‘দেবতার গ্রাস’ লেখকের প্রথম একক গল্প সংকলন। এই সংকলনটিতে স্থান পেয়েছে চারটি গল্প। চারটি গল্পই মূলত আবর্তিত হয়েছে যে চরিত্রটিকে কেন্দ্র করে, তিনি রুদ্রশংকর কৌল। রুদ্রশংকর কৌল এক যুবা সন্ন্যাসী, যিনি শৈব ও শাক্ত দুই মার্গেই তাঁর সাধনা সম্পন্ন করেছেন। রুদ্রশংকর ভক্তিমার্গে বিশ্বাসী। সকলের দুঃখে তাঁর মন সরল শিশুর মতো কেঁদে ওঠে। মা ছাড়া তিনি আর কিছুই জানেন না। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলেন, আমি ক্ষেমঙ্করীর খাসতালুকের প্রজা। আমি খাই দাই আর বগল বাজাই। আমি কিছু জানি না, সব আমার মা জানেন। মাতৃনাম আর মায়ের গান তার মুখে সবসময়। এমনই এক সাধক রুদ্রশংকর কৌল। সাধারণ মানুষকে অতিপ্রাকৃত শক্তির কবল থেকে রক্ষা করাই তাঁর জীবনের ব্রত। ১. সুখচরের অভিশাপ ২. দেবতার গ্রাস ৩. নয়নপুরের নরপিশাচ ৪. চণ্ডরোষণের রোষ
সপ্তর্ষি নারায়ণ বিশ্বাস-এর জন্ম ও বেড়ে ওঠা হাওড়ার বেলুড়ে। পৈত্রিক ব্যবসার সাথে যুক্ত। ছোটোবেলায় লেখালেখির ইচ্ছা থাকলেও সে আশা পূরণ হয়নি পড়াশোনা ও ব্যবসার জন্য। ফেসবুকে বিভিন্ন গল্পের গ্রুপে লেখা দিয়ে যাত্রা শুরু লেখকের। বিভিন্ন ম্যাগাজিনেও লিখেছেন লেখক। শখ-আহ্লাদ বলতে গান শোনা, সিনেমা দেখা, বিভিন্ন ধরনের বই পড়া ও খাওয়া দাওয়া।
শৈব ও শাক্ত— দুই মতেই সাধনা করেছেন রুদ্রশংকর কৌল৷ কিন্তু এই মানুষটি থিতু হতে চাননি। সেই যাত্রারই সূত্রে তিনি পৌঁছেছেন কিছু বিশেষ এলাকায়— যেখানে অতীতের তীর থেকে দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার সঙ্গে ভেসে এসেছে হিংস্র গর্জন। ভয় না পেয়ে দুর্বলের পাশে দাঁড়িয়েছেন রুদ্রশংকর। তাঁর তেমনই চারটি কাহিনি স্থান পেয়েছে এই বইয়ে। তারা হল~ (ক) সুখচরের অভিশাপ, (খ) দেবতার গ্রাস, (গ) নয়নপুরের নরপিশাচ, (ঘ) চণ্ডরোষণের রোষ। এবার ভাবুন এই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি টেমপ্লেটের কথা, যেখানে ধাপে-ধাপে নিম্নলিখিত ঘটনাগুলো আমরা দেখতে পাই~ ১. অতিপ্রাকৃত শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে একটি নির্দিষ্ট গ্রাম বা অঞ্চল বা ব্যক্তি; ২. কোনো এক জ্ঞানী ও শক্তিমান চরিত্রের আগমন ঘটেছে; ৩. ঘাত ও প্রতিঘাতের মাধ্যমে অশুভের পরাজয় ও শুভের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। অজস্র কাহিনি এই টেমপ্লেট মেনে রচিত হয়েছে ও হচ্ছে। তাহলে আলোচ্য বইটির বিশেষত্ব কোথায়?
