‘আসমানে উইঠাছে চান, সেই চান তোমারও লাহান, চানের ওই মুখ চৌক্ষে দেইখা, মন হইলো আনচান, বাগানে ফুইটাছে ফুল, সেই ফুলে তোমারই ভুল, আমার গাঙ্গে ঢেউ উঠাইয়া, ভাঙ্গিলো দুই কুল, আকুল হইয়া সেই ঢেউয়েতে ঘর ভাইঙ্গাছি, ও বন্ধু, তোমার লগে আমি আমার মন বাইন্ধাছি। শুধু আমি জাইনাছি, তোমার লাইগ্যা বন্ধু আমার মন বাইন্ধাছি।
Sadat Hossain (born 29 June 1984) is a Bangladeshi author, screenwriter, film-maker, and novelist. Sadat Hossain was born In Madaripur, Dhaka, Bangladesh. He studied anthropology at Jahangirnagar University. He was a photojournalist in a newspaper. Then the editor told him that he should write the story of those photos. Eventually, with these, he published his first book in 2013 named Golpochobi. Then, he started to write short stories. In 2014 Janalar Opashe published. In 2015 Aarshinagor is the first book when people recognize him in 2015.[4] Besides writing he has interest in filmmaking as well. He has a production house named ‘ASH’ Production house, released a number of visual contents like short films, dramas, music videos, documentaries, etc.
এইটা মানবজনম থেকে ব্যাটার, তবে খুব যে ভালো, তা বলতে পারবো না। বইটার মধ্যভাগে দারুণ জটিলতা লাগসিলো, সেসব শেষেও থেকে গেছে....এন্ডিং হইসে দারুণ ইন্টারেস্টিং একটা জায়গায়। লেখক জটিলতা তৈরি করসেন, কিন্তু নায়কের সেইটার মুখোমুখি হওয়ার আগেই গল্প শেষ করে ফেলসেন।
সাদাত হোসাইনের একটা প্যাটার্ন ধরতে পারতেসি, একেবারে অজপাড়াগাঁ হয় উনার গল্পের পটভূমি। বাঙালি ভিলেজ পলিটিক্সকে বেজ করে বেশি বই পড়া হয় নাই, শরৎ চন্দ্রের 'পল্লীসমাজ' পড়সিলাম আড়াই দুই বছর আগে, সেই সময় বইটাকে দারুণ লাগসিলো। সাদাত হোসাইনের এই বইগুলাতেও ভিলেজ পলিটিক্স খুব বড় একটা পিলার। এই পিলার কাজেরও ভীষণ।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে, যখন নায়ক নায়িকা প্রেমে পড়ে তখন সেই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে ফুটিয়ে তুলবেন। একটু এদিক সেদিক হয়ে গেলেই বড্ড ন্যাকাবোকা হয়ে যায়। এই জায়গায় সাদাত হোসাইন পুরাই ফেইল, একদম পারেন নাই।
হুমায়ূনীয় প্রভাব এখানাতেও একটা বড় রকমের ঝামেলা। মানবজনমে মোটামুটি মানা গেসিলো, এ বই পড়ার সময় এই ভীষণ প্রভাবের কারণে বিরক্ত হইসি প্রচুর। মাঝে মধ্যে ইচ্ছা হইতেসিলো মোবাইল খাটের তলে ছুইড়া মারি।
যাই হোক, রেটিং দিব দুই দশমিক আট। ভালো গল্প তৈরি করে লোকটা, কিন্তু সাহিত্য যে শিল্প এইটা বোধহয় উনার মাথায় থাকে না৷ সুন্দর, মৌলিক গদ্য না থাকলে বই পড়ব কেন? আর পড়ে আনন্দই বা পাবো কিভাবে। খালি ভালো গল্প চাইলে তো হিন্দি সিরিয়ালই দেখা যায়, সেসব জায়গায় দারুণ জটিল সব গল্প থাকে।
সাদাত হোসাইনের শুভ বুদ্ধির জয় হোক, এটলিস্ট নিজের লেখা নিয়া ছোটখাটো কিছু এক্সপেরিমেন্ট করার সাহস যেন উনার হয়।
সাদাত ভাই পড়া না থাকলে এ বই একবার পড়ে দেখতে পারেন, সামগ্রিক একটা আইডিয়া পাবেন উনার লেখা নিয়া।
সাদাত হোসেনের ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম "আরশিনগর" বইটা পড়ার পর থেকেই। নির্বাসন আমার পড়া লেখকের দ্বিতীয় বই।
খুব গুছিয়ে লিখতে গেলে হয়তো স্পয়লার হয়ে যেতে পারে, তাই ওতোকিছু লেখার ইচ্ছাও নাই আপাতত।
ইচ্ছা ছিল বইটা একটু সময় নিয়ে অনেকদিন ধরে পড়ব। কিন্তু পাঠকের মনে আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে লেখক পুরোপুরি সফল। ফলাফল হিসেবে বইটা দ্রুতই পড়া শেষ হয়ে গেল।
সাদাত হোসেনের লেখার যে ব্যাপারটা সবচেয়ে ভাল লাগে সেটা হল, এতো বড় পরিসরের উপন্যাসে এতো এতো চরিত্রের মাঝেও তিনি মোটামুটি সবাইকেই সমান গুরুত্ব দেন। তার গল্পের কোনো চরিত্রই যেন অপ্রয়োজনীয় নয়। তোরাব আলী লস্কর, আজহার খন্দকার, মনসুর, কণা, জোহরা, দেলোয়ার হোসেন, ওসি মঈনুল, একরামুল, হানিফ, মায়া, মঞ্জু - এরা সবাই ই যেন এই গল্পের একেকটা প্রাণ। অথচ এতো এতো চরিত্রের মাঝেও পাঠক হিসেবে কখনোই বিভ্রান্ত হতে হয় নি- এ থেকে বোঝা যায় সাদাত হোসেন তার গল্প বলায় কতটা সাবলীল।
"নির্বাসন" বইটা আমার কাছে কখনো লেগেছে সামাজিক গল্প, কখনো আবার মনে হয়েছে কোনো প্রেমের উপন্যাস পড়ছি, আবার কখনো কখনো রোমাঞ্চ বোধ হয়েছে আবার কিছু কিছু জায়গায় মনে হয়েছে বাংলাদেশের কোনো সিনেমার গল্পের খন্ডচিত্র। নিজের প্রেডিকশন আর গল্পের পরণতি জানার কৌতুহলে খুব আগ্রহের সাথেই বইটা পড়তে পেরেছি।
খুব আগ্রহের একটা কারণ ছিল গল্পের শেষটা কীভাবে হয় জানার জন্য। আমি যেভাবে ভেবে রেখেছি সেই অনুযায়ী নাকি লেখক আরো কিছু টুইস্ট শেষের জন্য রেখে দিয়েছেন। তবে এই এক জায়গাতে এসেই হতাশ হতে হয়েছে। যখনই মনে হচ্ছিল শেষ বারের মত গল্পে বড়সড় একটা ধাক্কা আসবে তখনই হঠাত করেই যেন লেখক বইয়ের ইতি টেনে দিলেন। হয়তো লেখকের ইচ্ছা ছিল সব পাঠক নিজের মত করে গল্পের শেষটা সাজিয়ে নিবে। তবে এমন এক জায়গায় নিয়ে লেখক ছেড়ে দিয়েছেন যেখানে জোর করেও কোনো 'হ্যাপী এন্ডিং' এর কল্পনা করতে পারিনি৷
সবশেষে এটাই বলতে পারি, এই গল্পের এন্ডিং পুরোপুরি পাঠকের নিজের হাতে। আর সেজন্য পড়ে যেতে হবে বইয়ের শেষ পাতা পর্যন্ত...
সাদাত হোসাইনকে আগে চিনতাম না। উনার লেখার সাথে পরিচিত হই কবিতার লাইনগুলোর মাধ্যমে যেগুলো ফেইসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছিল ছবির ক্যাপশন হিসেবে। তারপর হুট করেই নির্বাসন বইটি কেনা হয়।
পড়া শুরু করার পর প্রথম কয়েকপাতা পড়ে বর্ণনার ভঙ্গিতে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বইটা কয়েকদিনের জন্য রেখে দিয়েছিলাম। তারপর আবার শুরু করি। মাঝে ভালো গতি ছিল, শেষে আবার কেমন যেন; তবে টানা পড়ে শেষ করেছি । যদিও বেশকিছু অংশে অসঙ্গতি আর সিনেমার কাহিনীর মতো লেগেছে , কিন্তু ততটা খারাপ লাগেনি। ভালোই উপভোগ করেছি :)
আমার পড়া সাদাত ভাই এর প্রথম বই ছিল শেষ অধ্যায় নেই। যেটা বলতে গেলে একটা সনামধন্য বই এর কপি। কপি হতেই পারে তবে উনি যখন লেখক কে চেনেন না বলছেন তখন বিরক্ত লাগছিলো।যাইহোক, উনার লেখনী বেশ সুন্দর।এই বই তেও সেটা লক্ষ্য করলাম।
কিন্তু সমস্যা হল :
১/ বই এ মেদ অনেক।অপ্রয়োজনীয় আলাপ দিয়ে পৃষ্ঠা ভরে ফেলেছেন। চাইলেই বই এর পাতা কমানো যেত।
২/ বই এর ফিনিসিং এ উনি জোর করে একটা ট্রাজেডি ক্রিয়েট করতে চেয়েছেন।গল্প শুরু হলে গল্পের শেষ ও থাকে।আমার কাছে মনে হয়েছে উনি হয়ত সময়ের মধ্যে লিখার জন্য গোজামিল দিয়েছেন।নাহয় থানায় বসে আলাপের পরে কিভাবে শেষ করে দেয় এভাবে? খুব ই অপ্রয়োজনীয় বাজে এপ্রোচ এইটা।
তবে উনার লেখনী আকর্ষণীয়।জোর করে হুমায়ুন আহমেদের স্টাইল ফলো না করলে উনার লেখা ভাল লাগবেই!!
