ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া।" যাঁরা ইতিমধ্যেই কালীগুণীনের আগের বইটি, অর্থাৎ "কালীগুণীন ও ছয় রহস্য" পড়েছেন, তাঁদের কাছে উপরের এই আত্মপরিচয় দানটুকু মনের মধ্যে একরাশ বল ভরসা এবং আস্থা নিয়ে আবির্ভূত হয়। বিপদের যম, প্রেতযোনীর সাক্ষাৎ শমন, ধুরন্ধর কালীপদ মুখুজ্জে যখন এসে পড়েছেন তখন কিসের ভয়? কিসের বিপদ? গুণীনের চরিত্র বাঙলার সাহিত্যজগতে নেহাত কম নেই কিন্তু একজন নামজাদা বনেদি জমিদার হয়েও প্রসিদ্ধ তান্ত্রিক হয়ে ওঠার রোমহর্ষক ঘটনা হয়তো এই প্রথম। কালীপদর তন্ত্রশিক্ষা হয় একজন অসামান্য অঘোরীর হাতে, ফলতঃ তাঁর বিশাল হৃদয়ে জাতপাত বা ধর্মীয় ভেদাভেদের মতো তুচ্ছ মনোভাব বিন্দুমাত্র স্থান পায়নি কখনো। এই বইয়ের ছত্রে ছত্রে ওৎ পেতে রয়েছে মৃত্যুর কুটিল ফাঁদ, কালো অপশক্তির হিংস্র নখ আর জীবনীশক্তিকে তছনছ করে দেওয়া ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রের ছোবল, কিন্তু ভয় কি? কালীগুণীন আছেন তো। জীবন যখন কুটিল প্রেতাত্মার সুচতুর ফাঁদের কাছে আত্মসমর্পণ করে অসহায় ভাবে মরণের সময় গোণে, ঠিক তখনই নিজের ধুরন্ধর বুদ্ধি এবং অসামান্য সাহস নিয়ে, নিজের বলিষ্ঠ দুই হাতে আর্ত কে আড়াল করে দাঁড়ান এক ডাকসাইটে গুণীন আর শোনা যায় সেই বহু প্রতীক্ষিত পরিচয়দান--"ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া।"
হাসবেন না। একদম হাসবেন না। লোকে ভাবে আমার বুঝি কালীপদ মুখুজ্জের সাথে পুরোনো কোনো শত্তুরতা রয়েছে। বা সৌমিক দের পৃথিবীর প্রতি কোনোরূপ বিশ্রী বিরূপতা। সেরম যে আদতে কিছু নাই, সেই কথা কাউকে বিশ্বাস করানো দায়। আপনি বলবেন, ভুলভাল (সত্যজিৎ বিরচিত) লিমেরিক দিয়ে রিভিউ করছেন, এক-দুই তারকা রেটিং দিচ্ছেন। এখন আবার পালটি খাচ্ছেন। আপনি তো মশাই হাড় বজ্জাত মানুষ!
কথাটা কিছুটা হলেও সত্য। তবে পাঁকে ফোঁটা পদ্মকুঁড়ি ন্যায়, অসত্যের মাঝেই সত্যের নিবাস। বিদ্বেষ পুষে রাখলে, গাঁটের পয়সা খরচ করে, বারংবার এই জিনিস পড়তুম না। পড়ি, কারণ লেখক আর যাই করুন, দেশজ উপাদানে, গ্রাম্য মনোভাবটুকু ধরতে জানেন। বাংলার আচার, আচরণ, বিশ্বাস, অবিশ্বাস। খাঁটি গদ্য ও দ্রুত লয়ে, পড়তে সবটাই ভালো লাগে। সিরিজের দ্বিতীয় বই হওয়ার দরুন, লেখনীতে পরিপাকের ছাপ বিদ্যমান। এটাও অদেখা করা যায় না একেবারে।
