অন্ধকারের আলাদা ভাষায় তুমি কথা বলতে।আমাকে একদিন বলেছিলে,ঐ দেখো,কত মানুষ হেঁটে যাচ্ছে নিরুত্তাপ।ওরা আমার ভাষায় কথা বলছে। তোমার কথার অনেক কিছুই আমি বুঝতে পারতাম না।সেদিনও পারিনি।শহরে তখন সন্ধ্যার মুমূর্ষু আলো।এভাবেই তো বাড়ি ফেরে মানুষ!প্রতিদিনের চেয়ে ভিন্ন কিছু আমার চোখে পড়ছিল না।দেখতে দেখতে কেমন স্বপ্নালু,ব্যথাতুর হয়ে উঠেছিল তোমার চোখ।মনে হচ্ছিল নিরীহ ঐ আহত নিহত সমস্ত স্বপ্ন তোমাকে নিংড়ে শুন্য করতে চাইছে। তোমাকে বলেছিলাম,অন্ধকারের ভাষা আমাকেও শেখাবে জুয়েনা? কিছুই বলোনি তুমি।যেন আমার প্রশ্ন অশ্রুত থেকে গিয়েছিল। তারপর সন্ধ্যা ক্রমশ রাতে লীন হলে তুমি বলেছিলে,ওরা সব মেনে নিয়েছে আরিশ।শুধু মেনে নিতে পারেনি মৃত্যুকে।
মাহবুব ময়ূখ রিশাদের জন্ম ১৯৮৮ সালের ৩০ জুন। ২০০৫ সাল থেকে লেখালেখি শুরু করেন। প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। লেখকের পছন্দের জায়গা জাদুবাস্তবতা। প্রিয় লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ও শহীদুল জহির। ব্যক্তিজীবনে চিকিৎসক রিশাদ অর্জন করেছেন ইন্টার্নাল মেডিসিনের সর্বোচ্চ ডিগ্রি এফসিপিএস। পড়াশোনা করেছেন ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, নটর ডেম কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে।
তর্কশয্যায় মৃত্যু - বহুবিধ মৃত্যুর যন্ত্রণাদগ্ধ উপাখ্যান
মৃত্যু বলতে আমরা দৈহিক মৃত্যুকেই বুঝে থাকি। এই গল্পগ্রন্থে মৃত্যু এসেছে নানান রূপে - আত্মিক মৃত্যু, অনুভূতির মৃত্যু, সম্পর্কের মৃত্যু। এসব নানাবিধ রূপক মৃত্যু নিয়েই "তর্কশয্যায় মৃত্যু।" মাত্র ছয়টা ছোটগল্প, প্রতিটাই উল্লেখযোগ্য। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে "লিয়ান্তিকা।" মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো টুইস্ট আছে কয়েকটা গল্পে। গল্পগুলোয় টুইস্ট এসেছে শুধু চমকে দেবার জন্য নয়, এসেছে পরিস্থিতির তীব্রতা বোঝাতে, আমাদের যাপিত জীবনের দ্বান্দ্বিক অবস্থান তুলে ধরার জন্য। বাস্তব, স্বপ্ন, কল্পনা, ভ্রম মিশে একাকার হয়ে আছে গল্পগুলোয় - যেমনটা হয়ে আছে আমাদের মৃত্যুময় জীবন। সবাইকে এই বইটা পড়তে বলবো। কারণ গল্পগুলো পড়ে শেষ করার পরেও মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে,তাড়ানো যায় না।এমন বই পড়াই তো পাঠকের কাম্য।
প্রথমেই বইটা নিয়ে বলবো, বইটার নাম। নামটা অনেক ক্যাচি, না? এবং সুন্দর।
বইটা ছয়টি ভিন্নস্বাদের ছোটগল্প নিয়ে, শুরুর দুইটা গল্প মোটামুটি লাগলেও শেষের দিকের গল্পগুলো বেশ ভালো লেগেছে। কয়েকটা গল্পে প্যাঁচানো ভাব চলে আসছিল যদিও, লাইক একই কথার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, তাও আমার পড়তে ভালোই লেগেছে। 'লিয়ান্তিকা' গল্পটা আমার অনেক ভালো লেগেছে, তবে গল্পটাতে একটা তথ্য ভুল দেওয়া আছে। 'কাফকা অন দ্য শোর' বইতে আকাশ থেকে জোঁক এবং মাছ দুটোই পরেছিল। এরপরে 'কিকুচি' নামক এক জাপানিজ রোগের নাম শুনলাম 'কিকুচি' নামের একটা গল্পে।আরেকটা গল্পও খুব ভালো লেগেছিল, 'হাওয়া হাওয়া ও হাওয়া খুশবু লুটাদে'- গল্পটার শেষের টুইস্টটা মারাত্মক ছিল।