গ্রামে বসে গ্রামের বই পড়লাম। লেখকের দর্শনের সাথে অনেক কিছুই মিলেনা আমার। কিন্তু আমারও মনে হয়, গ্রামের মানুষের 'মন' ও 'মায়া' লেখক যেভাবে লিখেছেন সেইরকমই। বই প্রেম প্রীতি নিয়েই লেখা হলেও এইটা বলাই লাগে, লেখক চাইলে কিছু প্রেমের কথা বাদ দিতে পারতেন। তবে প্লোট অনেক ভালো লেগেছে।
মাত্র কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই যা বুঝলাম এই বই আমার জন্য অন্তত -"না"। যারা এককালে প্রচুর হুমায়ুন এর বই পড়ে বড় হয়েছে আমার মত কিংবা যাদের শুরুটাই হয়েছে হুমায়ুন দিয়ে তাদের এই বই ভালো লাগার কথা না। তবে ব্যতিক্রম থাকতেই পারে। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত।
অবশেষে 'নির্বাসন' বইটি পড়া শেষ হলো। প্রায় সাতদিন সময় লেগেছে। সাধারণত এই সাইজের বই পড়তে আমার একদিনের বেশি সময় লাগে না। কিন্তু কিছু কিছু বইয়ের ক্ষেত্রে বেশি সময় লাগে। সেসব বই অল্প কয়েক পাতা পড়ে অন্য বই পড়া শুরু করি। এই বইয়ের ক্ষেত্রেও এমনটা হয়েছে। নির্বাসন-এর প্লট ভালো। তবে বইয়ের মাঝামাঝি পর্যায়ে লেখক কাহিনীতে যে বাঁক এনেছেন তা ইউনিক নয়।
এর আগে লেখকের কয়েকটি বই পড়ার দরূন এটা জানা ছিলো যে প্লট ভালো হলেও প্রায় প্রতিটি অনুচ্ছেদে জীবনঘনিষ্ট এবং আবেগী কথাবার্তা থাকায় গল্পের টান টান ভাবটা ঝুলে পড়ে। নির্বাসনেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে শেষের দিকে কাহিনী গতি পেয়েছে। ইনফ্যাক্ট বইয়ের শুরু এবং মাঝের দিকের বর্ণনা ও কচ্ছপ গতির সাথে শেষের ২০/৩০ পাতার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। শেষের ২০/৩০ পাতায় ধুমধাম করে সব ঘটনা ঘটিয়ে শেষ করা হয়েছে। অথচ কিছু জায়গায় বর্ণনার প্রয়োজনীয়তা ছিলো, সেসব এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। যেমন-
যাই হোক, ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে বইটির সংস্করণ নিয়ে যেভাবে মাতামাতি এবং নেতিবাচক সমালোচনা চোখে পড়েছিলো, বইটি ততটা খারাপ নয়। যদিও বইয়ের কিছু নেতিবাচক বিষয় আলোচনায় এনেছি, তারপরও আমার কাছে ভালোই লেগেছে। তবে অসাধারণ বা অনেকদিন মনে রাখার মতো কিছু নয়।
মায়া বড়ই অদ্ভুত জিনিস,একবার এই জালে বন্দী হয়ে গেলে সহজে মুক্তি পাওয়া যায় না।এই মায়ায় পড়ে মানুষ আত্মভোলা হয়ে নিজের স্বপ্নকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতেও ইতস্তত বোধ করে না।কত-শত ইচ্ছেকে পিষে বাস্তব যেন সেই কল্পনাশক্তির চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উল্টোপথে চলে। সময়ের সাথে অবস্থা পাল্টে যায়,জীবনের বেহিসেবী খাতায় হুট করেই হিসেবের গড়মিল খুঁজতে হয়।পারিপার্শ্বিকতার সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে সত্তাকে ধোঁকা দিয়ে সমাজের নিয়মে গাঁ ভাসাতে হয়। অথচ সুন্দর ব্যাপার হলো, সবাই যখন প্রয়োজনের মালা জপে ঠিক তখন কিছু মানুষ প্রিয়জনের স্মৃতিতেই বেঁচে থাকতে পারে।প্রত্যাশার ঝুড়ি পেছনে রেখে মেঘে ডাকা চাঁদের মতো দিনগুলো কারো বড্ড প্রিয় হয়ে যায়! চরের জীবনের সাথে যেমন নগরজীবনের তুলনা হয় না তেমনি ভিন্নপথে জীবনধারণ করা মানুষের জীবনবোধের মাঝেও তুলনা হয় না।নিজের জায়গা আঁকড়ে ধরে রাখতে গিয়ে সাধ্যের বাইরেও সব করতে হয়,নিজেকে পরিবর্তন করতে হয় ঠিক নদীর উপরে প্রবাহমান বাতাসের মতো। কর্ম নৈতিকতা বর্জিত হলেও উদ্দেশ্য যে মহান হতে পারে, অধিকার আদায়ের লড়াই যে অন্যরকম হতে পারে সে চিত্রের দেখা মিলে নির্বাসনে।ভিন্ন বয়সী,ভিন্ন পথের,ভিন্ন কর্মের মানুষের চিন্তাভাবনা আর জীবনাচরণ নিঁখুতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।তবে জীবনের গোলমেলের মতো বইয়ের কিছু পাতায়ও সামঞ্জস্য করতে কিছুটা বেগ পেতে হবে।সুন্দর সত্য হলো,পুরোটা বই'ই যেন মমতার অদৃশ্য ছায়ায় আচ্ছন্ন,মায়ার জালে আবদ্ধ। বইয়ের শেষাংশে প্রতীয়মান হয় যে,আবেগের আতিশায্যের মূল্য দিতে কখনোবা পুরো জীবনটাই কম পড়ে যায়!.হারানো মানুষ,হারানো জীবন,হারানো স্থান, হারানো সম্পদ ফিরে পাওয়ার লোভ তবু থেকে যায় নিরন্তর। ঝরা পালকের মতো ঝরে যাওয়া প্রাণ কিংবা হলুদ পাখির মতো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া সবই যেন নিয়তি,তবু নদীর ধারে,চরের বুকে মানুষ স্বপ্ন দেখে,জীবনের জয়গানে মুখর থাকে। একটা চাওয়া শুধু, নির্বাসনের দিন না আসুক, কিংবা আসলে সব বদলে যাওয়ার আগেই শেষ হোক।
মনসুরের সাথে কণার বিয়ে হয়েছে। মনসুরকে মেরে ফেলা হইছে, আজহার খন্দকারের ইচ্ছে মনসুরের ছোট ভাই মঞ্জুর সাথে কণার বিয়ে হোক। মনসুর আটকা পরেছে লস্কর ডাকাতদের চরে, বেঁচেও মরে আছে মনসুর। মঞ্জুর আর কণার বিয়ে হয়ে গেছে। জোহরা মনসুরের পেমে পরেছে, কোন ভাবেই মনসুর কে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে দিবে না তা সত্ত্বেও মনসুরের কিছুটা নিজের কাছে রেখে তাকে ফিরে যেতে দিল নবীগঞ্জে।
সাদাত সাবের এত ভোটকা বই (নির্বাসন) মানুষ কেন পড়বে! সময়ের মূল্য নাই আমাদের!
This entire review has been hidden because of spoilers.
একবার ধরার পর আমি আর বইটা রাখতে পারি নাই!টানা পড়ে চলেছি! একবার পড়ার জন্য বইটা চমৎকার!
আলাদা করে আর ভেংগে বলতে মন চাইছে না। মন মাথা ডুবে আছে বইটায়। শুধু যেটা কঠিনভাবে মনে হয়েছে-লেখক ঠিক এ জায়গায় শেষ করেছেন কারণ যে জটিলতায় উনি উপন্যাসটা ভরিয়েছেন সেটার সামনের বাস্তবতা আর সেটার সমাধানের পথ ও উনার জানা নাই হয়তো! মনে হয়েছে-উনি পালালেন!😑 একজন লেখক কে কেনো বাস্তববাদি হতে হবে এতো? জানি না আমি কি হিসেবে বললাম -তারিফ না ধিক্কার!
