বিশ্বকবি, গুরুদেব প্রভৃতি উপাধি শুনলে আমাদের মনে যে ছবি মনে ভেসে ওঠে তার সঙ্গে এ বইয়ের রবীন্দ্রনাথের মিল সামান্যই। এখানে তিনি রক্তমাংসের মানুষ - খেয়ালী, কোমল, কৌতুকপ্রিয়, স্নেহশীল। পড়ালেখা ও স্বামীর চাকরির সুবাদে রানী চন্দ কবিগুরুর সংস্পর্শে থেকেছেন বহু বছর। যাপিত জীবনের সেসব টুকরো অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা এই বই। ঋষি রবীন্দ্রনাথ এখানে যেন উদাসীন শিশু। এক বাড়িতে তার বেশিদিন থাকতে ইচ্ছা করতো না, কিছুদিন পরপর ঘরের নকশা বদলাতেন, বাড়ি বদলাতেন। যে বাড়িতেই যেতেন, বলতেন, "এই বাড়িই আমার পক্ষে ঠিক হয়েছে। এখন থেকে আমি এখানেই থাকব।" অন্য কোনো বাড়িতে যেয়েও একই কথা বলতেন। বাড়ি নিয়ে এসব ঘটনার বর্ণনা এতো মজার!
খাবারের বেলাতেও একই অবস্থা। এক লোক একবার এসে পরামর্শ দিলো হবিষ্যান্ন খেতে। তিনি খাওয়া শুরু করলেন তাই। এরপর একজন পরামর্শ দিলো ডিম খেতে। রবীন্দ্রনাথ শুরু করলেন কাঁচামরিচ আর নুন দিয়ে কাঁচা ডিম খাওয়া। এরপর আরেকজন বললো নিমপাতার রস খেতে।তিনি বড়ো গ্লাস ভর্তি করে নিমপাতার তেতো রস এমনভাবে খেতে শুরু করলেন যেন অমৃত খাচ্ছেন। এভাবেই চলতো। গুরুদেব শুধু নিজে খেতেন না, আশ্রমের অন্যদেরও খাওয়াতেন উৎসাহ নিয়ে। তাই একেকবার মানুষজন ভয়ে খাওয়ার সময় তার কাছে আসা বন্ধ করে দিতো। কতো ছোটখাটো অম্লমধুর ঘটনা! আশ্রমের ছেলেরা অন্য এক কলেজের ছাত্রদের আট গোলে ফুটবল ম্যাচে হারানোয় রবীন্দ্রনাথ রেগে গিয়ে বলেছিলেন, "এ হচ্ছে বাড়াবাড়ি।বাইরের ছেলেরা খেলতে এসেছে, হারাতে হয় এক গোল কি দু গোলে হারাও।তা নয়, পরপর আট গোল। এ দস্তুরমত অসভ্যতা।" কবির অসুস্থতা, রোগভোগ ও মৃত্যুর বর্ণনা যথাযথ পরিমিতিবোধের সাথে দিয়েছেন লেখিকা।পড়তে পড়তে মনে হবে, নিজের ভেতরের শিশুটিকে আজীবন জাগ্রত রাখতে পেরেছেন বলেই রবীন্দ্রনাথ থেকে গেছেন চিরনবীন, চিরসতেজ ও প্রাসঙ্গিক।
লেখিকা ছিলেন শৈশব থেকেই বিশ্বকবির স্নেহভাজন। তার ওপর স্বামী অনিল চন্দ কবিগুরুর সেক্রেটারি হবার সুবাদে তাঁর জীবনের শেষ ভাগ হতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন রানী চন্দ। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, স্নেহ মমতায় ভরা সেই ক'টি বছরের গল্পই খুব সহজ গদ্যে এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। মন ছুঁয়ে যায়।