বিতর্কিত সার্বিয়ান বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা-র আবিষ্কারের সাহায্যে এক দল ষড়যন্ত্রকারী চাইছে পৃথিবীর বুকে ভয়াবহ বিষাক্ত ছোবল বসাতে। তাদের প্রলয়নেশায় ধস নামল পাহাড়ে, ফুঁসে উঠল সমুদ্র, ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গেল আস্ত এক শহর। উদ্দেশ্যটা কী এদের?
পুরানো বন্ধু সেলেনার সাহয্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ কাউণ্টার ইণ্টেলিজেন্সের মাসুদ রানা গিয়ে পড়ল প্রচণ্ড এই আবর্তের মধ্যে।
কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
3.5★ মাসুদ রানা সিরিজের বই হিসেবে এ্যাভারেজ বই, মাসুদ রানা সিরিজের বাইরে শুধু অনুবাদ হিসেবে চিন্তা করলে বেশ ভালো লাগতো কিন্ত রানা সিরিজে এই ধরনের বই এখন খুব একটা ভালো লাগেনা আর।😔 ডিউক জনের অনেক সুন্দরভাবে অ্যাডপ্ট করেছেন, আশা করি ইন শা আল্লাহ মাসুদ রানা সিরিজের সামনের বইগুলোতেও উনার লেখা পাব।
স্পাই মাসুদ রানার দিন ফুরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। এখন সে পুরোদস্তুর অ্যাকশন হিরো। সে কারণেই মাসুদ রানার সঙ্গ থেকে নিজেকে সরিয়ে এনেছিলাম, তবে সম্প্রতি প্রকাশিত শকওয়েভ বইটার বেশকিছু ইতিবাচক রিভিউ দেখেই আগ্রহ জাগে। যদিও জানা ছিলো আগের কয়েকটা বইয়ের মতো এটাও স্কট ম্যারিয়ানির লেখা বইয়ের অ্যাডাপ্টেশন। প্লট গতানুগতিক থ্রিলারের ট্রোপ অনুসরণ করা- প্রবল ক্ষমতাশালী উন্মাদ খুনি দুনিয়ায় ধ্বংস ডেকে এনে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতে চাইছে আর আমাদের বাঙালি স্পাইয়ের কাজ হচ্ছে তাকে ঠেকানো। প্লটের জন্য অবশ্য ম্যারিয়ানিই দায়ী। এখানে অনুবাদকদ্বয়ের কোনো দায়ভার নেই। বেন হোপ সিরিজের নবম বই দ্য নেমেসিস প্রোগ্রামের অ্যাডাপ্টেশন শকওয়েভ। বেশ ধুন্দুমার মারপিট আর হলিউড-সুলভ অ্যাকশন সমৃদ্ধ গল্প। কিংবদন্তী কাজীদার সাথে ডিউক জনের প্রথম কাজ মাসুদ রানায় এটি। সেবার চিরাচরিত মান অক্ষুণ্ণ থেকেছে মসৃণ অনুবাদের মাধ্যমে। ভাষাশৈলী বেশ চমৎকার। উপমা, শব্দ ও নামচয়ন বেশ ভিন্নধর্মী, দ্যোতনা ও ছন্দময়। উইলবার স্মিথসুলভ পরিবেশ ও জেমস রলিন্স সুলভ টেকনিক্যাল বর্ণনাও ছিলো বেশ ক’পাতা জুড়ে। কোথাও এতটুকু আটকাতে হয়নি পড়তে গিয়ে। অর্ধেক পৃথিবী ঘোরা হয়ে গেছে রানার সাথে প্লেনে চেপে। মন্দ লাগেনি সেটা। এক জায়গায় রহস্যপত্রিকার নাম দেখে বেশ মজা লেগেছে। মাঝেসাঝে পুরনো রানার রেফারেন্সও স্মৃতিতে দোলা দিয়ে গেছে। এবার আসি রূপান্তর-কর্মে যা ভালো লাগেনি সে কথায়ঃ ৪৬৬টা বই আর পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে পরিচিত মাসুদ রানার সাথে খাপ খায় না এমন বেশ কিছু ব্যাপার চোখে ঠেকেছে বার বার। যেমন, গল্পে সেলেনা যখন রানাকে আশু ধ্বংসের কথা বলে সতর্ক করতে চাইছে তখন রানা স্রেফ গাঁজাখুরি বলে তা উড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ এতশত ভিলেনের মুখোমুখি হওয়া আর হাই-টেক ব্যাপারস্যাপার ভেজে খাওয়া রানা যখন বিজ্ঞানের সম্ভাবনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়- তখন খটকা লাগা স্বাভাবিক। এছাড়াও স্রেফ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে রানা যখন নিরস্ত্র শত্রুকে ঘাড় মটকে মেরে ফেললো তখন যারপরনাই বিস্মিত হয়েছি। কারণ প্রতিপক্ষের হাতে অস্ত্র না থাকলে কিংবা হামলার শিকার না হলে রানা নরহত্যা করে না- এটা বহু আগে থেকেই দেখে এসেছি। আরেক জায়গায় রানার মুখে নাটকীয় ‘কাম অন ফ্রেণ্ডস!...থেমো না বন্ধুরা!’ শুনি তখন অদ্ভুত লাগে বৈকি। কয়েকটা জায়গা বাদ দিলে সবমিলিয়ে মোটাতাজা আকারের উপভোগ্য একটা বই।