আমি এই বইটা পড়েছি বেশিদিন হয় নি।উনার আরো অনেক বই পড়েছি।তবে এই বইটা অসাধারণ ছিল। এই গল্পে পছন্দনীয় চরিত্র জোহরা। ডাক্তারি পড়া মুনতাসিরের সাথে প্রেম হয় কনা।তারপর বিয়ে।তাদের দুজনের দুজনের প্রতি ছিল অসম প্রেম।তারপর হঠাৎ ডাকাত দলের আক্রমণের স্বীকার হয় মুনতাসির।তারপর কি হয়।গল্পের আসল টুইস্ট এখানেই।। গল্পের এন্ডিং একটা খটকা থাকে যদিও
আমরা প্রতিনিয়ত একটি অনিশ্চিত জীবন পরিচালনা করছি। কাল কী হবে আমরা কেউ জানি না!আর এই অনিশ্চিত জীবনকে নিয়ে আমাদের রাশি রাশি স্বপ্ন! কিন্তু আমরা কেউ জানি না,সেই সব স্বপ্ন গুলো আদোও সত্যি হবে কিনা? বা আমাদের জীবনের শেষ পরিণিত কী হবে,তাও বলতে পারি না! আজকের সুস্থ সবল হাসিখুশি মানুষ,কাল দুঃখ,বেদনায় ছটফট করতে পারে! তবুও এই জীবনকে নিয়েই আমাদের চলতে হয়!! লেখক তার নির্বাসন উপন্যাসে মানুষের এই অনিশ্চিত জীবন নিয়ে আলোকপাত করেছেন। তাছাড়াও লেখক এখানে পরিবার,সমাজ,পরিস্থিতি,ভালোবাসা,বিরহ ইত্যাদি বিষয় খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাসের শেষের কাহিনী মানুষের মনে ছোট গল্পের মত এক ধরনের অতৃপ্তি রেখে যাবে,মনে হবে,শেষ হয়েও হইলো না শেষ!! এখন ১৯৮৮ সালের আলোকে রচিত উপন্যাসটার সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় আসা যাক।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র : মনসুর,কণা ও জোহরা
আরও বিভিন্ন অপ্রধান চরিত্র রয়েছে যারা উপন্যাসে বেশ শক্ত প্রভাব বিস্তার করেছে,যেমন আজহার খন্দকার,দেলোয়ার হোসেন,তোরাব আলী লস্কর,মঞ্জু,হানিফ,ওসি মইনুল হোসেন ইত্যাদি
আজহার খন্দকারের ছেলে মনসুর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৩য় বর্ষে পড়ত,কিন্তু দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আজহার খন্দকার ছেলেকে নানা ভাবে বুঝিয়ে ঢাকা হতে গ্রামে নিয়ে আসে। আজাহার খন্দকার গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক এবং তার কদর গ্রামে স্পষ্ট,তার নিজের পাটের আড়ত ছিল। একসময় মনসুর তার বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গেলে সেখানে পরিচয় হয় কণার সাথে,পরিচয় হবার ঘটনাটা উপন্যাসে সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে! তারপর তাদের মধ্যে ভালোলাগা ও পরবর্তীতে প্রকৃতির নিয়মে ভালোবাসা হয়। তারপর আজাহার খন্দকারকে মেয়ের ছবি দেখালে সে খুশি হয় এবং বলে এই মেয়েকেই তার ছেলের বউ করে এই ঘরে চানই চান।আজাহার খন্দকারের স্ত্রী অনেক আগেই মারা যান,তারপর ছেলেরা আর মায়ের আদর পায়নি! কণার ছবি দেখার পর আজাহার সাহেব যা বলেছিলেন,"যে ঘরে নারী নেই,সেই ঘরের চেয়ে মায়াহীন গৃহ আর জগতে নেই।একজন মা,একজন স্ত্রী,একজন কন্যা একটা ইট পাথরের কাঠামোকে মুহূর্তেই ঘর বানিয়ে ফেলতে পারে। জীবনের রোজকার ক্লান্তির দিন,যুদ্ধের পথ,অবিরাম ছুটে চলা শেষে সেই ঘরখানায় তাই ফিরে আসতে ইচ্ছে হয়।একটু আশ্রয়ের জন্য,একটু প্রশান্তির জন্য,একটু মায়াময় স্পর্শের জন্য। কিন্তু এতটা কাল তিনি কাটিয়ে গেছেন আশ্রয়হীন এক জীবন।ছবির ওই মায়াবতী মেয়েটি যেন এক লহমে তার বুকের ভেতরের শুকিয়ে রুক্ষ্ম হয়ে যাওয়া মরুভূমিতে প্রশান্তির বৃষ্টি ঝরিয়েছে"
প্রথমে দোলোয়ার হোসেনের পরিবার মেয়েকে দূরে বিয়ে না চাইলেও,ছেলে ভালো এবং তার বিশ্বাস ছিল কণাকে যদি পরবর্তীতে কেউ লেখাপড়া করায় তাহলে মনসুরই করাবে! এই সময় কণা ছিল আইএ পরীক্ষার্থী।
তারপর মেয়ের বাড়িতে সম্বন্ধ পাঠায়,কিন্তু মনসুরের খালা বিয়ে প্রায় ভেঙে দেয়! তারপর আজাহার খন্দকার লজ্জিত হয়ে মেয়ের বাবার কাছে মেয়েকে ভিক্ষা চায়,যে আজহার খন্দকার জীবনে কারো কাছে অপমানিত ও হাত পাতেনি,সে নিজেই হাত পাতে! কিন্তু দেলোয়ার হোসেন তাতেও রাজি হতে চায়নি,কিন্তু কণা আজাহার খন্দকারের কান্না সহ্য করতে পারেনি,সে এমনেতে দুঃখে ছিল মনসুরের সাথে বিয়ে ভেঙে যাওয়ায়। তারপর এক রোমাঞ্চকর কাহিনীর মাধ্যমে তাদের বিয়ে হয়! তবে মেয়ের সাথে দেলোয়ার হোসেনের একটু মনোমালিন্য ও অভিমান থেকে যায়! উপন্যাসে বাবা ও মেয়ের ভালোবাসার পাশাপাশি শশুড় ও ছেলের বউয়ের মিষ্টি ভালোবাসাও প্রকাশ পেয়েছে। যা উপন্যাসের অন্যতম সুন্দর ঘটনা,যা পাঠকের মন ছুয়ে যায়। কণা আজাহার খন্দকারের ঘরের লক্ষী হয়ে থাকে! কণাও আজাহার খন্দকারকে নিজের আপন বাবার মতই ভালোবাসত। কি সুন্দর সেই ভালোবাসা। সেই রুক্ষ্ম আজাহার খন্দকার ছেলের বউ আসায় সজীব হয়ে যায়!
আর অন্যদিকে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী হলো ঐ লস্কর চরের ডাকাতদের কাহিনী। ডাকাত সর্দার তোরাব আলী লস্কর। এই লস্করদের দাপট ছিল আশেপাশের সব গ্রামে। আর জোহরা ছিল তোরাব ���লী লস্করের নাতনী। কিন্তু তোরাব আলী জোহরাকে ঠিক বুঝত না,জোহরার বাবা হারিয়ে যায় ছোট বেলায়,মাও মারা যায়,দাদার কাছেই মানুষ হয়। তবুও তোরাব আলী জোহরা মাঝেমধ্যে ভয় পেত,কী সুন্দর মায়াবতী চেহারা হঠাৎ কী ভয়ংকর হয়ে ওঠে! এই জোহরা হালকা লেখাপড়া জানত,একসময় চরে কলেরা সহ নানা অসুখ দেখা দেয়,তারপর জোহরার অসাধারণ বুদ্ধি ও সাহসিকতায় চরের সবাই মুগ্ধ হয়, এই ১৬/১৮ বছরে��� মেয়ে হয়ে সে পুলিশদের চোখে ধূলো দিয়ে গ্রেফতার হওয়া ডাকাতদের ফিরিয়ে আনে। উপন্যাসে জোহরার বুদ্ধি ও সাহসিকতায় নানা বর্ণনা রয়েছে! সে হঠাৎই কী পরিমাণ হিংস্র হয় তা উপন্যাস না পড়লে কেউ বুঝবে না,এক ধরনের রসহ্যময়তাকে তাকে নিয়ে! পুলিশের কাছেও সে থাকে রহস্যময়,কারণ পুলিশদের সে নানাভাবে হেনস্তা করে।আর পুলিশদের ও তখন সরকার ছাড়া অন্য বিষয়ে মাথা ঘামানো নিষেধ,কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। একসময় তোরাব আলী লস্কর আজাহার খন্দকারকে ডাকাতি করার বিষয় জানিয়ে চিঠি পাঠায়,কিন্তু আজাহার সাহেব পুলিশকে জানায় এবং ডাকাতের দিন ২জন ডাকাত ধরা পড়ে এবং ১ জন মারা যায়। যার কারণে আজাহার খন্দকারের প্রতি তোরাব আলী লস্করের ছিল ঘৃণা ও প্রতিশোধের ইচ্ছা। ঐ সময়ই জোহরা পুলিশদের প্রথম হেনস্তা করে। জোহরার নেতৃত্বে হানিফ ওদের নিয়ে ওরা ঐ সব করে। তারপর জোহরা একদিন আজাহার খন্দকারের পাটের আড়তে আগুন লাগিয়ে আংশিক প্রতিশোধ নেয়। এইসব ঘটনায় তোরাব আলী লস্কর খানিকটা চিন্তায় পড়ে,সে চেয়েছিল জোহরাকে সে চরে রাখবে না,দূরে ভালো জায়গায় বিয়ে দিবে। কিন্তু জোহরাকে থামাবে কে। সে সবসময় নিজের ইচ্ছামত চলে। আর সবাই তাকে ভয়ও পায়। ঐ সময় খন্দকাররা বেশ ভেঙে পড়ে,ব্যবসা ও অর্থ সংকট।আজাহার খন্দকারের সুখের সংসার কেমন যেন হয়ে যায়। তারপর মনসুর ফার্মেসীর মত কিছু দেয়~কিন্তু এতে আজাহার খন্দকারের অনুমতি ছিল না! বিয়ের অনেকদিন পর কণা বাপের বাড়ি যায়,কিন্তু নতুন ফার্মেসী করার কারণে সাথে যেতে পারে না,তাই কণাকে একটা চিঠি দিয়ে দিয়েছিল। কণাকে মঞ্জুর সাথে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তার কয়েকদিন পর মনসুরও কণার বাপের বাড়িতে যাওয়ার জন্য রওনা হয় কিন্তু সেই যাওয়া আর হলো না,মনসুর যেনো সবার থেকে হারিয়ে গেলো! আজাহার খন্দকার ঘটনার কিছুই জানত না,সে আবার কণাদের ছাড়া একা অসহায় হয়ে পড়ত,তাই কণা বাপের বাড়িতে চলে গেলে সেও বেশ কয়েকবার শুধু কণার জন্যই ছুটে চলে যেতো কণার বাপের বাড়িতে। কিন্তু সেবার গিয়ে মনসুরকে পেলো না,কণাও অস্থির হয়েছিল মনসুর বলেছিল ২ দিন পর আসবে আর আসেনি। পরে জানতে পারে ডাকাতদের হাতে নাকি মনসুর নিহত হয়েছে। এই ঘটনা উপন্যাসকে অন্য এক মাত্রা দান করে। কণা,আজাহার খন্দকার সবাই প্রায় শেষ,পাগলের মত হয়ে যায়! তখন কণার গর্ভে মনসুরের সন্তান! সে একা একা কল্পনায় গর্ভের সন্তানের সাথে মনসুরের ফিরে আসা নিয়ে কথা বলে,কাঁদে। তার কান্না দেখে আজাহার খন্দকার ও দেলোয়ার হোসেনও কাঁদে। সবাই হয়ে পড়ে অসহায়! তখন মনসুরের মেট্রিক পাশ করা ছোট ভাই মঞ্জু যে ছিল নির্জীব,অন্তরমুখী,কারও সাথে তেমন কথা বলত না,সে পরিবারের হাল ধরে।মনসুর হারিয়ে যাবার অনেকদিন পর একদিন কণা মনসুরের দেয়া শেষ চিঠিটা পায়,সেখানে মনসুর অনেক কথা বলেছে,যা পড়ে কণার কান্না এসে যায়! চিঠিতে মনসুর যা লিখেছিল তার কিছু অংশ:
"
ধরো যদি সত্যি সত্যিই কখনো এমন হয় যে, তোমাকে ছাড়া আমার থাকতে হচ্ছে, তখন কী হবে আমার? এই কথাটা আমি অনেক ভেবেছি জানো? কিন্তু প্রতিবারই ভাবনাগুলো হঠাৎই কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। আমার ধারণা আমি তখন পাগলই হয়ে যাবো। আচ্ছা, এমন কখনো হলে, কী করবে তুমি?