তবে, মুশকিল অন্যখানে। শেষবার যখন কালীগুনীন পড়ি। বিরক্তিতে রিভিউ লেখার ইচ্ছা হয়নি আর। কেবল ইংরেজিতে একটা শব্দ ব্যবহার করেই ইতি টানি। রিপিটেটিভ। লেখকের খাড়া বড়ি থোর। পুনরাবৃত্তির বিশ্রী প্রবণতা। 'কিস্তিমাত' জুড়ে পাঁচটি গল্প। এবং দুঃখের কথা, প্রথম তিনটে কাহিনীতেও সেই একই জিনিস। সেই একই ঘটনাক্রম, আবার! আর কতো? অভিশাপগ্রস্ত কোনো গাঁ বা পরিবার, তান্ত্রিক কি রাক্ষসের ভয়ানক তান্ডবনৃত্য, নৃশংস রক্তাক্ত মৃত্যু, কালীপদর লেট এন্ট্রি, "বন্ড জেমস্ বন্ড", ছলনা/ইতি গজ, তন্ত্র-মন্ত্র ম্যাডনেস্, সমাপ্তি। ছকে বাঁধা সার্কাস যেন।
ফেসবুকে যারা কালীকে তারানাথের উত্তরসুরী হিসেবে প্রতিনিয়ত সিংহাসনে বসান, তাদের প্রতি বাণ-টাণ নিক্ষেপ করতে মন চায় আরকি। তবে, আমার বিশ্বাস, লেখক নিজেও এসব বাজে তুলনার ধার ধারেন না। কারণ, এই গল্পগুলিতে তান্ত্রিক কাহিনীর উপাদান ঠুসে মজুদ হলেও, উৎকৃষ্ট হররের গুণাবলী নেই বললেই চলে। ভয় দেখানোর অতি উদগ্রীবতা হেতু, কার্টুন-মাফিক সব খলচরিত্র এবং উগ্র রাক্ষুসে উষ্টুম-ধুষ্টুমের সাহায্য নিয়ে হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছে যান লেখক। এ জিনিসকে হরর না বলে, কোনও হালকা চালের, পিরিয়ড পিস/পৌরাণিক ফ্যান্টাসি হিসেবে ক্লাসিফাই করলেও করা যেতে পারে।
তবে, সবই যে খারাপ, তেমনটা নয় কিন্তু। বইয়ের চতুর্থ গপ্পো, 'পিশাচের নখ'। শুরু হয় চমৎকার ভাবে। লেখক ছক ভাঙেন। দেন কথক ও কালীগুনীনের বন্ধুত্ত্ব ও বাৎসল্যের মনোরম নিদর্শন। পাঠকের কৌতূহল পকেটস্থ করে, প্রায় অভিযানমূলক ভাবে গল্প নিয়ে যান সুন্দরবনের এক ভয়াল দ্বীপে। এবং...এখানেই টাইটানিক ন্যায় ডুবে যায় তরী। অতি-প্রলম্বিত ন্যারেটিভে, কষ্টকল্পিত রেজোলিউশনে শিকার কাহিনী। সাধারণ তান্ত্রিক থেকে কালীপদ হয়ে ওঠেন সাক্ষাৎ হাতিম-তাই!
আপনি বলতেই পারেন, তাহলে, দুই তারা হোয়াই? শূন্য রানে চার উইকেট হারিয়ে, অবস্থা কাহিল হওয়ার কথা। তবে, কেন ক্রিজ আঁকড়ে পড়ে থাকা? ঠিক এখানেই, লেখক ম্যাচ বাঁচানোর তাগিদে শেষ একটা ইনিংস খেলেছেন। এমন এক ইনিংস যা প্রায় একা হাতে বইটির রেটিং দুই কি আড়াইয়ে টেনে এনেছে। ধন্যি, রায়দীঘড়ার অকাল্ট গোয়েন্দা! ইনিংসের নাম, 'কালীগুনীন এবং পঞ্চবান রহস্য'। বইয়ের শেষ ও বৃহত্তম কাহিনী। প্রায় ৯০ পাতার, ছোটখাট উপন্যাস সমান।
ভালোভাবে, ছক-ভেঙে, পর্যাপ্ত ভাবনাচিন্তার সাহায্যে লিখলে যে এই সিরিজের কাহিনী আসলে কতটা উপাদেয় হয়ে উঠতে পারে, সেই সম্ভাবনার চূড়ান্ত নিদর্শন। শেষ রাতে নিয়ে বসলে, এই জিনিসে যে গা-ছমছম করবে না, সেটা বলা দায়। তাই আর কোনো গল্প না পড়লেও, পঞ্চবানে একটিবার বিদ্ধ হতেই পারেন। কেবল আক্ষেপ, এই একটি ভালো গল্প পেতে, আমায় দশটি বাজে গল্প পেরিয়ে আসতে হলো। যা প্রায় কংক্রিটের সমুদ্রে সাঁতরানোর সমান। কি আর বলি...
