গ্রন্থের প্রারম্ভিক আলোচনায় জগদীশ গুপ্তকে সম্পাদক আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন ‘প্রথম আধুনিক গল্পকার’। তার অনেকগুলো ছোটগল্পের ভেতরে এখানে সংকলিত হয়েছে মাত্র ১০ টি। গ্রন্থটি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘চিরায়ত বাংলা গ্রন্থমালা’ সিরিজের অধীনে প্রকাশিত হয়েছে।
জগদীশ গুপ্তকে গুপ্তধনের মতো আবিষ্কার করলাম বড় ভাইয়ের বুকশেলফ গোছাতে গিয়ে। দশটা গল্পের সংকলন করেছেন আব্দুল মান্নান সৈয়দ। ভূমিকায় জগদীশ গুপ্তের তথ্যবহুল মেদহীন বায়োগ্রাফি যোগ করেছেন সম্পাদক। গল্পগুলোর টাইমলাইন বা পার্সপেক্টিভ বোঝার জন্য এইটুকু পড়ে নেওয়া দরকার ছিল। তবুও পড়িনি আলসেমি করে।
মানুষের মনস্তত্ত্বের ডুয়েলিটি বা দ্বিচারিতা পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত ফেনোমেনান। আর সবচেয়ে জটিল বস্তুও মানুষের মন। জগদীশ লেখক হিসাবে চেয়েছেন, সাহিত্যের মাঝে জীবনের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরতে৷ ভালো মানুষ সবসময় ভালো পথে চলবে, খারাপ মানুষ খারাপ পথে, এইসব মোরাল বিলিফ আদতে সম্ভব না। জগদীশ আমাদেরকে ইউটোপিয়া থেকে বের করে দেখাচ্ছেন পৃথিবীর প্রক্রিয়া সরল হলেও মানুষ বড়ো জটিল, দুর্বোধ্য। তাঁর গল্পগুলোতে টের পেলাম, মানুষের কনশাস নেগেটিভ ইমোশনকে এক্সপ্লোর করা যাচ্ছে।
জগদীশ পড়তে গিয়ে দাঁত ভাঙবে ভেবেছিলাম। কিছুই হলো না। সাধুভাষায় লেখেন, তবুও খুব সহজ সাবলীল ন্যারেশন বলে পড়া যায় আরামসে। কিছু ক্ষেত্রে গল্পে নাটকীয় আবহ তৈরি করেন লেখক। অবশ্য টাইমলাইন হিসাব করলে বিশ্বাস করতে হয়, জগদীশ সময় থেকে এগিয়ে থাকা সাহিত্যিক ছিলেন।
বাতিঘরে একটা তাক আছে "বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের"। বাতিঘরে ঢুকলেই,সেখানে অন্তত একবার যাওয়া হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন বইয়ের নাম পড়ি,লেখকের নাম পড়ি,তারপর বাসায় চলে আসি। সেই নাম পড়তে গিয়েই মূলত " জগদীশ গুপ্ত " নাম টা প্রথম দেখে ছিলাম।
তার অনেক পরে এসে দেখলাম মানুষ জন জগদীশ গুপ্তের লেখা পড়েন। গুডরিডসে দেখলাম, সবাই উনার "শ্রেষ্ঠ গল্প " টা পড়েছে। আমিও একদিন পুরাতন বইয়ের দোকানে পেয়ে, কিনে নিলাম। পড়লাম।
সময়ের বিবেচনা জগদীশ বাবুর লেখাগুলো ভীষণ আধুনিক। এবং ভাবনার উদ্রেগ করে। গড়পড়তা গল্পের মতো নয়,অন্তত আমার লাগেনি। গড়গড়িয়ে পড়া যায়,তবে পড়া টা স্বাভাবিক ছন্দে চলে না। পড়তে পড়তে থমকাতে হয়,ভাবতে হয়। আমি আরেক জন প্রিয় লেখক আবিষ্কার করলাম। পড়তে হবে এবার।
শ্রেষ্ঠ গল্পে,আমার প্রিয় গল্প : পুরাতন ভৃত্য,কামাখ্যার কর্মদোষ,চার পয়সা এক আনা,আঠারো কলার একটি।
শ'খানেক পৃষ্ঠার একটা গল্প সংকলন যাতে লেখকের দশটা ছোটগল্প স্থান পেয়েছে। অথচ এই দশটা গল্প দিয়েই লেখক নিজের জাত চিনিয়েছেন। কি পর্যবেক্ষণশক্তি, কি ভাষার প্রয়োগ, কি বৈচিত্র্য - সব দিক থেকেই বইটা লেখকের মাহাত্ম্য ঘোষণা করেছে। নিয়তি, বিশ্বাসঘাতকতা, লাম্পট্য ও প্রেম, ঈর্ষা ও সন্তানবাৎসল্য, কামনা, হাস্যরস, দরিদ্রের অভাববোধ, ঘৃণা ও আত্মপরিচয়ের সংকট ইত্যাদি নানা বিষয় উঠে এসেছে বইটাতে। বইয়ের শুরুতে আব্দুল মান্নান সৈয়দের ভূমিকাটাও দারুণ ছিল। মোটের উপর, অসাধারণ একটা বই।
জগদীশ গুপ্তের গল্পগুলোকে শক্তিশালী বলা যেতে পারে। লেখকের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত স্পষ্ট আর ভাষাশৈলীও মনোমুগ্ধকর। যতিচিহ্ন ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্য লক্ষ করা যায়। গল্লগুলোয় বিভিন্ন অভিনব উপমা, রূপক আর বক্রোক্তির প্রয়োগ দৃষ্টিগ্রাহী। তবে ক্ষেত্রবিশেষে বাহুল্য মনে হয়। এছাড়া কিছু কিছু স্থানে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার বর্ণনা অতিমাত্রায় দীর্ঘ, ফলে একঘেয়েমি আসে।
‘দিবসের শেষে’ এই সংকলনের প্রথম গল্প। এটি সবদিক থেকেই বাকি গল্পগুলোর চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে। অন্য গল্পগুলোকে এজন্য খানিকটা নিষ্প্রভ লাগে। তবে আলাদা করে ‘আদি কথার একটি’ আর ‘কলঙ্কিত সম্পর্ক’ গল্পদুটোর কথা বলা যায়। সব মিলিয়ে সংকলনটি মন্দ নয়।
জীবনানন্দ দাশ যে অর্থে প্রথম আধুনিক কবি, ঠিক সেই অর্থেই প্রথম আধুনিক গল্পকার জগদীশ গুপ্ত।
জীবনানন্দ দাশগুপ্ত আর জগদীশচন্দ্র গুপ্ত, এটাই ছিল তাদের আদি নাম। দুজনই গুপ্ত নামের দায়ভার তাদের সাহিত্যে বহন করেছেন। দুজনের সাহিত্যই রয়ে গেছে গুপ্ত। তবে জীবনানন্দ অনেকটা উজ্জ্বলতায় আসলেও, জগদীশ রয়ে গেছেন সেই অন্ধকারে...
