Jump to ratings and reviews
Rate this book

বেড়ালতমা

Rate this book
বেড়ালতমা হাসান মাহবুবের তৃতীয় উপন্যাস।

164 pages, Paperback

First published March 20, 2021

3 people are currently reading
90 people want to read

About the author

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
9 (26%)
4 stars
14 (41%)
3 stars
5 (14%)
2 stars
5 (14%)
1 star
1 (2%)
Displaying 1 - 14 of 14 reviews
Profile Image for তানজীম রহমান.
Author 34 books762 followers
March 24, 2022
সাররিয়েল বা পরাবাস্তব আসলে কী?*

পরাবাস্তববাদীদের স্বঘোষিত নেতা আঁদ্রে বেতঁ-এর একটা চমৎকার ছয় পৃষ্ঠার লেখা আছে এই বিষয়ে, নাম 'দ্য সাররিয়েলিস্ট ম্যানিফেস্টো’। সময় থাকলে পড়ে দেখার অনুরোধ রইল। সেই লেখায় পরাবাস্তবতার বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় আলোচনা করেন। সাররিয়েল মানে সেটা, যেটা যুক্তির সহজ আর শক্ত সীমানা মানতে চায় না। সাররিয়েল মানে সেটা, যেটা জাগ্রত পৃথিবীর চেয়ে স্বপ্নের বিশ্বকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সাররিয়েল মানে সেটা, যেটা শৈশবে আমাদের যে কল্পনাশক্তি ছিল তাকে আবার জাগিয়ে তোলার দাবি জানায়।

তবে আমার জন্য পরাবাস্তবতার আরেকটা সহজ সংজ্ঞা আছে। ধরুন যে লেখা, বা ছবি, বা শব্দগুলো সচেতন মস্তিষ্কের জন্য অর্থহীন, কিন্তু অবচেতন মনে নিজের জন্য একটা অর্থ দাঁড় করাতে পারে, সেটা হচ্ছে সাররিয়েল।

উদাহরণ হিসেবে দালির বিখ্যাত পেইন্টিং ‘দ্য পারসিস্টেন্স অফ মেমোরি’-এর কথা বলি। যদিও দালি আমার খুব প্রিয় সাররিয়েলিস্ট নন (সেই তালিকার প্রথমে থাকবেন মাগরিট আর ট্যানিং), কিন্তু ছবিটা পরিচিত হওয়ায় আলোচনায় সুবিধা হবে। ছবিতে দেখা যায় অনেকগুলো ঘড়ি গলে যাচ্ছে এক ঊষর প্রান্তরে। শিল্পীর এক বিমূর্ত প্রতিকৃতি আছে ছবির মাঝখানে, সেটার পিঠে লাগামের মতো ঘড়ি চড়ানো। একটা ঘড়িকে খুবলে খাচ্ছে একদল পিঁপড়া।

সচেতন, যৌক্তিক চোখে এই ছবির কোনো মানে নেই। আধুনিক পেইন্টিং-এর ব্যাপারে মানুষ যেসব বদনাম করে, সেগুলো সবই এটার ব্যাপারে করা যায়। আগামাথা নাই, আলগা ভাব, ইচ্ছে করে কঠিন বানানো, রূপকথার সেই রাজার অদৃশ্য পোশাকের মতো একটা পেইন্টিং।

তবে অবচেতনেও কি ছবিটার কোনো অর্থ নেই? সময় আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু ভাবতে গেলে সবার আগে মাথায় কী আসে? ঘড়ি। দ্বিতীয় কী আসে? নদী। সময় হচ্ছে বহমান, তরল জিনিস। এই দুই মিলিয়ে তরল, গলন্ত ঘড়ি। মানুষের কাছে সময়ের আরেকটা নাম কী? স্মৃতি। সময়ের সাথে সাথে স্মৃতি ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়। যেন একদল পিঁপড়া কুরে খায় স্মৃতিগুলোকে। সময় আমাদের জন্য একধরনের শেকল, বা লাগাম—যে লাগাম থেকে জীবনের মুক্তি নেই। তাই ছবিতে শিল্পীর প্রতিকৃতির পিঠে লাগাম চড়ানো।

এসব কি ছবিটার একমাত্র সংজ্ঞা? অবশ্যই না। কিন্তু আমার অবচেতনে দালির এই কাজের সংজ্ঞা হচ্ছে এমন। প্রত্যেকের অবচেতন মন আলাদা, তাই সংজ্ঞাও আলাদা হবে, শত সহস্র সংজ্ঞা আসবে।

সাররিয়েলিজম নিয়ে এত প্যাঁচালের কারণ হলো: বাংলা ভাষায় আমার পড়া সেরা সাররিয়েল উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে বেড়ালতমা। এই বইটাও স্বপ্নযুক্তিতে চলে, লাফিয়ে লাফিয়ে শিশুর কল্পনার মতো অসম্ভব সব ঘটনায় চলে যায়, আর আপাতদৃষ্টিতে কোনো অর্থের ধার ধারে না। কিন্তু অবচেতনে এই বই গভীর, জটিল, অর্থপূর্ণ আর মজার উপন্যাস হিসেবে দাগ কাটে।

যা ভালো লেগেছে:

যারা শহরবাসী সাহিত্যিক, তাদের মধ্যে একটা প্রবণতা খুব দেখা যায়। সাধারণত তারা শহরকে ভাবে বিষাক্ত, দূষিত, প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের একটা অস্ত্র। আর মানুষকে ভাবে প্রকৃতির বাইরের প্রাণী। শুধু গাছ আর মাছ, পাখি আর পোকা হচ্ছে প্রকৃতির অংশ। কিন্তু আসলে মানুষের তৈরি একটা বিল্ডিং আর উইপোকার তৈরি ঢিবির মধ্যে পার্থক্য কোথায়? দুটোই প্রকৃতি থেকে নেওয়া কাঁচামাল দিয়ে তৈরি করা হয়, দুটোই প্রাকৃতিক প্রাণীকে প্রকৃতির দংশন থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য তৈরি করা হয়, দুটোই আশেপাশের প্রাণীর জীবনব্যবস্থা আর প্রকৃতির ওপর প্রভাব ফেলে।

বেড়ালতমায় এরকম তুলনা বারবার আসে। কোথায় প্রকৃতি শেষ, আর সভ্যতা শুরু? কোন সীমান্তে যুদ্ধ হয় মানুষ আর প্রকৃতির? আসলে কি পক্ষ দুটো, না একটা?

