বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী পেশায় শিক্ষক, নেশায় লেখক। ছোটোবেলা থেকেই লেখালেখিতে তীব্র আগ্রহ। ২০১৯-এ প্রকাশিত গল্পসংকলননরকের দ্বার খোলা তাঁর প্রথম একক গ্রন্থ। পাঠকের প্রশংসাধন্য উল্লেখযোগ্য অন্যান্য বই: শ্বাপদ, জেগে আছে শয়তান, নরকের দ্বার খোলা ২, তিনে নেত্র ও নির্ঝর রহস্য ১। তাঁর অলৌকিক এবং রহস্য কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে বিবিধ গল্পসংকলনে। তাঁর অনেকানেক গল্প-উপন্যাসের শ্রুতরূপ রেডিও মির্চি সানডে সাসপেন্স, মিডনাইট হরর স্টেশন, থ্রিলারল্যান্ড-সহ নানান অডিও প্ল্যাটফর্মে সম্প্রচারিত হয়েছে। বৈশালীর গল্প অবলম্বনে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র অচিরেই রুপোলি পর্দায় মুক্তি পেতে চলেছে।
অলৌকিক সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন না, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। সুলেখক বৈশালী ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং পত্রপত্রিকায় এই ধারার বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। এবার বইমেলায় বিভা পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গল্প-সংকলন। সেটি পড়ে কেমন লাগল, তা জানানোর চেষ্টা করছি হেথায়। বইটি সুমুদ্রিত। নচিকেতা মাহাতো'র মিনিমালিস্ট প্রচ্ছদ আকর্ষণীয়। সর্বোপরি মুদ্রণ প্রমাদ লক্ষণীয়ভাবে কম। তাই সব মিলিয়ে এই পাঠ চোখের পক্ষে বেশ আনন্দদায়ক হয়েছে। কিন্তু মনের পক্ষে তা কেমন হয়েছে? এই বইয়ে কোনো ভূমিকা নেই। সূচিপত্রের পরেই আমরা ঢুকে পড়েছি গল্পের রাজ্যে। যে-সব গল্প আছে এই বইয়ে তারা হল: ১. নরকের দ্বার খোলা~ জনপ্রিয় থ্রিলার লেখক প্রান্তিক রাইটার্স ব্লক কাটাতে তথা নির্জনতার সন্ধানে বিজন প্রান্তরের মাঝে একটি বাড়ি ভাড়া নিল। তারপর কী হল? এই গল্প অলৌকিকের ট্র্যাপিংস ব্যবহার করেও একটি যথার্থ মনস্তাত্ত্বিক রহস্য গল্প হতে পারত। ছোট্ট-ছোট্ট বর্ণনায় লেখক যেভাবে চরিত্র ও পটভূমি নির্মাণ করেছিলেন, তার যথার্থ প্রয়োগ তখনই সম্ভব হত। ২. ইভ~ বাবা'র কাছ থেকে পাওয়া পুতুল ইভলিন তথা ইভ কি জীবন্ত? শুধু সাহচর্য আর ভালোবাসাই কি চায় সে, না অন্য কিছু? এই গল্পটাও অসামান্য মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের তথা রহস্যের গল্প