যে হয়েছিল ভোর, অথৈ আদর, নামহীন নদী,
একা লাগে যদি,
মনে রেখো তাকে"
এসব পড়ে কণার ভারী কষ্ট হয়! তারপর কণার একটা ছেলে সন্তান হয়,সে সময় আবার খন্দকার পরিবারে একটু সুখের বাতাস লাগে! নাতির সাথে সারাদিন খেলা করত আজাহার খন্দকার। আর অন্যদিকে দেলোয়ার হোসেন চিন্তায় আছে মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে,কারণ ২০ বছরে বয়সে কণা বিধবা হয়েছে,তাই সে কণার নতুন বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে,আজাহার খন্দকার ও ছেলের বউ ও নাতি হারানোর আশঙ্কায় অস্থির হয়ে পড়ে,কণার নতুন বিয়েতে কোন মত নেই,সে বিয়ে করবে না,খন্দকার কোন মতে ওদের হারাতে পারবে না,তাহলে সে পুরো শেষ হয়ে যাবে! তাই নানা চিন্তা করে খন্দকার সাহেব ছোট ছেলের সাথে কণার বিয়ের ব্যাপারে দেলোয়ার হোসেনের সাথে কথা বলে! দেলোয়ার হোসেন প্রথম বিষয়টি কেমন
ভাবলেও পরে বলে এর এটাই সবচেয়ে সুন্দর সমাধান! কারণ তাহলে কারও কিছু হারানোর চিন্তা থাকবে না! কিন্তু মঞ্জু প্রথমে রাজি না হলেও বাবার কথায় শেষে রাজি হয় কিন্তু কণাকে নিয়ে বিপত্তি,সে এমনেতেই বিয়ে করবে না,মনসুরের স্মৃতি নিয়েই বেঁচে থাকবে!তারপর ছোট ভাইয়ের মত দেখা আসা মঞ্জুকে সে কিভাবে বিয়ে করে!! তাই সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়,কিন্তু দেলোয়ার হোসেন তাকে ধরে আনে আর বলে," তোকে আর বিয়ের জন্য বলব না" সেদিন ভোর রাতে দেলোয়ার হোসেন মারা যায়,তখন কণা আরও ভেঙে পড়ে এবং নিজেকে দোষী করে,তাই বাবার শেষ ইচ্ছা মত বাধ্য হয়ে সে মঞ্জুকে বিয়ে করে! এই ঘটনা জীবনের এক ধরনের পরিস্থিতির স্বীকার। তারপরও ওদের সাথে আগের ভাই,ভাবীরমত ভাব কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলে না,আলাদা থাকে! একসময় কণার ছেলে মন অসুস্থ হয় তখন ওদের মধ্যে হালকা কথা হয়।
অন্যদিকে অচেনা,দূরের এক চরে পড়ে আছে মনসুর!চরটা এমন দুর্গম কেউ চর,বিল হতে বের হয়ে আসতে পারে না! পুলিশও ঐ চরের স্থান ভালো করে জানে না! চর দুর্গম হওয়ায় পুলিশও সাহস পায় না! তবে পুলিশ ডাকাতদের ধরার জন্য নানা পরিকল্পনা করতে থাকে। আসলে ঐ দিন যখন মনসুর কণাদের বাড়ি যাচ্ছিল তখন লঞ্চ ডাকাতির সময় অনেক মানুষকে মারলেও,যখন তোরাব আলী জানতে পারে মনসুর মেডিকেলের ছাত্র তখন তাকে না মেরে চরে নিয়ে যায়! তারপর হতে মনসুর সেখানে প্রতিদিন চরের লোকদের চিকিৎসা করে। কিন্তু মনসুরের মন পড়ে থাকে কণার কাছে,পরিবারের কাছে! সে এখানে প্রায় পাগলের মত হয়ে থাকে। সেখানে মনসুরকে জোহরার ভালো লাগে,একসময় তাকে ভালোবাসে,মনসুরের জন্য জোহরার মনের গভীরে একটা অসহ্য ব্যথা হয়! জোহরা নানা ভাবে মনসুরকে কাছে টানতে চায় কিন্তু পারে না,কারণ মনসুর কণাকে যে প্রচন্ড ভালোভাবে! কণা ও জোহরা দুজনই ছিল সুন্দরী।দিন যত যায় মনসুর জোহরা বুঝতে পারে,জোহরা সুখ,দুঃখ কেউ বুঝত না,একসময় মনসুর তা বুঝতে পারে। তবে মনসুর জোহরাকে ভয় পেত! মনসুর অসুস্থ হত, কারণ সে ঘুমাত না,খেত না,পালানোর চেষ্টা করত,বৃষ্টিতে ভিজে মাটিতে পড়ে থাকত,তখন জোহরাই তাকে সুস্থ করে তুলতে সাহায্য করত! আর অন্যদিকে হানিফ জোহরা ভালোবাসত,তাকে বিয়ে করতে চাইত কিন্তু তোরাব আলীর তাতে মত ছিল না,জোহরা ডাক্তার মনসুরকে বিয়ে করতে চাইত,এখানে তোরাব আলীর মত থাকলেও প্রকাশ করতে পারত না~কারণ তাহলে চরে সমস্যা সৃষ্টি হবে। হানিফ একসময় মনসুরকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে,তখন জোহরাই মনসুরকে বাঁচায়! জোহরার প্রতি মনসুরের একটা বিশ্বাস ছিল যে একদিন জোহরা তাকে ছেড়ে দিবে,তাকে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করবে!!একসময় আবার হানিফ ওরা পুলিশের কাছে ধরা পড়ে,তখন পুলিশরা মনসুরের বেঁচে থাকার কথা জানতে পারে,ওসি নানা চিন্তা করে একসময় তা আজাহার সাহেবকে জানায়,তখন আজাহার সাহেবকে ছেলেকে ফিরে পাবার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে! আর মনসুর চিন্তা করত তার স্বপ্ন ছিল সে বড় ডাক্তার হয়ে,দেশ বিদেশে মানুষের সেবা করবে,আর কণাকে সে ভার্সিটিতে পড়াবে কিন্তু এসবের কিছুই সে পূরণ করতে পারেনি! এর জন্য সে দুঃখ পায়। আর মনে হতে থাকে জীবন এত অনিশ্চিত কেনো!! এছাড়াও উপন্যাসে আরও খন্ড অনেক বিষয় রয়েছে,যা উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহে সহায়তা করেছে। জোহরা,বাহাদুর ভাইয়ের মেয়ে মায়াকে নিজের মেয়ের মত লালান পালন করে। তাছাড়া শেষে কণ���, জোহরা,মনসুরের কী হয় তা জানতে আর মনসুর কী তার বাড়িতে ফিরতে পারে?! এসব বিষয় আর জীবন,ভালোবাসা,মায়া,মমতা,অনিশ্চয়তা,বিরহ,বাবা,শশুড় ও ছেলের বউ এর প্রতি মমত্ববোধ, ইত্যাদি জানতে এবং এক রোমাঞ্চকর জগতে হারাতে চাইলে উপন্যাসটা পড়তে পারেন। তবে উপন্যাসটা পড়ে শেষে মনে হবে অসমাপ্ত!
