পাঠক, দাবা খেলতে বসে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আপনি দেখলেন একে একে আপনার সব ঘুঁটি কাটা পড়েছে প্রতিপক্ষের হাতে। শুধু একটা ঘোড়া দিয়েই এখন বাজিমাত করতে হবে আপনাকে। পারবেন? সেই ভয়ঙ্কর রাতের কথা মনে আছে আপনার? সেই যে শালবনের গভীর জঙ্গলে প্রেরণাকে নিয়ে লং ড্রাইভে গিয়েছিল ইফতেখার। ডা. জামান সারওয়ারকে মনে আছে আপনার? নৃশংসভাবে হত্যা করে ধানমণ্ডি লেকে ফেলে রাখা হয়েছিল যার লাশ। ব্রিগেডিয়ার আকরাম খান, আফ্রিকার মাসাদিও হায়দারা, কিংবা রহস্যময় পিটার বুন। কী সম্পর্ক ছিল তাদের দুই হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা জেরুজালেমের মৃত প্রেতাত্মাদের সাথে? পাঠক, যে রহস্যের শুরু হয়েছিল দুই হাজার বছর আগে জেরুজালেমে, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ঘুরে সে রহস্য আজ আপনার সামনে। তাহলে আর দেরি কেন? চলুন বের হয়ে পড়ি অন্ধকার জগতের গোপন অলিগলিতে, সে রহস্যের সমাধান করতে। দাবা খেলাটা এবার শেষ করতে হবে তো।
প্রথম পর্বটা দুর্দান্ত লাগলেও দ্বিতীয় পর্বটা প্রথম পর্বের তুলনায় বেশ দূর্বল লেগেছে। ফিনিশিং টাও কেন যেন পছন্দ হয়নি। কিন্তু সব মিলিয়ে বেশ ভাল একটা বই এবং বেশ উপভোগ্য।
When a spy sells something entirely new, all he needs to do is recount something you could find in any second-hand book stall.- Umberto Eco, The Prague Cemetery - এখনো ঘোড়ার চাল বাকি (শেষ পর্ব) - এখনো ঘোড়ার চাল বাকি এর শেষ পর্বকে এর আগের পর্বের direct continuation বলা যায়। এ পর্বে দেখা যায় সাবেক মেজর ইফতেখার আগের পর্বের নানা রহস্যের সমাধান করতে ব্যস্ত। এছাড়াও আগের পর্বের জেরুজালেমের প্লটের সাথে সত্তরের দশকে আমেরিকার কিছু ঘটনার কানেকশন পাওয়া যায়। সাথে এই পর্বে রয়েছে ব্রিগেডিয়ার আকরাম খান, ভয়াবহ গ্যাংস্টার পিটার বুন এবং আফ্রিকার মাসাদিও হায়দারা সম্পর্কে আরো বিস্তারিত কিছু তথ্য।
এখন বইটির আগের পর্ব অনেক প্রশ্নের দরজা খোলা রেখেই শেষ হয়েছিলো। যেমন বইয়ের শেষে যে ক্লিফহ্যাঙ্গার দেয়া হয়েছে সে রহস্যের আসল কারণ কি? ইফতেফারের একসময়ের বসের মৃত্যুর মূল রহস্য কি? আর এ সব কিছুর সাথে প্রায় ২০০০ বছর আগের জেরুজালেমের কি সম্পর্ক? সে সকল প্রশ্নের উত্তর রয়েছে লেখক রিফাত হাসানের এসপিওনাজ ধারার থ্রিলার "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি" এর শেষ পর্বে। - এখনো ঘোড়ার চাল বাকি (শেষ পর্ব) এর আগের বইয়ের মতোই মোটাদাগে এসপিওনাজ থ্রিলার। আগের পর্বের সকল রহস্যের উত্তর এই পর্বে পাঠকেরা পেয়ে যাবেন। এই বইয়ের লেখনশৈলী এর আগের খন্ডের মতোই ভালো। কিন্তু গল্পে টুইস্ট অ্যান্ড টার্ণ এর আগের পর্বের লেভেলে যেতে পারেনি মনে হয়েছে। এবারের পর্বে নন লিনিয়ার পার্ট আগের পর্বের চেয়ে কম ছিলো, তাই কাহিনি ধরতে বেশিরভাগ সময় সহজই লেগেছে। এই পর্বে মূল প্লটের সাথে সব সাবপ্লটের সমাপ্তিও টানা হয়েছে। তবে এর ভেতরে কয়েকটি সাবপ্লট খুব একটা ভালো লাগেনি মূল প্লটের সাথে তেমন একটা কানেকশন না থাকায়। - এখনো ঘোড়ার চাল বাকি (শেষ পর্ব) এ গত পর্বের মতোই সাবেক মেজর ইফতেখার স্ট্যান্ড আউট চরিত্র। তবে বইয়ের এই খন্ডে কয়েকটি চরিত্রের ইন্ট্রোডাকশন/রি-ইন্ট্রোডাকশন খুব একটা বাস্তবস্মত মনে হয়নি। বইতে এর আগের পর্বের মতো ফ্যামিলি ড্রামা থাকলেও এবারে তা আগের পর্বের মতো আমাকে ছুঁয়ে যায়নি, ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রয়োজনীয়ও মনে হয়েছে। প্রথম পর্বের শেষ দিকে যে লেভেলের শকড হয়েছি সেদিক থেকে এই পর্বের ফিনিশিং খুবই গতানুগতিক বলা চলে। - এখনো ঘোড়ার চাল বাকি (শেষ পর্ব) এর কারিগরি দিক থেকে দেখলে অভিযোগের খুব একটা জায়গা নেই মূল্যের তুলনায়। বইয়ের বাধাঁই, ফন্ট সাইজ, সম্পাদনা মোটাদাগে ভালোই।ছোটখাটো কিছু টাইপো অবশ্য ছিলো, কিন্তু সেগুলো পড়ায় খুব একটা সমস্যা করেনি। প্রচ্ছদও চলনসই বইয়ের কাহিনির সাথে। এক কথায়, আগের পর্বের মতোই দুর্দান্ত না লাগলেও এখনো ঘোড়ার চাল বাকি (শেষ পর্ব) একেবারে খারাপ নয় গল্পটির শেষ খন্ড হিসেবে। যারা এখনো ঘোড়ার চাল বাকি এর প্রথম ভাগ পড়ে ফেলেছেন বা পড়বেন তাদের জন্য এই খন্ডও রিকমেন্ডেড থাকলো।
প্লট, স্টোরিটেলিং এবং প্রথম খন্ড- সবকিছুই যথেষ্ট প্রমিসিং হলেও দ্বিতীয় খন্ডে এসে লেজগুবড়ে মেস আপ হয়ে গেছে৷ লেখকের লেখনশৈলী খুব ই প্রমিসিং, প্লট সহ যাবতীয় সবকিছুই প্রমিসিং। শুধুমাত্র প্রথম উপন্যাস বলেই কি না, সমস্যা হয়েছে এক্সিকিউশানে। শেষের দিকে এসে একেবারেই খাপছাড়া লাগলো।