কালীপদ মুখুজ্জে'র সঙ্গে পরিচিত নন— এমন মানুষ বোধহয় ফেমাজে পাওয়া যাবে না। 'ভূতভুতুম' গ্রুপের গণ্ডি পেরিয়ে চরিত্রটি বঙ্গভূমির এই ভূত, প্রেত ও পিশাচ অধ্যুষিত আঙিনায় নিজের জন্য একটি মজবুত জায়গা বানিয়ে নিয়েছেন। তাঁর পাঁচটি কাহিনি এই বইয়ে সংকলিত হয়েছে। সেগুলো হল~ ১. কালীগুণিন এবং দানবের মণি ২. কালীগুণিন আর করালদ্রংষ্টা রহস্য ৩. কালীগুণিন এবং ভস্মাসুরের শাপ ৪. কালীগুণিন এবং পিশাচের নখ ৫. কালীগুণিন এবং পঞ্চবান রহস্য এই ধরনের বই উপভোগ করতে হলে যে উইলফুল সাসপেনশন অফ ডিসবেলিফ প্রয়োজন, তা যথাবিধি অবলম্বন করেছিলাম। কিন্তু ইতিহাস, ভূগোল, পুরাণ, ধর্মাচার ইত্যাদি কচুকাটা করার পর যখন দেখলাম লেখক ভয়ালরসকে ক্রমেই (অনিচ্ছাসত্ত্বেও) হাস্যরসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, তখন আর পারা গেল না। তবে হ্যাঁ, বইখানা আমাকে শেষ করতে লেখক বাধ্য করেছেন— এও স্বীকার্য। যাঁরা এগুলো পড়েন, তাঁরা পড়বেনই। তাই আমার বলায় তাঁদের কিছু যায় আসে না। যাঁরা এ-সব পড়েন না, তাঁরাও আমার এই প্রতিক্রিয়ার ঊর্ধ্বে। তবে আমি আর এ-জিনিস পড়ব না। অনেক হয়েছে!
কালীগুণীন ফ্রম সুন্দরবন রায়দীঘড়া ইজ ব্যাক এগেইন উইথ সাম ইউনিক তন্ত্রমন্ত্র এবং পিশাচ কিলিং ভেরিয়াস স্ট্রাটেজি । কালীগুণীন প্রথম পত্র পড়ার পর অনেক বিরক্ত হয়ে এক বছর কোন প্রকার তন্ত্রমন্ত্রের আর ভূত তাড়ানোর বইয়ের ধারেকাছে যাই নাই । দ্বিতীয় পত্র বের হইলে আমি ভাবলাম প্রথমবার যেসব ত্রুটি বিচ্যুতি হয়েছিলো এইবার তা সংশোধন হলেও হতে পারে আর তাছাড়া কালীগুণীন জনে জনে উপকার করা ব্যক্তি; সে একটা দ্বিতীয় সুযোগ আমার মতো লোকের কাছ থেকে প্রত্যাশা করতেই পারে । নাটকীয় ভাবে ঘটনাস্থলে দুম করে আবির্ভূত হয়ে আইডেন্টি প্রকাশ ভিন্ন তার তেমন কোন বদ অভ্যাস নাই । আর এ জন্য এমনিতেই তান্ত্রিককূলের মধ্যে কালীপদ মুখুজ্জে সম্প্রতি অনেক খ্যাতি অর্জন করেছেন । এরপর শার্লকীয়া ইস্টাইলে ভিক্টিম কিভাবে অতৃপ্ত পিশাচ কিংবা কাপালিক দ্বারা নিপীড়িত হচ্ছেন তা বের করেন এবং সব শেষে নিজের জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন সেই পাষণ্ড , অর্বাচীন , হৃদয়হীন , অপরিপক্ক কাপালিক এবং প্রেতদের উপর । সুতরাং সব কিছু মাথায় রেখে আমি PDF টি সংগ্রহ করি আর মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দেই যে এইবার বাই চান্স লোকসান হলেও অর্থের লোকসান হবে না , সময়ের হবে । কিন্তু সময়ের মূল্যও কোন অংশে কম না , তাই আমি যে সময়টা ঘুমিয়ে নষ্ট করি ঐ সময়টাতে পড়ছি । বিশ্বাস করেন কোন রিস্ক নেই নাই । তো হ্যাঁ এই পর্বেও আগের বারের মত ভদ্রলোকের নাটকীয় এন্ট্রি আছে । ভাগ্য সহায় যে কালীগুণীন কোনদিন চাকুরীর পরীক্ষা দেয় নাই ।