Dhansere started on January 12, 2012 and has been producing quality books to connect authors and readers. Deliberately and resolutely independent, Dhansere maintains close relationships with the authors, designers and printers we work with to ensure that everyone involved in the production of one of our volumes gets a fair deal, as well as supporting local, independent business. We believe that a story can evoke a large range of emotions; they can make you cry, make you laugh and, most importantly, change a life. All of our books and authors are enormously special in their own way. We are completely dedicated to each of our authors, and work hands on with authors and media contacts in order to give every book the best start in life. Our publishing expertise has turned debut authors into bestsellers. That’s why we don’t offer one-size-fits-all publishing deals. Instead, we work closely with our authors on an individual basis to provide the support and publishing expertise you need. We do hope you enjoy perusing the witty, irreverent, radical and brilliant selection of books we have here.
একজীবনে কত জীবনের সম্ভবনা থাকে। আহা জীবন! বইটা পড়ার সময়ে ঘোরের মধ্যে ছিলাম। এমন দশা হয়ছে এই বইয়ের কথা মনে হলেও সেই ঘোর লাগা ফিরে আসে। অসাধারন লেখনী।
"জগতের সকল বস্তু, সমস্ত ব্যক্তিবর্গকে লইয়া এই আকাশের বুকে প্রাণ অনুপম কাহিনী রচিতেছে, কিন্তু সে নিজে কোন কাহিনীর ছকে বাঁধা পড়ে নাই।"
এই আকাশ যাকে খালি চোখে দেখা যায় এবং তার ব্যাপ্তির বাইরে থাকা আরো অজস্র আকাশ - যার মধ্যে মানুষ, প্রকৃতি, প্রাণীজগৎ, তার অসংখ্য সম্ভাবনা নিয়ে প্রতি মুহূর্তে যে নতুন নতুন দৃশ্যপট রচনা করছে - তারই সমষ্টি যুগ যুগ ধরে তৈরি করেছে এক ছায়াচরাচর। মানুষ যা হতে চেয়েছে, যা হতে পারেনি, আর যা হতে পেরেছে - এই ছায়াচরাচরে সেসবেরই অবস্থান। সকল মানুষের জীবনে এমন অনেক সন্ধিক্ষণ আসে, যেখান থেকে জীবন এক বিশেষ পথে ঘুরে যায়। যে পথকে আমরা নির্বাচন করি, কেবল সেই পথই আমাদের সামনে জীবন রূপে প্রস্ফুটিত হয়। কিন্তু যে পথ আমরা নির্বাচন করি না, তার কি হয়? সেই পথ কি বিলুপ্ত হয়ে যায়? নাকি সেই পথ আরও একটি নতুন জীবনের জন্ম দেয় অন্য কোন সমান্তরাল মহাবিশ্বে?
প্রৌঢ় পন্ডিত প্রমোদন পুরন্দর তার গ্রাম উনসিয়া থেকে চন্দ্রদ্বীপের রাজপ্রাসাদের রাজাকে বার্ষিক রাজকর দিতে যায়। সঙ্গে যায় তার পুত্র কমলনয়ন, যে "কমলনয়ন" - র পরিবর্তে "মধুসূদন" নামে বেশি সাবলীল। কমলনয়ন বা মধুসূদন, রাজা কন্দর্পনারায়ণকে তার লেখা কবিতা শোনাতে চান। কিন্তু রাজা তার কবিতা মনোযোগ সহকারে না শোনায় সে অত্যন্ত ব্যথিত হন। অভিমানে তিনি ঠিক করেন তিনি কবি হবেন না বরং তিনি ভক্ত হবেন। নবদ্বীপের শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর পদতলে আশ্রয় নেবেন। এবং আরো পরে তিনি হতে চাইলেন নৈয়ায়িক। তারও পরে অদ্বৈতবাদী সন্ন্যাসী। কিন্তু কিছুই হয়ে উঠতে পারলেন না। আর এই প্রত্যেকটি না হওয়া মুহূর্ত থেকে জন্ম নিল এক - একটি নতুন সম্ভাবনার বিশ্ব।
অদ্বৈতবাদী দার্শনিক মধুসূদন সরস্বতী, রাজকবি পদ্যাক্ষ, শ্রীচৈতন্যের ভক্ত রাজিবলোচন, বা বংশীবাদক উৎপলনয়ন - এক জীবনের ভিতর কত জীবন!