প্রথমত, বক্তব্যে বা বর্ণনায় বীভৎস রস এবং যথেচ্ছ যৌনতা প্রদর্শনের সুযোগ থাকা সত্বেও লেখক সেই ফাঁদে পা দেননি। বরং তিনি সংযম ও মিতকথনের পরিচয় দিয়ে কাহিনিদের ইতিহাসে প্রোথিত করায় বেশি আগ্রহী হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, কথার সূত্রেই শক্তি-সাধনার নানা দিক, তত্ত্ব ও তথ্য এই গল্পগুলোতে এসেছে। কিন্তু সেইসব বর্ণনার মধ্যেও এমন একটা সহজ শ্রদ্ধা প্রকট হয়েছে, যা পড়ে কখনোই মনে হয়নি যে লেখক ইনফো-ডাম্পিং বা জ্ঞানদান করছেন। তৃতীয়ত, রুদ্রশংকরের মুখে বহু শ্যামাসঙ্গীত ও লোকগীতি ব্যবহার করা হয়েছে। এই গানগুলোই গল্পগুলোর লাল রঙকে রক্তের বদলে জবার তুল্য করে তুলেছে। তান্ত্রিক হররের নামে মুন্ডু চিবোনো আর ঢকঢক করে রক্ত খাওয়ার গল্পে গ্রুপ থেকে ইউ-টিউব— সব প্লাবিত। সেই পটভূমিতে এমন একটি শীলিত, শোভন, বিবরণে নিপুণ অথচ টানটান লেখায় ভরা বই পড়তে পাওয়া ভাগ্যের কথা।
তবে এর কি সবটাই কুসুম, নাকি কিছু কাঁটাও আছে? আছে বইকি। সেগুলো হল~ ১) গল্পগুলোর ক্লাইম্যাক্স একমাত্রিক। একমাত্র 'দেবতার গ্রাস' ছাড়া অন্য কোনোটিতেই রুদ্রশংকরকে তেমন বিপদে পড়তেই হয়নি। সুপারহিরো'র হার না হলে যে তাঁর মহত্ব কমে যায়— এ আমরা সবাই জানি। তাই লেখককে ভাবতে হবে, কীভাবে তিনি রুদ্রশংকরের চলার পথে আরও কাঁটা বিছিয়ে গল্পগুলোকে আরও নাটকীয় করে তুলতে পারবেন। ২) শেষ গল্পটি ভীষণই, যাকে বলে, "শর্টে মেরে দেওয়া" হয়েছে। অথচ যেভাবে গল্পটার বিস্তার শুরু হয়েছিল তা থেকে মনে হয়, এটিকে নিদেনপক্ষে নভেল্লা করার ইচ্ছে ছিল লেখকের। কেন তিনি সেই ইচ্ছেকে মাঝপথে জরাসন্ধ কেস করে দিলেন— বুঝলাম না।
বইটির ছাপা পরিষ্কার। বানান-ভুল একদম চোখে পড়েনি। বিপাশা মিত্রের প্রচ্ছদটিও শোভন ও যথাযথ— তবে ভেতরে আরও কিছু অলংকরণ থাকলে ভালো হত। রক্ত ও মাংসের রৌরব থেকে বেরিয়ে, অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও নির্মল ও নিটোল গল্পের মধ্য দিয়ে শুভাশুভের দ্বৈরথ দেখতে চাইলে এই বইটিকে আপন করে নিতে পারেন। হয়তো দেখবেন, আশেপাশে জ্বলে থাকা দাউদাউ আগুনের শিখাগুলো স্নেহ আঁচলে ঢেকে বসে থাকা শান্তিময়ীর নাগাল এর মধ্যেই পেয়ে গেলেন!
