Premendra Mitra (Bangla: প্রেমেন্দ্র মিত্র) was a renowned Bengali poet, novelist, short story writer and film director. He was also an author of Bengali science fiction and thrillers.
His short stories were well-structured and innovative, and encompassed the diverse to the divergent in urban Indian society. The themes of poverty, degradation, caste, the intermittent conflict between religion and rationality and themes of the rural-urban divide are a thematically occurring refrain in much of his work. He experimented with the stylistic nuances of Bengali prose and tried to offer alternative linguistic parameters to the high-class elite prosaic Bengali language. It was basically an effort to make the Bengali literature free from softness, excessive romance and use of old style of writing which were prevalent in older writings.
আমেরিকার নাম "আমেরিকা" না হয়ে "কলম্বিয়া" হতে পারতো। কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ক্রিস্টোফার কলম্বাস জেদ ধরে বসেছিলেন যে তিনি এশিয়া মহাদেশ খুঁজে বের করেছেন, সম্পূর্ণ নতুন একটি মহাদেশ নয়। কলম্বাসের কপাল মন্দ, তাঁকে উপেক্ষা করে আমেরিকা মহাদেশের নামকরণ করা হয়েছে ইতালিয়ান অভিযাত্রী আমেরিগো ভেসপুচি-র নামে। উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা মিলিয়ে গোটা মহাদেশকে সেই সময় "নিউ ওয়ার্ল্ড" নামে ডাকা হতো, অর্থাৎ কিনা পূর্বে অজ্ঞাত সম্পূর্ণ নতুন একটি জগৎ। নতুন জগৎ মানে নতুন সম্ভাবনা। নতুন ধরনের মানুষ। নতুন ধরনের সভ্যতা। নতুন ঐশ্বর্য। নতুন লোভ। নতুন রক্তপাত।
ইয়োরোপীয় ঐতিহাসিকরা ঘটা করে সেই যুগটার নাম রেখেছেন "এইজ অভ ডিসকভারি"— "আবিষ্কারের যুগ"। আবিষ্কারের যুগ ঠিকই, কিন্তু নতুন মহাদেশ কিংবা নতুন সম্ভাবনার আবিষ্কার নয়। সত্যি কথা যদি মানতে হয়, মানুষ নামক একটি প্রাণীর রক্তপিপাসা (অন্য কোনও প্রাণীর নয়, মানুষেরই রক্ত), সম্পদের লালসা, অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতা, অবিশ্বাস্য বর্বরতা, এইসব গুণগুলো নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল সেই সময়। নানারকম বৈজ্ঞানিক উন্নতির হাত ধরে মানুষ যত বেশি "সভ্য" হয়েছে, মানুষের জান্তব নগ্ন রূপটা তত বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের দুঃখ করার কারণ নেই। "মৃত্যুর পরপার" বলে যদি কিছু থাকে, সেখানে বসে তিনি নিশ্চয়ই দেখতে পেয়েছেন, তাঁর খুঁজে বের করা সামুদ্রিক রাস্তা দিয়ে ধেয়ে গেছে একের পর এক পৈশাচিক অভিযাত্রীদের দল, এবং লুটেপুটে তছনছ করেছে "নিউ ওয়ার্ল্ড" নামের সম্পদভাণ্ডারকে।