আর সবার শেষে বলবো প্রচ্ছদটাও আমার অনেক ভালো লেগেছে। কেউ যদি ভিন্নধর্মের কিছু ছোটগল্প পড়তে চান, নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন। নতুন কিছুর স্বাদ পাবেন।
লেখককে নিয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছিনা, আপনারা একটু এদিক সেদিক খুঁজলেই জানতে পারবেন লেখক সম্পর্কে।
মাহবুব ময়ূখ রিশাদের গল্পের জগতের আকাশ পুঞ্জিভূত বিষন্ন মেঘ দিয়ে ছাওয়া। সেই বিষাদময় মেঘদলের ছায়ার নিচে সংঘটিত হয়ে যায় যতসব করুণ সুন্দর ঘটনাবলী। জীবনের নাটকীয়তা ধরা পরে আশ্চর্য সব উপাখ্যানে যা পড়ে পাঠককে থমকে যেতে হয় ক্ষনিকের জন্য। দাগের গায়ে চাঁদ লেগে থাকে লিয়ান্তিকার জন্য; হাওয়া হাওয়ায় খুশবু লুটিয়ে ছড়িয়ে দেয় কিকুচি রোগ সবার মাঝে। মৌরিতানিয়ার বাবা ভুগে কার্তিকের কাশিতে আর সেইসাথে পাঠকও ভুগেন অভিনব সব ভ্রমে!
এই সুন্দর-ছোট্ট, সেবা প্রকাশনী সাইজের বইটিতে আছে মোট ছয়টি গল্প। লেখকের লেখার হাত ভিন্নধর্মী, সুন্দর এবং আছে নিজস্বতার ছাপ..... ভাল লেখা ছাড়াও গল্পগুলোও ছিল বেশ ভাল!
প্রায় সব গল্প ভাল লাগলেও "লিয়ান্তিকা" এবং "হাওয়া হাওয়া ও হাওয়া খুশবু লুটাদে" এই দুটি গল্প প্রচন্ড প্রিয়। লিয়ান্তিকা গল্পটির ending আমাকে বেশ ভাবিয়েছে এবং অনবদ্য এক সৃষ্টি এই গল্প। কারণ উনি এই গল্পটি লিখেছেন "ভবিষ্যত কালে"। অর্থাৎ লাইনগুলো অনেকটা এমন, "একতানমনে বৃষ্টি পড়বে যেদিন, সেদিন শহরটা হয়ে উঠবে জলজমাট। কোথাও বের হতে পারবে না মানুষ, অফিস কার্যত অচল হয়ে পড়বে"
তাছাড়া এই বইয়ের প্রথম এবং শেষ গল্পে কিছুটা ম্যাজিক রিয়েলিজমের স্বাদ আপনি পাবেন। আর "মৌরিতানিয়ার বাবা" এই গল্পে পাবেন ব্ল্যাক কমেডির স্বাদ(ভুল বলতেও পারি, তবে আমার এমনটা লাগলো)
আমার মতো ছোট-গল্প যাদের বেশ পছন্দ তারা এই ভিন্নধর্মী, বিভিন্ন স্বাদের ছোট গল্প নিয়ে ভর্তি বইটি পড়ে দেখতে পারেন.... নতুন একরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে বইটি পড়ে। এই বইটি পড়ার পর লেখকের আরো কয়েকটি ছোট-গল্পের বই কিনার ইচ্ছা জাগছে আমার
ছোটগল্পকে বিবেচনা করা হয় সাহিত্যের কনিষ্ঠ সন্তান হিসেবে। স্থান, কাল, ব্যক্তি ও আবহ এই সবকিছুকে ক্ষুদ্র গন্ডির মধ্যে সাজিয়ে নিপুণ কৌশলে কাহিনীর বয়ানটুকুই বোধ করি একটি মহৎ গল্পের বৈশিষ্ট্য।