ইফতেখার আহমেদ। অভিজ্ঞ্য সামরিক অফিসার। সে কি জানে না নিজ পিস্তল দিয়ে ক্রাইম করলে সে ফেসে যাবে বুলেট ট্রেসিং এ? আমি পড়ার আগের থেকে ভাবছি এই কাজ করা যাবেনা। করলো,করে তবু ধরাও খেলোনা! ঐদিকে ধরা খেলো তাও ব্যক্তিগতভাবে একজনের ওপর। এভাবে পদে পদে ইফতেখারের বিভিন্ন ইশ্যু এসেছে একের পর এক যা খাপছাড়া লেগেছে।
ইংরেজীর সেই পুরনো বিখ্যাত লাইন আনতে হয়। 'শো, ডোন্ট টেল!' পুরো উপন্যাস জুড়েই, দেখছিলাম অর্থাৎ শো ই করছিলেন। শেষে এসে জিনিসটা উলটে গেলো, শো করার বদলে দেখলাম, বলছেন! অনেক অনেক সুতো ছাড়ার ফলে পরবর্তীতে সুতো গোটানোর সময় জগাখিচুড়ী লেগেছে কিছুটা বলে মনে হলো। তবে প্রথম খন্ড পড়া থাকলে পড়তে পারেন শুদুমাত্র গল্পের পরিণতি জানার জন্য। অবাক হবেন, জেরুজালেম এ যেতে হয় নি কাউকেই, শুধু অতীতে কেউ গিয়েছিলো, অতীতে কিছু একটা হয়েছিলো এর প্রেক্ষিতে বর্তমানে অন্য স্থানে অন্য কিছু ঘটছে সেটা আসলে কট্টুক হিস্টোরিকাল ফিকশানের জনরা কাভার করে, আমি সন্দিহান।
কাহিনি সংক্ষেপঃ ঢাকার নামজাদা বেশ কয়েকজন ডাক্তারের বাচ্চাদের কে বা কারা অপহরণ করেছিলো। এরপর একটা নির্দিষ্ট সময় পর ওদেরকে ছেড়েও দেয়া হয়। তাও বিনা মুক্তিপণে। অদ্ভুত শোনাচ্ছে না? এই অপহরণগুলোর সাথে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ও আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন কিছু ঘটনার মিল খুঁজে পেলো প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন্স এজেন্সি 'দ্য সিক্রেটস'-এর সিনিয়র এজেন্ট ইফতেখার। অপহরণকে আর্টের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত নাম কানা তারেক হঠাৎ-ই আবির্ভূত হলো দৃশ্যপটে। খুব সূক্ষ্মভাবে বোনা এক জালে জড়িয়ে গেলো ইফতেখার।
১৯৮০ সাল, শিকাগো। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র অফিসার প্রোফেসর স্যামুয়েল জনসন এক বিকেলে এফবিআই-এর হাতে গ্রেপ্তার হলেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা চার্জটাও ভয়াবহ। ধর্ষণ ও খুনের দায়ে গ্রেপ্তার করা হলো প্রোফেসর জনসনকে। কিন্তু তাঁর বিচার প্রচলিত আইনে না করে এফবিআই গুম করে ফেললো তাঁকে৷ তাঁর বাড়ি থেকে খোয়া গেলো এক মূল্যবান জিনিস। কেন এত লুকাছাপা?
ব্রিগেডিয়ার আকরাম খানের অকস্মাৎ মৃত্যুটা মেনে নিতে না পেরে তদন্ত করতে নামে ইফতেখার। ওকে সাহায্য করতে থাকে শোভন। ওদের মিলিত প্রচেষ্টায় বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর এমন কিছু তথ্য, যা নির্দেশ করে যে ভয়ঙ্কর কোন এক মাস্টারপ্ল্যানের রূপদান করার চেষ্টা করে চলেছে কোন এক শক্তিশালী চক্র। ওদিকে বেশ কয়েক মাস আগে গাজীপুরের শালবনে রাতের আঁধারে ডা. প্রেরণার সাথে যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গিয়েছিলো তার পেছনে কে কলকাঠি নেড়েছে, সেটাও জানা প্রয়োজন হয়ে পড়ে ইফতেখারের।
৭০ খ্রিস্টাব্দ, জেরুজালেম। ইহুদিদের তীর্থস্থান ও পবিত্র এই নগরীকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে রোমান সেনাবাহিনী। খোদ রোমেই যখন সি���হাসন দখল করা নিয়ে পুরোপুরি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তখনও সেনাপ্রধান টাইটাসের পথপ্রদর্শন ও নির্দেশে রোমান সেনাবাহিনী চালিয়ে যাচ্ছে ইহুদি নিধন যজ্ঞ। আর এরই ধারাবাহিকতায় জেরুজালেমের সেকেন্ড টেম্পলকে ধুলোর সাথে মিশিয়ে দিতেই মাঠে নেমেছে ওরা। আজকের, এই বর্তমান সময়ের কিছু ঘটনার সাথে এই ঐতিহাসিক ঘটনারই বা কি সম্পর্ক?
ধানমণ্ডি লেকের ধারে পাওয়া গিয়েছিলো ডা. জামান সারওয়ারের খণ্ডবিখণ্ড লাশ। স্বামীকে হারিয়ে তাঁর স্ত্রী আদ্রিতা আজ প্রায় নির্বাক। কোনভাবেই সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারছে না। আজও সে আশা করে ডা. জামান ফিরে আসবে। হয়তো সত্যি সত্যি মারা যায়নি সে। এভাবেই জীবন্মৃতের মতো একটা একটা করে দিন কেটে যাচ্ছে আদ্রিতার। অথচ আজও ডা. জামানের খুনের রহস্য অমীমাংসিত অবস্থাতেই বন্ধ পড়ে আছে। আদৌ কি এই রহস্যের কোন সমাধান হবে?
কে এই রহস্যময় পিটার বুন? ঢাকার বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে এন্ডি মর্গান নামের এক এফবিআই এজেন্ট। কেন? ডেভিড পোকারম্যানের ডায়েরিতে আসলেই কি গুপ্তধনের সন্ধান আছে, নাকি ডায়েরির পাতাভর্তি অচেনা ভাষা শুধুই কিছু অর্থহীন আঁকিবুঁকি?
