অমরনাথ একটু কেতাবি ঘরানার থ্রিলার। এক পাগলাটে সাংবাদিকের তথ্যের সুতোর প্রতিটা টান এই থ্রিলারে। অমরনাথ আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে স্বৈরাচারী এরশাদের সময়কার ঢাকার অন্ধকার সব কানাগলিতে, রাস্তায় আর মহাসড়কে। আর সাথে থাকবে এক খুনের রহস্য যা জটিল থেকে জটিল তর হয়েছে প্রতিটা মুহুর্তে, যা প্রশ্ন করবে অমরনাথের প্রতিটা প্রচেষ্টাকে। আপনাদের স্বাগত অনন্ত দহণে।
শুরু দেখে নড়েচড়ে বসেছিলাম। গল্পের টোনে ও শৈল্পিক সম্ভাবনায়। প্রথম দু’পেজের আর্টওয়ার্ক চোখধাঁধানো। জীবন্ত। কিন্তু পরের গুলো ঠিক ততটাই ম্রিয়মাণ ও মৃত। চরিত্র হিসেবে অমরনাথও যথেষ্ট পরিমাণে ফর্মূলাইক। কিছু গোঁয়ার প্রকৃতির গোয়েন্দা দেখা যায় না, মার মার কাট কাট? যেখানে যায় হাঙ্গামা বাঁধায়। এর নাক ফাটায়, তো ওর চেহারার নকশা পাল্টে দেয়। অমরনাথ ওই একই ছাঁচে গড়া। দৃষ্টিকটু লেভেলের ম্যাচিজমো ওর ভেতরে। ওকে সবাই কেন অত তোয়াজ করে তাও বোধগম্য না। একজন সাংবাদিককে কি এতটা তোয়াজ করে কেউ? নাকি তোয়াজ করে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের জন্য? সেটা হলেও বিশাল কিন্তু আছে। কারণ আমাদের দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের কেউই অতটা তোয়াজ করে না। কথাটা খারাপ শোনালেও, আমার মনে হয়, সত্য।
অমরনাথের কাহিনী গড়পড়তা মানের। আশির দশকের সেটিং শুনে বেশ আশাবাদী হয়েছিলাম। মনে করেছিলাম খানিকটা হলেও তখনকার চিত্র পাবো। কিন্তু ওখানেও আশাহত হতে হলো। স্রেফ মিছিলের ছবি দেখিয়ে ক্ষান্ত হয়েছেন লেখক।
পাঠ-প্রতিক্রিয়াঃ পড়ে ফেললাম মাতব্বর কমিকসের ' অমরনাথঃ অনন্ত দহন' বইঘর ইবুক অ্যাপ থেকে। কমিক্স নিয়ে আমি বরাবরই আগ্রহী। সেজন্য এক বসাতেই ফাস্ট বেজড ৪৮ পৃষ্ঠার থ্রিলার কমিক্সটি। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র অমরনাথ কে অনেক ভিন্ন ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যা সচরাচর অন্য সকল কেন্দ্রীয় চরিত্র এর মধ্যে দেখা যায় না। ক্ষ্যাপাটে, উগ্র, চরিত্রের অমরনাথ কে দেখে ভালো লেগেছে। গল্পটা অনেক আহামরি না হলেও এর গভীরতা অনেক। অমরনাথ এর চরিত্রের ব্যাক স্টোরিও আছে সেটা বুঝা যাচ্ছে গল্পে। আশা করি সামনে আরো অমরনাথ এর কথন পড়তে পারব।
আর্টওয়ার্ক এর কথায় আসলে প্রথম ৩ ৪ পৃষ্ঠার আকা দেখে দুর্দান্ত লাগলেও পরের অংশ টুকু সেই ছাপ ধরে রাখতে পারেনি। তার পরেও আর্টস্টাইল টা আমার কাছে ইউনিক লেগেছে। বিশেষ করে যে পৃষ্ঠায় অমরনাথ তার অফিসে অনেক বছর পর আসে, সে পৃষ্ঠা অনেক চমৎকার লেগেছে।
সসর্বশেষে বলব কমিক্স বাংলাদেশে আস্তে আস্তে নিজের জায়গা শক্ত করে দখল করছে। অনেক ভালো ভালো গ্রাফিক নভেল, কমিক্স পাচ্ছি আমরা। মাতব্বর কমিক্স এর এই কাজ আশা করি আরো ভালো হবে। আর দুর্দান্ত স্টোরিলাইন আর আর্টওয়ার্কে আমরা ভালো কিছু পাবার আশা রাখি।