হতে পারত। দুর্ভাগ্যের বিষয়, চিরাচরিত ও বহু-ব্যবহৃত অলৌকিকের খাঁচাতেই বন্দি রইল গল্পটা। ৩. মৃত্যু নির্মাণ~ ইতালির ওই গ্রামটা বড্ড সুন্দর। কিন্তু কেন সেখানে কোনো বহিরাগত স্বাগত নয়? এই গল্পটা বেশ ভালো। পাঠক বোঝেন গল্প কোন দিকে গড়াচ্ছে, কিন্তু ট্রিটমেন্টের গুণে তিনি উঠতে পারেন না গল্প ছেড়ে। ৪. এখানে অন্ধকার~ এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ লেখা এটিই। বর্ণনার নৈপুণ্যে, বিষয়ের সযত্ন পরিবেশনে, এবং গল্পের শেষ অবধি 'এ গল্প অলৌকিকের, না ভ্রমের?' এই প্রশ্নটি জিইয়ে রাখায় সফল হয়েছে গল্পটি। অনীশ দেব-এর লেখা গল্প 'কনে দেখা আলো'-য় শেষবার এই ট্রিটমেন্ট পেয়েছিলাম, আর তার আগে ড্যান সিমন্সের 'দ্য রিভার স্টিক্স রানস আপস্ট্রিম'-এ। কিন্তু এই গল্পের স্বাদই আলাদা। হ্যাটস অফ। ৫. স্বপ্নসম্ভব~ এই গল্পটা সুখপাঠ্য হলেও অত্যন্ত ফর্মুলাইক। তাছাড়া এই থিম নিয়ে শরদিন্দু এমন অসাধারণ কিছু গল্প লিখে গেছেন, যে এই গল্প আলাদাভাবে রেখাপাত করতে পারে না। ৬. সে আছে~ এই থিম মাত্র কিছুদিন আগেই আমরা পেয়েছি অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী-র লেখা 'ছেলেটা এখনও বন্ধু খোঁজে'-তে। তবে তা সত্বেও গল্পটা একটা অন্য গভীরতা পেয়েছে মাতৃহৃদয়ের অনন্য প্রকাশে। ভালো গল্প। ৭. বুনো ফুলের গন্ধ~ বেশ গা-ছমছমে গল্প। তবে উৎস (দেরাজে পড়ে থাকা ডায়েরি) এবং থিম, দুইই অতি-ব্যবহৃত। সব মিলিয়ে এটাই বলার যে আপনি যদি সুলিখিত ক'টি গল্প পড়ে ভয় পেতে, আর সেই সঙ্গে কিছু ভাবনার খোরাকও পেতে চান, তাহলে এই বইটি সংগ্রহ ও পাঠ করতেই পারেন। পাঠ শুভ হোক।
অলৌকিক জঁনরা নিয়ে সম্প্রতি যে সমস্ত বই প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে এই গল্প সংকলনটি অন্যতম । রীতিমতো ভয় ধরানো বেশ কয়েকটি গল্প আছে, আবার আছে ভাবনার রসদও । বেশ কিছু ক্ষেত্রে লেখকের বর্ননার গুনে, বই পড়তে পড়তে আতঙ্কে শিহরিত হয়ে উঠেছি ।
এই সংকলটির শ্রেষ্ঠ গল্প ‘এখানে অন্ধকার’ এবং ‘মৃত্যু নির্মান’। এছাড়াও ‘ইভ’ এবং ‘নরকের দ্বার খোলা’ বেশ ভালো লেগেছে ।
