‘মৎস্যগন্ধা’ এক জেলেকন্যার আর্য-মহিষীতে রূপান্তরের বৃত্তান্ত। মাছের পেটে জন্ম মৎস্যগন্ধার। কৈবর্তপরিবারে পালিত। উনিশে ধর্ষিত, ঋষি পরাশর দ্বারা। তারপর তার টিকে থাকার লড়াই। লড়াই শেষে রাজা শান্তনুর স্ত্রী। মৎস্যগন্ধা ওরফে সত্যবতীর জীবনে সুখ বা স্বস্তি আসেনি কখনো। তার জীবন প্রেমহীন অথচ সুরভিত, রক্তাক্ত কিন্তু উজ্জ্বল। দুই বিধবা পুত্রবধূকে নিয়ে হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে নিয়তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেছে মৎস্যগন্ধা। কূটকৌশল, স্বার্থপরতা, ধর্মাচার, যৌনতা তাকে তাড়িয়ে ফিরেছে। ‘মৎস্যগন্ধা’ এক কৈবর্তকন্যার যুদ্ধজয়ের কাহিনি, আবার পরাজয়ের আখ্যানও । ‘মহাভারতে’র পটভূমিতে আধুনিক মানুষের জীবনকথা শুনিয়েছেন হরিশংকর জলদাস। এই উপন্যাসে পুরাকাল ও বর্তমানকাল মিলেমিশে একাকার। ‘মৎস্যগন্ধা’য় হরিশংকরের জীবনদর্শন স্পষ্ট। এখানে তাঁর বাক্য সরল। ভাষা মনোহর। ইঙ্গিতবহ। ভানমুক্ত।
Harishankar is a promising Bangladeshi author. The most significant point to notice is that all the four novels produced from Harishankar's pen sketch the life of the downtrodden, some of whom are from among fisherfolks, some from among prostitutes and some others are the 'harijons' or 'methors'.
"মৎস্যগন্ধা" - এক সাধারণ কৈবর্ত নারী থেকে কুরুবংশের রাজমহিষী সত্যবতী হয়ে উঠার গল্প। সাধারণ মানুষের ভাষায় হরিশংকর জলদাস যেভাবে মহাভারতের আখ্যান ফুটিয়ে তুলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। মৎস্যগন্ধার জীবনের ঘাত প্রতিঘাত ও সংগ্রামের ইতিকথা - মহাকাব্যের আবেশ খুলে সহজ সরল ও যুক্তিপূর্ণ কিন্তু আবেগী ভাষায় লেখক তুলে ধরেছেন। বলা যায়, অন্তুজ শ্রেণীর দৃষ্টিতে মহাভারতকে দেখেছেন লেখক। যদিও আসল মহাভারত থেকে তথ্যগত কিছু অসঙ্গতি আছে, কিন্তু হিস্টরিকাল ফিকশন হিসেবে এইটুক গ্রহণযোগ্য।
গল্প মূলত সত্যবতীকে নিয়ে হলেও তার চরিত্রের গভীরে যাওয়া হয়নি। মহাভারতে জানা সত্যবতীর সাথে জড়িত কাহিনীগুলোই কেবল বিষদভাবে লেখা হয়েছে। সত্যবতী ব্যাসের সাথে বদরিকাশ্রমে চলে যাওয়ার পর কি হয় সেটা জানতেই বইটা পড়া আমার, কিন্তু হায় বই সেখানেই শেষ!