❝এটাকে বলে শব্দঋন। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে আর যেকোনো ঋন থাকতে পারে, কিন্তু শব্দঋন থাকতে পারে না। - মানে? - মানে তারা দুজন দুজনকে পৃথিবীর সকল কথা বলতে পারে। ভালোবেসে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম কথা। আবার ঝগড়া করে পৃথিবীর সবচেয়ে অসুন্দরতম কথা। এর কারণ কী জানো? এর কারণ জগতে এই দুইজন মানুষের মধ্যে কোন আড়াল থাকে না। আর সবার মধ্যে আড়াল থাকে।❞
কথাটা কত সহজ, তাই না? অথচ কী গভীর! আমি যখন কোন বই পড়া শুরু করি সাধারণত খুব একটা উচ্চ পর্যায়ের এক্সপেক্টেশন নিয়ে পড়িনা। সাদাত হোসাইন- এর 'নির্বাসন’ বইটাও ঠিক তেমনই স্বাভাবিকভাবে পড়া শুরু করেছিলাম। প্রথমে খুব সাদামাটা লাগছিল। ধীরে ধীরে যতই সামনে আগাতে লাগলাম ততই যেন প্রচুর বিষ্ময়ের সাথে হারিয়ে যেতে থাকলাম। বিষ্ময়ের অনেকটা জুড়েই ছিলেন লেখক নিজে৷ আমি ক্রমশই অবাক হচ্ছিলাম লেখকের নিগূঢ়তম মানবিক পর্যবেক্ষণ পড়ে। মানব-মানবীর অতি পরিচিত, কাঙ্ক্ষিত এবং প্রচলিত প্রেমের বাইরেও আমাদের চারপাশের নানা সম্পর্কের মধ্যকার প্রকৃত টান, গভীরতার কথাও লিখেছেন পরম যত্নে। যেসব উপেক্ষা করা আমাদের দ্বারা প্রায় অসম্ভব।
আমি গল্প সম্পর্কে তেমন কিছু বলবো না। আসলে হয়তো বলতে পারবো না। কারণ যখনই গল্পটা নিয়ে ভাবি তখনই আমার ভেতর কেমন যেন একটা ঘোরের মত কাজ করতে থাকে।
গল্পটা যে খুব বেশি আলাদা তা না। বরং এর অন্যতম আকর্ষন হচ্ছে - পড়তে পড়তে মনে হবে এ তো আমার বা আমাদের খুব কাছের বা আশেপাশের গল্প। খুব করে যেন চেনা চরিত্রগুলো। একটা বিষয় যেটা একটু অন্যরকম মনে হয়েছে সেটা হলো গল্পে খুব বেশি নাটকীয়তা রয়েছে। তবে লেখকের অসাধারণ লেখনীতে সে সব যেন ছাপিয়ে গেছে। জীবন তো আর নাটকের বাইরে না। আমাদের প্রত্যেকের জীবন-ই অসংখ্য নাটকীয়তায় পূর্ণ।
এই বইয়ে আমার কিছু ভালো লাগার কথাগুলো শেয়ার করছি। কিছু কবিতার লাইন যেখানে যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে সেখানটায় লাইনগুলো এতটাই জীবন্ত মনে হয়েছে আমি তাতে দারুনভাবে আপ্লুত হয়েছি। বি. দ্র. সবটাই আমার ব্যক্তিগত অভিমত। আপনারা চাইলে পড়তে পারেন। আশ করি অনেক ভালো লাগবে।
❝ঘৃণা লুকিয়ে রাখা যায়, ভালোবাসা লুকিয়ে রাখা যায় না।❞
❝একটা তোমার মত চাঁদের জন্য মেয়ে, আমি জোছনা সকল হেলায় ভুলে থাকি, একটা তোমার মত মনের জন্য মেয়ে, আমি হৃদয়টাকে যত্নে তুলে রাখি।❞
❝তোমাকে চেয়েছি অন্ধকারের মতন, একাকী ভীষণ, গভীর এবং গাঢ়, তোমাকে চেয়েছি প্রার্থনা ও প্রেমে, যতটা রয়েছো তারচেয়ে বেশি আরো।❞
❝পৃথিবীতে সবারই নিজের একটা মানুষ থাকে। নিজের একটা জায়গা থাকে। সবচেয়ে শক্ত, কঠিন যে মানুষটা তারও। সে চায় সেই জায়গাটাতে গিয়ে সে তার কঠিন আবরণটা খুলে সম্পূর্ন নিরাভরণ হয়ে যেতে। ভানহীন, শিশুর মতো।❞
❝ঝরা পালকের মতো, ঝরে যদি যাই? হলুদ পাতার মতো, মরে যদি যাই? যদি শূন্য এ রাতের মত হয়ে যাই চুপ? যদি তোমাকে না ডাকি আর? তুমি কি তখন এই আমার মতো, খুঁজে পাবে কাউকে আবার?❞
❝মনে রেখো, ছিলো কেউ কাছে, দূরের তারার মতো, আরো দূরে গিয়ে, এখনো সে আছে। মনে রেখো, ছিল কেউ পাশে কাছের মায়ার মতো, মেঘ হয়ে, দূরের আকাশে। মনে রেখো, দহনের দিনেও সে ছায়া হয়ে থাকে, ছুঁয়ে দিও তাকে। যে হয়েছিল ভোর, অথৈ আদর, নামহীন নদী, একা লাগে যদি, মনে রেখো তাকে।❞
❝সে এসে বসুক পাশে, যেভাবে অসুখ আসে, তারপরে হয়ে যাক, যন্ত্রনা অনায়াসে। তবুও আসুক সে, প্রিয়তম অসুখ সে।❞
"লুইস ম্যাকেন" এর একটি কথা আছে-" ভালোবাসা হচ্ছে এক ধরণের মায়া যেখানে পুরুষ এক নারীকে অন্য নারী থেকে আর, নারী এক পুরুষকে অন্য পুরুষ থেকে আলাদা করে দেখে"। সত্যি তাই - ভালবাসা আর মায়া এক হয়ে নারী পুরুষের মধ্যে যে শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরী করে তা ছিন্ন করতে তারা পারে না। এ মায়ার জালে আবদ্ধ হয়ে সব তারা নির্বাসনে যেতেও দ্বিধা করে না। লেখক সাদাত হোসাইন এর নির্বাসন এ রকমই একটা উপন্যাস যেখানে ভালবাসার মায়ায় আবদ্ধ হয়ে উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলো একে একে নির্বাসনে যায়। সংসারের মায়া, জীবনের প্রতি মায়া, সম্মানের মায়া, ভালোবাসার মানুষগুলোর জন্য মায়া।
নির্বাসন বৃহৎ উপন্যাস। বড় উপন্যাস পড়তে গেলে অনেকের বিরক্ত লাগে কিন্তু নির্বাসন পড়তে গেলে আপনি হুট করে এর প্রেমে পড়ে যাবেন। মানুষের জীবন যেমন বহতা নদীর মত, তাতে হাসি, কান্না, দুঃখ সব ভাসে, আবার মাঝে মাঝে টর্নেডোর মত সব সমীকরন বদলে দেওয়া ঘটনাও থাকে তেমনি এই উপন্যাস।
এত বড় উপন্যাস পড়তে ধৈর্য দরকার হয়। যদি তাতে মাল মশলা না থাকে তবে আপনি একটুতেই হাল ছেড়ে দেবেন। কাহিনী যদি একটু পরপর আপনাকে চমকে না দিতে পারে, যদি পাঠক মনে প্রশ্ন না জাগে এর পরের পাতায় কি চমক আছে, তবে সেই উপন্যাস বানিজ্যিক ভাবে ফ্লপ। এখন আসি উপন্যাসের মূল কাহিনীতে-
সুবর্নপুর বিলের নাম, সেই বিল ছাড়িয়ে জলের বুকে জঙ্গল। লস্করদের চর জঙ্গলের ওপারে। তোরাব আলী লস্কর হলো লস্করদলের সর্দার। সোনাপুর বাজারে ডাকাতি করতে গিয়ে গ্রামবাসীদের হাতে ধরা পড়ে আর ফেরত আসেনি তেরাব আলী লস্করের মেজো ছেলে ফয়জুল। দীর্ঘ সাত বছর তিনি তার মেজো ছেলের জন্য অপেক্ষা করে আছেন। তোরাব আলী লস্কর তার মেজো ছেলের মেয়ে জোহরাকে নিয়ে খুব ভাল সময় কাটান এবং জোহরাকে নিয়ে অন্য জীবনের স্বপ্ন দেখতে থাকে। তোরাব আলী লস্কর চান না জোহরা লস্কর চরে থেকে জীবন অতিবাহিত করুক। নাতনিকে তিনি বিল ছাড়িয়ে, চর ছাড়িয়ে বিয়ে দিতে চান অন্য কোনো সুন্দর জাযগায় সুন্দর কোনো ছেলের সাথে।
গল্পের অন্য অংশে তখন ঢাকায় মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া মনসুর নবীগঞ্জের আজহার খোন্দকারের বড়ছেলে। মনসুর গোবিন্দপুরের স্কুল মাস্টারের মেয়ে কণার সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। তারই ধারাবাহিকতায় দুই পরিবারের মধ্যে ঝগড়া এবং পরিশেষে মনসুর ও কনার প্রনয় সম্পন্ন হয়। আপনারা উপন্যাসটি পড়লেই জানতে পারবেন মনসুর আর কণার প্রেম অনেক ভালবাসাময় ছিল পুরো উপন্যাস জুড়ে। কনা ছাড়া মনসুরের পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কি ভীষন জঘন্য হবে এই কথা দিয়েই লেখক বুঝিয়ে দিয়েছেন তাদের ভালবাসার চমৎকারিত্ব। একটা মানুষের তার নিজের মানুষটিকে শুধুমাত্র পাশে পাবার অপেক্ষায় তার বুকে যে কি ভীষণ তৃষ্ণার উৎপত্তি ঘটে তা কণা-মনসুরের মধ্যে দেখা যায়।- ‘যে হয়েছিল ভোর, অথৈ আদর, নামহীন নদী, একা লাগে যদি, মনে রেখো তাকে।’
