সাধু আর পাগল ছাড়া পরিকল্পনা সবার থাকে। আমাদের নায়কের এক পরিকল্পনা ছিল। একজনকে পুতুল নাচ দেখাতে নিয়ে যাবে। কিন্তু, আচমকা ঝড় প্রকৃতিতে আসে কেবল বৈশাখ আর আশ্বিনে কিন্তু মানুষের জীবনে আসতে পারে যেকোনো সময়। জীবিকার তাগিদে তাকে বাবা আর ভাইয়ের সাথে চলে যেতে হলো কাঁটাতার পেরিয়ে ওপারে। ঘটনাচক্রে পথের সাথীদের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো তার। সহায় সম্বলহীন এক কিশোর আটকে গেলো পরভূমে। এ গল্প এক সংগ্রামের। এ গল্প এক প্রতিজ্ঞার। এ গল্প অচেনার চেনা হয়ে ওঠার। এ গল্প নৃশংসতার, এ গল্প প্রতিশোধের। নিজের মাটি আর রক্তের টানে অদম্য হয়ে ওঠা এক কিশোরের গল্প। মুহুর্মুহু ঘটনাপ্রবাহে বাঁক নেয় কাহিনী। সে কি ঘরে ফিরতে পারবে? কলিযুগের অভিমন্যু কি পারবে চক্রবুহ্য ভেদ করতে? নাকি, সেই মহাভারতের বিধান আবার ফিরে আসবে? এখনো বুহ্যের কোণায় কোণায় ওত পেতে থাকে কাপুরুষ আর লোভী সপ্তরথীরা। আর তাদের মাঝ দিয়ে এগিয়ে যায় নির্ভীক অভিমন্যু।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় বর্ডারের এক গ্রামে বসবাস রবি নামের এক ছেলের। জীবিকা নির্বাহের জন্য বাবা, ভাই ও এলাকার গরু দালাল মাধবকে নিয়ে চোরাই পথে গরু নিয়ে আসতে পাড়ি জমায় কাঁটাতারের ওপারে ইন্ডিয়ায়। রবি শান্তশিষ্ট স্কুল পড়ুয়া এক বালক বর্ডার পার হওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই যেতে বাধ্য হয়। যাত্রায় বুঝতে পারলো কতো ভয়াবহ কষ্টকর রাস্তায় পা দিয়ে ফেলেছে কিন্তু রবি নিজেকে নত করেনি। আফসোস ঘটনাক্রমে সবাইকে চিরতরে হারায় সীমান্তের কোন এক জঙ্গলে। শুরু হয় সেদেশেই বেঁচে থাকার লড়াই অজানা দেশ এবং দেশের মানুষ তাছাড়া সাথে আছে স্বজন হারানোর বেদনা। পেটের খুদা আর থাকার জন্যে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। জীবন সংগ্রামের টিকে থাকার লড়াইয়ে যখন যুদ্ধ করতে হচ্ছে তখনই জানতে পারলো কে বা কারা তার এই আজকের পরিনতির জন্য দায়ী। চলার পথে পরিচয় হলো নন্দু নামের সমবয়সী এক ছেলের যে কিনা তার কাকার চায়ের দোকানে কাজ করে তিন বেলা খাবারে বিনিময়ে। কাজের সন্ধানে পরিচয় হলো মাদকদ্রব্য জুয়ার হোতা বীরু এবং তার বাহক নিতাই। বীরু যথেষ্ট ঠান্ডা মাথার মগজ, বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারি। শুরু হলো রবির তাদেরকে সাথে নিয়ে প্রতিশোধ প্রতিশোধ খেলা এখেলা মোটেই সহজ কিছু নয় জীবন মরণ খেলা। খেলায় কি হয় জানতে পড়ে ফেলতে হবে দিবাকর দাসের অভিমন্যু বইটি।
দিবাকর দাসের প্রথম বই পড়ি পঞ্চম সেই বই পড়েই উনার অসাধারণ লেখনী উপলব্ধি করি। বরাবরের মতো এই বই পড়ে আমি বিস্মিত অসাধারণ ভাবে সহজ সাবলীলভাবে বর্ণনা করে গেলেন। মোট কথা ৩৮০ পৃষ্ঠার এই বইটি খুব উপভোগ করেছি। কিন্তু দুইটা যুক্তি মেনে নিতে পারলাম না ১. বাংলাদের বাংলা ভাষা ইন্ডিয়ায় ব্যবহার করার পরও বুঝতে পারলো না সে ওপারের?? ২. রবি এক বালক আর দুইজন সামান্য মাদকাসক্ত লোক চারজন প্রশিক্ষিত আক্রমণাত্মক সরঞ্জামাদির সহিত আর্মি সদস্যদের খালি হাতে এতো সহজেই ঘায়েল করে ফেললো?
থ্রিলারে প্রয়োজনীয় ডিটেইলিং আমার কাছে অনেকটা অলঙ্কারের মত মনে হয়। আর তার সাথে দুই একটা দারুন কোটেশন যেন বিরানির ভেতর আলুর মতই সুস্বাদু! কিন্তু তাই বলে প্রতি প্যারাই প্যারাই দর্শনের বুলি লবঙ্গ বা এলাচের থেকেও বিরক্তিকর৷
গল্পের মাঝের অংশের কিছু ব্যাপার আসলেই প্লটহোল নাকি লেখকের সীমাবদ্ধতা তা জানার ইচ্ছা থেকে লেখকের অন্যান্য বই পড়ার আগ্রহ যেমন বেড়ে গেছে তেমনি অভিমন্যুর খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলো করে ফেলেছেন নড়বড়ে।
সত্যি বলতে লেখার প্যাটার্ন এর দিকে যদি একটু ইগনোর করতে পারি তাহলে লেখকের সাবলিলতা আমাকে শেষ পর্যন্ত টানতে সাহায্য করেছে৷ আর যে বিষয় গুলো আমাকে টানে নি, সেগুলো পাঠক সমাজের নতুন রিডার্স দের ক্ষেত্রে তেমন ইমপ্যাক্ট পরবে বলে মনে হয়না৷ আসলে পরেও নি, দুই একজনের কাছে ছাড়া অভিমন্যু ছিল অন্যতম সেরা সামাজিক থ্রিলার।
তবে লেখক এর আরো অনেক বই পড়ার ইচ্ছা আছে, মন থেকে চাই এই অতিরঞ্জিত ব্যাপার গুলো তিনি কাটিয়ে উঠুক আর আমাদের সাহিত্যে দারুন সব মৌলিক বই যুক্ত করতে থাকুক৷
'... এক চিলতে সাদা মেঘের নিচে এক চিলতে জমিতে অশ্রু খেলা চলছে... মেঘের ওপাশে কি কেউ দেখছেন? যিনি হাসেনও না, আবার কাঁদেনও না। যিনি অনুভূতিশূন্য, আনন্দ আর ব্যাথার ঊর্ধ্বে। নাকি তিনিও হাসেন। মাঝে মধ্যে কাঁদেন। নিজ সৃষ্টি বৈচিত্র্যে নিজেই মুগ্ধ হয়ে যান। কে জানে...'
কী সাবলীল্ভাবে বলে দিয়েছে কি নিগূড় কথা, তাই না? বইটা নাকি রিভেঞ্জ থ্রিলার! ক্রাইটেরিয়াগত ভাবে হতে পারে। আমার কাছে রিভেঞ্জ থ্রিলার থেকেও বড় হয়ে এসেছে গভীর জীবনবোধ। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে জিজ্ঞ্যেস করলে আমি থ্রিলার বলবো না। সামাজিক-থ্রিলারের মাঝামাঝি কিছু একটা হবে তবে আমি সামাজিক ই বলবো। স্টোরিটেলিং অনেক আরামদায়ক। আরাম লাগসে পড়তে। সাথে আছে মাটি আর দুটো সীমানার কাটাতার দিয়ে আলাদা করে ফেলা দুইটা ভুখন্ডের মানুষের অনুভূতির ব্যবচ্ছেদ! স্টোরি টেলিং এ শুধু একটি সমস্যা ভিন্ন সবটুকু মাইন্ড ব্লোয়িং। একদম মাস্টার ক্লাস। সমস্যা টা শেষে বলবো। তবে অবাক করা ব্যাপার, বইটা যেরকম, তা মাস্টার ক্লাস হোক আর যেমন তেমন হোক; বই টা নিয়ে যে পরিমাণ হাইপ আর তর্ক বিতর্ক হবার কথা তার কিচ্ছু হয়নি। হয়ত উপন্যাস টার কথা জানেই কম লোকে। ইভেন আমার ও হয়ত পড়বার কথা ছিলো না। আমি গোটা দশেক একদম পিওর এপিক বলেন বা একদম হার্ডকোর থ্রিলার বলেন, সেরকম উপন্যাস টানা পড়ছিলাম। ছুটছিলাম খুব জোরেশোরে। একঘেয়েমী আসলো। খুজছিলাম সফট কিছু একটা। 'সীমান্তের কাটাতারের বেড়ার এপার-ওপারের দুই গ্রামীণ জীবন, কিশোর-কিশোরীর প্রেম, বন্ধুত্ব সাথে আছে রিভেঞ্জ থ্রিলার, এডভেঞ্চার'- এরকম একটা রিভিউ দেখে হাতে নিয়েছিলাম। বইটা কেমন দেখতে যেয়ে খোলার পরে যখন মাথা তুললাম, ততখনে ঢুকে গেসি বই এর ভেতর আমি! কয়েক অধ্যায় পড়া শেষ! বই এর প্রথম অর্ধাংশ বা তার ও বেশি পর্যন্ত উপন্যাস টাকে আমার সামাজিক উপন্যাস ই মনে হইসে। পরে শেষ বেলায় বুঝলাম নাহ থ্রিলার ও বলা চলে।
যা এক্সপেক্টেশান ছিলো, এর আগে লেখকের একটা বই পড়েছিলাম। রীতিমত বিরক্তির কাছাকাছি ছিলো প্লটের কারনে। ওয়েল এবার সব পুষিয়ে গেলো।
বলেছিলাম একটি সমস্যা ভিন্ন বাকী সব ঠিক মনে হয়েছে। সমস্যাটি হচ্ছে, উপন্যাসের প্রথমদিকের মাত্রাতিরিক্ত কিছু দর্শন। যেকোনো একটা ঘটনা দেখানোর শুরু বা শেষে লেখক সেই ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করছেন অর্থাৎ দর্শন এড করছেন। প্রত্যেক টা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই। জিনিস টা হচ্ছে, 'Show but Don't Tell' কিন্তু লেখক গল্পটা খুব সুন্দর করে দেখাচ্ছেন। দেখানোর ফাকে ফাকে- প্রত্যেক টা ছোট বড় ঘটনার আগে-পরে গল্পটা বলছেন ও। মানে আমি দর্শন পাচ্ছি। দর্শন মোটেও খারাপ না। কিন্তু ডিটেইলিং এর মতো এইটাও তরকারির লবণের মতোই। উপন্যাসের প্রথম অর্ধেকে যা বেশি হইসে যা বিরক্তির উদ্রেক ঘটাইসে। শেষের দিকে আসতে আসতে আবার একদম ব্লেন্ড হয়ে গেছে।
