লেখক তাঁর অরণ্যবাসের অসাধারন অভিজ্ঞতাগুলিকে সুখপাঠ্য কাহিনিতে পরিণত করে ‘কথাসাহিত্য’ পত্রিকাতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন। সেগুলিকে নিয়েই তিনি পরবর্তীকালে ‘জঙ্গলে জঙ্গলে বইটির রূপ দেন। সেযুগে বনভূমি ছিল অতি দুর্গম এবং বিপদসংকুল। যাতায়াতের পথঘাট প্রায় ছিলই না।, যোগাযোগ ব্যবস্থাও চিল সেইরূপ। বর্তমান বইটি পড়লে পাঠকেরা বিশেষভাবে রোমাঞ্চিত হবেন। তৎকালীন জঙ্গলের বুকে কর্মময় জীবনযাত্রা যে কীভাবে চাকুরিজীবনে প্রতিফলিত হত তার একটি সুনিপুণ প্রতিচ্ছবি আমরা এখানে দেখতে পাই এবং আজকের উন্নততর পথঘাট ও শিল্পবিপ্লবে তাঁদের ভূমিকা যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটিও পাঠকমনকে নাড়া দেয়।
বর্তমান বইটিতে সংযোজিত হয়েছে লেখকের সংগৃহীত তৎকালীন কিছু ছবি। এ ছাড়াও আছে কন্যাপ্রতিম দৌহিত্রী মঞ্জরী ঘোষকে লেখকের নিজের হাতের লেখা ১৯৫১ সালের একটি চিঠি এবং জঙ্গলের ভেতরে একটি ক্যাম্পের নকশাচিত্র।
প্রায় শতবর্ষ আগের ভারতবর্ষ। লেখকের ছোটবেলা কেটেছে আফ্রিকায়। বাংলা বলতে পারতেন না ঠিকমতো। দেশে এসে চাকরি নেন শ্বাপদসংকুল উলুবেড়েতে। সেখানকার অরণ্যজীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছেন "জঙ্গলে জঙ্গলে।" সে এক বন বটে। রাতে ঘরে বসে আছেন, ঠিক দুয়ারে হয়তো ঘোরাফেরা করছে ভালুক বা উঁকিঝুঁকি মারছে বিশালাকার সাপ। পথেঘাটে হিংস্র পশুদের আক্রমণ ছিলো নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। রোমাঞ্চকর ঘটনার পাশে আছে সামান্য অসুখে ভুগে মানুষের করুণ মৃত্যু বা হাস্যরসাত্মক অভিজ্ঞতার কথাও। একটা ব্যাপার, বইটা সুসম্পাদিত নয়। গদ্যশৈলী একেক স্থানে একেক রকম। তাই পাঠ অভিজ্ঞতা পুরোটা সুখকর বলা যায় না।
(এ বই পড়ে "আরণ্যক" এর কথা অবধারিতভাবে মনে পড়বে। বন কেটে উজাড় হওয়ার পেছনে যে শ্যামলকৃষ্ণেরও হাত আছে!)
লেখকের অকাপট্য আর সূক্ষ্ম বীক্ষণগুণে বইটা রাঙানো। খুব চমকপ্রদ উপাদান নেই, কিন্তু এমন এক স্থানকালপরিসরের স্মৃতি তিনি মলাটে বেঁধেছেন, যার বর্ণনা বাংলায় মেলাই দুষ্কর। প্রমদারঞ্জনের 'বনের খবর' আর জন হান্টারের 'হান্টার'-এর কথা মনে পড়লো।
লেখকের জন্ম আফ্রিকাতে। জানতেন কেবল ইংরেজি আর সোয়াহিলি। বাংলায় এসে চাকরির খোঁজে পাড়ি জমান উলুবেড়েতে। সেখানের জঙ্গলবাসের অভিজ্ঞতাই বর্ণনা করেছেন বাংলায়। ভারতবর্ষে ফেরার পর বাংলাটা বেশ ভালোমতোই শিখে নিয়েছিলেন, তাই বাংলা সাহিত্যের জঙ্গলকাহিনীর একটি অন্যতম গ্রন্থ রচনা করতে পেরেছিলেন। বইটির কথা জানি সবিতেন্দ্রনাথ রায় এর কলেজ স্ট্রীটে সত্তর বছর বইয়ের তৃতীয় পর্ব থেকে। কতভাবে যে ঋণী করছে বইটা আমাকে! এই বইয়ের কাহিনী জঙ্গল নিয়ে হলেও এটা কোন শিকার কাহিনী নয়। বরং লেখকের চাকরিকালীন টিকে থাকার অভিজ্ঞতা সমষ্টি। চাইবাসার জঙ্গলে ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার সাথে লড়াই, আশেপাশে সম্বর থেকে ভালুক হয়ে বাঘ পর্যন্ত প্রাণীদের নিয়ে বেঁচে থাকার গল্প, চিংড়ি ভেবে আলোয় আসা পোকা তরকারিতে পড়ে যাওয়ায় সেই পোকা হজমের গল্প! শুরুতেই স্টেশনে এক মরা লাশের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে রাত পার করে