উনি যেইভাবে নিজের নাম ঠিকানা ঘোষণা করেন সেইভাবে যদি ভাইভা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সামনে গিয়ে�� পরিচয় দিতেন তাইলে প্রশ্নকর্তাদের চেহারা কেমন হতো , একবার কল্পনা করে দেখেন ! কালীগুণীন কিস্তিমাতে মোট পাঁচ টা গল্প আছে । সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গল্প গুলোতে কাপালিক এবং ভূত প্রেতের হতাহতের সংখ্যা খারাপ না । তাছাড়া এবার কালীগুণীন গল্পের মধ্যে শুধু জাগতিক উপকার ই না বরঞ্চ ঐশ্বরিক উপকার ও করেছেন । ‘’বিশ্বকর্মা’’ কে এক হতভাগা কাপালিক মন্ত্রবলে বন্দী করে রেখেছিল ,কালীগুণীন সময়মতো ক্রাইম সিনে উপস্থিত হয়ে তাকে মুক্ত করেন ( কি দুঃসাহসিক ব্যাপার স্যাপার! ) যত যাই হোক কালীগুণীন এইবার আগের বারের চেয়ে সামান্য উন্নত মনে হলো আমার । আগের কাঁচা হাতের লেখাটা একটু হলেও পাকা করার চেষ্টা করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসা করার মতো নয় কিন্তু ‘’ঠিক আছে’’ তো বলাই যায় । আর কিছুই বলবো না।প্রচ্ছদ আগের মতোই হাস্যকর । শুধুমাত্র মাঝেমধ্যে ভূত প্রেত পিশাচ সাধনা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দেওয়ার জন্য এক তারকা দিলুম । গুরত্বপূর্ণ সিরিয়াস লেভেলের সতর্কীকরণ - গল্পে কালীগুণীন যখন পরিচয় দিবেন তখন কোন কারণ ছাড়াই পাঠক কানে বজ্রপাত আর শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দ শুনতে পারেন । দয়া করে বিচলিত হবেন না । এটা কালীগুণীন স্পেশাল থিম ।
এই সিরিজের প্রথম বইটা পড়ে যতটা ভালো লেগেছিল ২য় খন্ড ততটাই বিরক্তিকর ছিল। এই গল্পের সব কাহিনী পৌরাণিক চরিত্রদের নিয়ে যার বর্ননা ও ব্যাখ্যা অস্পষ্ট, দুর্বোধ্য এবং অনাগ্রহ সৃষ্টিকারী। সর্বোপরি বইটা আশাহত করেছে।
যারা এর আগের সিরিজটি পড়েছেন তাদের কাছে রায়দীঘড়া নিবাসী কালীপদ মুখুজ্জে তথা কালীগুনীন অতিপরিচিত জনপ্রিয় চরিত্র।এই বইটিতেও কালীগুনীন চরিত্রের কোনো হানি ঘটেনি, এখানেও সে পাঠককে মুগ্ধ করে।তবে আগের সিরিজের গল্প গুলো পড়ে আমার যতটা ভালো লেগেছিলো,এই সিরিজটা সেভাবে মন ছুঁতে পারেনি।এখানে ৩টি ছোটো গল্প ও দুটি বড়ো গল্প আছে - ক) কালীগুনীন ও দানবের মণি _(৩/৫⭐) খ)কালীগুনীন ও করালদ্রংস্ট্রা রহস্য (২/৫⭐) গ)কালীগুনীন ও ভস্মাসুরের শাপ (৩/৫⭐) ঘ)কালীগুনীন ও পিশাচের নখ_(১/৫⭐) ঙ)কালীগুনীন ও পঞ্চবান রহস্য (২/৫⭐)
এই পাঁচটি গল্পের কমন বিষয় হলো প্রতিটি গল্পেই এসেছে পুরাণে উল্লিখিত কোনো না কোনো দানব শক্তি। লেখকের গল্পের নাম নির্বাচনের সময় আরও একটু সময় নিয়ে ভাবা উচিত ছিল। অতিরিক্ত বর্ণনায় গল্পের গতিবেগে বাধা সৃষ্টি হয়েছে তাই গল্পগুলো পড়তেও একটু বেশিই সময় গেছে,বারবার ধৈয্যচ্যুতি ঘটেছে,দু একটি গল্প পড়ে বিরক্তিতে হাঁসফাঁস করে উঠেছি, আর শিহরিত হইনি এতটুকুও। সত্যি বলতে এই বইতে যে গল্পগুলো যোগ করা হয়েছে এই টাইপের গল্প ২৫ বছর আগে লেখা হলে ভালো চলতো,কিন্তু এখন এসব চলে না।