বই এক তৃতীয়াংশ পেড়োবার পরে স্টোরি আর প্লটের গতি বেড়ে দ্বিগুন হয়ে গেসে। কিন্তু লেখকের মধ্যে কোনো তাড়াহুরো পাইনি! বরঞ্চ আমার ই মনে হচ্ছিলো যে, একেক লাইন এক লাফে শেষ করে পরে কি হইসে তাড়াতাড়ি দেখি। কিন্তু স্টোরিটেলিং এ লেখক একদম শেষের দিকে একটা সময় পর্যন্ত এসে তাড়াহুরো করেন নাই। যা সচরাচর অনেক ক্ষেত্রে অনেক গুণীজনের লেখাতেও তাড়াহুরো চোখে লাগে। তবে একেবারে শেষের উপন্যাস সমাপ্তি টানবার অধ্যায় দুইটা তে হালকা তাড়াহুরা পাইসি মনে হইসে। এটা হতে পারে আমার এক্সপেক্টেশান জনিত এনিওয়ে।
প্রশ্ন ওঠাবার মতো ফাক যে একেবারে নেই তা নয়। তবে মায়াবী স্টোরিটেলিং এ বেশ মুগ্ধ হয়েছি। খুত ধরে মুগ্ধতা উগড়ে দিতে ইচ্ছা করছে না। রবি, বীরু, নিতাই আর নন্দুর কেমিস্ট্রি টা মনে থাকবে দীর্ঘদিন <3
তুমুল প্রশংসা প্রাপ্ত বই 'অভিমন্যু' অনেক দিন থেকে লিস্টে ছিলো। শিরোনাম প্রকাশন এর মাধ্যমে বইটা আবারো প্রকাশ পায়। বইটা পড়ার পর মনে হলো আসলেই বইটা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। ব্যাতিক্রমী প্লটে লেখক এক দারুণ গল্প লিখেছেন। বইটা পুরোপুরি থ্রিলার না। সামাজিক উপন্যাসের আবহের সাথে একটা সার্থক রিভেঞ্জ থ্রিলার। সাদামাটা চরিত্রের মাধ্যমে যে একটা চমৎকার থ্রিলার লিখা যায় তা এই বইটা পড়ে বুঝা গিয়েছে। প্রতিটা চরিত্র লেখক সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। লেখক প্রকৃতির বর্ণনা অনেক দক্ষ হাতে ফুটিয়ে তুলেছেন। হঠাৎ মনে হবে আপনিও রবির সাথে সেই সংগ্রামে আছেন জঙ্গলে। লোভ, সংগ্রাম,ভালোবাসা, প্রতিশোধ এক ব্যাতিক্রমী উপন্যাস। বইটা প্রথম থেকে গতিশীল, শেষের দিকে এসে আরো গতি ধরেছিলো বইটা আর সুন্দর এক সমাপ্তিতে বইটা শেষ হয়েছে। আশা করি বইটা পাঠকপ্রিয়তা পাবে আবারো।
যা ভালো লাগে নি: লেখক বইয়ের কিছু কিছু জায়গায় মাত্রাতিরিক্ত দর্শন নিয়ে এসেছেন। প্রথম প্রথম দর্শনের জায়গা ভালো লাগলে শেষের দিকে বিরক্তিকর লেগেছে। অন্যদের ভালো লাগতেও পারে বেশি পরিমাণের দর্শন। এটা ছাড়া পুরো বই সুখপাঠ্য।
অভিমন্যু। অর্জুনের পুত্র, কৃষ্ণের ভাগনে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দ্রোণাচার্যের চক্রবুহ্য ভেদ করে, বীরের মতো একাই লড়াই করেছিলেন অভিমন্যু। কিন্তু চক্রবুহ্য থেকে ফিরে যাওয়ার উপায় জানা ছিলো না তার। একের পর এক কুরুসেনাকে ঘায়েল করে, কুরু মহারথীদের একত্রিত হামলায় অসংখ্য তীর শরীরে নিয়ে মারা গেলেন অভিমন্যু।
মহাভারতের এই বীরকে কলিযুগে ফিরিয়ে এনেছেন লেখক দিবাকর দাস, তার 'অভিমন্যু' উপন্যাসে। বাংলাদেশের গ্রামের সাধারণ এক কিশোর রবিউল, সকলে ডাকে 'রবি' বলে। বন্ধুদের সাথে হালকা নেশাভাঙ্গ, প্রেমিকা সখীকে নিয়ে সুখী ভাবনা, আর কম বয়সের গরম রক্তের কারণে 'বড় হওয়ার' আকাঙ্খা নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলো। জীবন বদলে গেল, যখন বাপ - ভাইয়ের সাথে বর্ডার পেরিয়ে ভারত গেলো চোরাই পথে গরু পাচার করতে। বিএসএফের গুলিতে মারা গেল সঙ্গী তিনজন। ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেল রবি, কিন্তু কখনো কখনো বেঁচে থাকাটাই অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। পেটের দায় টেনে নিতে লাগলো তাকে অন্ধকার পিচ্ছিল পথে৷ বাড়ি ফেরার ইচ্ছে থেকেও অনেক বড় লক্ষ্য পেয়ে গেল রবি, যেদিন জানতে পারলো তার স্বজনদের মৃত্যু এক গভীর ষড়যন্ত্রের ফল। বুকের ভেতর জ্বলে উঠলো প্রতিশোধের আগুন। একালের অভিমন্যু রবি'র এবার আর হেরে যাওয়ার উপায় নেই। শত্রুবধ করে চক্রবুহ্য ভেঙ্গে ফিরতেই হবে।
'অভিমন্যু' উপন্যাসটিকে শুধুমাত্র রিভেঞ্জ থ্রিলার বা সামাজিক উপন্যাস - কোনো একটি ধারায় ফেলে দেওয়া চলে না। দুটি ধারারই পর্যাপ্ত উপকরণ নিয়ে গল্পটি গাঁথা হয়েছে। সীমান্তবর্তী মানুষের সামাজিক জীবনের বিশদ বর্ণনার পাশাপাশি অপরাধ জগত এবং প্রতিশোধের একটি জমজমাট গল্পও এখানে পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ - ভারতের সীমান্ত সমস্যা নিয়ে এর আগে তেমন পড়া হয়নি। ভারতীয় আর্মির শ্যুট অন সাইট নীতির কারণে, নির্বিচারে মারা পড়ে অনেক বাংলাদেশী। কাঁটাতারের বেড়ার দু'পাশে যাদের বসবাস, তারা এই বেড়াজালের মর্ম বুঝে না। পাসপোর্ট তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয়। বৈধ বা অবৈধ - বিভিন্ন তাড়নায় এই বেড়া তাদের প্রতিনিয়ত পার করতেই হয়, আর সেটাই তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে কাজে লাগায় কিছু সুযোগ সন্ধানী, কারন অবৈধ পথে চলতে গিয়ে কেউ মারা গেলে কোনো পক্ষের প্রশাসনের কাছেই সহানুভূতি পাওয়ার আশা নেই।
এমনই কিছু সুযোগ-সন্ধানীর কুচক্রের শিকার রবি চরিত্রটি৷ উপন্যাসের শুরুতে যে ছিল সতেরো বছর বয়সী চঞ্চল চিত্তের এক কিশোর। বিধাতা তাকে ঠিকমতো প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ না দিয়েই কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষায় ফেলে দেন। রবির মধ্যেও সেই কাঠিন্য বিস্তৃত হয়। সখীর ভীরু প্রেমিক পরিনত হয় ঠান্ডা মাথার খুনিতে। রবির চরিত্রের এই পরিবর্তন লেখক ঘটিয়েছেন সুচারুভাবে।
গল্পের মূল চরিত্র রবি হলেও, তাকে ছাপিয়ে নায়ক হয়ে উঠেছিল বীরুদা৷ বীরুদা সেইসব মানুষদের একজন, যাদের কর্ম শুরু হয় আঁধার নামার পর। বর্ডারের অন্ধকার জগতে যা কিছু ঘটে, তার প্রায় সবকিছুতেই জড়িয়ে আছে বুদ্ধিমান এই লোকটি। তাই বলে সে একেবারে মানবিক নীতিবিবর্জিত নয়। সন্ত্রাস তার লেবাস হলেও, অন্তরে বীরু একজন দার্শনিক।
আরেকটি ভালো লাগার মতো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র 'নন্দকুমার।' তার সরলতা আর বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা মনে দাগ কাটার পর। নিতাই, অমল বোস এবং ক্যাপ্টেন নিখিলের চরিত্রও লেখক তৈরী করেছেন যত্নের সাথে৷ লাশের গালে পোড়া সিগারেট চেপে ধরে মুখাগ্নি করার দাবি করা, নিরস্ত্র মানুষদের হত্যা করার পর অধীনস্থদের 'শুট টু কিল'র পাঠ দেওয়া পাঠকের মনে সফলভাবে নিখিলের প্রতি ঘৃণার উদ্রেক ঘটাবে।
উপন্যাসটি শুরুতে একটু অনীহা নিয়ে পড়লেও, কিছুটা এগোনোর পর আপনাতেই পাঠককে টানবে। প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা, প্রতিশোধ গ্রহণ এবং টিকে থাকার সংগ্রাম চিত্তাকর্ষক ছিলো। যদিও কাহিনী থেকে কিছুটা মেদ ঝেড়ে ফেলা সম্ভব ছিল। কেবল পড়তে গিয়ে থমকে যাচ্ছিলাম বারবার, বর্ণনায় ধারাবাহিকতার অভাবে। লেখক একবার বলছেন নন্দু ভারী নিঃশ্বাস ফেলে ঘুমাচ্ছে, পরের পাতাতেই জানাচ্ছেন সে আদতে জেগেই আছে! কিছু কিছু ক্ষেত্রে গল্পটি একটু ছেলেমানুষী পর্যায়ের, পিকনিক স্পটে দড়ি টেনে গাছ নাড়ানো পড়ে মনে হচ্ছিলো মুহম্মদ জাফর ইকবালের কোনো কিশোর উপন্যাস পড়ছি। সেগুলো রবির কিশোর মনের সাথে তাল মেলাতেই হয়তো এভাবে উপস্থাপন করা। রবির সতেরো বছরের তুলনায় তার চরিত্রটিকে দিয়ে লেখক অনেক অসাধ্য কাজও করিয়ে নিয়েছেন, যার কতকটা ঠিক যুক্তিগ্রাহ্য মনে হয়নি।