এভাবেই পরিচিত প্রতীকগুলোকে বারবার পালটে দেন লেখক হাসান মাহবুব। তীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণের তীরে বিদ্ধ করেন আমরা যেগুলোকে ভালো ভাবি, আর যা খারাপ ভাবি, সেই চিহ্নগুলোকে। বেড়ালতমায় সাপ আর বিষ হয়ে ওঠে ভালোবাসা এবং স্নেহের প্রতীক, গোলাপ হয়ে ওঠে দূষণ আর দুর্নীতি। সত্যের ধারক পত্রিকার প্রকাশক হয়ে ওঠেন চূড়ান্ত চক্রান্তকারী, নরক হয় পৃথিবীর চেয়ে আরামদায়ক।

বেড়ালতমার নিজস্ব একটা পৃথিবী আছে, যেটা আমাদের পৃথিবীর স্বপ্নরূপ (বা দুঃস্বপ্নরূপ)। না, পৃথিবী বললে আসলে ভুল হবে, বেড়ালতমার আছে নিজস্ব একটা বাংলাদেশ। এখানের শহর, মফস্বল আর নিসর্গ, এখানের ভালোবাসা আর সংস্কৃতি, এখানের ইহকাল আর পরকাল। তবে এই বাস্তবতাগুলোকে দেখানো হয়েছে দালির ঘড়ির মতো বাঁকা, গলন্ত আয়নায় প্রতিফলিত স্বপ্নের মতো করে।

এসব অসম্ভব ঘটনা আর জটিল সত্যগুলোকে গিলতে সাহায্য করে হাসান মাহবুবের চমৎকার লেখনী। যা একইসাথে সহজ এবং কাব্যিক। যেখানে জোর করে উপমার ব্যবহার নেই, কিন্তু যেখানে ব্যবহৃত হয় সেখানে পরিষ্কার ছবি ফুটিয়ে তোলে। যে লেখায় আছে মমতা, বিভ্রান্তি, রাগ আর সততা। তবে সবার আগে এই লেখায় আছে সারেন্ডার, যেন যিনি লিখছেন তিনি নিজের পুরোটা তুলে ধরেছেন। যে ধরনের লেখাকে নিচাহ্ বলেছিলেন ‘রক্ত দিয়ে লেখা’। যে লেখার সাথে সাদেগ হেদায়াতের লেখার মিল পাই। যেন উপন্যাস নয়, জীবন্ত মিথ।

যা ভালো লাগেনি:

শেষের অংশে মনে হয়েছে লেখক খানিকটা আগ্রহ হারিয়েছেন। কিছু প্যারাগ্রাফ স্পষ্ট নীতিজ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করে, যেটা বইয়ের বাকিটার সাথে যায় না। তবে ভালো লাগেনি এমন অংশ আসলে ছিল সামান্যই।

২০২২-এর তৃতীয় মাস মাত্র, কিন্তু এখনই এ বছরে পড়া প্রিয় বইগুলোর মধ্যে একটা পেয়ে গেলাম মনে হচ্ছে। লেখকের অন্য বইগুলোর সারসংক্ষেপ পড়ে মনে হচ্ছে সেগুলো ঠিক আমার টাইপের হবে না, তাও পড়ে দেখবো অবশ্যই। বেড়ালতমা আমার তরফ থেকে এতটুকু বিশ্বাস অবশ্যই অর্জন করেছে।

*আজকাল জাদুবাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন, বিশেষ করে সাহিত্যে। আমার কাছে জাদুবাস্তবতা মানে হচ্ছে একটা বাস্তব পৃথিবীতে অবাস্তবের বসবাস। আর পরাবাস্তব হচ্ছে বাস্তব পৃথিবীর উপকরণ নিয়ে অবাস্তব পৃথিবী গড়া। এই সংজ্ঞার সাথে অন্য কেউ একমত না হলে একদমই সমস্যা নাই।
Profile Image for Manzila.
167 reviews161 followers
April 2, 2022
এখন যারা লেখালেখি করছেন ভিন্নধর্মী কিছু করার বা লেখার যে প্রবণতা দেখি সেটা সবসময় ভালো লাগে এমনটা না। এক বা দুই তারা দিয়ে "it was good but not my cup of tea" এরকম বলে কেটে পড়া যায় বটে, সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় অন্য পাঠকদের প্রতি অন্যায় করা হয় (লেখকের প্রতি অন্যায় করা হয় তা বলছি না কারন উনার স্বাধীনতা মত উনি লেখবেন এটাইতো স্বাভাবিক)।

