"ভালো হয়ে যাও মাসুদ, ভালো হয়ে যাও।"
আমাদের পরিচিত সেই মাসুদ জীবনেও ভালো হয়েছিলো কি হয়নি তা আমরা জানিনা, তবে রূপনগরের "ঘোড়ামাসুদ" কোনোদিন ভালো হয়েছিলো কি হয়নি, তা বইটি পড়লেই আপনি জানতে পারবেন।
সিরিয়াস আলোচনায় যাবার আগেই বলি,বইটি আমার পড়া অন্যতম সেরা একটি পলিটিকাল স্যাটায়ার।যেখানে ঘোড়ামাসুদ,তার মা লাইলি, তার আপন বাপ মাজেদ প্রিন্সিপাল এবং ইটা মোখলেসকে ঘিরে রূপনগরের চায়ের দোকানের, চা-বিস্কুটের সাথের বিশাল কেচ্ছাই হলো মূল উপন্যাসের বিষয়বস্তু।উপন্যাসটিতে আপনি আমাদের ঘোড়ামাসুদের নানাবিধ ঐতিহাসিক কর্মগুলোর বিবরণ পাবেন এবং দারুণ মজা পাবেন পড়তে পড়তে।মনে হবে কোনো এক খুংখার(আমার ছাত্রের থেকে এই শব্দ শিখেছিলাম) বড় ভাইয়ের নানাবিধ বীরত্ব গাঁথা শুনছেন লোকমুখে।
এবারে সিরিয়াস কথায় আসা যাক। বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক দলগুলোর পালাক্রম আপনি মোটামুটি মুখস্ত বলে দিতে পারবেন। কেননা ১৯৭১ থেকে ২০২৫ খুবই ক্ষুদ্র একটা সময়। ক্ষুদ্র বলার কারণ বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর রাজনৈতিক ইতিহাস আরো বিশদ সময়কালকে ঘিরে আবর্তিত হয়৷বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ছোট সময়কালে বহু অদলবদল কিন্তু আমরা দেখেছি।সেখানে কিছু কমন ক্যারেক্টারও আমরা সবাই দেখেছি।কমন ক্যারেক্টারের একজনই হলো উপন্যাসের নায়ক, তার বাপের ভাষ্যমতে ভিলেন,"মাসুদ"। বইটি এইজন্যই অনেক বেশি রিলেটেবল এবং আকর্ষণীয়।
ক্ষমতা নিয়েই যেহেতু বলছি, তখন আরেকটি বিষয়ে একটু আলোচনা করি।ক্ষমতা কি জিনিস সেটা নিয়ে সচরাচর অতো বেশি আমাদের ভাবা হয় না।তবে সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের সহকারী সচিবের একটা লেখা পরছিলাম। সেখান থেকে জানলাম ক্ষমতা মূলত অন্যকে দিয়ে আপনি যা চাইছেন তা করিয়ে নেয়া। কূটনীতির ভাষায় এই কাজ করা যায়, "স্টিক" বা "লাঠি" দিয়ে অথবা "ক্যারট" বা "গাজর" দিয়ে। অর্থাৎ আপনি বল প্রয়োগের মাধ্যমে বা টাকা পয়সার জোরে ক্ষমতায় বসে থাকতে পারেন। একে বলা হয় হার্ড পাওয়ার। আরেকটা হচ্ছে সফট পাওয়ার, সেটা প্রতিষ্টা করা যায় "মধু" দিয়ে বা "মিষ্টি কথা" দিয়ে।এই জায়গাটায় এবার বাংলাদেশের দিকে আসি। এখানে হার্ড পাওয়ারের সেই স্টিক হচ্ছে এলাকার বড় ভাইয়েরা। এদেরকে আবার "ক্যারট" আর "মধু" দুটোর মাধ্যমে চালায় ক্ষমতাধর লোকজন। ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন তো তাহলে? দিনশেষে ভাইয়েরা ক্ষমতাসীন নয় বরং একটা টুল।আমাদের গল্পের ঘোড়ামাসুদ তেমনই এক টুল! যার সকল কর্মই ঘটে দিনের চকচকে আলোতে। মানুষজন সেগুলো নিয়ে গল্প করতে বসলে তার ঘোড়ামাসুদ হয়ে ওঠা থেকে জট পাকিয়ে কোন দিক থেকে কোনদিকের আলোচনায় যায় তার কোনো হদিশ থাকে না।
১।বইটির মূল মজাই এখানে, এতো সুন্দর একটা ক্রমে লেখক এই জগাখিচুরি আলাপ সেরেছেন যে এক বারের জন্যও মনে হবে না আপনি বিচ্ছিন্ন ঘটনা পড়ছেন। একদম আমাদের মা-খালাদের আড্ডার আসরে বসলে যেই মজাটা পান, বইটি ঠিক তেমন৷
আরো ডিটেইলসে যাই। রূপ নগরের মানুষ মোটাদাগে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগণকে রূপক আকারে ফুটিয়ে তোলে। প্রান্তিক বলে অবশ্য ভুল করলাম, আমরা সকলেই একদিক থেকে রূপনগরের মানুষই। এখানে দিনে দুপুরে ঘোড়া মাসুদের ঘটানো একটা 'তিল' মুখে মুখে হয়ে যায় 'তাল'।
আর তাই নিয়ে আলাপ চলতে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা, "পলিটিকস" এর এই আলোচনা করতে করতে আমরা এড়িয়ে যাই , মাছ কেনো হয়ে গেলো অধুনা বড়লোকের খাদ্য?রহিম বিহারী কেনো মরণকালে মাছ পেলো না? রেপ কেইসটা কেনো আর কোনো ভাত পেলো না?