কালীগুণীন ও ছয় রহস্য পড়ে যতটা মুগ্ধ হয়েছিলাম, এই পর্বে সেই মুগ্ধতা অনেকটাই কেটে গেছে। প্রথম তিন গল্পে কারনে অকারনে প্রচুর মিথ টানা হয়েছে, আজগুবি সব ঘটনা দুর্ঘটনা, মৃত্যু ঘটেছে। প্রচুর অসুর, রাক্ষস খোক্কস, ভিলেন তান্ত্রিক আনা হয়েছে। একটা সময় মনে হচ্ছিলো যেন ঠাকুরমার ঝুলি আর আলিফ লায়লার ককটেল তান্ত্রিক ভার্সন পড়ছি! আর একেক গল্পে কালীগুণীনের নাটকীয় প্রবেশ আরো বিরক্তিকর।
এই সংকলনে দুইটা গল্পই মন টেনেছে। ফ্যান্টাসি গল্প হিসাবে কালীগুণীন ও পিশাচের নখ ভালো ছিল। আর তন্ত্রমন্ত্র, মিথ, হরর মিলিয়ে সার্বিক দিক দিয়ে কালীগুণীন ও পঞ্চবাণ রহস্য আমার সবচাইতে ভালো লেগেছে। শুধু এই দুইটা রহস্যের জন্য দুই তারা বরাদ্দ রইলো।
সৌমিক দে-র কালীগুনীনের গল্পের একটা প্যাটার্ন আছে — কোনো এক জায়গায় ঘটনা শুরু হয়। গ্রামবাসীর কোনো অশুভ শক্তির কবলে পড়ে বিপর্যস্ত অবস্থা, ঠিক তখন কোথাও হতে হাজির হন কালীগুণীন। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। বাস রায়দীঘড়া। কালীগুণীনের কিস্তিমাত বইটির প্রথম তিনটি গল্পও এই ধাঁচের। কিছুটা একঘেঁয়ে, তবে সব মিলিয়ে বেশ ভালো। কিন্তু শেষ দুটি গল্পের কথা বিশেষ করেই বলতে হয়। এই গল্প দুটি বেশ বড়, নভেলা বলাই চলে। গল্প দুটির শুরু হয়েছে ভিন্নভাবে – চমৎকার বিল্ড-আপ যাকে বলে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়েছে রহস্য সমাধানের পথে। তবে শেষের গল্প দুটিতে কালীগুণীনের বুদ্ধিমত্তার ছাপ অন্যান্য গল্পগুলোর হিসেবের তুলনায় কিছুটা কমতি মনে হয়েছে। গল্পগুলো ভালো ছিল, কিন্তু 'কালীগুণীন' বলতে যে ব্যাপারটা সেটাতে ধার কম লেগেছে।
⭐কালীগুণীন এবং দানবের মণি : এক পৌরাণিক দিব্যবস্তু , যাকে যুগ যুগ ধরে মানবসভ্যতা অলীক বলে ভেবে এসেছে । অথচ যার সন্ধানে আদিকাল থেকেই মুনি - ঋষি , দেব , দানব ও মানুষেরা ঘুরে বেরিয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে । কালীগুণীন কি পারবে সেই পৌরাণিক রহস্য উদ্ধার করতে ?
⭐কালীগুণীন এবং করালসংটা রহস্য : - পুরাণে যে মহা মারণাস্ত্রের নাম শোনা মাত্র দেবতা , দানব , যক্ষ , রক্ষ , পিশাচ , দৈত্য সকলে কাঁপতে কাপতে হাত জোড় করে বসে পড়ে , সেই মহামারী অস্ত্রের একটা অংশ হঠাৎ মানবসভ্যতায় উন্মুক্ত হয়ে পড়ল এক পুরাতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে । আরম্ভ হল নরমেধের পালা । তারপর ?
⭐কালীগুণীন এবং ভস্মাসুরের শাপ : - এক প্রলয়ংকরী মহাবিদ্যা ' বজ্রসম্ভব ' - এর সন্ধান পেয়ে কাপালিক চন্ড হয়ে উঠল অপরাজেয় । তার গুরুর আশীর্বাদ , অপরের হাতে কখনও মরবে না সে । কালীগুণীন কি পারবে সেই অদম্য শক্তির আধার চন্ডকে পরাস্ত করতে ।
⭐ কালীগুণীন এবং পিশাচের নখ : - আচ্ছা ঘড়ি জিনিসটা কতটা আধুনিক আবিষ্কার বলে মনে হয় । এক অভিশপ্ত দ্বীপে মহৌষধি জড়িবুটির সন্ধানে নৌকো ভাসিয়েছিলেন এক নামজাদা কবিরাজ । সেই দ্বীপে নাকি অজস্র শয়তানের দল নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে রয়েছে । তারপর ?