কাবেরিনগরে মানুষের পাপ থেকে বানানো কালো গোলাপের কারখানা - শাপলাপুকুরের সাপের খামার - নরকের ট্রেন- নরকবাস - মোটামুটি আউটলাইনটা এরকম। প্রথম দুই অধ্যায় তবুও ভাল লেগেছে বলা যায়, শেষের "নরকের ট্রেন" আর "নরকবাস" অধ্যায়গুলো "skim" না করে উপায় ছিল না - কারন ততক্ষণে এই বই কোনভাবেই আমার মনোযোগ ধরে রাখতে পারছিল না, আমার মনে হচ্ছিল বইটার "এরপর কী হল" তা আমি আর জানতে চাইনা। স্বীকার করছি ভুল আমারই, খুব hype শুনে ঢাকা থেকে বন্ধুকে দিয়ে বইটা আমিই আনিয়েছিলাম। পরাবাস্তবতার যে সিগনেচার স্টাইলটা থাকে মানে "dreamlike" দৃশ্যের অবতারণা -সেটা অস্বীকার করব না কিছু কিছু জায়গায় এসেছে (যেমন কারখানার সাপরূপী মালিকের সাথে কথক আর বেড়ালতমার মোলাকাত)। কিন্তু বাকি বইতে এতো কথা আর কথা যেগুলার তেমন কোন অর্থ নাই এমনকি অর্থহীন তবু পড়ত��� ভালো লাগছে এমনও না। সুরিয়েলিজমের শিল্পীদের ব্যাপারে কথা প্রচলিত আছে যে অবচেতনাকে ধরার জন্য কখনও কখনও চোখ বন্ধ করে ছবি আঁকতেন তাঁরা। তাই বলে সাদা-কালো মাধ্যমে (বই), কলম বা কিবোর্ড ধরে এই কাজটা লিটারালি (এমকি সিম্বোলিক্যালি) করলেও বিষয়টা খুব ভালো ঠেকে না আমার কাছে। খুব bizarre ছবি বা বই কোন অর্থ তৈরী করতে না পারলেও দিন শেষে মনে একটা ইম্প্যাক্ট অবশ্যই ফেলতে পারে। নাইলে আর "Art" কেন বলছি? এক্ষেত্রে "বেড়ালতমা" বেশ দূর্বল। ঠিক আছে, এবার তাহলে এভাবে আগাই - "বেড়ালতমা"কে আমি সুরিয়েল সুরিয়েল বললেও লেখকের কোন উদ্দেশ্যই ছিল না সুরিয়েল কিছু লিখবেন, উনি লিখেছেন উনার স্বাভাবিক গতিতে, উনার ইচ্ছে মত। তাহলে ধরে নিচ্ছি "বেড়ালতমা"য় কোন জনরা অনুসরণের প্রয়াস নেই, খামোখা এসব "ইজম" আমরাই আরোপ করছি। তাহলে "বেড়ালতমা" আসলে কী? উপন্যাস? গল্প? ছবি? অনুভূতির শব্দরূপ? এর উত্তর আমার জানা নেই।

এখনকার সময়ে গল্পে কাহিনী খোঁজা লোকদের টিকে থাকা মুশকিল।মেনে নিচ্ছি সব গল্পকে কোন না কোন ফর্মে পড়তে হবে এমন না। কিন্তু এই "যা খুশী তাই করি"র যুগে বিপদে পড়ে আমার মত সাধারণ পাঠক। সাপের ছুঁচো গেলার মত এধরনের বই গলায় আটকে থাকে আর মনে হয় "What am I missing that everybody is getting?" যাইহোক, খুব নিন্দা নিন্দা শোনালেও অনেস্ট মতামত দিয়েছি। সব মতামতই একান্ত ব্যক্তিগত, সবার সাথে সবার কি মিলবে?
Profile Image for হামিম কামাল.
79 reviews29 followers
March 23, 2022
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রয়া :

আজ হোক বা কাল এই উপন্যাস আমাদের জাতীয় গর্ব বলে বিবেচিত হচ্ছে, এমন একটা কল্পনা আমাকে আচ্ছন্ন করছে। আমার মনে হয়, আমাদের কাফকাটিকে আমরা খুঁজে পেয়েছি। একান্তই আমার বিশ্বাস। আরো বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে কোনোদিন কোনো গুণি নির্মাতার হাতে অস্কার বিজয়ী কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হবে এর গল্প থেকে।

To me, বেড়ালতমা is the magnum opus of Hasan Mahbub, till now. And one true masterpiece.


আলোচনা :

এমন কৌতুককর দুঃস্বপ্ন আর দেখিনি। নরকের এমন স্বর্গীয় যাপনও কমই করেছি। 

সিপাহী রেজার অতিপ্রাকৃতিক প্রচ্ছদটা বলছিল, এ বই কোনো গভীর কালোর ভেতর নিয়ে গিয়ে আমাকে গোলাপের সৌরভ দেবে। প্রচ্ছদ সত্য হয়েছে। আমি সেই সৌরভ পেয়েছি। আমাকে এক পরাবাস্তব জগতের চাদর জড়িয়ে রেখেছে। এমন সুখ সুখ নরক শুধু তখনই অনুভব করেছি, যখন ও যতবার আমি কাফকা পড়েছি। 

এবং কাফকা যেখানে থেমে গেছেন, হাসান মাহবুবের শুরুর বিন্দু ওটাই। কাফকার চরিত্রগুলো তাদের মনুষ্যত্বকে বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। এবং সমাজের কাছ থেকে তার দণ্ড গ্রহণ করেছে। বেড়ালতমার কথকও মনুষ্যত্বকে প্রত্যাখ্যান করতে চায়। হাসান মাহবুবের লেখায় প্রধান চরিত্রগুলোর ভেতর যা সহজাত। তবে এখানে  আরো খানিকটা জল গড়িয়েছে। “বেড়ালতমা” আমাকে দেখিয়েছে, মনুষ্যত্বকে প্রত্যাখ্যানের যে চেষ্টা তা মূলত মনুষ্যত্বে ফিরে আসারই পথ। যেন একটা মানুষ বাড়ি থেকে পালাচ্ছে কারণ সে বাড়িতে ফিরে আসতে চায়। উপন্যাসটা এই পথে আমার কাছে দার্শনিক।

উপন্যাসগুলো যখন এমন পরস্পরবিরোধী  বিমূর্ত বাস্তবতা নিয়ে ডিল করে, রসশূন্য শুষ্ক হয়ে ওঠার সমূহ আশঙ্কা থাকে। "বেড়ালতমা" আমাকে অবাক করেছে এর একশ চৌষট্টি পৃষ্ঠার প্রতিটি বর্ণ ও অক্ষর গল্পরসে ভিজিয়ে রেখে। 