বইটিকে নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করার আগেই বলে রাখি এই বইটি একটি তন্ত্রনির্ভর বই। আর তন্ত্র এমন এক জিনিস যা মানুষ বিশেষে স্বাদ পরিবর্তন করে। তাই এই পাঠক প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ ভাবে আমার মত একজন ছোট্ট পাঠকের মতামত। যদি কোন জায়গা ভুল ত্রুটি থাকে মার্জনা করে দেবেন নিজ গুনে। ---------------------- প্রথমেই আমি বইটির বাহ্যিক গঠন সম্বন্ধে সামান্য বলে নেওয়ার পর বিস্তারিত আলোচনায় যাবো।
🔱 প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ- কথায় বলে "প্রথমে দেখনদারী তারপর খুন বিচারী" । আর এই বই এর প্রচ্ছদ এতটাই মনগ্রাহী যে এটি যেকোন পাঠককে আকর্ষণ করবেই। তার অন্যতম কারণ বোধহয় বইটির কালার কম্বিনেশন। আর ছবিটিও বিষয়বস্তু এর সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ । আর তারসাথে হৃদয়স্পর্শী অলঙ্করণ, যা বইটাকে দুই হাতের তালু মধ্যে আর চোখের দৃষ্টি মধ্যে বেঁধে রাখতে যথেষ্ট। 🔱 বই এর বাঁধন এবং পাতার মান বেশ ভালো।আমার মাথামোটার দপ্তর প্রকাশনা এর বই এর প্রতি একটা অমোঘ টান তৈরি হয়েছে ওনাদের কাজ দেখে। প্রতিটি কাজ এতটাই যত্ন সহকারে চয়ন দা করান তাতে ওনার প্রতি ধন্যবাদ জানালেও কম বলা হয়, তাই ওনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ এত সুন্দর উপস্থাপনা এর জন্য। আর চয়ন দা এর মত একজন ভালো মনের মানুষ এর সান্নিধ্য পাওয়াও একটা অনেক বড় প্রাপ্তি আমার কাছে। -------------------------------- এবার আমি বইটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে সামান্য বলি। তার আগে বলে রাখি এই বই হলো চারটি বড় গল্প বা নোভেলা এর সংকলন। আর প্রতিটি লেখাই এক একটি রত্ন। আর চারটি রত্ন হলো- ১. সুখচরের অভিশাপ ২. দেবতার গ্রাস ৩. নয়নপুরের নরপিশাচ ৪. চণ্ডরোষণের রোষ
এর সাথে বলেরাখা প্রয়োজন এই বই হলো রুদ্রশংকর কৌল নামের এক জন মানুষ এর গল্প নিয়ে লেখা। আমরা বাংলা সাহিত্যের তান্ত্রিক মানেই তারানাথ তান্ত্রিক কে বুঝি। আর এই রুদ্রশংকর কিন্তু তান্ত্রিক নন। তাহলে রুদ্রশংকর কী? রুদ্রশংকর হলেন শৈব ও শাক্ত দুই মার্গেই সাধনা সম্পন্নকারী সন্ন্যাসী। তিনি হলেন মায়ের সন্তান। কেউ তার পরিচয় জানতে চাইলেই তিনি শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ এর মতো বলে ওঠেন " আমি হলুম ক্ষেমঙ্করীর খাসতালুক এর প্রজা, আমি কিছুই জানিনা, আমি খাই দাই আর বগল বাজায়, সব আমার মা জানেন"। কৌল মহাশয় এর আরও একটি অসীম প্রতিভা হলো শ্যামা সঙ্গীত বা বলা ভালো মা কালী কীর্তন এর সুমধুর কন্ঠ। এর সাথে তিনি যে কোন মানুষ এর যে কোন প্রয়োজনে সবসময় হাজির তাতে সেটা নিজের জীবনের বদলেই হোক না কেন। আর এই রুদ্রশংকর কৌল এর সঙ্গী হন রতন এবং পরে তার সাথে যোগ দেন ছোট্ট ছেলে হুলো।