⭐কালীগুণীন এবং পঞ্চবাণ রহস্য : - এক ধূর্ত তান্ত্রিকের অভিনব মারণ কৌশল এবং অনন্তর পরিবারকে রক্ষা করতে কালীগুণীনের অমোঘ কূটবুদ্ধির লড়াই কি শেষ অবধি পারবে পঞ্চবাণের আশ্চর্য রহস্য ভেদ করতে ? যখন অপশক্তির হাতে জীবনীশক্তি পরাস্ত হতে আরম্ভ করে ... অশরীরী অপদেবতার হিংস্র থাবা গ্রাস করতে থাকে গ্রাম - তালুক - শহর ... অপারগ মানুষ অসহায়ভাবে অপেক্ষা করতে থাকে মৃত্যুর ... ঠিক তখনই আবির্ভূত হন ... পিশাচের যম ... অপশক্তির সাক্ষাৎ শমন ... এক ব্রাহ্মণ ... নাম কালীপদ মুখুজ্জে ... নিবাস রায়দীঘড়া ।
"ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখূজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া।"
বিপদের মুখে ভরসার বাক্য হয়ে উঠে কালীগুণীনের মুখের এ কটা লাইন। কালীগুণীনের সাথে প্রথম পরিচয় হয় 'চিরকুট' থেকে প্রকাশিত প্রথম বইটার মাধ্যমে। তারই ধারাবাহিকতায় লেখক দ্বিতীয় বইএ আবারও আবির্ভাব ঘটিয়েছেন কালীগুণীনকে। এবারের প্রতিটি গল্পই উঠে এসেছে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনির উপর ভিত্তি করে। বইয়ে স্থান পেয়েছে মোট পাচঁটা গল্প।
📝 কালীগুণীন এবং দানবের মণি 📝 কালীগুণীন এবং করাল দংস্ট্রা রহস্য 📝 কালীগুণীন এবং ভস্মাসুরের শাপ 📝 কালীগুণীন এবং পিশাচের নক 📝 কালীগুণীন এবং পঞ্চবান রহস্য
কালীগুণীন সিরিজের প্রথম বই পড়ে ঠিক যেমনটা উপভোগ করেছিলাম, প্রথম বইয়ে কাহিনির যে পরিপক্বতা ছিলো আমার মনে হয়েছে এই বইয়ে এসে কাহিনি ঠিক ততটা পরিপক্কতা পায়নি। পৌরাণিক ভিত্তিক কাহিনি হিসেবে গল্প গুলো যে ভাবে লেখক শুরু করেছিলেন ঠিক সেইভাবে ক্লাইম্যাক্সে নাটকীয়তা আনতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছেন। অনেকটা 'গল্প যতটা গর্জেছে, ঠিক ততটা বর্ষায়নি।
আমার কেবল একটা গল্পই ভালো লেগেছে, সেই সাথে সম্পূর্ণ কাহিনি চমৎকার লেগেছে, তাহলো "কালীগুণীন এবং ভস্মাসুরের শাপ"। গল্পটা পড়ে চমৎকার লেগেছে, এই গল্পটি পড়ে সানডে সাসপেন্সেও অডিও বুক হিসেবে প্রচার করা হয়েছে তাও শুনেছি, উপভোগ্য গল্প ছিলো এটা।
এই লাইনটাই যথেষ্ট। কালিগুনিনের সাথে আমার পরিচয় বিভা ক্যাফে নামক অডিও স্টোরি চ্যানেল এ।
এই বইটি পড়ে একটু আশাহত হয়নি। তারানাথ তান্ত্রিকের পর কালিগুনিন এক বর্ণময় চরিত্র। অশুভ শক্তির সাথে তার প্রত্যহ লড়াই পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
এই বইয়ের ৪টি বড় গল্প আছে। প্রত্যেকটি নিজের জায়গায় সেরা। গল্পের উত্তেজনা একটুও কমার না। এই বইয়ের সেরা গল্প আমার মতে "কালিগুনীন ও পিশাচের নখ" আর "কালীগুনিন ও পঞ্চবান রহস্য"।
কালীগুনিনের সাথে আমার প্রথম পরিচয় এই বই এর হাত ধরেই। বইটি সম্পূর্ণ পরে একটাই প্রশ্ন জাগছে মনে - ১. সত্যি কি দরকার ছিল রেকটি তান্ত্রিকের বা গুনিনের ? না হলে কি হতো? কেবল তারানাথ তান্ত্রিক থাকলেই কি চলছিল না? ২. অকারণে কি এতো এক্সট্রাফিড জেক বলে দরকার ছিল? ৩. কেও ভগবান হতে পারেনা। গল্পের চরিত্র হোক কি বাস্তব জীবনে নিজের সীমা জানাটা খুব দরকার! নোট : লেখক এর কিছু কিছু বিষয় এর বর্ণনা আর পরিশ্রম এর জন্য একটি তারাই বরাদ্দ।