মানুষ যে কারণে বই বন্ধ করে, সেই একই কারণে আত্মহত্যা করে। জীবন যখন একটা সুলিখিত গল্পের অনুভূতি দিতে থাকে, পরিণতি জানলেও মানুষ তার শেষ পাতা পর্যন্ত উল্টে যায়। প্রাচীন পুঁথিকাররা তো ট্রাজেডির শুরুতেই একটা অশ্রুভেজা ভূমিকা দিতেন। তবু শেষ বাক্য উচ্চারণ পর্যন্ত শ্রোতাদের কারো আসনপিঁড়ি টলত না। এর রহস্য রস।

“বেড়ালতমা” অদ্ভুত রসে ডোবা। ঐ যে বলছিলাম কৌতুককর দুঃস্বপ্ন, তার কৌতুকটুকু সাঁতার কাটছে এই অদ্ভুত রসে। এ উপন্যাস একইসাথে বীভৎস রসেরও একটা ধারা বয়ে নিয়ে গেছে কিছুদূর৷ তবে ওটা প্রধান হয়নি। 

ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার সম্পর্কগুলোর ভেতর-বাহির বেশ বিচরণ করি। মহামারী চলাকালে যে কারণে এক পর্যায়ে আমি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছিলাম। বিচরণের অভাবে। মানুষ নির্জন দ্বীপে হয়ত বাঁচতে পারবে, কিন্তু বাঁচতে চাইবে না। কারণ মূলত সে সম্পর্কবিচরী। অনেক বিচরণের পর সে ধীরে বিচরী থেকে বিচারী হয়ে ওঠে। 

এই যে বিচরণ এবং বিচার, এ তার জীবনের অনেকটা দখল করে আছে। জীবন তার অনেকটা একে দখল করে রাখতে দিয়েছে কারণ, সম্পর্ক জীবনের রক্ষাকবচ। আর যা রক্ষা করে, তার সূত্র ধরেই হত্যা সহজতর। 

“বেড়ালতমা”র যে কাবেরিনগর, সেই শহর তার নাগরিকদের জীবন যাপন দুরূহ করে রেখেছে। মৃত্যুপথযাত্রীর জন্যে যেমন শারীরবৃত্তি দুরূহ, শহরের মৃত্যুর সময়ও নাগরিকদের শহরবৃত্তি দুর্বহ হয়ে ওঠে। সেই অর্থে বলা যায় কাবেরিনগর মৃত্যুপথযাত্রী। তার প্রাণময়তা প্রকাশ করার যে অল্প ক’টা জায়গা এখনো টিকে আছে, তার একটা হলো ঝিনুক হ্রদ। সেখানে এখনো সম্পর্কবিচরী প্রেমিক-প্রেমিকাদের সমাবেশ ঘটে। বয়স্ক আর শিশুরাও সেখানে আসে। দেখা যাচ্ছে ওটা সম্পর্কের বিচরণক্ষেত্র। 

একটি বিশেষ পক্ষ ঝিনুক হ্রদের এই বিচরণক্ষেত্র নষ্ট করতে চায়। তার সূত্রধরে শহরকে ধ্বংস করতে চায়, যার সূত্র ধরে যে শহরের মানুষ ধ্বংস হবে। আর এই ধ্বংস এগিয়ে আনার জন্যে সেই পক্ষ অভিনব কৌশলের আশ্রয় নেয়। 

এই পর্যায়ে উপন্যাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের অবতারণা হয়েছে। গোলাপের খামারে বিরতিহীন তৈরি হতে থাকে কালোগোলাপ। এবং কৌশলে সেই গোলাপ নেওয়া বাধ্যতামূলক করে তোলা হয় তাদের ভেতর, যাদের মধ্যে নিবিঢ় মধুর সম্পর্ক বজায় আছে। 

যা কালো, তার সব রঙের অনুপস্থিতি। এই অনুপস্থিতি একটা কৃষ্ণগহ্বরের মতো। যেখানে যা আলো, তা সে শুষে নেয়। সম্পর্কের আলো শুষে নেওয়া এই কালোগোলাপের সৃষ্টিপ্রক্রিয়া বীভৎস। উপন্যাসের কথককে এই কালোগোলাপের খামারে কাজ করতে হয় বিধায়, আমরা এর ভেতরটা দেখতে পাই। গোলাপের উপকরণ হিসেবে তিনি মানুষের হৃদপিণ্ড কেটে বার করছিলেন। 

হাসান মাহবুব শব্দ সৃষ্টি করেন বলে এর ক্ষমতা সম্বন্ধে সাবধান। নয়ত তিনি বীভৎসতা আরো বাড়াতে পারতেন। তীব্রতার স্বার্থে আমি বীভৎসতার দৃশ্যমানতা তৈরিকারী আরো শব্দের অভাব বোধ করেছি। ওই মুহূর্তে বুঝতে পেরেছি, আমার ভেতর থেকে অন্য আমিকে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে। সেই আমি কাবেরিনগরের নৃশংস পরিবেশে বসবাসের উপযুক্ত। 

এমন আরো একটা ক্ষেত্র উল্লেখ করছি “বেড়ালতমা”র বাইরে। বার্জেসের উপন্যাস থেকে গড়া কুব্রিকের “আ ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ”। যখন ওটা দেখছিলাম, যেন চাইছিলাম সুন্দরের স্বার্থে অ্যালেক্সের বল্গাহীন অবোধ নৃশংসতায় আরো কিছু যুক্ত হোক।

কদর্যতার যে রূপ তারও পৈশাচিক সৌন্দর্যতৃষা আছে। আমাকে তার কাছে দাঁড় করিয়েছিল এরা ক্ষণিকের জন্যে হলেও। 

“বেড়ালতমা”র কথক কদর্য সুন্দরের উৎকৃষ্ট উকিলে পরিণত হচ্ছিল। আমার মতোই, সেও একটা দুঃস্বপ্ন কৌতূহল নিয়ে দেখে যাচ্ছিল।  আমাদের বিবেকি সত্ত্বা স্বপ্নের বাইরে ছটফট ছটফট! এমন স্পর্শকাতর সময়ের আশ্রয় বেড়ালতমা; উপন্যাসের নাম-প্রটাগনিস্ট। 