১৫২১ সালে এর্নান কর্তেস নামের একজন স্প্যানিশ অভিযাত্রী দক্ষিণ আমেরিকার মেহিকো অঞ্চলের "অ্যাজটেক" নামের একটি আঞ্চলিক সভ্যতাকে জয় করেছিলেন। তখনকার এই স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের "কনকিস্তাদর" (conquistador) নামে ডাকা হতো। অ্যাজটেক ছিল একটি সুসংবদ্ধ এবং সম্পদশালী সভ্যতা। পরাজিত এই সভ্যতাকে ধর্ষণ করে, তার সম্পদ লুণ্ঠন করে, পাঠানো হলো স্পেনের রাজার দরবারে। সেই সম্পদের পরিমাণ দেখে রাজাগজা থেকে শুরু করে স্পেনের সাধারণ মানুষ, সবার চক্ষু চড়কগাছ। শোনা গ্যালো এই নাকি শেষ নয়, নিউ ওয়ার্ল্ডে আছে এরকম আরও অনেক সভ্যতা। সেখানে আছে আরও অনেক সম্পদ। অফুরন্ত সম্পদ! ব্যাস, আর কী, কনকিস্তাদর নামের অভিযাত্রীরা দলে দলে পাড়ি জমাতে থাকলো অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে সেই নতুন পৃথিবীতে।
ফ্রান্সিস্কো পিজারো নামের একজন কনকিস্তাদর শুনেছিলেন এমনই একটি নতুন সভ্যতার কথা। সূর্য থেকে যেমন অঝোরধারায় রশ্মি ঝরে পড়ে, সেই দেশে নাকি স্বর্ণের সেরকমই অকল্পনীয় প্রাচুর্য। কিন্তু কোথায় সেই সভ্যতা? কীভাবে যাওয়া যায় সেখানে? দুবার চেষ্টা করেও বিফল হলেন পিজারো। কিন্তু হাল ছাড়লেন না। তৃতীয়বারের চেষ্টায় খুঁজে পেলেন, দক্ষিণ আমেরিকারই নতুন আরেকটি সভ্যতা, আয়তনে এবং প্রাচুর্যে যারা মেহিকোর অ্যাজটেকদের চেয়েও বৃহৎ। সেই সভ্যতার নাম "ইনকা" (বর্তমানে পেরু এবং চিলে নামের দেশ যেখানে আছে, সেখানেই ছিল এই সভ্যতা)। সেইসময় ইনকাদের জনসংখ্যা ছিল এক কোটিরও বেশি। সেখানকার সম্রাট ছিলেন অতুল প্রতাপশালী। বিপুল শক্তিসম্পন্ন তাঁর সৈন্যবাহিনী। এই ভয়ংকর ইনকাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে পিজারোর অধীনে রয়েছে মাত্র... শুনলে হাসি পাবে... মাত্র ১৬৮ জন স্প্যানিশ সৈন্য!
শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা কিন্তু আর হাস্যকর রইলো না। মুষ্টিমেয় ওই কয়েকজন সৈন্য নিয়েই, স্রেফ নৃশংস চতুরতা এবং অবিশ্বাস্য কপালজোরে, ইনকাদের প্রবল পরাক্রমশালী সম্রাট অ্যাতাহুয়ালপা-কে বন্দী করে ফেলেছিলেন ফ্রান্সিস্কো পিজারো! কীভাবে সম্ভব?! হ্যাঁ সম্ভব তো হয়েছিল বটেই, পরবর্তী ঘটনাক্রম ছিল আরো মর্মান্তিক। সুগঠিত একটি প্রাচীন সভ্যতাকে প্রায় চোখের নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল আগন্তুক স্প্যানিশ নেকড়ের দল। প্রেমেন্দ্র মিত্রের "সূর্য কাঁদলে সোনা" উপন্যাসটি ইনকা-বিজয়ের সেই চমকপ্রদ (এবং দুঃখজনক) কাহিনিকে ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। প্রায় চারশো পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি শুধু ঘনাদা সিরিজের নয়, প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা সবচেয়ে বড় উপন্যাস। এই উপন্যাসটিকে বাংলায় লেখা সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করতে আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছি না। যারা ইতিমধ্যে পড়েছেন (কিংবা ভবিষ্যতে পড়বেন) তারাও দ্বিধা করবেন না এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
বাংলা কিশোর সাহিত্যে অনেক দাদা আছেন। এঁদের মাঝে ঘনাদা (ভালো নাম ঘনশ্যাম দাস) একটু অন্যরকম দাদা। যদিও তিনি একজন প্রতিভাবান গুলবাজ, কিন্তু তার গুলমার্কা গল্পগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে বিজ্ঞান কিংবা ভূগোল কিংবা ইতিহাসের কোনও চিত্তাকর্ষক বৃত্তান্ত। সত্যি কথা বলতে, পাঠক হিসেবে বয়স যখন অল্প ছিল, ঘনাদাকে আমি পছন্দ করতাম না। ইশকুলের বইপত্রে বিজ্ঞান ইতিহাস ভূগোলের গুঁতোয় এমনিতেই জর্জরিত হয়ে ছিলাম। গল্পের বইতেও এইসব পড়ে (তা যতোই চিত্তাকর্ষক হোক না ক্যানো) উপভোগ করার মতো ব্রিলিয়ান্ট ছাত্তর আমি ছিলাম না। তাই ঘনাদা-গল্পের মজা পেয়েছি অনেক পরে (ইশকুলের বইপত্রের গুঁতো যখন একটু স্তিমিত হয়ে এসেছে)। অনেক পরে বুঝেছি, প্রেমেন্দ্র মিত্র একজন জিনিয়াস। অনেক পরে বুঝেছি, ঘনাদাকে নিয়ে আরও অনেক বেশি মাতামাতি হওয়া উচিৎ!
"তথাকথিত বাংলা কিশোর উপন্যাস"-এর চাইতে "সূর্য কাঁদলে সোনা" একটু আলাদা। বাংলা কিশোর সাহিত্যে নারী চরিত্রদের সচরাচর দূরে সরিয়ে রাখা হয় (খুকুদের সংস্পর্শে এলেই নির্বোধ খোকারা যদি দুষ্টু হয়ে যায়!) কিন্তু এই কাহিনিতে বেশ গুরুতর দুজন নারী চরিত্র আছেন। তাদের মধ্যে একজন তো আবার গল্পের নায়ককে সিডিউস করতে উঠে পড়ে লেগেছেন! কিন্তু নারীঘটিত ব্যাপারটা বাদ দিলেও আরেকটা বড় রহস্য আছে। এমন দুর্ধর্ষ ঐতিহাসিক প্লট, রচনার এমন চমৎকার শৈলী, গল্পের এতরকম রুদ্ধশ্বাস বাঁকবদল, দুর্দান্ত উপস্থাপনা, আকর্ষণীয় সব চরিত্র (বাস্তব এবং কাল্পনিক, দুরকমই), সবমিলিয়ে এমন জমজমাট এবং রোমাঞ্চে ভরপুর একটি উপন্যাস, যা কিনা অন্য যেকোনো কিশোর উপন্যাসকে দশ গোলে ধরাশায়ী করতে পারে (হ্যাঁ, "চাঁদের পাহাড়"কে ধরে নিয়েই বলছি)— তবু এই উপন্যাসটি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাই নেই। কোনো মাতামাতি নেই। কোনো লাফালাফি নেই। ক্যানো?!
