রুদ্র সোম এই পৃথিবীর প্রথম প্রফেসর যার মূল্যায়ন করতে মঞ্চে নামে আমার মতন এলেবেলে ডাইনোসরেরা!
অবসরপ্রাপ্ত হলেই বা কি? মেটাফিজিক্সের এই প্রাক্তন অধ্যাপক / চার্চের রেভারেন্ড / বিদগ্ধ গোস্ট-হান্টারটির জগৎজোড়া খ্যাতি। কেবল আমার সাথেই ওনার কোনো সুসম্পর্ক তৈরি হলো না এতদিনে। আক্ষেপ এখানেই। সিরিজের প্রথম বইটি পড়েছিলাম আজ থেকে বছর-দেড়েক আগে। বইয়ের ন'টি গল্প নিয়ে বেশ বিশদে আলোচনা করেছিলাম এই প্ল্যাটফর্মেই।
সে জিনিস যে খুব একটা ভালো লাগেনি, তার প্রমাণ বইটির প্রতি ব্যায় করা দুটো করুণ তারা, ও রিভিউইয়ের নামে আমার হতাশামন্ডিত দুচ্ছাই। তবুও কোথাও গিয়ে সেবারে মনে হয়েছিল যে সিরিজের ভবিষ্যত নিয়ে ভরসা রাখা যায়। সিদ্ধান্তটির পেছনে, কৌশিক সামন্তের প্রতি আমার পাঠকস্বরূপ আস্থার অবদান অনস্বীকার্য। যা সামান্য হলেও, লেখকের 'মেলানকোলির রাত' নামক অমন চমৎকার সংকলনটির দ্বারা স্বার্থকতা পায়।
কিন্তু... দুঃখের ব্যাপার, প্রফেসরের সাথে আমার এই দ্বিতীয় মোলাকাতেও শান্তির পতাকা উড়ল না।
ব্যাপারটা ট্র্যাজিক। কারণ এবারের বইটি সাইজে ছোট। গল্প সংখ্যাও মাত্র তিনটে। নিজে হাতে কলেজ স্ট্রিট থেকে খুঁজেপেতে কেনা। আশাবাদী ছিলাম না, বলা অন্যায় হবে। অরণ্যমনের পরিবেশনাও পারফেক্ট। শক্তপোক্ত ছোট্ট হার্ডকভার। ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের দুরন্ত আর্ট-ওয়ার্ক। কৃষ্ণেন্দু মন্ডলের দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ, ঝকঝকে প্রিন্ট ও প্রমাদবিহীন বানানরীতি। সমস্ত টেকনিকাল ডিপার্টমেন্টেই প্রকাশকের খাতায় একশোয়-একশ!
বাট হোয়াট অ্যাবাউট গল্প? (ঠিক এখানেই কবি কেঁদে ভাসালেন...)
তবে, আগে, ক্রেডিট হোয়ার ক্রেডিট ইজ ডিউ। পুরোনো গল্পের তুলনায় এবারে লেখকের গদ্যশৈলী অনেকটাই গোছানো। সংলাপেও এসেছে যত্নের ছাপ। কৌশিক ও প্রফেসরের বন্ধুসুলভ সমীকরণও অনেক বেশি পরিণত ও ফ্লেশড-আউট। এছাড়াও, বিগত নয়টির তুলনায়, তিনটে কাহিনীই সর্বাংশে উন্নত ও পাঠযোগ্য। সিরিজের খাতিরে নিজের কমফোর্ট জোন থেকেও অনেকটা বাইরে বেরিয়ে এসেছেন লেখক।
কিন্তু বাধ গিয়ে সাধে গল্পের মূল ঘটনাপ্রবাহ। সাথে, একরাশ আইডেনটিটি ক্রাইসিস। যা উগ্ররূপে দেখা দেয় বইয়ের প্রথম গল্প 'ডায়েন'-এ। চরম কার্টুনিশ, সেন্টিমেন্টাল ও শিশুতোষ এই কাহিনীটি পড়ে মনে অবিলম্বে প্রমাদ গুনি। হতাশ হয়ে নিজেই নিজেকে শুধোই...আবার সেই তাড়াহুড়ো? আবার সেই বালখিল্যতা? কোথায় গেলেন মেলানকোলির মিনিগল্পের হরর লেখক? কোথায় গেলেন সেই পছন্দের কৌশিক সামন্ত?