উপন্যাস আরিমাতানো পড়ার মধ্য দিয়ে ইতিপূর্বে পরিচয় ঘটেছিল ঔপন্যাসিক মাহবুব ময়ূখ রিশাদের লেখার সাথে। তাঁর ছোটগল্প পড়ার অপেক্ষায় ছিলাম তখন থেকেই। 'তর্কশয্যায় মৃত্যু'র ছয়টি গল্পই অাঙ্গিক ও বিষয়ের দিক থেকে বৈচিত্র্যময় হলেও 'মৃত্যু' যেন চক্রাকারে ঘুরপাক খেয়ে ফিরে ফিরে এসেছে সবকটি গল্পেই। সেই মৃত্যু হোক সম্পর্কের, অনুভূতির, কিংবা বিশ্বাসের। একটি গল্পগ্রন্থের সবগুলো গল্পই যে সমমানের হবে না তা বলাই বাহুল্য। ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে এই বইয়ের দুটো সেরা গল্পের একটি যদি হয় 'লিয়ান্তিকা', অন্যটি তবে 'হাওয়া হাওয়া ও হাওয়া খুশবু লুটাদে'। 'কার্তিকের কাশি' ও 'কিকুচি' শিরোনামের গল্প দুটিও বেশ।
ভাষার কারুকার্য, বাক্যের সরলতা ও প্রভাবী লেখনশৈলী'র জন্যই সমকালীন লেখক হিসেবে মাহবুব ময়ূখ রিশাদের নামটি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করতে হয়। এ যাবৎ প্রকাশিত তাঁর ছোটগল্পের ভান্ডার অসীম না হলেও খুব অল্পও না। সেগুলো পাঠের জন্য মুখিয়ে রইলাম।
হাতে নেওয়ার পর আমার মনে হলো এই বই এক বসাতে পড়তে পারবো হয়তো। আদতে এই বইয়ের গল্প এত ভালো লাগছিলো যে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিলাম। একটু রয়েসয়ে পড়লাম। ছোট্ট এই বইয়ের গল্পগুলো আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে জীবনের ছোট ছোট বিষয়গুলো নিয়ে। মৃত্যুর বহুরূপ এখানে দেখবেন। দৈহিক কিংবা আত্মিক। সংসার জীবনের কলতান আর নিত্য ঘটে যাওয়া ঘটনারই যেন অন্য রূপ গল্পগুলো। 'হাওয়া হাওয়া ও হাওয়া খুশবু লুটাদে' গল্পটাই সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। শেষের টুইস্টটা ছিলো তব্দা খাওয়ার মতো। তবে বাকি গল্পগুলোও কোনোটা থেকে কোনটা কম নয়।
রিশাদের ভাবনাচিন্তা, তার জগতের ধরন গড়ন আমাকে গর্বিত, অন��প্রাণিত করে। তর্কশয্যায় মৃত্যুর অভিনব গল্পগুলো তার অবাক করা পৃথিবীর সুশোভিত, সুরভিত একেকটা অরণ্য। সেখানে ঐশ্বরিক ফুল ফুটে আছে।
ভরসার অভাবে হোক আর যে কারণেই হোক, দীর্ঘদিন ধরে নতুন কোন লেখকের কোন লেখা পড়া হয়ে উঠছিল না। রিশাদের "তর্কশয্যায় মৃত্যু" আমার কাছে বদ্ধ ঘরে হঠাৎ খোলা হাওয়ার মত হয়ে এসেছে। লেখকের আগের লেখাও পড়েছি তবে বেশ আগের। গল্পের ভাষা, গল্প বলার ভঙ্গী এবং গঠনশৈলী সব মিলিয়েই চমৎকার হয়েছে। ৫টা গল্পেই মানব মানবীর সম্পর্কের বিভিন্ন আনাচ কানাচের সুলুকসন্ধান করা হয়েছে, ও রসে বঞ্চিত বলে একারণে হয়ত পুরো মজাটা নিতে পারি নি। তবে আমার মত নিরস/নিরাবেগ লোকদের জন্য কিছু রেশন থাকলেও বেশ লাগত। অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলি, প্রিয় ব্যান্ড পিঙ্ক ফ্লয়েডের দুই নাটের গুরু গিলমোর আর ওয়াটার্স দুজনকে গানেশ্বর মানলেও ওয়াটার্স যুদ্ধ, শান্তি, মানবতা আর রাজনৈতিক আলাপ গানে নিয়ে আসতে পারেন বলেই আমি একটু উপরে ঠাঁই দেই। রিশাদের লেখার যেহেতু ক্ষমতা আছে তার উচিত মাঝেসাঝে ওদিকটাও খানিকটা ঘুরে আসা। আরেকটা মজার জিনিস হল, প্রতিটা গল্পেই রোগ শোক এবং হাসপাতালের প্রাধান্য, একই জিনিস একসময়(এখনো খানিকটা) শাহাদুজ্জামানের লেখাতেও চোখে পড়ত। চোখে পড়া পর্যন্ত ঠিক আছে, চোখে লাগা শুরু করলেই মুশকিল। কিকুচি, কার্তিকের কাশি গল্পদুটো এ সংকলনের মাঝে বিশেষ নজর কেড়েছে আমার। সব মিলিয়ে রিশাদের পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় থাকব এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই।