সমস্ত প্রশ্নের জট খুলতে হবে ইফতেখারকে। আর সেজন্য হয়তো ওকে জাগিয়ে তুলতে হবে ওর যন্ত্রণাময় অতীতকেও। কখন মিথ্যা পরিণত হচ্ছে সত্যে, আর সত্য সম্পূর্ণভাবে বদলে যাচ্ছে মিথ্যায় ধরাটাও কঠিন হয়ে গেলো ইফতেখারের জন্য। প্যাঁচালো এই দাবা খেলায় ঘোড়ার শেষ চাল কে দেবে?
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ 'এখনো ঘোড়ার চাল বাকি' তরুণ লেখক রিফাত হাসানের প্রথম মৌলিক থ্রিলার উপন্যাস। দুটো খণ্ডে এই উপন্যাসটা পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি। বইটার প্রথম ভাগ পড়েছি খুব বেশিদিন হয়নি। আর প্রথম ভাগের ঠিক যেখানে এসে লেখক বিরতি টেনেছেন, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়েছে শেষ ভাগের কাহিনি। স্বাভাবিকভাবেই, প্রথম ভাগ পড়ার পর থেকেই শেষ ভাগ পড়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কারণ, অনেক প্রশ্ন জমা হয়ে ছিলো মনের ভেতরে। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার জন্য দ্বিতীয় ভাগ পড়াটা জরুরি ছিলো। আমি আনন্দিত যে 'এখনো ঘোড়ার চাল বাকি'-এর শেষ ভাগ পড়ার জন্য খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি আমাকে।
এই উপন্যাসে রিফাত হাসান ইতিহাস, এসপিওনাজ, মার্ডার মিস্ট্রি আর কন্সপিরেসির মতো ব্যাপারগুলোকে এমনভাবে মিশিয়েছেন যে শুরুতে আমি নিজেই একপ্রকার চিন্তায় পড়ে গেছিলাম যে শেষমেষ সবকিছুকে তিনি এক সুতোয় কিভাবে গাঁথবেন সেটা ভেবে। তবে শেষ ভাগ পড়তে গিয়ে আমি যতোই এগিয়েছি, ততোই লেখকের গল্প বলার ধরণ ও স্টেপ বাই স্টেপ নানা রহস্যের জট ছাড়ানো দেখে মুগ্ধ হয়েছি। লেখকের মুনশিয়ানা দেখে মনেই হয়নি যে এটা তাঁর প্রথম মৌলিক থ্রিলার।
'এখনো ঘোড়ার চাল বাকি'-এর প্রথম ভাগে ইতিহাস সম্পর্কিত বিষয়াদি বেশ কম ছিলো। কিন্তু শেষ ভাগে এসে সেই অভাব পূরণ হয়ে গেছে। ৭০ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেমের ইহুদিদের ওপর রোমানদের চালানো আক্রমণ সম্পর্কে মোটামুটি পরিস্কার একটা ধারণা দিতে পেরেছেন রিফাত হাসান। কানা তারেকের মতো শক্তিশালী চরিত্রটাও বেশ ভালো লেগেছে। আর মূল চরিত্র ইফতেখারকে তো ভালো লেগেছেই। সেই সাথে ভালো লেগেছে প্রথম ভাগে উদ্ভূত একাধিক প্রশ্নের উত্তর শেষ ভাগে পেয়ে। এতো বড় প্লটের একটা থ্রিলারকে শেষ দিকে এসে পারফেক্ট একটা ওয়েতে মিলিয়েছেন লেখক, যা সত্যিই প্রশংসার দাবীদার। শেষটা একটু সিনেম্যাটিক হলেও বেশ ভালো লেগেছে আমার।
বেশ কিছু টাইপিং মিসটেকের দেখা পেয়েছি 'এখনো ঘোড়ার চাল বাকি'-এর শেষ ভাগে। বানান জনিত সমস্যাও লক্ষ্য করেছি বেশ কিছু। যেমন, কন্ট্যাক্ট-কে কন্ট্রাক্ট, ছুরি-কে ছুঁড়ি ও দাড়ি-কে দাঁড়ি লেখা হয়েছে৷ এই ভুলগুলো প্রথম ভাগেও ছিলো। আশা করি পরবর্তী এডিশনে এই ভুলগুলো থাকবে না। চোখে লেগেছে একটা ব্যাপার। সেটা হলো, জানো শব্দটাকে জান লেখা হয়েছে বেশ অনেকবার। উচ্চারণগতভাবে জানো-ই হওয়ার কথা, জান না। এসব দিকে রিফাত হাসান সুদৃষ্টি দেবেন আশা করি।
'এখনো ঘোড়ার চাল বাকি'-এর শেষ ভাগের আমার যে কপিটা, এর বাঁধাইটা বেশ খানিকটা দুর্বল বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। বরাবরই ভূমিপ্রকাশ-এর প্রোডাকশন টপ ক্লাসের হয়। বাঁধাই দুর্বল হওয়ার কথা না। সম্ভবত আমার কপিতেই সমস্যা আছে। যাই হোক, এটা তেমন কোন ব্যাপার না।
সজল চৌধুরী'র করা প্রচ্ছদ বরাবরের মতোই চমৎকার লেগেছে৷ 'এখনো ঘোড়ার চাল বাকি' প্রথম ও শেষ ভাগ অ্যাভেইলেবল আছে বাজারে। চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন।
অনেকের কাছে শুরুর ভাগ ভালো লেগেছিলো, আমার মোটামুটি লেগেছিলো৷ অনেকের কাছে শেষের ভাগ হতাশাজনক ছিল, আমার কাছে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ছিল। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে শেষের দিকে এসে লেজে গোবরে অবস্থা হয়েছে (শেষ ৫-৬ পেজে) কিন্তু ওভার অল ভালো লেগেছে। লেখকের কাছে আশা করি আরো চমৎকার সব থ্রিলার পাব।
প্রথম ভাগের চেয়ে দ্বিতীয় ভাগ যথেষ্ট গতিশীল। এবং গল্প বলার ধরনও পাল্টে গেছে অবশ্য। প্রথম বইয়ে যে রহস্যগুলোর তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর জট খোলা হয়েছে এই বইতে। মূল যে রহস্য, সেটা আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। বইয়ের সমাপ্তিও যথেষ্ট উপভোগ্য লেগেছে, সাথে কাব্যিকতা। তবে সমাপ্তিতে যাওয়ার আগের ঘটনাগুলোতে তাড়াহুড়ো করা হয়েছে। আগের বইয়ের সাবপ্লটগুলো এই বইতে এসে মার খেয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে, দুর্বল লেগেছে বেশ। সবমিলিয়ে বেশ ভালো সময় কেটেছে উপন্যাসটির সাথে।