বেড়ালতমা ছিল সন্তানকেন্দ্রিক সাংসারিকতার স্বপ্ন দেখা মানুষ। একটা স্থির আয়ের নিশ্চয়তা, ছাদ খুঁজত। কিন্তু কথকের প্রাণসংশয়ী সবচেয়ে বড় বিপদে যে বেড়ালতমা শক্তিশেল ছুড়েছিল, সে কিন্তু আগের মানুষটা নয়। যেন তার পুনর্জন্ম হয়েছে। সুস্থ সাপের মতো যে নিজেই ছাড়াতে পেরেছে নিজের খোলস।  

আমার বিশ্বাস বেড়ালতমায় সাপ এস��ছে বিশেষ সুমেরীয় পৌরাণিক তাৎপর্য নিয়ে। আদম-হাওয়া কেন্দ্রিক পুরাণের উত্তরাধিকারী ধর্মগ্রন্থ তোরাহ, বাইবেল আর কোরান যা করেছে, তা হলো স্বর্গে সাপের মাধ্যমে শয়তানকে আনিয়ে সাপকে করেছে ব্রাত্য। “বেড়ালতমা” সে পথ বাঁকিয়ে সাপের প্রতি মমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে এনেছে।  লেখক যেন মধ্যপ্রাচ্যকে ভারতবর্ষের পথ দেখালেন। 

সুমেরীয় পৌরাণিকতা মেনে এখানে কথক (আদম) আছে, বেড়ালতমা (হাওয়া) আছে, চলে এসেছে সাপও। আর এমন সময়ে সাপ আত্মপ্রকাশ করছে যখন বেড়ালতমা “হবা” বা “হাওয়া” থেকে বিকশিত হয়ে হলেন “লিলিথ”। যিনি প্রকৃত “প্রথম নারী”। বেড়ালতমার এই বিকাশ আমাকে প্রভাবিত করেছে।

কাবেরিনগরের পর সাপের খামার অধ্যায় হলো একটু শ্বাস ফেলার মাঝবিরতি। এখানে নরকের ভেতর স্বর্গ যাপনের স্বাদ পেলাম। পরাবাস্তব ধূসর জোছনায় সাগরপাড়ে বেড়ালতমাকে নিয়ে বেড়ালাম, মদ পান করলাম। তবে ডিসটোপিয়ান ছুটি নিশ্চয়ই ফুলেল সুবাস ছড়িয়ে শেষ হবে না। হয়ওনি। 

প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দম্পতি যত বেশি শক্তি সংগ্রহ করবে, তত বেশি নরকের উপযুক্ত হয়ে উঠবে, এটা অনিবার্য। সুতরাং কথক আর বেড়ালতমার চরিত্র-বিকাশ শেষ পর্যন্ত তাদের নরকের ট্রেনে চড়াবে এটা অবধারিত ছিল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, “বেড়ালতমা”য় আমরা এক অভিনব নরক দেখতে পেলাম। আমার মনে হয়েছে চিরায়ত বর্ণনার চেয়ে যা বুদ্ধিদীপ্ত। পৃথিবী থেকে বয়ে নিয়ে যাওয়া ব্যথা সেখানে চক্রবৃদ্ধিতে বাড়ে। মানুষ তার বেদনাবোধের জ্বালানী।  

উপন্যাসের শেষে এক "আয়নার" সামনে দাঁড়ালাম। দেখি উপন্যাসের নাম “বেড়ালতমা” কেন উত্তর এখানে নিরুপদ্রব ঘুমোচ্ছে। আমি জাগাইনি তাকে। ঘুমন্ত মুখ দেখতে ভালো লাগে। 

সম্পাদনার শেষ নেই। পরের সংস্করণে, গোলাপবাগানের মধ্যস্থতাকারীর সংলাপে আরো স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারেন বোধয় লেখক।  আর গোলাপবাগানের বহুরূপী মালিকটির মন কী করে কালো হয়ে উঠল? এর পেছনে নিশ্চয়ই মন কেমন করা কোনো গল্প আছে। আমি জানতে চাই। এটা জরুরি কারণ সেই গল্পের ভেতর কাবেরিনগরের ভবিষ্যত এন্টাগনিস্টদের বধসূত্র লুকিয়ে আছে। 

“বেড়ালতমা”র জগৎ থেকে পাঠক আমি এখনো বের হইনি। হবো না। ঝিনুক হ্রদটা শেষতক বেঁচে গেছে। আগের মতো মানুষের তৈরি পরিপাট্য নেই, তবে প্রাকৃতিক বুনো সুন্দর নিয়ে ঝিলমিল করছে। 

জগৎটাতে এখনো বেশি মানুষের দেখা তেমন পাইনি। তবে কাবেরিনগর দিকে দিকে ডাক পাঠিয়েছে। আমার মতোন অনেকেই জড়ো হবে শিগগির। ওরা সাপের খামারের সাগরধারে ক্যাম্পফায়ার করবে, দিনভর প্রেম করবে আর রাতভর করবে গান। পান করবে। শহরটা নরকের খাতিরে নরক হয়ে উঠবে না অনেকদিন। 

তারপর হঠাৎ একদিন আমাদের ভেতর থেকেই কেউ ক্রমশ কালো হয়ে ‍উঠবে। আবার নতুন সংগ্রাম।  তখন অন্য কোনো বেড়ালতমা তার প্রেমাস্পদকে “প্রেরিতপুরুষ” করে পাঠাবে। তাকে অরক্ষিত রাখবে না। করুণাময় বাহুতে তাকে জড়িয়ে রেখে নিরন্তর আশ্রয় হয়ে থাকবে। 

মহাকালের আয়নায় বিম্বিত ছবিটা চোখে ভাসছে। যখন আবারও আমি ভয়ার্ত হৃদয়ে তার কাছে ছুটছি, চোখজোড়া প্রেম প্রশ্রয় নিয়ে আমার দিকেও ঝরনার মতো নেমে আসছে বেড়ালতমা।