২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা The ABC's of Death। যেখানে A-Z অব্দি ২৬ টা লেটার তাই ২৬ টা শর্ট ফিল্মের উপস্থিতি আছে, যার পিছে কাজ করেছেন ১২ জনের বেশি ডিরেক্টর। সেই সিনেমার ২৬ টি গল্পে ২৬ রকম ভাবে মৃত্যু এসেছে। মৃত্যুই গল্প গুলার ক্লাইমেক্স অথবা বিগিনিং। ময়ূখ রিশাদের লেখা তর্কশয্যায় মৃত্যু বইয়ে রয়েছে ৬ টি ছোটগল্প। ৬ রকমের মৃত্যুর গল্প। যে মৃত্যুর মাধ্যমে গল্প গুলার শেষ আবার অন্যভাবে ভাবলে দেখা যাবে সেই মৃত্যুর মাধ্যমেই গল্পের আসল কিসসা শুরু। মৃত্যুই যেন সবকিছুর শেষ নয়।
তর্কশয্যায় মৃত্যু, একটি গল্প গ্রন্থ,ছয়টি গল্পের সমাহার এই বই। গল্পগুলো স্বাভাবিক বা কমন প্লটের কোন গল্প না। প্রত্যকটি গল্পের মধ্যে অদ্ভুত একটা ঘোরলাগা ব্যাপার কাজ করে। একেকটি গল্প শেষ করার পর,আপনাকে আবার গল্পটা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে। লেখক আপনাকে কোথেকে, কোথায় নিয়ে যাবে বুঝতেই পারবেন না।
তর্কশয্যায় মৃত্যু, আমার পড়া লেখকের প্রথম বই। প্রথমটা তে ই মুগ্ধ হয়েছি,লেখাগুলো আমাকে আচ্ছন্ন করেছে। প্রতিটি গল্প আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে। লেখকের বর্ননার ভঙ্গি ও আমার বেশ চমকপ্রদ লেগেছে। তবে, গল্পগুলো পড়তে পড়তে পাঠক খুব সহজেই আবিস্কার করতে পারবে,আমাদের শ্রদ্ধেয় লেখক পেশায় একজন চিকিৎসক।
গল্প কি শুধু কাহিনী নিয়েই হয়? কাহিনী এর কঙ্কালটা দাঁড় করিয়ে দেয় ঠিকই।এর ওপরে ব্যক্তিগত দর্শনের মাংস আর বাচনকৌশলের মসৃণ ত্বক লেপে দিয়ে একে প্রাণ দেন লেখক। শক্ত কাহিনীর থাকার পরেও বয়ানের দক্ষতার অভাবে গল্প পাঠক হারায়।আবার সুবচনের সাথে বিষয়বস্তুর যোগসুত্র জোড়াতে না পারলে আপনা আপনি ভেঙে পড়ে কাহিনী। এই বইয়ের কিছু গল্পের কাহিনী আমাকে চমকে দিয়েছে,আর সমস্ত বইজুড়ে তার বর্ণনার ধরণ মুগ্ধ করেছে। কিছু গল্প চমৎকার শুরুর সাথে শেষটায় তাল মেলাতে পারেনি। তবুও সুখপাঠ্য এই বই আমার কাছে ৫তারার রেটিং পাচ্ছে।
কি অদ্ভুত ভাবে, পরতে পরতে নিজেকে আবিষ্কার করেছি এটা যখন পড়ছিলাম। মেটাফরের দারুণ ব্যবহার, টুইস্ট, শব্দশৈলীতে সাহসিকতা, এগুলোর পাশাপাশি বিষন্নতার ছায়া ছিলো লেখাতে। সালভাতর দালি র চিত্রকর্মের ( The burning Giraffe) মত surrealism এর subconscious, পরাবাস্তব বিষন্নতা কিছুটা রয়েছে। সাইকোঅ্যানালিসিস নিয়ে লেখকের চিন্তাধারা অন্যরকম। আসলেই আমরা কি ভাবছি ভেতরে, কি বলতে চাইছি অথচ করতে ব্যর্থ হচ্ছি বারবার, মেটাফরে এই আকুতি গুলোই দৃশ্যমান। সুখপাঠ্য তো অবশ্যই, সাথে লেখকের ব্যতিক্রমী গল্প বলার মুন্সিয়ানা... সব মিলিয়ে দারুণ...