সজল চৌধুরীর করা প্রচ্ছদটি চমৎকার। ছাপা এবং বানানে গোলমাল ছিলো, সমোচ্চারিত শব্দের ব্যবহারে বেশ বিভ্রান্তি লক্ষ করার মতো। লেখকের প্রাঞ্জল লেখনী এসব সমস্যাকে এড়িয়ে যেতে অনেকটা সাহায্য করেছে। সবমিলিয়ে 'অভিমন্যু' উপন্যাসটি ভালো লাগার মতো, তবে আরো ভালো হওয়ার অনেকটাই সুযোগ ছিল।
কিছু বই শুরু করার আগে মনে হয় কি জানি কেমন হয়। কয়েক পেইজ পড়ার পর কাহিনী না আগালে আরও প্যারা লাগে। অভিমন্যু এরকমই অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু একটু যখন গল্পের ভিতরে প্রবেশ করলাম, মজাটা আস্তে আস্তে টের পেতে থাকলাম। দিবাকর দাসের লেখনী দারুন। আর সেই লেখনীর স্রোতে গল্প দ্রুত আগাবে আর সে গল্প টান টান উত্তেজনায় ধরে রাখবে আপনাকে।
মানুষের কোনো সরল রেখা নয়,এটি অনেকটা পেচানো বক্ররেখার মতো। আর খেটে খাওয়া অভাবগ্রস্থ মানুষ প্রতি মুহূর্তে জীবনের সেই বক্রতার দীর্ঘশ্বাস উপলব্ধি করে। সবসময় জীবন একই নিয়মে চলবে না, এই দুনিয়ায় লড়তে হয়, শিখতে হয়, মারতে হয়,মরতে হয়।
ছোটবেলায় আমাদের কোনো বাঁধা,ধরা নিয়ম নেই। মন চায় তো বন্ধুদের ঘুরি, আড্ডা দিই, খেলি। কিন্তু এই সময় সারাজীবন থাকে না। হয়ত কারো জীবনে আকস্মিক পরিবর্তন, কারো টা ধীরে। কিন্তু যারা দুবেলা দু মুটু ভাতের জন্য লড়াই করে, তাদের অনেক চড়াই উৎরাই পার হতে হয়। বিপদ সৃষ্টিকর্তার সাথে সাধারণত ব্যবধান কমায়, আর সচ্ছলতা সে দূরত্ব বাড়ায়। তাই সর্বশক্তিমান বিপদ নামক পরীক্ষার ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে নামিয়ে দেন মানুষকে। তিনি সবার মঙ্গল চান। নিশ্চিতভাবেই ব্যবধান কমাতে চান তিনি।আমরাই কেবল নানা অজুহাতে দূরে সরে যাই।
উপন্যাস থেকেঃ
গল্পটা রবি নামক এক কিশোরকে নিয়ে,গল্পটা সীমান্তবর্তী দুটো গ্রাম নিয়ে। রবি একজন সাধারণ শান্ত, শিষ্ট মাঝেমধ্যে বেপরোয়া হয়ে উঠা এক কিশোর। তার জীবনটা বন্ধু, দৌড়াদৌড়ি, স্কুল নিয়ে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ঐ যে আমাদের পরিবর্তন আসে, রবিরও এসেছিল।বাবা-ভাইয়ের সাথে মাত্র সতেরো বছর বয়সে সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি জমায় বিপদসংকুল পাশের দেশে। তার বাবার ব্যবসা হলো অবৈধ উপায়ে গরু চালান দেওয়া। এই কাজে ঝুঁকি আছে, লুকিয়ে আছে হিংস্র শ্বাপদরা।কিন্তু রবির এসবের কোনোদিন মুখমুখি হয়নি, এটাই তার প্রথম যাত্রা। আস্তে আস্তে বুঝতে পারে তার সামনে কঠিন বিপদ। অজানা জঙ্গল,অস্ত্র ধারি শত্রু লুকিয়ে আছে তাদের ঘায়েল করার জন্য।
একসময় সে তার বাবা-ভাই কে চিরতরে হারিয়ে ফেলে সেই দূর্গম জায়াগায়। তারপর রবির জীবনের লড়াই শুরু হয়,সেই দূর্গম আচেনা জায়গায় পেটের ক্ষুধা, অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচে। ঘটনাক্রমে রবি জানতে পারে কারা তার পরিণতি তার আপনজনের হ*ত্যাকারী। তারপর শুরু হয় প্রতিশোধের খেলা। এ গল্প রক্ত আর মাটির টানে অদম্য হওয়া এক ছেলের গল্প। সে ফিরতে চায় নিজ ঘরে।সে কি পারবে এত নৃশংস বিপদ পেরোতে?
ব্যাক্তিগত মতামতঃ
এটাকে আমি পুরোপুরি থ্রিলার বলব না, বরং সামাজিক উপন্যাসের আদলে থ্রিলার এডভেঞ্চার উপন্যাস । একটা পার্ফেক্ট রিভেঞ্জ থ্রিলার। লেখক খুব সুন্দর ভাবে সীমান্তবর্তী দুটি গ্রামের বর্ণনা দিয়েছেন।কাটাতারে আলাদা করে ফেলা দুটি ভূখণ্ডের মানুষ অনুভূতির আখ্যান। বলাই যায় লেখকের লেখনী ভালো। স্টোরি টেলিং অনেক আরামদায়ক। পড়ার সময় আরামসে পড়তে পেরিছি। লেখক ডিটেইলে আলোচনা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন গ্রামীণ জীবনের পরিবেশ, নিম্নবিত্ত মানুষের সংগ্রাম। এক কিশোরের বিপদ আর প্রতিশোধের মধ্যে দিয়ে পরিণত হওয়া। লেখক এখানে গল্পের প্রধান চরিত্র রবির অবস্থার সঙ্গে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনপুত্র অভিমন্যু চক্রব্যূহে আটকা পড়ার ছাপটা তুলেছেন। কারণ রবি সীমান্তের অপারে গিয়ে অজানাতেই রহস্যের জালে আটকা পড়ে।
বইটা শুরু থেকে গতি নিয়ে চললেও, শেষ ভাগে গিয়ে গতি আরও বেড়ে যায়।অনেকেই বলে এরকম উপন্যাসে লেখক শেষটা তাড়াহুড়ো করেন। কিন্তু লেখক এখানে দক্ষ হাতে সঠিকভাবেই ইতি টেনেছেন।গল্পটাকে আমি মাস্টারক্লাস বলব না, কারণ সেটা আমার পাঠক বন্ধুই নির্বাচন করবেন।তবে একটা উপন্যাস যে যে উপাদান গুলো থাকলে পাঠক পছন্দ করেন, সেগুলোর সবটাই রয়েছে অভিমন্যু তে। আমার অভিজ্ঞতা হলো পুরো উপন্যাসটাই একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে শেষ করেছি। অবাকও হলাম এরকম একটা উপন্যাস নিয়ে আলোচনা নেই কেন। বইটা নিয়ে তর্ক বিতর্ক হওয়া দরকার।
চরিত্রায়নঃ
এতক্ষণে বুঝতেই পেরেছেন উপন্যাসের মূল চরিত্র রবি। রবি চরিত্রটিতে সেই ছন্ন ছাড়া কিশোর থেকে প্রতিশোধ পরায়ণ যুবকের ছায়া ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। সেই সাথে আছে তার চলার পথে পরিচয় হওয়া নন্দু নামের তার সমান বয়সী এক ছেলে। নন্দু তিনবেলা খাবারের বিনিময়ে তার চায়ের দোকানে কাজ করে। কাজের সন্ধানে পরিচয় হলো মা*দ*ক দ্রব্য জুয়ার হোতা বীরু ও তার সঙ্গী নিতাইয়ের সাথে। তাদের সাথে নিয়ে রবি প্রতিশোধ প্রতিশোধ খেলা শুরু করল, যেটা মরণের সামিল।
অসংগতিঃ
লেখক শুরু থেকেই বিভিন্ন জিনিসের খুব ডিটেইল এনে ফেলেছেন অর্থাৎ কিছু জায়গায় মাত্রাতিরিক্ত দর্শন যোগ করেছেন। এটা ছাড়া পুরো ৩৮০ পৃষ্ঠার বেশ উপভোগ্য।
সর্বশেষ কথা, এটি উপভোগ্য একটি ভালো মৌলিক থ্রিলার বই। রবির লড়াই করে বেঁচে থাকা রক্ত টানে পরিণত হওয়া একটি মানুষের গল্প।
সীমান্তে যাদের বাস, তাদের অনেকেই এপার-ওপারের কাঁটাতারের বেড়া উপেক্ষা করে কিছু দুই নাম্বারি কাজ করে। তেমনই এক পরিবারের সতেরো বছর বয়সী অনভিজ্ঞ এক তরুণ রবি। ঘটনাচক্রে ফেঁসে যায় অদ্ভুত এক পরিস্থিতিতে। তার বাপ ভাই অনেক আগে থেকেই গরু চোরাচালানের কাজে থাকলে সে এর আগে কখনো সেসব কাজে যায়নি, অবৈধভাবে সীমানা পার হয়নি। প্রথমবারেই এমন এক অবস্থায় পড়লো, যা থেকে উত্তরণের কোনো উপায় তার জানা নেই।
সীমান্তে যারা এসব কাজে জড়িত থাকে, তাদের অনেকেই মাঝেমাঝে আর ফিরে আসে না। কেন ফিরে আসে না, তার নিরেট খবর কেউ না পেলেও অনুমান করে নিতে পারে। কিন্তু রবি সেরকম একটা ঘটনার মধ্যে পড়লো, যাতে তার জীবনই বদলে গেল। রবির বাবা আর ভাইকে মেরে ফেলেছে সীমান্তরক্ষীরা। সৌভাগ্যক্রমে সে বেঁচে গেছে। কিন্তু তাতে কী? সে আছে কাঁটাতারের এপারে। কীভাবে নিজের দেশে ফিরে যাবে, জানে না। অচেনা বিদেশ বিভূঁই, অভিজ্ঞতা নেই, পথ চেনা নেই, হাতে পয়সা নেই, পেটে খাবার নেই। কী করে বেঁচে থাকবে সে?