পরাবাস্তব এ উপন্যাস ২০২১ সালের বইমেলায় প্রকাশ করেছে পেন্ডুলাম। গায়ের দাম ২৮৫ ৳। 
Profile Image for জাহিদ হোসেন.
Author 20 books479 followers
March 12, 2022
দারুণ লাগলো।
কিছু কিছু জায়গায় বইটাকে থ্রিলার হিসেবে ট্যাগানো হয়েছে দেখলাম। কারণটা যদিও বোধগম্য নয়। বেড়ালতমা তাহলে কী ধরণের বই?
বেড়ালতমা একইসাথে রুপকধর্মী, পরাবাস্তব ও মিথিক্যাল। বইয়ের কল্পিত কাবেরিনগরকে মনে হচ্ছিল ডিসটোপিয়ান কোন শহর, ভয়ংকর রাসায়নিক সংক্রমণে মারাত্নক দূষিত। ধুঁকছে। যে কোন সময় হুড়মুড়িয়ে ধ্বসে পড়বে। স্রেফ একটা টোকাই যথেষ্ট।
আর এরই মাঝে বেড়ালতমা ও তার প্রেমিকের কাহিনী এগিয়ে চলে।
বইয়ের প্রচ্ছদ আকর্ষণীয়। দৃষ্টিনন্দন। বেশ একটা মিস্টিরিয়াস ব্যাপার আছে।
চরিত্রের নাম দু'এক জায়গায় পাল্টে গেছে দেখলাম। সংলাপে সামান্য গোলমাল আছে। তবে ওগুলোকে উপেক্ষা করাই যায়।

সব মিলিয়ে উপভোগ্য একটা বই।
Profile Image for Anjuman  Layla Nawshin.
86 reviews147 followers
March 23, 2022
পরাবাস্তব জগতের এক শহর কাবেরিনগর।
সেই শহরে আছে এক গোলাপ বাগান। যেখানে কারখানায় উৎপাদন হয় কালো গোলাপ। এই কালো গোলাপের উৎপাদন প্রক্রিয়াও ভিন্ন। এই গোলাপ তৈরী হয় মানুষের পাপ থেকে। কিন্তু পাপ কোথায় পাওয়া যাবে?
এই পাপকেও তৈরী করতে হবে। আর সংগ্রহ করতে হবে মৃত মানুষের পুরে যাওয়া কালো কালো হৃদয়। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি হত্যা করে পাখির পালকে পাপ মিশিয়ে কালো হৃদয় খোদাই করে তা দিয়ে কারখানায় উৎপাদন হয় মহামূল্যবান কালো গোলাপ। আর তা উৎপাদিত হয় কোন প্রেমিকের হাত দিয়ে। বেড়ালতমার প্রেমিক তেমনই একজন।

কাবেরীনগরে প্রেম নিষিদ্ধ। এখানে প্রেমিককে বেছে নিতে হয় ভালোবাসা ধ্বংস করার কাজ। মানুষের হৃদয়কে বিষ নিলে পরিনত করার কাজ। কিন্তু কেন?

উপন্যাসটি প্রথম অংশ পড়ার সময় বেড়ালতমার প্রতি তার প্রেমিকের ব্যাকুলতা দেখে মনে হয় পড়ছি শহীদ কাদরীর তুমুল কোন প্রেমের কবিতা। আবার পরক্ষনেই মনে হচ্ছে পড়ছি পরাবাস্তব মানুষের মাংসের রেস্তোরার মত গল্প। কাবেরীনগর পাড় হয়ে যখন সাপের খামারের গল্প এগিয়ে ট্রেনে উঠে নরকে পৌঁছায়, তখন মনে হচ্ছিল কাফকা পড়ছি।

পুরো উপন্যাসে ৫ টি স্তর রয়েছে। কাবেরীনগর, সাপের খামার, নরকের ট্রেন, নরকবাস আর প্রত্যাবর্তন। প্রত্যেকটি অংশেই মানুষের অস্তিত্ব, মানুষের প্রত্যাশা, চাওয়া- পাওয়া, জীবনের অর্থ- এসব এমন প্রশ্নের জন্ম দেবে।
একসাথে অনেক কিছু, অনেক প্রশ্ন, অনেক জিজ্ঞাসা, অনেক সংসয় নিয়ে এগিয়েছে বেড়ালতমা, তার প্রেমিক আর মহাজগতের এই দুর্দান্ত গল্প।

হাসান মাহবুবের লেখা পড়ার সৌভাগ্য এর আগে আমার হয়নি। বেড়ালতমা পড়ে মনে হচ্ছে, সমকালীন সাহিত্যিকরা বাংলা সাহিত্যকে আরও অনেক উপরে নিয়ে যাবে। বাংলা সাহিত্য নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা করার কোন অবকাশ হয়তো আর থাকবে না।

বেড়ালতমা নামটা যেমন আদূরে আর লোভনীয়, বইটা পড়া শুরু করলে এর মোহ কাটানোও মুশকিল। ঝরঝরে গদ্য, দুর্দান্ত সংলাপ আর সরল বহিঃপ্রকাশ। মনে হচ্ছে এই লেখক সামনে আরও চমকে দেবেন। তবে, কিছু অংশে রিপিটেশন, আমার মতে দুই এক জায়গায় অযথা দীর্ঘায়িত না করলে আরও জমতো বেশ। আর শেষটা? আরেকটু অন্যরকম কি হতে পারতো?

