অন্ধকারে হঠাৎ গুলীর শব্দে নৌকাটা দুলে উঠল। যাত্রীরা উবুড় হয়ে পড়ল এ-ওর গায়ের ওপর। নৌকার পেটের ভেতর থেকে ময়লা পানির ঝাপটা এসে আমার মুখটা সম্পূর্ণ ভিজিয়ে দিল। সার্ট ও গেঞ্জির ভেতর ছলছলানাে পানি ঢুকে ঝুলতে লাগল। আর ফোঁটা ফোঁটা চুইয়ে পড়তে লাগল পাটাতনে। ততক্ষণে বুড়াে মাঝি ও তার ছােটো ছেলেটা বৈঠা গুটিয়ে নিয়ে পাটাতনে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছে। কে একজন ছিটকে এসে আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছে। কান্না ও শরীরের ছোঁয়াতেই আমার বুঝতে বাকি রইল না, একটা মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁাঁপাচ্ছে। আমার অস্তিতের সমর্থন পেয়েই কিনা জানি না, মেয়েটার কানা আরও শব্দ করে একট রােদন বা বিলাপের মতাে হয়ে উঠল। আর সাথে সাথেই আখাউড়ার দিক থেকে সারিবাধা পটকা ফাটানাের মতাে গর্জন করে বইতে লাগল গুলীর শব্দ। সীসার বাতাস কেটে চলে যাওয়ার শিস উঠছে। এর মধ্যেই আমাদের গাইড আনিসের বাজখাই গলা শােনা গেল, ‘কে কাদছে? এই হারামজাদি একদম চুপ করে থাক।'
Mir Abdus Shukur Al Mahmud (best known as Al Mahmud) was a Bangladeshi poet, novelist, and short-story writer. He was considered one of the greatest Bengali poets to have emerged in the 20th century. His work in Bengali poetry is dominated by his frequent use of regional dialects. In the 1950s he was among those Bengali poets who were outspoken in their writing on such subjects as the events of the Bengali Language Movement, nationalism, political and economical repression, and the struggle against the West Pakistani government.
Notable awards: Bangla Academy Award (1968) Ekushey Padak (1987)
মুক্তিযুদ্ধের এমন একটি দিক এ উপন্যাসে এসেছে যেদিকটা নিয়ে সাধারণত আলোচনা হয় না। মেইনস্ট্রিম ইতিহাস বইয়ে অনালোচিত এই দিকটি তুলে ধরাই এই উপন্যাসের একমাত্র সার্থকতা। কৃত্রিম সংলাপ, এলোমেলো বাক্য বিন্যাস, উদ্ভট ও অন্তঃসারশূন্য কাহিনী, সর্বোপরি কাঁচা হাতে জোরপূর্বক লেখা। একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিকের হাত থেকে কিভাবে এমন উপন্যাসের জন্ম হল তা আমার বোধগম্য নয়।
কবি হাদী মীর। ঢাকায় পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের লাইব্রেরিয়ান তিনি। ঢাকা যখন পুরোপুরিভাবে পাকিস্তানিদের দখলে চলে গেছে, চারিদিকে পাকিস্তানিদের অমানবিক অত্যাচার ও লুটপাটের কারনে সবাই ঢাকা ছেড়ে প্রথমে গ্রামে এবং গ্রামেও না টিকতে পেরে ভারতে পাড়ি দেন। সেই দলের একজন কবি সাহেব। তিনি তার স্ত্রীর থেকে বিছিন্ন হয়ে তার জন্য বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করে থেকে ভারতে যাবার সিদ্দান্ত নেন। কবির বোন ও ভগ্নিপতি একজন মুক্তি যোদ্ধাকে দিয়ে চিঠি লিখে দিয়ে কবিকে খুব শিঘ্র ভারতে চলে যেতে বলেন। তিনি অন্য এক মুক্তিযোদ্ধার মাধ্যমে জানতে পারেন যে কবির স্ত্রী হামিদা নিরাপদে কলকাতায় পৌছে গেছে।
