছেলেটা কেন তার হাত ধরছে না? ছেলে মানুষ হয়ে এত ভয় পেলে চলবে?
ভয়ানক চমকে উঠে চোখ খুলে নিলয়। আকাশের চাঁদটা আরও বড় হয়েছে মনে হয়। মাথার ভেতর সবকিছু জট পাকিয়ে গেছে তার। পুকুর থেকে উঠে গা হাত পা মুছে হোষ্টেলের দিকে এলোমেলো পা বাড়ায় সে। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্চি ধীরে ধীরে?
মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম এর জন্ম ১৯৮১ সালে নরসিংদী জেলায়। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দেশে-বিদেশে। একজন সফল উদ্যোক্তা ও স্বপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানির সিইও হিসেবে বর্তমানে প্রবাসজীবন যাপন করছেন লিবিয়াতে। শিক্ষাজীবনে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে ২০০৩ সালে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতক। লিখছেন দীর্ঘদিন থেকে। 'শান্তির দেবদূত' ছদ্মনামে সামহোয়ারইনব্লগে সায়েন্স ফিকশন লিখে যথেষ্ট জনপ্রিয়। অনলাইন জগতে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় দুই ডজন বিপুল পঠিত ও আলোচিত সায়েন্স ফিকশন গল্প-উপন্যাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার। লেখকের প্রথম সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল যথেষ্ঠ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘ও-টু’ লেখকের দ্বিতীয় সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস। বিজ্ঞান, মানবতা, প্রেম আর প্রখর রসবোধের মিশেলে অনবদ্য লেখনিবৈশিষ্ট্য লেখককে বিশিষ্টতা দিয়েছে। তার লেখাগুলো সুখপাঠ্য ও চুম্বকধর্মী। লেখকের সায়েন্স ফিকশনগুলো বিজ্ঞানের নীরস কচকচানি নয়, বরং জীবনের প্রেম-কাম ও হাসি-কান্নার রসে সিক্ত। -- By Tasruzaman Babu
ভাষার মূল উদ্দেশ্য কি? কাউকে কোন কিছু বোঝানো, মনের ভাব প্রকাশ করা। কখনো এমন যদি হয়, মুখ নিঃসৃত শব্দমালা/ধ্বনির পরিবর্তে এমন কোন একটা মাধ্যম আবিষ্কার হয় যার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা আরো সহজতর হয়? এবং এটা হয় আরো বেশি সুনির্দিষ্ট, আরো স্পেসিফিক এবং আরো বেশি ডিটেইলড তাহলে কি ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য হবে?
পাঠক ভ্রু কুঁচকে ভাবতে পারেন, ইংরেজি ভাষার শব্দসংখ্যা প্রায় ২,৫০,০০০ (যার মাঝে কালের বিবর্তনে ৫০,০০০ শব্দ ইতোমধ্যে বাদ হয়ে গেছে), কোটি কোটি মানুষ প্রায় হাজার বছর ধরে এ ভাষা ব্যবহার করে চমৎকার স্পেসিফিকভাবে মনের ভাব প্রকাশ করছে, এর চাইতেও ডিটেইলড ভাষা, তাও আবার মুখ না নাড়িয়ে? কিভাবে? তেমনি এক আইডিয়া নিয়ে আস্ত একটা সাই-ফাই ঘরানার বই লিখেছেন মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। বইটার নাম ‘আর্কোইরিচ কসমস’, প্রকাশ পেয়েছে ৫ আগস্ট, ২০২২। নামটা একটু খটমটে শোনায় আমি একটু গুগল করতেই জানলাম আর্কোইরিচ শব্দটার অর্থ হচ্ছে রংধনু আর কসমস মানে তো মহাকাশ, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, বিশ্বজগৎ ইত্যাদি। তো ব্যাপারটা দাঁড়ায় যে, রংধনুর বিশ্বজগৎ কিংবা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে রংধনু। যাই হোক, আজাইরা প্যাঁচাল বাদ দিয়ে বই কেমন লাগলো তা বলি।