বইটি পড়তে পড়তে প্রায়ই মনে হয়েছে, এই "আমি" কি একেবারে সত্যি? চিরন্তন? এই "আমি" হয়তো কেবলমাত্র আমার অসংখ্য সম্ভাবনার একটি মাত্র? শুধু আমিই বা কেন...সবার ক্ষেত্রেই হয়তো তাই। হতেই তো পারে, অবশ্য না হলেই বা! সর্বব্যাপী ছায়াচরাচরের বুকে আমরা এক দৃশ্যপট বৈ তো কিছুই না।
যদিও বইটি সাধু ভাষায় লেখা, কিন্তু কি অপূর্ব ঝংকারময় লেখনী! যা হৃদয়ের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে সুমধুর সুরের পরশ বুলিয়ে যায়। যেন পূর্ণিমার রাতে সমুদ্রের তীরে বসে ঢেউয়ের ওঠানামা দেখা। সন্মাত্রানন্দের লেখা "নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা" পড়ে যেমন এক অসাধারণ ঘোরলাগা ভাব এসেছিল, "ছায়াচরাচর" - র ক্ষেত্রেও তাই।
এই বইতে দর্শন আছে, ইতিহাস আছে, যুক্তি আছে, যুক্তির দ্বন্দ্বও আছে। আছে একজন ভৈরবী, বেদান্ত দর্শন, সম্রাট আকবর, এনায়েত খাঁ আর তার হাভেলী। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে নদীর মতো বয়ে চলা অর্ন্তলীন সেই বাঁশির সুর ও এক সপ্রাণ বিগ্রহ কৃষ্ণকিশোর। যে কথা বলে কমলনয়নের সঙ্গে। আর তাদের কথোপকথনে হৃদয় আকুল হয়। এক অপূর্ব প্রেমের আলো যেন হৃদয়ে পদ্ম ফোটায়। সমগ্র সত্তা যেন সেই প্রেমের সুরে ভেসে যেতে চায়। যে সুরের সওয়ারী আমরা, সামগ্রিক মানবজীবনে খুঁজে চলি পূর্ণতা, কিন্তু পূর্ণতা কোথাও নেই, কেবল শূন্যতেই সে পরিপূর্ণ। শূন্যতাই প্রেম, শূন্যতাই প্রজ্ঞা, শূন্যতাই সত্যি। কিছু না হওয়াই যে সবচেয়ে বড় হওয়া - এই সত্যিই উন্মীলিত হয় পরিশেষে।
"কি আশ্চর্য মায়া দিয়ে গড়া তোমার এই সৃষ্টি, কিশোর!... এই আশ্চর্য বিষ্ময় - পরমা প্রজ্ঞা অপেক্ষাও যে মহত্তর।" "এতক্ষন তবে কি দেখিলে?" "দেখিলাম জীবনে আমি কি কি হইতে পারিতাম..." "কি বুঝিলে?" "বুঝিলাম, আমার কিছুই হওয়া হইল না।" "ভাগ্যিস তুমি কিছুই হও নাই। কিছু না - হওয়াই সবথেকে বড় হওয়া... কমল! ও কমল! কিছু হও নাই - ভালোই হইয়াছে। কিছু হও নাই বলিয়াই তোমাকে আমি আমার করিয়া পাইয়াছি"
মহারাজের এই উপন্যাস ষোড়শ শতাব্দীর প্রখ্যাত বাঙালি দার্শনিক মধুসূদন সরস্বতীর জীবনকে কেন্দ্র করে রচিত একটি ইতিহাস-নির্ভর সাহিত্যকর্ম। গল্পের মূল চরিত্র কমলনয়ন, যিনি পরবর্তীতে মধুসূদন সরস্বতী নামে পরিচিত হন, তার জীবনের বিভিন্ন সম্ভাবনা ও বিকল্প পথ নিয়ে এই উপন্যাসের কাহিনী গড়ে উঠেছে। লেখক সমান্তরাল মহাবিশ্বের ধারণা ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, কিভাবে এক জীবনে না হওয়া বা না পাওয়া বিষয়গুলি অন্য সমান্তরাল জগতে বাস্তবায়িত হতে পারে।
বিবিধ theme এবং leitmotif দিয়ে লেখাটিকে সাজিয়েছেন মহারাজ। পর্যালোচনা করা যাক একে একে:
১) সমান্তরাল মহাবিশ্ব ও জীবনের সম্ভাবনা: উপন্যাসের কেন্দ্রীয় থিম হলো সমান্তরাল মহাবিশ্বের ধারণা, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও সম্ভাবনা একেকটি নতুন জীবনের জন্ম দেয়। কমলনয়নের জীবনে বিভিন্ন মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি কিভাবে তার জীবনকে ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে পারত, তা লেখক দক্ষতার সাথে উপস্থাপন করেছেন।
২) দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা: মধুসূদন সরস্বতীর অদ্বৈতবাদী দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র চর্চা এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান উপন্যাসে গভীরভাবে আলোচিত হয়েছে। তার সন্ন্যাস গ্রহণ, বেদান্ত চর্চা এবং ধর্মীয় দ্বন্দ্বের মাধ্যমে লেখক মানবিক দর্শনের জটিলতা তুলে ধরেছেন।
৩) ইতিহাস ও সংস্কৃতি: ষোড়শ শতাব্দীর বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট উপন্যাসে জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে। চন্দ্রদ্বীপের রাজসভা, নবদ্বীপের টোল, কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটের বর্ণনা পাঠকদের সেই সময়ের পরিবেশে নিয়ে যায়।
মহারাজের ভাষা ও শৈলী এক কথায় অনন্য। তিনি সাধু ভাষার মাধ্যমে উপন্যাসটি রচনা করেছেন, যা সময়ের প্রেক্ষাপটের সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পাঠকদেরকে অতীতের আবহে নিয়ে যায়। তবে, এই ভাষার জটিলতা কিছু পাঠকের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। লেখার শৈলী ঝংকারময় ও সুরম্য, যা পাঠকদের মুগ্ধ করে এবং কাহিনীর গভীরতায় ডুবিয়ে রাখে।
সমালোচনার অবকাশ না থাকলেও শুধু একুকুই বলবো যে এই উপন্যাসের জটিল কাঠামো এবং সমান্তরাল জীবনের ধারণা কিছু পাঠকের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তাছাড়া, সাধু ভাষার ব্যবহারে কিছু পাঠক পাঠে ধীরগতি অনুভব করতে পারেন। তবে, এই চ্যালেঞ্জগুলি উপন্যাসের গভীরতা ও শৈল্পিক মানকে সমৃদ্ধ করেছে।
পরিশেষে বলবো যে 'ছায়াচরাচর' একটি গভীর ও চিন্তাশীল উপন্যাস, যা জীবনের সম্ভাবনা, দর্শন এবং ইতিহাসের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। সমান্তরাল মহাবিশ্বের ধারণা এবং মধুসূদন সরস্বতীর জীবনের বিভিন্ন দিক উপন্যাসটিকে অনন্যতা প্রদান করেছে। যারা গভীর ও অর্থবহ সাহিত্যকর্ম পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।
এমন কিছু বই থাকে যার পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখা মোটেও সহজ কাজ নয়। এই বইটিও ঠিক সেরকম। গত পাঁচদিন ধরে ধীরে ধীরে পড়ে শেষ করেছি এই বইটি। কারণ এই বই দ্রুত পড়ে শেষ করার মতো বই নয়। পড়তে পড়তে যে ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম, মনে হচ্ছে এখনও আমি সেই ঘোরের মধ্যেই আছি। এই বই পড়ে যা যা অনুভব করলাম তা পুরোপুরিভাবে ভাষায় প্রকাশ করা কখনই সম্ভব নয়। তাও কিছুটা লেখার চেষ্টা করলাম।
প্রৌঢ় পন্ডিত প্রমোদন পুরন্দরের গ্রাম উনসিয়া থেকে চন্দ্রদ্বীপের রাজপ্রাসাদ অনেক দূরে। নদীপথে যেতে পাঁচদিন সময় লাগে। কিন্তু রাজকর দিতে তাকে রাজার কাছে যেতেই হবে। তাই তিনি স্থির করেছিলেন এবার রাজার কাছে গিয়ে অন্য উপায় বলবেন। রাজা কন্দর্পনারায়ণ বিদ্যোৎসাহী মানুষ। তাই প্রমোদন পুরন্দর ভেবেছিলেন তার ছেলে কমলনয়ন অর্থাৎ মধুসূদন সরস্বতী, যিনি এই আখ্যানের নায়ক, তাকে দিয়ে যদি একটি কবিতা রাজাকে শোনানো যায় আর শুনে যদি রাজা মুগ্ধ হন, তাহলে তিনি রাজাকে বলবেন চন্দ্রদ্বীপে কর দিতে না এসে তিনি তার গ্রাম উনসিয়াতেই রাজার এক প্রতিনিধির কাছে কর দিয়ে দেবেন। রাজাকে নিজের রচিত কবিতা শোনানোর ইচ্ছেতে কমলনয়ন পিতার সাথে রাজদরবারে আসেন। কিন্তু রাজা তার কবিতা মনযোগ সহকারে না শোনায় তিনি ব্যাথিত হন, তার কবি হওয়ার সাধ মিটে যায়। তিনি তখন স্থির করেন তিনি আর কবি হবেন না, তিনি ভক্ত হবেন, গৃহত্যাগ করে নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পদতলে আশ্রয় নেবেন।