ঘটনার এগিয়ে যাওয়ার সূত্র ধরে পরবর্তীতে জোহরার লস্কর দলের সাথে সরাসরি কাজ করবার মধ্য দিয়ে খুন, জখমে লিপ্ত হওয়া, শেষ জীবনের পরিনতি কি হবে। এই লাইন কয়েকটির মতো তা শুধু জোহরাই জানে!-- ‘ও বন্ধু তোমার লগে আমি আমার মন বাইন্ধাছি শুধু আমি জাইনাছি, ‘তোমার ল্যাইগা আমি আমার মন বাইন্ধাছি।’
তার চাচাতো ভাই হানিফের সাথে জোহরার বিয়ে পাকাপাকি হওয়ার পরও ঠিক কেনো জোহরা গড়িমসি করছিল? পাঠক হতচকিত হবেন হঠাৎ হঠাৎ বিভিন্ন জায়গায় উপন্যাসটির মোড় এতো দ্রুত ঘুরে যাওয়া দেখে।
অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা ঘটে যায় আজহার খন্দকারের সর্তকতা বা ভুলের কারনে, জীবনে নেমে আসে দূর্বিষহ বিপত্তি। জোহরার প্রাধান্যে লস্কর চরের সর্দার তোরাব আলীর অস্তিত্ব কোনঠাসা হয়ে যেতে থাকে দিন দিন। লস্কর চরে নিজেদের মধ্যেও ঝামেলা শুরু হয়। কণা- মনসুরের জীবনে নেমে আসে অপ্রত্যাশিত ঝড় যার রেশ উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত রয়ে যায়৷ একদিকে কণার সাথে তার বাবা দেলোয়ার হোসেনের বিভিন্ন বিষয়ে মনোমালিন্য, মা শাহিনা বেগমের প্রতি বিরক্তি, কণাকে হারানোর চিন্তায় দিশেহারা শ্বশুর আজাহার খন্দকার। অপরদিকে ডাকাত দলের একের পর এক অভিযান৷ প্রায় সমান্তরালে চলমান ঘটনাপ্রবাহের আকস্মিকতায় যেনো চরিত্রগুলোর সাথে সাথে পাঠকও দিশেহারা হয়ে যাবে। এসব ঘটনা গল্পকে কোন দিকে নিয়ে যাবে তা পাঠক শুরুতে আন্দাজ ও করতে পারবেনা। আন্দাজ করতে হলে পড়তে হবে "নির্বাসন" উপন্যাস।
পাঠ পর্যালোচনাঃ লেখক হিসেবে সাদাত হোসাইনের যেমন অনেক সুনাম আছে তেমনি তাকে নিয়ে সমালোচনাও কম নেই। সাধারন পাঠক হিসেবে নির্বাসন হলো আমার পড়া লেখকের প্রথম বই। প্রথম বই পড়ে লেখক হিসেবে সাদাত হোসাইন কেমন তা বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। তবে তার বই পড়ে কিছু লিখতে পারছি এটাই অনেক।
উপন্যাসের পটভূমি যুদ্ধ পরবর্তী ১৯৮৮ সালের। এ উপন্যাস দুটি অংশ নিয়ে লিখিত। লেখক অত্যান্ত সুন্দরভাবে দুটি অংশের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করেছেন বুদ্ধিমানের সাথে এবং সুন্দরভাবে। নির্বাসন উপন্যাস আসলে একটুকরো জীবনের গল্প। এর শুরুটাও নেই শেষটাও নেই। মাঝখানের ঘটনাবলির একটা অংশ আমাদের সামনে দৃশ্যমান শুধু।
কোনো পাঠক যখন গল্পের ভিতর নিজেকে আবিষ্কার করেন, নিজেকে কল্পনা করেন কোনো একটি চরিত্রে তখনই পাঠক মজা পায়, আর এটা হলো যে কোনো ভাল গল্পের মূল চালিকা শক্তি। আমি সত্যি কথা বলতে এ উপন্যাস পড়ে নিজেকে কোনো চরিত্রের সাথে মেলাতে পারিনি তারপরও বিশাল উপন্যাস পড়তে আমার কস্ট হয় নি। কারন- প্রাঞ্জল ভাষায় এক টুকরো জীবনের গল্প অনেক দিন পরে হাতের মুঠোয় ছিল।
উপন্যাসের চরিত্র নিয়ে যদি কিছু বলতে হয় তাহলে আমি জোহরা চরিত্রকে প্রধান চরিত্র হিসেবে বাছাই করবো। আমার মতে এটা একটা নায়িকা নির্ভর উপন্যাস। যে উপন্যাসে জোহরা চরিত্রের আর্বিভাব আগে ঘটে এবং পুরো উপন্যাস জুড়ে তার বিস্তার ছিল চোখে পড়ার মত। অনেকে হয়তো কনা আর মনসুরকে উপন্যাসের নায়ক নায়িকা মনে করে থাকবে।
জোহরা এমন এক চরিত্র যে একই সাথে দুটি রহস্যময় রূপ ধারণ করে থাকে। শান্ত স্নিগ্ধ নদীর মতো সে হঠাৎ কখন যে উত্তাল সমুদ্রে পরিণত হয়ে যায় তা কেউ বুঝে উঠতে পারে না। ডাকাত দলের এক একটি অভিযানে পাঠক দেখবেন জোহরার প্রলয়ঙ্করী রূপ আর সেই সাথে মুখোমুখি হবেন অসংখ্য রোমাঞ্চকর অনুভূতির। সব থেকে বেশি সাহস দেখায় সে মনসুরের প্রেমে পড়ে এবং পরে তাকে মুক্ত করে দিয়ে। নিজ সীদ্ধান্তে অটল থাকার যে কঠিন চরিত্র সাদাত হোসাইন এঁকেছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
কনা এবং মনসুরের প্রেমের যে কথপোকথন তা অনেকটাই নাটুকে মনে হয়েছে আমার কাছে। ভালোবাসার মানুষের সাথে ঠিক এভাবে কথা বলে কিনা মানুষ তা নিয়ে আমার যথেষ্ঠ সন্দেহ রয়েছে। উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি চরিত্র এস আই মইনুল হোসেন, যিনি প্রায় প্রতিটি ঘটনায় কম বেশি জড়িত ছিলেন।
নির্বাসন’ পাঠক হৃদয়ে সৃষ্টি করবে এক অব্যক্ত বিষণ্ণতা। আমাদের জীবন যে সত্যিই কতটা অনিশ্চিত তা এই উপন্যাস পড়ে বারবার উপলব্ধি হতে থাকে। তবে উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠা পড়ে আমার মনে চরম অতৃপ্তির উৎপত্তি হয়েছে। সাদাত হোসাইন এমনভাবে উপন্যাসটি শেষ করেছেন যাতে অসমাপ্ত শেষ পাতায় পাঠকের কল্পনায় অনেক রকমের দ্বিধাদ্বন্দ্ব মিশ্রিত সমাপ্তি ঘটতে পারে। আপনারা তাহলে উপন্যাসটি শেষ করে সেই নানা রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব সমাপ্তি কি হতে পারে তা কল্পনা করেন??
বই থেকে তুলে আনা কিছু কথা- ১। "অজস্রবার ভালোবাসি বলার পরও ভালোবাসা হয় না। আবার একবার না বলেও পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম অনুভূতি নিয়ে ভালোবেসে ফেলা যায়"। ২। 'জীবন কি আশ্চর্যরকম অনিশ্চিত, অনির্দেশ্য। আর মানুষ সেখানে কী ভীষণ অসহায়! এখানে নাটকের লিখে রাখা পান্ডুলিপিও মঞ্চস্থ হওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে হুট করে বদলে যায়। হয়ে যায় অচেনা অন্য কোনো গল্প। সেই গল্পে মানিয়ে নিতে হয় কুশীলবদের। কিন্তু সেই মানিয়ে নেয়া বড় কষ্টের'। ৩। 'জগতে নিঃসঙ্গ মানুষের কান্নার মতো এমন গভীর আর কিছু নেই'! ৪। ‘মায়া এমন এক জিনিস যা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। হিতাহিত জ্ঞান বুদ্ধি লোপ পাইয়ে দেয়৷ মায়ার প্রভাব ভালোবাসার চেয়েও বেশি।’ ৫। ‘সংসার আসলে সঙসার। সঙ মানেতো পাগল! যেখানে পাগলের বসবাস, সেটাই সঙসার।’ ৬। ‘মায়া বড় ভয়ানক এক জাল। এই জালে একবার কেউ আটকে গেলে তার পুরোটা জীবন কেটে যায় সেই জাল ছিন্ন করতে করতে। কিন্তু দিন শেষে দেখা যায়, সেই জালে মানুষ আবার জড়িয়েই পড়েছে। আর কখনোই বের হতে পারে না সে। কিংবা বের হতে চাওয়ার ভান করলেও ভেতরে ভেতরে সে হয়তো আর বের হতে চায়ও না।’
সাদাত হোসেন এর পড়া প্রথম উপন্যাস। বইটা লেখা পড়ে তৃপ্তি পেয়েছি। প্রথম পড়া বই তাই হয়তো। অনেক লম্বা উপন্যাস, প্রায় ৩০০+ পেইজের। পড়া শেষ করেছি ১মাস আগে। এখানে নিজের জন্য বইটা নিয়ে কিছু কথা লিখে রাখছি।
গ্রাম আর ডাকাতদের জীবন নিয়ে ঘটনা। চরের ডাকাতদের সর্দার তোরাব আলি লস্কর ডাকাতির আগে চিরকুট দেয়। জানান দেয় যে ডাকাতি হবে যেন সবাই আগে প্রস্তুত থাকতে পারে। ঝামেলা কম হয়। যদি চিরকুট পাবার পরেও প্রস্তুতি না থাকে তাহলে খুন খারাবি হবার সম্ভাবনা থাকে।
গ্রামের বড় আড়ত ব্যবসায়ী আজহার খন্দকার। তার কাছে চিরকুট আসে তার আড়তে তোরাব আলি লস্কর ডাকাতি করবে। খন্দকার সাহেব চিরকুট পেয়ে প্রস্তুতি নিলেন, এবার লস্করদের ছাড় দেয়া যাবে না। ডাকাতি করতে এসে ডাকাত দলের ২জন ধরা পরলো, একজন মারা গেল।