বইয়ের প্রতিটি গল্পই ভালো। কোনোটিই ২০-৩০ পাতার থেকে বড় নয়। তবে এতে গল্পের গুণগত মান কমেনি একবিন্দুও। এখানে অন্ধকার এবং ইভ গল্প দুটি চূড়ান্ত ভয় দেখিয়েছে। গল্পে বীভৎসতা না থাকলেও আতঙ্ক ভরপুর পরিমাণে আছে। আমার মতে বইয়ের সবথেকে ভয়ঙ্কর গল্প এই দুটোই। বুনো ফুলের গন্ধ, মৃত্যুনির্মাণ গল্প দুটির মধ্যে আলাদা কিছু আছে যা গল্প পড়ার পরও ভাবতে বাধ্য করেছে "কেমন যেন একটা হয়ে গেল, এটা যদি সত্যি হতো! 😰😰" আতঙ্কের মাত্রার দিক থেকে এরপরই স্থান দেওয়া উচিত নরকের দ্বার খোলা বলে প্রধান গল্পটি কে। স্বপ্ন সম্ভব, সে আছে গল্পগুলি historical horror suspense। খুব উপভোগ্য। মুহূর্তে মুহূর্তে শিহরিত হবেন পড়তে পড়তে।
প্রতিক্রিয়ায় উল্লিখিত সমস্ত মন্তব্যই আমার একান্ত ব্যাক্তিগত। কাউকে ছোট করা বা কারোর ভুয়ো প্রসংশা এই প্রতিক্রিয়ার উদ্দেশ্য নয়। বইটি পড়ার পর যা যা মনে হয়েছে সেইসব তুলে ধরাটাই একমাত্র উদ্দেশ্য।
মাসখানেক আগে 'ওরা আসছে' গ্রুপের এডমিন মাননীয় দেবাশীষ কমলকৃষ্ণ গোস্বামী দাদা একটি পোস্ট রেখে বলেছিলেন নিজের নিজের প্রিয় তিনজন লেখক এবং প্রিয় তিন ফেসবুক লেখকের নাম কমেন্ট বক্সে লিখতে। অনেকেই সেদিন বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী নামটি প্রীয় ফেসবুক লেখিকার তালিকায় লিখেছিলেন। আমিও লিখেছিলাম। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে, বৈশালীদি এখন আর শুধু ফেসবুক লেখিকা নন। ওনার লেখা, বেশ কিছু গল্প সঙ্কলনে বেরিয়েছে ইতিমধ্যেই। সম্প্রতি লেখিকার একাঙ্ক গল্প সঙ্কলন মুক্তি পেলো। 'নরকের দ্বার খোলা'... এরপর ওনাকে 'ফেসবুক লেখিকা' বললে ওনার পরিশ্রমকে খাটো করা হবে।
যাই হোক, বইটি হাতে পেয়েই প্রথম যেটা ভালো লাগলো সেটা হলো প্রচ্ছদ। শ্রী নচিকেতা মাহাতো খুব সাধারনের মধ্যে দিয়ে অসাধারন কাজ করেছেন। কুর্নিশ।
এরপর ভালো লাগলো পৃষ্ঠার মান। সেটিও বেশ ভালো। বিভা প্রকাশনির বেশ কিছু বই হাতে নিয়ে দেখা আছে, সেইগুলোর তুলনায় এই বইটির পৃষ্ঠার মান বেশ বেশ ভালো।
তবে বইয়ের শুরুতে একটি মুখবন্ধ বা ভূমিকা থাকলে ভালো হত। লেখিকার প্রথম বই ( যত দূর আমি জানি), নিজেই যদি কয়েক লাইন লিখে দিতেন পাঠকদেরও ভালো লাগতো। আমি প্রথমেই পাতা উলটে ভূমিকাটাই খুজতে যাচ্ছিলাম কিন্তু দেখলাম সূচিপত্রের পরই গল্প শুরু। একটু যেন কেমন লাগলো। সে যাই হোক, ব্যাপার হচ্ছে পাঁচটি বড় গল্প এবং দুটি ছোট গল্প রয়েছে বইটিতে। বড় গল্প গুলি মোটামুটি বাইশ তেইশ পাতা, ছোট গুলি ছয় সাত পাতা করে, মোট ১৪৪ পাতার বই।
এবার গল্পে আসা যাক..