ভৈরব ও আগুগঞ্জে যখন পাক হানাদরেরা এসে অত্যচার শুরু করেন তখন সেখানকার সকলে নবাবপুরে এসে পালিয়ে বাঁচে এবং সেখান থেকেই নৌকায় করে ভারতে যাবার জন্য রওয়া দেয়। এদেরই সাথে কবি আছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা আনিস এদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। নৌকায় মোট ৩০জন লোক যেতে পারে কিন্তু সেখানে ৩২ জন্য ওঠার পরেও দুটি মেয়ে সীমা ও নন্দিনী এসে কান্না কাটি শুরু করে। সীমার স্বামী ঢাকায় গিয়ে আর ফিরতে পারে নি। সীমা একটা স্কুলের শিক্ষীকা। হিন্দুদের বাড়ীতে থাকাটা এখন খুব কঠিন হয়ে যাওয়াতে স্বামীর ফেরার অপেক্ষা না করে বোন নন্দিনীকে নিয়ে সে পথে বের হয়েছে। দুই বোন এসে অনেক কান্না কাটি করার পর কবি জোর করে আনিসকে বলে তাদেরও নৌকায় তুলে নেয়।
কিছু দূর যাবার পর গুলির শব্দ শুনে সবাই খুব ভয় পেয়ে যায়। পাকিস্তান টহলদারের তাদের নৌকাটা অন্ধকারে দেখতে না পারলেও অনুমান করতে পেরেছে। অনেক সাবধানে তারা একটা ঘাটে এসে নৌকা ভিড়িয়ে উপরে উঠলে চারিদিক থেকে কিছু লোক তাদের ঘিরে ধরে। সবার হাতে অস্ত্র থাকলেও তারা মুক্তি বাহিনীর লোক নয়। নকশাল বাহিনীর লোক।অস্ত্রদারী মুক্তিযোদ্ধা সাথে আছে জানলে বিপদ হতে পারে ভেবে আনিস পানিতে ডুব দিয়ে পালিয়ে চলে যায়। নন্দিনীকে স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়ে এবং কাছা কাছি কোন গ্রামে কবির পরিচিত আত্মীয় কথা বলে তাদের হাত থেকে বেঁচে যায় তারা।
অন্ধকারের মাঝে লাইন ধরে একজন আর একজনের কাপড় ধরে পথ চলতে চলতে সকলে একটা মাঠের কাছে এসে পৌছায়। কিন্তু এখানে এসে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে যায়।
সাথে যে কয়জন মহিলা ছিলো তার সবাই নিম্ন শ্রেনীর কৃষক পরিবারে। এর মাঝে সীমা ও নন্দিনী সম্ভ্রান্ত পরিবারের তার উপর দেখতে সুন্দর তারা। রাজাকারদের সাথে কবির তর্কাতর্কির ফলে সবাইকে ছেড়ে দিয়ে কবি সীমা ও নন্দিনীকে আটকে রাখে। সীমা ও নন্দিনীর পরনের শাড়ী খুলে কবিকে খুব শক্ত করে বেঁধে নির্জন গ্রামের একটি বাড়ীর ঘরে আটকে রাখে তাদের। কবির পাশের ঘরে সীমা ও নন্দিনীকে।
কবিকে অনেক শারীরিক অত্যচার সহ্য করতে হয় ফলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। হঠাৎ করে কবির কানে ভেসে আসে কোন নারীর আর্ত চিৎকার ও গোংরানি। এটা কি সীমা ও নন্দিনীর রাজাকারদের হাত থেকে সম্মান বাঁচানোর জন্য প্রতিবাদ না কি কবির স্বপ্ন.....?
মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস অগেও কয়েকটা পড়েছি। তবে আমার কাছে প্রতিটি উপন্যাসই নিজেস্ব স্বকীয়তা উদ্ভাসিত। বিষয়বস্তু এক হলেও অনুভূতি সবসময় নতুন। লেখকের বর্ননাতে চোখের সামনে চলে এসেছে সেই সময়টা। তবে লেখক "উপমহাদেশ " উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি দেশের সংখ্যালঘু রাজনৈতিক দলের আর্দশ ও উদ্দেশ্যকে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। একই সাথে সেই সময় তাদের অবস্থা ও সরকার পক্ষের সাথে তাদের সম্পর্কটাও।
আরও একটা নাড়া দেবার মত একটা বিষয় লেখক তুলে ধরেছেন, সেই সময়ের ভারতীয় কবি সাহিত্যিক দের মানসিক অবস্থা ও আমাদের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ ও সহযোগিতা।
স্বাধীনতা দিবস (২৬শে মার্চ, ২০২৪) উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটা বই পড়ব ভাবছিলাম আর সে সুবাদে কবি আল মাহমুদের এই উপন্যাসটিতে হাত দেয়া।
বইটার তেমন কিছুই ভালো লাগেনি। এতো বাস্তব বহির্ভূত একেকটা ঘটনার অবতারণা! মাত্র কয়েকদিন আগে রাজাকারদের হাতে সারারাত ধরে নির্যাতিতা নন্দিনী কী করে হাদী মীর বা তার পরিবারের সাথে এতো সচ্ছন্দ মেলামেশা করে, হাদী মীরের স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও কী করে তাঁর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে এতো আগ্রহী হয় তা নীলিমা ইব্রাহিমের “আমি বীরাঙ্গনা বলছি” বা শাহীন আখতারের “তালাশ” পড়া আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকল না। এদিকে হাদী মীরের কথা আর কী বলব? এমন দূর্বল চরিত্রের মানুষ, বোন-দুলাভাইয়ের বাসায় একটা বিবাহিত মানুষ পরনারীকে নিয়ে তাদের সামনে শুয়ে থাকতেছে! আদব লেহাজ বলে যদি এদের কিছু থাকে! যুদ্ধের দোহায় দিয়ে কত কিছুই না দেখালেন এই বইতে আল মাহমুদ! আর শেষটায় তো দুই নারীকে নিয়ে হাদী মীরের সংসারকেও জায়েজ করে দিলেন ধর্মের দোহায় দিয়ে। হামিদা নারী মুক্তিযোদ্ধা বলে যতটা না সম্মান আদায় করে নিয়েছিল, শেষটায় এসে ওর এই ব্যাপারটা একদমই ভালো লাগল না। বইয়ের সমাপ্তির প্রয়োজনে কত কীই না করেন লেখক!
অল্প যা কিছু এই বইয়ের ভালো তার মধ্যে কয়েকটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি – - ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে নীতিগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু স্বতন্ত্র দলের অংশগ্রহণের কথা আমরা জানি। বামপন্থী এরকম একটি দলের (সম্ভবত কাল্পনিক) কার্যক্রমের কথা উঠে এসেছে এই বইতে। ভারতের নকশাল পন্থীদের সাথে যোগাযোগ থেকে শুরু করে তাদের কিছু অপারেশনেরও কথা বইতে এসেছে। - বইয়ের শুরুতেই একটা জায়গায় দেখা যায় জিঘাংসা বশত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা একজন রাজাকারের কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করছে। আবার শেষের দিকেও নন্দিনী যে ক্যাম্পে ট্রেইনিং নিতে যায় ওখানেও দেখা যায় “মেয়ে মুক্তিযোদ্ধা মানেই পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের দেহ দান করলেই কর্তব্য শেষ” এইরকম একটা অনাচার। এই ব্যাপার গুলো কতটুকু সত্যি বা মিথ্যা আমার জানা নেই, এই ব্যাপারে আমার পড়াশোনাও নেই আসলে। তবে আল মাহমুদ যে খানিকটা “Devil’s Advocacy” করেছেন এদিক থেকে ব্যাপারটা ভালই লেগেছে। - এখানে লক্ষ্য করার মতো আরেকটা ব্যাপার ইমাম আর পারুলের পরিবারের অবস্থা যারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয় নিয়েও দেখা যায় সরকারের বড় পদে চাকরী করার দরুন রাজার হালে দিনাতিপাত করছে – টেবিলে রুটি-মাখন, মুরগী, কলের পানি, মেয়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে। এই ব্যাপারটা বেশ চোখে লাগে।
সর্বোপরি বইটার কিছু ভালো দিকের জন্য নিতান্তই একটি তারা দেয়া গেল না। দুইটা তারা দিয়ে শেষ করছি।