ঘনাদাকে নিয়ে আমার কিঞ্চিৎ শুচিবায়ু আছে। এর কারণ আলী ইমাম; ঘনাদা বা তার স্রষ্টা প্রেমেন্দ্র মিত্র নন। ঘনাদা আলী ইমামের প্রিয় সিরিজ। তিনি তার বিভিন্ন লেখায় ঘনশ্যাম দাসকে দুঃসাহসী ও নির্ভীক অভিযাত্রী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আজ থেকে ২৩/২৪ বছর আগে আমি ছিলাম হাইস্কুলের ছাত্র। তখন ঢাকা শহরে যেতাম না একেবারেই। লাইব্রেরিতে অর্ডার করেও ঘনাদা পাইনি কারণ সিরিজটা এদেশে তেমন জনপ্রিয় নয়। প্রচুর খোঁজাখুঁজি করার পর তুমুল উৎসাহ নিয়ে পড়তে যেয়েই পপাৎ চ! কিছুই তো মেলে না!স্বীকৃতভাবেই ঘনাদার গল্প tall tale বা আষাঢ়ে। তিনি দুঃসাহসী ঠিক আছে কিন্তু সেটা গুল মারার সময়। ঘনাদা যে আষাঢ়ে গল্প ফাঁদেন এ তথ্য আলী ইমাম পুরোপুরি চেপে গেছেন। অনিবার্য কারণেই সিরিজটা পড়ে শান্তি পাইনি; বারকয়েক চেষ্টা করেও। এজন্যই "সূর্য কাঁদলে সোনা" কেনার পরও পড়া হচ্ছিলো না, শুরু করেও বারবার থামতে হচ্ছিলো। অবশেষে পড়��াম, অনেকটা জেদ করেই।কুখ্যাত পর্যটক পিজারো আর তার বাহিনী কর্তৃক ইনকা সভ্যতার পতনের গল্পে রোমাঞ্চের অভাব নেই। কিন্তু ঘনাদা বা তার পূর্বপুরুষের গল্প বলেই কি না জানি না, আমি খুব একটা উপভোগ করতে পারলাম না; মূল কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা জানা থাকা সত্ত্বেও, পরিচ্ছন্ন ও নাটকীয় গল্প থাকা সত্ত্বেও। নিরপেক্ষভাবে বলছি, বইটা ঘনাদা সিরিজের না হলে ভালো হতো।
এই বইটি কেন গুডরিডসে আগে তুলে রাখিনি, এটাই একটা বিস্ময়। বাংলা রোমাঞ্চনোপন্যাসে এর তুল্য সম্ভবত এখন পর্যন্ত কিছু পড়িনি। পড়ব , সে বিশ্বাসও বোধ করি হয় না
এই উপন্যাসটি আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল "ঘনাদা তস্য তস্য অমনিবাস"-এর অংশ হিসেবে। তখন নিতান্তই ছোটো ছিলাম বলে লেখাটার অনেক কিছুই বুঝিনি। পরে লেখাটা আরেকবার পড়ার সুযোগ পাই "ঘনাদা সমগ্র"-র তৃতীয় খণ্ডের অংশ হিসেবে। ততদিনে মাথা থেকে ঘনাদা-সংক্রান্ত অনেক পূর্বারোপিত ধারণা দূর হয়েছে। ইতিহাস নিয়ে কিঞ্চিৎ পড়াশোনারও সুযোগ হয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ঘনশ্যাম দাসের ওই পূর্বপুরুষের উত্থান ও পতন-বন্ধুর অ্যাডভেঞ্চার আমার চোখে একেবারে নতুন চেহারায় ধরা দিয়েছিল। কী মনে হয়েছিল আমার? বাংলায় ইতিহাসাশ্রয়ী অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন এটি— এই নিয়ে কোনো সংশয় নেই আমার মনে। সত্যি কথা বলতে কি কনকুইস্তাদরদের অভিযানে দক্ষিণ আমেরিকায় যে রক্ত ও অশ্রুর স্রোত বয়েছিল, সেই বীভৎস লুণ্ঠন নিয়ে বাংলায় আর কিছুই লেখা হয়েছে বলে মনে হয় না। তেমন ঘটনার ঘনঘটার মধ্যেও কাহিনির নায়ক 'গানাদো' তার বুদ্ধি ও ঘনাদা-সুলভ দক্ষতা দেখিয়েছিলেন একেবারে অনন্য ভঙ্গিতে। আর গল্পের শেষ লাইনটা তো... জাস্ট অসামান্য! না পড়ে থাকলে এক্ষুনি পড়ুন। বাংলায় এমন বই আর হয়নি, হবেও না।