পাঁচে পাঁচ তারকাই দেয়া যায়। প্রত্যেকটা গল্পে মেটাফরের ব্যবহার এতো দারুণ হয়েছে যে পড়তে গিয়ে মুগ্ধ হতে বাধ্য। মৌরিতানিয়ার গল্পটা খুবই সাহসী। বাংলা সাহিত্যে এই গল্প টিকে থাকবে বলেই বিশ্বাস।
দাগের গায়ে চাঁদ মমতায় মাখানো এক গল্প। কিকুচি গল্পতে আছে কিছুটা থ্রিলারের ছোঁয়া।
*৪.৫/৫ বাংলা সাহিত্যে ডার্ক কমেডির দেখা পাওয়া সত্যিই দুরূহ। আর এই ডার্ক কমেডির সাথে যদি চমৎকার কিছু গল্প বলা হয়, তবে তা পাঠকে দিবে তৃপ্তির ঢেকুর। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। লেখক যদি এই গল্পগুলোর সাথে জুড়ে দেয় কিঞ্চিৎ ম্যাজিকাল রিয়েলিজম তবে তা হয়ে উঠে 'মারহাবা!', 'লা জবাব!'!
লেখক মাহবুব ময়ূখ রিশাদের 'তর্কশয্যায় মৃত্যু' (বইয়ের নামটা অভিনব!) পড়ে আমি 'মারহাবা!' বলতে বাধ্য হয়েছি। সাম্প্রতিক কালে আমার পড়া সবচেয়ে পছন্দের ছোট গল্পের বই এটা! বইয়ে আমার সবচেয়ে পছন্দের গল্প 'কার্তিকের কাশি', এই গল্পের নির্বিকার গল্প বলার ধরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে (আর শেষের টুইস্টটা!)। তবে সাহিত্য গুণে 'লিয়ান্তিকা' অন্য সব গল্পকে ছাপিয়ে গেছে। বাকি গল্পগুলোও চমৎকার।
অদূর ভবিষ্যতে লেখক মা. ম. রি. এর বাকি বইগুলোও পড়ে ফেলতে হবে। আর ভাই-বন্ধু সকলকে বলে বেড়াতে হবে এই বইয়ের ব্যপারে।
'তর্কশয্যায় মৃত্যু' পড়ে একজন লেখককে পেয়ে গেলাম যার সবগুলো লেখা পড়ার জন্য মনের ভিতর একটা তাড়না অনুভব করছি। সহজ স্নিগ্ধ বাক্যগুলো দিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে খাদের কিনারে নিয়ে যাওয়া সব গল্প। 'দাগের গায়ে চাঁদ' আর 'মৌরিতানিয়ার বাবা' প্রথম দুটি গল্প সবচেয়ে ভালো লেগেছে- এই বাক্যটি লেখার পরে মনে হচ্ছে বাকি গল্পগুলো নিয়েও আমার কোন অভিযোগ নেই। পাঠানুভূতির শেষে প্রশ্নবোধক চিহ্ন যেটা রয়ে গেলো সেটা হল বইটির নামকরণ। কেন নামটা 'তর্কশয্যায় মৃত্যু' সেটা বুঝে উঠতে পারিনি।
বইতে আছে মোট ছ'টা গল্প । দাগের গায়ে চাঁদ, মৌরিতানিয়ার বাবা, লিয়ান্তিকা, কার্তিকের কাশি, কিকুচি, হাওয়া হাওয়া ও হাওয়া খুশবু লুটাদে ।