মহাভারতের অন্যতম একটা চরিত্র সত্যবতী। যেখান থেকেই মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের প্রেক্ষাপটটা তৈরি শুরু হয় বলা যায়। মহাভারতের মূল কাহিনিতে পাণ্ডব ও কৌরবদের বংশলতিকা কিন্তু এই নারীর মাধ্যমেই এগিয়েছে। সত্যবতীর আদি নাম ছিল 'মৎসগন্ধা'। তিনি কুরু সাম্রাজ্যের রাজমাতা, মহারাজা শান্তনুর পত্নি আর মহর্ষি বেদব্যাসের জননী, যে বেদ ব্যাসকে মহাভারতের রচয়িতা মনে করা হয়।
সত্যবতীর জন্ম থেকে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ই রহস্য আর নানান বাক বদলের গল্পের ছড়াছড়ি বলা যায়। তার জন্মের পর তাঁর শরীর থেকে তীব্র মাছের গন্ধ বের হতো বলে প্রথমে নাম রাখা হয় মৎসগন্ধা। তিনি ছিলেন চেদীরাজ উপরিচর বসু এবং মৎসরূপী অপ্সরা আদ্রিকার সন্তান। মাছের পেট ছিঁড়ে পাওয়া এই সন্তানকে এক ধীবর (জেলে) রাজা পালন করেছিলেন বলে তিনি ধীবর-কন্যা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
সত্যবতী যখন বৃদ্ধ কৈবর্তরাজ বাবাকে সাহায্যের জন্য যমুনায় খেয়া বাইতেন, তখন ঋষি পরাশরের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। ঋষির সাথে তার এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে সত্যবতীর শরীরের মাছের দুর্গন্ধ দূর হয়ে পদ্মফুলের সুগন্ধ নির্গত হতে থাকে। তখন তাঁর নাম হয় 'পদ্মগন্ধা' বা 'যোজনগন্ধা' (যার গায়ের সুবাস এক যোজন দূর থেকেও পাওয়া যেত)।
এই গল্পের সাথে জড়িয়ে আছে হস্তিনাপুত্রের রাজা শান্তনুও যার সাথে একসময় বিবাহ হয়েছিল হিমালয় কন্যা গঙ্গার সাথে। এই গঙ্গা একসময় শিবের পত্নী ছিলেন, যাকে পার্বতী পুত্র গণেশ কৌশলে নামিয়ে দিয়েছেন মর্তে। এই গঙ্গা আর শান্তনুর ঘরে জন্মেছিলো দেবব্রত। যার জ্ঞান কুরুবংশকে অনেকবার রক্ষা করেছে বহুবিপদ থেকে। এই পুত্রকে বাঁচাতে গিয়েই শান্তনু পত্নি হারা হয়েছেন সে বহু বছর আগে।
বহুবছর পর রাজা শান্তনু আবারও মুগ্ধ হলেন মৎসগন্ধা থেকে পদ্মগন্ধা হয়ে ওঠা সত্যবতীর মায়াবী সুবাসে। কিন্তু রাজবংশের সিংহাসন নিয়ে এক কঠোর শর্ত চাপিয়ে দিল কন্যার পিতা দাসরাজা। যে শর্তের বেড়াজালে দগ্ধ হচ্ছিল রাজা শান্তনু, পিতার হৃদয়ের এই নীরব যন্ত্রণা সইতে না পেরে দেবব্রত এমন ত্যাগের প্রতিজ্ঞা করলো যেখান থেকে সে ভীষ্ম নামেই পূনরুজ্জীবন লাভ করলো, বিনিময়ে তিনি পিতার কাছ থেকে পেলেন ইচ্ছামৃত্যুর বর। এক মুহূর্তের এই চরম ত্যাগই কুরুবংশের ভাগ্যে লিখে দিল মহাযুদ্ধের প্রথম অধ্যায়।