কমলনয়ন কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে রওনা দিলেন নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্ত হতে। উনসিয়া গ্রাম থেকে নবদ্বীপের যাত্রাপথ অনেক দীর্ঘ। কিন্তু হায় কপাল! এত দীর্ঘ যাত্রাপথ অতিক্রম করে নবদ্বীপে পৌঁছে কমলনয়ন জানতে পারেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নবদ্বীপ ত্যাগ করে সন্ন্যাস নিয়ে পুরীধামে চলে গেছেন। কমলনয়ন দিশেহারা হয়ে পড়েন। গঙ্গার ধারে বসে থাকাকালীন দেখতে পান মথুরানাথ তর্কবাগীশকে। এরপর তিনি মথুরানাথ তর্কবাগীশের সান্নিধ্যে বিদ্যার্থী হয়ে ন্যায়শাস্ত্র শিখে নৈয়ায়িক হয়ে ওঠেন। ন্যায়শাস্ত্র বা দ্বৈতবাদে পারদর্শী হয়ে তিনি পাড়ি দেন কাশীতে অদ্বৈতবাদ চর্চা করতে। তিনি স্থির করেন অদ্বৈতবাদ চর্চা করে তার দুর্বলতা খুঁজে দ্বৈতবাদের যুক্তি দিয়ে অদ্বৈতবাদকে খন্ডন করবেন। কাশীতে পৌঁছে রামতীর্থের কাছে তার অভিপ্রায় গোপন রেখে তিনি অদ্বৈতবাদ চর্চা শুরু করেন। কিন্তু অদ্বৈতবাদের চর্চা সমাপ্ত হওয়ার পর তার মনের পরিবর্তন ঘটে এবং তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন।
কমলনয়ন কবি হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারলেন না। কিন্তু সমান্তরাল বিশ্বে তার কবিতা শুনে রাজা মুগ্ধ হয়ে তাকে রাজসভায় বরণ করে নিলেন। তবে সেখানে তার নাম কমলনয়ন নয়, সেখানে তিনি পদ্মাক্ষ। কমলনয়নের সাথে তার এর আগে পর্যন্ত কোনো পার্থক্য ছিল না, কিন্তু এই সময় থেকেই দুজনের পথ পরিবর্তন হয়ে গেল। "কমলনয়নের মনে হইল, সে যেন দর্পণে নিজেকে দেখিতেছে। অবিকল তাহারই মতন আর-একজন মানুষ! অবিকল তাহারই প্রতিকৃতি! পার্থক্য যদি কিছু থাকে, তবে তাহা বেশবাসে এবং কেশপারিপাট্যে।" তাহার (কমলনয়নের) বিহ্বল অবস্থা দেখিয়া পদ্মাক্ষ প্রশ্ন করিল,"মহাশয়ের কি চন্দ্রদ্বীপে কখনও যাওয়া হইয়াছে?" কমলনয়ন সামান্য ইতস্তত করিয়া কহিল, "হাঁ। কৈলোরকালে একবার চন্দ্রদ্বীপ গিয়াছিলাম।" তাহার পর হাসিয়া যোগ করিল, "রাজাকে কবিতা শুনাইতে... " পদ্মাক্ষ উত্তেজিত হইয়া কহিল, "কী আশ্চর্য! আমিও তো ওই বয়সেই চন্দ্রদ্বীপের রাজা কন্দর্পনারায়ণকে কবিতা শুনাইতে গিয়াছিলাম!" কমলনয়ন বলিল, "রাজা কবিতা শুনিয়াছিলেন?" "হাঁ, শুনিয়াছিলেন। আমার কবিতা শুনিয়া রাজা অত্যন্ত প্রীত হইয়া আমাকে সভাকবিপদে বরণ করিয়া লইয়াছিলেন। সেই হইতে চন্দ্রদ্বীপেরই একপ্রান্তে বসবাস করিতেছি।" "কমলনয়ন ভাবিতে লাগিল।"
কমলনয়ন কবিতা লেখা ত্যাগ করে নবদ্বীপে এসেছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পদতলে আশ্রয় নিতে। কিন্তু নবদ্বীপে এসে তাঁর দর্শন তিনি পেলেন না। তবে অন্য আরেক সমান্তরাল বিশ্বে কমলনয়ন কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দর্শন পেয়েছিলেন এবং তাঁর সাথে তিনিও পুরীধামে গিয়েছিলেন। তবে সেখানে তিনি কমলনয়ন নয়, সেখানে তিনি রাজীবলোচন। "এই তবে রাজীবলোচন? ইহারই অনেক অনুসন্ধান কমলনয়ন আযৌবন করিয়া আসিয়াছে? কমলনয়নের ন্যায় উনসিয়া হইতে এ ব্যক্তি নবদ্বীপে আসিয়াছিল। কিন্তু কমলনয়ন যেখানে মহাপ্রভুর দর্শন পাই নাই, এ ব্যক্তি কিন্তু সেস্থলে মহাপ্রভুর দর্শন পাইয়াছিল। মহাপ্রভু ইহাকে লইয়া পুরীক্ষেত্রে গিয়াছিলেন। বড়ো অদ্ভুত তো! অবিকল তাহারই ন্যায় দেখিতে!"