ধীরে ধীরে খাবারের ব্যবস্থা হলো, থাকার জায়গা হলো। কিন্তু প্রাণ টানছে মাতৃভূমি। এখানকার কাওকে না জানিয়ে, কারোর সাহায্য না নিয়ে কী করে সে ফিরে যাবে মায়ের কাছে? পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে প্রাণটুকুও থাকবে না ধড়ে।
তারপর বুদ্ধির জোরে পকেটে পয়সা এলো, এমনকী দেশে, নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার সুযোগও এলো৷ কিন্তু কিসের নেশায় সতেরো বছরের এই তরুণ তক্ষুনি ফিরে গেল না মাতৃভূমিতে? দেশের মাটিতে বসেই কীসের প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফিরে গেলো জমের ঘরে? এমন কোন ব্যাপার ঘটলো, যার জন্য একজন অনভিজ্ঞ তরুণ হয়ে উঠলো নিষ্ঠুর মানুষে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া
প্রথমে একটু ধীরে শুরু হলেও দুই তিন চ্যাপ্টার ধৈর্য্য নিয়ে পড়ে ফেললে, এই বই আপনাকে আর হাত থেকে রাখতে দেবে না। কাহিনি এমনভাবে টেনে নিয়ে যাবে, যাতে করে আপনি বুঝতেই পারবেন না, ৩৮০ পৃষ্ঠার বই কখন শেষ হয়ে গেল! টান টান উত্তেজনাময় গল্প অভিমন্যু নয়, বরং একটা বহমান নদীর মতো এর কাহিনি। সবচেয়ে অভিনব হলো গল্পের প্লট। এতো দারুণ একটা গল্প, যা আমরা আবছা আবছাভাবে জানি। টিভিতে, পত্রিকায় সীমান্তের অনাচার সম্পর্কে শুনি, তারপর কয়েকদিন গালাগাল দিই। এরপরেই ভুলে যাই। কিন্তু ওই খবরগুলোর অন্তরালে কতো শত গল্প লুকিয়ে থাকে, তা আমাদের ভাবনাতে ঘূর্নাক্ষরেও আসে না। দিবাকর দাসের ক্যারেকটার ডেভেলপমেন্টও বেশ ভালো।
এবারে আসি কিছু নেগেটিভ দিক নিয়ে। লেখকের লেখনিতে দর্শন একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। খুব সাসপেন্সে ভরা রোলার কোস্টার স্পিডের বইয়েও একটু আধটু দর্শন ভালো লাগে। কিন্তু সেটা যদি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে ধীরে ধীরে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একই কথা প্রযোজ্য পারিপার্শ্বিকতার বর্ণনার ক্ষেত্রে। পরিবেশের, অবস্থার বর্ণনা না থাকলে গল্পটা ঠিক চোখের সামনে ভেসে ওঠে না। তাই পারিপার্শ্বিকতার বর্ণনা খুবই জরুরি। গল্প যাই হোক, কিছু কিছু লেখকের বই পড়তেই ভালো লাগে বর্ণনাভঙ্গীর জন্য। তবে সেক্ষেত্রেও খেয়াল রাখতে হবে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বর্ণনা হয়ে যাচ্ছে কি না। তারমানে লেখককে এক্ষেত্রে পাঠকের ভূমিকায় বসে বুঝতে হবে, কখন রাশ টেনে ধরা উচিত৷
রবি বাংলাদেশের ছেলে। সে বাংলায় কথা বললেও বাঙালিদের বাংলায় আলাদা একটা টান আছে। যেমনটি আছে ওপারের বাঙালিদের ভাষাতেও। এই টানের মাধ্যমেই বোঝা যায়, কারা 'বাঙাল' আর কারা 'ঘটি'। অভিমন্যুতে এত দীর্ঘ সময় ধরে রবি সেদেশে নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দিলো। অথচ সে যে ভারতীয় নয়, তার ভাষাতে ঘটিদের টান নেই, বরং বাঙালিদের টান আছে। এটা কেউ ধরতেই পারলো না? এই ব্যাপারটাতেই একটু অসংগতি লেগেছে।
এছাড়া পুরো বইয়ে আমি অন্তত কোনো প্লটহোল পাইনি। আর কোনো ব্যাপারই আমার কাছে বেখাপ্পা লাগেনি। ভুলত্রুটি সব মিলিয়ে বইটি একবসায় শেষ করার মতো বই।
বই- অভিমন্যু (সামাজিক থ্রিলার উপন্যাস) লেখক- দিবাকর দাস প্রচ্ছদ- সজল চৌধুরী প্রকাশনা- ভূমি প্রকাশ মলাট মূল্য- ৪৬০ প্রকাশকাল - বইমেলা ২০১৯ প্রাপ্তিস্থান : অনলাইন বুকশপ, নীলক্ষেত এবং তাদের শোরুম : ৩৮ বাংলাবাজার, ২য় তলা। (সিঁড়ি দিয়ে ওঠে বামদিকে ফেইথ বুকস এর সাথে লাগোয়া।)
দেশের সীমান্তবর্তী এক জনপদ, যেখানে সকলের বিশ্বাস, “বর্ডারের ওপারেই সর্বসুখ।” সেই গ্রামের এক পরিচিত মুখ রবিউল, ওরফে রবি। সে-ও পাড়ি দেয় বাবা, ভাই আর মাধব কাকার সাথে সেথায় , জীবিকার জোগান যেথায়। রবি শান্তিপ্রিয় মানুষ। তাছাড়া, বর্ডার পারাপারের কাজে সে নতুন। কিন্তু জীবিকার সন্ধানে একদিন এ পথে নামতেই হতো। তাই বাবা ভাইয়ের সাথে সে-ও পাড়ি দেয় এক অনিশ্চিত যাত্রায়। যাত্রার পরপরই সে বুঝতে পারে, কি পরিমাণ ভয়াবহ পথে পা দিয়েছে তারা। কিন্তু রবি সাহস হারায় না। আফসোস, সে নিজের বাবা আর ভাইকেই হারিয়ে ফেলে চিরতরে। নিজেও হারিয়ে যায় সীমান্তের ওপাড়ে, অজানা এক দেশে। শুরু হয় তার নতুন এক জীবন। অজানা দেশ, অজানা মানুষ, তার মাঝে টিকে থাকার লড়াই। কিন্তু যেখানে সভ্য জগতের মানুষের কাছে তার ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ পেলেই তার জীবনের সংশয়, সেখানে সে টিকে থাকবে কি করে? একটা পথই খোলা থাকে তার কাছে। সে পথ বড্ড অন্ধকার। প্রচণ্ড বিপদজনক। কিন্তু পেটের দায়ে তাকে সে পথেই পাড়ি দিতে হয়। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে রবি যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন সে জানতে পারে তার এই করুণ পরিণতির পেছনে দায়ী কারা। একসাথে তিনটা লক্ষ্য সামনে নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে থাকে সে, দু মুঠো রোজগার, প্রতিশোধ, আর বাড়ি ফেরা। কিন্তু ততদিনে তো অন্ধকার এক জগতের বাসিন্দা হয়ে গেছে সে। সে কি পারবে অভিমন্যূর চক্রবুহ্য ভেদ করতে? নাকি কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যাবে আর দশটা সাধারণত মানুষের সীমান্তের ওপাড়ে হারিয়ে যাওয়ার মত?
অভিমন্যু সীমান্তের ওপাড়ে পাড়ি জমানো এক যুবকের গল্প। জীবনের নির্মম পরিস্থিতে এক সহজ সরল যুবকের কঠোর হয়ে ওঠার গল্প। রবি, যার কথা ছিলো একদিন সখীকে পুতুলনাচ দেখাতে নিয়ে যাবে, সে নিজেই আজ স্থানীয় অবৈধ ব্যাবসায়ীর হাতের পুতুল। বইটিতে লেখক খুবই সাদামাটাভাবে কাহিনীর বর্ণনা করেছেন। এই সহজ সরল বর্ণনাভঙ্গিই লেখকের লেখার বিশেষ দিক। লেখক বইটিতে প্রচণ্ড রকমের শক্তিশালী কিছু চরিত্র তৈরি করেছেন। বিশেষ করে বীরু চরিত্রটির বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বেশ ভালো লেগেছে। বইটির শুরুর দিকে খুব একটা আবেদন না থাকলেও, মাঝ থেকে শেষ পর্য়ন্ত আকর্ষণ ধরে রেখেছিলো। ঘটনার মুহুর্মুহু বাঁক আর বীরুর ধূর্ত কূটবুদ্ধি আপনাকে বইয়ের শেষ পর্যন্ত ধরে রাখবে। আর শেষের দিকে টান টান উত্তেজনার কিছু অংশ বেশ রোমাঞ্চ তৈরি করবে। বইয়ের শেষকীর্তিটুকু একটু সাদামাটা হয়ে গেলেও, বইটা পড়ে আপনি হতাশ হবেন না। কেননা, বাস্তবতার সন্মুখে একজন মানুষের পরিবর্তনশীলতা লেখক সুচারূভাবেই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন এই বইটিতে।
ভূমিপ্রকাশের বেশীরভাগ বইয়ের প্রচ্ছদই বেশ সুন্দর। এই বইটিও তার ব্যাতিক্রম নয়। আর পুরো বইটিতে বানান ভুল খুব একটা চোখে পড়েনি। এক্ষেত্রে প্রকাশককে বাহবা দিতেই হয়।
মোদ্দাকথা, অভিমন্যু ৩৮০ পৃষ্ঠায় দুই মলাটের মাঝে একটি ভালো মানের বই।
❛অভিমন্যু নামের অভি অর্থ অত্যধিক; আর মুন্য অর্থ ক্রোধ। অভিমুন্য নামের অর্থ দাড়ায় ক্রোধিত পুরুষ। অভিমন্যু অর্জুন-সুভ্রদার সন্তান এবং কৃষ্ণের ভাগ্নে। মহাভারতের অন্যতম চরিত্র তিনি। যু দ্ধ ক্ষেত্রে অভিমুন্য তার পিতা অর্জুন ও মাতুল শ্রীকৃষ্ণের সমান। কুরুক্ষেত্রের যু দ্ধের ত্রয়োদশ দিবসে দ্রোণাচার্যের চক্রবুহ্যের মাঝে যু দ্ধ করতে করতে মাত্র ষোলো বছর বয়সে তিনি মৃ ত্যুবরণ করেন।❜
সীমান্তের এক গ্রামে বাস করতো ষোলো সতেরো বছরের যুবক রবিউল, যাকে সবাই রবি নামে ডাকে। আর দশটা গায়ের ছেলের মতোই তার জীবন চলছিল। পরিবারের ছোটো সন্তান হিসেবে নির্ভেজাল জীবন কাটাচ্ছিল। জীবনে ছিল সখী নামের মনের মানুষ। রবির বাবা ছোটখাটো ব্যবসায়ী। আর্থিক অবস্থা মন্দ নয়। কাঁ টাতারের বেড়া পেরিয়ে অবৈধ পথে গরু এনে দেশে বিক্রি করে। এবার বেশ বড়োসড়ো একটা চালান আনতে হবে। কিন্তু লোক সংকট হওয়ায় ইচ্ছে না থাকলেও ছোটো ছেলে রবিউলকে দুর্গম ঐ পথে নিতে হচ্ছে। রটনা ঘটনা মিলে সীমান্তের ঐ দুর্গম পথ পাড়ি দেয়া বেশ ভয়ের। অনেকেই গিয়ে ফিরে আসেনা। তাদের খোঁজ করার প্রয়োজন নেই। ভাগ্যে কী ঘটে সবাই আন্দাজ করে নেয়। সীমানায় কোনো মুখের কথা হয় না। গু লি ই একমাত্র বুলি সেখানে। রবিকে যেতে হবে তাই সে খুব একটা খুশি বা আবার বেজার না। নতুন পথ, নতুন অভিজ্ঞতা। কিন্তু সখীকে কথা দিয়েছে হাটবারে পুতুল নাচ দেখাতে নিয়ে যাবে। ফিরে এসে সেই প্রতিজ্ঞা পালন করতে পারবে কি?