প্রথম ভাগে যে জাল বোনা হয়েছিল তা আস্তে আস্তে গোটানো হয়েছে দ্বিতীয় ভাগে এসে। কিন্তু এত্ত আয়োজন করে যে জাল বোনা হয়েছিল তার সমাপ্তি খুব সুখকর ছিল না। তবে আশার কথা হল "ঋ" এর মত বিরক্তির উদ্রেক ঘটে নি কোথাও।
কাহীনী সংক্ষেপ: ১৯৮০ এর দশকে কোন এক দিনে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্কিওলজী ডিপার্টমেন্ট এর শেষ ক্লাস নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন প্রফেসর স্যামুয়েল জনসন।কিন্তু বাড়ি ফিরেই এফবিআইয়ে লোক তাকে ধরে নিয়ে যায়।এরপর থেকেই নিখোঁজ তিনি। এদিকে দ্য সিক্রেট এর ইফতেখার কে মনে আছে ত পাঠক? সে তখন ব্রিগেডিয়ার আকরাম খানের খুনের রহস্য বের করতে মরিয়া। অন্যদিকে কেন আকরাম খান তার হাতেই তার প্রিয়তমা প্রেরনা কে খুন করিয়েছিলো সব কিছুই তার কাছে ধাধা। ডাঃ জামান সারোয়ারের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া,ব্রিগেডিয়ার আকরাম খানের খুন,প্রেরনাকে ইফতেখারের নিজের হাতে গুলি করা! এতোগুলো ব্যাপারের সাথে প্রফেসর স্যামুয়েল জনসন এর কি সম্পর্ক? ধীরে ধীরে রহস্য জট পাকাতে থাকে।না আর না,এর আগের খেলায় দাবা খেলায় হেরে যাওয়া ইফতেখার এইবার জিততে মরিয়া হয়ে উঠলেন। এরই মধ্যে রহস্য যখন ঘনিভূত তখন ই ইফতেখার খুঁজে বের করেন এন্ডি মর্গান নামে এফবিআই এর এক এজেন্ট কে।যিনি ই ছিলেন কুখ্যাত সন্ত্রাসী পিটার বুন।কিন্তু একজন এফবিআই সদস্য কিভাবে সন্ত্রাসী হলো?
৭০ দশকের দিকে রোমান রা জেরুজালেম শহরে ইহুদিদের যে লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের সৃষ্টি করেও তাদের মন্দিরের গুপ্তধন এর ব্যাপারে একটা তথ্য ও বের করতে পারেনি,সেই একই গুপ্তধনের পিছনে ছুটে চলেছে প্রফেসর স্যামুয়েল জনসন ও তার বন্ধু ডেভিড পোকারম্যান।এমনকি তারা প্রায় ৪০ টি গুপ্তধন বের ও করে।কিন্তু সেই গুপ্তধন খুঁজে বের করার জন্য ডেভিড পোকারম্যান এক সাংকেতিক ভাষার প্রয়োগ করে একটি ডায়েরী লিখে যায়।
কিন্তু সত্তুর দশকের এক গুপ্তধনের সাথে একুশ শতকে বাংলাদেশের মত একটি রাষ্টে এতগুলো খুন,আর ক্রাইমের আসল যোগবিন্দু কি?
ক্রমেই রহস্য জটিল থেকে জটিল আকার রুপ ধারন করে।কিন্তু ইফতেখার একা পারবে সেই রহস্য উদ্ধার করতে? প্রেরনা কি বেঁচে আছে?
সকল রহস্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু একটিই।কিন্তু সেটি কি আর এর শেষ কোথায়?
ব্যাক্তিগত মতামতঃ এখনো ঘোড়ার চাল বাকি এর শেষভাগ এই বইটি।মুলত প্রথম বইয়ে লেখক যে রহস্য এর জাল বুনেছেন এই বইটিতে সেই সকল রহস্য একে একে জাল ভেদ করেন লেখক নিজেই।পাশাপাশি লেখক রহস্যের মধ্যে কিছু ইতিহাসকে যোগ করে বইটাকে পরিপূর্ণ রুপ দিয়েছেন। লেখকের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।
বিঃদ্রঃ আমার এখনো ঘোড়ার চাল বাকি (শেষভাগের) রিভিউ পড়ার আগে পাঠক কে প্রথম ভাগের রিভিউ পড়তে অনুরোধ করবো।সবচেয়ে ভালো হয় যদি প্রথম বইটা পাঠক পড়ে নেয়।নাহলে ভুল বোঝার আশংকা থেকে যায়।
"ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে" এর আপডেটেড ভার্সন বলা যায় "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি।" ময়দানে সব বিসর্জন দিয়ে হেরে যেতে নিয়েও হঠাৎ করে ঘোড়ার আড়াই চালেই কিস্তিমাত। দাবার গুটির মধ্যে ঘোড়ার চাল অস্বাভাবিক। এটি এমন স্কয়ারে চলে যায় যা দুই বর্গক্ষেত্র অনুভূমিকভাবে এবং এক বর্গক্ষেত্র উল্লম্বভাবে, বা দুটি বর্গক্ষেত্র উল্লম্বভাবে এবং একটি বর্গক্ষেত্র অনুভূমিকভাবে। সম্পূর্ণ চালটি "এল" বর্ণের মতো দেখায়। অন্যান্য সমস্ত স্ট্যান্ডার্ড দাবা গুটি থেকে আলাদা, ঘোড়া তার গন্তব্য স্কয়ারে অন্য সমস্ত গুটি "লাফিয়ে" যেতে পারে। এটি তার স্কয়ারে প্রতিস্থাপন করে শত্রু গুটি দখল করে। রাজা ও নৌকা সহ ঘোড়ার চাল যে কোনও দাবা গুটির প্রাচীনতম চাল, এটির চাল ভারতে ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে চতুরঙ্গ আবিষ্কারের পর থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। থ্রিলার জনরা দিনকে দিন আমাদের দেশে পাঠকপ্রিয়তা পেয়ে আসছে। লেখকেরাও তাদের থ্রিলার লেখায় পাঠকদের একদম চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছেন। থ্রিলার বইতে প্রতি শব্দে কী হয় কী হয় একটা ভাব থাকবেই। কিন্তু সাথে যদি প্রেম, জীবনের