আমার বিশেষ ভাল্লাগছে 'দাগের গায়ে চাঁদ, কিকুচি, মৌরিতানিয়ার বাবা । গল্পের বুননে রসনায় সবগুলোই উত্তীর্ণ । ভালো গল্প । কিন্তু দু একটা ভিন্নতর তেমনই একটা হলো প্রথম গল্পটা *দাগের গায়ে চাঁদ । পড়ার সময় অদ্ভুত অদ্ভুত মনে হয়েছে । বাস্তবেও একটা অদ্ভুত গল্প ছিল ঐটা । প্রথমে মনসুর তার স্ত্রী মানসুরা আর জায়গাটা মনসুরাবাদ এইরকম একটা কাকতলীয় মিল লেখকের চিন্তা থেকেই গল্পের মোড়কে স্থান করে নেয়াটা ভালো লেগেছে । আবার পরক্ষনেই একটা অদ্ভুত রকমের পাখির খবর পাওয়া যায় । ডোরাকাটা পাখি । কেমন বাঘের মত দেখতে । এর পর আবার বাচ্চা ছেলেটা । মুগ্ধ নাম । তার যেই বর্ণনা । ঐটা আমি এখানে বলে স্বাদ ঘোলে মেটাতে চাই না । পাঠক গল্পের অন্দরে প্রবেশ করে দেখে নেবেন ।
আর *কিকুচি' নামটাই কেমন অদ্ভুত । ভেতরে আরো অদ্ভুত কিছু যে নেই বলা যাবে না । এইটা মূলত একটা জাপানি রোগ । গল্পের অন্দরে প্রবেশ করলে এই রোগের অদ্ভুত কিছু দৃশ্য দেখে পাঠক শিউরে উঠতে পারেন । অথবা নাও পারেন বলা মুশকিল । গল্পটা আলাদা । চিত্র চিত্রাঙ্কন সুন্দর । বর্ণনাটা সাবলীল । হালকা হালকা তথ্য রিশাদ ভাই'র গল্পকে আলাদা আসন দিয়েছে ।
*মৌরিতানিয়ার বাবা । মূলত দুইটা নাম মৌরি আর তানিয়া । মিলায়ে মৌরিতানিয়া । লোকটার যমজ মেয়ে হয় দুটো । চাচা এমন নাম দুটো রেখে দেন বাবার অনুপস্থিতিতে । বাবা ফিরে এসে নাম পাল্টাতে চান । তা আর হয়ে ওঠে না । মাঝে আমরা জেনে যাই মৌরিতানিয়া দুই নাম মিলায়ে একটা রাষ্ট্র আছে । আফ্রিকা মহাদেশে । আদৌ আছে কিনা জানি না । তবে এখান থেকে তেমনটাই জানান লেখক । এবং এও জানান সেটা একটা ইসলামিক দেশ । এবং এই কারণেই পিতা তার মেয়েদের নাম আর পাল্টাতে চান না । এছাড়া বাকি গল্প গুলোও ভালো । লিয়ান্তিকা একটা অন্যরকম গল্প ঠিক । কিন্তু আমি তাল হারিয়েছি । ফ্ল্যাপের লেখায় আরিশ নামটা দেখে মনে হলো এই গল্পেও আরিশ আছে । ফ্ল্যাপে কি তবে এই গল্পেরই খন্ডাংশ । জানিনা । এখনো ক্লিয়ার না । কারণ ফ্ল্যাপের মেয়েটা ছিল জুয়েনা এইখানে লিয়ান্তিকা নাম নিয়ে বলার নেই তবে ঐটুকু গল্পে দেখলাম না । তবে ফ্ল্যাপে লেখা টুকু সুন্দর ছিল । কার্তিকের কাশি । নামটাই আলাদা । ভেতরেও আলাদা কিছু আছে সত্যি । গল্পের বর্ণনাও ভালো ছিল । সব মিলিয়ে সুন্দর গল্প এটাও । হাওয়া হাওয়া ও হাওয়া খুশবু লুটাদে । নামের মধ্যেই যেই রকম আলাদা একটা আকর্ষণ থাকা দরকার এইখানে খুব একটা ব্যঘাত ঘটেনি । একটা মাতলামো ভাব আছে । ভেতরও কি তেমন কিছু আছে ! আছে হয়তো । বা নেই । এর জন্য ভেতরে প্রবেশ করাটাই বরং ঠিক হবে । তবে একদম শেষ গল্প হলেও পাঠক গল্পটা শেষ না করে হয়তো উঠবেন না । বই: ৮০ পৃষ্ঠা । দাম ১৫০ টাকা । প্রকাশনী: অনিন্দ্য প্রকাশ ।
সস্তায় সুস্থ বিনোদন ।