দুর্গম পথ আর ভয় নিয়ে অনভিজ্ঞ রবির অভিজ্ঞতা বেশ খারাপ। এরপর কেউ হাজার টানলেও এই পথ মা রাবে না সে। এবারের যাত্রায় ফিরে যেতে পারলেই হয়। রবির বাবা, ছেলে কাসেম আর মাধব মিলে অমল বোসের থেকে গরু খরিদ করে আবার ফিরতি পথ ধরেছিল। সে পথেই যমেরা ওত পেতে ছিল। তিনটা অব্যর্থ বু লেটে প্রাণবায়ু শেষ হয়ে গেলো তিনজনের। ❛রাখে আল্লাহ মা রে কে?❜ এই প্রবাদ একেবারে সঠিক হয়ে ধরা দিল রবির জন্যে। ভয়ানক এই ঘটনার ঠিক কিছু আগেই পান করার পানি আনতে দলের থেকে আলাদা হয় সে। এভাবেই বেঁচে যায় কিন্তু হারিয়ে ফেলে নিয়ে আশা সবাইকে। নিয়তির অমোঘ খেল আর ভয়ে প্রাণপণ ছুট দেয়। স্বজন হারানোর বেদনা, রাতের ভয়ানক ঘটনা আর খিদের তাড়না মিলিয়ে বিধ্বস্ত রবি এসে পড়ে দয়াগঞ্জ নামের এক লোকালয়ে। এখানেই সাক্ষাৎ হয় নন্দকুমার ওরফে নন্দুর সাথে। আলাভোলা নন্দু তাকে আশ্রয় দেয়, খাবার দেয়। কেন জানি রবিকে তার আপন মনে হয়। সমবয়সী দুজনের মাঝে অল্প সময়েই গড়ে ওঠে সখ্যতা। যদিও রবির অতীত বা একরাত আগেই ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা তার নেই। একেবারে ভিন্ন দেশ, ভিন্ন মাটিতে টিকে থাকতে এবং আপন সীমানায় ফিরে যেতে হবে রবিকে। সেজন্য প্রয়োজন টাকা। নন্দু তাকে আধপেটা খেতে আর রাতে থাকতে দিচ্ছে এই অনেক। নন্দুরও অবস্থা সুবিধার না। কাকার অধীনে থাকে, কাজ করে। একসময় নন্দুই কাজের জোগাড় করে দেয় রবিকে। পরিচয় ক��িয়ে দেয় এলাকার গ ডফাদার বীরুর সাথে। কাজ সঠিক লাইনের না হলেও কাজ যা পেয়েছে তাতেই ভরসা। ওপারে ফেরার মতো রসদ প্রয়োজন। বীরুর সাথে একরাতের কাজে নিজের ভূমিতে পৌঁছানোর সুযোগ পেলেও সেই মুহূর্তে এমন এক সত্য সে জানতে পারে যে তার পুরো লক্ষ্যই বদলে যায়। শুধু ঘরে ফেরার তাড়না থেকেও বড়ো হয়ে দাঁড়ায় নিজের বাপ ভাইয়ের হ ত্যার শোধ নেয়া। যারা শেষ সময়ে সাড়ে তিন হাত মাটিও পায়নি। অনভিজ্ঞ রবি জানে না সে লেগেছে কঠিন সব মানুষের পিছে। ঘটনাক্রমে রবির ভাগ্যের সাথে জুড়ে যায় বীরু, নিতাইও। নন্দু তো বন্ধু হিসেবে পাশে ছিল-ই। সখীকে নিয়ে কি রবির পুতুল নাচ দেখা হবে? ওপারে এতক্ষণে লোকে যা বুঝার বুঝে নিয়েছে। দুঃখী মায়ের মুখ আর কি দেখা হবে? চারজন ভিন্ন বয়সের মানুষগুলো কি পারবে কঠিন এই পথ পাড়ি দিয়ে অন্যায়ের প্র তিশোধ নিতে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
দিবাকর দাসের লেখা এর আগে দুটো বই পড়েছি। উনার লেখার ধরন বেশ গতিশীল। সাবলীল লেখায় পড়ার অভিজ্ঞতা ভালো হয়। ❝অভিমন্যু❞ লেখকের বেশ পাঠকপ্রিয় উপন্যাস। লেখকের অন্যান্য লেখার মতোই সাবলীল ধারার বর্ণনা ছিল এই বইতেও। তবে একটা কথা না বললেই নয়। বইটা পড়তে যেয়ে আমার গতি বেশ থেমে গেছিল অযাচিত উপমা আর উদাহরণের প্রয়োগের বাহারে। ৩২০ পৃষ্ঠার বইটা নির্দ্বিধায় ২২০-২৬০ পৃষ্ঠার মধ্যে মানিয়ে যেত বেশ ভালোভাবেই। বাড়তি কিছু বর্ণনা, একই কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলা আর উপমার অতি প্রয়োগে বাকি পাতাগুলো বেড়েছে বলে আমার মনে হয়েছে।
উপন্যাসের পটভূমি বেশ আগ্রহোদ্দীপক�� দুই সীমান্তের মধ্যে চলা কঠিন এই সমস্যাকে উপজীব্য করে একটা রি ভেঞ্জ থ্রিলার উপন্যাস অবশ্যই বেশ উপভোগ্য। সীমান্তে নির্বিচারে হ ত্যা, বৈধ-অবৈধ ব্যতিরেকে বু লেটের প্রয়োগ এবং নীরব থাকার যে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা তার একটা ছোটো চিত্র লেখক উপন্যাসে তুলে এনেছেন। উপন্যাসের শুরুটা বেশ লেগেছে। রবির ওপারে যাওয়ার সময় এবং জঙ্গল পাড়ি দেয়ার যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন সেটা পড়ার সময় নিজের দমবন্ধ হওয়া ভাব টের পেয়েছি। মাঝের দিকে কিছুটা ঝিমিয়ে গিয়েছিল। আর সেখানেই মাত্রাতিরিক্ত উপমার প্রয়োগ আমাকে বেশ ভুগিয়েছে। যেমন, ১. নন্দুর পেটে খাবার বেশি পড়ার বর্ণনাকে শুরু করতে লেখক এক প্যারায় ❛অধিকন্তু ণ দোষাই❜ কে ব্যাখ্যা করেছেন যেটা বাড়তি লেগেছে আমার। ২. গ্রামে অনেকেই কলা পাতায় খায় এটাও বলা নিষ্প্রয়োজন ছিল। এরকম অনেকগুলো উপমা, দর্শন ছিল যেগুলো পৃষ্ঠা বাড়িয়েছে শুধু। না থাকলেও ক্ষতি বিশেষ হতো না।
তো যা বলছিলাম। মাঝের দিকে ঝিমিয়ে গেলেও মাঝের পরে বা শেষের আরো অনেক আগে দিয়ে গল্পে ধুম ধারাক্কা একটা ভাব এসেছিল। আপাতদৃষ্টিতে সীমান্তরক্ষীদের তিনটা বু লেটে তিনজনের প্রাণ ঝরে যাওয়া যে শুধু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তাকে কেন্দ্র করে কিছু সত্যের আগমন আর সব হারানো এক যুবকের প্রতি শোধ পরায়ণ হয়ে যাওয়ার টার্নটা বেশ দারুণ ছিল। কিছু জায়গায় শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা হয়েছিল। কী হচ্ছে বা কী হবে এখন এমন আশঙ্কায় মনে হয় দুই তিন লাইন এমনেই চোখ বুলিয়ে গিয়েছি ক্লাইম্যাক্স কী জানতে। যদিও চোখ বুলিয়ে যেতে কিছু অদরকারি বর্ণনাও দায়ী ছিল। উপন্যাসে বন্ধুত্ব, দায়বদ্ধতা আর ভালোবাসার বিষয়গুলো লেখক নিদারুণভাবে দেখিয়েছেন। বলতেই হয় নন্দু নামক চরিত্রের কথা। নিঃস্বার্থ এই ছেলের চরিত্র আমাকে মুগ্ধ করেছে। চেনা জনহীন ওপারের এক ছেলের প্রতি সে যে কৃপা করেছে তার তুলনা নেই। বীরু চরিত্রটাকেও মনে ধরেছে। মূল হিসেবে রবিকে ভালো লেগেছে এমনিতেই। তার কারণেই অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা একটা রূপ পেয়েছিল। দুঃখ, ভয়, বিপদের মাঝেও নিতাই চরিত্রের কাজকর্ম কিছুক্ষেত্রে বেশ হাসির যোগান দিয়েছিল। শেষটা কেমন হলো জানতে হলে পড়ে নিতে হবে বইটি।
পড়া শেষে কিছু প্রশ্ন বা প্লটহোল আমার চোখে পড়েছে। প্রথমত, ঐ ঘন জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে গু লি করে দিল মানলাম। কিন্তু দূরত্বের কথা কি মাথায় আসেনি? অতো দূর থেকে গু লি গায়ে লাগবে কিন্তু একেবারে অব্যর্থ নিশানা কীভাবে হলো? দ্বিতীয়ত, রবি যে গাছের আড়ালে বনদেবতা হয়ে গেলো। সেখানে গাছের নাড়াচাড়া বাদ দিলাম কণ্ঠেরও একটা ব্যাপার ছিল। ঘটনাটা যুতসই লাগেনি। তৃতীয়ত, প্রশিক্ষিত চার জোয়ানের সাথে প্রতিপক্ষ তিনজনের সং ঘর্ষটা বেমানান ছিল। চতুর্থত, বাঙালি বা বাংলা ভাষা হলেও দুই বাংলার বলার ধরনে বেশ ভালো রকমের ভিন্নতা আছে। দাদাদের করেচি, খেয়েচির সাথে আমাদের কথ্য ভাষা শুনলেই যে কেউ তফাৎ ধরে ফেলতে পারে। সেখানে রবির ভাষা কেমন ছিল যে নন্দু না হয় আলাভোলা বীরু কিংবা নিতাই সে তফাৎ ধরতে পারলো না?