বাংলা সাহিত্যে ইতিহাস-আশ্রিত এডভেঞ্চারের সংখ্যা কম, যা আছে তার মধ্যে এই বইটা বেস্ট হওয়ার যথেষ্ট দাবি রাখে। স্প্যানিশ নাবিক-সৈন্যদের কর্তৃক ইনকা রাজার রাজ্য তথা সোনায় মোড়া দেশ পেরু জয়ের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসকে আশ্রয় করে বাঙালি বিচক্ষণ নায়ক ঘনরাম দাসের আশ্চর্য এডভেঞ্চার কাহিনী। ভাগ্য বিপর্যয়ে ফেরারি গোলাম হয়ে ভাগ্যের নিষ্ঠুরতাকে বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা দিয়ে বারবার জয় করে নেয় আমাদের নায়ক ঘনরাম। এডভেঞ্চার ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য ।
সূর্য অস্ত যায়, কিন্তু রক্তের ছায়া থেকে যায়: প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘সূর্য কাঁদলে সোনা’ পাঠান্তর
কখনও কখনও একটি উপন্যাস কেবল ইতিহাসের পুনর্গঠন নয়, হয়ে ওঠে সময়ের অন্তস্তল ছুঁয়ে যাওয়া এক দীর্ঘশ্বাস। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘সূর্য কাঁদলে সোনা’ পড়তে পড়তে আমার ঠিক এই অনুভূতিটাই হয়েছিল— যখন ছোট ছিলাম, পড়েছিলাম "ঘনাদা তস্য অমনিবাস"-এ, বিশেষ কিছু বুঝিনি। কিন্তু পরে, বয়স বাড়লে, ইতিহাস একটু জানা হয়ে গেলে, এই উপন্যাস যেন চোখের সামনে খুলে দেয় রক্ত-স্বর্ণ-মায়া-মিথের এক পৈশাচিক অথচ মনোহর জগৎ।
প্রেমেন্দ্র মিত্র এই উপন্যাসে আমাদের নিয়ে যান ষোড়শ শতকের সূর্যস্নাত, সোনায় মোড়া এক সভ্যতায়—ইনকা সাম্রাজ্য, আর সেই সভ্যতার পরাজয়, বিদ্বেষ, পতনের উপাখ্যানে। এটি শুধু একটি উপন্যাস নয়, এক ঐতিহাসিক, নৃশংস অ্যাডভেঞ্চার। একদিকে স্প্যানিশ কনকুইস্তাদর ফ্রান্সিস্কো পিজারোর সামরিক হিংস্রতা, অন্যদিকে ইনকা সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য, তাদের ধর্ম, রাজনীতি, পুরাণ—সব মিলে এক অগ্নিস্নান। প্রেমেন্দ্র মিত্র সেই আগুনে পাঠককে ধীরে ধীরে নামিয়ে দেন, যেন কেউ তাকে জাগতিক ক্লান্তি থেকে তুলে নিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছেন সতেরো শতকের পেরুর পাহাড়ে, যেখানে সূর্য কাঁদে, আর সোনা তার কান্না গিলে নেয়।
কিন্তু এই উপন্যাস কেবল ইতিহাস নয়—এ ইতিহাসকে টেনে এনেছেন এক গল্পের ছাঁচে। আমাদের চেনা ঘনাদা নেই এখানে, আছেন তার পূর্বপুরুষ ঘনরাম দাস—এক গোলাম, যিনি ভাগ্যের চাপে হয়ে ওঠেন এক বাঙালি অভিযাত্রী। তার অভিযানের মধ্যে যেমন আছে চাতুর্য, বুদ্ধি, অস্তিত্ব রক্ষা, তেমনি আছে স্বপ্ন, হারানোর ভয়, আর এক ধরণের নির্লিপ্ত বীরত্ব, যাকে ইংরেজিতে বলে stoic courage। ঘনরামের চরিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় অজ্ঞাত সাহসিকতার সেই বাঙালিকে, যে রক্তাক্ত বিশ্ব ইতিহাসেও একটি স্বর রেখে যেতে চেয়েছিল।