টানাপোড়ন, সৈনিক জীবনের চিত্র, হারানো জীবনের গল্প, আবার শ্বাস আটকে যাওয়া ঘটনা থাকে তাহলে তো কথাই নেই। আবার মাঝে মাঝে যদি সেই আদিম যুগে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা এসে হাজির হয় তাহলে তো বলা যায় মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির আগমন। বলছিলাম 'রিফাত হাসান' এর লেখা বই "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি" এর কথা। থ্রিলার এর সাথে এই বিষয়গুলোর উপস্থিতি একদম খাপে খাপ মিলে গেছে বইতে। রিভিউতে আমি "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি" এর দুইটা ভাগই তুলে ধরব আমার মতো করে। উপন্যাসের শুরুতেই ইহুদিদের পবিত্র নগরী 'জেরুজালেম' এ রোমান সৈন্যদের অত্যাচারের ছোট একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। এরপর উপন্যাসের কাহিনি এগিয়ে যায় কয়েকটি মৃত্যু, তাদের পরিবার, পুলিশের তদন্ত আর অবসরপ্রাপ্ত আর্মি কর্মকর্তা ইফতেখার আহমদ এর অতীত ও বর্তমানের ঘটনা নিয়ে। জীবন যুদ্ধের অলিগলি পার করে সে যোগ দিয়েছে দেশের প্রথম সারির প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি "দ্য সিক্রেটস"-এ। পাওয়া যায় মোখলেশ মিয়া নামক এক দিনমজুরের লাশ আর ধানমন্ডি লেকের পাশে বস্তাবন্দী মাথাবিহীন লাশ যার শরীর টুকরো করে কাঁটা। নিখোঁজ হন ডা. জামান সারওয়ার, যার নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্ট করে যান তার স্ত্রী আদ্রিতা জামী। খুনের সঠিক তদন্ত, নিখোঁজ ডাক্তারের সন্ধান করা সব নিয়ে বেশ চাপেই যাচ্ছিল কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার দিন। সাথে ইফতেখারও তার সহযোগী শোভনকে নিয়ে মেলানোর চেষ্টা করছিলেন পাজলের প্রতিটি অংশ। সাথে অতীতে ইফতেখারের জীবনে ঘটে যাওয়া কালো অধ্যায়ের বর্ণনাও এগিয়ে যাচ্ছিল। তার সৈনিক জীবন, পরিবার আর মনের গহীনে স্থান পাওয়া এক নারী "প্রেরণা" এর ঘটনা চলছিল আপন গতিতে। জীবনে বিশ্বাসঘাতকতা, হুমকির স্বীকার এক সৈনিক কিভাবে জীবনের কাছে পরাজিত হতে নিয়েও উঠে দাঁড়াতে চায় তার দৃশ্য দেখা যায়। উপন্যাসের কাহিনি শুধু স্বদেশেই নয় চলে গেছিল বিদেশের মাটিতেও। নানা রকমের চরিত্র, নানা রকম তাদের জীবন কাহিনি। তদন্ত করতে করতে দেখা যায় ঐ একই! খুন বা নিখোঁজের ঘটনাগুলো যেন আয়নার সামনে দাঁড়ানো প্রতিবিম্ব। একটার শেষ খুজঁতে গিয়ে মিলেছে আরেকটির উৎস। এর মাঝে ঘটে গেছে দেশের বাইরে আরো কিছু ঘটনা। উপন্যাসের একদম শেষে এসে যখন দেখবেন হৃদয়ের মাঝে লুকিয়ে রাখা প্রেমিকার হৃদয় ছুঁতে ব্যবহার হবে বুলেট তখন আপনি অস্থির হয়ে যাবেন। কেন এমন হলো? মাথায় ঘুরবে সিনেমার লাইন "কাটাপ্পা নে বাহুবলীকো কিউ মারা?" তখন পরের পৃষ্ঠা পড়বেন। দেখবেন লেখকের ভাব এমন "রুখো যারা, সাবার কারো!" কারণ ঘোড়ার চাল তো এখনো বাকি। না পাওয়া উত্তর খুঁজতে পড়তে "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি" শেষ ভাগ। এত এত চরিত্র, এত এত কাহিনি বিন্যাস দেখে ভেবেছিলাম সবাইকে কি এক সারিতে সাজাতে পারবেন লেখক? কিন্তু, আমার শঙ্কা শঙ্কাই রয়ে গেছিল। লেখক পেরেছেন। শতভাগ না হলেও সিংহভাগই পেরেছেন। যদিও কিছু খামতি ছিল। "জেরুজালেম" শহরে রোমান সৈন্য কতৃক ইহুদিদের ওপরে চলা নির্মম হত্যাকান্ড আর অত্যাচারের ভয়াবহ রূপ দেখিয়েছেন। জট খুলছিল খুনগুলো। শেষ ভাগে এসে যোগ হয়েছিল এফবিআই, পিবিআই এর সংশ্লিষ্টতা যা উপন্যাসের কাহিনীতে এনে দিয়েছিল এক নতুন মাত্রা। এসেছিল আইভরি কোস্টে কোকো চাষের জন্য নির্যাতিত শিশুদের ঘটনা। জেরুজালেমের ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া কিছু রহস্য যার জট খুলেছে শেষ ভাগে এসে। জীবন যুদ্ধে কয়েকবার পরাজিত সৈনিক ইফতেখার কি পেরেছিল ঘোড়ার আড়াই চাল দিয়ে কিস্তিমাত করে দিতে? কেনই বা সে গুলি করেছিল তার প্রিয়তমা প্রেরণা কে? প্রেরণা কি বেঁচে গেছিল নাকি হারিয়ে গেছিল ইহকাল থেকে? সব ষড়যন্ত্র, মৃত্যু পেরিয়ে কি ভালোবাসা আর সত্যের জয় হয়েছিল? পুরোটা জানতে হলে পড়তে হবে বইটি। বইতে মানব-মানবীর প্রেমকে এত নির্মল ভাবে দেখিয়েছে যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। ইফতেখার-প্রেরণার শেষ কী হলো সেটা বের করতে যেমন বেগ পেতে হয়েছে। তেমনি কষ্ট লেগেছে আদ্রিতা-জামানের পরিণতিতে। ইফতেখার চরিত্রটা আমার বেশ মনে ধরেছে। আশা করি লেখক তার অন্য লেখায়ও ইফতেখারকে রাখবেন। বইয়ের প্রিয় কিছু উক্তি: ১) হয়তো সবথেকে কঠিন মুহুর্তেই বের