১৯০১ সালে যে লোকটি লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে করে দু'মুঠো অন্নের সন্ধানে অষ্টপ্রহর ব্যস্ত ছিলো, ২০২১ সালে তার কোনো এক উত্তরপুরুষ হয়তো মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবছে। বিংশ শতাব্দীতে যে দেশটি পরাধীনতার গ্লানি টানছিলো, একবিংশ শতাব্দীতে সেই দেশটি তার সাবেক সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর দিকে স্পর্ধিত ভঙ্গিতে আঙ্গুল তুলে কথা বলছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীতে এত বেশি পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে যে, একবিংশ শতাব্দীর সাথে তার দুস্তর ব্যবধান। লেখক আমিনুল ইসলামের ভাষায় সেই পরিবর্তনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে “গল্পে গল্পে বিংশ শতাব্দী” বইয়ে। তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত না হয়ে “গল্পে গল্পে বিংশ শতাব্দী” বইটি গল্প শোনাবে বিংশ শতাব্দীর সেইসব চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ঘটনাবলি, যার জেরে পরিবর্তিত হয়েছে আজকের একবিংশ শতাব্দী। এ বইটি শুধু ইতিহাসের খচখচানি নয়, এ বই হয়ে উঠবে সকল শ্রেণির পাঠকের জন্য উপভোগ্য এক দলিল। গল্পের আকারে উত্তেজনায় ঠাসা বিংশ শতাব্দীর যাবতীয় চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে উঠবে পাঠকের মানসপটে।
বিংশ শতাব্দীর মত এত ঘটনাবহুল শতাব্দী পৃথিবীতে বোধহয় আর দুটি আসে নি। পুরো পৃথিবীর খোলনলচটাই যেন পালটে গেছে এই ১০০ বছরে। দুটি বিশ্বযুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদের পতন, কমিউনিজমের উত্থান ও পতন, জ্ঞান বিজ্ঞানে নানা বৈপ্লবিক উন্নতি, বিশ্বের নানা প্রান্তের পরাধীন জাতির স্বাধীনতা পাওয়া, স্নায়ুযুদ্ধ, গণহত্যা - পৃথিবীর নাট্যমঞ্চে ১০০ বছর runtime এর এই নাটকে উত্তেজনা আর রোমাঞ্চের কোন কমতিই ছিল না।
বইটিতে দুই বন্ধুর কথোপকথনের মাধ্যমে গত শতাব্দীর রাজনীতি ও ভূগোলের নানা পালাবদল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ইতিহাসের মত কাটখোট্টা বিষয়কে খুবই সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে বইটাতে। তবে কেবল রাজনীতির (আরও ভালোভাবে বলতে গেলে দুই বিশ্বযুদ্ধ) উপরই লেখক মূলত গুরুত্বারোপ করেছেন। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি বুঝতে যুদ্ধ দুইটি সম্পর্কে জানতে হবে এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এদেরকে বেশী গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্য অনেক বিষয় সংক্ষিপ্ত করে বর্ণনা করতে হয়েছে। আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠেই আসে নি। যেমন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস প্রায় উপেক্ষিত থেকে গেছে, বিজ্ঞানের ইতিহাস তেমন উঠে আসে নি ইত্যাদি। আবার কিছুক্ষেত্রে তথ্যের পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
কিছু কিছু জায়গায় লেখককে বিশেষ মতবাদের উপর অতিবিতৃষ্ণ ও কিছু মতবাদের প্রতি অতি আবেগী মনে হয়েছে। (এটা আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভংগির জন্যও মনে হতে পারে।)
তবে পুরো বইতেই লেখক নিরেপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকেই বেশীরভাগ ঘটনা ব্যাখা করার চেষ্টা করেছেন । এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়।
বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ঘটনাবলি সংক্ষেপে বুঝতে বইটি একটা ভাল অপশন হতে পারে।
১. জারিফের বয়ানে ইতিহাস। জারিফের যেহেতু নির্দিষ্ট বিশ্বাস আছে ফলে পুরো বইয়ে আমরা একটা নির্দিষ্টি শ্রেণির ইতিহাসই দেখতে পাই। ২. পুরো বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস একটা ছোট কলেবরে আনতে গেলে যে সমস্যা হওয়ার কথা ছিলো সেটা হয়েছেই। অনেক টপিকই ডালপালা মেলতে পারে নি! ৩. চাকরি প্রত্যাশীদের জন্য লেখা যা লেখক স্বীকারও করেছেন। ফলে অনেক জায়গায় শুধু শুধু বিভিন্ন তারিখ, নাম এসেছে। ৪. বেশ বানান ভুল লক্ষ্যণীয়, সম্পাদনার দরকার আছে।