প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার এই সুবৃহৎ উপন্যাস কেবল তথ্যভিত্তিক নয়, রীতিমতো চিত্রসম। প্রেমেন্দ্র মিত্র স্পেন, পেরু, ইনকা সমাজের এমন সব বিস্ময়কর তথ্য দিয়ে আমাদের বিস্মিত করেন, যা তিনি সংগ্রহ করেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন ইন্টারনেট ছিল না, যখন ক্যালকাটা থেকে কুস্কোর দূরত্ব ছিল কল্পনারও বাইরে। কীভাবে করলেন? এই প্রশ্ন আমার মাথায় বহুবার এসেছে। ইতিহাসকে এমন সাবলীলভাবে গল্পের শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা প্রেমেন্দ্র মিত্রের মতো লেখকের পক্ষেই সম্ভব।
উপন্যাসের ভিন্নতা এখানেই: এ কিশোর উপন্যাস হয়েও কিশোরসুলভ নয়। এখানে নারী চরিত্রের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ—একজন তো নায়ককে সিডিউস করার চেষ্টাও করেন। আবার, যেভাবে ইনকা ধর্ম, তাঁদের সূর্য-উপাসনা, রাজনীতি এবং সাম্রাজ্যিক শৃঙ্খলা উপস্থাপিত হয়েছে, তাতে লেখক যেন হয়ে উঠেছেন এক chronicler of the vanquished—হারিয়ে যাওয়া এক সভ্যতার বিদ্রূপাত্মক শ্রুতি-সংগ্রাহক।
একটিই আক্ষেপ—এমন এক অতুলনীয় উপন্যাস, অথচ সাহিত্যচর্চায় তার তেমন উচ্চারণ নেই। ‘চাঁদের পাহাড়’ নিয়ে যতটা মাতামাতি হয়েছে, ‘সূর্য কাঁদলে সোনা’ যেন থেকে গেছে সেই সোনালি অন্ধকারেই। অথচ, এই উপন্যাস স্প্যানিশ কনকুইস্তাদরদের বর্বরতা, পেরুর সোনার প্রাচুর্য, ইনকা সভ্যতার সূক্ষ্মতা, আর একজন বাঙালি চরিত্রের বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ—সবকিছুর অনন্য মিশ্রণ।
শেষ কয়েক পৃষ্ঠায় আসে সেই রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধের বর্ণনা—যা পড়লে বোঝা যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র চাইলে একেবারে থ্রিলার জঁরেও রাজত্ব করতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন ইতিহাসের কঠিন পথটিকে, কারণ তাঁর লক্ষ্য ছিল পাঠককে মুগ্ধ করার চেয়ে, সত্যের শরীরটিকে অলঙ্কারের মতো ফুটিয়ে তোলা।
আজ, যখন আধুনিক বিশ্বে পোস্টকলোনিয়াল পুনর্বিবেচনার ঢেউ বইছে, তখন ‘সূর্য কাঁদলে সোনা’ হতে পারে বাংলাভাষায় লেখা অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ উপন্যাস—যা উপনিবেশের গল্প বলে, বিজয়ীর নয়, পরাজিতের চোখ দিয়ে।
একদিন, সূর্য আবার উঠবে, বইবাড়িতে ফিরে আসব আমি, আবার হাতে তুলে নেব এই উপন্যাস, যেন হাতে নিই এক টুকরো ইতিহাস—একসঙ্গে রৌদ্র, রক্ত, আর সোনার গল্প।
আপনি যদি এখনও না পড়ে থাকেন, তাহলে বলতেই হয়: আর দেরি কিসের? ইনকাদের হারিয়ে যাওয়া সোনালী সভ্যতা, আর এক বাঙালির মহাকাব্যিক অভিজ্ঞতা—এই দুয়ে মিলে গড়ে উঠেছে এমন এক উপন্যাস, যা কেবল কিশোর নয়, প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের মনেও চিরকাল রয়ে যায়।