বনলতা সেন: সময়ের অন্তরালে একটি চিরন্তন পদধ্বনি:
জীবনানন্দ দাশ—একটি নাম নয়, যেন বাংলা কবিতার এক বেদনাবিধুর, সুরভিত, অথচ অস্পষ্ট ধোঁয়াশায় মোড়া অস্তিত্ব। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ বনলতা সেন (১৯৪৯), শুধু একটি কাব্যসংকলন নয়—এ যেন এক নির্জন আর্কাইভ, যেখানে সময়, মৃত্যু, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতার অভিধান রচিত হয় প্রতিটি কবিতায়। এ গ্রন্থের ৩১টি কবিতার প্রতিটি যেন একটি করে চিত্রকল্প—জীবনানন্দের অভাবনীয় সংবেদনশীলতায় আঁকা।
“From the seas of Ceylon to the straits of Malaya…”
কবিতার শুরুতেই আমরা পাই এক ক্লান্ত অভিযাত্রীর আত্মপ্রতিকৃতি। ‘বনলতা সেন’ কবিতার উদ্বোধনী পঙক্তিতেই (“For aeons have I roamed the roads of the earth”) ফুটে ওঠে সেই অনন্ত পথচলা, যে পথ সময়ের সীমা ছাড়িয়ে চলে গেছে ইতিহাসের কুয়াশায়—“Through the mists of Bimbisara, Asoka, and darker Vidarbha।” এই পথচলা বাস্তবিক নয়, বরং স্মৃতির ভিতরে ডুবে থাকা এক মহাজাগতিক ক্লান্তি, যেখানে একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠেন বনলতা
—“My only peace I knew with Banalata Sen of Natore।”
এই একটি লাইনেই কবির অস্তিত্ববোধ, তার অন্বেষণ, এবং এক নারীর প্রতিমূর্তিতে স্থিতি খোঁজার আকুতি যেন ধরা পড়ে। এই বনলতা সেন, রক্ত-মাংসের নারী নন, তিনি এক প্রতীক—সময়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এক শাশ্বত শান্তি।
“Her face the sculpture of Sravasti…”
জীবনানন্দের ভাষা স্বপ্নময়, অদ্ভুত নস্টালজিক। তাঁর কবিতা গঠন করে এমন সব চিত্র, যার মধ্যে প্রকৃতি, ইতিহাস ও শরীরী অনুভূতি মিলে তৈরি হয় এক ভিন্ন জগত। বনলতা সেনের মুখ “the sculpture of Sravasti”—এই উপমার মধ্যে একদিকে ইতিহাসের স্নিগ্ধতা, অন্যদিকে নারীত্বের শান্ত মাধুর্য মিলেমিশে যায়।
সাহিত্যে এমন প্রতিমারূপ আগে কেউ নির্মাণ করেছে কি? বোধহয় না। জীবনানন্দ সময়ের নির্জনতায়, শব্দের নিস্তব্ধতায় এই বনলতাকে নির্মাণ করেন, যে কিনা জীবনানন্দের কবিতার আর্কিটাইপ—নির্জনতার প্রেরণা, অস্তিত্বের সান্ত্বনা, সময়ের প্রান্তে বসে থাকা এক নারী, যিনি শুধু বলেন, “Where were you so long?”
এক প্রত্নতত্ত্বিক মৃত্যু, এক কাব্যিক পুনর্জন্ম
১৯৫৪ সালের অক্টোবরে রাসবিহারীর ট্রামলাইন–এ জীবনানন্দের মৃত্যু শুধু কলকাতার নয়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও একটি রহস্যময় মোড়। কেউ বলেন, দুর্ঘটনা। কেউ বলেন, আত্মহত্যা। কারণ কবির কবিতার ভিতরে ছিল এক অনমনীয় মৃত্যুবোধ—“A rush of desire for death” (One Day Eight Years Ago)।
কিন্তু এই মৃত্যুপিপাসা কখনও সরল নয়, বরং দার্শনিক, বিষণ্ন, কখনও কখনও তিক্ত। ‘The sleep of the plague rat’ কিংবা ‘cocky smile of hollow cunning’—এসব শব্দবন্ধে যেমন একধরনের নিঃসঙ্গ ক্ষোভ আছে, তেমনি আছে মৃত্যুকে আলতোভাবে ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টাও।
বাংলার প্রকৃতি, তার ঘ্রাণ, আর শরীরী ভাষা
জীবনানন্দের কাব্যভাষা বাংলা সাহিত্যে অনন্য। তিনি রবীন্দ্র-উত্তর যুগে দাঁড়িয়ে এমন এক কাব্যদর্শন নির্মাণ করেন, যেখানে শরীরীতা, প্রকৃতির ছোঁয়া ও নিঃসঙ্গ আত্মা একসঙ্গে কথা বলে।