সত্যবতী জেলে কন্যা থেকে রাজমাতা ঠিকই হলো কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হলো না, তার দুই পুত্রকে হারিয়ে বংশলোপের এই ঘোর সংকটে পড়তে হলো তাঁকে। তাই রাজমাতা সত্যবতী স্মরণ করলেন তার সেই শক্তিধর, তপোবনবাসী প্রথম পুত্র কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসকে। এভাবেই দেবী গঙ্গা থেকে আসা ভীষ্মের অপরিমেয় ত্যাগ এবং মৎস্যগন্ধা থেকে আসা সত্যবতীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা, শান্তনুর প্রেম এবং ব্যাসদেবের দৈব প্রক্রিয়া সব মিলে কুরুবংশের যে ভিত তৈরি হলো, সেই ভিতেই লুকানো ছিল মহাভারতের মহাযুদ্ধের অনিবার্য বীজ। সেই মহাযুদ্ধের সাথে পরিচয় আপনার এই গল্পে হবে না, এই গল্পের দৌড় সেখানেই শেষ যেখানে সত্যবতী নামক চরিত্রটির সমাপ্তি ঘটেছে।
সাধারণত আমরা দেখি যেকোনো বইয়ের ক্ষেত্রেই শুরুটা খুব বেশি আকর্ষণীয় হয় না, গল্প যত গভীরে যায় ততই কাহিনি আকর্ষণীয় হয়ে উঠে। কিন্তু এই বইয়ের বেলায় আমার মনে হয় সেটা খাটবে না। গল্পের শেষের চেয়েই বরং শুরুর কাহিনিগুলো আমার কাছে আকর্ষণীয় লেগেছে। এক্ষেত্রে অবশ্য লেখকের সুনাম করতেই হয়। মহাভারতের মহাখ্যান উপস্থাপনে লেখক যথার্থ সব শব্দের প্রয়োগ করেছেন। সময়, স্থান আর একটা আভিজাত্যের ভাব রেখে গেছেন উপন্যাসের প্রতিটি লাইনে। ফলে গল্প উপভোগে তা আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
এই গল্পটা পড়তে গেলেই আপনার মিশ্র প্রতিক্রিয়া হবে। কেননা এই গল্পের কেউই ঠিক সাধু নয়। মানবচরিত্রের নানান আচরণ, কূটকৌশল, হিংসা, রাজনৈতিক নানান ঘাতপ্রতিঘাতগুলো লেখক যেভাবে তুলে ধরেছেন তাতে কখনো গল্পের চরিত্রগুলো ভালো লাগবে আবার কখনো কখনো একই চরিত্রের ভিন্নরূপ দেখে চমকাতে হবে।
মৎসগন্ধার কথাই বলা যাক, তাকে প্রথমদিকে ভালো লাগলেও রাজমাতা হিসেবে মনে হয়েছে তার সেই আগের সারল্য, চিন্তাবোধটা একদম বদলে গিয়েছিলো অবস্থানের দম্বে। তার পরিণতি অবশ্য সে ভোগ করেছেও। ঠিক একই ভাবে স্বার্থপর মনে হয়েছে শান্তনু কিংবা দাশরাজাকেও। এই গল্পের সবচেয়ে ভালো লেগেছে ব্যাস আর ভীষ্মকে। অভাগায় বলতে হয় ভীষ্মকে সত্যবতী, শান্তনু আর দাশরাজার কাছে নিজের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে তাকে। তবুও দায়িত্ব থেকে তাকে যেমন সরাতে পারেনি, ঠিক একই ভাবে প্রতিজ্ঞাও ভঙ্গ করেনি। আর ব্যাস তো ব্যাসই, বরাবরই মাতৃআজ্ঞায় সে নিজেকে বারংবার ফিরে এসেছে, প্রয়োজনে পাশে থেকেছে।
সবমিলিয়ে দোষ আর গুণেই পরিপূর্ণ মৎসগন্ধা আমার ভালো লেগেছে। এই গল্প মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের আগেই শেষ হয়ে গেছে, সেখানে সত্যবতী চরিত্রটি থেমে গেছে। গল্পের শেষদিকে এসে তার ভূমিকাটাও আস্তে আস্তে কমে গিয়েছিলো। তার প্রভাব গল্পেও আছে।
বইটি সাইজে রয়ালই বলতে হয় প্রোডাকশন, প্রচ্ছদ, সম্পাদনা সবই নজরকাড়া। তাছাড়া হাতে নিলেই সবকিছু মিলিয়ে দারুণ এক অনূভুতি দিবে। সাথে বই শুরু করলেই দেখবেন লেখক তার রাজকীয় শব্দের খেলায় মোহিত করে ফেলেছে অনায়াসে। সেখানে পড়তে পড়তে কখনো রাগ লাগবে, কখনো হাসাবে আবার কখনো অভাগা নানান চরিত্র দেখে দুঃখও লাগবে। সবমিলিয়ে মহাভারতের সূচনার পর্ব জানতে বইটি চমৎকার চয়েস হবে। যদিও এই গল্পে কুরুক্ষেত্র অনুপস্থিত।
