কৌশিক জামান একজন অপদার্থ। ইংরেজিতে যাকে বলে- গুড ফর নাথিং। জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে পরাজিত হতে হতে হাল ছেড়ে দেয়া একজন ব্যক্তি। কিছু মানুষ আছে না এক ভুল বার বার করে? তিনিও ঐ কিসিমের।
তাই নিজেকে বন্দী করে রেখেছেন একশ স্কয়ার ফিটের একটা রুমে। রুম ভর্তি শুধু বই আর বই। বই পড়তে পড়তে তার মনে হয়েছে কিছু একটা লিখে ফেলা দরকার। এবং অখাদ্য ছাইপাঁশ কিছু আবর্জনা লিখেছেন যেগুলো প্রকাশক একরকম চাপে পড়ে ছাপিয়ে এখন আফসোস করছেন।
জুনজি ইতোর পাঁচটি ছোটগল্পের মাঙ্গা নিয়ে কৌশিক জামানের অনুবাদে 'জুনজি ইতো হরর মাঙ্গা সংকলন ১'। এতে পাওয়া যাবে জনপ্রিয় এই জাপানি হরর মাঙ্গাকার অস্বাভাবিক, ভয়াল দুঃস্বপ্নের জগত, যেখানে ভয় শুধু চোখে দেখা যায় না–বাস করে মনের গভীরে।
১. দি এনিগমা অফ আমিগারা ফল্ট- এক ভূমিকম্পের পর আমিগারা পাহাড়ে আবিষ্কৃত হয় অসংখ্য মানবাকৃতির গিরিখাদ। অনেক পর্যটক সেখানে যায়, অনেকে গিরিখাদে খুঁজে পাই অবিকল নিজের ছায়া, যার প্রতি আকর্ষণ তাদের এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবিত করে। শুরুতেই একটা ভিন্নধর্মী কনসেপ্টের অন্যরকম হরর গল্প। বরাবরের মতোই ব্যাখ্যাহীন অজানা আতঙ্ক নিয়ে কাহিনী যার শেষটা বেশ ক্রিপি।
২. লং ড্রিম- হাসপাতালে এক মৃত্যুপথযাত্রী নারী যেখানে নিজের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়া নিয়ে আতঙ্কিত, সেখানে অন্য একজন রোগী এমন দীর্ঘ স্বপ্ন দেখে যে, সে বাস্তবের চেয়ে স্বপ্নেই বেশী বেঁচে থাকে। প্রতি ঘুমে তার স্বপ্নের সময় দীর্ঘায়িত হতে থাকে। সংকলনের সেরা কাহিনী আমার মতে। দূর্দান্ত কনসেপ্ট, আর টুইস্টটাও দারুণ, পাঠককে ভাবাবে।
৩. চিল্ড্রেন অফ দি আর্থ- মাটি থেকে প্রতিটি মানুষের সৃষ্টি। কিন্তু কি হবে যদি মাটি নিজ স্পৃহায় কিছু বাচ্চাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে যায়? মাত্র ৬ পাতার কমিকস, একটা শক দেওয়া দৃশ্য বাদে কিছুই নেই।
৪. হিউম্যান চেয়ার- এক লেখিকা একটি চিঠি পায়, যেখানে এক কুদর্শন চেয়ার নির্মাতা তার গোপন কাহিনী বর্ণনা করে। সে তার নির্মিত একটি আরামদায়ক সোফার মধ্যে লুকিয়ে থাকে, অনুভব করে তার ওপরে বসা মানুষদের অস্তিত্ব। কিন্তু যখন সে এক বিশেষ নারীর প্রতি গভীর আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন ঘটনাগুলো ভয়ানক দিকে মোড় নেয়। এডোগাওয়া রেম্পোর ক্লাসিক কাহিনি অবলম্বনে জুনজি ইতোর এই মাঙ্গাটা বানানো। কনসেপ্ট অবশ্যই দারুণ, কিন্তু অলরেডি একটা বাংলা নাটকে এটা দেখে ফেলায় অবাক হই নি। যদিও এটাতে আরও কিছু টুইস্ট আছে। কিছু বিষয় একটু অবাস্তব লেগেছে যদিও, তবে হরর কাহিনী বিধায় তা মেনে নেওয়া যায়।