দ্র: বইটা ছোট হওয়ায় কেউ কেউ টানা পড়ে ফেলবেন হয়তো । আমার কাছে এমনটা ঠিক মনে হয় না । আমার মনে হয় এক লেখকের একাধিক গল্প একাধারে না পড়া ভালো । একটু বিরতি বা সময় থাকলে লম্বা বিরতি দেয়া ভালো । এতে করে অনুভূতি উপলব্ধি যথাযথ হয় । একাধারে পড়ে গেলে সমস্যা তেমন কিছু না । তবে একটায় অন্যটায় তালগোল যে পাকাবে না তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না । আমিও এই কারণে এখানের ছ'টি গল্প পড়তে মোটামোটি চারদিন সময় নিয়েছি । মাঝে অল্প বিস্তর বিরতি দিয়েছি । এখন দেখছি উপলব্ধি ঠিকঠাক আছে ।
মাত্র ৮০ পৃষ্ঠার পিচ্চি সাইজের একটা গল্প সংকলন। লেখকের পঞ্চম বই, আর আমার পড়া প্রথম।
সুলেখিত গল্প গুলোর সবগুলোই চমৎকার। বইয়ের ছয়টা গল্পের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় গল্প দুটি "লিয়ান্তিকা" ও "কার্তিকের কাশি"। যদিও দুটো গল্পের প্রথমটা বিষণ্ণ করে তোলে, আর দ্বিতীয়টার শেষ লাইনটা পড়ে মুচকি হেসে উঠি৷ তবে বইয়ের সেরা গল্পটা নিঃসন্দেহে "লিয়ান্তিকা"ই, বন্ধুত্ব, প্রেম, দাম্পত্য নিয়ে বেশ একটা ভাবনায় ফেলে দেয়।
একমাত্র " দাগের গায়ে চাঁদ" গল্পটার সমাপ্তিই কেন যেন ঠিক পছন্দ হয় নি। অথচ পুরো গল্পটা কত চমৎকার ছিল!
"মৌরিতানিয়ার বাবা" গল্পের প্রায় সম্পূর্ণ বাস্তবতা নিজ চোখেই দেখা। আফসোস আর বেদনার অনুভূতি জাগায়।
"হাওয়া হাওয়া ও হাওয়া খুশবু লুটাদে" সম্ভবত কোন ঈদ সংখ্যায় বা কালি ও কলমে পড়েছিলাম। এই গল্পটাও চমৎকার।
গল্পগ্রন্থের নামে সাধারণত একটা গল্প থাকে অন্যান্য বইয়ে। "তর্কশয্যায় মৃত্যু" নামে কোন গল্প নেই বইতে, একটু অবাক হয়েছি। এমনকি ফ্ল্যাপের লেখাটুকুও অনুপস্থিত পুরো বইয়ে।
এই বইটা পড়ার সময়, প্রতিটা গল্পের শেষে সময় নিয়েছি, ভেবেছি যা কিছু থাকে শব্দের সরলতায়, অন্যকিছু কি লুকিয়ে আছে? কোন লেখক যখন লেখেন, গল্পগুলো তার, তিনি অনেক কিছুর আড়ালে আর প্রকাশ করার মাধ্যমে একটা পৃথিবী সাজান, কিন্তু পাঠক যখন পড়ে, তখন গল্প গুলো তাঁরও হয়ে উঠে, যদি বই শেষ করে নিঃশব্দ শুন্যতায় আচ্ছন্ন না হই, তাহলে আমার কাছে গল্পগুলো আমার কাছের হয়ে ওঠে না। প্রকাশিত সবগুলো বই পড়ার পর বলতে চাই লেখক হিসেবে মাহবুব ময়ুখ রিশাদ আরও এগিয়ে যান, এই প্রত্যাশা করি, ছোটগল্প থেকে উপন্যাসের যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত থাকুক, তিনি যে পথ ধরে এগিয়ে চলেছেন, পাঠক হিসেবে এই ধরনের লেখার আরও প্রত্যাশী ।