১. নরকের দ্বার খোলা
হ্যাঁ এই গল্পটির নামেই বইটা। গল্পের নাম শুনে ভেবেছিলাম হয়তো কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মার্কা গল্প হবে। নরক শুনলে আমাদের মত পাব্লিকের মাথায় যেটা আসে আরকি। কিন্তু না… এ এক অন্য ধারার গল্প। ঠিক যে কারণে বৈশালীদি আমার প্রিয় লেখক - লেখিকাদের তালিকায়। লেখিকা বাঁধা ছকের মধ্যে থাকেন না। হ্যাঁ, এটা ঠিক দিদির গল্পে নারী চরিত্র একটু বেশি সক্রিয় থাকে, পুরুষ চরিত্র গুলো সাইড লাইন হয়ে থাকে, কিন্তু বেশিরভাগ পুরুষ লেখকরাও নিজেদের গল্পে পুরুষ চরিত্রদের বেশি প্রাধান্যদান করে থাকেন। গল্পের বিষয় বস্তুর ব্যাপারে কিছু বলে 'স্পয়লার' দিতে চাই না। তবে এটুকু বলতে পারি গল্পটি পড়তে পড়তে আমার প্রিয় লেখক এইচ পি লাভক্রাফটের কথা মনে পড়ছিলো। স্টেটমেন্ট অফ র্যান্ডল্ফ কার্টার গল্পটির সাথে এই গল্পের কোনই মিল নেই, কিন্তু ওই গল্পটি পড়ার সময় যে রকম একটা ফিলিংস্ হচ্ছিলো 'নরকের দ্বার খোলা' পড়ার সময় সেরকমই মনে হচ্ছিলো। অসাধারণ প্লট। আতঙ্কের বাতাবরণ স্পষ্ট। একটু বেশি সাহসিদের হয়ত ভয় করবে না, কিন্তু মনের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভুতি হবেই। তবে দিদি যেন একটু তাড়াতাড়ি লিখতে চেয়েছেন। কিছু কিছু যায়গা একটু বেশি খেলালে ভালো হত। শুরুতে গল্পের মূল চরিত্র প্রান্তিক, পেশায় লেখক এবং লেখকদের সব থেকে বড় শত্রু 'রাইটার্স ব্লক ' এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এই সময় লেখক যেরকম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যায় সেটার ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু আমার যেন একটু সংক্ষিপ্ত লেগেছে। লেখিকা চাইলেই অনায়াসে ত্রিশ বা চল্লিশ পাতা লিখতে ফেলতে পারতেন যেরকম বিষয়বস্তু ছিলো। তবে এরকম গল্প বাংলার হরর দুনিয়ায় এই প্রথম।
২. ইভ
এটি একটি পুতুলের গল্প। আপনি বলবেন চাইল্ডস প্লে। আমি বলবো চাইল্ডস প্লে সিনেমার গল্পের সাথে মিল বলতে এইটুকুই যে একটি ভৌতিক পুতুল যে মানুষ খুন করে, ব্যাস এটুকুই। এইটুকুর জন্য একটি দারুন লেখাকে সাইডলাইন করে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্বাস করুন, এই গল্পটা পড়ে যে বলবে ভয় লাগেনি, জানবেন সে ডাহা মিথ্যে বলছে। পুতুলের মধ্যে আত্নার প্রবেশ এবং শেষ মেষ পুতুলটিকে 'মেরে ফেলা' শুধু এই দুটো যায়গা একটু যেন একঘেয়ে লাগলো। কিন্তু বাকি গল্পটা স্তভিত করে দেওয়ার মত। বিশেষ করে ৪২ নম্বর পাতায় যা সব রয়েছে, রাতে একা বসে পড়বেন তো বুঝবেন! খুব সুসংবদ্ধ লেখা, তাড়াহুড়ো নেই। ভূতের গল্পের একটি বিশেষগুন হলো ফার্স্ট পারসন ন্যারেশন। মানে গল্পের কথক নিজেই তার জীবনের গল্প বলছে এমন। এই গল্পটিও ফার্স্ট পারসন ন্যারেটিভ। আর গল্পের শেষ লাইনটা আপনার রক্ত ঠান্ডা করে দেবে….