৫.দ্যা উইন্ডো নেক্সট ডোর- নতুন বাসায় ওঠার পর কিশোর হিরোসি রাতে তার জানালার বিপরীতের জানালায় এক বিকৃত চেহারার ভয়ংকর মহিলাকে দেখতে পাই। পাশের খালি বাড়ির সেই জানালার ওপার থেকে সেই মহিলা শুধু তাকে আহ্বানই করে না, বরং নিজেই আসতে চাই তার কাছে। একটা টিপিক্যাল হরর গল্প, পড়ে ভয়, উত্তেজনা কিছুই হয় নি। লাস্টের প্যানেলটাতে হালকা শক ক্রিয়েট করার চেষ্টা করা হয়েছে শুধু। সবমিলিয়ে আহামরি কিছু লাগে নি।
'উজুমাকি' এর পর আবার জুনজি ইতোর কাজ পড়া হলো, মোটামুটি ভালোই লেগেছে। আর্টওয়ার্ক বরাবরের মতো চমৎকার, চরিত্রগুলোর চেহারায় তেমন স্বতন্ত্রতা নেই। কৌশিক জামানকে বাংলাভাষীদের কাছে এই ভিন্নধর্মী মাঙ্গাকার কাজকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টার জন্য ধন্যবাদ। বর্তমানে জুনজি ইতো ধীরে ধীরে বাঙালি পাঠকদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠলেও, ২০২০ সালে অতটা ছিল না। এই সংকলনের আরও পর্ব বের হলে ভালো হতো।
অদুভূৎ সব চিন্তা-ভাবনা আর তার এক্সিকিউশান নিয়ে সাজানো বইটা। আঁকা যেমন ভাল, লেখাও। শট ডিভিশান খুব পরিমিত। অনুবাদও একদমই সহজ, সাবলীল। মানুষের ভাবনা যে কতোটা সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে, তার উদাহরণ এই বইটা। ভাবার বেলায় চাইলে যে কোন সীমা যে অতিক্রম করা যায়; এই বিশ্বাসটা আমাকে দিয়েছে এই বই। কৌশিক জামানকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি অনুবাদ না করলে, জানাই হতোনা এর সম্বন্ধে।
তবে ফটোকপি ফিলটা ভাল লাগেনি একদম। একটা অন্ধ অনুমান করি, “যদ্দূর মনে পড়ে, বইয়ের সত্ত্ব অনুবাদকের। অপ্রচলিত ঘরানার এই বই ব্যবসা করে কি না করে, সেই ভাবনা থেকে হয়তো ফটোকপি পেইজের জন্ম। পাঠকরা সাহস দিলে হয়তো ছাপা হয়ে আসবে এর দ্বিতীয় মুদ্রণ।” এটা একেবারেই আমার ভিত্তিহীন অনুমান। হতে পারে, মুদ্রণজনিত ত্রুটির শিকার আমার কপিটি। ত্রুটি ছাপিয়ে যে ৪ তারা দিতে পেরেছি, তার কৃতিত্ব বইয়ের।
জুনজি ইতো খুবই পছন্দের একজন মাঙ্গা আর্টিস্ট। দেখে ভালো লাগছে বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে ওর বই। যে রকম উদ্ভট, অদ্ভুত ও পরাবাস্তব ওর গল্পের প্লট ও সেটিং তাতে খুব যে পাঠকের আনুকূল্য পাবে তা হয়তো বলা যায় না। বরং উল্টাটা ঘটার সম্ভাবনাই বেশী। তা সত্ত্বেও বইটা প্রকাশের দুঃসাহস দেখানোয় প্রকাশনীকে সাধুবাদ জানাই।
দু'একটা বিক্ষিপ্ত ঘটনা বাদ দিলে অনুবাদ সাবলীল, ঝরঝরে, স্বচ্ছন্দ। মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়ে নাই। ওভার অল, উপভোগ্য। চার তারা পাওয়ার মত উপভোগ্য।