ভক্তের করুন আর্তি শুনে হয়তো পরবর্তী দুটো লেখায় লেখক কিছুটা হলেও ফিরে এসেছেন। 'রুদ্র ভৈরব' এই সিরিজের সবচেয়ে বড় ও দেশজ কাহিনী। হোলি ক্রস ও পবিত্র জলের বাহক রেভারেন্ড সোমের জীবনে খাটি বাংলার গ্রামীণ তন্ত্রাচারের তমসাময় অপপ্রবেশ। ভালো লাগে, অনেকটা সময় নিয়ে ওয়ার্ল্ড বিল্ডিংয়ের প্রচেষ্টা। সাথে, ভীষণ নির্মল পন্থায় ভরসা জাগানিয়া কৃষ্ণভাবের সম্প্রসারণ। কিন্তু এই গল্পটিও একাধিক টাইম জাম্পের ভার বয়ে শেষলগ্নে অদ্ভুত দক্ষতায় কেচিয়ে যায়। হতাশ হই ভীষণ। ভরাডুবির হিসেব চোকাই মন খারাপ দিয়ে।
তবে এই মেঘাচ্ছন্ন আকাশেই ঝিলিক দেয় একখানা 'সিলভার লাইনিং'! বইয়ের শেষ গল্প 'শিকার', বইয়ের তথা সিরিজের অন্যতম সেরা কাহিনী। একটি আদ্যোপান্ত বিদেশি মেজাজের অন্ধকার আর্বান হরর। যার নেপথ্যে, এক দঙ্গল গোস্ট-হান্টিং ও আপেক্ষিক ধূসরতা। কথায় বলে, কাক কাকের মাংস খায় না। তবে প্রফেসরের স্মৃতিপটে বেজে ওঠে আরেক সুর। যার আঁধারঘাটা স্বরূপে বিলীন হয় ঠিক বা ভুল মাঝের সুক্ষ্ম বিভেদ। সাথে, উপরি পাওনা হিসেবে শেষপাতে প্রফেসরের চমৎকার ধোঁয়াটে রূপ! এইতো।
ওদিকে, বইয়ের অন্তিম পাতায় প্রায় বন্ড + ফেলুদা ছবির ন্যায় পেয়ে যাই অমোঘ প্রতিশ্রুতি বাক্য - "প্রফেসর সোম আবার আসবেই..." প্রফেসরের সাথে কি আমিও ফিরে আসবো? এই প্রশ্নের উত্তর লুক্কায়িত ন্যাড়া ও বেলতলা সংক্রান্ত আরেকটি প্রশ্নের চিরায়ত অন্তরে।
▫️বছর তিনেক আগে আমার প্রথম আলাপ হয়েছিল ‛প্রফেসর সোম’এর সাথে । রেভারেন্ড রুদ্র সোম, মেটাফিজিক্সের অধ্যাপনা করা মানুষটাকে সবাই ‛প্রফেসর সোম’ নামেই চেনেন । অধ্যাপনার ফাঁকে ফাঁকে প্রফেসর সোম, অন্ধকারের ছন্দবিহীন পংক্তিগুলির দ্বন্দ্ব মেরামতি করে থাকেন । আলো-অন্ধকারের ভারসাম্য রক্ষায়, অন্ধকারের কায়াদের সঙ্গে প্রফেসর সোমের সম্মুখ সমরের হাড়হিম করা নয়টি গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছিল ‛প্রফেসর সোম’ সিরিজের প্রথম বইটি । ইউনিক প্লট এবং টানটান লেখনীর কারণে গল্পগুলি পাঠকদের মধ্যে রীতিমতো সাড়া ফেলে দেয় । এরপর কেটে গেছে তিন-তিনটে বছর... অবশেষে “প্রফেসর সোম আবার” ফিরলেন ।
▫️যে কোনো ভালো বিষয়ের (তা সে সিনেমাই হোক, বা গল্পের বই) শুরুটা ভালো হলেই, সেই বিষয়টির সৃষ্টিকর্তার কাছে আমাদের ‛এক্সপেক্টেশন’ খুব স্বাভাবিক ভাবেই অনেকটা বেড়ে যায় । ঠিক সেইরকমই, প্রফেসর সোমকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার দাবীর পাশাপাশি পাঠককূলের আরও দুটি দাবী ছিল - ১) প্রফেসর সোমকে যেন দেশীয় পটভূমিতে পাওয়া যায়, এবং ২) গল্পগুলি যেন আকার-আয়তনে বৃদ্ধি পায় ।
লেখক মহাশয় সোমকে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় নিলেও তিনি কিন্তু পাঠকদের সবকটি দাবী যথাযথভাবে পূরণ করেছেন ।
📜 এই সংকলনে রয়েছে দুটি বড়োগল্প এবং একটি নভেলা ।
▫️১. ডায়েন : পিতৃসম ফাদার ডিসুজা’র চিঠি পেয়ে পুরুলিয়া ছুটে যান প্রফেসর সোম, এই অভিযানে তাঁর সঙ্গী হয়েছে ‛কৌশিক’। চিঠি পড়ে জানা যায় - এক অসমশক্তিধর ডায়েনের আক্রমণে মৃত্যুপথযাত্রী হয়েছেন ফাদার ডিসুজা । সেই শক্তির বিরুদ্ধে কীভাবে লড়বেন প্রফেসর সোম ?