🔱 সারসংক্ষেপ- 📿 সুখচরের অভিশাপ গল্পে আমরা দেখতে পায় সুখচর নামের এক গ্রামে প্রায় ৯০ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক অপকর্মের ফল ভোগ করে চলেছে গ্রামের সব মানুষ। এক করাল অভিশাপ এর কোপে বলি হচ্ছে গ্রামের মানুষ জন। আর সেই অভিশাপ থেকে একমাত্র তাদের মুক্তি দিতে পারে এমন কোন মানুষ যে শৈব এবং শাক্ত উভয় মার্গে দিক্ষিত। আর ঘটনাচক্রে সেই সময়ই ওই গ্রামে এসে উপস্থিত হন রুদ্রশঙ্কর কৌল। আর সেখানে আশ্রয় নেন মা করুণাময়ী কালীর মন্দিরে। যে মন্দিরের দরজা নাকী খোলেনি বহুবছর। আর সেখানেই তার পরিচয় হয় রতনের সাথে। আর তারপর ঘটে এক অসীম ধৈর্য্য ও ক্ষমতার লড়াই। মা করুণাময়ী রুদ্রশংরের ডাকে সাড়া দেবেন ? কৌল কী পারবে সুখচরকে অভিশাপ মুক্ত করতে? কী সেই অভিশাপ এর নেপথ্যে ইতিহাস? রতনের জীবনেই বা ইতিহাস কী? এই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে এই নভেলা। 📿 দেবতার গ্রাস এই গল্পের নাম থেকে ই বই এর নামকরণ। এই কেন্দ্রিয় চরিত্রে অবস্থান করছেন দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী এবং সবথেকে ভয়ঙ্কর দেবী মা ধূমাবতী। এই ধূমাবতী হলেন দেবী মহামায়ার বিধবা রুপ। যিনি হলেন প্রলয়ের প্রতীক। ওনার বাহন কাক। আর এই দেবীর কোপে পড়েন রুদ্রশংর। এর সাথেও জড়িয়ে আছে এক নৃশংস ঘটনা বহুল ইতিহাস এবং তার থেকে কঠিন এক অভিশাপ। যে অভিশাপ এর তাড়নায় জমিদার বংশ এর শিবরাত্রির সলতে নিভে যাওয়ার অপেক্ষায়। আর সেখানেই হস্তক্ষেপ করে। আর সেখানেই এই গল্পের চমক। কী ফল ভো��� করতে হয় রুদ্রশংকর কে? কী সেই জমিদার বংশের পাপ? দেবী ধূমাবতী কী ভাবে এই জমিদার বংশের সাথে যুক্ত হলেন? ⚔️⚔️ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই গল্পটি একটি youtube channel এ অডিও স্টোরি রুপান্তর হয়েছে , আমি সেখানেও শুনেছি , তাদের উপস্থাপন ও বেশ ভালো। আপনারাও শুনতে পারেন ⚔️⚔️ 📿 নয়নপুরের নরপিশাচ গল্পটি এক অপদেবতা নরকেশ্বর এর বিরুদ্ধে রুদ্রশংকর ও তার মা এর লড়াই। এই গল্পে ব্রজমোহন ও মায়ার সন্তান হয় নরকেশ্বরের পূজার ফলে। আর সেখানেই সূচনা হয় অভিশাপ এর। তাদের জীবিত সন্তান হয়ে হয়ে ওঠে নয়নপুরের ত্রাস। তার দরকার রক্তের, তার একমাত্র উৎস হলো