গত শতকের প্রথম ভাগটা ছিল যুদ্ধের ডামাডোলে পরিপূর্ণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল। সেটি শেষ হতে না হতেই রুশ দেশে শুরু হল বলশেভিক বিপ্লব। ধীরে ধীরে এ বিপ্লবের কম্পন দিয়ে পৌছাল দক্ষিণ-পূর্বইউরোপ অব্দি। ততদিনে জার্মান মুল্লুকে এক নতুন একনায়কের আবির্ভাব ঘটেছে, যার নেতৃত্বে অচিরেই শুরু হল রক্তক্ষয়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রায় ছ' বছর ধরে চলল সে যুদ্ধ। এই যে এত যুদ্ধ আর বিপ্লব, এসবের পিছনে কিন্তু ছিলেন গুটিকয় ব্যক্তিত্ব। "ভিয়েনার ক্যাফে সেন্ট্রাল"-এর শুরুটা হয়েছে এদেরকে নিয়েই। লেখক অর্ধ শতাব্দী পূর্বের অতীত থেকে একটি রেখা অংকন করে তার সমাপতন ঘটাতে চেয়েছেন বর্তমানে। বোমারু বিমানের আঘাতে একদা ছিন্নভিন্ন বার্লিনে তিনি খুঁজে ফিরেছেন ধবংসস্তূপ, হিটলারের শৈল-নিবাসের সন্ধানে ছুটে গেছেন অস্ট্রিয়ায়। তবে শুধু যুদ্ধ আর বারুদ নয়, চলন্ত রেলগাড়ির জানালার বাইরে দেখা কিছু অপসৃয়মান মুখের মতোই এই বইয়ের গল্পগুলোতে ভেসে উঠে কিছু মানুষের মুখ। সেই মানুষগুলো কখনও আমাদেরকে শোনায় তাদের বেদনার বয়ান, আবার কখনো নিয়ে যায় তাদের অনুভূতির নানা অভিঘাতের বৃত্তান্তে।
ভিয়েনার ক্যাফে সেন্ট্রাল by সঞ্জয় দে। প্রকাশনীঃ সময় প্রকাশন।
এই বইটি সাজানো হয়েছে ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়া,জার্মানি,চেক রিপাবলিক,পোল্যান্ড,স্লোভাকিয়া,বসনিয়া এন্ড হার্জেগোভিনা,মলদোভা,ট্রান্সনিসট্রিয়াতে(স্বীকৃতিহীন রাষ্ট্র)লেখকের ভ্রমণ আর ইতিহাসের স্মৃতিচারণে।
অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার ক্যাফে সেন্ট্রালে পেস্ট্রি খেতে খেতে স্মরণ করেছেন একসময় এই ক্যাফেতেই কফি পান করতে করতে আড্ডা দেওয়া ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের নায়ক ও সোভিয়েতের বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন আর সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিনকে।এই ক্যাফেতেই সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জোসিফ মার্শাল ব্রজ টিটোকে প্লেগ রোগ দিয়ে মারার প্ল্যান এঁটেছিলেন সোভিয়েত দূতাবাসের সচিব পিয়তোর সেমিয়নভিচ পোপোভ আর ইয়ুশিফ গ্রিউলেভিচ।
লেখক জার্মানির নুরেমবার্গে ত্রয়োদশ শতকে নির্মিত ফ্রাউয়েন কিরশে গির্জায় দেখেছেন যীশুর চিত্রকর্ম।জার্মানির পোঁসডামের/পটসডামের কাইসার স্ট্রাসে স্ট্রিটের ১টি বাড়ি দখল করে নেয় সোভিয়েত রেড আর্মি।সৈন্য-সামন্ত নিয়ে ১১ বগির ট্রেনে করে মস্কো থেকে এই বাড়িতেই উঠেন স্তালিন।সেই বাড়িটি থেকে মাইল তিনেক দূরের সেসিলিয়েনহফ প্রাসাদেই ১ সম্মেলনে মিলিত হিয়েছিলেন সোভিয়েতের স্তালিন,আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান,ব্রিটেনের পিএম চার্চিল।লেখকের বর্ণনায় স্থান পেয়েছে পোল্যান্ডের ঐতিহাসিক সোলিডারিটি মুভমেন্টে বিদ্যুৎ মিস্ত্রী লেস ভালেসার নেতৃত্ব এবং পরবর্তীতে তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার ঘটনা।
লেখকের ভ্রমণের ঝুলিতে যোগ হয়েছে বিখ্যাত মিউজিক কম্পোজার মোজার্টের বাড়ি,চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগ,পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাসের স্ট্যাচু,জার্মানির রাজধানী বার্লিন,স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিস্লাভা,মলদোভার রাজধানী চিসিনাও,বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো এবং স্বীকৃতিহীন দেশ ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার রাজধানী টিরাসপোল।