এখান থেকে ঘটনা শুরু। লস্কর এর নাতনি জোহরার চরিত্র আমার কাছে সবচেয়ে দারুন লেগেছে। খুবই কমপ্লেক্স ক্যারেক্টার। কখন কি করবে বোঝা যায় না।
মনসুর আর কনার ভালবাসার গল্প এত সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে যা এখনো চোখে ভাসে।
তবে আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে আজহার খন্দকারের তার পরিবারের প্রতি ভালবাসার চিত্রায়ন। খুবই শক্ত মানুষ আজহার খন্দকার কিভাবে একটির পর একটি বিপদ থেকে আস্তে আস্তে বাচ্চাদের মত হয়ে যায়। একজন দৃঢ় কিন্তু অসহায় মানুষ তার মধ্যে প্রকাশ পায়। কনার প্রতি তার পিতৃরূপ ভালবাসার চরিত্রায়ন দাড়ুন লেগেছে।
বই এর আরেকটা সুন্দর দিক হচ্ছে গল্পে সাদাকালো করার কোন সুযোগ নেই। কেউ ভাল, কেউ খারাপ এটা বলা যাচ্ছে না। সব চরিত্রের পরিস্থিতি তুলে ধরে এমন একটি আবহাওয়া প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে সবাই বাস্তব জিবনের মানুষদের মতই কমপ্লিকেটেড। সহজ কোন সমাধান নাই।
রাগ, কষ্ট, হতাশা, ভাললাগা সব ধরণের আবেগ অনুভব করা যাবে বই তে। আমি খুব আনন্দ নিয়েই পড়েছি।
চরিত্র গুলো যাদের কথা মনে আছে আমারঃ তোরাব আলি লস্করঃ লস্কর চর ও ডাকাতদের সর্দার জোহরাঃ তোরাব আলি লস্করের নাতনি, বাবা মৃত, লস্করের খুব আদরের। খুবই বুদ্ধিমতি, এবং দুঃসাহসী। ঠান্ডা মাথার পাগলাটে মেয়ে। আজহার খন্দকারঃ নবীগঞ্জের আড়ত ব্যাবসায়ি ও প্রভাবশালী লোক। মনসুরঃ খন্দকার সাহেবের বড় ছেলে। মেডিক্যাল স্টুডেন্ট। মঞ্জুঃ খন্দকার সাহেবের ছোট ছেলে। ক্লাস টেন এ পড়ে। কনাঃ কিশোরি এক মেয়ে যার সাথে মনসুরের প্রণয় হয়। মনসুরের স্ত্রী সে। কনার বাবাঃ স্কুলের শিক্ষক।
পুলিশ ওসি ও এসআই ও অন্যান্য পুলিশ, স মিলের মালিক, কনার পরিবার, ডাকাতদের দল, অভিযান, জোহরার মেয়ে মায়া, মন্সুরের টুইস্ট, মন্সুর মারা যাওয়ার পর কনার কষ্ট!, জোহরার মন্সুরের প্রতি ভালবাসা, কনা আর জোহরার মধ্যে মনসুরের কনফ্লিক্টেড ফিলিংস, জোহরার বিভিন্ন প্ল্যান, লস্কর আর জোহরার মধ্যে দন্ধ, পুলিশদের বিভিন্ন অভিযান ইত্যাদি ইত্যাদি।
ঝরা পালকের মতো, ঝরে যদি যাই ? হলুদ পাতার মতো মরে যদি যাই ? যদি শূন্য এ রাতের মতো, হয়ে যাই চুপ? যদি তোমাকে না ডাকি আর ? তুমি কি তখন এই আমার মতো খুঁজে পাবে কাউকে আবার? (- সাদাত হোসাইন)
আমরা কথায় কথায় বলে থাকি , জীবনটা যদি গল্পের মতো হতো কতই না সুন্দর হতো ! কিন্তু হয়তো ভুলে যাই ,সব গল্প জোছনার রাতের মতন ঝলমলে হয়না ! কিছু কিছু গল্প থাকে যারা অমাবস্যার আঁধারের মতন গভীর বেদনাদায়ক হয়। নির্বাসন ঠিক তেমনি একটা গল্প। বেঁচে থেকেও মরে যাওয়ার গল্প , পেয়েও হারিয়ে ফেলার গল্প , বুকের ভরা শূন্যতা তৈরী করতে পারার মতন একটা গল্প।
মনসুর , কণা আর জোহরা , তিনটে মানুষের জীবনের তোলপাড় করা কিছু ঘটনার সাক্ষী এই বই । মনসুর মেডিক্যালের ছাত্র এবং বিত্তশালী ব্যবসায়ী আজহার খন্দকারের বড় ছেলে , কণা গোবিন্দপুরের শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের একমাত্র আদরের কন্যা , আর অন্যদিকে জোহরা লস্কর চরের নামকরা ডাকাত তোরাব আলী লস্করের আদরের বুদ্ধিমতী নাতনি। গোবিন্দপুরে বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে কণার প্রেমে পরে যায় মনসুর, সে যেন এক রূপকথার গল্প , সেই গল্প আশার কথা বলে , ভালোবাসার কথা বলে , বুকে আগলে রাখার কথা বলে , কিন্তু এমনই এক রূপকথার গল্পকে তোলপাড় করে দেয় জোহরা নামের ঢেউ। সেই ঢেউ এ কি ভেসে যাবে মনসুর আর কণার সংসার ? জোহরা কিভাবে জড়িয়ে পড়বে ওদের জীবনের সাথে ? জানতে হলে পড়তে হবে বইটা ।
এটা আমার পড়া সাদাত হোসাইন এর দ্বিতীয় বই । এই মানুষটা এমন করে কিভাবে লেখে ?বুকের ভেতর অনুভূতি দের যুদ্ধ চলে যেন , এই কাঁদতে কাঁদতে হাসছি আবার এই বুক ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রনায়। কণার কথা ভাবলেই মনে মেঘ ঘনিয়ে আসে , অন্ধকারের জোনাকির মতন টলটল করে ওঠে কণার চোখের জল। এই গল্প নিয়ে আমি বেশি কিছু বলবনা আবার ওনার লেখার মায়ায় জড়ালাম আমি । বুকের ভেতরে চিনচিনে ব্যাথাটা সেই রয়েই গেল শেষ অবধি ।
পরশুদিন পড়ে শেষ করেছি সাদাত হোসাইনের "নির্বাসন" বইটা । যারা বইটা এখনও পড়েন নি এবং যাদের পড়ার ইচ্ছে আছে দয়া করে নিচে আর নামবেন না । এখানেই পোস্ট টা পড়া বন্ধ করে দিন । কারন স্পয়েলার, কাহিনী আমি সব বলে দেব । আপনার আর পড়তে আগ্রহ জন্মাবে না । আর যারা পড়েছেন কিংবা পড়ে পড়ার ইচ্ছে নেই তারা পড়তে পারেন । তোরাব আলী লস্কর । বিখ্যাত ডাকাত । লস্কর চরের নেতা সে । তার নাতনী হল জোহরা । এই চরের আরেকজন উল্লেখযোগ্য আরেকজন ডাকাত হচ্ছে হানিফ। সে এই চরের সম্ভব্য নেতা । জোহরাকে যে খুবই পছন্দ করে । অন্য দিকে আজাহার খন্দকার নবীগঞ্জের পাটব্যবসায়ী । তার দুই ছেলে মনসুর আর মঞ্জুর । বড় ছেলে মনসুর মেডিক্যালে পড়ে । ছোট ছেলে ক্লাস টেনে পড়ে। বড় ছেলে মনসুরকে ডিএমসি থেকে গ্রামে নিয়ে হাজির হয় । দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ছেলেকে ঢাকা আসতে দিবেন না । গল্পের কাহিনী শুরু হয় তোরাব আলী লস্কর যখন আজাহার খন্দকারের কাছে চিঠি পাঠায় এই বলে যে আগামী বুধবার সে লোকজন নিয়ে তার আড়তে আসবে। সে যেন আড়তে পর্যাপ্ত পরিমান টাকা পয়সা রাখে । কিন্তু আজাহার খন্দকার সেটা না করে পুলিশে খবর দেয় । সে টাকা দিতে রাজি নয় । এক বুধবার ঠিকই ডাকাতেরা আসে এবং পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয় । দুইজন ডাকাত ধরা পড়ে এবং একজন মারা পরে ।
তোরাব আলী লস্কর কিছু না করে চুপ করে বসে থাকলেও জোহরা একটা ভয়াবহ সাহসের কাজ করে ফেলে । সে পুলিশের কাছ থেকে আটক দুইজন আসামীকে ঠিকই ছাড়িয়ে নিয়ে যায় । এভাবে জোহরা আরও কিছু সাহসীকতা কাজ করে ফেলে । তোরাব আলী হঠাৎ লক্ষ্য করে লস্কর চরের সব কিছু আর তার নিয়ন্ত্রনে নেই । লস্কর চরের সবাই তোরাব আলী থেকে জোহরার কথা বেশি শুনতে শুরু করে ।