জগদীশ বাবুর মোট ১০ টা গল্প আছে বইতে। প্রতিটি গল্পেই আধুনিকতার ছোঁয়া পাওয়া যায়। সত্যিকার অর্থেই তিনি প্রথম আধুনিক গল্পের স্রষ্টা। প্রতিটি গল্পই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে রচিত, জীবনের এক প্রতিচ্ছবি। লেখনি, গল্পের আকর্ষণ, ঘটনার প্রবাহ কিছুই তীব্রভাবে টেনে রাখবে না। কিন্তু একটা আয়না সামনে ধরবে। যেটা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি...
১০ টি গল্পের ভেতর ৭ টা গল্প বেশ ভাল লেগেছে। 'পুরাতন ভৃত্য', চার পয়সার এক আনা', 'প্রলয়ঙ্করী ষষ্ঠী', 'আদি কথার একটি' ও 'চন্দ্র-সূর্য যতদিন' এই পাঁচটি গল্প সবচে ভাল লেগেছে।
জীবনানন্দ দাশ যে অর্থে প্রথম আধুনিক কবি, ঠিক সেই অর্থেই প্রথম আধুনিক গল্পকার জগদীশ গুপ্ত।
জীবনানন্দ দাশগুপ্ত আর জগদীশচন্দ্র গুপ্ত, এটাই ছিল তাদের আদি নাম। দুজনই গুপ্ত নামের দায়ভার তাদের সাহিত্যে বহন করেছেন। দুজনের সাহিত্যই রয়ে গেছে গুপ্ত। তবে জীবনানন্দ অনেকটা উজ্জ্বলতায় আসলেও, জগদীশ রয়ে গেছেন সেই অন্ধকারে...
জগদীশ বাবুর মোট ১০ টা গল্প আছে বইতে। প্রতিটি গল্পেই আধুনিকতার ছোঁয়া পাওয়া যায়। সত্যিকার অর্থেই তিনি প্রথম আধুনিক গল্পের স্রষ্টা।
প্রতিটি গল্পই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে রচিত, জীবনের এক প্রতিচ্ছবি। লেখনি, গল্পের আকর্ষণ, ঘটনার প্রবাহ কিছুই তীব্রভাবে টেনে রাখবে না। কিন্তু একটা আয়না সামনে ধরবে। যেটা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি...
১০ টি গল্পের ভেতর ৭ টা গল্প বেশ ভাল লেগেছে। 'পুরাতন ভৃত্য', চার পয়সার এক আনা', 'প্রলয়ঙ্করী ষষ্ঠী', 'আদি কথার একটি' ও 'চন্দ্র-সূর্য যতদিন' এই পাঁচটি গল্প সবচে ভাল লেগেছে।
মানুষেরা যে গ্রে এরিয়ায় বসবাস করে (ভালো মন্দ দিয়ে যখন তারে বাঁধা যায় না), এবং তার কখন কী মতি কে বা জানে, তার নিয়তি তাড়িত জীবন - এইসমস্ত প্রবণতা নিয়ে জগদীশ গুপ্তের গল্পের জগত (যা নির্মিত হয়েছে আজ থেকে হয়তো একশ বছর আগে)। বাংলা ভাষার প্রথম আধুনিক গল্পকার বলে দিলেই জগদীশ গুপ্তকে নিয়ে আলাপ আমাদের দিশা পায় না। এই বিস্ময়কর প্রতিভা নিয়ে আমাদের আলাপ এত কম, এর এক কারণ হতে পারে লোকটা অভিনব হলেও অস্বস্তিকর। নিজ সময়কালে ওঁকে অনেকে অশুভ আর শয়তান ভাবত না, এমন মনে হয় না আমারও। তাই খ্যাতি প্রচার কিছুই জোটেনাই। আমাদের মাটিতে যেহেতু লেখক মানেই সাধু-সন্ত - লোকে ভাবত, মালিন্য লেখকেরা চিন্তা করতে পারেন না।। আরও অনেক পরে দুনিয়ার অন্য প্রান্তের লেখক উইলিয়াম ফকনারকে যখন আমরা বলতে শুনি 'শিল্পী এক শয়তানতাড়িত সত্তা', তখন মনে হয় 'আ রোজ ফর এমিলি' যেন হালায় জগদীশ গুপ্তেই লিখে এসেছিলো।
চার তারা দিলাম সংকলনের কলেবরের জন্য। এতো অল্পে মন ভরে না।