লেখক ভ্রমণের ক্লান্তি অবসানে স্বাদ নিয়েছেন মলদোভার বিখ্যাত 'পুরকারি' মদ, ব্লিনচিকি নামের প্যান কেক,ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টের পিৎজা ইত্যাদি।
ইতিহাস ও ভ্রমণকাহিনীর এক অসাধারন মিশ্রন। বইটিতে লেখক ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ইউরোপের সাথে বর্তমানের ইউরোপ ফুটিয়ে তুলেছেন তার নিজের ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভ্রমনের কাহিনীর সাথে সাথে। ইউরোপের বেশ কটি দেশ সম্পর্কে জানা গেলো এই বই পড়ে।
‘ভিয়েনার ক্যাফে সেন্ট্রাল’ যতটা না ভ্রমণকাহিনী তার চাইতে বেশি ইতিহাস। আসলে ইউরোপ নিয়ে লিখবেন আর বিশ্বযুদ্ধ কিংবা শীতল যুদ্ধের ইতিহাস আসবে না তা কী হয়? তার ওপর লেখক সঞ্জয় দে ভাগ্যে যাই থাকুক ঐতিহাসিক স্থান/নিদর্শন গুলো মিস দিতে নারাজ। সেই সুবাদে আমরা এই বইয়ে ইউরোপের বিশ্বযুদ্ধ ও বিশ্বযুদ্ধের আশপাশের বেশকিছু ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা পেয়েছি।
যার শুরুটা হয় ‘ভিয়েনার ক্যাফে সেন্ট্রাল’ দিয়ে। টাইটুলার কাহিনী। উপজীব্য ভিয়েনা শহরের একটি ক্যাফে, যেখানে একসময় মিলিত হয়েছেন স্তালিন-লেনিন, স্তালিন-ট্রটস্কি-টিটো ইত্যাদি বাঘা কমিউনিস্ট গণ। টিটোকে প্লেগ দিয়ে মারার প্ল্যানও নাকি হয়েছিলো এই ক্যাফেতেই।
বইয়ের বিশাল অংশ জুড়ে জার্মানি৷ সুতরাং বিশ্বযুদ্ধ। যেমন ‘নুরেমবার্গের হাউপ্ট মার্কেট’ এ গোলার আঘাতে ধসে যাওয়া ফ্রাউয়েন কিরশে গীর্জার কথা। কিংবা ‘পোঁসডামের সেসিলিয়েনহফ প্রাসাদ’ এ ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পটসড্যাম সম্মেলন ও তাকে ঘিরে নানা রঙের কূটনীতির কথা।
সঞ্জয় দে এরপর গিয়েছেন সীমান্তবর্তী শহর সলজবুর্গে। সীমান্তবর্তী হওয়ায় আফগান সিরীয় শরনার্থীদের আধিক্য এখানে। তবে লেখাটিতে প্রাধান্য পান মোজার্ট। সলজবুর্গের পুরোটা জুড়েই তো তিনি।
এরপর ‘বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবহুল বার্লিন’। আসে ওডার নদীতীরে জার্মান রুশে ধুন্দুমার যুদ্ধের কথা। স্তালিনের অর্গান-কাতিউশা রকেট লঞ্চার কিংবা একরোখা সোভিয়েত জেনারেল ঝুকভের কথা। এছাড়া হিটলারের বাংকার, বার্লিন ওয়াল, রুশ সেনাদের সমাধিস্থল টিয়ার গার্টেন, জার্মানির আত্নসমর্পণের স্থান কার্লহস্টের জার্মান-রাশিয়ান জাদুঘরেও গিয়েছেন লেখক।
এরপর কয়েকটি ছোট ভ্রমণকাহিনী আছে। যেমন ‘প্রাগের পাইপ অর্গান’ এ থাকা চেক-স্লোভাক দ্বন্দ্ব কিংবা সুবিশাল চার্চ অর্গানের বর্ণনা। অথবা ভেরফেনের দূর্গ বা বারশটেসগার্নে হিটলারের গ্রীষ্মকালীন আবাস (কেহল স্টাইন হাউস) নিয়ে লেখা ‘ঈগলের আস্তানায়’। লেখকের বন্ধুর এক্স পোলিশ রমণী লুদমিলাকে ঘিরে লেখা হয়েছে ‘ওয়ারশ এর বিষন্ন চড়ুই’। লেখাটি জুড়ে আসলেই রয়েছে বিষন্নতা। বিশেষ করে শেষদিকে, লুদমিলার আত্নকথনে। এছাড়া ওয়ারশ কিভাবে জার্মাদের গোলায় ধ্বংস হলো, সোভিয়েত রা কিভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করলো, ভয়চেক ইয়ুজারেলস্কির শেষকৃত্য, কোপার্নিকাস নিয়ে দুদেশের টানাটানি ইত্যাদিও আছে লেখাটিতে। সবকিছুতেই সেই বিষন্নতার ছাপ।