এদিকে আরেক ঘটনা ঘটে । মনসুর দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে কনার প্রেমে পড়ে । সে বাসায় এসে বাবা আজাহার খন্দকারের কাছে কনাকে বিয়ের কথা বলে । প্রথমে একবার বিয়ের ভেঙ্গে গেলেও নাটকীয়তার মাঝে মনসুর আর কনার বিয়ে হয়ে যায় । চমৎকার ভালবাসাময় একটা জীবন শুরু করে তারা । কনা খন্দকার বাড়িতে এসে সবাইকে আপন করে নেয় । খন্দকার সাহেবও যেন নিজের ছেলের বউ নয়, কনাকে পেয়ে নিজের মেয়েকে পেয়েছেন এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয় । অন্য দিকে জোহরা আবারও লস্করের চর থেকে বাইরে বের হয়ে আসে । তার পালিত কন্যা মায়াকে ডাক্তার দেখাতে আসে । সেখানে সে প্রায় ধরা পড়তে যায় কিন্তু এক পুলিশ সদস্যকে চরম ভাবে আহত করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় । তারপর সে আবারও আসে নবীগঞ্জে । এবার একেবারে পুলিশ ওসি মইনুল হোসের সামনে গিয়ে হাজির হয় সে । তাকে জিম্মি করে চর থেকে ধরে আনা মাছ বিক্রি করানোর ব্যবস্থা করে । তারপর যাওয়ার সময় আজাহার খন্দকারের পাটের গুদামে আগুন লাগিয়ে দিয়ে যায় । এই ক্ষতি আজাহার খন্দকার সহজে সামলে উঠতে পারেন না । মনসুর বাজারে একটা ডিসপেনসারি দিয়ে বসে । কদিনের ভেতরেই তার নাম ডাক হয়ে ওঠে ! আস্তে আস্তে সব কিছু সামলে উঠতে শুরু করে । কনা তখন গর্ভবতী হয়ে পড়ে । কনা হাজির হয় তার বাবা বাড়ি কদিন থাকার জন্য । কথা হয় যে এক সপ্তাহ পরে মনসুর গিয়ে তাকে নিয়ে আসবে । কিন্তু সে আসে না । পনেরদিন পরে আজাহার খন্দকার কনাদের বাসায় গিয়ে হাজির হয় এবং রাগারাগি করতে থাকে এই বলে যে তাকে একা রেখে সবাই এখানে কিভাবে শান্তিতে আসে । কনা তখন বলার চেষ্টা করে যে মনসুর তখনও তাকে নিতে আসে নি । আজাহার খন্দকার তখন বলে যে মনসুর কনাদের আসার তিন দিন পরেই নাকি লঞ্চে উঠেছিল । মনসুরের পঁচাগলা লাশ পাওয়া যায় আরও তিন দিন পরে । চেহারা চেনার উপায় ছিল না কারন লাশ একেবারে পঁচে গিয়েছিলো । তাকে চেনা যায় তার পরনের কাপড় দিয়ে । মনসুর যেদিন লঞ্চে উঠেছিলো সেদিক সেই লঞ্চে ডাকাত পড়েছিলো । কয়েকজন মারা গিয়েছিলো । তার ভেতরে মনসুর ছিল । কনা বিধবা হয়ে গেল । কিন্তু কাহিনী এটা না । কিছুদুর যাওয়ার পরে জানা গেল যে মনসুর মরে নাই । লস্করেরা তাকে ধরে নিয়ে গেছে লস্করদের চরে । সেদিন লঞ্চে ডাকাত পড়লে মনসুর আহত একজনকে বাঁচায় । সেটা দেখে তোরাব আলী তাকে চরে নিয়ে যায় চরের লোকজনদের সেবা দেওয়ার জন্য । চরে এতে শুরু হয় নতুন ঝামেলা । জোহরা মনসুরের প্রেমে পড়ে । এটা দেখে হানিফের আবার সহ্য হয় না । সে একবার মনসুরকে খুন করার চেষ্��া করে কিন্তু সে বেঁচে যায় । ঐ দিকে কনাকে আবার তার বাবা মা বিয়ে দিয়ে উঠে পড়ে লাগে । তখন আজাহার খন্দকার মনসুরের ছোট ভাই মঞ্জুরের সাথে কনার বিয়ে ঠিক করে । পরিবেশ পরিস্থিতির চাপে বিয়ে হয়ে যায় তাদের । বিয়ে হয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পরে ওসি মইনুস হোসেন জানতে পারে যে মনসুর মরে নাই । জব্বার নামের একজন ডাকাত ধরা পড়ে তাদের হাতে । এদিকে চরে জোররা মনসুর আর তার মাঝ থেকে সরানোর জন্য হনিফকে উসকে দেয় জব্বারকে ছাড়িয়ে আনার জন্য । হানিফ যখন দলবল নিয়ে জব্বারকে ছাড়াতে যায় তখন পুলিশের হাত ধরা পড়ে । সেখান থেকে পরিস্কার ধারনা পায় যে মনসুর মরে নাই । এদিকে চরে আবারও তোরজোর শুরু হয় হানিফদের ছাড়িয়ে আনার জন্য । থানা হামলার জন্য বিরাট বড় দল নিয়ে তারা হাজির হয় নবীগঞ্জ । আসার পথে জোহরা মনসুরকে নিয়ে আসে সাথে করে । অবশ্য আসার কিছুদিন আগে মনসুর আর জোহরার মাঝে একটা বৃষ্টির রাতে কিছু ঘটনা ঘটে যায় । কি ঘটনা ঘটে সেটা আপনারা বুঝে নিন । মনসুরকে জোহরা তাদের ঘাটে নামিয়ে দেয় । তারপর তাকে বলে সে মনসুরকেও সাথে নিয়ে যাচ্ছে । এই হচ্ছে নির্বাসনের ঘটনা । তার লেখার হাত ভাল । তবে এক ভাবে একটানা সারা দিন পড়া যায় না । গল্পের কাহিনী আমার সাথে ভাল মনে হয়েছে তবে একেবারে সেরা কিংবা এ ওয়ান অর্থ্যাৎ যেভাবে মানুষজন প্রসংশা করে সেই রকম মনে হয় নি । তার উপর তার আগের কদিন উপন্যাসের সাথে কাহিনী বর্ণনা একটা মিল আছে । আরেকটা খারাপ দিক আমার কাছে মনে হয়েছে সেটা হচ্ছে আগের কটা উপন্যাসের মত কাহিনীতে সময় এগিয়ে গেছে আবারও কোথায় একেবারে থেমে । এইটা তার আগের সব কটা বইতেই দেখতে পেয়েছি । জানি না এটা হয়তো অনেকের কাছে কোন সমস্যা না কিন্তু আমার পড়তে গেলে কেমন যেন লাগে । মনে হয় উপন্যাসের বর্তমান কালের ঘটনা বর্ণনাতে সময়ের সামঞ্জস্যতা থাকা জরুরী । কিছু কিছু স্থানে কাহিনীর বর্ণনা অত্যন্ত বেশি । বিশেষ করে কনা আর মনসুর যখন কাল্পনিক ভাবে একে অপরের সাথে কথা বলে, সেগুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে এতো কথা বার্তা না লিখলেও হয়তো চলতো । এতো প্যাচালের দরকার কি !
তবে কিছু স্থানে কিছু কথা একেবারে মন ছুয়ে গেছে । কয়েকটা স্থানে কয়েক লাইন পড়ে আমি বই বন্ধ করে চুপ করে ভেবেছি কিছু সময় । মনে হয়েছে যেন ঠিক আমার মনের কথাটাই সে বলেছে । মনে হয়েছে আমিও তো ঠিক এই ব্যাপারটা এমন করে ভাবি । গল্পে মনসুরের কষ্ট কনার কষ্ট গুলো যেন আমি নিজে উপলব্ধি করতে পেরেছি । বই শেষ করার পরে মনে হয়েছে এমন ঘটনা কেন ঘটলো ওদের সাথে । এতোটা কষ্ট না পেলেও তো হত ।
তবে গল্প এমন স্থানে শেষ হয়েছে যে পাঠকের মনে আগ্রহ জাগতে বাধ্য যে এর পরে কি হল ? জোহরা যে থানা আক্রমন করতে যাচ্ছে সে বেঁচে ফিরবে তো ? এদিকে মনসুর যখন হাজির হবে নিজের বাসায় তখন কনার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে ? মনসুরের কেমন লাগবে যখন সে জানতে পারবে যে তার ছোট ভাইয়ের সাথে কনার বিয়ে হয়েছে ?
বইয়ের নাম নির্বাসন লেখকঃ সাদাত হোসাইন অন্যধারা থেকে প্রকাশিত
This entire review has been hidden because of spoilers.
গত বইমেলায় (২০১৯) কেনা বই পড়তে পড়তে প্রায় এই বইমেলা(২০২০) চলেই এল! তবে বইটার নাম নির্বাসন না হয়ে বোধকরি ঘোর হলে ভাল হত। লেখকের পড়া তৃতীয় উপন্যাস এটা আমার। আগের দুটোর মতই এটাতেও মনে হয়েছে বিনা কারণে টেনে লম্বা করা হচ্ছে কাহিনী। অথচ পড়া থামাতে ইচ্ছে করেনি একবারও, পুরোটা সময়ই যেন কেটে গিয়েছে ঘোরের মধ্য দিয়ে!
গোবিন্দপুর গ্রামের স্কুল শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের পরিবার আর তার কন্যা কণা, শতক্রোশ দূরে থাকা নবীগঞ্জ থানার মহাপ্রতাপশালী আজহার খন্দকার আর তার দুই ছেলে মনসুর, মঞ্জু কিংবা দুর্গম লস্করের চরে থাকা ডাকাতদলের সর্দার তোরাব আলী, জালালুদ্দিন, হানিফ, বাহাদুর, মায়া, জোহরাদেরকে লেখক এত চমৎকারভাবে এক সুতোয় গেঁথেছেন, ঘোরে না পরে আর উপায় কী?
৩৭৫ পৃষ্ঠার এই বইটা পড়া শুরু করেছিলাম চট্টগ্রামগামী মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনে বসে। এরপর তা চলেছে যেন সারা বাংলাদেশ জুড়ে! কখনো বন্দরনগরীর জামালখানে বাঁধানো চেয়ারগুলোতে ল্যাম্পপোস্টের আলোয়, কখনো বিকেল বেলা এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের সামনে ফুটপাথে বসে, আবার চটগ্রাম থেকে সিলেটগামী ইউনিক বাসের ভেতর, সিলেটে শাহজালাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে, সুরমায় পরিচিত কারো বাসায় বসে কিংবা ঢাকাতে নিজের বিছানায়, সাদাত হোসাইনের লেখায় আচ্ছন্ন হয়েছিলাম পুরোটা সময়।