কমিক বুক বা গ্রাফিক নভেল মানেই সবসময় আকর্ষনীয় সুপারহিরো বনাম সুপারভিলেন ব্যাটল নয়। প্রায় সবধরনের জনরা গ্রাফিক নভেল ফরম্যাটে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশও খুব পিছিয়ে নেই। কমিক্স অঙ্গনে এগুচ্ছে আমাদের দেশ। অমরনাথ : অনন্ত দহন, একটি থ্রিলার বইয়ের গ্রাফিক নভেলে উপস্থাপন বললে মনে হয় খুব একটা ভুল হবে না। তবে টাইমলাইন হচ্ছে ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের এবং লোকেশন হচ্ছে ঢাকা।
রাহুল অমরনাথ একজন সত্যানুসন্ধানী সাংবাদিক। অত্যন্ত বদরাগী, উদ্ধত, তীব্র ঝলমলে আলোর নিচে সমাজের উৎকট অন্ধকার দিক দেখা এই ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টের সাথে বিশ্বখ্যাত গ্রাফিক নভেল "ওয়াচম্যান" এর অন্যতম প্রধান একটি চরিত্র "রোর্সাক" একটু মিল পাওয়া যায়। গল্পের কয়েকটা প্যানেলের লিখা এলান ম্যুরের প্রতি ট্রিবিউট দেয়া হয়েছে মনে হলো। ব্যাপারটা একজন নিয়মিত কমিক্স পাঠক হিসেবে আমার পছন্দ হয়েছে। এভাবেই কমিক্স ফ্রেটার্নিটিটে রেস্পেক্ট টিকে থাকে।
অনুসন্ধানী এই পাগলা সাংবাদিক এবং তাঁর এক পুলিশ বন্ধু যারা খুব সম্ভবত একত্রে ৭১ এ যুদ্ধে গিয়েছিলেন, জড়িয়ে পড়েন এক রহস্যময় কেইসে। এক অল্পবয়সী নারীর আত্মহত্যা এবং ঘটনা পরবর্তী অনুসন্ধান অমরনাথ ও মহসিনকে নিয়ে যায় সমাজের বিভিন্ন অন্ধকার চোরাগলিতে। এদিকে সমান্তরালে ঢাকার সড়ক, মহাসড়কে চলছে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। অমরনাথ জানেন যে নর্দমায় নেমে ফাইট করতে হলে শরীর নোংরা হবেই। বেপরোয়া এই রিপোর্টার নোংরামির দিকে মাঝে মাঝে ঝুঁকে পড়েন। ডিটেকটিভের মতো জীবন বাজি রেখে এই কেইস সলভ করার গুরুদ্বায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়ে নেন অমরনাথ এবং মহসিন। রাহুল অমরনাথ ব্যক্তিগত জীবনে এম্নিতেই বেপরোয়া, কাউকে গোনার সময় তাঁর নেই। সিগারেট, অ্যালকোহল এবং নিজের কাজের বাইরে আশেপাশের কিছুর প্রতি রাহুলের কোন টান নেই।
৪৬ পৃষ্টার এই থ্রিলার বেশ ফাস্ট পেইসড। গল্প অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগুতে থাকে। অমরনাথকে কোন অজেয় শক্তি হিসেবে দেখানো হয়নি। বড়ছোট ব্লান্ডার তিনি নিজেও করেন। কমিক্স আর্ট নিয়ে আর কি বলবো! সাদী ইমদাদের কাজের ফ্যান আমি অনেক বছর ধরে। কমিক্সের চরিত্রগুলোকে অতীব সুন্দর, পারফেক্ট বানানোর দিকে না গিয়ে চরিত্রগুলোর দৃশ্যত প্রাকৃতিক খুঁত গুলো তিনি এত সূক্ষ্ম ডিটেইলে ফুটিয়ে তুলেন যে সেটা প্রশংসা না করে পারা যায় না। ৯০ এর দশকের ঢাকা শহর এবং সেই সময়ের আবহকে এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তিনি বেশ ভালোভাবে বের করে এনেছেন তাঁর শৈল্পিক দক্ষতার গুনে। প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে। বইয়ের নাম এবং রাহুল অমরনাথ যেন অনন্ত দহনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