ফ্রাউয়েন কিরশে গীর্জার কথা আবার আসে ‘ড্রেসডেনের গ্যালারি নয়ে মাইস্টার’ এ। এছাড়া আসে এডগার দেগা, পল গগ্যা, ক্লদ মোনে ইত্যাদি শিল্পীর হাতে আঁকা নানান ছবির কথা। পুরো ড্রেসডেন শহরই একসময় এসব চিত্রকর্মের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলো
‘বার্লিনের বজ্রাহত চার্চ’ দিয়ে আবার আমরা প্রবেশ করি বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মানিতে। তিন নেতার তেহরান সম্মেলন, জার্মান যুদ্ধবিমান মেসারস্মিটের উদ্বোধন, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কাইজার উইলহেলম চার্চ - ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে লেখাজুড়ে। সেই সাথে অধুনা ইউরোপে গজিয়ে ওঠা সন্ত্রাসী হামলার উল্লেখ তো আছেই।
সোভিয়েত আমলে চেকোস্লোভাকিয়ার পরাধীন দশা নিয়ে লেখা ‘বাতিস্লাভায় পল সমাচার’। পল নামের এক বন্ধুর জীবনকাহিনী তুলে ধরে সঞ্জয় দে দেখিয়েছেন সোভিয়েত জাঁতাকলে কত ভয়াবহভাবে নিষ্পেষিত হয়েছিলো চেকের মানুষ। ‘সারায়েভোতে কফি আড্��া’ অবশ্য সে তুলনায় বেশ ছোট একটি লেখা। এক জার্মান সৈনিক ও তার বসনিয়ান বান্ধবীর সঙ্গী হন লেখক। ছোট হলেও এই লেখায় একটু হলেও বসনিয়ার ধর্মীয় সমস্যা উঠে এসেছে ‘ইউরইয়েভ’ নামের পার্বণের মাধ্যমে৷
‘লুগা উলিসার হার্নিট্যাপ’ বেশ বড় মাপের লেখা। এবার লেখকের সফরসঙ্গী জিনা - বার্লিনের মেয়ে। আর স্থান গিদাইনসক - পোলিশ শহর। গিদাইনসক একসময় ছিলো জার্মান অধ্যুষিত, কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েতরা এসে সব জার্মানদের খেদিয়ে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুও হয়েছিলো এই শহরে, শহরের বাইরে থাকা ভেস্টার প্লেটে নামক এক দ্বীপে গোলাবর্ষণ করে। দ্বীপটি ছিলো পোলিশ গ্যারিসনের অধীনে। আর গোলা ছুঁড়েছিলো বন্দরে নোঙর করা এক জার্মান সমরপোত। সুযোগ বুঝে লেখক সেই ভেস্টার প্লেটে তে গিয়ে ঝাঁঝড়া হওয়া দালানকোঠাও দেখে আসেন। আর জিনাকে শোনান শহরটির আরেক ইতিহাস। পোল্যান্ডে সোভিয়েত বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাতও এই শহরেই। মূল নায়ক এক নারী ক্রেন অপারেটর, এবং পার্শ্ববর্তী নায়ক পরবর্তীতে পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট বনে যাওয়া লেচ ভালেসা।
ট্রানসনিসট্রিয়া এখনো স্বাধীন হয়নি। মলদোভা আর ইউক্রেনের মাঝে স্যান্ডউইচ হয়ে পড়ে আছে রাশিয়ার আশির্বাদপুষ্ট একখন্ড ভূমি। মলদোভা এসেই সঞ্জয় দে দৌড় লাগান ট্রান্সনিসট্রিয়ায়। জুটেও যায় তিনদিনের ভিসা। সঙ্গী হয় সেখানকার যুবক ভিক্টর। দেশ হইয়াও দেশ না টাইপ জায়গাটির নানা চমকপ্রদ তথ্য পাবেন ‘এক টুকরো সোভিয়েত ইউনিয়নে’ এ। অপরদিকে মূল লক্ষ্য মলদোভায় লেখকের কাঁচামিঠা অভিজ্ঞতার স্বাক্ষী হবেন ‘চিসিনাউয়ের হোয়াইট ওয়াইন’ এ। এখানে সঙ্গী লেখকের পুরনো বন্ধু ইনগ্রিদ। আর মলদোভার সুবিখ্যাত আঙুরের মদ ওয়াইন।
জার্মানি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া, মলডোভা, ট্রান্সনিসট্রিয়া ও অস্ট্রিয়া (একটু করে বসনিয়াও আছে) - সবমিলিয়ে সঞ্জয় দের এবারের বইটি ছিলো বেশ ঘটনাবহুল। ইতিহাসের পরিমাণও অন্যান্য বই থেকে বেশি। আমি ‘ভিয়েনার ক্যাফে সেন্ট্রাল’ কে ৪.৫/৫ দিব। তবে ঘটনাবহুল/তথ্যবহুল হওয়ায় সবকিছু ক্যাচ করতে একটু সমস্যা হয়েছে, অস্বীকার করবোনা।