Jump to ratings and reviews
Rate this book

রাজকীয় উৎসর্গ

Rate this book
ফিকটাস ওয়ার্ল্ড! ধনীদের জন্য বিনোদনের এক সুবিশাল ও সুনিরাপদ মাধ্যম। ডাবরি রাজ্যের বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত “ক্যান্তর”রা দৈববলে তৈরি করেন এই জগৎ। বাস্তব জগৎ থেকে সেই জগতে আসা-যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম তারা। এক দুর্ঘটনায় সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্যদের ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে ফেলে পালিয়ে যায় দুই ক্যান্তর। কিন্তু কেন?
বিপদ কড়া নাড়ছে! মুদ্রাকে জরুরি বৈঠক ডাকল ডাবরি রাজ্যের প্রধান দ্বিরেফ! পাশার দান গেল উল্টে। অন্যদের বাঁচাতে নিজেই সে এখন অনিবার্য বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে! দ্বিরেফ কি পারবে সবাইকে বাঁচাতে? পারবে নিজে বেঁচে ফিরতে?
পলাতক ক্যান্তরদের খোঁজে “খের বাড়ি”তে ছুটে যায় সহকারী প্রধান ক্যান্তর আলকানতারা। পা রেখেই বুঝতে পারে বাতাসে বিপদের গন্ধ। বিছানো হচ্ছে চক্রান্তের জাল! সে কি পারবে সেই জাল ছিন্ন করতে?
সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাজ্য “সোনার নালী”র প্রধান আলফি পিলগ্রিম ধ্বংস নাকি গড়া—কোন পথে হাঁটছেন?
দেবিদ্বার রাজ্যে দেখা মিলল অদ্ভুত এক তরুণীর। প্রাক্তন প্রধান ক্যান্তর ফিলিক্সকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সে। কী তার উদ্দেশ্য?
ডাবরি রাজকন্যা নৈঋত যে স্মৃতি সে বয়ে বেড়াচ্ছে তার রহস্য কী?
ডাবরির দুর্দিন আসন্ন! প্রয়োজন রাজকীয় উৎসর্গের। প্রস্তুত তো সবাই?

320 pages, Hardcover

First published January 23, 2022

2 people are currently reading
22 people want to read

About the author

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
0 (0%)
4 stars
10 (38%)
3 stars
12 (46%)
2 stars
3 (11%)
1 star
1 (3%)
Displaying 1 - 11 of 11 reviews
Profile Image for Peal R.  Partha.
211 reviews13 followers
February 16, 2022
⚈ স্পয়লার-ফ্রি রিভিউ⚊ ❛রাজকীয় উৎসর্গ❜ [৩.৫]

উৎসর্গ শব্দের মর্মার্থ ‘সৎ’ উদ্দেশ্য অর্পণের বিধান থাকলেও রাজকীয় উৎসর্গে সেই বিধানের বাস্তবতা কতটা জৌলুস নিয়ে জ্বলে উঠেছে; তা জানতে ঢুঁ মারতে হবে ❛রাজকীয় উৎসর্গ❜ উপন্যাসের ছয় রাজ্যের অন্তরালে।

বইটি নিয়ে আলোচনার পূর্বে, কিছু কথা বলে নেওয়া ভালো। বাংলায় ইতোমধ্যে ফ্যান্টাসির দারুণ এক জোয়ার বইছে। নিরবিচ্ছিন্ন গতির এই ধারাকে উজ্জীবিত করার খুঁটি আরও আগ থেকে গেড়ে বসানো হলেও; পূর্ণত্বের ছোঁয়া ❛রাজকীয় উৎসর্গ❜ উপন্যাসের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। আশা করছি এই ছোঁয়া সকল পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে দারুণ সব জগৎসৃষ্টির মাধ্যমে।

❛রাজকীয় উৎসর্গ❜ লেখকের এপিক ও হাই ফ্যান্টাসি জনরার বই। এখানে আছে নিজস্ব এক জগৎ, সেই জগতের চরিত্রদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, কিছু রাজ্যের উত্থান-পতনের অতীত, রাজনৈতিক কলহ, ফিকটাস ওয়ার্ল্ড নামক জাদুর ব্যবহার, ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কূটকৌশলের উত্তম ব্যবহার এবং হাজার বছরের প্রথা মেনে আসা—রাজকীয় উৎসর্গ।

রাজকীয় উৎসর্গ অনুষ্ঠিত হয়ে ‘ডাবরি’ রাজ্যে। পার্বত্য ভূপ্রকৃতির সৌন্দর্য, ক্যান্তর তৈরির আঁতুড়ঘর, ফিকটাস ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রিত এই রাজ্য মাতৃতন্ত্র। যেখানে রাজার চেয়েও রানি বেশি সম্মানিত। কিন্তু কোনো এক ঘটনাক্রমে বর্তমানে এই রাজ্যের শাসনকর্তা একজন পুরুষ! নাম দ্বিরেফ। প্রয়াত রানির পুত্র। ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ এবং সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ক্যান্তর। পুরো ছয় রাজ্যের অর্থনৈতিক ও শক্তির দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডাবরি রাজ্য।

প্রথম এবং অন্যান্য রাজ্যের হর্তাকর্তা হচ্ছে ‘সোনার নালী’। রাজ্য প্রধান আলফি পিলগ্রিম। ঠান্ডা মাথার অধিকারী, বুদ্ধিচাতুর্যে অভিন্ন। হাজার মানুষের রক্তে রঞ্জিত লালকুঠি এই রাজ্যের সবচেয়ে বড়ো স্থাপনা। স্বয়ং রাজার বসবাস যেখানে। এই রাজ্যের অভিজাত মানুষরা ফিকটাস ওয়ার্ল্ড ভ্রমণ করতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে।

‘মুদ্রাক’ হচ্ছে জ্ঞানীদের রাজ্য। উক্ত জগতের যত ইতিহাস, গবেষণা সম্পর্কিত নথি সব এই রাজ্যে বহাল তবিয়তে আছে। শত্রু হামলা ব্যতীত এই রাজ্যের সবচেয়ে বড়ো ভীতির কারণ—মৃত্যু ও ভূমিকম্প! মুদ্রাক প্রধান ইখলাছ। বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও সৌম্য-শান্ত চেহেরার মানুষটি ডাবরি রাজ্য দ্বিরেফের ঘনিষ্ঠ বন্ধুও বটে। বই পড়া যাদের নেশা; এই রাজ্য তাদের পছন্দের শীর্ষে না রেখে পারা যাবে না। অন্যান্য রাজ্য প্রধানদের নিয়ে সভা এবং অপরাধীর বিচার কার্য এই রাজ্যে হয়ে থাকে।

‘ভাঙন’ সম্ভবত এই জগতের সবচেয়ে অবহেলিত রাজ্য! অথচ ইতিহাসের দিকে তাকালে এই রাজ্যের শুরুটা এতটা তথৈবচ কখনও ছিল না। ভাঙনের ইতিহাস মহাকাব্যিক ইতিহাস। যে ইতিহাস কখনো কখনো রূপকথাকে হার মানায়। যে ভাঙনবাসী আজ ‘ক্যান্তর’ হওয়ার স্বপ্ন দেখে; অথচ এক সময় সাধারণ ভাঙনবাসীও ‘ফেলানর’ হওয়ার স্বপ্ন দেখত। ভাঙন একটি নদীর নাম। সুপ্রাচীন এই নদীর তীরে থেকে গোড়া পত্তন হয়েছিল এই সভ্যতার। বর্তমানে জাভিয়ার এই রাজ্যের প্রধান। অপবিদ্যা নিয়ে যার চর্চা।

‘দেবিদ্বার’ শান্তিপ্রিয় ও ঝুটঝামেলা এড়িয়ে চলা রাজ্য। নাচ-গান নিয়ে মেতে থাকা যাদের কাজ। এই রাজ্যের উপস্থিতি কাহিনিতে খুব অল্প সময়ের জন্য এসেছে; ঠিক যেমনটা এসেছে ‘কোয়ার্থ’ ও ‘হরকলি’ নিয়ে। ‘কোয়ার্থ’ রাজ্যকে দেখানো হয়েছে অন্ধকার ও বিভীষিকার রূপকে। যেখানে নির্বাসনে পাঠানো হয় অপরাধীদের। অপবিদ্য চর্চা ও অন্ধকারে থাকা মানুষরা এই রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত।

‘বিরান ভূমি’ রহস্যে আবৃতে থাকলেও; ‘জিন্দাবন’ নিয়ে দারুণ মিথ রচয়িতা রয়েছে। মানব সৃষ্টির শুরুর দিকে কাহিনি। অন্যদিকে পুরো গল্পের অর্ধেক আকর্ষণ লুফে নিয়েছে ‘খের বাড়ি’র কার্যক্রম। সাধারণ মানুষ, মধ্যবিত্ত এবং অপরাধীদের জন্য এই জায়গা আদর্শ। গণিকালয় হলেও রহ্যসের অনেকাংশ দখল করে রয়েছে ‘সোনার নালী’ বিনিয়োগের অন্যতম কেন্দ্র এই খের বাড়ি।

❛রাজকীয় উৎসর্গ❜ উপন্যাসের ম্যাজিক সিস্টেম হচ্ছে ‘ফিকটাস ওয়ার্ল্ড’ তৈরি করে। এই ম্যাজিক টার্ম যারা ব্যবহার করে তাদের বলা হয় ‘ক্যান্তর’। উক্ত জগতে ফিকটাস ওয়ার্ল্ড একপ্রকার অনুমোদিত ‘বিদ্যা’ অন্য দিকে এর বিপরীতে রয়েছে অনুমোদনহীন ‘অপবিদ্যা’ অর্থাৎ ডার্ক ম্যাজিক। এই অপবিদ্যা যারা ব্যবহার করে তাদের বলে—মিমপি, মুরাকিব ও মুজারিব। অনুমোদিত বিদ্যা ক্যান্তর’রা ব্যবহারের পাশাপাশি ‘ফেলানর’ যারা; তারাও এই বিদ্যা প্রয়োগে পারদর্শী ভূমিকা পালন করে। এমনকি ফেলানরদের নিকটে এই ‘ক্যান্তর’রা শিশু মাত্র।

ফেলানরদের ক্ষমতা আছে ‘ক্ষৌণী’ সৃষ্টি করার। ফিকটাস ওয়ার্ল্ড কল্পনার অংশ হলেও ক্ষৌণী এই জগতের অংশ। বাস্তব। এমন কিছু অংশ যা লুকিয়ে রাখা হয় অপবিদ্যা চর্চাকারী মিমপিদের থেকে। মানুষের ভালোর এবং জগৎ নিরাপত্তার জন্য যে-কোনো মূল্যবান বস্তু পৃথক করে ক্ষৌণী তৈরি করা হয়। ফিকটাস ওয়ার্ল্ড দিয়ে যা করা যায় না ক্ষৌণী দিয়ে তা অনায়াসে করে ফেলা সম্ভব। তাই এই ক্ষৌণী গোপন রাখা কর্তব্য। প্রশ্ন হচ্ছে—কোনো ক্ষৌণী কি বর্তমানে অবশিষ্ট রয়েছে? থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো ফেলানর জীবিত আছে কি?

রহস্য শুধু ক্ষৌণী কিংবা ফেলানর আছে কি নেই—তা নিয়ে নয়। এই ছয় রাজ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন সব প্রশ্ন; যেগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে ঢুঁ মারতে হবে ❛রাজকীয় উৎসর্গ❜ উপন্যাসে।

◆ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—

❛রাজকীয় উৎসর্গ❜ গতিময় এবং দেশিয় আবহ মেশানো এক সহজ-সাবলীল সুন্দর এপিক/হাই ফ্যান্টাসি উপন্যাস। সত্যিকার অর্থে এতদিন ফ্যান্টাসি নিয়ে শোনা যত অভিযোগ আমার অথবা যাঁদের ছিল; এই উপন্যাস সেটা অনেকটাই কমিয়ে দিতে সক্ষম। কেন অন্যান্য মৌলিক ফ্যান্টাসি থেকে এই বইটি ব্যতিক্রম—কয়েকটি দিক তুলে ধরার প্রয়াস করছি। অবশ্যই তা আমার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে।

● সূত্রপাত—

ধনীদের বিনোদনের জন্য ডাবরি রাজ্যে তৈরি করা হয় সুবিশাল ও সুনিরাপদ মাধ্যম ফিকটাস ওয়ার্ল্ড। আয়েদিস নামক এক বিশেষ কক্ষে এই ফিকটাস ওয়ার্ল্ড নির্মাণ করা হয়। বেশ নিরাপদ থাকা সত্ত্বেও এই ফিকটাস ওয়ার্ল্ড ভ্রমণে দুর্ঘটনায় শিকার হয় সোনার নালী থেকে আগত সম্ভ্রান্ত পরিবারের ত্রিশ সদস্য! পালিয়ে যায় দুই ক্যান্তর। কিন্ত কেন?

মুদ্রাকে জরুরি বৈঠক ডাকে ডাবরি রাজ্যের প্রধান দ্বিরেফ। উদ্দেশ্য ঘটমান দুর্ঘটনা নিয়ে আলোচনা ও করণীয়। সেই বৈঠকে হাজির হয় সোনার নালী প্রধান আলফি পিলগ্রিম এবং ভাঙন থেকে সদ্য রাজা হওয়া জাভিয়ার। উপস্থিত আছেন মুদ্রাক প্রধান ইখলাছও। কিন্তু সাহায্য চাইতে এসে সব পরিকল্পনা দ্বিরেফের বিপরীতে চলে যাচ্ছে! হঠাৎ শুরু হলো তৃতীয় মাত্রার ভূমিকম্প! যে ভূমিকম্প থেকে বেঁচে ফেরার সাধ্য কারও নেই। মৃত্যু অনিবার্য!

অন্যদিকে পলাতক ক্যান্তরদের খোঁজে ‘খের বাড়ি’ ছুটে যায় ক্যান্তর আলকানতারা। পাবে কি অপরাধীদের? আলফি পিলগ্রিম কোন কূটনৈতিক চাল নিয়ে ব্যস্ত? দেবিদ্বার রাজ্যে উপস্থিত একজন মিমপির। কী খুঁজছে সে? দ্বিরেফের ছোটো বোন নৈঋতের অদ্ভুত এই ক্ষমতার রহস্য কী? রাজকীয় উৎসর্গ বা কেন প্রয়োজন?