এসব বাদ দিলে উপন্যাসটি বেশ উপভোগ্য। শেষটা আপনাকে আবেগে তাড়িত করবে না তৃপ্তি দিবে সেটা পাঠের পরেই জানতে পারবেন।
" লুডুর বোর্ড যেন জীবনের কথা বলে। কখন মই আসবে আর কখন সাপ আসবে কিছুই বলা যায় না। ভাগ্য ছক্কা হয়ে গড়ায় জীবনের বোর্ডে। কখনো সবচাইতে বড়ো মইয়ের গোঁড়ায় নিয়ে যায়, আবার কখনো নিয়ে যায় সবচেয়ে বড়ো সাপের মুখে" একদম ঠিক। জীবনটা আসলে এমনই। জীবন নামের গ্যাঁড়াকলে পড়ে কোন মানুষ কিসে পরিনত, পরিবর্তন হয় তা কে বলতে পারে? তাইতো গল্পের রবিউল, তার বড় ভাই, বাবা, বীরুদা, অমল বোস, এবং নিখিল কেউই সে গ্যাঁড়াকল টপকাতে পারেনি।
রবি, মানে আমাদের রবিউল। সে তো দিব্যি সুখেই ছিলো। কোনো জটিলতা, কুটিলতা তার মাথায় ছিলো না। সখীকে মাঝে মাঝে বাড়ির পাশে ডেকে এনে দেখা করা, দুটো লজ্জা মাখা কথা বলা। এটার চেয়ে আর কিসে আনন্দ পেতে পারতো রবি? বা কখনো সখনো উদাস হয়ে গাছের নীচে বন্ধুর পাশে বসে সিগারেটে দুটো সুখটান দেয়া, বা দার্শনিকের মত টুকটাক কথা বলা, ব্যাস এটাইতো। রবীর মত ১৭/১৮ বয়সের গ্রাম্য ছেলেদের চিন্তা এর থেকে কঠিন আর কী হতে পারে? কিন্তু না, ঐ যে শুরুতে লেখক "দিবাকর দাসের" উক্তি বললাম না, জীবনটা যেন সাপ লুডু খেলার মত। কখন যে কী আসবে তা কে বলতে পারে?
জীবন সহজ হোক আর কঠিন, পেটতো তা বুঝবে না। আর এই পেটের চাহিদা মেটাতেই জীবনে মানুষ কী না করে। রবির বাবা ভাইরাও সেই পেটের তাগিদে ইন্ডিয়ার সীমানা দিয়ে অবৈধ ভাবে গরু পাচারের কাজ করে। জানে এই কাজে নিশ্চিত মৃত্যু প্রতি পদক্ষেপে। মৃত্যু যেন বীক্রমের বেতালের মত সব সময় কাঁধের উপর চড়ে থাকে। তবু করতে হয় এই কাজ অভাবী মানুষ গুলোকে। কারন সরকারি ভাবে আনা নেয়া করলে যে তাদের শুধু ঐ কষ্ট করাটাই সার, পকেটে আর কিছুই আসে না।
এরকমই এক গরুর চালান আনতে রবির বাবা এবার ইন্ডিয়া যাবে, কিন্তু হঠাৎ করে সেই দলে রবির ডাক পরে। কারন তাদের একজন কোনো কারনে তাদের সাথে এবার যাবে না। তাই বাধ্য হয়ে এবার এবং প্রথমবারের মত রবির যাত্রা শুরু হয় অনিশ্চিতের পথে। গভীর অন্ধকারে সীমানা অতিক্রম করে রবিরা রাণীহাটের অমল বোসের বাড়ি যায়। অমল বোস এ তল্লাটের সবচেয়ে বড় গরু ব্যবসায়ী। তারচেয়ে বেশি গরু আর কারো কাছে নেই। অমায়িক আচরণের অধিকারী অমল বোস, তাদের খুব খাতির করে। সবশেষে গরুও বিক্রি করেন। দুই পক্ষই খুশি।
গরু নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য ফিরতি যাত্রা করে রবিরা। কিন্তু এবার জীবন নামের ছক্কার ডায়ালটা তাদের খুব বড় সাপের মুখে এনে ফেলে। সীমানা রক্ষির হাতে প্রান হারায় রবির বাবা, ভাই আর তাদের সাথের মাধব চাচা। ভাগ্য দোষে বা গুনে যে কারনেই হোক, রবি বেঁচে যায়।
শুরু হলো রবির পরাভূমিতে এলোমেলো পথচলা। তবে বিধাতা সব যায়গায়ই আছেন, তা না হলে কেন নন্দুর সাথে রবির পরিচয় ঘটাবেন? নন্দু দয়াগঞ্জে তার কাকার ছোট্ট চায়ের দোকানে পেটে ভাতে থাকে। দয়াগঞ্জ, রাণীহাটের পাশের গ্রাম। নন্দু সহজ সরল এক গ্রাম্য ছেলে। রবিরই সমবয়সী। এক সকালে ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্ত অবস্থায় রবি, নন্দুদের দোকানের সামনে চলে আসে, সেখান থেকেই শুরু তাদের ঘনিষ্ঠতা।
অচিনপুরে রবি থাকতে আসেনি। তার বাড়িতে আছে মা। এবং আছে তার সখী। যে করেই হোক তাকে আবার সীমানা পেরিয়ে ওপারে যেতে হবে। কিন্তু সেটা বললেইতো আর যাওয়া যায় না। তার জন্য দরকার টাকার। কিন্তু পরিচয় জানাজানি হলেতো বিপদ, তবে উপায়? বাধ্য হয়ে রবির অন্ধকার পথে চলা।
অন্ধকার জগতের সম্রাট বীরুদা। ঠান্ডা মাথায় যে কিনা সব কিছু সামাল দিতে সিদ্ধহস্ত । দৃঢ়তা সম্পন্ন এক মানুষ বীরুদা। বীরুদা অন্ধকারের মানুষ হলেও তার অন্তরে আছে বীবেকের আলো। নন্দুর কল্যানে রবির পরিচয় ঘটে বীরুদার সাথে। কাজ করতে থাকে বীরুদার সঙ্গে, এবং খুব সফল ভাবে। তেমনই এক কাজ করতে তারা চলে যায় সীমানার ওপারে বাংলাদেশে । রবির মনে আনন্দের যেন অন্ত নেই। বিনা কষ্টে সে আবার বাড়ি ফিরতে পারবে। শুধু দলের সাথে একটু চালাকি করতে হবে। কিন্তু খেলাতো এখনো শেষ হয় নি। বীরুদার সারগেদ নিতাইয়ের মুখ থেকে এমন একটা কথা শোনার পরই রবির সকল চিন্তা চেতনা পাল্টে যায়। রবি এতো দিন জানতো তার বাবা, ভাই অন্য সবার মতো ধরা পরেছিলো। কিন্তু আজ সে কি শুনতে পেলো? তারা সবা�� পরিকল্পিত এক জঘন্য খুনের শিকার!!!
রবি এখন তার লক্ষ্য ঠিক করে নিয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণই তার এখন ধ্যান জ্ঞান, "প্রতিশোধ" কিন্তু ১৭ বছরের রবি বিশাল এক চক্রের বিরুদ্ধে কীইবা করতে পারবে?