আল মাহমুদ 'উপমহাদেশ' শব্দটি দ্বারা মূলত পাক-ভারত উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে নির্দেশ করেছেন। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানের ভাঙন এবং বাংলাদেশের জন্ম ছিল ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা।
সৈয়দ হাদী মীর একজন কবি এবং পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলের লাইব্রেরিয়ান। ২৫শে মার্চের রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের পর সবাই যখন ভারতে কিংবা গ্রামের দিকে চলে যাচ্ছিল, তখন তিনিও ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে কবির স্ত্রী হামিদা বানুও বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্যদিক দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে, এই খবর পান হাদী মীর। কবির ভগ্নিপতি যুদ্ধকালীন সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়াতে কবিকে মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে ভারতে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেন। নৌকাযোগে যাওয়ার সময় সংখ্যালঘু হিন্দুদের সাথে নিতে বাধ্য হন। নৌকায় উঠে সীমা ও নন্দিনী নামের দুই বোন। সীমা বিবাহিত এবং তার স্বামী অজয় ঢাকায় গিয়ে আর ফেরত আসেনি। অন্যদিকে নন্দিনী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্রী। রাস্তায় তারা সিরাজ শিকদারের সমর্থক দলের সামনে পড়ে যায়। তাদের রাজাকার দল ভেবে মাঝি আর সামনে যেতে অস্বীকার করলে পায়ে হেঁটে সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সামনে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে? এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দোলাচলে সবাই যেন নিশ্চুপ হয়ে আছে।
আল মাহমুদ মূলত একজন কবি। কবি হলেও কথাসাহিত্যে পারদর্শীতা কম নয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। তবে যতগুলো পড়েছি এই বইটা ভিন্ন মনে হয়েছে। একটা যুদ্ধ ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পর্কে কতখানি প্রভাব ফেলে তা বোঝাতে চেয়েছেন লেখক। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং তাদের সংঘাতের যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তা বোধকরি খুব কম ঔপন্যাসিকই লিখেছেন। তবে যে জিনিসটা অন্য কোথাও পাইনি তা হলো মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক প্রতিশোধস্বরুপ রাজাকার পরিবারের উপর পাশবিক অত্যাচার। এমন ঘটনা যুদ্ধের সময় ঘটেছিল কিনা জানা নেই।
সৈয়দ হাদী মীরকে খুবই দূর্বল চিত্তের মানুষ মনে হয়েছে, যখন তিনি দুইটি নারীর দিকেই ঝুঁকেছেন তবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তবে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের বেলায় সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। হামিদা বানু ও নন্দিনী ভট্টাচার্য দুইজনই স্বাধীনচেতা নারী হলেও স্বভাবে বৈপরীত্য রয়েছে। কবির ভগ্নিপতি-বোন তৌফিক ইমাম ও পারুলের আরাম আয়েশের জীবন যুদ্ধকালীন কলকাতায় অবস্থানরত উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের জীবনযাপনের চিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
এক কথায় বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি ভিন্নধর্মী উপন্যাস বলা চলে। সুন্দর বই। হ্যাপি রিডিং।
গল্পে যুদ্ধের আবহ তৈরি করতে লেখক ব্যর্থ, হয়তো সেই চেষ্টাও করেননি তিনি! বইয়ের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে অদ্ভুত, অবাস্তব, যুক্তিহীন এক প্রেমকাহিনী। পাশাপাশি লম্বা লম্বা অসংলগ্ন সংলাপ অপ্রাসঙ্গিক লেগেছে অনেকাংশেই। মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী নেতাকর্মীদের অবদানের যে চিত্র আল মাহমুদ ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন সেটাও ফিকে হয়ে গেছে প্রেমকাহিনীকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে!