লেখক শুরুতে পাঠকদের রাজ্য, চরিত্র এবং আসন্ন বিপদ সম্পর্কে পরিচিতির মাধ্যমে গল্পের প্রথম স্তর সহজগম্য করে দেয়। অর্থাৎ কাহিনি শুরু হওয়ার পরপরই বিনা সময় ব্যয়ে প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ার পাশাপাশি কী এবং কেন তা জানা নিয়ে আগ্রহ তৈরি করে ফেলে। খুব বেশি বিস্তারিত লেখক শুরুতে প্রয়োগ করে বসেননি। ছোটো ছোটো অধ্যায়ে সামান্য কাহিনি এবং চরিত্র পরিচিত নিয়ে পর্বগুলো লেখা হয়েছে। সবকিছুর বর্ণনা, লেখক যতটুকু দেওয়া প্রয়োজন মনে করেছেন—তা দ্রুত দিতে পেরেছেন বলেই ভালো লেগেছে।

● গল্প বুনট » লিখনপদ্ধতি » বর্ণনা শৈলী—

লেখকের গল্প বুননের কৌশল পছন্দ হয়েছে। ছোটো ছোটো পর্বের লেখা কাহিনি বিন্যাসও চমকপ্রদ। সাধারণত ফ্যান্টাসি নিয়ে আমাদের সর্বপ্রথম অভিযোগ থাকে যে—মধ্যভাগ অথবা শেষ ভাগের বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা দিয়ে গল্পের সূত্রপাত করা হয়। কিছুটা নন-লিনিয়ার স্টাইলে। প্রায়ই ফ্যান্টাসি উপন্যাস এইভাবে লেখা হয়। তবে ❛রাজকীয় উৎসর্গ❜ উপন্যাসে লেখক এই দিকটি এড়িয়ে গেছেন সম্পূর্ণভাবে। বাহ্যিক বা অপ্রয়োজনীয় কোনো বর্ণনা দিয়ে অহেতুক সময় নষ্ট না করে মূল ঘটনা থেকে গল্প বুননের জাল বুনতে শুরু করে দেন।

এই বুনন কৌশলকে গতিশীল করতে সহযোগিতা করেছে লেখকের লিখনপদ্ধতি। দেশিয় আবহের কথা উল্লেখ করেছিলাম শুরুতে। এখানে সাহিত্যিক ধাঁচ বা সাহিত্য শব্দ নিয়ে ভেলকিবাজি খুব বেশি দেখা না গেলেও—কমবেশি অনেক রয়েছে। লেখকের নিজস্ব স্টাইলে তা সহজভাবে মিশেও গেছে গল্পের সাথে। মাঝে মাঝে লিখনপদ্ধতি কদাচিৎ দুর্বল মনে হলেও, ঘটনার ক্রমধারা অনুযায়ী তা আবার শক্ত সসৈন্যে মোড় নিয়েছে।

ফ্যান্টাসি উপন্যাসের মূল বিষয় হচ্ছে বর্ণনা শৈলী। একটি ঘটনাকে ঠিক কত সহজভাবে, পরিষ্কার লিখনপদ্ধতির মাধ্যমে পাঠকের মানসপটে ফুটিয়ে তোলা যায়। এই দিকটি রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো। বিশেষ করে কোনো রাজ্যের পারিপার্শ্বিক বর্ণনা, ফাইটিং সিকোয়েন্স, চরিত্রদের স্বকীয়তা নিয়ে বর্ণনা দিতে হয় জীবন্ত। না-হয় পাঠক ভাবনায় অপূর্ণতার রেশ থেকে যায়। ফলে কোনো কিছু বোধগম্য না হলে; সেটাকে নেগেটিভ পয়েন্ট হিসেবে মার্কিং করে রাখা হয়। তবে উক্ত উপন্যাসে এই দিকটি নিয়ে লেখক কোনো অভিযোগের অবকাশ রাখেননি। যে ফ্লো নিয়ে তিনি গল্প বলতে এবং গল্পের পারিপার্শ্বিক আবহের সাথে খাপ খাওয়াতে চেয়েছেন—সুন্দর ভাবে তা করতে পেরেছেন।

এখানে কয়েকটি কমতির কথা না বললে নয়। লেখকের বর্ণনায় দেশিয় ছাপ এত স্পষ্ট ছিল যে; তিনি মাঝেমধ্যে ঘটনার সাদৃশ্যতা দেখানোর জন্য আমাদের পৃথিবীর ‘গ্রামবাংলা’র কথা তুলে এনেছেন। যদি লেখকের সৃষ্ট জগতে সেই ‘গ্রামবাংলা’ নামক কোনো গ্রাম বা কোনোকিছুর ছায়াও দেখা যায়নি। এই দিকটি একান্ত ভুলে না-কি ইচ্ছাকৃত তা লেখকই ভালো বলতে পারবেন।

ভাষা নিয়ে স্বকীয়তা খুঁজে পাইনি। একটু খুলে বলি। একটি জগতের ছয়টি রাজ্য। সেই রাজ্যের মধ্যকার যে স্বভাবচরিত্র, পোশাক অর্থাৎ যেসব দিকগুলো দিয়ে এক জাতি থেকে অন্য জাতিকে পার্থক্য করা যাবে—সেই দিকটি একেবারেই মিসিং ছিল। সবচেয়ে অবাক লেগেছে যাতায়াত ব্যবস্থা নিয়ে কোনো যানবাহনের দেখা না পেয়ে। এক রাজ্য থেকে যে অন্য রাজ্যে যাওয়া-আসা করবে সে-জন্য রাস্তাঘাট যেমন প্রয়োজন তেমন সেই জগৎ অনুযায়ী যানবাহনেরও প্রয়োজন। অন্তত ঘোড়া জাতীয় কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব তো থাকার কথা। কিন্তু এই দিকটি নিয়ে লেখককে কোনো বর্ণনা দিতে দেখেনি। ভাষাগত পার্থক্য তেমন একটা চোখে পড়েনি। যেহেতু ট্রিলজির প্রথম বই; সেই অনুযায়ী এই বইয়ে সেই দিকটি বিল্ডাপ করার প্রয়োজনীয়তা ছিল।

যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দূরত্ব নিয়েও বিশেষ কিছু চোখে পড়েনি। অর্থাৎ এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যেতে কত দিন খরচ হয়, দূরত্ব কতটুকু। দ্রুত কোনো সংবাদ দিতে হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন; এ-রকম ছোটোখাটো দিকগুলোতে আরেকটু সুদৃষ্টি দেওয়ার দরকার ছিল।

দিনের হিসাব বাদ দিয়ে চরিত্রদের বিরতিহীন পদচারণ। শুধুমাত্র একদিনের ঘটনা নিয়ে লেখক প্রথম ১৫০+ পৃষ্ঠা লেখে ফেলেন! তিনি চাইলে বিরতি দিয়ে এই কাজটি করতে পারতেন। যদিও এই দিকটি নিয়ে বলাটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। তবে ফ্যান্টাসি হলেও বাস্তবতা বজায় রাখতে কিছুটা সময় তিনি ধাপে ধাপে ব্যয় করতে পারতেন। কাকতাল ঘটানোর উদ্দেশে সব ঘটনাগুলো একদিনে না ঘটিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দিনে ঘটালে আরও ভালো হতো বলে মনে করছি। যোগাযোগ আর দূরত্বের বিষয়গুলো এই দিকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আশা করছি ট্রিলজির দ্বিতীয় বইয়ে এই দিকটি আরও বিশদভাবে ফুটে উঠবে। ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি এই ছোটোখাটো দিকগুলো গণনায় রাখা উচিত। এতে গল্পের খুঁটি আরও শক্ত হয়।

● চরিত্রায়ন—

ফ্যান্টাসি গল্প অনুযায়ী চরিত্র থাকার কথা অগণিত। সৌভাগ্যক্রমে উক্ত উপন্যাসে ছয় রাজ্য মিলিয়ে সম্ভবত ত্রিশ-এর বেশি চরিত্রের দেখা পাওয়া যায়নি। প্রথম বই হিসেবে চরিত্র গঠনে লেখকের অনেকটা সময় কেটে যায়। শুরুর দিকে প্রধান চরিত্রগুলো প্রাধান্য পেলেও গল্প আগানোর সাথে সাথে নতুন অনেক চরিত্রের দেখা মিলতে থাকে। শেষের দিকে প্রায়ই চরিত্র স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়।

কাহিনিতে বৃহৎ যুদ্ধ দেখা না গেলেও, যে কয়েকটি ফাইটিং সিকোয়েন্স রয়েছে তার চেয়েও চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক দিক এবং একে অন্যকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা আমার নজর কেড়েছে। বিশেষ করে ডাবরি রাজ্যের দ্বিরেফের ছোটো বোন নৈঋতের কথা না বললেই নয়। অন্য দিকে মুদ্রাকের ইখলাস ও ক্যান্তর আলকানতারাকেও পছন্দ হয়েছে। এ-ছাড়া কোয়ার্থ থেকে আগত সানভিও আলাদা একটা ক্রেজ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। শেষ অবধি নৈঋত আর সানভির মধ্যকার লড়াই দেখার সমূহ সম্ভবনা থাকলেও কাহিনির শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। মোদ্দা কথা, উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলো পুরুষদের থেকেও শক্তপোক্ত লেগেছে।

● অবসান—

গল্পের শেষটা প্রথম বই অনুযায়ী ভালোই মনে হলো; যদিও ঘটনা মাত্র শুরু। ডালপালা যা মেলে দেওয়ার লেখক মেলে দিয়েছেন প্রথম বইতে। থিউরি অনুযায়ী অনেক কিছুর মিল-অমিল রয়ে গেলেও—ট্রিলজির প্রথম খণ্ড হিসেবে সন্তুষ্ট করেছে। অন্তত পড়ে আরাম পাওয়া গেছে।

যারা মৌলিক ফ্যান্টাসি পড়তে পছন্দ করেন না অথবা সহজ কোনো ফ্যান্টাসি বই দিয়ে পড়া শুরু করতে ইচ্ছুক—তাঁদের জন্য এই বইটি রেকোমেন্ডে অবশ্যই করব।

◆ লেখক নিয়ে কিছু কথা—

লেখকের প্রথম কোনো লেখা এবং বই দুই-ই পড়া। পূর্বে লেখকের লেখা পড়ার অভিজ্ঞতা না থাকলেও; বইয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছোটো ছোটো পোস্টের অংশগুলো থেকে লিখনপদ্ধতি নিয়ে অনেকটা ধারণা পেয়ে যায়। একটি বিষয়কে সহজ বর্ণনায় প্রকাশ করার যে প্রচেষ্টা তা উপন্যাসের পাতায়ও ভালোভাবে ফুটে উঠেছে।

লেখকের নিজস্ব যে স্বকীয়তা এবং গল্প বলার ঢং দুটোই ভালো লেগেছে। আশা করছি আগামী বইগুলোতে এই দিকটি আরও উন্নত এবং শক্তিশালী হবে। গল্প বলার পাশাপাশি অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়ে লক্ষ রাখার পূর্ণ পরামর্শ দিব। আশা করছি লেখক উপকৃত হবেন। আগামীর জন্য শুভকামনা রইল।

● সম্পাদনা ও বানান—

বইয়ে বানান ভুল নেহাত ছিল না। প্রচলিত ও অপ্রচলিত দুই ক্যাটাগরির-ই দু’রকম বানানের প্যাটার্ন (যেমন—ফেনিলকে লেখা ফেলিন) দেখা গিয়েছে।

৫১ পৃ: প্রথম লাইনে ডাবরি প্রধান না লিখে, ভাঙন প্রধান লেখা হয়েছে। এ-রকম টুকটাক কিছু ত্রুটি আছে। তবে দূরত্ব, ভাষাগত পার্থক্য, দিনের হিসাব; এই নিয়ে আরেকটু কাজ করা যেত বলে মনে করছি।

● প্রচ্ছদ » অলংকরণ » নামলিপি—

বইয়ের মতোই রাজকীয় প্রচ্ছদ। নামলিপি থেকে শুরু করে পুরো প্রচ্ছদ ভাবনা সবকিছু আকৃষ্ট করার মতো। সজল ভাইয়ের আরও একটি অসাধারণ কাজের মধ্যে অন্যতম এটি।

ওয়াসিফ নূর ভাইয়ের অলংকার সব সময়ের মতো সুন্দর। বিশেষ করে ডাবরির আর্টওয়ার্��টি। প্রথমটিতে যে ক্যান্তর ভয়ে ভীত অবস্থায় রয়েছে; তাকে কেন যেন বাঙালি মধ্যবয়স্ক কোনো আঙ্কেলের রূপ দান করা হয়েছে। পরনে আবার পাঞ্জাবি মনে হলো! লেখক কি এইভাবে চরিত্রটিকে দেখাতে চেয়েছেন?

● মলাট » বাঁধাই » পৃষ্ঠা—

পুরাই মাখন প্রোডাকশন। কাগজের মান, কমফোর্টেবল বাঁধাই। খুলে আরাম করে পড়ার মতো। ঠিক যে-রকমটা আমি চাই। এইরকম বই হাতে নিয়ে পড়ে প্রিমিয়াম ফিল পাওয়া যায়।