‘মৎস্যগন্ধা’ এক জেলেকন্যার আর্য-মহিষীতে রূপান্তরের বৃত্তান্ত। মাছের পেটে জন্ম মৎস্যগন্ধার। কৈবর্তপরিবারে পালিত। উনিশে ধর্ষিত, ঋষি পরাশর দ্বারা। তারপর তার টিকে থাকার লড়াই। লড়াই শেষে রাজা শান্তনুর স্ত্রী। মৎস্যগন্ধা ওরফে সত্যবতীর জীবনে সুখ বা স্বস্তি আসেনি কখনো। তার জীবন প্রেমহীন অথচ সুরভিত, রক্তাক্ত কিন্তু উজ্জ্বল। দুই বিধবা পুত্রবধূকে নিয়ে হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে নিয়তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেছে মৎস্যগন্ধা। কূটকৌশল, স্বার্থপরতা, ধর্মাচার, যৌনতা তাকে তাড়িয়ে ফিরেছে। ‘মৎস্যগন্ধা’ এক কৈবর্তকন্যার যুদ্ধজয়ের কাহিনি, আবার পরাজয়ের আখ্যানও । ‘মহাভারতে’র পটভূমিতে আধুনিক মানুষের জীবনকথা শুনিয়েছেন হরিশংকর জলদাস। এই উপন্যাসে পুরাকাল ও বর্তমানকাল মিলেমিশে একাকার। ‘মৎস্যগন্ধা’য় হরিশংকরের জীবনদর্শন স্পষ্ট। এখানে তাঁর বাক্য সরল। ভাষা মনোহর। ইঙ্গিতবহ। ভানমুক্ত।
পাঠ্য প্রতিক্রিয়া:
বর্ষীয়ান লেখক হরিশংকর জলদাস এর লেখার ধার নিয়ে নতুন করে তো কিছু বলার নেই৷ তার লেখা এতটা সাবলীল ও প্রাঞ্জল মনে হয় শুধু একটানে পড়ে যাই৷ আর পেক্ষাপট যদি হয় মহাভারতের ইতিহাস নিয়ে রচিত উপন্যাস তাহলে তো কথাই নেই৷
এবারের বইমেলায় কথা প্রকাশের স্টলে দাঁড়িয়ে যখন বইটা পড়তেছিলাম স্থান কাল পাত্র ভুলে গিয়েছিলাম৷ এতটা চুম্বকের মত টেনেছে বইয়ের দাম নিয়ে মাথা ঘামালাম না। কিনে ফেললাম বেখাপ্পা সাইজের বই৷ বইটা পড়ে যে ক্ষুদ্র পাঠ্যনুভূতি জমা হয়েছে তা না হয় আপনাদের সাথে শেয়ার করা যাক৷
অভিশপ্ত মৎসরুপি আদ্রিকার গর্ভে পালিত হচ্ছিলো গল্পের নায়িকা৷ ধীবররাজ সিন্ধুচরণে উঠানে মৎস্যের পেটচিরে জন্ম হয় মহাভারতের এক মহাকাব্যিক চরিত্রের। জন্ম থেকে গায়ে মৎস্যের গন্ধ তাই নামের সাথে সেটে গেল মৎস্যগন্ধা৷ এরপর সে কন্যার জীবনে এল উত্থান পতন৷ কালে কালে তার নাম মৎস্যগন্ধা থেকে পুষ্পগন্ধা, যোজনগন্ধা ছাড়িয়ে সত্যবতীতে এসে ঠেকলো৷
এই গল্পটি শুধু মৎস্যগন্ধার৷ গল্পের প্রয়োজনে যেন চরিত্রায়ন হয়েছে ঋষি পরাশর, রাজা শান্তনু, ভীষ্ম, দেবী গঙ্গা আর কত কি? বিস্তারিত বলতে গেলে তো পুরো গল্পটিই বলা হয়ে গেল। মহাভারত নিয়ে যাদের জানা আছে তাদের কাছে গল্পটা অজানা নয়৷ নতুন পাঠকদের জন্য না হয় স্পয়লার উহ্য রাখি৷
লেখার মান নিয়ে যদি বলতে হয় একেবারে খাসা হয়েছে৷ খুত ধরার কোন উপায় নেই৷ বেশ সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় গল্পটি বলে গেছেন৷ মহা ভারত এমন একটি মহাকাব্য এখানে নতুন করে কারুকার্য করার উপায় নেই৷ তবে এই প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখে শিল্পের ছোঁয়া দেওয়া যায়৷ আর শব্দ শিল্পের কারিগরের হাতে যেহেতু পড়েছে বইটি নিঃসন্দেহে একটানে পড়ার মত৷