▫️২. রুদ্র ভৈরব : এক ‛অঘোরী’ তান্ত্রিকের উত্থান এবং পতনের গল্প, চিরকালীন শুভ এবং অশুভের দ্বন্দ্বের গল্প ‛রুদ্র ভৈরব’। হ্যাঁ, গল্পের প্লট ভীষণ পরিচিত । কিন্তু গল্পে আছে - এক ভয়ংকর অঘোরী, বাঁশি হাতে কালো একটি ছেলে, এক সামান্য পূজারী, একটি লক্ষীমন্ত বালিকা, এক ধূর্ত জমিদার এবং একজন অসম-সাহসী পাদ্রী । আর আছে - মরণহাটির জঙ্গল, যেখানে দিনের বেলায় প্রবেশ করতেও বুক কেঁপে ওঠে । ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বাস আর অন্ধবিশ্বাস মেশানো কোন ঘটনার মধ্যে দিয়ে তন্ত্রসাধনার একান্ত নিজস্ব ঐতিহ্যকে চিনলেন প্রফেসর সোম ?
‛রুদ্র ভৈরব’ গল্পটি এই সংকলনের সবচেয়ে বড়ো গল্প ।
▫️৩. শিকার : অতীতের একটি ভুলের জন্য অনেক বড়ো খেসারত দিতে হয় প্রফেসর সোমের একসময়ের সঙ্গী ‛টরাস রেজমন্ড’কে । কিন্তু কি সেই ভুল ? যে ‛রক্তবীজের ঝাড়’ শেষ করার শপথ নিয়েছিলেন সোম এবং টরাস, তার কি আবার পুনরুত্থান হবে ? ‛গোস্ট-হান্টিং’এর উত্তেজনার আড়ালে চাপা পড়ে থাকা কোন্ অন্ধকারের গল্প কৌশিককে শোনালেন প্রফেসর সোম ?
📜 এই সংকলনটিতে প্রথম বইটির থেকে আলাদা কি আছে ?
▫️উত্তর আছে বইটির ভূমিকায় লেখা ঋজু গাঙ্গুলি মহাশয়ের কথায় - “ঠিক কেন ও কীভাবে প্রফেসর সোম আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছেন, তার একটি স্পষ্ট এবং চতুর্মাত্রিক মানচিত্র তুলে ধরেছে এই বইয়ের তিনটি কাহিনি । বদলে যাওয়া স্থান ও কালের তিনটি শ্বাসরোধী আখ্যানের মাধ্যমে এরা বুঝিয়ে দিয়েছে, কেন প্রফেসর শুধু একজন গোস্ট-হান্টার বা অকাল্ট ডিটেকটিভ বা প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেটর নন । তিনি একজন মানুষ— যিনি নিজের মানবিক দৌর্বল্য সত্বেও দুর্বলের পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করেন আমরণ, অবিশ্রাম । তারই সঙ্গে এখানে আমরা দেখি, এ-দেশের একান্ত নিজস্ব শক্তি ও দুর্বলতা, বিশ্বাস ও অপবিশ্বাস কীভাবে তাঁর মনোজগতে বিবর্তন ঘটিয়েছে ।”
📜 অন্ধকার বা অতিপ্রাকৃত ভয়ের যে জগত সেই জগতে লেখক যে বেশ স্বচ্ছন্দেই বিচরণ করেন, তার প্রমাণ আমরা আগেই পেয়েছি । কিন্তু এই সংকলনে লেখক চেষ্টা করেছেন নিজের চেনা পরিসর থেকে বেরিয়ে পাঠকদের নতুন কিছু উপহার দিতে, যার প্রমাণ পাওয়া যায় সংকলনের প্রথম দুটি গল্পে । তৃতীয় গল্পে আবার আমরা ফিরে পেয়েছি সেই চেনা ‛কৌশিক সামন্ত’কে । ‛রুদ্র ভৈরব’ গল্পে লেখক তুলে ধরেছেন ‛অঘোরী’ তান্ত্রিকদের সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য, আবার ‛শিকার’ গল্পটিতে পাওয়া যায় ‛গোস্ট-হন্টিং’ এবং ‛গোস্ট-হান্টিং’ সম্পর্কিত সুন্দর আলোচনা । তিনটি আলাদা পটভূমিতে লেখা তিনটি গল্প, প্রতিটি গল্পেই আছে লেখকের রিসার্চ, ক্ষুরধার লেখনী, গা-ছমছমে পরিবেশ এবং মোক্ষম ট্যুইস্ট । সবমিলিয়ে ‛প্রফেসর সোম’এর দ্বিতীয় বইটিও যে প্রথমটির মতোই ‛মাস্ট-রীড্’, তা বলাই বাহুল্য ।
কৌশিক সামন্তের প্রোফেসর সোম আবার! পড়ে মনে হল—এ যেন বাংলা সাহিত্যের নিজস্ব “অকাল্ট ইনভেস্টিগেটর” ঘরানার দৃঢ় প্রত্যাবর্তন, যার অনুরণন খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্বসাহিত্যের জন কন্সট্যান্টিন (Hellblazer) কিংবা উমবের্তো একোর The Name of the Rose-এর উইলিয়াম অব বস্কারভিলের মতো চরিত্রে। তবে সোম একেবারেই দেশজ—তাঁর ফাউন্ডেশনে মেটাফিজিক্স, মননে তন্ত্র-মন্ত্র, আর ফলস্বরূপ তিনি একটি জ্ঞানের ভাণ্ডার, যাঁর গল্পগুলিকে স্রেফ বৌদ্ধিক কৌতূহলের জন্যই পাঠযোগ্য করে তোলে।
তিনটি কাহিনির মধ্যে ‘ডায়েন’ অনেকটা আগের বইয়ের ধারাবাহিকতায়—উষ্ণ আপেটাইজারের মতো, যেখানে পুরুলিয়ার প্রেক্ষাপটে জমিদারবাড়ির অভিশাপের নিষ্পত্তি করেন সোম। ‘রুদ্র-ভৈরব’ স্পষ্টতই সংকলনের কেন্দ্রবিন্দু—অঘোরী তান্ত্রিক, শ্যামা নামে এক কিশোরীর বিপদ, আর মরণহাটির জঙ্গলের গাঢ় আবহ মিলিয়ে এটি অনেকটা ব্রাম স্টোকার বা মিখাইল বুলগাকভের ধাঁচে গঠিত, যেখানে অশুভের সঙ্গে দ্বন্দ্ব কেবল শারীরিক নয়, আধ্যাত্মিকও। আর ‘শিকার’—টুকরো টুকরো ঘটনার শেষে চমৎকার গিঁট খোলা, যা স্টিফেন কিংয়ের Bag of Bones-এর মতো ব্যক্তিগত শোক ও অতিপ্রাকৃত রহস্যের মেলবন্ধন ঘটায়।
বিশ্বসাহিত্যের অকাল্ট গোয়েন্দাদের কাজ রহস্য উন্মোচন -- এমন রহস্য, যার গভীরে লুকিয়ে থাকে অতিপ্রাকৃত, গূঢ়তত্ত্ব কিংবা গথিক আতঙ্ক। প্রফেসর সোমও সেই অন্ধকারের মুখোমুখি হন। কিন্তু তিনি এই অন্ধকারের মোকাবিলা কেবল শারীরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং করেন তাঁর অর্জিত জ্ঞান, গভীর গবেষণা ও বিশ্লেষণক্ষমতার শাণিত প্রয়োগে। তাঁর কর্মপদ্ধতি অনেকটা ড. ভ্যান হেলসিং-এর চিকিৎসাবিদ্যা ও অকাল্ট বিদ্যার মিশ্রণ, বা থমাস কারনাকির বিজ্ঞান ও তান্ত্রিক আচার মিলিয়ে কাজ করার পদ্ধতির মতো, আবার কিছুটা ড. জন সাইলেন্সের আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি ও দার্শনিক তীক্ষ্ণতার সঙ্গেও মেলে। পার্থক্য হল—সোম কেবল পাশ্চাত্য অকাল্ট lore নয়, নন-ওয়েস্টার্ন, বিশেষত ভারতীয় গূঢ়তত্ত্বেও সমান সিদ্ধহস্ত।