≣∣≣ বই : রাজকীয় উৎসর্গ • আল কাফি নয়ন
≣∣≣ জনরা : হাই/এপিক ফ্যান্টাসি
≣∣≣ প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০২২
≣∣≣ নামলিপি • প্রচ্ছদ : সজল চৌধুরী
≣∣≣ চিত্র অলংকরণ : ওয়াসিফ নূর
≣∣≣ প্রকাশনা : ভূমিপ্রকাশ
≣∣≣ মুদ্রিত মূল্য : ৫০০ টাকা মাত্র
≣∣≣ পৃষ্ঠা : ৩২০
Profile Image for Jheelam Nodie.
314 reviews12 followers
September 28, 2023
একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে। কিন্তু কেন ঘটছে কিছুই বুঝতে পারছি না। চরিত্রদের সাথে কানেক্ট করতেও পারছি না। বিরক্ত লেগেছে প্রচুর। তবুও টেনেটুনে শেষ করলাম। একমাত্র নৈঋত চরিত্রটাই একটু ফুটেছে, বাকিরা একেবারেই ম্লান।
Profile Image for তান জীম.
Author 4 books279 followers
February 26, 2022
ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান লেখক ঝুম্পা লাহিড়ির বই নিয়ে দারুণ একটা উক্তি আছে। তার উক্তিটি বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘এটাই বইয়ের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। কোন পা নাড়ানো ছাড়াই বই আপনাকে যে কোন জায়গা থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে।’ কি দারুণ সুন্দর সত্যি কথা, তাই না?
এই কথা টানার উদ্দেশ্য হচ্ছে, শেষ কিছুদিন আমিও পা নাড়ানো ছাড়াই ঘুরে এসেছি এমন জায়গা থেকে যেখানে আসলে পা নাড়ালেও যাওয়ার সুযোগ হতো না। এমনি এক জায়গা সেটা, যেখানে টাকা খরচ করলেও আসলে ঘুরতে যাওয়া সম্ভব না।
বলছিলাম কিছুদিন আগে ভূমি প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হওয়া বই ‘রাজকীয় উৎসর্গ’ নিয়ে। বইপাড়ার সবাইই মনে হয় এই বইটি নিয়ে ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছেন। যারা জানেননি, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, ‘রাজকীয় উৎসর্গ’ উপন্যাসটা হচ্ছে ফ্যান্টাসি উপন্যাস। আর ফ্যান্টাসি উপন্যাস বলেই আমি বলেছি, টাকা খরচ করলেও আসলে ‘রাজকীয় উৎসর্গ’ এর সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ড ‘ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে’ ঘুরে আসা সম্ভব না। ‘ফিকটাস ওয়ার্ল্ড’ হচ্ছে এমন একটা জায়গা যেটা তৈরী হয় একজন মানুষের ভাবনা অনুযায়ী। মানে সে মনে মনে কোন একটা দেখা/অদেখা জায়গাকে যেমন করে তৈরী করতে চায় তেমনি একটা জায়গা তৈরী হয়ে যায় আর সেখান থেকে ঘুরে আসতে পারে লোকজন (অবশ্যই সাথে গাইড হিসেবে থাকে যে সেই ওয়ার্ল্ডটা তৈরী করেছে সে)। আর এই বিশেষ ওয়ার্ল্ড যারা তৈরী করতে পারে, তাদেরকে বলা হয় ‘ক্যান্তর’। রাজ্য ‘ডাবরি’তে বসবাস করা এই ক্যান্তরদের সাথে স্বশরীরে যাবার টিকেট মেলে ‘সোনার নালী’ রাজ্যের ধনীদের। আমাদের আলোচ্য বইয়ের শুরুতেই ৩০ জন অভিযাত্রী নিয়ে দুই ক্যান্তর পাড়ি জমায় ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে। হঠাৎ সেখানে একটা সমস্যা দেখা দেয়, যেটা আগে কখনো হয়নি আর সে সমস্যা সমাধানে অপারগ হয়ে পালিয়ে যায় ঐ দুই ক্যান্তর। এখান থেকেই গল্প শুরু। কি হয়েছিলো সেখানে? এটা জানার জন্য ডাবরি প্রধান দ্বিরেফ যেমন উদ্বিগ্ন তেমনি নিজ রাজ্যের উঁচুস্তরের মানুষের বিপদ নিয়ে চিন্তিত ‘সোনার নালি’র প্রধান আলফি পিলগ্রিম। তবে এনারা উদ্বিগ্ন হলেও মনে মনে খুশি হয় ‘ভাঙন’ রাজ্যের প্রধান জাভিয়ার। তার কাছে এটাকে একটা সুযোগ হিসেবে মনে হয়। মনে মনে সে ভাবে, শুধুই ডাবরিই ক্যান্তর দিয়ে টাকা উপার্জন করে সমৃদ্ধশালী রাজ্যে পরিণত হবে, ওদিকে আর্থিক ভাবে হাঁটুভাঙা রাজ্য ‘ভাঙন’ আরো ভেঙ্গে পড়বে, এই দিন পাল্টাবার সময় এসে গেছে, প্রতিটা চাল চালতে হবে মাথা খাঁটিয়ে। রাজনীতিতে একটা চালই নেতাকে শীর্ষে নিয়ে যাতে পারে আবার ঐ একটা চালই পারে তাকে ধুলিসাৎ করে দিতে। এই ব্যাপারটা যে দ্বিরেফ বোঝে না, তা নয়। কিন্তু সে বিপদের ঘ্রাণ পাচ্ছে, এতদিন ধরে যাদেরকে শুভাকাঙ্খী ভেবে এসেছে তাদের আচরণেও কেমন যেন একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছে সে। ওদিকে পালিয়ে যাওয়া ক্যান্তরদের খুঁজে বের করতে রাস্তায় নেমেছে দ্বিরেফের ডানহাত সহকারী প্রধান ক্যান্তর, আলকানতারা। ঐ ক্যান্তরদের খুঁজে বের করার মাঝেই নির্ভর করছে, দ্বিরেফের রাজ্য শাসনের ক্ষমতা আর ডাবরির ভবিষ্যত। সুতরাং দাঁতে দাঁত চেপে ‘খের বাড়ি’র উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো আলকানতারা, রাজ্যের অপরাধীদের আড্ডাখানা ‘খের বাড়ি’তে কি সত্যি সে ক্যান্তর দুজন আত্মগোপন করেছে? আর যদি করেই থাকে তাহলে সে কি পারবে ওদের খুঁজে বার করতে? জাভিয়ার কি পারবে ভাঙনের সেই পুরনো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে? এর জন্য কত রক্তে রঞ্জিত করতে হবে তার হাত? আলফি পিলগ্রিম কোন পক্ষ সমর্থন করবেন? ক্ষমতার পাল্লা কোন একদিকে ভারী করে দিলেই যে বিপদ আসতে পারে, সেটা কি সামাল দিতে পারবেন তিনি? ওদিকে রাজ্যের পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে সানভি নামে এক রহস্যময় নারী, যে খুঁজে বেড়াচ্ছে ফিলিক্স নামে এক বৃদ্ধ ক্যান্তরকে? এই উদ্দেশ্য এই রহস্যময়ী নারীর?
এইসব প্রশ্ন নিয়ে এগিয়ে গেছে ‘রাজকীয় উৎসর্গ’। তবে এর বাইরেও আরো হাজারটা জিনিস আছে। সেগুলো নাহয় পাঠক বই থেকেই পড়ে নেবেন। আমি বরং চলে যাই বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়ায়।
ফ্যান্টাসী বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া দিতে গেলে আমি পাঠ-প্রতিক্রিয়াকে দুভাগে ভাগ করে নিই। এক ভাগে বলি, বইটা ফ্যান্টাসি হিসেবে কতটুকু ভালো লেগেছে আর আরেকভাবে বলি সাধারণ ভাবে চিন্তা করলে উপন্যাসটি কেমন হয়েছে। তো কথা না বাড়িয়ে বলি ফ্যান্টাসি হিসেবে ‘রাজকীয় উৎসর্গ’ কেমন লেগেছে আমার কাছে।
ফ্যান্টাসি উপন্যাস হিসেবে একটা বই কতটুকু স্বার্থক সেটাকে একজন পাঠকের আসন থেকে বিচার করতে বসলে, মূলত কয়েকটা বিষয় অবশ্যম্ভাবী হিসেবে চলে আসে। এগুলো হলো, ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং বা ওয়ার্ল্ড সেটিং, ম্যাজিক সিস্টেম, ফ্যান্টাস্টিক ক্রিয়েচার বা প্রাণী ইত্যাদি। আর সেই সাথে সকল উপন্যাসের মতো চরিত্রায়ন, প্লট, লিখনশৈলী এগুলো তো আছেই। ‘রাজকীয় উৎসর্গ’তে এ বিষয়গুলো কতটা ভালোভাবে উঠে এসেছে চলুন দেখি।
*ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং/ওয়ার্ল্ড সেটিংঃ যারা ফ্যান্টাসি উপন্যাস পড়েন তারা ভালো করেই জানেন, ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং ফ্যান্টাসিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং বলতে মূলত বোঝায় ফ্যান্টাসি উপন্যাসের মধ্যকার জগতটাকে লেখক কিভাবে সৃষ্টি করছেন সেটাকে। এখানে লেখক তার সুবিধামতো প্রকৃতিকে সাজাতে পারেন, নিয়ম সাজাতে পারেন, সৃষ্ট চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য সাজাতে পারেন। আমাদের পরিচিত এই পৃথিবীর মাঝেও তার গল্পের মঞ্চ হতে পারে (প্রাইমারী ওয়ার্ল্ড) আবার একদম সম্পূর্ণ আলাদা, অপরিচিত একটা পৃথিবীও তার গল্পের প্রেক্ষাপট হতে পারে (সেকেন্ডারী ওয়ার্ল্ড)। আবার লেখক চাইলে দুটো ওয়ার্ল্ড মিলিয়েও লিখতে পারেন। মোদ্দাকথা লেখকের মাথার ভেতর থাকা দুনিয়াটা এখানে তুলে ধরতে পারেন লেখক এবং ফ্যান্টাসি জনরার সবচাইতে মজার ব্যাপার হচ্ছে এখানে লেখক যা সাজাবেন তা কিন্তু আমাদের এই পৃথিবীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এমন কোন কথা নেই। যেমন : আমরা যেমন দেখি এই পৃথিবীতে কেবল মানুষরাই মনের ভাব পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করার জন্য কথা বলতে পারে। কিন্তু ফ্যান্টাসি গল্পে গাছেদেরও, প্রাণিদেরও এই ক্ষমতা থাকতে পারে। তবে লেখকের মন মতো তার সবকিছু লেখার অধিকার থাকলেও পরস্পর বিরোধসম্পূর্ণ কোন বিষয় চাইলেই লেখক আনতে পারেন না। যেমনঃ কোন একটা জগতে কোন গ্রাভিটি নেই কিন্তু প্রাণীরা সেই জগতে খুব সহজেই হেঁটে বেড়াচ্ছে এটা কিন্তু পরস্পর বিরোধসম্পূর্ণ একটা বিষয়। এটা যদি কোন লেখক তার ফ্যান্টাসি গল্পে লিখতে চান তাহলে তাকে অবশ্যই একটা যুক্তিযুক্ত সিস্টেম তৈরী করতে হবে।
তো রাজকীয় উৎসর্গের ওয়ার্ল্ডবিল্ডিং নিয়ে বললে বলতে হবে, লেখক এখানে বলা যায় দুটো ওয়ার্ল্ড তৈরী করেছেন। একটা হলো, সাধারণ রাজ্যগুলো অর্থাৎ ডাবরি, মুদ্রাক, সোনার নালি, কোয়ার্থ, ভাঙন, দেবিদ্বার ইত্যাদি (বইয়ের শুরুতে দারুণ একটা ম্যাপও আছে)। এই রাজ্যগ���লো ঠিক ভৌগোলিক বর্ণনাগুলো আরেকটু ডিটেইল হলে ভালো হতো বলে মনে হয়েছে। যেমন : পুরো বইটা পড়েও আমি বুঝতে পারিনি বইতে মূলত কোন রাজ্যের আয়তন কত। আর এই কারণে কোন রাজ্য থেকে কোন রাজ্য কত দূর সেটা বুঝতে পারিনি। আর ডিটেইলিং করতে গিয়ে এই ওয়ার্ল্ডের মানুষের ইতিহাস নিয়ে একটু লিখেছেন লেখক, যেখানে বলা হয়েছে, মানুষকে আগে শাসন করতো ডেমিটন নামে এক প্রজাতি, যাদেরকে আমার জিন গোত্রের কিছু একটা ��নে হয়েছে। তবে এই ডেমিটন হঠাৎ কি করে মানুষের ওপর শাসন করার ক্ষমতা হারালো তা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। আর সব গুলো রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে পাঠক হিসেবে, অন্তত দুপাতা হলেও জানতে চাইছিলাম আমি। এখানে লেখক আমাকে একটু হতাশ করেছেন। তবে রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে একেবারেই যে কিছু আসেনি, এমন নয়। যেমন : লেখক ভাঙন রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন। সে ইতিহাসে জানা যায় ভাঙন একসময় সমৃদ্ধ রাজ্য ছিলো, কিন্তু সে রাজ্যের অধঃপতন হিসেবে যে কারণটা দেখানো হয়েছে সেটা আমার কাছে খুব একটা কনভিন্সিং মনে হয়নি। তবুও রাজ্যগুলোর মাঝে ডাবরি, সোনার নালি আর ভাঙনই প্রাধান্য পেয়েছে এবং এগুলোর ডিটেইলিং চলনসই হয়েছে। তবে বই পড়ে আমার মনে হচ্ছে, মুদ্রাক বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা রাজ্য, তবে মুদ্রাক নিয়ে কেন বিশদ বিবরণ দেয়া হয়নি এইটা আমি বুঝতে পারিনি।
এই তো গেল, সাধারণ রাজ্যগুলোর ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং। এবার আসি ফিকটাস ওয়ার্ল্ড নিয়ে ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং এর ব্যাপারটায়। ফিকটাস ওয়ার্ল্ডের আইডিয়াটা আমার কাছে মাইন্ডব্লোয়িং একটা আইডিয়া মনে হয়েছে। ভাবছি আর তৈরী হয়ে যাচ্ছে, সেখানে গিয়ে মানুষ ঘুরতে পারছে, নিজেদের মত করে কোয়ালিটি টাইম পাস করতে পারছে; এই পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে দারুণ ভালো লেগেছে। কিন্তু আফসোস লেগেছে যে এই চমৎকার ফিকটাস ওয়ার্ল্ড নিয়ে লেখক বইতে একদমই কম লিখেছেন। ফিকটাস ওয়ার্ল্ডের গোড়াপত্তন কিভাবে হলো তা জানা যায়নি, কিন্তু আমার মতে এটা বেশ জরুরী একটা বিষয় ছিলো। আমরা জানতে পারি ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে যেতে পারে ক্যান্তররা। আর এই ক্যান্তররা সব রাজ্যেই পায় দারুণ সম্মান। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে এই ক্যান্তর পেশাটা লোভনীয় একটা পেশা। তো লোভনীয় হলে সবাইই তো ক্যান্তর হতে চাইবে, রাইট? কিন্তু সবাই তো ক্যান্তর হতে পারবে না। ক্যান্তর হতে হলে যোগ্যতা লাগবে। কিন্তু কি যোগ্যতা লাগবে তা জানা যায়নি, ক্যান্তর হবার প্রসেস কি সেটাও জানা যায়নি এমনকি একজন ক্যান্তর কিভাবে অভিযাত্রীদের ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে নিয়ে যান সেটাও বলা হয়নি। যেমন : হতে পারে, ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে যাবার সময় ক্যান্তর যাদের হাত ধরেন বা যারা ক্যান্তরের হাতে ধরা ব্যক্তির হাত ধরেন এবং যারা কোন না কোন ভাবে ক্যান্তরের শরীর স্পর্শ করে রাখেন তারাই ক্যান্তরের সৃষ্টি করা ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে যান। এরকম আরো বেশ কিছু জিনিস অত্যন্ত জরুরী ছিলো, যা লিখলে বইটার ওয়ার্ল্ড সম্পর্কে পাঠকের ধারণা আরো পরিষ্কার হতো বলে আমি মনে করি। পরিশেষে ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং নিয়ে আমি বলবো, লেখক আইডিয়াটা দারুণ করেছেন কিন্তু এক্সিকিউশন/ডিটেইলিং আরো বেশী পরিধি ডিজার্ভ করে। যে কারণে ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং আমার কাছে বেশ খানিকটা দূর্বল মনে হয়েছে।
*ম্যাজিক সিস্টেমঃ ম্যাজিক সিস্টেম বলতে লেখকের সৃষ্টি করা ওয়ার্ল্ডে ম্যাজিক কিভাবে কাজ করবে, কারা কারা ম্যাজিক করার ক্ষমতা রাখে, কাদের ওপর সেগুলো কাজ করবে/কাদের ওপর কাজ করবে না এইসব সুনির্দিষ্ট নীতিমালাকে বোঝায়। এখানে লেখক ঐ ওয়ার্ল্ডের নিজস্ব কোন সায়েন্সও তৈরী করতে পারেন যেটা আমাদের জগতের সাথে হয়তো মিলবে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে হবে, বোঝাতে হবে সিস্টেমটা কিভাবে কাজ করে। রাজকীয় উৎসর্গে আমরা ফিকটাস ওয়ার্ল্ড, ক্ষৌনী তৈরী আর সানভির ক্ষমতা (কি ক্ষমতা সেটা স্পয়লার হবার ভয়ে এড়িয়ে গেলাম) ছাড়া আর কোথাও ম্যাজিকের দেখা পাইনি। সুনির্দিষ্ট কোন ম্যাজিকাল সিস্টেমের বর্ণনাও উপন্যাসে উঠে আসেনি। সে হিসেবে এই উপন্যাসের ম্যাজিক সিস্টেমকে একদমই ‘সফট ম্যাজিক’ হিসেবে ধরে নিচ্ছি। তবে এই সিরিজের পরবর্তী উপন্যাসে ম্যাজিক সিস্টেমের বিপুল অ্যাপ্লিকেশন আশা করছি এবং আমি মনে করি ম্যাজিক সিস্টেম দাঁড় করানোর একটা ফোরশ্যাডো ইতোমধ্যে রাজকীয় উৎসর্গে করা হয়েছে।
*ফ্যান্টাস্টিক ক্রিয়েচার/প্রানী/এলিমেন্টঃ ফ্যান্টাসি উপন্যাসে স্পেশাল কিছু প্রাণী প্রায়ই দেখা যায় যেগুলোর অস্তিত্ব থাকে লেখকের কল্পনায়, আমাদের এই বাস্তব জগতে নয়। যেমন : হ্যারি পটার সিরিজে আমরা দেখি ইউনিকর্ন, হাউজ এলফ, ট্রল। লর্ড অফ দ্যা রিংস এ আমরা দেখি ডোয়ার্ফ জাতি, এলফ জাতি ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজকীয় উৎসর্গে এরকম কোন ম্যাজিক্যাল ফ্যান্টাস্টিক প্রাণী নেই তবে এখানে ক্ষৌনী নামে একটা অদ্ভূত বস্তু/এলিমেন্টের কথা এসেছে, যেটার অস্তিত্ব আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে এবং এই বস্তুর বিশেষত্ব বলি আর এই সিরিজের তার ভূমিকাই বলি, সেটা যে বিশাল কিছু তা লেখক অল্প কথায়ই বুঝিয়ে দিয়েছেন। এই ক্ষৌনীর ব্যাপারটাতে নতুনত্ব ছিলো আর আমি বিশ্বাস করি এটা সব পাঠকেরই ভালো লাগবে।
এবার আসি সকল জনরার উপন্যাসের ক্ষেত্রে সর্বজনীন যে বিষয়গুলোতে নজর দেয়া হয় সেদিকে।
‘রাজকীয় উৎসর্গ’র শেষটুকু পড়লেই বোঝা যায় এটা একটা সিরিজ হতে যাচ্ছে। যেহেতু একটি সিরিজ হতে যাচ্ছে সে হিসেবে এর প্লট নিয়ে আসলে বেশি কিছু বলার নেই। তবে এটুকু বলাই যায় যে, সিরিজের প্রথম বইটি যেরকম হওয়া উচিৎ, পাঠকের মাঝে যতটুকু আগ্রহ সৃষ্টি করা উচিৎ, তার প্রায় সবটুকুই রাজকীয় উৎসর্গ করতে পেরেছে। তবে ডিটেইলিং এর দিকে আরেকটু মনোযোগ দিলে সিরিজের পরবর্তী বইগুলোর দিকে পাঠক আরো আগ্রহী হতো আমার ধারণা। আর রাজকীয় উৎসর্গ বলে যে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে এই জিনিসটি নিয়ে আমি ঠিক ক্লিয়ার নই। মানে এই উৎসর্গটি কেন করতে হবে? শুধুই রীতি বলে? নাকি কোন স্পেশাল ব্যাপার আছে? আর এই রীতির ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরী কি? কবে থেকে শুরু হলো, কেন শুরু হলো?
চরিত্রায়নের ব্যাপারে বলবো, লেখক কোন চরিত্রেরই খুব একটা ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরী দেননি। যেটুকু দিয়েছেন তাতে চলে, কিন্তু আরেকটু ডিটেইল হলে ভালো হতো। যেমন : নৈঋত নামের চরিত্রটি আমার মাঝে সবচাইতে আগ্রহ সৃষ্টি করছে। তার রহস্যময় কথা-বার্তা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, বিজ্ঞ-জ্ঞানীর মত আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু মাত্র ১৪ বছর বয়সী এই মেয়ের এরকম ভারিক্কী চিন্তাভাবনার পেছনের কারণ আমি জানতে পারিনি। হতে পারে সে একজন প্রডিজি, তবে তা নিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি। তা সত্ত্বেও সিরিজের পরবর্তী বইতে আমি নৈঋতকে নিয়ে জানতে পারবো আশা রেখে এই বিষয় এখানেই ক্ষান্ত দিলাম। তবে চরিত্রায়নের ব্যাপারে যদি কারো ওপর অবিচার হয় সেটা হলো, মুদ্রাকের প্রধান ইখলাছ। এই লোকটা নিঃসন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা রাখেন কিন্তু তাকে নিয়ে স্রেফ একটা ফোরশ্যাডো করা হয়েছে, ডিটেইল কিছুই জানানো হয়নি। এছাড়া চরিত্রায়নে লেখক বাদবাকি যা করেছেন তা আমার কাছে মোটামুটি ভালোই লেগেছে। বেশ কিছু চরিত্র (যেমন : সানভি, মুসা, আলফি পিলগ্রিম) নিয়ে লেখক যে ফোরশ্যাডো তৈরী করেছেন তা বেশ সাসপেন্স তৈরী করেছে এটা আমাকে যেমন পরবর্তী বই পড়তে বাধ্য করবে তেমনি বাকি পাঠকদেরও করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আর লেখকের লিখনশৈলী নিয়ে বললে আমি বলবো, আল কাফি নয়নের লিখনশৈলী অনেক ভালো। অনেক ভালো মানে অনেক ভালো। যে কোন বয়সের পাঠক কিংবা কিংবা যে কোন জনরার পাঠক খুব সহজেই বইটি পড়তে পারবেন, বিরক্তি আসবে না আশা করি। তবে ডিটেইলিং এর দিকে মনোযোগ দেয়া উচিৎ। এই ডিটেইলিং যেখানে দরকার সেখানে না হয়ে বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় জায়গায় হয়েছে যা বইয়ের মেদ বাড়িয়েছে বলার মত নয়, তবে ওগুলো না হলেও চলতো আমার ধারণা।
তো এই ছিলো রাজকীয় উৎসর্গ নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা। ভালো/খারাপ বলার চেয়ে গঠনমূলক আলোচনা বেশি করতে পেরেছি বলে আমার বিশ্বাস এবং আমি মনে করি, এই গঠনমূলক আলোচনা পাঠককে বই নিয়ে যেমন আগ্রহী করে তোলে তেমনি লেখককেও পরবর্তী বই নিয়ে ভাবতে সাহায্য করে।
পরিশেষে, বইয়ের কোয়ালিটি নিয়ে আমি কখনোই খুব একটা মাথা ঘামাইনি। এবারও ঘামাচ্ছি না। তা সত্ত্বেও বলছি, বইটির প্রচ্ছদ করেছেন সুলতান আযম সজল এবং এই বইতে এই প্রচ্ছদ ভীষণ ভাবে মানিয়ে গেছে এবং দেখতে চমৎকার লাগছে। আর বইয়ের পেজ কোয়ালিটি, বাইন্ডিং এভারেজের একটু ওপরে বলবো। তবে এগুলো ছাপিয়ে যে বিষয়টা আমি বলতে চাই, তা হলো, ভূমি দারুণ একটা সাহস দেখিয়েছে। দেশীয় আনকোরা নতুন লেখকের মৌলিক ফ্যান্টাসি ছাপানোর ক্ষেত্রে শব্দটাকে আসলে সাহস না বলে দুঃসাহস বলাটাই শ্রেয়। এই একটি কারণই ভূমিকে আর দশটা প্রকাশনী থেকে আলাদা করেছে। হ্যাটস অফ টু ভূমি। আশা করি ভূমি ভবিষ্যতেও সাহিত্যের বিকাশে এভাবেই রিস্ক নেবে এবং এই রিস্ককে পাঠক বই কিনে পূর্ণ সম্মান দেবে।
লেখক আল কাফি নয়নকে একইসাথে সাধুবাদ এবং কনগ্রাচুলেশন্স জানাচ্ছি। সাধুবাদ আপনার এই প্রচেষ্টার জন্য এবং কনগ্রাচুলেশন্স কারণ আপনি সঠিক পথেই হাঁটছেন বলে। আশা করি অচিরেই আপনি আপনার কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন।