তবে বইয়ের কিছু শব্দ প্রয়োগ আমার কাছে তেমন যুতসুঁই মনে হয়নি৷ সব গুলোর উদাহরণ তো টানা যাবে না৷ একটার কথা বলি৷ ৩২৮ নাম্বার পেজের একটা দৃশ্যায়নে দেখা যাচ্ছে সত্যবতী নিয়োগ প্রথার মাধ্যমে তার বংশধারা আগে বাড়াতে চান৷ এ সময় মনে পড়ে তার প্রথম পুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়নের কথা৷ এ ব্যাপারে ভীষ্মের মতামত চান৷ তখন একটা লাইন এমন ছিল৷
"ভীষ্ম ফাঁপড়ে পড়ে গেলেন। কী বলবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না৷"
এখানে ফাঁপড় শব্দটি গল্পের আবহের সাথে একেবারে কেমন জানি অপ্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছিলো৷ এর থেকে দ্বিধা বা সংকট বা সংশয় এই ধরনের শব্দ লাইনটা কে আরও শ্রুতি মধুর করতে পারতো৷
পরিঃশেষে বলতে হয় মৎস্যগন্ধার সাথে আমার বেশ ভাল সময় কেটেছে৷ লেখকের লেখনির মধ্যে জাদু আছে। আপনারা দামের কারণে কিনতে চাচ্ছেন না। নিদ্বিধায় কিনুন৷ টাকার নিদারুণ অপচয় হবে না৷
এবার বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি কিছু না বললেই নয়৷ কথা প্রকাশ এই বইয়ের ব্যাপারে তাদের সেরা কাজটি দেখিয়েছে৷ বইয়ের বাইন্ডিং থেকে শুরু করে, কাগজের মান, প্রচ্ছদ সব কিছুতেই যত্মের ছোঁয়া ছিল। বানান ভুল তো চোখেই পড়েনি৷ এভাবে তারা সেরা কাজ গুলো তুলে ধরুক পাঠকের কাছে৷ শুভ কামনা রইলো৷
বইয়ের নাম :- মৎস্যগন্ধা লেখক :- হরিশংকর জলদাস ধরন :- ঐতিহাসিক+মিথলজিক্যাল উপন্যাস প্রকাশনী :- কথাপ্রকাশ প্রচ্ছদ :- সব্যসাচী হাজরা পৃষ্ঠা সংখ্যা :- ৩৫৯ মুদ্রিত মূল্য :- ৭০০৳
কাহিনী সংক্ষেপ :- মাছের পেটে মানুষের জন্ম হতে শুনেছেন কখনো! অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে তাই না? ঠিক এমনই এক অদ্ভুত ঘটনার মাধ্যমে শুরু হয় 'হরিশংকর জলদাস' এর লেখা "মৎস্যগন্ধা" উপন্যাসের গল্প।
মহাভারতের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের কথা আমরা সবাই কমবেশি শুনেছি। যেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাঁচ পান্ডব ভাই এবং এক'শ এক কুরু ভাইয়ের মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়, লাখ লাখ সেনা মারা যায়, ভারতবর্ষের ভাগ্য নতুন মোর নেয়, শুরু হয় নতুন এক যুগের, কলিযুগ। আমাদের এই উপন্যাসে মহাভারতের সেই সব চরিত্রেরই জন্মের এবং শুরুর গল্প কিছুটা তুলে ধরেছে লেখক। তবে এই গল্প মৎস্যগন্ধার, তাঁর অবিশ্বাস্য জন্ম থেকে জীবন যুদ্ধে লড়াইয়ের, এই গল্প মৎস্যগন্ধা থেকে পুষ্পগন্ধা হয়ে মহারানী সত্যবতীতে পরিণত হওয়ার।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র 'মৎস্যগন্ধা'। রাজা উপরিচরবসুর ঔরস্যে এবং মৎস্য রুপি অপ্সরা অদ্রিকার গর্ভে জন্ম নেয় দুটি মানব সন্তান। ফর্সা ও দেখতে সুন্দর পুত্র সন্তানটিকে রাজা নিয়ে গেলেও কালো ও মাছের আঁশটে গন্ধ যুক্ত কন্যা সন্তানটি থেকে যায় কৈবর্তপাড়ায়। শরীরে মাছের গন্ধ থাকায় মেয়েটির নাম দেওয়া হয় মৎস্যগন্ধা।