লেখক রাগিব নিহাল তন্ময় এই অল্প বয়সে ভালো স্টোরিটেলিং শিখে ফেলছেন। গল্পটা গ্রাউন্ডব্রেকিং বলবো না তবে "ডার্ক এন্ড গ্রিটি" এর যে যুগে বাংলাদেশের কমিক্স প্রবেশ করেছে সেই যুগের সূচনার একটা অংশ বলবো। একশন সমৃদ্ধ এই গল্পে লেখক "টাইপরাইটার" নিয়ে যা লিখেছেন, একটি টাইপরাইটারের সঠিক প্রয়োগ সেটি যে একটি ভয়াবহ মারনাস্ত্রে পরিণত হতে পারে, সেই কয়েকলাইন অনেকদিন মনে থাকবে। গল্পটা শেষের দিকে একটু রাশড মনে হয়েছে, এছাড়া বেশ উপভোগ্য। তবে গল্পটা ডিস্টার্বিং। দূর্বল হৃদয়ের মানুষের জন্যে এই গল্প নয়। ভালোর সবসময় জিত হবে খারাপের বিরুদ্ধে এরকম নিজ ইগো পরিতৃপ্ত করার বাসনা লেখকের এই গল্প লিখার সময় মনে হয় ছিলো না। অনন্ত দহন আসলে কার নিয়তি? সেই আত্মহত্যা করা মেয়েটির? সারাদিন সিগারেট খাওয়া অমরনাথের, নাকি পাঠক আপনার?
❝এই শহর, যাদুর শহর প্রানের শহর ঢাকারে এই শহর, যাদুর শহর প্রানের শহর আহারে❞
চিরকুটের আলোঝলমলে জাদুর ঢাকা শহরের গানটা আমরা কমবেশি অনেকেই জানি। কিন্তু কথায় আছে না আলো যেখানে সবচেয়ে বেশি অন্ধকারও থাকে ঠিক তার নিচেই। এই জাদুর শহরে পাওয়া যায় এক লাশ! খুন নাকি আত্মহত্যা?
রগচটা সাংবাদিক অমরনাথ, লাশের ছবি তুলে অফিসে জমা দিয়ে দেয়। কিন্তু কিছু একটা যেন ঠিক নেই! কিন্তু কী? ছুটে যায় বন্ধুর কাছে সাধারণ কোনো লাশ নয় এটি। রহস্য আছে হয়তোবা ষড়যন্ত্রও। কিন্তু কে বা কারা রয়েছে এর পিছে? কী উদ্দেশ্য তাদের?
যুদ্ধের পরবর্তী সময় সম্ভবত স্বৈরাচারী বিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত কল্পপট। ঢাকার অন্ধকার দিকটাই তুলে ধরা হয়েছে। লাশের সন্ধান পেয়ে ছবি তুলতে যেয়ে জড়িয়ে যায় কেসের সাথে। সে সূত্রেই চষে বেড়াতে দেখা যায় ঢাকার অন্ধকার কানাগলিতে সাথে আছে কিছু একশন সিনও। খুব একটা টুইস্টেড বা জটিল কোনো রহস্য নেই। শেষটা আরও একটু গোছানো হলে ভালো হতো। চরিত্রায়ন কিছুটা জটিল মনে হয়েছে। মূল চরিত্র অমরনাথও কিছুটা আবছা থেকে গেছে। রগচটা, মারকুটে এক সাংবাদিক। সম্ভবত কোনো পাস্ট হিস্ট্রি আছে কিন্তু বইয়ে সেটা খোলসা করা হয়নি।
যেহেতু গ্রাফিক্স নভেল, বইয়ের ছবিগুলো নিয়েও কিছু বলার আছে। বরাবরই ডিজিটাল থেকে ট্রেডিশনাল আর্টের প্রতি ঝোঁক বেশি আমার। বইয়ের ছবিগুলো দেখেই স্বভাবতই অনেক খুশি হয়ে গেছিলাম। কিন্তু প্রথমের কয়েক পেজ বাদে বাকিগুলো কেমন জানি ঘোলা আর কালো কালো লাগে। স্কেচে লাইট-ডার্কের কম্বিনেশনে ডার্ক বেশি হয়ে গেছে। কিছু চরিত্রের ফেস অস্পষ্ট।
বইয়ের প্রোডাকশন ভালো হয়েছে। বাঁধাই, পেজের মান ভালো। প্রচ্ছদও সুন্দর।