পড়তে ভালোই লেগেছে। একদিনে সমস্ত বইটি গড়গড় করে পড়ে ফেলেছি। কাহিনীগুলি রীতিমতো রিসার্চ করে লেখা বলেই মনে হয়েছে। ইতিপূর্বে কালিগুনীন এর প্রথম বই যারা পড়ে থাকবেন তাদেরও মন্দ লাগবে না।
না জমলো না। কল্পনা ভালো তবে সেটি অতি মাত্রায় প্রয়োগ করলে ফল আশানুরূপ হয়না সেটা বোঝা গেলো। শেষ গল্পটি বাদ দিয়ে কোন গল্পই ভালো লেগেছে বলা যায়না। গুনিন কে ভগবান করে দিলে মুশকিল।
❝ব্রাহ্মণ। কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া।❞ ― কালীগুণীন - ❝কালীগুণীনের কিস্তিমাত❞ - ❝কালীগুণীনের কিস্তিমাত❞ বইটি লেখক সৌমিক দে এর "কালীগুণীন" সিরিজের ২য় পর্ব। হিন্দু পুরাণ ভিত্তিক ৫টি অতিপ্রাকৃতিক গল্প নিয়ে কালীগুণীনের এই পর্বটি লেখা হয়েছে। বইটি বিভা পাবলিকেশন থেকে ২০২০ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। - কালীগুণীন এবং দানবের মণি:- সনাতন নামে এক লোক স্বভাবে ভবঘুরে হলেও মাটির মূর্তি গড়ায় বেশ নামডাক আছে তার। সেই সনাতনের হাতে হঠাৎ এসে পড়ে এক পৌরাণিক জিনিস। এর ফলে তার পেছনে লাগে এক কাপালিক। ঘটনাক্রমে কাহিনিতে কালীগুণীন জড়িয়ে যাওয়ার পরবর্তীতে কী হয় তা নিয়েই "কালীগুণীন এবং দানবের মণি" গল্পটি লেখা।
"কালীগুণীন এবং দানবের মণি" এই বইয়ের প্রথম গল্প হলেও খুবই গড়পরতা মানের মনে হলো এই গল্পটিকে। হিন্দু পুরাণ কিংবা সুপারন্যাচারাল কোন দিক থেকেই তেমন আগ্রহ জন্মাতে পারেনি এই গল্পটি। এক কথায় কোনরকমে চলে টাইপ গল্প বলা যায় একে। - কালীগুণীন এবং করালদংষ্ট্রা রহস্য:- এক পুরাতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে মহামারী এক অস্ত্রের একটা অংশ হাতে আসে বিক্রম কলু নামের এক লোকের কাছে। তার ফলে সেই লোকটি যেখানেই যায় সেখানেই হাজির হয় অদ্ভুতদর্শন এক প্রাণী আর চারিদিকে শুরু হয় নরহত্যা। ঘটনাক্রমে কালীগুণীন এই ব্যপারে জড়িয়ে যাওয়ার পরে কী হয় তা নিয়েই "কালীগুণীন এবং করালদংষ্ট্রা রহস্য" গল্পটির কাহিনি।
"কালীগুণীন এবং করালদংষ্ট্রা রহস্য" নামের এই গল্পের শুরুটা বেশ ভালোই ছিলো। গল্পে কালীগুণীন আর তার গুরুর ভেতরে ধাঁধার খেলাটা বেশ উপভোগ করেছি। তবে গল্পের শেষটা বেশ তাড়াহুড়ো করেই করা হয়েছে বলে মনে হলো। - কালীগুণীন এবং ভস্মাসুরের শাপ:- চন্ড নামের এক কাপালিক "বজ্রসম্ভব” নামে�� এক মহাবিদ্যার সন্ধান পাওয়ার পরে এক প্রকারের অপরাজেয় হয়ে উঠে। এক সময়ে তার রোষ পরে শীতলগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের উপরে। এখন কালীগুণীন চন্ড কাপালিকের হাত থেকে সেই পরিবারকে বাঁচাতে পারবে নাকি এই নিয়েই "কালীগুণীন এবং ভস্মাসুরের শাপ" গল্পটি লেখাটি।