মানুষ। আর এখানেই আগমন ঘটে রুদ্রশংকর এর। আর তার জীবনে ঘনিয়ে আসে কাল মেঘ। কিন্তু কেন? কেন তাদের সন্তান এমন? রুদ্রশংকর কী পারবে নয়নপুর কে বাঁচাতে? নাকী হবে অন্য কিছু? কে এই নরকেশ্বর ? তার সৃষ্টিই বা কী ভাবে? ⚔️ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই গল্পেই রুদ্রশংকর এর সাথে যুক্ত হয় হুলো নামের এক বাচ্চা ছেলে। 📿 চণ্ডরোষণের রোষ গল্পটি এই বই এর অন্তিম গল্প। আর এই গল্প এর সূচনা রুদ্রশংকর এর জীবনের শুরুর দিক এর ঘটনা দিয়ে। এখানেই রুদ্রশংকর এর সন্ন্যাস পূর্ববর্তী জীবনের সমস্ত ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এই গল্পের মূল উপজীব্য অন্য। এখানে আমরা পাই একজন কলেজ এর শিক্ষক অদ্রীশ এর কথা, যার নেশা হলো ছবি তোলা। সেই অদ্রীশ এক রিসার্চ শুরু করে উড়িষ্যার কান্ধামাল নামক এক জায়গার এক উপজাতি সম্প্রদায় দের জীবনের উপর। আর সেখানে গিয়েই সে এক অনুষ্ঠানের কথা জানতে পারে, এবং সেই অনুষ্ঠানের রাতেই তার জীবনে এসে পড়ে চণ্ডরোষণ দেবতার রোষ। এই রোষ এর ফল ভুগতে হয় অদ্রীশ কে বেশ কিছু বছর। আর তারপর একদিন অদ্রীশ এর বাবার বন্ধু সুখেন বাবুর মাধ্যমে তিনি এসে পড়েন রুদ্রশংকর কৌল এর কাছে। আর তারপর ই শুরু হয় বৌদ্ধ মন্ত্রযান ধারার দেবতা চণ্ডরোষণ এর সাথে রুদ্রশংকর এর এক অদৃশ্য লড়াই। আর তার সাথে রুদ্রশংকর এর ক্ষমতা পরিদর্শন এর এক অন্তিম পর্ব। কে এই চণ্ডরোষণ? কেন বৌদ্ধ মন্ত্রযান ধারার উল্লেখ এলো এই গল্পে? কী সেই ধারার ধারাবাহিকতা? অদ্রীশ এর কী হয়েছিলো? কী ছিল সেই উপজাতি সম্প্রদায় এর উৎসব? রুদ্রশংকর কী পারবে এই অদৃশ্য সমর জিততে? _______________________________________ এবার একটু নিজের অনুভূতি এর কথা বলি।
📌 ভালো লেগেছে- ১.) প্রতিটি গল্পের ক্ষেত্রে একটি অসম্ভব সুন্দর ধারবাহিকতা ও সাবলীলতা বজায় রেখে শেষ এ একটি দারুণ টুইস্ট দিয়েছেন লেখক।
২.) অনেক দিন পর আবার এই ধরনের বিশ্ব তন্ত্রের উপর লেখা পড়লাম। বর্তমান দিনে তন্ত্র মানেই ভাবাহয় তারানাথ তান্ত্রিক এর অনুকরণে লেখা, কিন্তু এই বই বেশ স্বতন্ত্র। কোন অনুকরণ এর ছাপ নেই লেখার মধ্যে।
৩.) মানে প্রচুর পরিমাণে রিসার্চ ওয়ার্ক না করলে এই ধরনের লেখা বোধহয় সম্ভব না। কারণ দশমহাবিদ্যার যে বর্ণনা লেখক এখানে করেছেন তা মুগ্ধ হয়ে পড়ে গেছি। তার সাথে অনন্য বহু নতুন নতুন তথ্য জানতে পেরেছি বইটির হাত ধরে।
৪.) আর লেখকের চরিত্র সৃষ্টি নিয়ে বলতে গেলে আমি একটাই কথা বলবো রুদ্রশংকর আমার কাছে একজন আদর্শ হয়ে উঠেছেন। চরম নাস্তিক মানুষ ও এই বই পড়ে ভগবানে বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন লেখকের লেখার ও চরিত্র সৃষ্টির গুণে।