মুদ্রিত মূল্য : ৫০০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩২০
জনরা : ফ্যান্টাসি
প্রচ্ছদ : সুলতান আযম সজল
Profile Image for Aadrita.
276 reviews228 followers
June 19, 2022
অনেকদিন ধরে পড়তে চাওয়া আরেকটা বই। বাংলা ফ্যান্টাসীর জন্য এই বছরটা আসলেই দারূন যাচ্ছে। তবে বেশি এক্সপেক্টেশন থাকার কারণেই হয়তো রাজকীয় উৎসর্গ কিছুটা হতাশ করলো।

ঘটনার শুরু ডাবরি রাজ্যে, যেখানে আছে ধনীদের বিনোদনের বিশেষ ব্যবস্থা। জাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী ক্যান্তররা নিজের কল্পনামাফিক তৈরী করতে পারেন নতুন জগৎ, যার নাম ফিকটাস ওয়ার্ল্ড। ঝামেলা বাধে তখনই যখন দুই ক্যান্তর ত্রিশ জন অতিথিকে নিয়ে ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে যান কিন্তু কোন অশুভ শক্তির মুখোমুখি হয়ে অতিথিদের সহ বাস্তবে ফিরতে পারেন না। আসন্ন বিপদ নিয়ে আলোচনা করতেই ডাবরি প্রধান জরুরি সভার ডাক দেন এবং সভায় যোগ দিতে রওনা হন মুদ্রাকে। বাকি সব রাজ্যের প্রধানদের উপস্থিতিতে আলোচনা শুরু হয় ফিকটাস ওয়ার্ল্ডের ভবিষ্যত নিয়ে।

সেকেন্ডারী ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসী হিসাবে ওয়ার্ল্ডবিল্ডিং বেশ চমৎকার। ফিকটাস ওয়ার্ল্ডের তত্ত্বাবধানে থাকা 'ডাবরি', জ্ঞানের রাজ্য 'মুদ্রাক', রহস্যময় ও অপবিদ্যার চর্চাকারী 'কোয়ার্থ', অবহেলিত দরিদ্র রাজ্য 'ভাঙন', অপরাধীদের জায়গা করে দেওয়া 'খের বাড়ি', কারও সাতে পাঁচে না থাকা 'দেবিদ্বার' এবং ক্ষমতার শীর্ষে থাকা 'সোনার নালী' সহ আরও ছোটখাটো কিছু স্থানের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই দুনিয়া। রাজ্যগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ও বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য বইতে উঠে আসলেও তাদের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, বাসিন্দাদের পোশাকআশাক, ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক পার্থক্য খুব বেশি লক্ষ্যনীয় ছিলো না। সব রাজ্যেই পরিচিত গ্রামবাংলার একটা ছাপ চোখে পড়ছিলো। এমনকি পুরো বইজুড়ে চরিত্ররা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বার কয়েক যাত্রা করলেও যাত্রার মাধ্যম বা অতিবাহিত সময় নিয়েও সেভাবে উল্লেখ ছিলো না। ফ্যান্টাসীর দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো কিছুটা অপূর্ণতা রেখে গেলো।

ম্যাজিক সিস্টেমের এই বইতে যেটুকু দেখা গেছে সেটুকু যথেষ্ট আগ্রহ জাগানিয়া। ফিকটাস ওয়ার্ল্ডের পাশাপাশি জাদুবিদ্যা চর্চাকারী ক্যান্তর, ফেলানর অথবা অপবিদ্যা চর্চাকারী মিমপি, মুরাকিব, মুজারিব; ম্যাজিকাল অবজেক্ট ক্ষৌণী, ধী-আয়েদিসের মাধ্যমে বেশ চমৎকার ম্যাজিক সিস্টেম তৈরী করেছেন যার সম্পর্কে আশা করি পরের বইগুলোতে আরো বিস্তারিত পাবো।

রাজকীয় উৎসর্গ অনেকটাই পলিটিক্যাল ফ্যান্টাসী। ডাবরি, মুদ্রাক, ভাঙন, সোনার নালী, খের বাড়ির প্রধানদের মধ্যে ক্ষমতার সূক্ষ্ম লড়াই নিয়েই কাহিনী। পলিটিক্যাল যেকোনো কাহিনীতে প্রয়োজন পড়ে চালাক চতুর, ধূর্ত, ক্ষমতাবান, ঠান্ডা মাথার কিছু চরিত্রের। তার বদলে এখানকার সব চরিত্রগুলোই যথেষ্ট আবেগপ্রবণ ছিলো। সোনার নালীর প্রধান আলফি পিলগ্রিম আর ডাবরির রাজকুমারী নৈঋত ছাড়া কোনো চরিত্রই বিশেষভাবে আকর্ষণীয় ছিলো না। তবে কিনা পুরো বই জুড়ে মূল চরিত্র কে এই নিয়ে পাঠককে অনুমানে রাখার ব্যাপারটা উপভোগ্য ছিলো।

লেখকের লেখনশৈলী, বর্ণনাশৈলী বইয়ের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখার মতো। বাহুল্যদোষ বা পুনরাবৃত্তিদোষ একেবারেই নেই বললে চলে। একইসাথে বিভিন্ন রাজ্যে চলতে থাকা বিভিন্ন ঘটনাবলি সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন বইতে। ছোট ছোট অধ্যায়ে কাহিনীর বিন্যাস বেশ ভালো লেগেছে। পুরো বইজুড়ে লেখক অনেক অনেক প্রশ্ন রেখে গেছেন। সিরিজের ক্ষেত্রে বই ক্লিফহ্যাঙ্গারে শেষ হওয়া স্বাভাবিক তবে তিনশ পৃষ্ঠার বই শেষ করে উত্তরের থেকে বেশি প্রশ্ন পাওয়ায় আমার পাঠক সত্তা কিছুটা হতাশ।

আমার এই পোষ্টের উদ্দেশ্য কোনো দিক দিয়েই লেখক বা তার সৃষ্টিকে ছোট করা নয়। ফ্যান্টাসী সাহিত্যের একনিষ্ঠ ভক্ত আমি। নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বইয়ের ত্রুটিপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। আশা করি লেখক সামনের বইতে আরো ভালো কাজ দেখাবেন। রাজকীয় উৎসর্গের অপেক্ষায় ছিলাম প্রায় বছর দুয়েক, ধী-আয়েদিসের অপেক্ষায় থাকার পালা এখন। লেখকের জন্য শুভকামনা।
Profile Image for Mahmudul Hasan.
16 reviews2 followers
February 13, 2022
ফ্যান্টাসি জনরাতে জোয়ার আসছে। আল কাফি নয়নের রাজকীয় উৎসর্গ সে জোয়ারের সর্বশেষ সদস্য।

এটি মূলত হাই ফ্যান্টাসি উপন্যাস—যার বিশেষত্ব হলো সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ডবিল্ডিং। অর্থাৎ, আমাদের চেনাজানা পরিচিত জগত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা জগত সৃষ্টি করা। আমাদের জগতকে বলা হয় প্রাইমারি বা রিয়েল ওয়ার্ল্ড। হাই ফ্যান্টাসির পটভূমি এই চেনাজানা জগতে নয়; বরং রচিত হয় একটা বিকল্প, কাল্পনিক জগতে—যার মেকানিজম প্রাইমারি ওয়ার্ল্ড থেকে আলাদা।

আরেকটি বিশেষত্ব হলো প্লট, পটভূমি বা চরিত্রের মহাকাব্যিক প্রকৃতি। সাধারণত, সমগ্র জগতের ভবিষ্যৎ সংকটাপন্ন থাকে এ ধরণের গল্পে।
উদাহরণ দিলে হয়তো বুঝতে সুবিধে হবে—যদিও ফ্যান্টাসির এই শ্রেণীবিভাগ নিয়ে ব্যাপক কাইজ্জা আছে!

হ্যারি পটার হাই ফ্যান্টাসি নয়, কারণ ম্যাজিকাল এলিমেন্টস থাকলেও এটার পটভূমি আমাদের পৃথিবীতেই।

রাজকীয় উৎসর্গের ম্যাজিক সিস্টেম হলো ফিকটাস ওয়ার্ল্ড। ম্যাজিশিয়ানদের বলা হয় ক্যান্তর। যে বিশেষ ঘরে ফিকটাস ওয়ার্ল্ড তৈরী করা হয় তাকে বলে আয়েদিস। ফিকটাস ওয়ার্ল্ড আসলে কী?

কাল্পনিক এক জগত। ক্যান্তর কল্পনায় যা ভাববেন তা ম্যানিফেস্ট করে। তিনিই এই কাল্পনিক জগত তথা ফিকটাস ওয়ার্ল্ডের ঈশ্বর। আয়েদিসে যারা থাকবেন তাদের সবাইকে নিয়ে এই জগতে প্রবেশ করতে পারবেন তিনি। দূর থেকে মনে হবে, আয়েদিসের সবাই বুঝি ভ্যানিশ হয়ে গেলো।

এই ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে সাংঘাতিক এক দুর্ঘটনায় ৩০ জন প্রভাবশালী নিখোঁজ হন। নারকীয় এই ফিকটাস ওয়ার্ল্ডের ক্রিয়েটর দুই ক্যান্তর পালিয়ে যান রহস্যজনকভাবে। ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে এই বিশৃঙ্খলা মানে পুরো জগতের সমস্ত মানুষেরই অস্তিস্ত্ব সংকটে পড়ে যাওয়া।
রাজকীয় উৎসর্গের কাহিনীর সূত্রপাত এখানেই। উপন্যাসটি বিশাল কলেবরের কাহিনীর প্রারম্ভ মাত্র। এখানে মূলত সেকেন্ডারি এই জগতের পটভূমি গাঁথা হয়েছে। এস্ট্যাবিলিশ করা হয়েছে সবকিছু কীভাবে ফাংশন করে। সে ব্যাপারে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি।
মোট ছয়টি রাজ্য—ডাবরি, মুদ্রাক, সোনার নালী, ভাঙন, দেবীদ্বার ও হরকলি—নিয়ে এ জগত গঠিত।

ডাবরি

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু। ক্যান্তর প্রশিক্ষণ এখানেই দেয়া হয়। আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র ডাবরিতেই ফিকটাস ওয়ার্ল্ড তৈরী করা যায়। অন্যান্য রাজ্যের আগ্রহীদেরকেও ডাবরিতে এসে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী তারা ডাবরিতেই থাকবে এবং ফিকটাস ওয়ার্ল্ড তৈরী করবে। ডাবরি প্রধানের নাম দ্বিরেফ। তিনি প্রডিজি, ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ক্যান্তর, মাত্র ১১ বছর বয়সেই ফিকটাস ওয়ার্ল্ড তৈরী করতে সক্ষম হন। যদিও ডাবরি মাতৃতান্ত্রিক রাজ্য, দ্বিরেফ একমাত্র পুরুষ শাসক। দ্বিরেফের ছোট বোনের নাম নৈঋত।

মুদ্রাক

রাজ্য প্রধানদের সভা এখানে বসে। এ জগতের জ্ঞানবিজ্ঞান, গবেষণা মূলত এখানেই হয়ে থাকে। অন্য কোথাও সাধারণত বই পড়া হয় না। সুতরাং সেন্ট্রাল লাইব্রেরি অর্থে মুদ্রাকই শেষ আশ্রয়। মুদ্র��ক প্রধান ইখলাছ, জগত শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। বিচার ব্যবস্থা মুদ্রাকে অধিষ্টিত হয়।

সোনার নালী

এ্যাপারেন্টলি সব থেকে প্রভাবশালী, ধনী রাজ্য। অন্যান্য রাজ্যের নিয়ন্ত্রণও এদের হাতে। আলফি পিলগ্রিম এর কর্ণধার। বংশ পরম্পরায় পিলগ্রিম গোষ্ঠীই সোনার নালীর ত্রাণকর্তা। আলফি পিলগ্রিম ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা ও শান্ত-সৌম্যের প্রতীক। রহস্যজনকভাবে এ বংশের আর কেউ বেঁচে নেই!