৩.৫ দেওয়া উচিৎ তবে ওভারল চিন্তা করে ৪ দিলাম। এই যে ৩ আর ৪ এর মধ্য থেকে তারা ৪ টি ই দিলাম এই অর্ধ তারা বেশী দেওয়ার মূল কারণ হলো বইটি চুম্বক এর মতো আটকে রাখে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ২য় বিশ্বযুদ্ধ আর স্নায়ুযুদ্ধের ইতিহাস যদি কেউ বেসিক জেনে নিতে চায় এই বইটি একদম আদর্শ। তার পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ও উঠে এসেছে। বই এর নেগেটিভ দিক হলো, "ভারতবর্ষের স্বাধীনতা" র পূরো ব্যাপার টাই অনুপস্থিত। একটা ছোট চ্যাপ্টার হলেও ডিজার্ভ করতো । আর লেখক অতিমাত্রায় আমেরিকা পন্থী ও কমিউনিস্ট বিরোধী। ইতিহাসের লেখায় এতটা পক্ষপাতিত্ব অনেক দৃষ্টিকটু।
এক মলাটে এই বিশাল সময়ের ঘটনা টেনে আনা সত্যিই দুঃসাধ্য। তবে লেখক কিছুটা সফল। বিশ্ব রাজনীতির সাধারণ ঘটনাবলী সম্পর্কে ধারণা নেই এমন কেউ বইটি নির্দ্বিধায় তুলে নিতে পারেন। চটকদার কিছু রেফারেন্স এর কথাও এনেছেন বইয়ে (যেমন: বই, চলচ্চিত্র) যেগুলো হয়ত অনেককে সাহায্য করবে। তবে বইয়ের ভাষাগত ত্রুটি এবং বানান ভুলের বিষয়টি উৎকটভাবে চোখে পড়ার মত। এইদিকে সম্পাদনা করা গেলে পাঠকের অভিজ্ঞতা আরো সুন্দর হবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সামগ্রিক চিত্র, স্নায়ুযুদ্ধ, বিশ্ব নেতাদের অবস্থান, বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিভিন্ন সংস্থার উত্থান,বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকের বিভিন্ন দেশের রাজনীতির সংক্ষিপ্ত আলোচনা এই বইয়ের আলোচ্য বিষয়। সংক্ষিপ্ত পরিসরে বিংশ শতাব্দীর উত্তাল সময়ে পরিভ্রমণের জন্য বইটি ভালো সঙ্গী হতে পারে।
বইটি পড়তে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছি বানান বিভ্রাটের জন্য।এত্ত ভুল!! প্রতিটি পৃষ্ঠায় বানান ভুল ছিল দেখার মতো।৮৪ পৃষ্ঠায় জার্মানির আত্মসমর্পণ হিসেবে সাল দেওয়া আছে ২০১৮ । ৪০০ পৃষ্ঠায় জনসংখ্যায় বৃহত্তম দেশ হিসেবে দেওয়া হয়েছে ইন্দোনেশিয়া। এছাড়া জাপানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ সম্পর্কে খুবই কম আলোচনা করা হয়েছে।একই কথা প্রযোজ্য চে গুয়েভারার রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে। সমসাময়িক রাজনীতি আলোচনায় বাংলাদেশের রাজনীতির কোনো প্রসঙ্গ আসেনি। এছাড়াও যদি বইতে আরো অনেক ছবি,ডায়াগ্রাম কিংবা ছক ব্যবহার করা হতো বইটি আরো বেশি সুখপাঠ্য হতো।
সর্বশেষ, বিংশ শতাব্দী ঘুরে যা জানতে পারলাম তা হলো মানুষের প্রতি মানুষের নিশংস আচরণ, মানুষ হত্যার কলাকৌশল, দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, সমাজতন্ত্রের অপব্যবহার,ক্ষমতার লোভ ইত্যাদি ইত্যাদি। সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে,সময় করে আবার পড়তে হবে।
সহজ, সাবলীল এবং সুখপাঠ্য ইতিহাস আলোচনা করা যায় তা এই বই থেকে জানলাম, যারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন তাদের জন্য এই বই টা মাস্ট মাস্ট রিড।
বিংশ শতাব্দী ১০০ বছরের কাহিনী।তাছাড়া এই শতাব্দী মানবজীবনে এক নতুন মোড় দিয়েছে।দুইটা মহাযুদ্ধ,অক্টোবর বিপ্লব,২য় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হওয়া,প্রোপাগান্ডা,১৯৫০ এর পর একে একে আফ্রিকা আর এশিয়ার দেশগুলা স্বাধীন হতে থাকা এগুলা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা আছে।এতগুলা বড় বড় ঘটনা ছোট আকারে প্রকাশ করলে যে ঝামেলা সৃষ্টি হয় সেটা দেখা গেছে বইয়ে।খুব বেশি ডিটেইল তো নাই তবে কাজে দিবে চাকরি পরীক্ষায় মুখস্থ করা লাগলে। যাই হোক, বইটা সেটার জন্যই করা।
খুবই সহজ ভাবে বিংশ শতাব্দীর ইতহাস জানার জন্য এই বইটা একটা মাস্টারপিস হবে। যাদের ইতিহাস ভালো লাগে না, ��ারা এই বই পড়লে আমার মনে হয় ইতিহাস ভালো লাগবে এবং সহজ খাদ্য হবে। বিগিনার লেভেল কেউ যদি বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস জানতে চান তাদের জন্য এই বইটা সেরা একটি বই। একেবারেই হাতে কলমে সহজবোধ্য ভাষা দিয়ে বিংশ শতাব্দীর তুলে ধরেছেন।
বিসিএসের আন্তর্জান্তিক বিষয়াবলী পড়তে বিরক্ত লাগছিলো। দোকানে এই বইটা উল্টেপাল্টে বুঝে গেলাম। এটাই আমার দরকার। গল্পের ছলে কাহিনি পড়ার মত করে ইতিহাস জানলেই তো চলছে। গৎবাঁধা গাইড বইগুলো পড়ে পড়ে তথ্য-উপাত্ত মুখস্ত করতে কে চায়!