তবুও সব মিলে দুর্দান্ত।
৪.৫/৫।
Profile Image for Yeasin Reza.
521 reviews88 followers
Read
January 13, 2023
বেড়ালতমা নিঃসন্দেহে বেশ ব্যতিক্রমী কাজ। বাংলায় সুররিয়াল উপন্যাস নামক বস্তু বোধহয় হাতে গোণা। পড়লাম, অভিভূত হলাম,বোঝলাম যে আবার পড়তে হবে।তাই রেটিং প্রণালীতে আর যাচ্ছিনা।
Profile Image for Harun Ahmed.
1,682 reviews453 followers
February 22, 2025
"বেড়ালতমা" গত ৫ বছরের মধ্যে আমার পঠিত বইগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রিয়।
(এতো দুর্দান্ত লেখা, আমি উপযুক্ত রিভিউ লিখতে পারিনি অদ্যাবধি। তবে লিখবো কখনো, আশা আছে।)
Profile Image for Raihan Ferdous  Bappy.
244 reviews16 followers
November 10, 2025
সাররিয়াল উপন্যাস কি সেই বিষয়টা আগে বুঝিয়ে বলা উচিৎ। সাররিয়ালের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই ধাঁচের উপন্যাসগুলা বাস্তবতার নিয়ম মানে না। বাস্তব জগৎ আর কল্পনার জগৎ এক হয়ে যেতে পারে। মৃত মানুষ কথা বলতে পারে। পোকামাকড়-ও জ্ঞান দিতে পারে। অর্থাৎ, ঘটনাগুলা অবাস্তব বা স্বপ্নের মতো হয়। তবে, এর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে গভীর দার্শনিকতা। আমি 'Metamorphosis' বইটা পড়ে এই জনরা সম্পর্কে প্রথম জেনেছিলাম। এরপর খুব ভালো লাগলো যখন জানতে পারলাম বাংলাদেশেও এরকম ভিন্নধর্মী লেখার কাজ আছে জানতে পেরে। তবে, পড়ার পরে আসলেই হতাশ হয়েছি।

কথা বলছি হাসান মাহবুবের লেখা বই 'বেড়ালতমা' নিয়ে। নামটা জোশ না? বেশ ভিন্নধর্মী। প্লাস, আমার বিড়াল অনেক পছন্দের। টাইটেলটাই সেক্ষেত্রে বেশ নজর কেড়েছে। এবার ফিরি উপন্যাসে।
পরবাস্তব জগতের এক শহর হচ্ছে কাবেরিনগর। যেই শহর তার নাগরিকদের জীবন একদম দুরূহ করে রেখেছে। সেই নাগরিকদের মধ্যেই একজন এমন মানুষ আছে যার থাকার নির্দিষ্ট জায়গা নাই, হাতে খরচ করার মতো তেমন টাকাও নাই। তবে, একটা জিনিস আছে। তার ভালোবাসার মানুষ। তার 'বেড়ালতমা'। তার বেড়ালতমার রেফারেন্সেই সে একটা চাকরি পেয়ে যায়। গোলাপ বাগানে তার চাকরি। যেখানে উৎপাদন হয় কালো গোলাপ। এই কালো গোলাপ তৈরি হয় মানুষের পাপ থেকে। কি হয় তারপর? জানতে হলে পড়ে ফেলুন বইখানা।

বেশ আশা নিয়ে বইখানা ধরেছিলাম বললে মিথ্যা বা বাড়িয়ে বলা হবে। তা বলছি না। তবে, প্রথম কয়েক পেজ পড়ে সত্যিই আশা তুঙ্গে উঠে গেছিলো। চমৎকার লাগছিলো। তবে অর্ধেক যাবার পরেই একদম হুমড়ি খেয়ে পড়েছি। অনেক কষ্টেই বাকি অর্ধেক শেষ করেছি। হ্যাঁ! পড়ে অনেককিছু মাথায় এসেছে। বলা যায়, পাঠে চিন্তা জেগেছে, কিন্তু কোনোভাবেই তৃপ্তি পাইনি।

তাই, সবমিলিয়ে বলতেই হচ্ছে, ভালো লাগেনি।
Profile Image for SH Sanowar.
118 reviews29 followers
February 23, 2025
৩.৫

আমার মনে হয়, জাদুবাস্তব আর পরাবাস্তব ঘরানার লেখাগুলোর মধ্যে লেখকের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হলো নির্মোহ থাকা। বাস্তবের বাইরে গিয়ে লেখা কখনোই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার জন্য নয়; বরং বাস্তবতাকে স্বীকার করেই তার একটা ভিন্ন রূপ দেখানো, তার ভবিষ্যৎ এক রূপরেখা নির্মাণ করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তাই এই জনরাগুলোতে শুধু লেখকের বিশ্বাস বা পর্যবেক্ষণই আসে না, আসে তার অন্তর্দৃষ্টি, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস, দার্শনিক উপলব্ধি, এমনকি ভবিষ্যতের প্রতি তার সংশয় ও আকাঙ্ক্ষাও।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে কঠিন কাজ— নির্মোহ থাকা। কারণ, এই ঘরানাগুলোর সহজ ফাঁদ হলো অতিরঞ্জন বা একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি। লেখক যদি চরিত্রের প্রতি নির্মোহ ও নির্লিপ্তি ভাব বজায় রাখতে না পেরে নিজস্ব বিশ্বাসকে মাত্রাতিরিক্তভাবে চাপিয়ে দেন, তবে কথকের কথা বলার মাঝে লেখকের চেহারাটাও উঁকি দিতে থাকে। যেটা যেকোনো পাঠকের জন্যই বিরক্তিকর আসলে। নির্মোহ থাকার অর্থ এই নয় যে লেখক অনুভূতিহীন থাকবেন, বরং তিনি যেন তার সৃষ্ট জগতের প্রতি যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখেন, যেন সেখানে সত্যের বিকৃতি না ঘটে। তাই একজন পরাবাস্তব বা জাদুবাস্তব লেখকের সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজেকে চরিত্রের ঈশ্বর না বানিয়ে, বরং এক নির্লিপ্ত নির্মাতা হয়ে থাকা— যে কেবল দেখায়, নির্দেশ করে না। সে হিসেবে 'বেড়ালতমা'য় হাসান মাহবুব পুরোপুরি সফল না হলেও অনেকটা সফল বলা যায়। প্রথমদিকে আরোপিত ভাবটা বেশ ভালোই লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে "আমাদের শহরে এই..আমাদের শহরে সেই.." ব্যাপারগুলো। ক্রাশের কাছে পাত্তা না পাওয়া কিশোরের হা-হুতাশ মনে হচ্ছিল। খুব ক্রিঞ্জ লাগছিল। মনে হলো লেখক একপ্রকার জোর করেই গেলাবেন! কিছুদূর গিয়েই অবশ্য এই প্রবণতা বাদ দিতে পেরেছেন। প্রথমের কিছু অংশ বাদ দিলে বাকিটা বেশ ঠিকঠাক। আর লেখনী এতো সুন্দর, গদ্যের ভাষা, বর্ণনার বুনন এতো চমকপ্রদ যে লিট্রেলি একবসায় শেষ করে ফেলেছি পুরো বইটা। শুধুমাত্র লেখনীর কারণেই এই বই যেকেউ চোখ বন্ধ করে হাতে তুলে নিতে পারে।