যে গল্পের শুরু সেটা যে বেশ রোমাঞ্চকর হবে তা বোঝাই যায়। নানান প্রতিকূল অবস্থা লেখক পার করেছেন বেশ সাহসিকতার সহিতই। মনের জোর, অ্যাডভেঞ্চার এর বাসনা এবং বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছে আসলে মানুষকে দিয়ে সবই করিয়ে নিতে পারে। মৃত্যু আসন্ন রোগীকে দেখতে গিয়ে তার শেষ সময় আঁচ করে কফিন অর্ডার দিয়ে সেই কফিনে নিজেরই লাশ কবরের অদ্ভুত ঘটনাও আছে বইটাতে। হাসি-কান্না-রসিকতা, কোলদের অদ্ভুত জীবনযাপন, জঙ্গলের ভয়াবহ নিস্তব্ধতা এবং একই সাথে অপার্থিব সৌন্দর্য সবই উঠে এসেছে ১৫০ পৃষ্ঠার এই বইটিতে৷। বেশ ভালো লাগল পড়ে, একটু ঘুরে এলাম যেন অরণ্য থেকে, লেখকের সাথে একটু সময়ের জন্য অরণ্যবাসী হয়ে।
কেনিয়ার নাইরোবিতে জন্ম নেয়া এক উনিশ-কুড়ি বছরের কিশোর, বাবাকে হারিয়ে যে কলকাতায় এসেছে চাকরির খোঁজে। অনেক খুঁজেপেতে বার্ড নামের মাইনিং কোম্পানিতে একটা ছোট চাকরি জুটায় সে, কিন্তু কাজের খাতিরে তাকে ছুটতে হয় উড়িষ্যার গভীর অরণ্যে, উলিবুরু পাহাড়ে। যে জঙ্গলের অধিবাসী কষ্টসহিষ্ণু সাঁওতাল কোল রা। ম্যালেরিয়া, কালোজ্বর সাথে হরেকরকম বিষাক্ত সাপ, পোকা, হিংস্র বাঘ, ভাল্লুক আর হাতির আনাগোনা। হাতেগোনা যে দুচারজন সভ্য লোক আছে তারাও কেমন যেন রহস্যময় - সব মিলিয়ে একদম বিরুদ্ধ পরিবেশ।
সেই কিশোরটি কিন্তু এই পরিবেশেই ঠিক টিকে গিয়েছিলো। চিংড়ি মনে করে রান্না করা পোকা খাওয়া, গভীর আঁধারে সামনে ভাল্লুক পিছনে বাঘের মোলাকাত করা, ম্যালেরিয়া-বেরিবেরির সাথে প্রাণপণ যুদ্ধ করা - এতসব প্রতিকূলতার পরও সবকিছু সামলে কাজকর্ম গুছিয়ে অল্পসময়েই সে বনকে আপন করে নেয়। সেই কিশোরটির নাম শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষ। কর্মগুণে পরবর্তীতে উড়িষ্যা মাইনিং করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়ে অবসর নেন তিনি।
লেখকের জঙ্গল ও পরবর্তীতে কর্মক্ষেত্র সংক্রান্ত অন্যান্য কিছু টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা মিলিয়ে বইটি লেখা। অভিজ্ঞতা গুলো কিন্তু ইউনিক, সচরাচর চোখে পড়েনা।
কাজে যোগদানের আগের রাত লেখক খোলা স্টেশনে লাশের গায়ে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলেন। প্রথম কর্মদিবসেই জ্বরে প্রাণ দেয়া এক হতভাগার লাশ দাহ করেছেন। নিজ হাতে সৎকার করা মৃত মহিলার প্রেত দেখেছেন। আদিবাসীদের উইপোকা শিকার, ফক্স ব্যাট খাওয়া দেখেছেন। গর্ভবতী শম্বরকে গুলি করে মারার অপরাধবোধে শিকার করাই ছেড়ে দিয়েছেন - এরকম অনেক অভিজ্ঞতার বর্ণনা আছে বইটিতে।
লেখক অকপটে নিজের বিভিন্ন দুষ্টুমি, চপলতার কথাও এনেছেন যেমন - মৃত মানুষের কাটা পা গাছে ঝুলিয়ে রেখে ডাক্তারকে ভয় দেখানো, কোলদের সামনে বাঘের ডাক ডাকতে গিয়ে আরেকটু হলে প্রাণ হারানো, তুমুল বৃষ্টির মাঝে জ্বর গায়ে রেলের বাইরে বসে থাকা, টাপলুকে ভূতের ভয় দেখানো, স্ত্রীকে ঠান্ডা করতে ভাল্লুকের আক্রমণের মিথ্যা গল্প ফাঁদা, রাতের বেলা মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের হাতে মরতে বসা ইত্যাদি। শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষ যে কৌতুকপ্রিয় হাসিখুশি লোক ছিলেন এ ঘটনাগুলো তার সাক্ষ্য দেয়।