‘রুদ্র-ভৈরব’-এ ভারতীয় তন্ত্রবিদ্যার যে সুগভীর ও বিশদ উপস্থাপনা রয়েছে, তা উমবের্তো একোর সূক্ষ্ম ঐতিহাসিক রীতিনীতির বর্ণনার কথা মনে করায়; আবার ‘শিকার’-এর গোস্ট-হান্টিং কৌশলে পাওয়া যায় মাইকেল রোভি বা Ghost Hunters International-এর বাস্তবমুখী তদন্ত-পদ্ধতির স্বাদ। ফলত, সোমের অনুসন্ধান কেবল আতঙ্ক সৃষ্টি করে না, পাঠককে একইসঙ্গে জ্ঞানের গভীর গহ্বরেও টেনে নিয়ে যায়—যা তাঁকে ভ্যান হেলসিং, কারনাকি, ড. সাইলেন্স বা জুল দ্য গ্রাঁদাঁ-র মতো আন্তর্জাতিক অকাল্ট গোয়েন্দাদের সারিতে অনন্য মর্যাদা দেয়।
তবে বইটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয় — গতি মাঝে মাঝে হ্রাস পায় অতিরিক্ত ব্যাখ্যায়। তিনটি গল্পেই আগের বইয়ের তুলনায় চমকের মাত্রা খানিকটা কম। কিন্তু অলংকরণ, পটভূমির বৈচিত্র্য (দুটি গল্প বাংলা, একটি বিদেশ), এবং চরিত্রায়ণের স্থিতি এটিকে একটি সফল সিক্যুয়েল করে তোলে।
শেষমেশ, যদি আপনার The X-Files-এর মালডার-স্কালি, Jonathan Strange & Mr Norrell-এর মিস্টিকাল ভিক্টোরিয়ান লন্ডন, অথবা শার্লকীয় যুক্তিবাদের সঙ্গে গথিক হররের সংমিশ্রণ পছন্দের বিষয় হয় —তাহলে 'প্রোফেসর সোম আবার!' আপনার পড়া উচিত।
আর হ্যাঁ, আশা করি, সোম আগামীদিনে আরও শিহরণ-জাগানো অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবেন —কারণ এই অন্ধকারের গোয়েন্দার সম্ভাবনা, বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রেও, এখনও অত্যন্ত বিস্তৃত।
সদ্য পড়ে শেষ করলাম কৌশিক সামন্তের লেখা প্রফেসর সোম সিরিজের দ্বিতীয় বই "প্রফেসর সোম আবার"
আগের বই এর মতই এই বই টিতেও রয়েছে প্রফেসর রেভারেন্ড সোম এর জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার বিবরণ। তিনটি পৃথক কাহিনী নিয়ে নির্মিত এই বই যার প্রত্যেকটি গল্পই ভিন্ন স্বাদের ও ভিন্ন ধরনের প্যারানির্মাল অ্যাকটিভিটি ও এন্টিটি নিয়ে। এবার শুধু প্রফেসর সোম নন তার কর্মকাণ্ডের সাথে গল্পের কথক কৌশিক ও জড়িয়ে পড়েছে।।
গোস্ট হান্টিং ও গোস্ট হন্টিং এর যে পার্থক্য ও তার প্রকারভেদ নিয়ে সুনিদিষ্ট এক আলোচনা রয়েছে যা পড়ে ভালো লেগেছে।প্যারানোমাল অ্যাকটিভিটি নিয়ে নানান মজার তথ্য যা রোমাঞ্চকর, সাথে শিক্ষামূলক ও বটে।