কেউ যদি উপন্যাসের মূল থিম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে আমি হয়তো বলতে পারব না। আমি জানি না আসলে (আমাদের এক ম্যাম একবার বলছিল, যারা খুব সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে তাদের কথার সারমর্ম করলে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। বেড়ালতমার ক্ষেত্রেও হয়তো সে কথা খাটে।) তবে একটা কথা জানি, হাসান মাহবুবের লেখার মূল সুর হচ্ছে অন্তর্লীন দুঃখ। পঁচে গলে যাওয়া মানুষ দেশ ও সময়ের বর্ণনা, শ্বাসরোধ করা এমন কবিতার ভাষায় লিখা লেখাগুলো আমি বারবার পড়তে চাই। এটাও হয়তো পড়বো। "বেড়ালতমা" পাঠের একটা স্থায়ী পাঠ অভিজ্ঞতার রেশ আমার মধ্যে থেকে যাবে অনেকদিন নিঃসন্দেহে।
Profile Image for Ratika Khandoker.
314 reviews35 followers
December 31, 2022
২.৮ তারকা
এই বছরের শেষ বই বেড়ালতমা,অথচ সেইই বছরের শুরু থেকে- ফেব্রুয়ারি থেকে খোঁজ করছিলাম বইটির।
সত্যি কথা হলো,বইটি আমি তেমন ভালো বুঝিনি,পাঠোদ্ধার করতে পারিনি।কিংবা হয়তো খুব বেশি কিছু পাঠোদ্ধার করার নেই ও।
কাবেরীনগর,গোলাপবাগান,সাপের খামার পর্যন্ত পড়তে বেশ ভালো লেগেছে,লেখকের কাব্যিক লেখনির জন্যেই।
তবে যেই মাত্র নরকের ট্রেন ছেড়ে গেলো,আমার ধৈর্য্য ও ছুটে গেলো।এরপর শেষ করেছি বেশ টেনে হিচঁড়ে।
তবে মহাজাগতিক আয়না থেকে চ্যাপ্টার এ এসে বুঝলাম,আরেহ, বেড়ালতমা পুরা গল্পটাইতো মনে হয় লেখকের ব্যক্তিজীবনের এক কাল্পনিক রূপ!
Profile Image for soumya mukherjee.
6 reviews3 followers
June 14, 2025
বিষয়বস্তুর গভীরতা, লেখনী, রূপকের ব্যবহার এবং সর্বোপরি পরাবাস্তবতার মোড়কে জীবন ও প্রকৃতির শাশ্বত সম্পর্কের স্বরূপ উন্মোচন, এরকম এক বিরল এবং সফল প্রচেষ্টার জন্য লেখককে সাধুবাদ।
Profile Image for টক   দইয়ের  চা.
371 reviews7 followers
February 14, 2023
*৪.২৫/৫
কিছুদিন আগে দেখা The Menu মুভির একটা ডায়লগ খুব পছন্দ হয়েছিল। ডায়লগটা ছিল- "You will eat less than you desire and more than you deserve."

আর 'বেড়ালতমা' পড়ার পরে আমার মনে হচ্ছে - You will grasp less than you understand and more than you imagine. আমি অনেক কিছু বুঝতে পেরেও কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না আবার কিচ্ছু না বুঝেও অনেক কিছু বুঝতে পারলাম। তবে বইটা উপভোগ করেছি যতক্ষণ পড়েছি। মহাকালীক প্রেম - প্রকৃতি - ধর্ম - দর্শন - ঈশ্বর - এবসার্ড প্লট সব কিছু মিলিয়ে এই বই একটা জগাখিচুড়ি। কিন্তু এই জগাখিচুড়ি খেতে মন্দ লাগবে না।

বইয়ের কিছু জিনিস দৃষ্টিকটু লেগেছে। যেমন : এক জায়গায় লেখক খরগোশকে মাংসাশী প্রাণী বলছেন, আবার আরেক জায়গায় এক স্টেশনের নাম প্রথমে বলা হলো হিলি কিন্তু একটু পরে ঐ স্টেশনের নাম হয়ে গেল জীবনপুর! এই সব বিষয়গুলো দিকে একটু দৃষ্টি দেবার দরকার ছিল।

বইয়ে লেখক মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষ করে প্যানিক অ্যাটাক নিয়ে যে অবস্থা বলেছেন তা আমার নিজের সাথেও বেশ মিলে যায়। আর এই অবস্থাকে এতো চমৎকার ভাবে লিখতে পারার জন্য অবশ্যই সাধুবাদ জানাই।

ভিন্নধর্মী কিছুর স্বাদ নিতে চাইলে এই বই অবশ্যই পড়ে দেখার মতো।
Profile Image for Mohtasim Hadi Hadi.
Author 11 books53 followers
March 31, 2022
এখনো ঘোর কাটেনি। কাটলে আবার লিখতে বসব। আপাততো নটিং হিল সিনেমার সেই ডায়লগখানি দেয়া যায়, "সুররিয়েল, বাট নাইস।"
Displaying 1 - 14 of 14 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.