ভাঙন

সভ্যতার সূচনা ভাঙনের তীরে হয়েছিল। ভাঙন একটি নদীর নাম। মানুষের পূর্বে ডেমিটন এ জগত শাসন করতো। মানুষ ছিল তাদের দাস। যেভাবে মানুষ সভ্যতার সূচনা করে তা বেশ ইন্ট্রেস্টিং স্টোরি। এই ডেমিটনদের পরাভূত করে বানানো হয় আজ্ঞাবাহী জিন-এ, সৃষ্টি হয় জিন্দাবনের। সেসব সুদূর অতীতের কথা। ভাঙন হাজার বছর ধরে সত্যিকার অর্থেই ভেঙ্গে পড়েছে। সবচেয়ে দীনহীন অবস্থায় জীবনযাপন করে এ রাজ্যের মানুষ। এ অঞ্চলের মানুষকে দারিদ্র কতোটা গ্রাস করেছে তার একটা উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন—নাপিত দিয়ে গোঁফদাড়ি কামানো বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে। ভাঙন প্রধান জাভিয়ার, তার বাবার নাম জ্যাসপার—সাবেক ভাঙন প্রধান। জ্যাসপারের বাল্যবন্ধু জসুয়া নামের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের দেখা মেলে। জসুয়ার যমজ ছেলে লিভান ও ইভান। জাভিয়ারের ডান হাত লিভান।
গল্পে মূলত এই ৪টি রাজ্যের ব্যাপারেই তথ্য দেয়া হয়েছে। দেবিদ্বারকে বলা হয়েছে নিরপেক্ষ রাজ্য। হরকলির ব্যাপারে তেমন কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

এ বাদে সোনার নালীর এক জায়গা গল্পে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও রিকারিং এলিমেন্ট হিসেবে এসেছে—খের বাড়ি। যার তুলনা এশিয়ার সবচেয়ে বড় গণিকালয় দৌলতদিয়া হতে পারে।

এছাড়াও কোয়ার্থের কথা বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। মুদ্রাকে অপকর্ম প্রমাণের পর অপরাধীদের নির্বাসনে পাঠানো হয় কোয়ার্থে। হ্যাঁ, এ জগতে ট্র্যাডিশনাল কোনো কারাগার নেই। এখানকার মানুষদের অন্যান্য রাজ্যের মানুষ প্রচণ্ড ভয় পায়। সানভি নামের এক চরিত্রকে পেয়েছি এ অঞ্চলের—যার এগজিস্টেন্সেই সবাই ভীত হয়ে গেছে।

আইন অনুযায়ী ম্যাজিক প্র্যাকটিসের বাইরেও অপবিদ্যার চল আছে, যা অবৈধ। প্র্যাক্টিশনারদের মিমপি বলা হয়। ফিকটাস ওয়ার্ল্ডের তথাকথিত রুলস বা শর্ত তাদের উপর প্রযোজ্য নয়। যাদুবিদ্যার বিভিন্ন ধাপ রয়েছে তাও অনুমেয়। ক্যান্তরদের পরের লেভেলকে যেমন বলা হয় ফেলানর, যদিও সর্বশেষ ফেলানর কে ছিল তাই কেউ বলতে পারবে না, এতোই আগের ঘটনা সেটা। তেমনই মিমপিদের পরবর্তী ধাপ মুরাকিব, মুজারিব। নেক্সট লেভেল যাদুবিদ্যার ব্যাপারে আমরা শুধু হিন্টস পেয়েছি।

গল্পের প্রয়োজনে যেসব চরিত্র ও রাজ্য এসেছে সেগুলো বেশ যত্নের সাথে সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে অনেক অস্পষ্টতাও রয়েছে। যেমন—

ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের মানুষের মধ্যে আপাত কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। সবার একটা ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ রয়েছে সম্ভবত। সব রাজ্যের মানুষই একই ভাষায় কথা বলে, নিদেনপক্ষে কোনো আঞ্চলিকতাও পাওয়া যায় না। বিশাল ভৌগলিক এলাকার মানুষের চেহারায় বৈচিত্র্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেটা লেখায় আসেনি। এমনকি গল্পে স্পষ্টত আছে, ডাবরির মানুষ আরেকজন ডাবরিবাসীকে আলাদা করে চিনতে পারছে না। কালচারাল ডাইভারসিটি বা এলিমেন্টসও অনুপস্থিত। রাজ্যগুলোর বিস্তৃতি বা সীমারেখা সম্পর্কে তেমন ধারণা পাওয়া যায় না। গল্পে যেভাবে এসেছে তাতে মনে হয়েছে মাত্র কিছুদিনের দূরত্বে মূল শহরগুলো। দূরত্ব অ্যাজ ইন ঘোড়ার দূরত্ব সম্ভবত। এছাড়াও রাজ্যগুলোর আন্তঃসম্পর্ক স্পষ্ট নয়। একটা ঠাণ্ডা সম্পর্ক রাজ্যপ্রধানদের মধ্যে অবশ্যই আছে। কিন্তু রাজ্যের মানুষের জাতীয়তাবাদ বা বিভেদ সেভাবে আসেনি। সোনার নালীর বশ্যতা সবাই আদপেই কেন স্বীকার করে নিয়েছে তা স্পষ্ট না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, রাজ্যগুলোর মধ্যে ইতোপূর্বে কোনো বড় রকমের যুদ্ধ বা কোনো এক রাজ্যের অন্যায় আগ্রাসনের ঘটনা হয়নি। এতো ভারসাম্য কীভাবে এস্ট্যাব্লিশ হলো তা বুঝলাম না। এসবই হতে পারে, পরের বইয়ে পরিষ্কার করা হবে, আমি জানি না।

লেখনশৈলীর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি। সর্বোপরি, সম্পাদনা ও প্রুফ রিডিংয়ে আরও মনযোগ দাবী করছি। চরিত্রের নাম ভুল হওয়া বা এতোগুলো মুদ্রণ প্রমাদ বইয়ে থেকে যাওয়া কোনো বইই ডিজার্ভ করে না, স্পেশালি এরকম ফ্যান্টাসি উপন্যাস তো একেবারেই না।

রাজকীয় প্রচ্ছদ ও দুর্দান্ত অলংকরণের জন্য যথাক্রমে সজল চৌধুরী ও ওয়াসিফ নূরকে অসংখ্য ধন্যবাদ। সুপার্ব হয়েছে সবকিছু।

রাজকীয় উৎসর্গের ভবিষ্যতে কী লেখা আছে তা জানতে সুপার এক্সাইটেড।
Profile Image for Kudrate Jahan.
13 reviews19 followers
February 14, 2022
ফিকটাস ওয়ার্ল্ড। ধনীরা বিনোদনের জন্য ঢুকে পড়ে এই মেটাভার্স-জাতীয় জাদুকরী রাজ্যে। সেখানেই হঠাৎ ঘটে যায় দুর্ঘটনা। সেই রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে বিভিন্ন ঘটনার পাকেচক্রে জড়িয়ে পড়ে চরিত্রগুলো।

কাহিনী আর খুব বেশি কিছু বলছি না। মূল রাজ্য আর চরিত্রগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে পারি।

বইয়ের মূল রাজ্য সোনার নালী, ডাবরি, ভাঙন, দেবিদ্বার, কোয়ার্থ, হরকলি। সোনার নালী হলো সবচেয়ে ধনী এলাকা। সবচেয়ে ধনশালীদের আবাস সেখানে। ডাবরিতে থাকে ক্যান্তরেরা। এই ক্যান্তরেরা তাদের কবচের সাহায্যে সৃষ্টি করে ফিকটাস ওয়ার্ল্ড। ডাবরির বাইরে অন্য কোথাও ফিকটাস ওয়ার্ল্ড তৈরি করা নিষেধ। ক্যান্তরদের মধ্যে যারা। এই ওয়ার্ল্ড বানানোর ব্যাপারে আরো কিছু নিয়ম আছে। সেই নিয়ম যারা মানে না, তাদের বলা হয় মিমপি। মিমপিদের উপরের স্তরে আছে মুরাকিব আর মুজারিব। এরা সবাই বেসিক্যালি কালো জাদুকর।
মুদ্রাকে বসবাস করে জ্ঞানীরা। মুদ্রাক বাদে অন্য কোথাও বই পড়ার প্রচলন নেই তেমন। রাজপ্রধানদের সভাও হয়ে থাকে এখানে। দেবিদ্বার মোটামুটি নিউট্রাল একটা এলাকা। কোয়ার্থে সাধারণত সব অপরাধীদের নির্বাসনে পাঠানো হয় আন্দামানের মতো। এটা কিছুটা নিষিদ্ধ এলাকা বলা চলে। এছাড়াও আছে খেরবাড়ি, যাকে দৌলতদিয়ার সাথে তুলনা করা যায়।

সোনার নালীর প্রধান হলো আলফি পিলগ্রিম। ডাবরির প্রধান দ্বিরেফ, তার বোন নৈঋত, দ্বিরেফের ডান হাত আলকানতারা, প্রধান ক্যান্তর ইথান। মুদ্রাকে আছেন মহাজ্ঞানী ইখলাছ। ভাঙন প্রধান জাভিয়ার, তার বাবা জাসপার, তার বন্ধু জসুয়া, জসুয়ার দুই যমজ ছেলে ইভান ও লিভান। এছাড়া আছে প্রাক্তন প্রধান ক্যান্তর ফিলিক্স। আরো বিভিন্ন ক্যান্তরের দেখা আমরা পাই। যেমন - সাইফ, কাইফ, মুসা, কবীর। কোয়ার্থ থেকে আসে সানভি।

ফিকটাস ওয়ার্ল্ড বাদে আরো কিছু জাদুকরী জিনিসের নাম জানি আমরা। যেমন - ক্ষৌণী। এই জগতে রাখা নিরাপদ নয়, এমন জিনিসকে আলাদা করে ফেলা হয় ক্ষৌণীরূপে। ক্ষৌণী নিয়ন্ত্রণ করতে পারা ক্যান্তরদের বলা হয় ফেলানর, তবে স্মরণকালের মধ্যে এরকম পারদর্শী ক্যান্তরের দেখা মেলেনি, যারা ফেলানর হতে পারবে।

রাজকীয় উৎসর্গটা কী? জিনিসটা আসলে খুবই ঘৃণ্য একটা চুক্তি। ���ড়ে গা গুলিয়ে গিয়েছিল প্রায়।

এই বইয়ের প্রধান উদ্দেশ্য পুরো ওয়ার্ল্ড এস্ট্যাবলিশ করা এবং ক্যারেক্টারগুলোর সাথে পরিচিত করা। সিক্যুয়েল আসবে জানি, তবে শেষটা হঠাৎ করেই ব্রেক কষে থেমে যাওয়ার মতো। ক্যারেক্টারগুলোর জার্নি কেবল শুরু হয়েছে মাত্র। সবগুলো রাজ্য বর্তমানে যে অবস্থায় আছে, তাতে এগুলোর সূচনা সম্পর্কে জানতে প্রিক্যুয়েলেরও প্রয়োজন বোধ করছি (যেমন: সোনার নালীর লাল কুঠি)।

বইয়ের প্রোডাকশন এবং পেজ কোয়ালিটি সুন্দর ছিল। তবে কিছু বানান ভুল চোখে পড়েছে। এক জায়গায় ভাঙন প্রধান লেখা হয়েছে দ্বিরেফকে। এক জায়গায় ইভান নিজের বাবার সাথে ইদের চাঁদের তুলনা করেছে। এই ওয়ার্ল্ডে কি ইদ কিংবা ইদের চাঁদ কিংবা ইসলাম ধর্ম আছে? আর রাজ্যগুলোর মধ্যে কি কখনো কোনো যুদ্ধ লাগে না? ভাঙনের সাথে অন্যদের কিছুটা ঠাণ্ডা সম্পর্ক, তা বাদে তেমন কোনো সমস্যা দেখলাম না। কোনো মিমপিরা কখনো সোনার নালীকে আক্রমণের চেষ্টা করেনি? আরো কিছু প্রশ্ন আছে, পরে স্পয়লার সমৃদ্ধ পোস্টে আলোচনা করা যাবে। কিছু জায়গায় সংলাপের লেখনশৈলী আমার অতোটা ভালো লাগেনি। আরেকটা ব্যাপার হলো, শুরু থেকেই প্রতি পদে পদে সাসপেন্স পাবো, এভাবে কাহিনী আগিয়েছে। এইজন্য আলটিমেটলি মেগা সাসপেন্স পাওয়ার জায়গাটায় অতোটা এপিক লাগেনি আমার কাছে।

এসব বাদে প্লট বিল্ডিং চমৎকার। লোকেশন, পোশাক-আশাক, ম্যাজিক, রাজতন্ত্র কিংবা আর্কিটেকচার নিয়ে কল্পনা করতে করতে মেডিইভাল ইউরোপের কথা মনে পড়েছে বেশি। ক্যারেক্টারগুলোর মোটিভেশন সম্পর্কে আরো জানার আগ্রহ জাগছে। ধারণা করছি, সবকিছুর পেছনে ডেমিট্রনদের আপরাইজিংয়ের কোনো একটা সম্পর্ক আছে। নেগেটিভ ক্যারেক্টারের দিকে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়া আমার স্বভাব, তাই ভাঙন নিয়েই আমার ইন্টারেস্ট বেশি। ক্যান্তরদের মাঝে জাতিগত কলহের ব্যাপারটাও ভাল লেগেছে, প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের প্লটটাও। ভাঙনে ঐ রাতে কী হয়েছিল, জসুয়ার স্বপ্নের অর্থ কী, এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তর জানতে তর সইছে না।

গ্রুপে লেখকের বেশ কিছু পোস্ট আছে বিভিন্ন রাজ্যগুলোর বর্ণনা নিয়ে। ইচ্ছে হলে আগেই পড়ে নিতে পারেন। বইয়ে অনেক চরিত্র আর বেশ কিছু অপরিচিত শব্দ আছ। সেগুলোর সাথে আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হতে হবে। তাই বলবো, একটু মনোযোগ দিয়ে সময় নিয়ে পড়ার জন্য। এখনো হয়তো বইটা অনেকের পড়া হয়নি। এটার একটা রিক্যাপ লিখে রেখেছি নিজের জন্যই, সিক্যুয়েল আসা পর্যন্ত ভুলে যেতে পারি, সেজন্য। মাসখানেক পরে গ্রুপে পোস্ট করবো।

এ দেশে মৌলিক ফ্যান্টাসি কম লেখা হয়, বা সেগুলো চলে না সেসবই ঠিক আছে। কিন্তু ফ্যান্টাসি (বিশেষত হাই ফ্যান্টাসি) লিখতে গেলে অবশ্যই গ্র্যান্ড প্রেমাইজের এপিক কিছু লিখতে হবে। কারণ, সবাই নব্য ফ্যান্টাসি পাঠক নয়, হ্যারি পটার, গট, উইচার, লটরের বাইরেও অনেক লোরের সাথে পরিচিত অনেকে। এ বছরে আপকামিং ফ্যান্টাসি বইগুলোর মধ্যে আছে - আশিয়ানী, মিরিয়া, যুদ্ধের সহস্র বছর পরে। এক্সাইটেড!! স্বপ্ন দেখি, সামনেই আমাদের লেখকদের বইকে ঘিরে বড় বড় ফ্যানডম গড়ে উঠবে, সেগুলোর বিভিন্ন প্লট-সাবপ্লট নিয়ে তুমুল আলোচনা হবে, ফ্যান-ফিকশন, ফ্যানআর্ট সৃষ্টি হবে।
Profile Image for RHR.
35 reviews11 followers
November 7, 2023
#বই_পর্যালোচনা

বিনোদনের একটি সুবিশাল ও সুনিরাপদ মাধ্যম হিসেবে যদি আপনার কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগানো যেতো তাহলে কেমন হতো? ধরুন, নিজ কল্পনাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা যায় একটি চমৎকার জগৎ যা দেখে জুড়িয়ে যাবে আপনার চোখ এবং অবসর সময়টুকু কাটবে অনেক ভালো! এমন কোনো ক্ষমতা আপনায় দেওয়া হলে কাজে লাগাবেন কি?

