বইটি বাংলাদেশের রাজনীতির উপর ইংরেজিতে লেখকের রচিত ৬ষ্ঠ বই A study of the Democratic regimes এর বঙ্গানুবাদ। বইটিতে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৬ সাল আবধি সংবিধান সংশোধন ও আইন সংস্কারের প্রসঙ্গসহ বিভিন্ন গুরুপ্তপূর্ন বিষয় আলোচিত হয়েছে যেগুলি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। ওই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে জানতে ও বুঝতে সাহায্য করার জন্য লেখক এখানে অত্যন্ত গভীর ও নির্ভুলভাবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রশাসনের রাজনীতিকরণের বিষয়গুলো বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বেশ কিছু পরিবর্তন যেমন উপকারী তেমনি কিছু অত্যন্ত বিতর্কিত যা এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নতির লক্ষে পুনর্বিচার করা প্রয়োজন। এ বইয়ের অপর উল্লেখযোগ্য ও তথ্যবহুল অংশটি হচ্ছে বিচারব্যবস্থায় বিভিন্ন পরিবর্তন ও রাজনীতিকরণের প্রসঙ্গটি যার উপর দেশের গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো-মন্দ গভীরভাবে নির্ভরশীল। আর লেখক স্বয়ং এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বইয়ে আলোচিত সমসাময়িক প্রসঙ্গ, যেমন রাজনৈতিক দলের চরিত্র, একই সঙ্গে ভাবনা উদ্রেককারী এবং তা আলোচ্য সময়ের রাজনীতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছে। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর স্বভাব, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ইনডেমনিটি বিষয় সম্পর্কেও যথেষ্ট তথ্য হাজির করেছেন। সরকার অথবা বিরোধীদলে থাকা অবস্থায়, সবসময়, মওদুদ আহমদ একজন সমালোচনামূলক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি এই বইতে গত ২০ বছরের রাজনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কে গবেষণাসম্বলিত বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন। আর তিনি যে বিষয়গুলো তুলে এনেছেন, সেখানে কোনো কিছুই তাঁর নজর এড়িয়ে যায়নি।
" ২০০৭ সালের ৫ জানুয়ারি লেখক ( অর্থাৎ মওদুদ নিজে) খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনী তাকে নির্বাচনে সাহায্য করবে কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ভাববেন না, সেনাবাহিনী পুরোপুরিভাবে আমাদের সঙ্গে আছে। অত্যন্ত গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে তিনি বলেন, ' সেটা আমার হাতে ছেড়ে দেন। ' "
সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রাণপুরুষ ব্যারিস্টার মওদুদ। "পলিটিক্যাল কারেক্টনেস" বলে একটা কথা আছে। এই কারেক্টনেসের ছিঁটেফোঁটাও নেই মওদুদের মধ্যে। কিন্তু একই ব্যক্তি রাজনৈতিক ইতিহাস লেখক হিসেবে যথেষ্ট শুদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন।" স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা", " শেখ মুজিবের শাসনকাল", "চলমান ইতিহাস" প্রভৃতি গ্রন্থাদি পাঠ করে মনে হয়েছে ডক্টর জেকিল আ্যন্ড মিস্টার হাইডের বাংলাদেশি সংস্করণ মওদুদ।
১৯৯১ থেকে ২০০৬ প্রায় দেড়যুগের রাজনৈতিক ইতিহাস এই বইতে বলার চেষ্টা করেছেন মওদুদ আহমদ। এই দেড়যুগে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল দুইবার এবং আওয়ামী লীগ একবার। বিএনপির আমলে মন্ত্রী ছিলেন মওদুদ। তাই রাজনৈতিক ঘটনাবলির পর্দার অন্তরালের অনেক ঘটনাই আকার-ইঙ্গিতে বলতে চেয়েছেন মওদুদ। ১৯৯১ কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তখন কোন দল সরকার গঠন করবে তা নিয়ে এক সংকট তৈরি হয়। সেই সংকটকালীন কিছু ঘটনা এবং ঘটনার পেছনের ঘটনা লিখেছেন মওদুদ। '৯১ সালে বিএনপি প্রথমদিকে চেয়েছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা বহাল রাখতে। তখন তৈরি হয় সাংবিধানিক সংকট। ক্ষমতাসীনদের অনমনীয়তা বিরোধীদলকে হরতালের মতো কর্মসূচির দিকে ঠেলে দেয়। আওয়ামী লীগও সেই পথ বেছে নেয়। মাগুরা নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের ছাড় না দেওয়ার মানসিকতারই ফল। ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের এই ঘটনা বিরোধীদলগুলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির দিকে প্ররোচিত করেছিল তা মওদুদ স্বীকার করেন। তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ইসরাইলের প্যালেস্টাইনের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করে সংসদে আলোচনায় তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার একটি মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগ ওয়াক আউট করে। এরপরই ধীরে ধীরে দানা বাঁধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন শেখ হাসিনা।