বইটির আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এতে বর্ণিত চরিত্রগুলো। কাজের সুবাদে হরেক কিসিমের লোকের সাথেই ওঠাবসা করতে হয়েছে শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষকে।
যার মাঝে ছিলেন রহস্যময় শ্বেতাঙ্গ ম্যানেজার এ্যালেন। রাত গভীর হলে যিনি মনের সুখে বেহালা বাজাতেন। কখনো রেগে ফেটে পড়তেন, কখনো বরফের মত ঠান্ডা।
এক তান্ত্রিক স্টোরকিপার। ক্যাম্পের সকল লোকের চক্ষুশূল হলেও লেখক যার শক্তির প্রমাণ পেয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
উড়িষ্যার জিম করবেট টালাক সাহেব। মাত্র আধঘন্টার বিরতি চেয়ে মানুষখেকো বাঘ মেরে যিনি আবার আড্ডায় যোগ দেন।
ক্ষ্যাপা রুশ নিকোলাস বুনিন। চিত্রবিচিত্র কাজ কারবার করতে করতে শেষমেশ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে শহীদ হন যিনি।
এছাড়া উৎসাহী কেমিস্ট সুখময় চ্যাটার্জি, মদ্যপ ওভারসিয়ার গোমেজ, সবজান্তা জ্ঞানী আবু ইউসুফ, কড়া মেজর মার, গুণবতী স্ত্রীর গর্বিত স্বামী ফ্রিগেড- এই চরিত্রগুলোও ছিলো ইন্টারেস্টিং।
এছাড়া পুরো বই জুড়ে ছিলেন দুজন - তরুণ মার্জিত টাইপরাইটার বোস ও দরাজ মনের নারী গবেষক বক্সী। বারবার লেখক এনেছেন এই দুই চরিত্রকে।
তৎকালীন ব্রিটিশদের ভারতীয়দের প্রতি হীন আচরণ ও ভারতীয় চাকুরিজীবীদের পদলেহনের কিছু প্রমাণ আছে বইটাতে। লেখক ব্রিটিশ কলোনীতে জন্ম নেয়ায় তাঁকে আদত ভারতীয়দের থেকে আ��াদাভাবে বিবেচনা করা হত হেড অফিসে। এমনকি পদে গুণে বয়সে বড় ভারতীয়রাও মাথা নিচু করতো। ইংরেজরা অল্পশিক্ষিত অনভিজ্ঞ হলেও রক্তের গুণে ভালো পদ পেয়ে যেত। অফিসে ইংরেজি ছাড়া বাংলা চলতোনা। লেখকের পরিচিত একজন তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন - "উন্নতি করতে চাও তো দেশি লোকেদের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক ছাড়া কথাই কইবেনা - কাজের কথাও বলবে ইংরেজিতে।"
বইটির নাম জঙ্গলে জঙ্গলে হলেও জঙ্গলের পাশাপাশি কর্পোরেট জীবনের কথাও এসেছে প্রচুর। শেষদিকে এসে কিছুটা জটিল আর রসহীন লেগেছে। শুরুটা যেভাবে হয়েছিলো - সবুজ বন, বাঘ হাতি বাইসন শম্বর, জঙ্গলে পাওয়া রহস্যময় লোকজন, নিটোল অঙ্গের সাঁওতাল - সব মিলিয়ে এক ঘোর লাগা বিবরণ, শেষদিকে কর্পোরেট জীবনের কথাবার্তা সে তুলনায় নীরস লেগেছে। আর একটু rushed ও ছিল।
প্রমদারঞ্জন রায়ের 'বনের খবর' এর সমতুল্য বলবোনা। তবে যথেষ্ট উপভোগ্য। শেষদিকে এক শুভাকাঙ্ক্ষীর দৃষ্টিতে লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা উঠে এসেছে। শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষ যে কতটা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক ছিলেন - এ ঘটনাগুলোতে তা পরিষ্কার হয়।
'জঙ্গলে জঙ্গলে'। প্রকাশক লালমাটি। পৃষ্ঠাসংখ্যা ১৫২। তবে প্রথম ৭০-৭৫ পেজের অভিজ্ঞতা বেশি ইন্টারেস্টিং। পার্সোনাল রেটিং ৩/৫।
ব্রিটিশ ভারতে দুর্গম অঞ্চলে খনির কাজ কিভাবে হতো, বনজঙ্গলে কিভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতো লোকজন সে নিয়েই স্ম্বতিকথা। বর্ণনা চমৎকার, কিন্তু বেশ এলোমেলো, মনে হয় ডায়েরি থেকে সরাসরি নেয়া। তবে সময়টাকে বুঝতে চাইলে এটা মাস্ট-রিড।