"ফিকটাস ওয়ার্ল্ড" তেমনই এক মাধ্যম। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সকলের জন্য এ এক অসাধারণ বিনোদন জগৎ। ডাবরি রাজ্যের প্রশিক্ষিত ক্যান্তর ছাড়া অন্য কেউ সেই জগৎ করার অনুমতি পায় না। তেমনই একদিন জাবির ও কাহফ নামে দুজন ক্যান্তর সোনার নালী থেকে আগত ত্রিশজনকে সঙ্গে করে তৈরি করে ফিকটাস ওয়ার্ল্ড। কিন্তু তারা কি জানতো, ভাগ্য তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

ঘটনার ভয়াবহতা টের পেয়ে ফিকটাস ওয়ার্ল্ড থেকে জাবির ও কাহফ ফিরে এলেও আসেনি ফিরে সেই ত্রিশজন। বিপদ আসন্ন। পালিয়ে গেলেন দুজন ক্যান্তর। খবর পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন ডাবরি প্রধান দ্বিরেফ ও ক্যান্তর আলকানতারা। জরুরি বৈঠকের ডাক দিলো দ্বিরেফ। অন্যদিকে, আলকানতারা রহস্য উদঘাটনে বেরিয়ে পড়লেন ভিন্ন পথে। কোথায় যাচ্ছেন?

সোনার নালী প্রধান আলফি পিলগ্রিমই নিবেন সিদ্ধান্ত। বৈঠকের সিধান্ত এলো ডাবরির বিরুদ্ধে। মাথায় হাত পড়লো দ্বিরেফের। অন্যদিকে, খুশির হাওয়া বইলো অন্যান্য রাজ্যে। কিন্তু তারা কেন খুশি? বৈঠকের সিদ্ধান্তই অন্তিম সিদ্ধান্ত। তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই আর কারোর। কিন্তু ভাগ্য ফেলে দিলো এক অনিশ্চয়তায়৷ তৃতীয় মাত্রার ভূমিকম্প মুদ্রাকের মাটিতে। দ্বিরেফরা বেঁচে ফিরবে তো?

ডাবরির আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে দুঃসংবাদ। জনমানবে বাড়ছে ক্ষোভ। ক্ষোভেরা ধীরে ধীরে রূপ নেয় হিংস্রতায়। ঠেকানো যাবে কি তা? অশনি এক সংকেত! যেটিকে ভাঙন তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে, আসলেই কি করবে পরিবর্তন? নাকি এ কোনো এক চক্রান্ত? ডেকে আনবে কি সে বিপদ?

অন্যদিকে এক রহস্যময়ী তরুণী। প্রাক্তন ক্যান্তর ফিলিক্সের সন্ধানে বেরিয়েছে সে। সন্ধান পাবে কি? কী তার উদ্দেশ্য?

ডাবরির রাজকন্যা নৈঋত। অতীতের ভয়ংকর সেসব স্মৃতি তাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে? ডাবরিকে বিপদের হাত থেকে কি রক্ষা করতে পারবে সে? নাকি প্রয়োজন পড়বে রাজকীয় উৎসর্গের? প্রশ্ন নাহয় তোলাই থাকুক, বই পড়েই উত্তর জেনে নিবেন।

পাঠ-প্রতিক্রিয়া:
আমার চোখে ফ্যান্টাসি থ্রিলার হিসেবে "রাজকীয় উৎসর্গ" বইটি কেমন? এককথায়, অসাধারণ। সত্যিই চমৎকার একটি বই। কয়েকটি অসঙ্গতি বাদে গোটা বই নিয়ে আমার সন্তুষ্টির পরিমাণ প্রায় হিমালয় শৃঙ্গের কাছাকাছি। কাছাকাছি বলছি এজন্যই কারণ বইতে ছোটোখাটো অসঙ্গতি পেয়েছি সেগুলো না থাকলে শৃঙ্গ অবধিই পৌছে যেতো। তবে এটা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ড নিয়ে যতো ফ্যান্টাসি ফিকশন রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম একটি নাম হয়ে থাকবে "রাজকীয় উৎসর্গ।" এই বইটি সত্যিই সে সম্মানের যোগ্য।

আমার পড়া এটিই আল কাফি নয়নের প্রথম বই। আরও একটি কথা বলে রাখতে চাই, এটিই আল কাফি নয়নের প্রথম লেখা কোনো মৌলিক উপন্যাস। তাহলে আমি কেন একে আমার পড়া প্রথম বই বললাম যেখানে লেখকেরই এটা প্রথম বই? কারণ লেখক এর পূর্বে অনুবাদও করেছেন। মৌলিক পরে লিখলেও বইপাড়ায় তিনি পূর্বে পরিচিত ছিলেন একজন অনুবাদক হিসেবে। মৌলিকের মাধ্যমেই আমার আল কাফি নয়নের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অনুবাদ পড়া হয়নি। যদিও মৌলিক ও অনূদিত বই এক নয়। তবে যদি কাজের দিক থেকে বিবেচনা করি, তাহলে এই বইয়ের মাধ্যমেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। সেজন্যই অনুবাদ ও মৌলিক একত্র করেই "প্রথম" শব্দের উল্লেখ।

অনুবাদে তার হাতের দক্ষতা ঠিক কেমন সে ব্যাপারে আমি কোনোপ্রকার মন্তব্য করতে না পারলেও মৌলিকে তিনি আমার কাছে একশোতে একশো। চমৎকার লিখন-পদ্ধতি। লেখার হাত বেশ পরিণত। মৌলিক বইয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো লেখক তার প্রথম বইতেই এতো অসাধারণ লেখা উপহার দিতে পারেন না যা আল কাফি নয়ন দিতে পেরেছেন। তিনি এই বই লেখার আগে বেশ অনুশীলন করেই লিখতে নেমেছেন বলে আমার মনে হয়। অধ্যবসায়ও করেছেন প্রচুর। যার ফলাফল, আজ পাঠক "রাজকী���় উৎসর্গ"র মতো একটি বই হাতে পাচ্ছেন। আমি লিখন-পদ্ধতি নিয়ে খুব বেশি সন্তুষ্ট। আমি তাঁর কাছ থেকে আরও দারুণ কিছু আশা করবো ভবিষ্যতে।

গল্প বা প্লট সম্পর্কে যদি কিছু বলি, প্লটটাকে আমি ঠিক অনন্য বলবো না। আবার একবারে ছিমছামও বলবো না। এর মধ্যবর্তী স্তরে ফেলবো আমি। প্লটের চেয়ে বেশি যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো উপস্থাপনা। অতি সাধারণ এক প্লটকে নিমিষেই অসাধারণ করা সম্ভব যদি উপস্থাপনা সঠিক হয়। এই বইয়ের ক্ষেত্রেও আমি উপস্থাপনার দিকেই নজর বুলিয়েছি ও সন্তুষ্ট হয়েছি। গল্পের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখাকে কাজে লাগিয়ে যা দারুণ কাজ দেখিয়েছেন লেখক তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। ছোট্টো একটা উদাহরণ দেই। নৈঋত ও আলকানতারা নামে দুটি চরিত্র আছে বইতে। দুজনের একটি করে মোট দুটি অধ্যায়ে তাদের পেছনের গল্প বা অতীত লেখা হয়েছে বইতে। যাকে বলা হয়, ব্যাকস্টোরি বা ফ্ল্যাশব্যাক। নৈঋতের গল্পটা প্রয়োজনীয় হলেও এই বইতে আলকানতারার সে পেছনের গল্পটা বইতে খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি বা এ অধ্যায় না থাকলে বইতে তেমন কোনো পরিবর্তনও আসতো না। তাহলে এই পেছনের গল্পটা কেন ছিলো?

লেখকের যুক্তি আমি জানি না তবে আমি আমার মতো করে এর যুক্তি দিচ্ছি। একটি চরিত্রের কিছু হয়ে ওঠার বা এক ধরনের মন-মানসিকতা হবার পেছনে কোনো না কোনো গল্প থেকে থাকে যা অতীতে তার সঙ্গে ঘটেছিলো। নৈঋতের ক্ষেত্রে যার প্রভাব বর্তমানে পড়ে। অন্যদিকে আলকানতারার যে বিষয়টা, প্রভাব না ফেললেও আমরা সে অংশটা পড় বুঝতে পারি, আলকানতারা ঠিক কেমন! তার মন-মানসিকতাটা সামনে এমন হবে বা এমনই হচ্ছে সেটার একটা সংকেত হিসেবে এই অংশটা কাজ করেছে। এটাই হচ্ছে, উপস্থাপনা। একটি গল্পের ক্ষেত্রে সে গল্পের প্লট অনন্য নাকি সাধারণ সেটা মূল বিষয়বস্তু নয়। উপস্থাপন কীভাবে লেখক করবেন সেটাই আসল। আর এখানেও আমায় বলতে হচ্ছে, লেখক বাজিমাত করেছেন। উপস্থাপনাই তার প্লটের উচ্চতাকে একটু বেশিই উপরে নিয়ে গিয়ে স্থির করেছে।

একটি পরিপূর্ণ উপন্যাসের ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন? আমি মনে করি, সে উপন্যসের সকল চরিত্রকে। চরিত্র হতে হয় এমন, যার উপস্থিতি সাধারণ ঘটনাকেও করবে অসাধারণ! তাই চরিত্র গঠন হতে হয় শক্ত ও মজবুত। এখানেও লেখক নিজের সেরাটা দেবার চেষ্টা করেছেন। প্রয়োজনমতো চরিত্রদের সাজিয়েছেন, কথোপকথন তৈরি করেছেন। সক্রিয়তা বাড়িয়েছেন। এর উদাহরণ হিসেবে কারোর নাম বলতে হলে, ফিলিক্সের কথা বলবো আমি। প্রথমদিকে লোকটার উপস্থিতি একেবারে নাই হলেও শেষাংশে গল্পের গতি বৃদ্ধি করতেই এই চরিত্রের উপর সময় দেওয়া হয়। বোধ করি, সিরিজের দ্বিতীয় বইতেও এই চরিত্রের এক বড়ো ভূমিকা থাকবে। স্পোয়েলার অবশ্যই দিচ্ছি না তবে এটুক বলতে পারি, এ চরিত্র বা এ চরিত্রকে ঘিরে কিছু একটা হয় বা ঘটে যা পরবর্তী বইয়ের একটি পূর্বাভাস হিসেবে দেখানো হয় বইতে।

তবে চরিত্র গঠন অংশে আমার সামান্য অভিযোগ রয়ে গেছে। ইখলাছ চরিত্রকে খুব বেশি সময় দেওয়া হয়নি। কিন্তু এই চরিত্রের মধ্যে যে গাম্ভীর্য ফুটে উঠেছিলো তাতে এই লোকের উপস্থিতি আমি আরেকটু বেশি আশা করেছিলাম ও এই চরিত্রের যে অবদান রয়েছে সে হিসেবে এই চরিত্রকে আরেকটু গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরা যেতো। তাকে কিছু সময় দেওয়া যেতো অথবা শক্ত কোনো উক্তির মাধ্যমেও লোকটাকে চমৎকারভাবে তুলে ধরা সম্ভব হতো। হয়নি তা। এই চরিত্রকে প্রথমে যেভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিলো তাতে যেই প্রত্যাশাটা তৈরি হয়েছিলো সে প্রত্যাশাটাই আসলে পূরণ হয়নি। চরিত্রের ভার সেভাবে প্রকাশ পায়নি।

এছাড়া উপন্যাসের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নৈঋতের কথা বলতে হয়। এই চরিত্রের প্রতি আমার সামান্য দুর্বলতা কাজ করে, এটা সত্য। তবে যা বলতে যাচ্ছি তা এই দুর্বলতার জন্য নয়। এই চরিত্র বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও লেখক এই চরিত্রে সময় বেশ কম দিয়েছেন। কিন্তু দেওয়াটা জরুরি ছিলো। এই চরিত্রকে আরেকটু মেলে ধরা সম্ভব হলে ভালো হতো। চতুর্দশী এক বালিকা; বয়সের তুলনায় সে বেশ পরিণত। পরিণত হবার আরও কিছু উদাহরণ দেওয়া আবশ্যক ছিলো। নৈঋতের নৈঋত হয়ে ওঠার (কেন এই চরিত্রের মানসিকতা এমন) গল্পেও খুব কম সময় ব্যয় করেছেন লেখক। হয়তো এটা ইচ্ছাকৃতও হয়ে থাকতে পারে। চরিত্রটাকে রহস্যময়ী রাখতে চেয়েছিলেন বোধহয়, তাই হয়তো। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে আশা করি, চরিত্রটিকে ঘিরে যে রহস্য সেগুলো ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে। আমি আশা ছাড়িনি। পরবর্তী বইতেই সম্ভবত নৈঋত শক্তভাবে আসবে। অন্তত শেষের দিকে গিয়ে আমার তাই মনে হয়েছে তাই আমি অধীর আগ্রহে সিরিজের দ্বিতীয় বই "ধী আয়েদিস"র অপেক্ষা করছি। বইমেলা ২০২৪'এই প্রকাশের মুখ দেখবে বোধহয়। সেজন্য লেখককে অনেক অনেক শুভ কামনা।

দ্বিরেফ প্রসঙ্গে বলি এবার। একজন রাজ্য প্রধানকে যেভাবে ফুটিয়ে তোলা জরুরি সেভাবে দ্বিরেফ নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি। তাকে একটু বেশিই আবেগী লেগেছে আমার যা একজন রাজ্য প্রধানের সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না। তাকে মানসিকভাবে আরেকটু শক্ত-পোক্ত রাখা যেতো। আমি বলছি না, আবেগী থাকা অন্যায়। তবে তার মধ্যে একটু দাম্ভিকতা রাখাও জরুরি ছিলো যেহুতু গোটা একটি রাজ্য তার কথামতো চলে। সেখানে একটু বেশিই আবেগপ্রবণ, ভীতসন্ত্রস্ত আর অসহায় লেগেছে। এটা একটু অদ্ভুত লেগেছে আরকি। তবে যাই দেখানো হয়েছে তাও খুব একটা খারাপ না। তার অনুভূতি ও সংলাপগুলো আরেকটু শক্ত করা যেতো।

আলকানতারা উপস্থিতি আমার ঠিকঠাক লেগেছে। এই চরিত্রের যতোটুক দেবার সে ততোটুকুই দিয়ে চলছে ও সামনেও তা বজায় থাকবে। সানভিকে এই বইতে বেশ রহস্যময়ী লেগেছে। ধীরে ধীরে বোধহয় সে নিজেকে মেলার সুযোগ পাবে। তাই এখানে আপাতত আমার কোনো আপত্তির জায়গা নেই৷ তবে জাভিয়ারকে আরও কিছু সময় দেওয়া যেতো বলে আমার মনে হয়। কিন্তু এ নিয়ে আমার খুব একটা অভিযোগ নেই। কেননা, গল্পের স্বার্থে সময় ওঠানামা করে। দৃশ্য বদলায়। সে হিসেবে বিবেচনা করলে জাভিয়ারকে নিয়ে অভিযোগ করার তেমন কিছু থাকে না।

বাঁধাই, পৃষ্ঠা ও ছাপার মান:
এ ব্যাপারগুলো আমার কোনোই অভিযোগ নেই। বই যখন ভূমিপ্রকাশের তখন অভিযোগের প্রশ্নই আসে না। এই তিনটিতে ভূমিপ্রকাশ সেরা। ভূমিপ্রকাশের প্রথম দিককার কিছু কাজ কাঁচা হলেও ধীরে ধীরে নিজেদের হাত শক্ত ও পাকা করে ফেলেছেন। তাছাড়া তখন যে ধরনের প্রডাকশন প্রকাশনীদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হতো তখন ভূমিপ্রকাশও তাই দিতো ফলে এ নিয়েও কথা বলার কিছু নেই। ভূমিপ্রকাশ নিজেদের সেরাটা দেবার চেষ্টা করে এবং সে চেষ্টায় তারা প্রতিবার সফল হয়৷ এবারও আমি সন্তুষ্ট। আশা করছি, সামনেও সন্তুষ্ট থাকবো।

প্রচ্ছদ:
সজল ভাই দ্য গ্রেট! এই লোককে নিয়ে আমি কী বলবো! আমার বলা কি আদৌ সাজে?! দিন যায় আর ভদ্রলোক আমায় রীতিমতো অবাক করে দেন। হিং/সা বৃদ্ধি পায়। মানে কীভাবে সম্ভব?! আপনারাই বলুন, একটা লোক এতো চমৎকার কাজ করে দিনদিন কীভাবে নিজেকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে?! আমি তো বুঝি না। আমার হিং/সায় জ্ব/লে পু/ড়ে যাওয়াটা কি স্বাভাবিক নয়? আমিও তো গ্রাফিক ডিজাইনার। একটা লোক কীভাবে এতো অসাধারণ কাজ করে! কেউ আমাকে বোঝান। আমি তো বুঝতেই পারছি না। আমার দ্বারা কেন সম্ভব হয় না?!