রবির মা রবির জন্য পথ চেয়ে আছে। আরো পথ চেয়ে আছে রবির সখী। যে কিনা চলে আসার আগেরদিন পরন্ত বিকালে পুকুর পাড়ে হঠাৎ করে রবির মুখে চুমু খেয়ে বসে। যার আর্কষণ রবিকে এখনো টানছে। কিন্তু রবি… … "অভিমন্যু" বইটির নাম। অভিমন্যু নামটার মানে আমি জানতাম না। মানে জানার ইচ্ছে ছিলোনা আরকি। কিন্তু বই পড়ছি, আর অর্থ জানবো না তাকি হয়? "সৈয়দ ফাতেমা বানু" তিনিও এই বইয়েরই রিভিউ দেন। সেখান থেকে কিছুটা জানতে পারি।
অভিমন্যু হলো অর্জুনের পুত্র, আর শ্রী কৃষ্ণের ভাগিনা। অভিমন্যু দারুন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন। তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বীরের মত যুদ্ধ করেন। একের পর এক শত্রু সেনা বধ করতে থাকেন, এক পর্যায় সেখানেই যুদ্ধ করতে করতে মারা যান অভিমন্য। তাহলে আমাদের অভিমন্যুর কী হবে? আমাদের অভিমন্যু কী পারবে শত্রু ডেরা থেকে শত্রু বধ করে ফিরে আসতে? … অসংখ্য ধন্যবাদ লেখক "দিবাকর দাস" কে এত সুন্দর একটি বই পাঠকদের উপহার দেয়ার জন্য। বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ উপাদানই এখানে বিদ্যমান। প্রকৃতির বর্ননা, মানুষের আচার ব্যবহার, চারপাশের পরিবেশ খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি প্রতিটা চরিত্র এতটা যত্নে সৃষ্টি করেছেন যে পড়তে পড়তে মনে হয় চরিত্র গুলো বাস্তব। যেমন সহজ সরল নন্দু তার অপরিচিত বন্ধুর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন পড়তে পড়তে একসময় নিজের বুকেই একসময় চাপ অনুভব করি। আবার মন্দিরের ভিতরে রবির সহজ সরল মন থেকে যে ভয়ংকর রূপটা লেখক বের করেছেন তা এক কথায় প্রশংসার দাবিদার। আর বীরুদা যতই মহৎ সাজুক না কেন, দিনশেষ তাকে তার স্থান ঠিকই দিয়েছেন। তবে বীরুদার চিন্তা করার শক্তি দেখে আমি মুগ্ধ।
গল্পের সবচেয়ে এই জিনিসটা বেশি প্রয়োজন থাকে, চরিত্রের সক্ষমতা। এ কাজটা লেখক খুব দক্ষতার সাথে করেছেন। প্রথম দিকে পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল কাহিনীটা সামাজিক জনরার। কিন্তু অর্ধেকের পর থেকেই যেন প্লাটে যায় সব কিছু। একের পর এক টুইস্ট। তারপর আর সেটাকে শুধু সামাজিক বলা যায় না। বলতে হয় "সামাজিক অপরাধ" জনরা।
তবে সব পাঠক এক না। তাই সবার চিন্তাও ভাবনাও সমান না। লেখকের লেখার প্রতি পূর্ন শ্রদ্ধা রেখে আমার নিজের মতপ্রকাশ করছি- গল্পের একটা বিষয়ে আমার খারাপ লেগেছে। সেটা হলো চরিত্র গুলোর নিজেদের চিন্তা বা পরিকল্পনা একে অন্যর সাথে হুবহু মিলে যাওটা। এই বিষয়টা যদি আরেকটু ঘোরের মধ্যে রাখতো পাঠককে তাহলে আরো বেশি উপভোগ্য হত।
তবে লেখক লেখবেন নিজ ইচ্ছায়, অন্যর কথা শুনে নয়। বইটা আমাকে ভিষণ রকম নাড়া দিয়েছে। এটাই লেখকের দিন শেষে প্রাপ্তি।☺
বইটা পড়ে আমার একটাই কথা মাথায় ঘুরছিলো- "১৬ থেকে ২০ বছরের একটা ছেলে বা মেয়ে পেট্রলে চুবানো ন্যাকড়ার বলের মত। শুধু একটু আগুন পেলেই হলো। সব কিছু জ্বালিয়ে ছারখার করে দিবে।"
বইঃ অভিমন্যু লেখকঃ দিবাকর দাস বইয়ের ধরণঃ মৌলিক। পৃষ্ঠাঃ ৩৮০ প্রকাশনীঃ ভূমিপ্রকাশ। প্রকাশকালঃ একুশে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ~ কাহিনী সংক্ষেপঃ জীবিকার তাগিদে প্রতিটা মানুষই ছুটে চলে দিগ-বেদিক । জগত সংসারে এই দিগ-বেদিক ছুটে চলা উপার্জনক্ষন ব্যক্তিরাই হয়ে উঠেন নিজ নিজ পরিবারের কর্তা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মানুষের একজন। এই উপার্জনের জন্য কেউ কেউ বেচে নিয়েছেন সঠিক পথ আবার উপায় না পেয়ে কেউ কেউ বেচে নিয়েছেন আড়ালের পথ! সঠিক পথে জীবিকা উপার্জনে কোন ঝামেলা নেই কিন্তু আড়ালে-আবডালের পথগুলো বরাবরই কঠিন হয়। বাস্তবতার কষাঘাতে তখন নিয়তিকে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ও থাকেনা। বলে রাখা ভালো এই আড়ালের পথে রিস্ক কেঁটে উঠতে পারলে আর্থিকভাবে নিয়মের তুলনায় অনেক বেশি লাভবান হওয়া যায়। আর এই লাভের আশায় অনেকই পাঁ বাড়ায় এই রাস্তায়! কখনো কখনো সীমান্তের কাটাতারের বেড়া উপেক্ষা করে পাঁ বাড়াতে হয় নিজ দেশ থেকে অন্যদেশে। . উপন্যাসের মালেক মিয়া তার দুই সন্তান এবং মাধবকে নিয়ে পাঁ বাড়ায় সীমান্তের অপর পাঁড়ে। দেশের সীমারেখা অনুযায়ী এই দেশ মালেক মিয়ার দেশ নয়। এই দেশে তার অনৈতিকভাবে প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু এই নিষেধ কাজটির দিকেই তাকে পাঁ বাড়াতে হয়েছে জগত সংসারকে টিকিয়ে রাখার জন্য। একটু বাড়তি আর্থিকভাবে সচ্ছলতার জন্য। এখানে যেমন অল্প সময়ের কারবারে অনেক বেশি লাভবান হওয়া যায় ঠিক তেমনি অল্প সময়ের ব্যবধানে উড়ে যেতে পারে মানুষের প্রাণ। যেন এক জীবন-মরণ লড়াই। এই লড়াইয়ে জিততে পারলে যেমন মুখে হাসির রেখা ফুটে তেমনি হেরে গেলে চোখ দিয়ে বইতে থাকে অশ্রুর প্রবাহ। . এপারে পাঁ দেওয়ার পর পরিকল্পনা মাফিক সবকিছু ঠিকভাবেই এগুচ্ছিলো! বিপত্তি বাঁধলো ফিরে আসার পথে। অনেক পথ হাঁটার পর ক্লান্ত দেহ পানির সন্ধান করতে লাগলো তখন মালেক মিয়ার ছোট সন্তান 'রবি'-কে পাঠালেন তাদের জন্য পানি আনার জন্য। এই প্রথমবারের মতো রবি তাদের সাথে এই পাড়ে পাঁ রাখলো। পানি আনতে গিয়ে দূর থেকে এক অশুভ আওয়াজ শুনতে পেলো। এক অজানা আতংকে কেঁপে উঠলো রবির শরীর৷ সে কি হারিয়ে ফেললো তার সাথে থাকা সঙ্গীদের। যদি হারিয়ে ফেলে তাহলে সে কি পারবে কাঁটাতারের বাধাকে উপেক্ষা করে এই দেশে আসতে? . কিন্তু যখনই কাঁটাতারের বেড়াকে উপেক্ষা করে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসার সময়টা আসে তখন ঘটনা মোড় দেয় অন্য এক যায়গায়। যেখানে কোন মায়া নেই, মানবতা নেই। নেই কোন অনুভূতি। সেখানে আছে কেবলই প্রতিশোধ! সেই প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হতে থাকা রবি কি শেষ পর্যন্ত তার দেশে নতুন করে, নতুন ভাবে ফিরে আসতে পারবে? পারবে তার ভালোবাসার মানুষ "সখী"-কে আপন করে পেতে? ~ নিজস্ব মতামতঃ দিবাকর দা'র লেখা বইগুলোর মাঝে আমার পড়া প্রথম বই 'অবিমন্যু'। মৌলিক আমার বরাবরই পছন্দের তালিকার শীর্ষ স্থানে আছে। কিন্তু লেখকের এই বইটি শেষ করতে আমাকে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। তার কারণ হলো অতিরঞ্জিত বর্ণনা এবং বর্ণনার ধরন। কিছু কিছু সময় আমি উপন্যাসের শ্রুতিমাধুর্যতা হারিয়ে ফেলেছি। আমার কাছে মনে হয়েছিলো লেখক ইচ্ছে করলে বইটি তিনশো পৃষ্ঠার মধ্যেই শেষ করে দিতে পারতো এবং বিশ্লেষনে আরো কৌশলগত দিক অবলম্বন করলেই পারতো। তাতে করে আরো সুখপাঠ্য হয়ে উঠতো। সর্বোপরি আমার কাছে মাঝামাঝি লেগেছে। তবে হ্যাঁ, কিছু কিছু যায়গায় চমকে যাওয়ার মতো বিষয়ও ছিলো। আশাকরি লেখকের পরবর্তী বইগুলো আমার জন্য আরো সুখপাঠ্য হয়ে উঠবে। ~ বিঃদ্রঃ লেখককে মনে কষ্ট দেওয়া আমার উদ্দেশ্য না। আমি শুধু আমার প্রতিক্রিয়াটা জানিয়েছি। আপনাদের সাথে আমার মতের মিল নাও হ��ে পারে। কেননা, এটা আমার একান্তই নিজস্ব মতামত। ভুল করে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।
একদমই অন্য ধাঁচের লেখা। সীমান্ত মানেই কাঁটাতার দিয়ে দু-দেশ আর সাথে মানুষ, ধর্ম, সংস্কৃতিকে আলাদা করা। কিন্তু পুরোপুরি কি আলাদা করা যায়... সীমান্ত মানেই ওপারের নিষিদ্ধ এর হাতছানি। রবি নামে এক সহজ সরল বাংলাদেশের এক কিশোর। দুরন্তপনাই যার কাজ হোওয়ার কথা থাকলেও ভাগ্য তাকে নিয়ে যায় এই সীমান্তের খেলায়। সীমান্তের নিষ্টুরতা তাকে কখনো নিষ্ঠুর, আবার কখনো সাহসী করে তোলে। দেখা হয় স্বজনহারা চোখে প্রতিশোধের আগুন, পথ- হারা ক্লান্ত মানুষ ও বুদ্ধি আর বিচক্ষণতায় অবিচল থাকে তার লক্ষ্যে। একট��� বই যেনো দু'বাংলার মানুষের ব্যবসা,বাণিজ্য, প্রেম-ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, শত্রুতা, নিষ্ঠুরতার প্রতীক। ফিরতে হবে রবিকে সব বাধা পেরিয়ে নিজের আপন ঠিকানায় একদম অন্য এক রবি হয়ে, ভুলে যেতে হবে পিছনের ফেলে আসা দিনগুলোকে। একটা সময় মানুষের কাছে কোনটা ভালো কোনটা খারাপ সেই বোধ থাকে না, পাপ পূন্যের বাইরেও পৃথিবীতে বিচার করার আরো অনেক কিছু আছে। এই বই অনেক গুলো জীবনের গল্প বলে। একটুও বই আপনাকে মনোযোগ সরাতে দিবে না। কি হয় শেষ পর্যন্ত অসম শক্তির সাথে লড়াই করে রবি কি ফিরতে পারবে তার মায়ের বুকে, তার ভালোবাসার কাছে। জানতে হলে চমৎকার এই বইটি পড়ে ফেলুন। নিরাশ হবেন না। বই পড়ুন, সময় কে কাজে লাগান।
এটা আরেকটা মাস্টারপিস... গতকাল রাতে নিয়ে বসি.. আজ বিকেলের মধ্যেই শেষ... এটা পড়ার জন্যে আজকের ৩টা ক্লাস মিস দিয়েছি🙂🙂
বাংলাদেশের ভারত সীমান্তের এক গ্রামের একজনের কাহিনী। অবৈধ পথে গরু আনানেয়া কারী এক ছেলে ও তার আশেপাশের লোকজনের গল্প। ভাই, বাবা ও কাকা মাধবের সাথে ভারত যায় রবি। এরপর পরে যায় সেখানকার দালাল ও আর্মির চক্রব্যূহ। অভিমন্যুর মতো কিভাবে এই চক্রব্যূহ ভেদ করে রবি, তা নিয়েই গল্প এগিয়ে যায়। মহাভারতের অভিমন্যু কিন্তু দ্রোণাচার্যের চক্রব্যূহ ভেদ করে প্রবেশ করে ঠিকই কিন্তু ফিরে আসতে পারে নি.... রবি কি পারবে ফিরে আসতে?? জানতে হলে পড়ুন অভিমন্যু
বইয়ের নামঃ অভিমন্যু লেখকঃ দিবাকর দাস প্রকাশকঃ শিরোনাম প্রকাশন প্রচ্ছদঃ আবুল ফাতাহ প্রথম প্রকাশঃ বইমেলা ২০২৩ জনরাঃ সামাজিক উপন্যাস (আমার মতে) পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৩২০ মুদ্রিত মূল্যঃ ৬০০
দিবাকর দাস দাদা, এই একটা বই দিয়েই তো আপনার লেখক জীবনের যে তৃপ্তি তা পাওয়ার কথা, পেয়েছেন? আমি কিন্তু একেবারে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছি বইটা শেষ করে। এক কথায় যাকে বলে 'পয়সা উসুল, সময় উসুল'।
সামাজিক জনরা? বলা যায়। থ্রিল আছে? পাতায় পাতায়। কাহিনি ট্যুইস্ট? ঠিক যেখানে আশা করবেন না সেখানেই।
২০১৯ সালে প্রকাশ পাওয়া বইটা এর মধ্যে অন্তত ৪ থেকে ৫বার রিপ্রিন্ট হওয়া উচিত ছিলো, হলো না কেন?