হয়ে আসে মানুষের মনের সবথেকে কোমল দিক। ২) নিজেকে মনে হয় সীমাহীন মহাকালের সবচেয়ে অভিশপ্ত মানুষ। ৩) একজন মানুষ যখন প্রতিশোধ নিতে চায় তখন তার জন্য দুটো কবর খোঁড়া হয়। ৪) যে কবিতা পড়তে পারেনা সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে - আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। ৫) নারী মাংস। সমস্ত পৃথিবীর সব সুস্বাদু খাবারের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় সে জিনিস। ৬) সত্যমিশ্রিত মিথ্যা সম্পূর্ণ মিথ্যার থেকেও ভয়ংকর। #বি_দ্র : বইটা পড়ে আমার যেমন খুব ভালো লেগেছে তেমন বইয়ের কিছু অসংগতিও আমার চোখ এড়ায়নি। আশা করি পরবর্তিতে লেখক এসব দিকে মনোযোগ দিবেন। প্রথম পর্বের পৃষ্ঠা ১৮৯ তে লেখক অনন্যার পোশাকের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে "অনন্যা পরে এসেছে একটা ডিপ খয়েরী কালারের সালোয়ার, সাথে একই কালারের একটা প্যালাজ্জো।" আমি লাইনটা কয়েকবার পড়েছি। দেখি না আসলেই তাই লেখা। আমার জানামতে সালোয়ার আর প্যালাজ্জো দুইটাই পায়জামা বা প্যান্ট জাতীয় পোশাক। কামিজ, কুর্তি, ফতুয়া, টপ ধরনের কিছুইনা। মানে অনন্যা সালোয়ার আর প্যালাজ্জো পরে শোভনের সাথে দেখা করতে গেছে! শেষ পর্বের পৃষ্ঠা ১৩৪ এ লিখেছেন "ডিপ ব্লু জিন্স আর কমলা রঙের লং কুর্তার মতো একটা সালোয়ার পড়ে আছে।" এই লাইনটা পড়েও আমি কিছুক্ষণ ভেবেছি। একই ভুল। জিন্স আর কুর্তা সালোয়ার! আমার জানা মতে এটাও প্যান্ট বা পায়জামা ধরনেরই পোশাক। লেখক হয়ত কামিজ, কুর্তি কে সালোয়ারের সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন। আশা করছি পরবর্তীতে তিনি এই বিষয়গুলোর দিক নজর দিবেন। এই কথাগুলো আমি লেখককে ছোট করতে বা হাস্যরস করতে বলিনি। একজন ক্ষুদ্র পাঠিকা হিসেবে নিতান্তই আমার কাছে দৃষ্টিকটু লেগেছে বলে বলেছি। লেখককে আঘাত করে থাকলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
Nothing is more creative nor destructive than a brilliant mind with a purpose - Inferno (Dan Brown)
🧩ফ্ল্যাপ থেকে : পাঠক, দাবা খেলতে বসে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আপনি দেখলেন একে একে আপনার সব ঘুঁটি কাটা পড়েছে প্রতিপক্ষের হাতে। শুধু একটা ঘোড়া দিয়েই এখন বাজিমাত করতে হবে আপনাকে। পারবেন? সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গলের কথা মনে আছে আপনার? সেই সে শালবনের গভীর জঙ্গলে প্রেরণাকে নিয়ে লং ড্রাইভে গিয়েছিল ইফতেখার। ডা. জামান সারওয়ারকে মনে আছে আপনার? নৃশংসভাবে হত্যা করে ধানমন্ডি লেকে ফেলে রাখা হয়েছিল যার লাশ। ব্রিগেডিয়ার আকরাম খান, আফ্রিকার মাসাদিও হায়দারা, কিংবা রহস্যময় পিটার বুন। কী সম্পর্ক ছিল তাদের দুই হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা জেরুজালেমের মৃত প্রেতাত্মাদের সাথে? পাঠক যে রহস্যের শুরু হয়েছিল দুই হাজার বছর আগে জেরুজালেমে, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ঘুরে সে রহস্য আজ আপনার সামনে। তাহলে আর দেরি কেন? চলুন বের হয়ে পড়ি অন্ধকার জগতের গোপন অলিগলিতে, সে রহস্যের সমাধান করতে। দাবা খেলাটা এবার শেষ করতে হবে তো।
🧩 প্রারম্ভ : এখনো ঘোড়ার চাল বাকি ঠিক যেখানে শেষ হয় তার পরবর্তী অধ্যায় থেকেই এ বই শুরু। অধ্যায় উনপঞ্চাশ থেকে বই শুরু। প্রফেসর স্যামুয়েল জনসনের কাহিনী দিয়ে। আগের বইতে একের পর এক জট পাঁকানো হয়েছিল যা শেষে বিশাল এক ক্লিফহ্যাঙ্গার দিয়ে শেষ হয়। এ বইটা ঠিক তার পর থেকেই শুরু।
🧩স্টোরিটেলিং ও গল্প বুনন : লেখকের প্রথম বই ছিল এখনো ঘোড়ার চাল বাকি। প্রথম বইতে স্বভাবতই লেখায় একটু জড়তা থাকলেও এ বইতে লেখক বেশ ভালোভাবেই তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। লেখনী যথেষ্ট সাবলীল। প্রথম বইতে যেরকম একের পর এক জট পাঁকানো হয়েছিল এ বইয়ে খুব ধীরেসুস্থে সেগুলো খোলা হয়েছে। কোথাও তেমন কোনো তাড়াহুড়া নেই। প্রোটাগনিস্ট ইফতেখার আহমেদ এর চরিত্র আগের বইতেই যথেষ্ট সময় নিয়ে বিল্ড আপ করা হয়েছে তাই এ বইতে সেটার খুব একটা দরকার পড়েনি বললেই চলে। গল্প বলার ধরণ আগের মতই প্যারালাল টাইমলাইনে তবুও আগের টাতে খাপ খাইয়ে নিতে পারায় এখানেও তেমন কোনো সমস্যা হয় নি। লেখক একাধিক সাবপ্লট এগিয়ে নিয়ছেন। মোটা দাগে এস্পিওনাজ জনরায় ফেললেও ( বইয়ের ব্যাক কভারেও তাই লেখা) আমার মতে বইতে এস্পিওনাজ এলিমেন্ট তেমন ছিল না বললেই চলে। লেখক নিজেও বইটিকে ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস বলেছেন। তবে প্রেরণা চরিত্রটাকে আরো একটু সময় দেওয়া উচিৎ ছিল বলে মনে হল। পড়ার সময় বেশ কিছু ক্ষেত্রে আমার অন্যতম প্রিয় বই আই অ্যাম পিলগ্রিম এর কথা মনে পড়ল। অন্যদের কাছে কেমন মনে হবে আমার জানা নেই। ওভার অল লেখক বেশ সুন্দর একটা কাহিনী বলে গিয়েছেন।