সৈনিক, গোলাবারুদ, কামান, ড্রোন, যাবতীয় হাতিয়ার- পৃথিবীর সবচেয়ে সফল সামরিক অপারেশনে এসবের আর দরকার নেই। ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য প্রযুক্তির কিছুই প্রয়োজন পড়বে না। যুদ্ধ শুনলেই আমাদের চোখের সামনে যা যা ভেসে ওঠে সেসবের কিছুই থাকবে না। কিন্তু সামান্য একটা জিনিস ব্যবহার করে পুরো আস্ত দেশকে আপনি হাতের মুঠোয় পুরতে পারবেন। যুদ্ধে যে পুরো আরামসে এবং একশোতে একশো স্টাইলে জিতে যাবেন তা তো বলাই বাহুল্য। এর জন্য লাগবে সামান্য একটা জিনিস! সেটা হলো- "শকওয়েভ!" প্রতিটা গল্পেই একজন খলনায়কের দরকার পড়ে। সেক্ষেত্রে প্রকৃতিমাতার চেয়ে ভাল খলনায়ক আর কে হতে পারে? যেসব রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার শত্রুতা সেখানে দেখা গেল হুট করে, বিনা নোটিশে, কথা নেই বার্তা নেই ভয়ংকর কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে গেল। মরল লাখ লাখ মানুষ, নিশ্চিহ্ন হলো শহর। রাষ্ট্রব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ল। ঠিক তখনই খোদার রহমত হিসেবে আবির্ভূত হলো আমেরিকা, যাদের দয়ায় টিকে আছে পুরো পৃথিবী। ওরা বাড়িয়ে দিল সাহায্যের হাত, এরপরই বদলে গেল দুর্যোগে আক্রান্ত দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা। কী? ডাল মে কুচ কালা হ্যায় মনে হচ্ছে? আসলেই আছে। ডালের ভিতরটা পুরাই বুড়িগঙ্গার পানির মত কালা। আর সেসবেই নাক গলাচ্ছিল এক মেয়ে। সে খবর পাঠাল তার বান্ধবীকে। বান্ধবী আবার আমাদের মাসুদ ভাইয়ের পরিচিত। নাক গলানোর ব্যাপারে রানাও জড়িয়ে পড়ল। শুরু হলো কেয়ামত। রানা এজেন্সির টমাস হার্ডি তো জিজ্ঞেসই করে বসল, "এবার কার পোঁদে আঙুল দিয়েছ, বন্ধু?" এই যে একটা ক্যাঁচাল, সেটার শুরু কিন্তু অনেক আগে। সার্বিয়ান বিজ্ঞানী টেসলার মাধ্যমে এর শুরু। যার পুরোটা রানা জানে না, তবে শীঘ্রই জানবে। "চিফ" নামের এক রহস্যময় চরিত্র এরই মধ্যে তৎপর হয়ে উঠেছে। পাঠিয়ে দিয়েছে খুনে বাহিনী, গ্রেনেড লঞ্চার, হেলিকপ্টার, বেশ কিছু ডাবল এজেন্ট এবং "রিপেয়ারম্যান" নামের এক সিরিয়াল কিলার। একটু পরই শুরু হবে ভূমিকম্প, অথচ মাসুদ রানা আটকা পড়েছে কবরস্থানে! ভিলেনরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে বলছে, "ভাল হয়ে যাও, মাসুদ! ভাল হয়ে যাও!" দেখা যাক মাসুদ ভাই কীভাবে সবকিছু সামলায়, দেখা যাক বই শেষ করার আগ পর্যন্ত কত মানুষ মরে। বেশ কিছু ভায়োলেণ্ট অ্যাকশন ছিল, ছিল দুর্ধর্ষ কার চেসিং সিন, প্রচুর গোলাগুলি আর সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সাসপেন্সফুল সিকোয়েন্স আর ছিল পাঠকের চাহিদা মেটাবার মত টুইস্ট। কয়েক মুহূর্তের জন্য কবীর চৌধুরীর দেখাও পাওয়া গেছে। পড়ে দেখতে পারেন। পুনশ্চ- মাসুদ ভাই আর কবীর ভাই, দু'জনের নামের শেষেই চৌধুরী আছে। চৌধুরীতে সাদৃশ্য থাকার কারণে তাদেরকে পরস্পরের খালাতো ভাই, চাচাতো ভাই বানায়া দেয়া যায় না?
স্কট ম্যারিয়ানির লেখা বেন হোপ সিরিজের দ্যা নেমেসিস প্রোগ্রামের এডাপটেশন "শকওয়েভ"। স্পাই মাসুদ রানাকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও একদম মারদাংগা একশন হিরো মাসুদ রানা উপস্থিত। বিজ্ঞানী টেসলার অপ্রকাশিত এক গবেষণা নিয়ে গল্প এগিয়ে চলেছে। এই গবেষণার ফলাফল বদলে দিতে পারে পুরো পৃথিবীর মানচিত্র! লেখা ঝড়ঝড়ে এবং আরামদায়ক, গল্প যেহুতু এডাপটেশন সেহুতু মূল গল্পের প্লটটা আমার কাছে একটু বেশি প্যাচানো মনে হয়েছে। তবে বইটা পড়ে একদম একশন মুডে চলে যাবেন আপনি এটা নিশ্চিত।