সম্পাদনা ও বানান সংশোধন:
ভূমিপ্রকাশের বইতে বানান ভুল ও সম্পাদনায় অসঙ্গতি খুব কম চোখে পড়ে। এই বইতেও তাই। যে যে অসঙ্গতি চোখে পড়ে তা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১. "কী" ও "কি" ব্যবহারে অসঙ্গতি। এটি ছিলো চোখে পড়ার মতো। "কী" শব্দটি "কি" ব্যবহার হবে, সেখানেও ব্যবহার করা হয়েছে আবার "কী"তেও "কী" ব্যবহার করা হয়েছে।

২. পৃষ্ঠা ৩২'এ "বৃদ্ধ বয়সে অধিকাংশ সময় অপেক্ষা করতেই চলে যায়" এই বাক্যে "অপেক্ষা করতে করতেই" হবে।

৩. পৃষ্ঠা ৩৮'এ "বৈষম্যগুল কে" -- "বৈষম্যগুলোকে" হবে।

৪. পৃষ্ঠা ৪৫'এ "তরুণির" -- "তরুণীর" এবং "বাকী" শব্দ "বাকি" হবে।

৫. পৃষ্ঠা ৪৬'র "সানভির অন্য পথ চিন্তা করল।" --- "সানভি" হবে। "..........আসবে।'মেয়েটা......" ইনভার্টেড কমার পর স্পেস হবে।

৬. পৃষ্ঠা ৫২'র "সবাই অপেক্ষায় দ্বিরেফের পরবর্তী বাক্য শোনার জন্য।" --- "সবার অপেক্ষা দ্বিরেফের পরবর্তী বাক্য শোনার জন্য" এভাবে থাকলে বোধহয় পড়তে ভালো লাগতো।

৭. পৃষ্ঠা ৫৪'র "সমর্থনের আসায়" --- "আশায়" হবে।

৮. পৃষ্ঠা ৫৬'তে "...........পথ বন্ধ। জাতীয়........" এর মাঝে বিরামচিহ্নের প্রয়োজন ছিলো না।

৯. পৃষ্ঠা ৬২'তে নৈঋত ইথানকে তুমি করেই সম্বোধন করেছিলো। আবার পৃষ্ঠা ৬৪'তে সম্বোধন বদলে আপনি হয় যা খাপছাড়া।

১০. পৃষ্ঠা ৬৫ এখানে "অগ্যতা" নয় "অগত্যা" হবে।

১১. পৃষ্ঠা ৬৬'তে "দিন শেষে" -- "দিনশেষে" ও "সে সময়" -- "সেসময়" হবে।

১২. পৃষ্ঠা ৭৪'এ "ইখলাছে কথাশুনে......" -- "ইখলাছের কথা শুনে...." হবে।

১৩. পৃষ্ঠা ৭৯'তে "খরব" -- "খবর" হবে।

১৪. পৃষ্ঠা ৮১'তে "নিগেল উত্তেজিত করে দালালরা...." -- "নিগেলকে" হবে।

১৫. পৃষ্ঠা ৮৪'তে "সাবধানি" -- "সাবধানী" হবে।

১৬. পৃষ্ঠা ৮৯'তে "অব্দি" -- "অবধি" ও "হাটলেই" -- "হাঁটলেই" হবে।

১৭. পৃষ্ঠা ৯০'তে উল্লেখ করা হয়েছে, বাতাসে পর্দা হালকা সরে গেলে নিগেল আলকানতারা যে কক্ষে বসে আছেন সেদিকে তাকায়। তার পরের প্যারায় লেখা, নিগেল সেদিকে লক্ষ্য করার অবসরই নাকি পায়নি। গোঁজামিল লাগলো।

১৮. পৃষ্ঠা ৯৫'তে লিভান চরিত্রটিকে যেভাবে বইতে উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে এই লোককে ঘিরে লোকমুখে দুর্নামের পাল্লাই ভারী থাকবে সুনামের চেয়ে। এখানে সুনাম শব্দের উল্লেখ পেয়েছি। সুমামও চাইলে ব্যবহার করা যেতো, যদি (!) এরকম কিছুর ব্যবহার পরবর্তীতে থাকতো। এমন কিছু নেই।

১৯. পৃ: ১০৬'এ "জাসপার খুব করে চাইছেন ইতিবাচকভাবে ভাবতে চাইছেন।" পড়তে মোটেই ভালো লাগছিলো না এটা। তাই লেখা যেতো, "জাসপার ইতিবাচকভাবে ভাবার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন" বা "করে চলছেন।"

২০. পৃষ্ঠা ১০৭'এ "উপস্থির" -- "উপস্থিত" হবে।

২১. পৃষ্ঠা ১০৯'এ "ঠিক কোনো জায়গায় তার স্বজাতি ভাইদের রেখে গিয়েছিল......" -- "কোন" হবে।

২২. পৃষ্ঠা ১১১'তে ".....সে মুদ্রাকে ছেড়ে যেতে চায় না।" -- "মুদ্রাককে" হবে।

২৩. পৃষ্ঠা ১১২'তে "কালক্ষেপন" -- "কালক্ষেপণ" হবে।

২৪. পৃষ্ঠা ১১৬'তে "স্বরণকালের" -- "স্মরণকালের" হবে।

২৫. পৃষ্ঠা ১১৮'তে "যেখান থেকে আমরা তৃতীয় মাত্রার ভূমিকম্পের কথা আমরা জেনেছি...." -- একই বাক্যে একটি শব্দ দু'বার লেখা, "আমরা।"

২৬. পৃষ্ঠা ১২০'এ "সেদিকে আর লক্ষ নেই ইখলাছের" -- "লক্ষ্য" হবে। "দায়িত্ব নেবার মতো অবস্থায়ও সে নেই।" এটা এভাবে লিখলে, "দাঁয়িত্ব নেবার মতো অবস্থাতেও সে নেই" বা "দায়িত্ব নেবার অবস্থায় সে নেই" ভালো হতো।

২৭. পৃষ্ঠা ১২২'এ "সমবয়সি" লেখা। বর্তমানে কি এই শব্দ এভাবেই লিখে? আমি তো "সমবয়সী" জানতাম।

২৮. পৃষ্ঠা ১২৪'এ "আবার আপনার চাইলে সেই সংজ্ঞা পরিবর্তন করতে পারেন।" -- ব্যক্তি এখানে একাধিক। তাই "আপনারা" হবে।

২৯. পৃষ্ঠা ১৩৩'এ "নিগেল নিমলির কথায় সে আশাহত হয়েছে।" -- মাঝের "সে" শব্দটা হবে না।

৩০. পৃষ্ঠা ১৩৪'এ "আর তাতেই সে আলকানতারা ধৈর্যহারা হয়ে পড়েছিলো। -- মাঝের "সে" শব্দটা এখানেও হবে না।

৩১. পৃষ্ঠা ১৪১'র "সান্তনা" -- "সান্ত্বনা" হবে। (একই ভুল ১৪৬'তে)

৩২. পৃষ্ঠা ১৪২'এ "ডাবরিবাসির" -- "ডাবরিবাসীর", "কাধের" -- "কাঁধের" ও "সত্বেও" "সত্ত্বেও" হবে।

৩৩. পৃষ্ঠা ১৪৫'এ "ঝরণাগুলো" -- ঝর্ণাগুলো হবে। "পুনবার" -- "পুনর্বার" হবে। একবার লেখা "ফেলিন" অন্যবার লেখা "ফেনিল।"

৩৪. পৃষ্ঠা ১৪৭'এ "একটা হাত স্পর্শ...." এটি "এক হাতের স্পর্শ......." হবে।

৩৫. পৃষ্ঠা ১৫১'তে "ঘোরে মধ্যে আছে সাইফ" -- "ঘোরের" হবে।

৩৬. পৃষ্ঠা ১৫৮'তে "হাতগুলো ও কথা শুনছে না" এখানে "হাতগুলোও" হবে। মাঝে স্পেস হবে না।

৩৭. পৃষ্ঠা ১৬২'তে "এরপর সবার উদ্দেশ্যে বললেন...." বাক্য অনুযায়ী "উদ্দেশে" হবার কথা।

৩৮. পৃষ্ঠা ১৬৩'তে "তুমি কোনো বিষয়ের কথা বলছো?" -- "কোন" হবে।

৩৯. পৃষ্ঠা ১৬৬'তে "দ্বিরেফ নিশ্চিত হলো কোন ফিলিক্সের কথা বলছে" -- "হলো"র পর কমা হবে।

৪০. পৃষ্ঠা ১৭৬'এ "যোগত্যা" -- "যোগ্যতা" হবে।

৪১. পৃষ্ঠা ১৮৩'তে "আয়ত্ব" -- "আয়ত্ত" হবে।

৪২. পৃষ্ঠা ১৮৮'তে "হয়ৎ" -- "হয়তো" হবে। "এই খাঁজগুলো নিজে কা/টতে হয়েছে জসুয়াকে।" -- "এই খাঁজগুলো জসুয়াকেই কা/টতে হয়েছে" হবে।

৪৩. পৃষ্ঠা ১৮৯'তে "চেচিয়ে" -- "চেঁচিয়ে" হবে।

৪৪. পৃষ্ঠা ১৯২'তে লেখা মাস তিনেক আগেই ডাবরির রাজা মারা যান। অর্থাৎ তিন মাস পূর্বে দ্বিরেফের বাবা মারা যান। অথচ পৃষ্ঠা ১৯৩'তে সময়টা হয়ে যায়, কিছুদিন আগে। কিছুদিন আগে আর মাস তিনেক এক নয়। [এটি ফিরে দেখা গল্প যা অতীত]

৪৫. পৃষ্ঠা ১৯৪'তে "ভবিষ্যত" -- "ভবিষ্যৎ" হবে। (একই ভুল পৃষ্ঠা ২৩৩'তে)

৪৬. পৃষ্ঠা ১৯৮'তে "......কেন তুমি আমাদের আয়ে অন্যকে ভাগ বসাতে দিলে।" -- শেষে প্রশ্নবোধক চিহ্ন হবে।

৪৭. পৃষ্ঠা ২০০'তে "আমাদেব" -- "আমাদের" হবে।

৪৮. পৃষ্ঠা ২১৫'তে "নিগেল যখন ঠিক হাতের নাগালে। আলকানতারা যখন নিগলকে ধরার আক্রোশ নিয়ে হাতটা বাড়িয়েছে তখনই জনসমুদ্রে ভেসে গেলো সে।" দুটো বাক্যই ভুল। এটাকে প্রকাশ করা যেতো "নিগেল তখন ঠিক হাতের নাগালে। আলকানতারা নিগলকে ধরার জন্য যেই না আক্রোশের সঙ্গে হাত বাড়ালেন, তার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে গেলেন জনসমুদ্রে।"

৪৯. পৃষ্ঠা ২২৩'তে "সবাই বেরিয়ে যেতে বললেই চলে যাবে...." -- "সবাইকে" হবে। "এখনি" -- "এখনই" হবে।

৫০. পৃষ্ঠা ২২৪'এ "......পাশে এসে দাঁড়াল আলফি পিলগ্রিম।" এই চরিত্রকে আপনি করেই সম্বোধন করেন লেখক। তাই "দাঁড়ালেন" হবে।

৫১. পৃষ্ঠা ২২৫'এ "আবার শুরু হতো বাবা জন্য প্রতীক্ষা" -- "বাবার" হবে। "মনে পড়লেই লিভানের চোখ ভিজে যাচ্ছে। তার কষ্টটা লিভানের চেয়ে ভিন্ন।" লিভানের কষ্ট সমন্ধে বলছেন লেখক। কিন্তু লিভানের কষ্ট আবার লিভানের চেয়েই ভিন্ন! এখানে দ্বিতীয় বাক্যের নামটা "ইভান" হবে।

৫২. পৃষ্ঠা ২৩৫'এ "কেউ অপবিদ্যার মাধ্যমে কেউ স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ করছে" -- "কেউ" শব্দটা একবারই হবে।

৫৩. পৃষ্ঠা ২৩৭'এ "কিংবা জাসপার আটবার চেষ্টা করতেন" -- "আটকাবার" হবে।

৫৪. পৃষ্ঠা ২৩৯'এ "আলকানতারাকে নিয়ে হতাশা কোনো পর্যায়ে পৌছেছিল তা হয়তো তিনিই বলতে পারবেন" -- "কোন" হবে।

৫৫. পৃষ্ঠা ২৪০'এ "খোঁয়াড়ের মালিকের কাছ থেকে জানা গেল সকাল সকাল কোনো কিশোর মেষগুলো খোঁয়াড় দিয়েছে" -- "কোনো এক কিশোর" হবে।

৫৬. পৃষ্ঠা ২৪৪'এ "তু মি" -- "তুমি" হবে।

৫৭. পৃষ্ঠা ২৪৯'এ "শেষ পর্যন্ত বোঝান গেছে" -- "বোঝানো" হবে।

৫৮. পৃষ্ঠা ২৫০'এ "নজরদারীতে" -- "নজদারিতে" হবে।

৫৯. পৃষ্ঠা ২৫৯'এ "জ্ঞান হারানো আগে..." -- "হারানোর" হবে। "ভবিষ্যত বাণী" -- "ভবিষ্যৎ" হবে। (একই ভুল পৃষ্ঠা ২৮২'তে আছে)

৬০. পৃষ্ঠা ২৬৭'তে "মুখে না দেখার প্রতিজ্ঞা" -- "মুখ" হবে।

৬১. পষ্ঠা ২৭৬'এ "বার বার" -- "বারবার" হবে।

৬২. পৃষ্ঠা ২৭৮'এ "ভ্র" -- এটি "ভুরু" বা "ভ্রু" হবে।

৬৩. পৃষ্ঠা ২৭৯'এ "রানি" -- "রাণী" হবে (একই ভুল পৃষ্ঠা ২৮০, ২৮১, ২৮৮, ২৯৬ ও ২৯৮'তে আছে)। "শাসন আমলে" -- "শাসনামলে" হবে।

৬৪. পৃষ্ঠা ২৮২'তে ".......আমার সাথে একমতো হলে...." -- "একমত" হবে। (একই ভুল পৃষ্ঠা ২৮৭'তে)

৬৫. ফিলিক্সকে গোটা বই জুড়ে আপনি করে সম্বোধন করেছেন লেখক। অথচ পৃষ্ঠা ২৮৭'র একটি বাক্যে "কিন্তু বিরোধিতাও করল না" এখানে "করলেন" হবার কথা থাকলেও ছিলো না।

৬৬. পৃষ্ঠা ২৮৯'তে "এ কোনো লোকের পাশে হাঁটছে সে!" -- "কোন" হবে।

৬৭. পৃষ্ঠা ২৯৮'তে "নীরব বসে আছে তিনজন" -- "নীরবে" হবে।

৬৮. পৃষ্ঠা ৩০২' এ "বাকী" -- "বাকি" হবে।

৬৯. পৃষ্ঠা ৩১১'তে "ডাবরির জন্য কী উপঢৌকন এনেছেন" -- এখানে প্রশ্নবোধক চিহ্ন হবার কথা।

আমার চোখে যতো অসঙ্গতি (স্পোয়েলার অ্যালার্ট):
যদি বইটি আপনার পড়ার ইচ্ছে থাকে এবং এখনও পড়া হয়নি তাহলে এই অংশ এড়িয়ে যাবার বিনীত অনুরোধ রইলো। হালকা স্পোয়েলার পেয়ে যাবেন। তবু যদি পড়তে আগ্রহী হোন তাহলে সেটি সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছে।