"কালীগুণীন এবং ভস্মাসুরের শাপ" গল্পটি কালিগুণীন এর অন্যান্য গল্পের তুলনায় বেশ আগের সময়ের এক গল্প। এই গল্পটিতে কালীগুণীনের একটি ব্যক্তিগত ঘটনার কথা জানা যায়, তবে গল্পের ফিনিশিং একেবারে টিপিক্যাল লাগলো। সবমিলিয়ে আমার মতে কালীগুণীনের আরেকটি অ্যাভারেজ গল্প। - কালীগুণীন এবং পিশাচের নখ:- চড়ুইপোঁতা নামের এক গ্রামের পাশের দ্বীপে ভেষজ ওষুধের সন্ধানে পাড়ি জমায় মণি কবিরাজ নামের এক লোক। কিন্তু অনেক দিন পার হওয়ার পরেও তার খোঁজ পাওয়া না গেলে তার বড় ভাই রসময় কবিরাজ কালীগুণীনের কাছে আসেন তার খোঁজ পাওয়ার জন্য। এর ফলে কালীগুণীন ছোট এক দল নিয়ে চলেন সেই দ্বীপের সন্ধানে। এখন সেই দ্বীপে কী রহস্য লুকিয়ে রয়েছে তা নিয়েই "কালীগুণীন এবং পিশাচের নখ" গল্পটি লেখা।
"কালীগুণীন এবং পিশাচের নখ" গল্পটি এই সংকলনের সবথেকে দারুণ গল্প মনে হলো। হিন্দু পুরাণের সাথে ভয়াল রসের চমৎকার মিশ্রণ এটিকে অন্য গল্পের থেকে আলাদা করে তুলেছে। সাথে সেই দ্বীপ এবং এর অভিবাসীদের রহস্যের ব্যপারগুলোও ইউনিক লেগেছে। এই গল্পের শেষটাও বেশ তৃপ্তিদায়ক লাগলো, এই ধরনের গল্পই আসলে পাঠক হিসেবে আমি আশা করি কালীগুণীন সিরিজ থেকে। - কালীগুণীন ও পঞ্চবাণ রহস্য:- অনন্ত সিংহ, তার বংশের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের কাছ থেকে একটি বিগ্রহ নিয়ে আসে। কিন্তু তারপর থেকেই এক আশ্চর্য উপায়ে মারা যেতে থাকে তার পরিবারের একের পর এক সদস্য। এখন অনন্তের পরিবারের সবাই মারা যাওয়ার আগেই কালীগুণীন এই মৃত্যুগুলোর রহস্যভেদ করতে পারে নাকী তা নিয়েই "কালীগুণীন ও পঞ্চবাণ রহস্য" গল্পটি লেখা।
"কালীগুণীন ও পঞ্চবাণ রহস্য" গল্পটি এই বইয়ের সবথেকে বড় গল্প। তবে এই গল্পের বেশ কিছু অংশ খানিকটা অপ্রয়োজনীয় লাগলো। প্রথমদিকে কাহিনি বেশ ঢিমেতালে চললেও অনন্তের বাসায় কালীগুণীনের পা রাখার পরে গল্পটি গতি পায়। গল্পটিতে পঞ্চবাণকে ঘিরে যেই রহস্য গড়ে উঠেছিলো সেই রহস্যের পরিণতি তার তুলনায় সাধারণ মানেরই লাগলো। - সবমিলিয়ে কালীগুণীন এর এই পর্বের গল্পগুলোকে এর আগের পর্বের চেয়ে কিছুটা দুর্বল ঘরানার মনে হলো। প্রায় প্রতিটি গল্পে কালীগুণীনের সিগনেচার স্টাইলে আবির্ভাব পড়তে ক্লিশেই লাগে এখন। এই পর্বের গল্পে সুপারন্যাচারালের তুলনায় হিন্দু পুরাণের উপরেই বেশি ফোকাস দেওয়া হয়েছে। তবে সে সময়ের স্টাইলের লেখনশৈলী বরাবরের মতোই আকর্ষণীয় লেগেছে। - ভারতীয় পেপারব্যাক হিসেবে বিভা প্রকাশনীর পেপারব্যাক বেশ ভালোমানের লেগেছে। বইতে বানান ভুল বলতে গেলে চোখেই পড়েনি, তাই সম্পাদনাও ভালো হয়েছে বলা যায়। ❝কালীগুণীনের কিস্তিমাত❞ বইয়ের প্রচ্ছদটি মোটামুটি লাগলো, তবে প্রতিটি গল্পের শুরু এবং শেষে করা ইলাস্ট্রেশনগুলো ভালোই ছিলো। এক কথায়, হিন্দু পুরাণ ভিত্তিক সুপারন্যাচারাল গল্প যারা পড়তে পছন্দ করেন তারা ❝কালীগুণীনের কিস্তিমাত❞ বইটা একবার পড়ে দেখতে পারেন।