সর্বোপরি আল মাহমুদকে আমি প্রথম সারির একজন কবি হিসেবেই মনে রাখতে চাই, ঔপন্যাসিক হিসেবে নয়।
আল মাহমুদ রচিত উপমহাদেশ (প্রকাশ - ১৯৯৩) একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত হলেও এর মূল কেন্দ্রে রয়েছে মানব মনের জটিলতা, প্রেম, এবং অস্তিত্বের সঙ্কট। এটি কেবল যুদ্ধের ইতিহাস নয়, বরং যুদ্ধের আগুনে পোড়া মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং স্বপ্নভঙ্গের এক কাব্যিক দলিল।
গল্পের সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক হলো লেখকের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো, এতো লেম।
সমালোচকদের মতে, উপন্যাসটিতে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছায়া পড়েছে এবং এটি মুক্তিযুদ্ধাশ্রয়ী এক ধরণের আত্মজৈবনিক শিল্পভাষ্য।
এই বইয়ের একদম শেষ পাতায় (সম্ভবত) এসে তারপর বোধগম্য হইসে আমার আসলে কি ঘটল। হতে পারে মাথায় বুদ্ধি সুদ্ধি কম দেখে শেষ পাতা পর্যন্ত আসতে হইসে।
মুক্তিযুদ্ধের উপর পড়ার বইয়ের লিস্ট দিন দিন খালি বাড়তেসে। ক্লাস টেন পাশ করে সমাজ বই পড়ার পাট চুকে গেলে, আগে এইটায় হাত দেওয়া দরকার ছিল। ছোট থাকতে সব সময়েই এই বিষয়ের উপর বই পড়ার সময় মনে হতো, শুধু স্বজাতি দেখে বোধ হয় কিছু ক্ষেত্রে কিছু ব্যাপার বাদ দিয়ে লেখা হচ্ছে।
এদ্দিন যেটা খুঁজতেসিলাম, যে ব্যাপারগুলো সব সময়েই মনে হইতো, এমন তো হবার কথা না, দিন দুনিয়ার সবাই দিল খোলা ক্ষমাশীল মানুষজন না, আবার পুরা একটা জাতির সবাই সুশীল নাগরিক না, আর আমাদের তো আরও না। সেগুলা এটায় শেষ মেষ পেয়ে মাথা ঠান্ডা হইসে।
মোদ্দা কথা, পুরা বইয়ে অবশ্যই দুঃখের কাহিনীতে ভরা, কিন্তু গণহারে স্বজাতি দেখে নগদে আকাশে তুলে দিসে টাইপ না হউয়ায় মনে হইসে বইটা খুবই জাতের। মুক্তিযুদ্ধের "Dark side of the Moon" খুঁজে পেয়ে মাথা ঠান্ডা হইসে আবার গরমও হইসে। তবে আসলেই জাতের বই নাকি বোঝার জন্য আরও বই পড়া লাগবে।
অতিআবেগী দুটি নারীপুরুষের গল্প। মূল পুরুষ চরিত্রটিকে এমন কীটের মতো দুর্বল করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে পড়ার সময় বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের যেসব বর্ণনা আছে সেগুলো ঠিক আছে, তবে কিছু জায়গায় অযৌক্তিক বর্ণনা দেখে খারাপ লাগলো। যেমন নাসরিন নামের মেয়েটিকে উদ্ধার করার অপারেশনে কবির মতো ট্রেনিংবিহীন একজন নিষ্কর্মাকে সাথে নেয়াটা সম্পূর্ণ অবাস্তব, অযৌক্তিক তো বটেই।
একটা দিকই শুধু ভালো লেগেছে। আওয়ামীলীগের বাইরের দলগুলো যেরকম বীরত্বের সাথে লড়াই করেছে এবং তাঁদের রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি যে নিষ্ঠা, সর্বোপরি যুদ্ধটাকে তাঁরা যেরকম বাস্তবসম্মতভাবে বুঝতে পেরেছিলেন সেভাবে খুব বেশি মানুষ ভাবে না।
আল মাহমুদ সম্ভবত কবি হিসেবেই মানানসই। উপন্যাসে এসে তিনি হতাশ করে দিলেন।
১৯৭১ , মুক্তিযুদ্ধ , অসীম আত্মত্যাগ, ভু - রাজনীতি , ডান - বাম , কমিউনিস্ট , নকশাল , ভারত যুদ্ধে জড়ানোর কারণ , ছেংদোলাই খাওয়া পাকিস্তান ও আশা জাগিয়ে রাখা কবি হাদি মিরের নোনাকাব্য ---