৩. মৃত্যুনির্মাণ
এটি একটি বিদেশী পুরাণ এবং ডার্ক ফ্যান্টাসির মিশেল। শুরু থেকে শেষ বেশ টানটান। আদর্শ ভয়ের গল্পের সমস্ত রকম উপকরণ রয়েছে। বিষয়বস্তু নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। তবে এটুকু বলতে পারি, বেশ অনেক গুলি থিম মিশিয়ে দারুন একটি গল্প লিখেছেন দিদি। ধীরে সুস্থে শুরু করে সুসংবদ্ধ সমাপতন। আগের দুটি গল্পের মতন ততটা ভয়ের নয়, কিন্তু অন্যরকম ভালো। আসলে আগের গুলো একটু বেশি ভালো।
৪. এখানে অন্ধকার
উরিব্বাস…! সত্যিই এটা মনে হয়েছিল গল্পটা পড়ার পর। তবে বিধিসন্মত সতর্কবার্তা, দূর্বল মনের মানুষজন এই গল্পটা পড়লে সামান্য অস্বস্তিতে পড়তে পারেন। গল্প শুরু হয়, সাধারন আর পাঁচটা গল্পের মত করেই। কিন্তু ধীরে ধীরে কুয়াশার মত রহস্য ঘনীভূত হয়ে জমাট বাঁধে। গল্পের বিষয় বস্তু সিরিয়াল কিলিং। কিন্তু সিরিয়াল কিলিং-এর পিছিনে যে একটি মর্মস্পর্শী কারন আছে সেটা এই গল্পটিকে অন্য আর সব সিরিয়াল কিলিংয়ের গল্প থেকে আলাদা রাখে। শুধু রহস্য বা মার্ডার নয়, রীতিমতো ব্ল্যাক ম্যাজিক আর ভূতও আছে। কিন্তু এই সব গল্পের যেটা মূল ব্যাপার, সেটা হল খুন করে যে, তার সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক স্থাপন, সেটা হয়ে ওঠে নি। এখানে খুনিকে প্রথম থেকেই ভিলেন হিসেবেই দেখানো হয়েছে। আর একটা যায়গায় খটকা লাগল। খুনি বলেন যে এক্সিডেন্টের কয়েকঘন্টা পরেই তিনি তার স্ত্রীর দেহ কবর থেকে খুড়ে তুলে নিয়ে বাড়ি চলে আসেন। কিন্তু সেটা কী সম্ভব? পুলিশ তো দেহ পোস্ট মর্টেমের জন্য নিয়ে চলে যাবে!
তবে এই রকম গল্প বাংলা সাহিত্যে কম। একেবারে টানটান গল্প।
৫. স্বপ্নসম্ভব
গল্পের নামের মতই গল্পের বিষয়বস্তু। সত্যি কথা বলতে কী গল্পের কয়েক পাতা পড়ার পরই একটু আন্দাজ হয়ে গেছিল যে শেষটায় কী হবে। বড্ড প্রেডিক্টেবল গল্প। তবে যারা রোমান্টিক গল্প পছন্দ করেন তাদের ভালো লাগবে। এই জাতীয় গল্পের ধারা একই রকম হলেও একটা অদ্ভুত ভালো লাগা থাকে। তবে এই গল্পটি ফার্স্ট পারসন ন্যরেটিভ হলে ভালো হত।
৬. সে আছে
সম্ভবত এই গল্পটা 'সত্যি ভূতের গল্প' গ্রুপের ইতিহাস নির্ভর ইভেন্ট 'ভৌতিহাসিক' -এ প্রথম প্রকাশ পায়। তাই গল্পটি আগেও পড়েছি। অসম্ভব তথ্য সমৃদ্ধ গল্প। এটি ভৌতিক গল্পের সীমা ছাড়িয়ে ইতিহাসের এক নক্কারজনক ষড়যন্ত্রের কথা সামনে এনে দেয়। ভৌতিহাসিক ইভেন্ট বাতিল না হলে, সম্ভবত এই গল্পটিই প্রথম হয়ে যেত।
৭. বুনো ফুলের গন্ধ