১৯৯১-১৯৯৬ পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে তারেক জিয়ার কোনো ভূমিকা দেখা যায় না। ২০০১ সালে দল ক্ষমতার আসার পর হাওয়া ভবনের উত্থান। মওদুদ নিজে তখন মন্ত্রী ছিলেন। হাওয়া ভবন কীভাবে দুর্নীতির আখড়া ছিল এবং সমান্তরাল সরকারের ভূমিকা পালন করে চলছিল তা মওদুদ নিজে লিখেছেন। বিএনপির আজকের এই অবস্থার জন্য হাওয়া ভবন ও তারেক জিয়ার সবকিছুতে হস্তক্ষেপ কতটা দায়ী তা মূল্যায়নের সুযোগ মওদুদের বইটি দেয়।
মওদুদের দাবি, বড় ধরনের জঙ্গি হামলা প্রথমবার হয় আওয়ামী লীগের আমলে ১৯৯৯ সালের দিকে। তখন দলটি জঙ্গিবাদ দমনে মনোযোগ না দিয়ে বিরোধীদলকে দোষারোপকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। বিএনপি শুধু আওয়ামী লীগের লিগেসি বহন করেছে বলে মনে করেন মওদুদ। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে প্রথমবারের মতো দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হই আমরা। বিএনপি এই লিগেসি ধরে রাখতে সফল হয়।
মূলত, বিএনপি ইসলাম-পছন্দ দল বলে নিজেকে মনে করে। জামাত তখন ক্ষমতার সঙ্গী। তাই ইসলামি জঙ্গিবাদকে প্রথমদিকে গুরুত্ব দেয়নি দলটি। বিএনপির কতিপয় সাংসদ এবং একজন উপমন্ত্রী নিজেই জঙ্গিদের প্রথমদিকে মদদ দিয়েছেন, আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন বলে স্মরণ করেন মওদুদ। দলটি নিজে যখন বুঝতে পারলো ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করেছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবু জঙ্গিদমনে নিজ দলের ভূমিকার সাফাই গেয়েছেন মওদুদ।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপিকে কোনো ছাড় দেয়নি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অসহিষ্ণুতার চর্চায় কীভাবে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করবে তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার কথা লেখক নিজে স্বীকার করেছেন। তবে তার বিশ্লেষণ অনেকটা একপেশে ছিল। বড় বড় অপরাধকে হালকাভাবে দেখানোর চেষ্টা লক্ষ করেছি। বিশেষত, নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু নিয়ে।
ওয়ান/ইলেভেনের পটভূমি আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দলই তৈরি করেছিল। কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা বানাতে সংবিধান সংশোধন, ভুয়া ভোটার ( এই ভোটার সংখ্যা নিয়ে মওদুদ গোঁজামিল দিতে চেয়েছেন৷ তবে ভুয়া ভোটার এক কোটি নয়। অনেক কম ছিল), নির্বাচন কমিশনে হস্তক্ষেপ, হাসানের পরবর্তী বিচারপতিদের কাউকে মেনে না নিয়ে ইয়াজউদ্দিনের মতো মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা বানানো এবং তারপরেও তাকে ন্যূনতম নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে না দেওয়াই ছিল বিএনপির বড় ভুল। এই ভুলের মাশুল দলটি আজও দিচ্ছে, ভবিষ্যতেও দেবে। লগি-বৈঠা নিয়ে মাঠে না নেমে বরং কীভাবে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিতে পারতো আওয়ামী লীগ। কারণ মওদুদ মনে করেন, তখনও নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগই জয়ী হতো। ওয়ান-এলিভেন নিয়ে মওদুদের বিশ্লেষণ সত্যিই পড়ার মতো। যথেষ্ট নিরপেক্ষ।
এই দেশে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র আছে। কিন্তু সংসদে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। আছে ৭০ অনুচ্ছেদ। বহুদল আছে দেশে। দলগুলো নিজেরা কখনোই দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। বিরোধী দলে থাকলে গণতান্ত্রিক প্রথার প্রতি একনিষ্ঠতা, বাকস্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা, সততা, রাজনৈতিক আদর্শ প্রভৃতির সপক্ষে বুলি আওড়ায় দলগুলি। ক্ষমতাসীন দলকে নানা নেতিবাচক বিশেষণে বিদ্ধ করে। অথচ সেই বিরোধীদল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন নিজে পূর্ববর্তী সরকারের চাইতে নিকৃষ্টতর হয়ে ওঠে।
ব্যারিস্টার মওদুদ বুদ্ধিমান মানুষ। ১৯৭৫ সালের ৭নভেম্বর, স্বাধীনতার ঘোষণা প্রভৃতি নিয়ে জিয়ার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। আবার একই ব্যক্তি দলের সমালোচনা করেছেন, ম্যাডাম এবং ম্যাডাম-পুত্রের কতিপয় কার্যকলাপের বিবৃত করেছেন অত্যন্ত বিশ্লেষণী মন নিয়ে। লেখক নিজে ক্ষমতার অংশ ছিলেন৷ দলের ভুল-ভ্রান্তির দায়ভার তার ওপরেও বর্তায়। অস্বীকার করেননি মওদুদ। ভবিষ্যতে নিজের আত্মজীবনীতে সেইসব কথা লিখে যাবেন বলে পুরো বইতে অনেকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পাঠককে।
এই বই নিয়ে বহুমাত্রিক আলোচনা হতে পারে। পক্ষে-বিপক্ষে কথাবার্তা চলতে পারে। তবে স্বল্প পরিসরে এই পাঠপ্রতিক্রিয়ায় সবটা বলা গেল না
মূল বইটি ইংরেজিতে লেখা। বাংলা অনুবাদ করেছেন জগলুল আলম। অনুবাদক সম্ভবত আক্ষরিক অনুবাদে বিশ্বাস করেন। তাই অনুবাদের রুক্ষতা পড়ার আনন্দকে মলিয়ে করে দেয়। দিয়েছে। তাই টানা পড়ার মতো বই হলেও স্রেফ অনুবাদের কারণে দীর্ঘসময় লাগলো শেষ করতে।