মাছের পেট থেকে জন্ম হলেও পুরোপুরি মানুষ মৎস্যগন্ধা লালন পালন হতে থাকে কৈবর্ত পল্লীর দাসরাজা সিন্ধুচরণের ঘরে। সিন্ধুচরণ ও তার নিঃসন্তান স্ত্রী ভবানীর আদর স্নেহে বড় হতে থাকে মৎস্যগন্ধা। কিন্তু সুখ বেশিদিন সয় না তাঁর কপালে। মাত্র উনিশ বছরের যুবতী মৎস্যগন্ধা পেটের দায়ে খেয়া পারাপারের কাজ করতে শুরু করে। এমনই একদিন খেয়া পারাপার করতে গিয়েই যমুনার বুকে ঋষি পরাশর দ্বারা ধর্ষিত হয় মৎস্যগন্ধা।
এরপর শুরু হয় তাঁর অন্য এক লড়াই, শুরু হয় মৎস্যগন্ধার ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। ধর্ষক ঋষির আশীর্বাদেই মৎস্যগন্ধার শরীর থেকে দূর হয়ে যায় মাছের গন্ধ, সেখানে জায়গা করে নেয় তীব্র ফুলের গন্ধ, মৎস্যগন্ধা হয়ে যায় পুষ্পগন্ধা। একে একে পুষ্পগন্ধার জীবন গল্পে হাজির হতে থাকে মহাভারতের অজেয় সব চরিত্ররা। গাঙ্গেয় পুত্র পিতামহ ভীষ্ম, মহাভারতের রচয়িতা 'কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস' সহ অনেকেই আসে মৎস্যগন্ধার এই জীবন যুদ্ধের লড়াইয়ে।
এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে? কোথায় গিয়ে থামবে এই লড়াই? আর কিভাবেই বা মৎস্যগন্ধার এই জীবনের লড়াই রুপ নিবে মহাভারতে? তা জানতে হলে পড়তে হবে বইটি।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:- হরিশংকর জলদাস বর্তমান লেখকদের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের এক জনপ্রিয় লেখক। অনেকদিন ধরেই পড়ব পড়ব করেও উনার লেখা এতো দিন পড়া হয়নি। শেষপর্যন্ত এই মৎস্যগন্ধা দিয়েই লেখকের সাথে প্রথম পরিচয় হলো।
বইটা চলিত ভাষায় লিখলেও অনেক অপ্রচলিত এবং কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করছেন লেখক। অনেক সময় শব্দের অর্থ দেখার জন্য ডিকশনারি দেখতে হইছে। কিন্তু তারপরও উন��র লেখার একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে, আছে আলাদা একটা আকর্ষণ, যেটা পুরো সময়টা আমাকে গল্পের মধ্যে আটকে ধরে রাখছিল। উনি গল্পে এমন সব শব্দ এবং ভাষার ব্যবহার করছেন যেগুলো প্রচলিত শব্দে লিখতে গেলে হয়তো অশ্লীল এবং খারাপ লাগতো। কিন্তু উনার এই শব্দের কারুকাজের কারণেই সেটা খারাপ লাগেনি কখনো।
সেই সাথে উনার উপমার ব্যবহার এবং পরিবেশ ও প্রকৃতির বর্ণনার গুণে প্রতিটি উপাদানই জীবন্ত হয়ে উঠছিল। আর উনি এমন ভাবে চরিত্র গুলো ফুটিয়ে তুলছেন যে পাঠক সবগুলো চরিত্র ফিল করতে পারবে। পড়ার সময় মনে হবে, উপন্যাসে যতগুলো চরিত্র আছে কেউই পুরোপুরি ভালো বা খারাপ না। সবার ভেতরেই কিছু ভালো আর কিছু খারাপ দিক আছে, মানুষ মাত্রই দ্বৈত সত্তার অধিকারী। আর লেখক চরিত্র গুলোর এই দ্বৈত সত্তাটাকেই অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