শেষ গল্প হিসেবে আদর্শ। এত গুলি ভয়ের, বিষ্ময়ের, গা-শিরশির করা গল্পের পর শেষে বেশ একটা অধিভৌতিক নেশা ধরানো গল্প। লেখিকার আজ পর্যন্ত যে কটা ছোট গল্প পড়েছি নিঃসন্দেহে এটি সেরা। অন্তত আমার বিচারে। গল্পটা এই বইয়ের কভার ডিজাইনটির মতই। অতি সাধারন বিষয় বস্ত কিন্তু অসাধারন তার অন্তর্নিহিত কাহিনি। যারা লেখা শুরু করতে চান তারা এই গল্পটি পড়তে পারেন। অনেক কিছু সেখার আছে।
সব শেষে যেটা বলার, এত কম দামে এরকম একটা গল্প সম্ভার মিস করাটা বোকামি। গল্প গুলি বারবার পড়তে ইচ্ছা করবে। সেই প্যানপ্যানানি একই ধারার ভূতের গল্প পড়ে যারা হেবিয়ে গেছেন তাদের বলব অবশ্যই পড়ুন। সবাই ভালো থাকবেন। নমস্কার।
বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দীর লেখা , মূলত ছোট গল্প সংকলন হলো নরকের দার খোলা।
কলকাতা বই মেলা ২০১৯ এ প্রকাশিত হলেও এই বই জনপ্রিয় হয় মূলত , অডিও স্টোরি টেলিং প্ল্যাটফর্ম এর বদানতায়।।
হরর ফিকশন এর ওপর ভর করে, সব কটি গল্প লেখা হলেও , প্রথাগত তন্ত্র নির্ভর গল্প নেই একটাও, লেখিকা প্রধানত এখানে , অপ্রাকৃতিক ঘটনা সুমূহকেই ভয়ের উপকরণ হিসেবে গল্প ইনজেক্ট করেছেন। বলা ভালো প্রত্যেকটি গল্পই অতিপ্রাকৃতিক , ও শোভনীয় ঘটনার বিবরণ ।
বই এর নাম অনুসারেই প্রথম গল্পের নাম
*নরকের দ্বার খোলা* ✒️এক রহস্য লেখিয়ের জীবনে যখন , গল্পের উপকরনের অভাব দেখা দেয়, সেই রয়টার্স ব্লক থেকে বের হতে , লেখক সম্প্রদায় ভুক্ত মানুষ , কত কাণ্ড করে তার উদারহন পৃথিবীতে প্রচুর। তবে এই গল্পের লেখক , সেরকম অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড না করলেও, সে গিয়ে পড়লো এক , পাহাড়ী অঞ্চলে ঘেরা নির্জন বাড়িতে, লেখার জন্যে এরকম নিরপদ জায়গায় ভূমিকা প্রচুর কিন্তু নিয়তির হয়তো অন্য কিছুই লিখে রেখেছিল ।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই , দৈবের প্রকোপে, সে গিয়ে পড়ে, একটি গুহার দারে, সেই গুহা থেকেই , কৌশিকী অমাবস্যায় উঠে আসে , নরকের কীট,গরম হয়ে ওঠে ঠান্ডা পরিবেশ , , যেই বাড়িতে লেখক থাকেন, গুহার উৎস সেই বাড়িতেই , কিভাবে এলো এই গুহা, কে বানালো, কেন বানালো । লেখক এর শেষ পরিণতি বা কি ,সব টাই এই গল্পের রহস্য উপাদান।।
✒️*ইভ* - একটি পুতুল, যা কিনা তার বাবা তাকে জন্মদিনে উপহার ��িলো, সেই পুতুল কি শুধুই পুতুল নাকি পুতুলের অন্তরালে থাকা , এক ছোট্ট সিজোফ্রেনিয়া রোগে, মৃত মেয়ের আত্মা।। যার উদ্দেশ্য শুধুই নিজের জীবন্ত সঙ্গীর ওপর হওয়া অবিচারের শাস্তি দেওয়া। নাকি তার থেকেও বেশি কিছু।। প্রেম ভালোবাসার থেকেও যেটা বেশি গুরুত্ব পূর্ণ তা হলো ,কর্তব্য ও দায়িত্ব বোধ।
ভালোবাসা অনেক সময় অন্ধ করে দেয় , আর তার ফলেই সৃষ্টি হয় অনাসৃষ্ঠির , আর সেই অনাসৃষ্টির বলি হতে নিরীহ মানুষ দের। গল্প পরে মনে হতেই পারে "এনাবেলার" কথা , হ্যাঁ তার অনেক টাই ছাপ রয়েছে এই গল্পে ।। আত্তা প্রতিস্থাপন তত্বর এর ওপর ভিত্তি করেই এই গল্প।। শেষে কে জিতলো "ভালবাসা" না "দায়িত্ববোধ" এটাই দেখার বিষয়।