“Sunlight and the sparrow play in the lattice of the Hisal’s branches”—এই পঙক্তিতে যেমন শিশির মাখা সকালের নরম আলো, তেমনি আছে এক প্রগাঢ় চিত্রকরসুলভ স্পর্শ। এই কবির কবিতায় গন্ধ, রঙ, স্পর্শ—সব একসঙ্গে উপস্থিত। একদিকে “The musty smell of rice”, আরেকদিকে “the fragrance of sleep”—এ যেন এক ইন্দ্রিয়সংবেদনের মেলা।
এমন চিত্রকল্প কি কেবল বাংলায়? না। বরং এ যেন Keats-এর “Ode to Autumn”-এর মতোন স্বাদ, Lorca-র মতোন বিষণ্নতা, আর Baudelaire-এর মতন নাগরিক বিষ। অথচ জীবনানন্দ একান্তই বাঙালি, তাঁর নদী পদ্মা, তাঁর পথ-ঘাট বরিশাল, তাঁর ট্র্যাজেডি দক্ষিণ কলকাতার সন্ধ্যার ভিতরেই আটকে আছে।
“A parched, yellow light lingers in the sky…”
‘Saptak’ (Epitaph)-এ আমরা পাই মৃত্যুর পরে ধরা এক ক্লান্ত দৃশ্য। এখানে কোনও দার্শনিক বিষাদ নেই—আছে এক প্রায়-নৈর্ব্যক্তিক টোন। “Like an invisible cat / On whose face sits a cocky smile”—এটা যেন আলোর অভাব নয়, বরং সেই অপার্থিব আলো যা মৃত্যু পরবর্তী অনিশ্চয়তা বোঝাতে চায়।
এই কবিতাগুলোর ব্যঞ্জনা সাধারণ নয়—তাতে রয়েছে গূঢ় ইঙ্গিত, অলীক স্বপ্ন ও জীবনের প্রায়-নাট্যরূপ।
“The world is led by the counsel / Of the loveless, pitiless ghosts…”
Banalata Sen কাব্যগ্রন্থে কিছু রাজনৈতিক ছায়াও স্পষ্ট। ‘A Strange Darkness’ কবিতায় আমরা দেখি, কবির সমাজবীক্ষণও গভীর। “The clearest vision belongs to the blind”—এই লাইন আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক। যে সময় ‘আলোকের বাংলাদেশ’ গড়ার কথা বলছে সবাই, সেই সময় জীবনানন্দ বলেন—আলো যারা দেখে, তারা তো চোখবদ্ধ হায়না আর শকুনের আহারে পরিণত হয়।
“The green wind blowing in her face…”
এইসব কবিতায় প্রকৃতি কখনও শান্ত, কখনও চঞ্চল, কখনও রহস্যময়। কবির শব্দচয়ন এতই ব্যক্তিগত যে, তা অনুবাদে প্রায় হারিয়ে যায়। যদিও Chidananda Dasgupta-এর অনুবাদ অনেকাংশেই সফল, তবু সেই স্বাভাবিক ছন্দ, সেই নিস্তব্ধ আবেগ—তা তো কেবল মাতৃভাষায়ই ধরা পড়ে।
বনলতা সেন: শেষ নাকি শুরু?
এখন প্রশ্ন উঠে—বনলতা সেন কি কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ? নাকি এটি জীবনানন্দের কবি-জীবনের এক পর্বান্তর? বলা যায়, এটি এক ধরণের ‘bridge’—যেখানে মধ্যবিত্ত বাঙালি কবিতার বিমূর্ত সৌন্দর্যে পৌঁছে যায়। এই বই আমাদের শেখায়—আধুনিকতা মানে কেবল পাশ্চাত্য অনুকরণ নয়, বরং বাংলা ভাষার ভিতরে থেকেই নিজস্ব ভঙ্গিমায় পথ নির্মাণ।
বনলতা সেন তাই বাংলা কবিতার এক ধ্রুব তারা, যার আলো আজও কমে না। এই বইয়ের পাঠ এক ধরণের ধ্যান—একটি ধীরচেতা নদীর মতোন, যেখানে পাঠক নিজের আত্মার প্রতিবিম্ব দেখতে পায়।
শেষ কথা:
জীবনানন্দের বনলতা সেন এমন এক গ্রন্থ যা কেবল পড়ে ফেলা যায় না—তা অনুভব করতে হয়, বুকে ধরে রাখতে হয়। এর প্রতিটি শব্দে সময় গলে পড়ে, প্রতিটি চিত্রকল্পে লুকিয়ে থাকে এক ক্লান্ত কবির স্বপ্ন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, ক্লান্ত শরীর নিয়ে, এই কবি খুঁজেছেন শান্তি। আর আমরা, পাঠকেরা, বারবার ফিরে যাই সেই নারীটির কাছে, যিনি শুধুই বলেন
—“Where were you so long?”
এ যেন এক কবিতার নাম নয়, এক আশ্রয়—বনলতা সেন।
অলমতি বিস্তরেণ।