১. আলকানতারা ও নিমলির মধ্যকার সম্পর্কটা কীভাবে এতোদূর অবধি গড়ালো তার কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই বইতে। দুম করেই এক সকালের ঘটনায় চলে যান লেখক। তখন দুজন এক বিছানাতে। নিমলির মুখে রাজ্য জয়ের হাসি, অন্যদিকে আলকানতারা লজ্জায় মিইয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তারা বিছানা পর্যন্ত কীভাবে গেলো, কেন গেলো, এতো অন্তরঙ্গতা কীভাবে তৈরি হলো তার কিছুই নেই বইতে। এই ব্যাপারটায় একটু নজর দেওয়া জরুরি ছিলো যেহুতু আলকানতারা সেরকম কোনো পুরুষ নয় যে কিনা মেয়ে দেখলেই শুয়ে পড়বে। তাই এটি খাপছাড়া লেগেছে আমার। তাদের সম্পর্ক বিছানা পর্যন্ত যাবার পূর্বে আরও কিছু ঘটনা উল্লেখ করা আবশ্যক ছিলো যাতে মনে হয়, দুজনের মধ্যে অন্তরঙ্গতা তৈরি হবার পেছনে এই ঘটনাগুলো দায়ী বা এ ঘটনাগুলোর জন্যই দুজন কাছাকাছি এসেছে।

২. আলফি পিলগ্রিমের ব্যাপারে কিছু কথা আলোকপাত করতে হয়। আলফি পিলগ্রিম শান্ত স্বভাবের মানুষ। জটিল পরিস্থিতিতেও মাথা থাকে তার ঠান্ডা। তার চিরচেনা স্বভাব এটি৷ অথচ এই লোকটাকে টানা দু'বার নিজের চিরচেনা স্বভাব হতে বেরিয়ে আসতে দেখেছি তাও মোট তিনজন ব্যক্তির সামনে। সেই তিনজন যেন-তেন কোনো চরিত্র নয়। সোনার নালী প্রধান আলফি পিলগ্রিম নিজের শারীরিক অক্ষমতার (!) ইতিহাস পড়ে যেখানে হাসতে জানেন সেখানে কোনো ব্যক্তির সামনে নিজের অনুভূতি এভাবেই প্রকাশ করে দেবেন তা মেনে নিতেই কেমন যেন লেগেছে। বিশেষ করে, নৈঋতের কামরায় যে ঘটনাটি ঘটে এবং তিনি বুঝতে পারেন, নৈঋত আসলে তারই কন্যা তখনকার সময়টা। এ কথা জানার পূর্বে ছবি বিষয়ক একটা ঘটনা ছিলো আবার উপঢৌকন হিসেবে সামরিক চাইবার পর চোয়াল ঝুলে পড়ার ব্যাপারটায় তার অনুভূতিগুলো বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ঠান্ডা মাথার মানুষকে অস্থির লেগেছে এখানে।

ফিলিক্স ও দ্বিরেফ ফিকটাস ওয়ার্ল্ড তৈরি করে কৌশলে আলফি পিলগ্রিমকে যখন নিয়ে আসেন তখনও তার ঠান্ডা স্বভাবটা চোখে পড়েনি। একজন ঠান্ডা মাথার মানুষ যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে ঠান্ডা রাখবেন। এমন কোনো ব্যক্তির সামনে নিজের মানসিক অবস্থা প্রকাশ করবেন না যেখানে তার দুর্বলতা ধরা পড়ে বা তার ভেতরকার অবস্থা অপরপক্ষ পড়ে ফেলতে সক্ষম হবে অনায়াসে। বইতেই উল্লেখ করা হয়েছে, আলফি পিলগ্রিমের পূর্বপুরুষেরা শ/ত্রু তৈরি করে গেছেন বহু। যেখানে-সেখানে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা থেকে তাই আলফি পিলগ্রিমকে সতর্ক থাকতেই হয় কারণ শ/ত্রু/পক্ষ মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যাবে। দুর্বলতাই মূল অ/স্ত্র হিসেবে কাজ করে।

৩. দ্বিরেফ, ফিলিক্স ও আলফি পিলগ্রিম ফিকটাস ওয়ার্ল্ড থেকে কখন ফিরে এলেন তার সুনির্দিষ্ট বর্ণনা নেই ওভাবে। একটু অদ্ভুত ঠেকেছিলো এটা।

পরিশেষে, বইটি আমার কাছে দারুণ লেগেছে। ফ্যান্টাসি ফিকশনের প্রতি আগ্রহী হলে অবশ্যই এই বইটি পড়তে বলবো আমি। আশা করি, বইটির সঙ্গে দারুণ সময় কাটবে।

বই: রাজকীয় উৎসর্গ
লেখক: আল কাফি নয়ন
প্রকাশনী: ভূমিপ্রকাশ
প্রকাশকাল: অমর একুশে বইমেলা ২০২২
জনরা: ফ্যান্টাসি থ্রিলার
প্রচ্ছদকার: সজল চৌধুরী
মুদ্রিত মূল্য: ৫০০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩২০

©RHR
Profile Image for Md. Nahidul Islam.
32 reviews1 follower
February 22, 2023
বাংলায় ইদানিং ফ্যান্টাসি লেখালেখি হচ্ছে এটা বেশ ভাল একটা দিক।

বইটার লেখনী ভাল তবে সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ডের বর্ণনা প্রায়ই আমাদের প্রাইমারি ওয়ার্ল্ড এর মত। History & Lore তেমন নেই, চরিত্রগুলো সময় পায় নি সবাই। অনেকক্ষণ পর্যন্ত আসলে কাহিনী কীসের উপরে চলছে বুঝতে পারি নি। ফিকটাস ওয়ার্ল্ডের কনসেপ্টটা বেশ ভাল, কিন্তু সব মিলিয়ে লেখক একটু তাড়াহুড়ো করে ফেলেছেন মনে হয়। কাহিনীর বেশ কিছু জায়গায় অসম্পূর্ণ ভাব আছে। হয়তো সেটা পরের পর্বে ঠিক হয়ে যাবে।

যাই হোক না কেন, বাংলা ভাষায় ফ্যান্টাসি বইয়ের বিকাশে এটা ভূমিকা রাখবে আশা করি।
Profile Image for Sazzad Hossain.
22 reviews
Read
December 16, 2023
বেশ অগোছালো বই। চরিত্রায়নের জন্য ভালো লাগেনি।
Profile Image for Tasmin Nisha.
163 reviews5 followers
September 11, 2022
কেমন হয় যদি আমরা আমাদের নিজেদের মতো করে আলাদা জগৎ তৈরি করে নিতে পারি , নিজেদের কল্পনাশক্তির সাহায্যে সম্পূর্ণ আলাদা এক পরিবেশ তৈরি করতে পারি। ফিকটাস ওয়ার্ল্ড ঠিক এমন একটি জায়গা যেখানে ক্যান্তরদের সাহায্য নতুন এক ভিন্ন জগৎে প্রবেশ করা যায়। এ যেন ধনীদের একটি বিনোদনের মাধ্যম।

ফিকটাস ওয়ার্ল্ড তৈরি করার ক্ষমতা কেবল ডাবরি রাজ্যের ক্যান্তরদের উপর ন্যস্ত। ক্যান্তর হচ্ছেন ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে প্রবেশ এবং বের হওয়ার একমাত্র মাধ্যম। সম্ভ্রান্ত পরিবারের ত্রিশজন সদস্যগণকে নিয়ে ক্যান্তর জাবির ও কাহফ রওনা হলেন ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে এবং কাঙ্খিত জগৎ তৈরি করতেও সক্ষম হলেন। কিন্তু হঠাৎ এমন কিছু ঘটে গেল যে ক্যান্তর জাবির ও কাহফকে বাকি সদস্যদেরকে রেখেই ফেরত আসতে হল সাধারণ জগতে এবং তারপর থেকেই তারা দুজন পলাতক। অশুভ শক্তির উৎস খুঁজে পেয়েছিল তারা সেই জগতে।

মুদ্রাকে জরুরি বৈঠক ডাকা হলো। বৈঠকে ছিলেন ডাবরি রাজ্যের প্রধান দ্বিরেফ, মুদ্রাকের প্রধান ইখলাছ, ভাঙনের প্রধান জাভিয়ার এবং সোনার নালির অধিপতি আলফি পিলগ্ৰিম। বৈঠক মূলত ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে যে দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেটিকে ঘিরে। দ্বিরেফ ঘটনা খুলে বলার পরও তার কথায় বাকিরা খুব একটা বিশ্বাস করেনি। ফলশ্রুতিতে দ্বিরেফ সাময়িক সময়ের জন্য ফিকটাস ওয়ার্ল্ড বন্ধ করার দাবি জানালে বাকিরা ডাবরি থেকে ফিকটাস ওয়ার্ল্ড সরিয়ে সব রাজ্যে চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়। বছরের পর বছর যেই ফিকটাস ওয়ার্ল্ড তৈরি করার ক্ষমতা ডাবরি রাজ্যের আয়ত্তে ছিল সেই ক্ষমতা এখন সব রাজ্যের মধ্যে বন্টন হবে। দ্বিরেফ জানে এর ফলে তাকে কঠিন সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে। এমনি ডাবরির জনগণ তাকে খুব ভালো চোখে দেখে না। এরই মধ্যে দ্বিরেফ তার সহকারী প্রধান ক্যান্তর আলকানতারাকে পলাতক দুজন ক্যান্তরকে খুঁজে বের করতে পাঠান খের বাড়িতে। খেরবাড়ি হলো মদ, জুয়া, নারীদের নিয়ে আয়েশ করার জায়গা। কিন্তু সেখানে গিয়ে আলকানতারা পড়েন একের পর এক মহাবিপদে।

ডাবরি রাজ্যে বর্তমানে একজন পুরুষ শাসন কার্য পরিচালনা করলেও ডাবরি রাজ্য নারীর শাসন কার্যে সর্বদা পরিচালিত হয়ে এসেছে। তবে ডাবরির রানি হওয়ার পেছনে খুবই বিভৎস ঘটনা ঘটে থাকে, আগত রানিকে করতে হয় রাজকীয় উৎসর্গ। রানি আলেয়া দ্বিরেফর ছোট বোন নৈঋতকে জন্ম দেওয়ার সময় মারা যান। মারা যান না ঠিক ,তাকে খুন করা হয়। তারপর থেকেই সাধারণ নাগরিকদের খুব একটা মত না থাকার পরও দ্বিরেফকে শাসন কার্য পরিচালনা করতে দেওয়া হয়। তবে বড় ভাই রাজা হলেও নৈঋত নিজেকে ডাবরি রাজ্যের রানি মনে করেন। তার কথাবা���্তা, চালচলন খুবই রহস্যময়ী। সবার মনের খবর কি করে যেন সে আগেই জেনে যায়, এগুলো অতীত থেকে পাওয়া কিছু ক্ষমতা তার।

সোনার নালি সচ্ছল রাজ্যগুলোর মধ্যে একটি। সকল রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা যেন সোনার নালির হাতেই আর সেই রাজ্য চালনার মূল অধিপতি আলফি পিলগ্ৰিম। খুবই বিচক্ষণ এবং ঠান্ডা মাথার মানুষ। জীবনের অর্ধেক সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও বিয়ে করেননি। তাকে নিয়ে নানা ধরনের গুজব শুনতে পাওয়া যায়। সোনার নালি রাজ্যের ঠিক উল্টো যেন ভাঙন রাজ্য। অভাবের তাড়নায় এখানকার জনগণের নাজেহাল অবস্থা। এক সময় এই রাজ্যে ছিল প্রাচুর্যের ভান্ডার কিন্তু এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ভাঙন রাজ্যের সবকিছু নিঃস্ব করে দেয়। প্রাক্তন ভাঙন প্রধান জাসপারের বাল্যবন্ধু জসুয়া হঠাৎ একদিন অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে যেখানে তাকে মেরে ফেলার জন্য একজন নারী আসে এবং তাকে আলকানতারা বলে সম্বোধন করে। এই অদ্ভুত স্বপ্ন দেখার কিছুদিন পরেই এক ঘাতকের হাতে তার মৃত্যু হয়। অতীতের গোপন সত্য সামনে এসে দাঁড়ায় যেন।

ক্ষমতা ভাগাভাগি করা ক্ষমতাসীনদের বিক্ষোভের কারণ হতে সময় নেয় না। ডাবরি রাজ্যের প্রধান দ্বিরেফের বিরুদ্ধে চাপা ক্ষোভ আর চাপা পড়ে থাকেনা। প্রাক্তন ক্যান্তরগণ এবং ডাবরি রাজ্যের ভিতরের মানুষের প্ররোচনায় পরিকল্পনা করা হয় দ্বিরেফকে পথ থেকে সারাজীবনের জন্য সরে নেওয়ার এবং ডাবরি রাজ্যকে আবার রানি উপহার দেওয়ার। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল বলে কোনো ভাবে বেঁচে যায় দ্বিরেফ তবে এরই মাঝে কিছু রহস্য উন্মোচন হতে থাকে তার সম্মুখে। ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি করার মহাযজ্ঞে তাকে হারাতে হয় ধী আয়েদিস।

এবার আসি গল্পের যেই দিকগুলো আমার ভালো লেগেছে

✓ লেখকের লেখনশৈলী সুন্দর। গল্প বলার ধরণ সাবলীল এবং গোছানো। পড়তে অসুবিধা হয়নি।

✓ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অধ্যায় আকারে ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বেশ গুছিয়ে সাজানো হয়েছে। কোনো কিছু বেখাপ্পা লাগেনি।

✓ ফিকটাস ওয়ার্ল্ডকে ঘিরে যতটুকু বর্ণনা দেওয়া ছিল সেই অংশগুলো উপভোগ্য ছিল।

✓ নৈঋত চরিত্রটিকে রহস্যময়ী করতে লেখক বেশ সফল।

এবার আসি গল্পের যেই দিকগুলো আমার ভালো লাগেনি

√ বইটি ফ্যান্টাসি জনরার হলেও খুব বেশি ফ্যান্টাসির ছাপ খুঁজে পায়নি বলে আমি মনে করি। ক্ষমতা নিয়ে ভাগাভাগি, কাড়াকাড়ি নিয়েই বইয়ের অর্ধেক অংশ। ফিকটাস ওয়ার্ল্ড নিয়ে খুব বেশি বর্ণনা নেই। ধী আয়েদিস নিয়েও খুব একটা বর্ণনা নেই।

√ তিনশত বিশ পেইজের বই হলেও লেখক অনেকগুলো ঘটনার পর্দা উন্মোচন করেননি। যেমন:
∆ রানি আলেয়াকে কেন মারা হলো?
∆ ফিকটাস ওয়ার্ল্ডে কি ঘটেছিল? যেই ত্রিশজন সদস্য ওখানে ছিল তাদের সাথে কি হলো শেষ পর্যন্ত?
∆ জসুয়াকে কেন স্বপ্নে আলকানতারা বলে সম্বোধন করা হলো?
∆ জসুয়াকে খুন‌ করার জন্য কে পাঠালো?
∆ তৃতীয় মাত্রার ভূমিকম্প কি কোনো অশুভ শক্তির কারণে হয়েছিল?
∆ খেরবাড়িতে কাহফকে কে মারলো?
∆ খেরবাড়ির চাকর নিগেল কেন আলকানতারার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো?
∆রাজকীয় উৎসর্গ বইয়ের টাইটেল হলেও শুধু কি রানি হওয়ার পেছনে যে বিভৎস ঘটনার উল্লেখ আছে সেইটুকুকে ঘিরেই এই উৎসর্গ নাকি আরো অন্যকিছু ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত এই রাজকীয় উৎসর্গ?

√ শেষ অংশটুকু আরো ভালো হতে পারতো। এখানেও লেখক প্রশ্ন রেখে গিয়েছেন।

এই বইয়ের সম্ভবত দ্বিতীয় অংশ বের হবে যার কারণে লেখক অনেককিছু ধোঁয়াশায় রেখে গিয়েছেন যেটা চরম মাত্রার বিরক্তির কারণ। তবে গল্পের প্লট ইন্টারেস্টিং। দ্বিতীয় অংশে আশাকরি সবগুলো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবো।
Profile Image for AFROZA CHOITY .
29 reviews10 followers
June 23, 2022
সর্বপরি বলতে গেলে ভালো একটা ব‌ই। প্রথম দিকে একটু স্লো মনে হলেও শেষের দিকে তা পুষিয়ে দিয়েছে। শেষের দিকে কয়েকটা ক্লিফ হ্যাঙ্গার ছিল। যদি পরবর্তী পার্ট বের হয় তখন হয়তো সব প্রত্যাশা পূরণ হবে। লেখকের লিখনশৈলী ছিল সাবলীল।
Displaying 1 - 11 of 11 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.