একজন পাঠক হিসেবে আমি অবশ্যই এই বইটা পড়ার সাজেশন দিবো সবাইকে। যারা ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন তাদের কাছে ইতিহাসের সাথে হিন্দু মিথলজির মিশ্রণে লেখা এই বইটা বেশ ভালোই লাগবে আশাকরি। তবে আগেই যেমন বলছি, অনেক কঠিন কঠিন শব্দের ব্যবহার করছেন লেখক। তাই নতুন বা অপরিণত পাঠক হলে এই বই ভালো নাও লাগতে পারে। তবে পড়তে পারলে অনেক নতুন নতুন শব্দ শিখতে পারবেন। কষ্ট করে কিছু শব্দের অর্থ দেখে নিয়ে পড়ে যেতে পারলে দারুন লাগবে বইটা।
মহাভারতের চরিত্র মৎসগন্ধ্যা কে নিয়ে এই উপন্যাস। মৎসগন্ধ্যা যার অপর নাম যোজনগন্ধা, পুষ্পগন্ধা, কালী। ইনি কুরু রাজা শান্তনুর স্ত্রী, ঋষি বেদব্যাসের মা, গঙ্গাপুত্র দেবব্রতের সৎ মা, ঋষি পরাশরের দ্বারা ধর্ষিতা এক নারী।
তার জীবন সংগ্রামের কাহিনি এই উপন্যাসের পটভূমি। লেখক কালীর সংগ্রামের চিত্রে তাকে মহীয়সী রূপ দিয়েছে। আবার ভীষ্মকে অবিশ্বাস করার ফলাফল বর্ণনার সময় কালীকে চিত্রিত করেছে অসহায়া রূপে। তাই উপন্যাসের কোথাও লেখকের পক্ষপাতিত্ব চোখে পড়েনি।
লেখকের লেখাও সাবলীল। পড়তে পড়তে হাপিয়ে উঠবেন না অন্তত। উপন্যাসের বর্তমান কালের অংশে কালীর জীবণের চিত্র চিত্রিত হয়েছে। এবং অতীত কালের অংশে উঠে এসেছে পরাশর, বেদব্যাস, ভীষ্ম, গঙ্গা, ঋষি বশিষ্ট, মহাদেবের বিভিন্ন গল্প।অতীত ও বর্তমান কালকে সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে নিয়েছেন লেখক। পড়ে দেখতে পারেন। personal rating: 7.5/10
মহাভারত, রামায়ণ এসব পৌরাণিক চরিত্রদের একটা বৈশিষ্ট্য আমার খুব মনে ধরে। সেটা হলো কোনো চরিত্র নায়ক না খলনায়ক এটা পাঠক যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে তার উপর নির্ভরশীল। আমি যখন প্রথম রামায়ণ পড়েছিলাম বিভীষণ কে ধার্মিক এবং সঠিক মনে হয়েছিল। কিন্ত মেঘনাদ বধ কাব্য পড়ার পর মনে হলো "আরেএএএ,এভাবেও তো ব্যাপার টাকে দেখা যায়।" যখন রাজশেখরের মহাভারত পড়েছিলাম সেখানে উচ্চবর্গীয় মানুষদের চরিত্রে নেতিবাচক দিক টা কম।কিন্ত হরিশংকর নিচু বর্ণের হওয়ায় উনি উচ্চবর্ণের মানুষের নিষ্ঠুর আর অনৈতিক আচরণগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।মৎস্যগন্ধ্যা ছেলে কৃষ্ণ ঋষির ধর্ষণের ফসল। তাই সবমিলিয়ে বেশ। ভালো খারাপ মিলিয়েই তো মানুষ। আর এর সেরা উদাহরণ মহাভারতের চরিত্রগুলো।