৫.) প্রকাশক তার অসীম দক্ষতা দেখিয়েছেন এই বই এর ক্ষেত্রে। আর তার সাথে প্রুফ সংশোধন যিনি করেছেন তিনিও রিতিমত নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে এই বই এর কাজ করেছেন। এর জন্য আমি ওনাদের কেও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি।
📌 ভালো লাগেনি-
১.) যে জায়গা গুলোতে লেখক শুভ শক্তির সাথে অশুভ শক্তির লড়াই দেখিয়েছেন , সেই জায়গা গুলোকে আরও বেশি ধারালো করার প্রয়োজন আছে।
২.) লেখকের লেখার গতি অত্যন্ত বেশী মনে হয়েছে। কারন বই এর শুরুর রুদ্রশংকর এর বয়স আর বই এর শেষ এ রুদ্রশংকর বয়স এর পার্থক্য অনেকটাই। লেখা আরও ধীরে করার প্রয়োজন আছে। কারণ রুদ্রশংকর সিরিজ এর দাবী যে কোন পাঠক এর থাকবে।
৩.) আর কোটেশন এর ব্যাবহার বিষয়ে বেশ যত্নশীল হওয়ার প্রয়োজন ছিলো। কারণ বেশ কিছু জায়গায় কোটেশন শুরু হলেও শেষ হয়নি।
----------------------------------- বইটি আমার চরম লেবেলে ভালো লেগেছে এটুকু আমি এক বাক্যে বলতে পারি। তাই বলে কী এই বই এর ভুল থাকবে না? অবশ্যই আছে কিছু ভুল। আর এরপর সেগুলোই বলবো।
📌 এবার বলি বইটি কিছু ভুল-
১.) সুখচরের অভিশাপ গল্পে পঞ্চমাথা কে একবার পঞ্চদেবতা বলা হয়েছে ভুল করে।
২.) সুখচরের অভিশাপ গল্পে নবীনের, কুসুমকে নিতে আসার কথা হয় দু সপ্তাহ পড়ে। কিন্তু তার পরের পর্বেই দেখা যায় কয়েক মাস পরের ঘটনা লেখা হয়েছে।
৩.) রতনের ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে লেখকে নজর দিতে হবে। কারণ আমরা বই এর শুরুর দিকে রতন কে তার আঞ্চলিক ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখলেও পরবর্তী তে তা সাধারন বাংলা চলিত ভাষায় পরিণত হয়ে গেছে। ----------------------------------------------
📌 এবার আমার মত পাঠকের প্রতি কিছু বলি। মানে বইটি কেন পড়বেন এবং কারা পড়বেন। এই বইটি প্রাপ্ত মনষ্ক পাঠকরা পড়ুন। আর বইটি পড়ার কারণ শুধু মাত্র একজন ই হতে পারেন, আর তিনি হলেন রুদ্রশংকর কৌল। আর যারা একটু নতুন ধরনের তন্ত্রনির্ভর বই পড়তে চাইছেন তাদের জন্য এই বই আমি অবশ্যই রেকমেন্ড করবো।
📌 লেখকের প্রতি একটাই কথা বলবো বা বলা ভালো একটাই দাবী রাখবো রুদ্রশংকর কৌল সিরিজ চাই ই চাই। কারণ এমন সাধক বাংলা সাহিত্যে নেই বললেই চলে। তবে এই বই কিন্তু প্রমাণ করেছে লেখকের নামে নয় বই ভালো লাগে লেখার গুণে। লেখকের প্রথম বই হলেও আমার মন কেরে নিয়েছে এই বই। ধন্যবাদ লেখক সপ্তর্ষি দা কে। দাদার লেখা আরও বেশী ছড়িয়ে পড়ুক পাঠক মহলে। 😍😍