🧩সমাপ্তি : লেখক আসলে ডুয়োলজি টা এমনভাবে করেছেন পরের এই বইটা সম্পর্কে বেশি কিছু লিখতে গেলেই আগের বইয়ের স্পয়লার হয়ে যাবে। সবগুলো কাহিনী একসাথে খুব সুন্দরভাবেই জোড়া লাগানো হয়েছে। এন্ডিংটা আমাকে যথেষ্ট তৃপ্তি দিয়েছে। অদ্ভুত বিষাদময় সুন্দর। ইফতেখার আহমেদ চরিত্রটা বেশ মনে রাখার মত একটা চরিত্রই মনে হয়েছে সবার শেষে।
🧩প্রচ্ছদ - প্রোডাকশন - সম্পাদনা : বইয়ের কাহিনীর সাথে মানানসই একখানা প্রচ্ছদ করেছেন সজল ব্রো। বইতে বানান ভুল খুব একটা চোখে পড়ে নাই। ছোটখাটো সেসব ধরার মত না। আর প্রোডাকশন নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নাই আসলে। ভূমির বই যারা পড়ে তারা খুব ভালো করেই জানে এর ব্যাপারে। তবে আমার মনে হয় বই দুইটা একসাথে একটা অখন্ড আকারে আনা যেতে পারে। (আমি প্রায় তিন বছরেরও বেশি সময় পরে রিভিউ লিখতেছি। বইটা অস্বাভাবিক ভালো লেগেছে তাই রিভিউ দেওয়া। আগে যখন লিখতাম তখন একটা বই শুধুমাত্র নিখাদ আনন্দ থেকে অনেক কষ্টের জমানো টাকা দিয়ে কিনতাম। ৭-৮ বন্ধুর হাত ঘুরে আসত আবার আমার হাতে। প্রোডাকশন নিয়ে খুব বেশি বলারও নেই আমার। এখনও নিখাদ ভালোলাগা থেকেই বই পড়ি। এ ব্যাপারে খুব বেশি ধারণাও নেই।)
🧩এক নজরে : এখনো ঘোড়ার চাল বাকি শেষ ভাগ - রিফাত হাসান প্রথম প্রকাশ - ২০২০ পৃষ্ঠা - ২২৪ প্রচ্ছদ - সজল চৌধুরী প্রকাশনী - ভূমিপ্রকাশ।
লেখকের প্রথম থ্রিলার উপন্যাস হিসেবে "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি" বইটা আমার পছন্দ হয়েছে। লেখকের পরের আরেকটা বই পড়েছি। বেশ ভালো লেখনী উনার।
সময়টা এখন এমন, যে থ্রিলার জনরাটা অনেকের কাছেই খুব পছন্দের। (আমার কাছে তো অনেক বেশি প্রিয়)। আর তাই পাঠক হিসেবে নতুন ধরনের থ্রিলার বই পড়তে বেশ ভালো লাগে।
একজন পাঠক হিসেবে বই পড়ে সমালোচনা করাটা হয়তোবা সহজ, কিন্তু একটা পরিপূর্ণ বই লিখতে পারা, কোনো প্লটহোল না রেখে একটা গল্প বলতে পারা কিন্তু খুব কঠিন। লেখক সেই কাজটা এই বইতে করতে পেরেছেন।
এই বইটার প্রথম পার্ট টা পড়ার পর থেকেই দ্বিতীয় পার্ট পড়ার আগ্রহ কাজ করেছে। লেখক সফল, এই আগ্রহ তিনি পাঠকের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন। বইটা নিঃসন্দেহে ভালো বইগুলির মধ্যে একটি।
কিন্তু তারপরও আমার রেটিং ৩ কেন? এর কারণ এই পার্টটা আমার কাছে খুবই দুর্বল লেগেছে। বিশেষ করে ফিনিশিং এর সময়, আমার মনে হয়েছে লেখক খুব তাড়াহুড়ো করেছেন। এত তাড়াহুড়ো করার দরকার ছিল না মনে হয়। প্রথম বই পড়ে যেমন একটা দারুন থ্রিলারের আশা করেছিলাম, এই বইটা পড়তে যেয়ে কেন জানি মিইয়ে গেছে সেটা। আরো রগরগে কোনো সমাপ্তির প্রত্যাশা ছিল।
কিন্তু সবকিছু প্রত্যাশা মত হয় না। লেখকের বই পরপর পড়ে মনে হচ্ছে, উনি আমাদের বেশ ভালো কিছু থ্রিলার বই উপহার দিবেন। লেখনী খুবই সাবলীল, সুন্দর, পরিমার্জিত। কোথাও অতিরঞ্জন কিছু নেই, অতিরিক্ত কিছু নেই। প্রথম বই হিসেবে বেশ ভালো।
লেখকের জন্য শুভকামনা, আরো নতুন বইয়ের অপেক্ষায় থাকলাম।
যে রহস্য প্রথম ভাগে অমীমাংসিত ছিল, সেটাই সুন্দরভাবে একটা সমাপ্তি পেল। ছোট ছোট চরিত্র এবং প্লটগুলোর বিল্ডাপ ছিল সহজ কথায় সুন্দর। তবে, শেষের দিক কিছু কিছু প্লট টুইস্ট ছিল সহজ অনুমেয় এবং কিছু ছিল অতিকাল্পনিক। তবে প্রথম বইটার শুরুতে লেখকের যে লেখনীর অলঙ্কার তা শেষ ভাগের শুরুর দিকে ছিল না। কিন্তু বইয়ের মাঝখান থেকে মনে হয়েছে অতিরিক্ত সময় দিয়েছেন। বইয়ের মূল চরিত্র কিছুটা মাসুদ রানা ভাইব দিয়েছে। বইয়ের কিছু কিছু জায়গায় শব্দ বিভ্রাট ছিল। তবে তা মোটেও বেশি কিছু নয়। কিছু কিছু জায়গায় ইফতেখারের সাথে সাথে ঠিকই সমাধান বের হয়ে এলেও শেষের দিকে ভালোই খেলা দেখিয়েছেন। দাবার চাল পালটে পালটে যাওয়াটা দারুণ উপভোগ্য। মনে হচ্ছিল, এই চরিত্র পরের কোন বইয়ে চলমান থাকলে মন্দ হয় না। কিন্তু, সমাপ্তিটা সুন্দর হওয়ায় এই বইয়েই স্থির থাকাটা বেশি যৌক্তিক আমার কাছে।