ছোটবেলায় মহাভারত এতবার পড়েছি যে এখনো মহাভারতের অনেক কিছুই, নাম ধাম আমার মুখস্থ। তবে রাজমহিষী সত্যবতীর পূর্বকথা এত বিস্তারিত জানতে পারলাম এই বইটিতেই। ভাল লাগলো। জন্ম থেকে শুরু করে মৎস্যগন্ধার পুষ্পগন্ধা হয়ে ওঠার গল্প, সেখান থেকে রাজা শান্তনুর স্ত্রী, কুরু বংশের কত্রী হয়ে ওঠা - এ এক বিশাল জার্নি। সাথে গঙ্গাপুত্র দেবব্রতের জন্মপূর্ব ও পরবর্তী কাহিনি, তিনি কি করে ভীষ্ম হয়ে উঠলেন, এবং তার পরবর্তী জীবনের বেশি কিছু সময়ের কথা সবকিছুই বইটিতে পেলাম। তবে একটা ব্যাপার পড়ার সময় খুবই বিরক্ত লাগলো সেটা হচ্ছে- এই কথার প্রচুর রিপিটেশন। এই কারণে বইটা বড় হয়েছে বেশ। এটা না থাকলে বইটা আরো দ্রুত শেষ করতে পারতাম।
জলদাস যা লেখেন তাই ভালো লাগে (প্রেমের উপন্যাস বা গল্প ছাড়া। এখন তুমি কেমন আছো বইটা কিছুটা ভালো লেগেছে রোমান্টিক জনরায়) মৎসগন্ধার শুরুটা চমৎকার। মাছের পেটে বড় হওয়া নারীদেহ লোভের শিকার হয় এক সাধুর। এরপরে কাহিনী আগাতে থাকে। মাঝখানে লেখক একটু বেশি বেশিই বলেছেন বলে কিঞ্চিৎ ঝামেলা লেগেছিল। তবে উনার সব লেখাই আমার কাছে সেরা শুধু সলিড প্রেমের গল্প বা উপন্যাস বাদে।
শুরু থেকে ভালোই ছিলো কিন্তু মাঝে দিয়ে আমার কাছে কেমন জন্য ভালো লাগে নাই পরে আবার সুন্দর করে শেষ হয়েছে । কিন্তু হিন্দু পুরাণ যাদের ভালো লাগে না বা ইচ্ছা নাই জানার তাঁদের পড়া উচিৎ না আর শেষ করে মনে হয়েছে এই গল্প থেকে বাচ্চা পোলাপাইন দূরে থাকাই ভালো।
আমি আশা করেছিলাম বইটি কল্পকাহিনী হবে, মৎস্যগন্ধার সংগ্রাম এবং ধর্ষিত হওয়ার পরে সমাজে দাঁড়ানো সম্পর্কে হবে, নারীর ক্ষমতায়ন সম্পর্কে হবে। তবে পড়ার পর মনে হলো গল্পটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আধিপত্যকে চিত্রিত করেছে ফ্যান্টাসি এবং মিথের সংমিশ্রণে।
গল্পের গতি ছিল মিশ্র। প্রারম্ভে অধ্যায়গুলি চিত্তাকর্ষক এবং একটি দুর্দান্ত প্লট তৈরি করেছিল। কিন্তু মাঝপথে প্লট সম্পূর্ণরূপে ফোকাস হারায়। গল্পটি মাঝপথে বেশ ভাল পরিমাণেই অফ-ট্র্যাক্ট হয়ে যায়। তারপর লেখক আবার কাহিনীর বিন্দু সংযুক্ত করে। কাহিনীর সংযুক্ত খারাপ ছিল না তবে গল্পগুলির সংযোগ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে অনেক ধৈর্য ধরতে হয়েছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে লেখক সংযোগটি সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার জন্য কাহিনীগুলো ভিন্ন ধারায় সাজাতে পারতেন। প্লটেও কিছু ত্রুটি ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। কিছু গল্প অসম্পূর্ণ ছিল, যেগুলো আমার মতে, চরিত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো ।
মৎস্যগন্ধার চরিত্রের বিকাশ অপর্যাপ্ত ছিল। এমনকি তার মধ্যে পরিবর্তনগুলি আকস্মিক এবং অনেক প্রসঙ্গ ছাড়াই ছিল। বাকি চরিত্রের সমর্থনকারী ভূমিকাগুলি মোটেই সহায়ক বোধ হয়নি।
ক্লাইম্যাক্স আমার কাছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে একজন নারীর পরাজয়ের মতো মনে হয়েছে। যদি লেখকের উদ্দেশ্য এটি হয়েও থাকে, তিনি তা ভিন্ন উপায়ে চিত্রিত করতে পারতেন।
শুরুর দিকটা কিছুটা পছন্দ হওয়ার কারণে ২ ষ্টার রেটিং দিয়েছি।