*মৃত্যু নির্মাণ* ✒️অফবিট জায়গায় ঘোরার নেশা, মানুষ কে অনেক সময় এমন কিছু ঘটনার সাক্ষী করে তোলে , যা বর্ণনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এই গল্প সেই রকমই একটা গল্প । রোম থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরে একটি জায়গা কেটানজারো তে ,গল্পের নায়ক ভ্রমণে যাওয়ার উদ্দেশ্য বেরিয়েও তার ভাগ্য তাকে , নিয়ে গিয়ে ফেললো , বেলিসিমো নামে একটি গ্রামে । সেখানে প্রচলিত এক কুসংস্কার তাকে সেখানে থেকে যেতে বাধ্য করলো, বাধ্য করলো বললে ভুল হবে , সে থেকে গেল নিজের বৈজ্ঞানিক আধুনিকতার দ্যান ধারণার ওপর বিশ্বাস করে। কিন্তু এই গ্রামের ইতিহাস যে বড়ই নির্মম, রাক্ষুসে যৌনতার শিকার এই গ্রামের অনেক পুরুষ ।। শয়তানের জন্মদাত্রী বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় জেগে ওঠে শারীরিক খু:নিবৃত্তির জন্যে , গল্পের নায়কের পরিণীতি কি হতে চলেছে,, কে সেই মরণপ্রেমিকা যার আবেদনের কাছে শত শত পুরুষ , নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে। আর কি বার উপায় এর থেকে পরিত্রাণের , এই গল্প তারই উপাখ্যান।।
✒️*এখানে অন্ধকার* আসিফের জীবনে হঠাৎ করেই নেমে এলো এক দুর্যোগ, ভবিষ্যত্ বাণী অনেক সময় মানুষ কে নির্মমতার সীমানায় নিয়ে যেতে পারে, এ তারই গল্প। ফেসবুক পুরনো বন্ধুর ,সাথে কথার মাধ্যমে ভেঙে যাওয়া যোগ সূত্র পুরণায় স্থাপন , এবং তাকে চমকে দিতেই তার বাড়ি যাওয়া, এখানে থেকেই গল্পের শুরু। গিয়ে একেরপর এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী, আসিফ এর ভীতি সন্ত্রস্ত ব্যবহার , সারা বাড়ির জানলা দরজা আটকানো , তার বউ বাচ্চাই বা গেল কোথায়, বন্ধ ঘরে কর হাসি, পূরণ ডাইরীর পাতায় , আসিফ কোন উপচারের সন্ধান পেল, আর তার ফলে তার অন্ধ স্নেহ তাকে কি এমন কাজ করতে বাধ্য করলো , এই গল্প সেই কাহিনী বর্ণনা করে।
✒️*সপ্ন সম্ভব* পাপ বাপ কেও ছাড়ে না , হয় শাস্তি নয় ক্ষমা পার্থী। এই গল্পের বিষয় বস্তু এই টুকুই। পূর্ব জন্মের পাপের কাহিনী বর্তমান জন্মে পূর্ণতা পাওয়ার গল্প। স্বামী হত্যায় জড়িত এক মহিলার অযাচিত ,অবারিত যৌনাচারের বলি, এক প্রেমিক যুগল।। তার প্রতিফলন স্বরূপ সৃষ্ঠ অভিশাপ ,থেকে মরেও বা কি মুক্তি পাওয়া যায়। হয়তো যায় না। তাই তো ১০০ বছর পরেও তাকে এসে ক্ষমা চাইতে হয়।।। ছোট গল্প বলেই এখানে ভয়ের থেকে, ন্যায় অন্যায় দিক টি বেশি ধরা পড়েছে এই গল্পে।