ধন্যবাদ 🙏 সকলে ভালো থাকুন 🙏 সুস্থ থাকুন 🙏 আর অবশ্যই অবশ্যই বই এ থাকুন 🙏
Predictable, কিন্তু ভালো লাগবে। একটা সারল্য আছে গল্পগুলোতে যেটা টানবে পাঠককে। বীভৎস রসের বদলে ভক্তিরস এনেছেন সপ্তর্ষিদা which is really commendable,, পড়ে দেখুন, ভালো লাগবে।
#পাঠ_প্রতিক্রিয়া #৪ (২০২২) বই - দেবতার গ্রাস লেখক - সপ্তর্ষি নারায়ণ বিশ্বাস প্রকাশনা - মাথামোটার দপ্তর
এটি লেখকের প্রথম বই । বইটির মুলে রয়েছেন রুদ্রশঙ্কর কৌল নাম্নী এক সাধক । শৈব ও শাক্ত - দুই মতেই সাধনা করেছেন তিনি । গুরুর আদেশে তিনি পরিব্রাজক । সারা দেশ ঘুরে ঘুরে যখনই কোনো সাহায্যপ্রার্থীর সম্মুখীন হন তখনই তার সংকট মোচনে সচেষ্ট হন । এরকমই চারটি ঘটনা স্থান পেয়েছে ~২০০ পাতার এই বইটিতে । কাহিনীগুলি হল যথাক্রমে :
প্রায় ৫০ পাতার প্রতিটি গল্পই এক ছকে বাধা । যেখানে দেখা যায় কোনো এক কারণে এক অশুভ শক্তির আগমন এবং পরে রুদ্রশঙ্করএর হাত ধরে মা আনন্দময়ীর ইচ্ছায় সেই অশুভ শক্তির বিনাশ । প্রতিটি গল্পেই অতি যত্নের সাথে অশুভ শক্তির আগমনের চিত্রটিকে আঁকা হয়েছে । কি ভুলের মাশুল হিসেবে কার বা কাদের প্রতি এই অশুভ শক্তির আগমন তার বর্ণনা প্রতিটি গল্পেই মনগ্রাহী । রুদ্রশঙ্কর কৌল চরিত্রটি যেভাবে মায়ের সাধনা করে গেছেন সারা বই জুড়ে তাতে আমার নিজের মধ্যেও ভক্তিভাব বেড়েছে । রুদ্রশঙ্কর কৌলের মুখে বেশ কটি ভক্তিগানের ব্যবহার করা হয়েছে এই বইতে । গানগুলির উপস্থাপনার গুনে গানের কথাগুলি বইটা পড়ার প্রথম দিন থেকেই মাথায় ঘুরছে । একটা সিনেমা দেখার পর তার হিট গানগুলো যেরকম মুখে মুখে ঘুরে সেরকমই । দশমহাদিয়া, কামরূপ-কামাখ্যা এই বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য অত্যন্ত সাবলীল ভাবে পরিবেশন করা হয়েছে । প্রতিটি গল্পেরই ৯০ই ভাগ জুড়ে এই জিনিসগুলি রয়েছে। বাকি দশ ভাগে সেই শক্তির বিনাশের পর্বটা স্থান পেয়েছে , যা আমার মতে একটু বেশি সহজ ও সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে । যাই হোক, বইটি পরে খুশি হয়েছি , অনেক কিছু জেনেছি এবং আরো নতুন কিছু জানার জন্য আগ্রহ পেয়েছি, তাই বাকিদের বলবো পড়ে দেখতে পারেন । বইটির সন্ধান পাই goodreads এ ঋজু গাঙ্গুলীর রিভিউ থেকে ( https://www.goodreads.com/book/show/5... ). তার জন্য ঋজুদাকে ধন্যবাদ।
লেখক ভবিষ্যতে রুদ্রশঙ্কর কৌলের আরো চ্যালেঞ্জিং কিছু কাহিনী নিয়ে এলে সাগ্রহে পড়বো । তার অপেক্ষায় রইলাম ।