শুরুতে যে ব্যাপারটার প্রশংসা করতে চাই তা হলো ইউনিক আইডিয়া। শব্দ মালার পরিবর্তে রঙের মাধ্যমে যোগাযোগের যে আইডিয়াটা তা আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। তবে আইডিয়া সুন্দর দিয়ে শুরু হওয়া বইটার প্লট শেষেরদিকে এসে খানিকটা খেই হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে হয়েছে। তবে লেখকের লিখনশৈলী আমার বেশ ভালো লেগেছে। লেখা এতটাই সহজ, সাবলীল এবং গতিশীল যে হাতে ২-৩ ঘন্টা সময় থাকলে পাঠক এক বসায় এই বই শেষ করতে পারবেন। হার্ডকোর সায়েন্স ফিকশনে যে ব্যাপারটা থাকার সম্ভাবনা থাকে তা হলো সায়েন্সের কচকচানি। তবে এ বইটা হার্ডকোর সায়েন্স ফিকশন হলেও যে বিষয়গুলো বইয়ের প্রয়োজনে এসেছে তা আমার কাছে সহজ বোধ্যই মনে হয়েছে। তবে বইটা দূর্বল লেগেছে চরিত্রায়নে। গল্পের মূল চরিত্র নিলয় বাদে বাকিরা কেউ তেমন একটা হাইলাইট পায়নি। ২৫৬ পেজের বইতে চাইলে ম্যালো-ই-সুজা, ফেরদৌস হাসান, রনজিৎ চক্রবর্তীরা আরো ব্যাপকভাবে আসতে পারতেন। তা না হয়ে কাউকে শুধুই ভিলেনিশ একটা ভাইব দেয়া হয়েছে, কোন একজন ডাক্তারকে বর্ণনা করতে ‘মস্তিষ্ক কেটে-কুটে’ কথাটি বেশ কয়েকবার এসেছে, যা ছিলো কিছুটা শিশুসুলভ ও একই সাথে বিরক্তিকর। আর কাজের জায়গায়, তাদের নিয়ে লেখকের বর্ণনা এতটাই কম ছিলো যে, তাদেরকে ভিজ্যুয়ালাইজ করতে বেগ পেতে হয়েছে। আরো ছিলো কিছু টেকনিক্যাল এরর। তবে নিচে টেকনিক্যাল এরর (শুধু টেকনিক্যাল এরর না, কিছু খাপছাড়া পয়েন্টও আছে) নিয়ে কথা বলার আগে একটা বিষয় বলতে চাই, তা হলো আমার জ্ঞান সীমিত। এ জ্ঞানে অনেক কিছুই আমার জানার ভুল থাকতে পারে। তাই কেউ পয়েন্টগুলোর ভুল ধরতে পারলে, আপনাকে সাদরে আমন্ত্রণ।
(এখানে কিছু স্পয়লারও আছে, তাইও #স্পয়লার_অ্যালার্ট ও রইলো।)
১. ফেরদৌস হাসান একজন সাইকোলজিস্ট। কিন্তু তাকে বইয়ের অনেক জায়গায়ই ডা. ফেরদৌস হাসান বলা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, সাইকোলজিস্ট যদি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টও হোন তবু তাকে ডা. বলা যায় না। ফেরদৌস হাসানকে ঔষধ প্রেসক্রাইব করতেও দেখা গেছে। ডা. বলা, ঔষধ প্রেসক্রাইব করা এগুলো একজন সাইকিয়াট্রিস্ট এর ব্যাপার, সাইকোলজিস্টের না। ২. সময়ের সাম্যবস্থানে যাওয়ার কারণ ভিনগ্রহের ঐ ইউনিভার্সে সময় অনেক স্লো দেখানো হয়েছে। ঐ গ্রহের প্রাণীর এক প্রজন্মের আয়ুষ্কাল পৃথিবীর সময়ে ৩০০-৪০০ দেখানো হয়েছে। সেক্ষেত্রে মাত্র ২৩ বছর আগে ঐ প্রাণীর জন্ম হলে (জন্মের সময়ই নিলয়ের সাথে যোগাযোগটা শুরু হয়), ২৩ বছর পর তারা কিভাবে তাদের পূর্ণজ্ঞান প্রাপ্তের দ্বারপ্রান্তে চলে আসে? তাদের তো এখনো শিশুকালই চলার কথা, তাই না? ৩. ফেরদৌস হাসান নিলয়কে ১ম যেদিন দেখলেন সেদিন তিনি তার হাতে আংটি না দেখে ধরে ফেললেন যে, তিনি সম্ভবত বিবাহিত না। হাতে আংটি দেখে বিবাহিত-অবিবাহিত বোঝার ব্যাপারটা আসলে ইউরোপ-আমেরিকার বই, মুভিতে ঘটে, আমাদের দেশে ঘটে না। আশেপাশে চোখ বোলালেই এটা সহজে বোঝার কথা। ৪. নিলয় চাইলেন আর তার employer এর ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজের স্কুল, কলেজের নাম, ধাম বদলে দিলেন, এটা তো একটা জোক হয়ে গেলো। ৫. গ্রামের স্কুলের হেডস্যার চেনেন না জানেন না এমন একজন এসে চাইলো তাদের কোন এক আমলের স্টুডেন্টের ডিটেইল চাইলো আর তিনি পান খেয়ে গল্প করতে করতে দিয়ে দিলেন? তাও আবার কম্পিউটারের ডাটাবেস ঘেঁটে? ওয়েট, আমাদের বাংলাদেশের ঘটনা এটা? ৬. বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর (ম্যালো-ই-সুজা), যে কিনা নিভৃতচারী হয়ে গবেষণা করার জন্য ইউনিভার্সিটি অ্যাটেন্ড করছে না। কিন্তু তাকে নিভৃতচারী হয়ে গবেষণা করতে হচ্ছে কারণ তার থিওরীতে কেউ বিশ্বাস রাখতে পারছে না। প্রশ্ন হলো, সব ফান্ডিং বন্ধ করে দিয়ে, থিওরীতে বিশ্বাস রাখতে না পারার পরেও বিশ্ববিদ্যালয় তাকে এই নিভৃতচারী হয়ে গবেষণা করার সুযোগ দিচ্ছে? এটা তো আসলে যুক্তির চাইতে আবেগের বিষয় হয়ে গেলো বেশি? ৭. ম্যালো-ই-সুজা নিভৃতচারী হলো তো হলোই, এমনভাবে হলো যে বিশ্ববিদ্যালয়ের HR এর কাছে তাকে তার কোন কন্ট্যাক্ট ডিটেইলস নেই। কারণ সে কি করছে, কিভাবে করছে তা ফাইনাল হবার আগে কাউকেই জানতে দিতে চায় না। সিরিয়াসলি? আই মিন, বিশ্ববিদ্যালয় এটা কিভাবে অ্যালাউ করে? ৮. তবে সব কিছু ছাড়িয়ে গেছে, রনজিৎ চক্রবর্তীর আচরণে। ম্যালো-ই-সুজা, যাকে কিনা তার ইউনিভার্সিটির HR ও ট্রেস করতে পারে না, নিয়মিত যোগাযোগ না থেকেও তাকে ১৬০০০ কিলোমিটার দূর থেকে ট্রেস করে ফেললেন রনজিৎ? সেমিনার কবে হবে সেটা জানা, সে দিনের পরের দিন প্রফেসরের জন্য টিকেট কেটে রাখা, এগুলো তো একটু আজব মনে হলো।
তবে এগুলো স্কিপ করলে আপনি নিঃসন্দেহে বইটা উপভোগ করতে পারবেন (স্কিপ করাটা অস্বাভাবিক না)। তবে যে জিনিসটা স্কীপ করতে পারবেন না সেটা হলো, এই বইয়ের প্রকাশনী হিসেবে ‘কুহক কমিক্স এন্ড পাবলিকেশন’ এর গাফেলতি। প্রায় প্রতিটা পৃষ্ঠায় বানান ভুলের ছড়াছড়ি, গল্পকথকের একই চরিত্রের ক্রিয়াপদে কখনো আপনি, কখনো তুমির অহরহ ব্যবহার প্রমাণ করেছে তারা আসলে সম্পাদনার ব্যাপারটাতে অতটা জোর দেননি। আপনাদের কন্টেন্ট ভালো তাই বলবো, সম্পদনার দিকে নজর দিন। আরেকটা জিনিসের দিকে আপনাদের নজর দেয়া উচিত, সেটা হলো বই বাধাই। আমার কাছে বইয়ের প্রডাকশন, প্রচ্ছদ হচ্ছে লিস্ট ইম্পর্ট্যান্ট একটা বিষয় কিন্তু তাই বলে একবার পড়লেই একদম নড়বড়ে হয়ে যায় যে বই, সে বইয়ের বাধাই নিয়ে কাজ করার জায়গা আছে আমার ধারণা।
রেকমেন্ডেশন : আপনারা যারা সাই ফাই পছন্দ করেন তারা ৩৮০ টাকা মুদ্রিত মূল্যের এই বইটা ট্রাই করে দেখতে পারেন। দূর্দান্ত, মাস্টারপিস না হলেও ভালো বই তো অবশ্যই। আমাদের দেশের সাই ফাই জনরা সাহিত্যে এই বইটা অবশ্যই ভ্যালু অ্যাড করেছে, সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
আইডিয়া চমৎকার ও ইউনিক। কিন্তু গল্পটা আরো বিস্তৃত, আরেকটু ডিটেইলড হলে ভাল হত। অতৃপ্তি থেকে গেল একটা। ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট এ আরেকটু নজর দেয়া প্রয়োজন ছিল। কিছু টেকনিক্যাল ইরর, কিছু টাইমলাইন এর প্রব্লেম আছে। যেইটা সম্পাদনা ভাল হলে সহজেই ঠিক হত। কিছু ঘটনার সাথে মূল কাহিনির সম্পর্ক বোঝা যায় নি, যেমন - মাইশার আচরন ও মৃত্য