সদ্য পড়ে শেষ করলাম আমার একজন অতি প্ৰিয় লেখিকা বৈশালী দাসগুপ্ত নন্দী ম্যাম এর লেখা "নরকের দ্বার খোলা " বইটি। এই বইটি সম্পর্কে জানতে পারি মিরচি বাংলা তে। তারপরে বইমেলা থেকে সংগ্রহ করেছিলাম, পড়েও ফেলেছিলাম। তবে একবার পড়েই ভুলে যাইনি। বইটি নিজেই আবার পড়ার জন্য টান দিল😍। দ্বিতীয় বার পড়ার পরে কেমন লাগল সেটাই বলতে এলাম।
লেখিকার লেখনী নিয়ে নতুন করে বলার কিছু আর নেই 🫡 যারা ওনার গল্প পড়েছেন বা অডিও প্লাটফর্মে শুনেছেন তারা বুঝতে পারবেন কেমন উত্তেজনাপূর্ণ থাকে সেগুলো। ব্যতিক্রম নয় এই বইটিও। অসাধারণ একটি বই পড়লাম।
এটি একটি অন্ধকার জগতের গল্পসংকলন। মোট গল্প আছে ৭ টি। সব গল্পেরই বিষয় ভয়। তবে সেগুলো এক এক কাহিনী তে ভিন্ন ভিন্ন রূপে এসেছে। গল্পগুলো বেশ বড়ো বড়ো। প্রতিটা গল্পই অসাধারণ। এতগুলো গল্পের সম্বন্ধে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই কাহিনীর স্পয়লার দেবোনা।
কয়েকটা গল্প ইতিমধ্যেই অডিও স্টোরি রূপে চলে এসেছে। তবে আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়েছে শোনার চেয়ে আমি পড়ে বেশি উপভোগ করেছি গল্পগুলো।
এই বইয়ের প্রতিটা গল্পই ভীষণ ভালো লেগেছে। তার ভিতরেও সব চেয়ে ভালো লেগেছে "ইভ " গল্পটি। এখানে উল্লেখ আছে একটি ভৌতিক পুতুলের কথা। এটার জন্যই গল্পটার প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ ছিলো পড়ার আগে পর্যন্তও। কারণ আমাদের ভৌতিক পুতুলের কথা শুনলেই আগে মনে আসে অ্যানাবেল এর কথা। কিন্তু গল্পটা পড়ার পরে সেই ধারণা পুরো ভেঙে গেছে। অ্যানাবেল এর কাহিনী র সাথে এই কাহিনীর কোনো মিল নেই, শুধু একটি ভৌতিক পুতুল আছে এটুকুই যা। বাকি সম্পূর্ণ আলাদা।
গল্প বর্ণনা ভীষণ সহজ সরল। কোথাও এতোটুকু বোরিং ফীল হয়নি। গল্পের প্লট নতুনত্বে ভরপুর। কিছু কিছু চরিত্র মনে আঁচড় কেটে যাবার মতো। সব শেষে বলব লেখিকার লেখনী নিয়ে সমালোচনা করার ক্ষমতা আমার নেই, নিজের যেটুকু অনুভব হয়েছে বইটি পড়ার সময়ে সেগুলোর কিছু কিছুই আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম। একটি থ্রিলার বই সাধারণত একবার পড়েই রেখে দেওয়া হয়, কিন্তু এই বইটি এতটাই আকর্ষনীয় যে দ্বিতীয়বার পড়েও সেই অনুভূতি পেয়েছি যখন প্রথম পড়েছিলাম।❤
ভালো থাকবেন লেখিকা, আপনার লেখনী আরও দীর্ঘায়িত হোক। আমরা আপনার লেখনী থেকে আরও নতুন নতুন নানান স্বাদের গল্প উপহার পাবার আশাতে থাকলাম।🥰🥰
গল্পের বই পড়ে যে রাতের ঘুম উড়ে যেতে পারে তা এই বইটি না পড়লে জানা যেত না ।ঝরঝরে গদ্যে লেখা ,টানটান উত্তেজনায় মোড়া আদ্যপান্ত গল্পগুলি ।পড়বার সময় গায়ে শিরশিরানি আসতে বাধ্য ।Highly recommended .