গতকাল প্রথম ভাগ শেষ করলাম। আজকে যেহেতু পানিশমেন্ট আবার সকাল ৮ টা থেকে শুরু হইল, আগে থেকে প্রিপারেশন নিয়াই গেছিলাম। বই খুলে উৎসর্গপত্র টা দেখে পারসোনালি আমার বিশাল ভালো লাগছে। মনে হল, আমিও যদি লেখক হইতাম, প্রত্যেকটা বইয়ে এরকম একটা উৎসর্গ লেখতাম। যাইহোক, প্রথম বারের সাসপেন্স সবগুলা আস্তে আস্তে জট খোলা শুরু করার বদলে আরো জট পাকাইছে। কিন্তু নির্দিষ্ট বিরতিতে একেকটা রহস্যের উন্মোচন করার জন্যে আকর্ষণ ধরে রাখতে পারছেন ভাই। তবে যেহেতু উনি বলেই দিছেন, এইটা ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস(থ্রিলার), ইতিহাসের তথ্যগুলা বাইর করতে প্রচুর সময় লাগছে বুঝা যায়। উনার অনেক খাটা লাগছে এইটা লেখতে। এন্ডিং টা ভালো ছিল। পরের বার বাতিঘর গিয়ে আপনার আরেকটা নতুন বই কেনার আশা রাখি। আজকের মত পানিশমেন্ট শ্যাষ, বইও শ্যাষ
ঘোড়ার চাল যে সত্যিই বাকি ছিল তা যেন লেখক আক্ষরিক অর্থেই প্রমান করে ছেড়েছেন বইটির দ্বিতীয় ভাগে। তবে প্রথাগত যে প্রোটাগনিস্টের বিজয় দেখানো হয় সর্বক্ষেত্রে, এই বইটা সেভাবে আগায়নি, এ যেন অনেকটা নিয়তির হাত ধরে প্রোটাগনিস্টের এগিয়ে চলা। দারুন লেগেছে।
ওহ! এই যে প্রফেসর সাহেব! যত চরিত্র তাদের প্যারালাল কাহিনী, সবকিছু মনে রাখা এবং একই সুতোয় গাঁথা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় কাজ। লেখক সব সুতোই মিলিয়েছেন দক্ষতার সাথে। প্রথম খণ্ডের যেসব আক্ষেপ ছিলো সবই মিটেছে বলা চলে। কিন্তু তারপরেও কী যেন একটা খাপছাড়া রয়ে গেলো বোঝা যাচ্ছে না।
এখানে ঘোড়ার চাল বাকি প্রথম ভাগ পড়ে কেমন খাপছাড়া লাগছিলো।অনেক গুলো রহস্যের উত্তর রেখে দিয়েছেন লেখক।আশাহত হয়ে শেষ ভাগ শুরু করলে আস্তে আস্তে লেখক সকল রহস্যের উত্তর দিয়েছেন। সবমিলিয়ে দুইটা বই পরলে পাঠক ভালো একটা গল্প উপভোগ করবে
জঘন্য। টাকা নষ্ট। ধার করা হুমায়ুন আহমেদ। ভাই, সস্তা খ্যাতির জন্য নিজের স্বকীয়তা বিকোতে মানুষের বাজে না কেনো? হুদাই দুই তিনটা আলাপ টেনে ঐতিহাসিক উপন্যাস!? 😆😆😆 ফাজলামির চূড়ান্ত।
"ওস্তাদের মাইর শেষ রাতে" এই উক্তির সমার্থক বাগধারাই "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি"।
নামের সাথে লেখায় কাজেরও মিল রেখেছেন লেখক সাহেব। অর্থাৎ ঘোড়ার শেষ চালে বাজিমাতের মতো রহস্য উদঘাটনও করেছেন উপন্যাসের শেষেই। আর এই একটা জায়গাতেই লেখক সাহেব বইটার প্রতি অবিচার করেছেন।
• প্রথম ভাগের সকল প্রশ্নের উত্তর ধারাবাহিকভাবেই শেষ ভাগে দেয়ার কথা ছিলো। কিছু কিছু উত্তর লেখক দিয়েছেনও। আবার হাজার বছর আগের 'জেরুজালেমের সেকেন্ড টেম্পল', বিংশ শতাব্দীর স্যামুয়েল জনসন, আর বর্তমানের পিটার বুন, এদের সকলের বিস্তর বর্ণনাও উঠে এসেছে উপন্যাসে। তবে এগুলোর মাঝের সম্পর্কটা শেষের দিকেই টেনে নেয়া হয়েছে। যার ফলে উপন্যাসের শেষ অংশ ছিলো বেশি জটলা পাকানো এবং মাঝের অংশ একঘেয়ে হয়ে এসেছে।
• 'এখনো ঘোড়ার চাল বাকি প্রথম পর্বে' অধিক শব্দে অল্প কাহিনীর বিস্তর বর্ণনা পেলেও, এই বইয়ে অল্প শব্দে অধিক কাহিনীর বর্ণনা করেছেন লেখক। তদন্তের বেশকিছু অংশে ভাগ্য যেনো বেশিই সহায় হয়েছে ইফতেখারের, সহজেই হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছে অনেক কিছু। এ বিষয়গুলো কিছুটা চটজলদি অবস্থা তৈরি করেছে উপন্যাসে । সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাওয়ায় লেখকের এ তাড়া লেখার মানেও প্রভাব ফেলেছে।
• কিছু প্লটহোল নজরে এসেছিলো, যার কয়েকটা খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না পড়লে নজরে আসার মতো না, আর কয়েকটা প্লটহোল লেখক সমাপ্তির দিকে স���লভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তবে, একটা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন না করলেই নয়, ইফতেখারের মতো বিচক্ষণ স্পাই প্রেরণার বিষয়টা খতিয়ে দেখেনি? তাও একবার নয়, দুই দুইবার সে উদাসীন ছিলো বিষয়টার প্রতি। যেখানে প্রেরণা তার ভালোবাসার মানুষ, সেখানে তার উচিত ছিলো আরো বেশি বুদ্ধিমত্তা খরচ করা।
• ব্যাক্তিগত অনুভূতি থেকেই বলছি, বইটা দুই খন্ডে না রেখে, তিন খন্ডে হলেই ভালো হতো। লেখক এতে করে জেরুজালেম ও স্যামুয়েল জনসনের কাহিনীর আরো বিস্তর বর্ণনা দিতে পারতেন, লেখার মানও আরো ভালো হতো।
সব মিলিয়ে বইটাকে মন্দ বলা যায় না, বরং স্পাই থ্রিলার ও ঐতিহাসিক রেফারেন্স যুক্ত উপন্যাস হিসেবে বেশ ভালো। 'প্রথম পর্বে'র টানটান উত্তেজনার পর 'শেষ ভাগ' উপভোগ করতে পাঠককে রাখতে হবে কিঞ্চিৎ ধৈর্য্য। সমাপ্তির পরিশিষ্ট অংশে কারো জীবনের পরিণতি পাঠকের মনে জন্ম দেবে সুখকর অনুভূতির, আবার কারো পরিণতিতে বুকে হবে চিন চিন ব্যাথা।