এক কথায় দুর্দান্ত! দারুণ একটা প্লট। দিবাকর দাসের লিখনীও চমৎকার। যে কোনো পরিস্থিতি লেখক খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। তবে একটা ব্যাপার লেখক হয়তো ভুলে গেছেন। উপন্যাসের নায়ক রবি'র বয়স বলা হয় ১৭ বছর। ওই বয়সী এক কিশোর'কে দিয়ে যেসব কাজ করানো হয়েছে তার মধ্যে কয়েকটা'তে ‘অতিরঞ্জিত’ মিশে ছিল! আর শেষের দিকে ৩ বনাম ৪ এর ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখলে ঠিক মেনে নেয়া যায় না।
তবে সেসব কিছু বাদ দিলে বইটা একটা মাস্টারপিস! এই বই আরও বেটার কিছু ডিজার্ভ করে।
গ্রাম-গঞ্জের সামাজিক আবহে রিভেঞ্জ থ্রিলার লেখার জন্য লেখক দারুন একটি প্লট বেছে নিয়েছেন। চরিত্র গুলো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভালো ভাবেই গড়ে উঠেছে। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক মাদক ব্যবসায়ী বীরুর চরিত্রটিকে এতটা সুপার-হিউম্যানাইজ না করলেও চলতো (বিশেষ করে ট্রেইনড আর্মি পারসনদের সাথে ক্লাইমেক্স সিনটা)। মাঝারি গতিতে কাহিনী চলতে থাকলেও বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে দার্শনিকতার স্পিডব্রেকারে। সম্পাদনা করে বইটিকে আরো ছোট ও গতিশীল করা যেতো।
খুবই দুর্দান্ত একটা বই। তথাকথিত কোনো থৃলার না এটি। পরতে পরতে কোনো রহস্য ছিল না এখানে। কিন্তু তারপরও পড়তে একবিন্দুও একঘেয়েমি লাগে নি। রবির স্ট্রাগল, বীরুদার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, নীতাইয়ের মাঝে মাঝে বোকামি সবশেষে নন্দুর বন্ধুত্ব সবমিলিয়ে অনেক চমৎকার লেগেছে।
বই রিভিউ: বইয়ের নাম: অভিমন্যু লেখকের নাম: দিবাকর দাস প্রকাশনী: ভূমিপ্রকাশ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩৮০ মুদ্রিত মূল্য: ৪৬০ টাকা
ফ্ল্যাপের লেখা:
সীম��নার এপারে এসে তাদের গ্রামের অনেকেই আর ফিরে যায় না। তাদের তালিকায় আরো তিনজন যুক্ত হল। মাধবকাকা, বাবা আর কাসেমভাইও কোনোদিন ফিরবে না। লাশ তিনটে নিজের চোখে দেখেছে সে। ভালোমতো কবরও জুটলো না ওদের কপালে। যা গুজব শোনা গিয়েছিল সব সত্যি। বিপদ সত্যিই আছে। মানুষের মনগড়া নয়।
তিনজন নয়। চারজনের নাম যোগ হবে নিখোঁজের তালিকায়। সে নিজেও তো হারিয়ে গেছে। এই জনহীন ধানক্ষেতের ধারে কোনো আশা দেখতে পাচ্ছে না সে৷ তাকেও মরতে হবে। একটু আগে নয়তো একটু পরে৷ এই কালের হাত থেকে কোনো মুক্তি নেই। কিছুতেই উদ্ধার পাওয়া যাবে না। তবে মোট কথা হলো, সে বেঁচে আছে। ভাবনাটা প্রহসন হয়ে দেখা দিলো তার কাছে। শ্বাস নেয়ার মানে যদি বেঁচে থাকা হয় তবুও তাকে অর্ধমৃতের চেয়ে বেশি কিছু বলা যায় না। শ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে তার৷ স্নায়ু অনেক উত্তেজিত আর শরীর ঠিক ততটাই দুর্বল। দেশে ফেরার একটা চেষ্টা করতে পারে সে৷ কিন্তু, পথ কোথায়?
চরিত্র বিশ্লেষণ:
এই উপন্যাসের মূল চরিত্র হচ্ছে সতেরো বছর বয়সী রবি, যার ভালো নাম রবিউল। সে থাকে পরিবারের সাথে বাংলাদেশ-ভারত সীমারেখার কাছে একটি গ্রামে। বাবা ছোটখাট ব্যবসায়ী। মা গৃহিনী। গ্রামের আর দশটা মানুষের মতোই সীমারেখার কাছে থাকে বলে অবৈধ পথে চোরাকারবারি কাজ করে থাকেন রবির বাবা। রবি পরিবারের ছোট ছেলে বলে তাকে এই কাজে জড়ানো হয়নি। কিন্তু এবার রবিকে যেতেই হবে এই কাজে। রবির বাবা আর বড় ভাই আগে থেকেই এই কাজ করে আসছেন মাধব কাকার সাথে। শেষ মুহুর্তে আরেকজন লোক দল ছেড়ে চলে যাওয়ায় রবিকে নেয়া হয়৷ রবি যাওয়ার আগে তার প্রেমিকা সখীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসে। ইন্ডিয়াতে তারা চারজন গরুর চালান নিতে যায়৷ কিন্তু ফিরে আসতে পারে না কেউ। তার কয়েক গজ দূরে মারা যায় তার বাবা, ভাই আর মাধব কাকা। অচেনা দেশে কিশোর রবি অসহায় হয়ে আটকে যায়, ভাগ্যের খেলায় কয়েক মুহুর্তের ব্যবধানে হয়ে ওঠে অনাথ, অসহায়, সম্বলহীন এক কিশোর।
রবিকে তার পরিবারের সাথে শান্ত, ধীরস্থির স্বভাবের দেখানো হয়েছে৷ কিন্তু ভারতের সীমারেখায় বাবা,ভাইকে হারানোর পর তার মধ্যে আবেগের যে পরিবর্তন লেখক দেখিয়েছেন তা প্রশংসার দাবীদার৷
এবার আসি নন্দুর ব্যাপারে যে রবির পরে উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। নন্দু ভারতের সীমানার কাছে একটি গ্রামে থাকে। সহজ, সরল, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন, বাকপটু বলতে এককথায় যা বোঝায় তাই নন্দু। রবির চেয়ে স্বভাবে, কাজকর্মে পুরোপুরি আলাদা। তবুও রবির প্রতি প্রচণ্ড মায়াবোধ থেকে নিজের সমস্যা থাকা সত্ত্বেও রবিকে নিজের সাথে থাকার জায়গা দিয়েছে, রবির কাজের সংস্থানও করেছে। পুরো বই পড়তে গিয়ে নন্দুর কাজকর্মে পাঠকরা হাসবেন, কখনো সহজ সরল এই ছেলের প্রতি মায়াও জন্মাবে।
বীরুদা সাতঘাটের জল খাওয়া মানুষ৷ চোরাকারবারিতে একমাত্র গরু বেচাকেনা ছাড়া বাকি সব অবৈধ কাজে তার হাত আছে৷ বীরুর নামডাক অন্ধকারের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে৷ দিনের আলোতে যেসব কাজ মুখে আনাও পাপ, রাতের আধারে সেসব কাজের বন্দোবস্ত হয় বীরুর আস্তানায়। বীরু ঠান্ডা মাথার মানুষ৷ যে নিজের লাভ ছাড়া কোনো কাজ করে না। বুদ্ধিমান মানুষ বুদ্ধিমান মানুষদের সংস্পর্শই বেশি পছন্দ করে৷ তাই বীরু রবিকে অল্প কয়েকদিনের কাজে অগ্রগতি দেখে পছন্দ করে ফেলে। কাহিনীর মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত বীরুর সাথে রবির কাহিনী এগোতে থাকে। কাহিনীর প্রয়োজনে বীরুকে আনা হয়েছে আর লেখক এই চরিত্র অন্য সব চরিত্রের মতোই সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
এছাড়াও বীরুর সহকারী নিতাই, ক্যাপ্টেন নিখিল, অমল বোস, ডাকাত সুবল প্রতিটি চরিত্রই ভালো লেগেছে। তিনশো আশি পৃষ্ঠার বইটি পড়তে একটুও বাধেনি কোথাও। এজন্য পুরো কৃতিত্ব লেখককে দিতে হবে।
নিজস্ব মতামত:
দ্য নেস্ট অফ স্পাইডার পড়ার পর থেকেই দিবাকর দাস ভাইয়ার লেখার ভক্ত হয়ে গিয়েছি। 'অভিমন্যু' পড়ার আগে একদমই জানতাম না এটা কী জনরার বই হতে পারে৷ ফ্ল্যাপের লেখা পড়ার পর মূল বই পড়া শুরু করে দেখি এটি সামাজিক জনরার বই৷
পুরো বই পড়ার সময় ঘোরের মধ্যে ছিলাম৷ নিজেকে বারবার রবি মনে হচ্ছিল। রবির মুখে গল্প এগোচ্ছিল আর আমি হারিয়ে যাচ্ছিলাম কাহিনীর গভীরে৷ যারা দিবাকর দাসের লেখনী সম্পর্কে জানেন তারা এই বই পড়ে ধাক্কা খেতে পারেন। এই উপন্যাস একদমই অন্যরকম৷ আমি কখনো ভাবিনি লেখক সামাজিক জনরাতেও এতো সুন্দর করে কাহিনী উপস্থাপন করবেন। বছরের পর বছর ধরে দুই দেশের কাটাতারের সীমারেখায় যে অবৈধ ব্যবসা হয়ে আসছে তার ব্যাপারে পাঠকরা বেশ ভালো ধারণা পাবেন বইটিতে। পাশাপাশি সীমানার কাছে অবস্থিত জনপদের আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের কিছু ধারণা পাবেন। সামাজিক জনরা নিয়ে লেখকের কাছ থেকে আরো ভালো লেখার প্রত্যাশা করছি।