অবশ্য এসব আলাপের চেয়ে "ঘোড়ামাসুদ আসিচ্ছে" বলে বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোই বরং সমীচিন। কেনোনা আমাদের মাসুদের বাবাও স্বীকার করে, তার ছেলে হচ্ছে সিনেমার "রাফ্যানটাফ" ভিলেন। পাড়ার না হতে পারা মাস্তানরা তাই বলে ওঠে
"আমাদের প্রব্লেমটা ছিলো বাপ-মায়ের সাপোর্ট আমরা পাইনি, এখন ঘোড়ামাসুদ যেটা পাচ্ছে।"
প্রত্যেকবার ক্ষমতার হাত বদলের পর রূপনগরের জব্বার মিয়া কেনো বলে ওঠে "সবুর করেন", "সবুর করেন" সেটা আবার আপনাকে নিজ দায়িত্বে বুঝে নিতে হবে।তাই সবুর না করে, বইটি পড়ে ফেলুন।
বেশি গভীরে "পলিটিকস" নিয়ে আলোচনা না করে আমি বরং আমার কাজটা করি, উপন্যাসের কাঠামোকে এবারে একটু ভাঙার চেষ্টা করি।
বর্ণার ভঙ্গিতে এতোদিন উত্তম পুরুষ কিংবা তৃতীয় পুরুষের বর্ণনায় অনেক লেখা পড়েছি৷ তবে এখানে, সেই জায়গায় টুইস্ট টা হচ্ছে,লেখক অভিনব উপায়ে কোনো ধরণের জবানি এমনকি সরাসরি কথোপকথন না দেখিয়ে, লোকমুখে শোনা গল্প পুরোটা সময় আওড়ে যায়।এমন ধারায় আর কোনো লেখা বাংলা উপন্যাসে আছে কিনা আমার অন্তত জানা নেই।কাজেই এই জায়গায় বইটি অভিনব এবং অবশ্যপাঠ্য!
তার উপর, একটা জিনিস কম বেশি আমরা সবাই স্বীকার করি যে,ট্র্যাজেডির চাইতে কমেডি লেখা কঠিন! সেখানে যদি ব্যাপারটা হয় পিউর কমিডি যার পাতায় পাতায় আপনি "হো হো" করে হেসে উঠতে বাধ্য হবেন, আবার অনেক সময় "মুচকি মুচকি" হেসে ওঠার মতো স্যাটায়ারিকাল টার্ম গুলোও পাবেন তাহলে তো কথাই নেই! বিশ্বাস করেন এটাই সেই পিউর কমিডি!লেখকের শব্দচয়ন মারাত্মক।স্যাটারিকাল লেখায় এই শব্দের খেলাই আসল, এই জায়গায়ও বইটি একশ তে একশ।আর জগাখিচুরি আলাপেও যে একটা গল্প বলার সিকুয়েন্স লেখক বজায় রেখেছেন, সেটার আসলে আমি প্রশংসা করার ভাষা পাচ্ছি না। আরেকটি ভালোলাগার বিষয় হচ্ছে, "কোথাও কেউ নেই" উপন্যাসের বাকের ভাইয়ের মতো কিংবা হিন্দি সিনেমা "মুন্না ভাই এম বি বি এস" এর মুন্নার মতো, এই "ঘোড়ামাসুদ"-কে নায়কে পরিণত করা হয়নি।বেচারাকে আমাদের লেখকও একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করে, বাংলাদেশের রাজনীতি এবং তার সাথে জনগণের সম্পর্ক কষে একটা চড় মারার মতো আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। এর বেশি কিছু আর বলার নেই। আপাতত নিউজপেপারে "ঘোড়ামজিদই","ঘোড়ামাসুদ" কিনা
তাই নিয়ে সংশয়ে থাকি গিয়ে কারণ,
মাসুদকে দেখলে জিজ্ঞেস করতে হবে,
"তুমি কি কোনোদিনও ভালো হবে না?"