সব থেকে ভালো লাগছে " শিকার " গল্পটি । গল্পটির বিল্ডআপ থেকে ক্লাইম্যাক্স খুব নিস কোয়ালিটির । যেহুতু সব গুল্পই ফিকশন তাই বাস্তব ভিত্তিক যে তথ্য বই তে রয়েছে , পাঠক যদি সেই হিসেবে গল্প গুলো মূল্যায়ন করে তাহলে ভুল হবে। পরবর্তী তে যেই পড়বেন এই বিষয়টি মাথায় রেখে পড়লে ভালো।।
✨ ভালো না লাগার মত একটি ব্যাপার রয়েছে-- তা হলো প্রথম গল্পটির শেষের দিকে , যে দিন প্রফেসর বানজারা মহিলাটির ছবি দেখলেন সেদিনই কিছু ক্ষণের মধ্যে শেফালী বলে একজন কে পেয়েও গেলেন তার মত দেখতে , এটা খাপছাড়া লেগেছে।।
শুধু গল্পটি নয় এই সামান্য অংশটি কৌশিক ও প্রফেসর সোম এই দুটো চরিত্র কে পাঠকদের কাছে হাসির পাত্র বানিয়ে দিচ্ছে।। লেখকের উচিত পরবর্তী এডিশন এ এটি ঠিক করিয়ে নেওয়া।।
✨ বই এর কোয়ালিটি ও বই এর কভার ও ভেতরে থাকা ইলাস্ট্রেশন গুলো খুব সুন্দর ।। সেক্ষেত্রে পাবলিশার্স ও লেখক কে সাধুবাদ ।।
⭐প্রফেসর সোম সিরিজের প্রথম বই ও দ্বিতীয় বই এর শেষ দুটো গল্প ধরে যদি বিচার করি তাহলে বলবো অবশ্যই আশা রাখব পরবর্তীতে আরও জমাটি কিছু প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেশন ভিত্তিক উপন্যাস লেখক আমাদের উপহার দেবেন।।
ডায়েন: প্রফেসর সোমের গুরু ফাদার ডিসুজা তার স্টুডেন্ট একজন ফরেস্ট রেঞ্জারের আমন্ত্রণে হাজির হন পুরুলিয়ার এক সুন্দর জঙ্গলে। সেই সুন্দর জঙ্গলের মধ্যে একটি পোড়োবাড়ি হয়ে ওঠে বিভীষিকা। প্রফেসর সোম আর কৌশিক কি পারবেন তার এক সময়ের শিক্ষককে উদ্ধার করতে?
রুদ্র ভৈরব: এবার প্রফেসর সোমের পাড়ি মরনহাটির জঙ্গল এবং সংঘাত অতি পরাক্রমি এক অঘোরীর সাথে যার শক্তির না আছে কোন সীমা। কিভাবে বাঁচাবেন এক রত্তি মেয়ে শ্যামাকে, পারবেন কি তার বাবার কাছে ফিরিয়ে দিতে?
শিকার: প্রফেসর সোম হলেন ঘোস্ট হান্টার কিন্তু এই গল্পে হান্টার কি নিজেই হান্টেড? যেখানে শিকারি একজন ভ্যাম্পায়ার। গল্পে পোর্টাল হান্টিং, পোল্টারজাইস্ট, রেসিডুয়াল হান্টিং সম্পর্কে বলা আছে সেগুলি খুবই ইন্টারেস্টিং।
বইয়ের অলংকরণ বা ছবিগুলি ভারি সুন্দর এবং তার সাথে প্রচ্ছদও।
কৌশিক সামন্ত সৃষ্ট প্রোফেসর সোম সিরিজের দ্বিতীয় সংকলন "প্রোফেসর সোম আবার!"। বহু প্রতীক্ষার পর মেটাফিজিক্সের প্রফেসর রেভারেন্ড রুদ্র সোম আবার হাজির হয়েছেন। সাথে এনেছেন তিনটি কাহিনী যার প্রতিটি ছত্রে মিশে আছে এক আদিম শিহরণ, অভিনবত্ব এবং ধূসর ভয়াল রসের স্রোত। 1.ডায়েন ২. রুদ্র ভৈরব ৩. শিকার ঋজু গাঙ্গুলীর ভূমিকা এবং ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের অলঙ্করণে সমৃদ্ধ হয়েছে এ বই। প্রফেসরের পরবর্তী অভিজ্ঞতাগুলির জন্য আবারও অপেক্ষায় রইলাম।