এক জীবনের ভিতর কত জীবন। সকল মানুষের জীবনে এমন অনেক সন্ধিক্ষণ আসে যেখান থেকে জীবন এক বিশেষ পথে ঘুরে যায়। কিন্তু যদি ওই বিশেষ পথে না গিয়ে অন্য পথে যাওয়া হতো, তাহলে জীবন হয়তো অন্যরকম হতো। বিষয়টা সহজভাবে বলি একটু।
ধরুন, ছোটোবেলা থেকেই আপনার আঁকার হাতটা বেশ ভালো ছিল। সেই দেখে আপনার বাবা-মা আপনাকে আঁকার ক্লাসে ভর্তি করালেন। দিব্যি শিখছিলেন, কিন্তু কিছু পারিবারিক সমস্যার কারণে আপনার শিখন আর না এগিয়ে ওখানেই থেমে গেল। কিন্তু ভাবুন তো, যদি ওই পারিবারিক সমস্যা না আসতো আর আপনার শিখন থেমে না যেতো, তাহলে হয়তো আপনি একদিন কোনো বড়ো আর্টিস্ট হতেন।
আবার ধরুন, আপনার কাউকে পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আপনি তাকে আপনার মনের কথা বলতে কিছুতেই পারছেন না। এবার কয়েকদিন বাদে দেখলেন সেই মানুষটির অন্য আরেকজনের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু ভাবুন তো, আপনি যদি একটু সাহস করে আপনার মনের কথা বলতেন সেই মানুষটিকে, তাহলে আজ হয়তো সেই মানুষটির সঙ্গে আপনি সংসার বাঁধতেন।
আর একটা যদি বলি, ধরুন, আজ আপনার কোনো একটি জায়গায় চাকরির পরীক্ষা আছে। আপনি বাসের জন্য অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পর যখন বাস পেলেন ততক্ষণে আপনার পরীক্ষা সেন্টারে পৌঁছনোর সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। কিন্তু ভাবুন, বাসটি যদি আপনি আজ সঠিক সময়ে পেয়ে পরীক্ষা সেন্টারে পৌঁছতেন, কে বলতে পারে কাল হয়তো আপনি পরীক্ষায় পাশ করে চাকরিটি পেয়ে যেতেন।
আসলে কে বলতে পারে আপনি যেগুলো হতে পারেননি বা যেগুলো আপনি পাননি, সেগুলোই হয়তো আপনি হতে পেরেছেন বা সেগুলোই আপনি পেয়েছেন, তবে এই বিশ্বে নয়, সমান্তরাল বিশ্বে। জীবন তো নদীর মতো। নদী যেমন কিছুদূর যাওয়ার পরই অন্যদিকে বাঁক নেয়, মানুষের এই জীবনও তো তাই, যা এক সন্ধিক্ষণে এসে অন্যদিকে বাঁক নেয়। জন্ম হয় সেখান থেকে নানান সম্ভাবনা। এই বিশ্বে যা আপনি পাননি, সেগুলোই আপনি পেয়েছেন তবে সমান্তরাল বিশ্বে। অর্থাৎ একটি বিশ্বে যে চরিত্র অপূর্ণতায় কাতর, অন্য সমান্তরাল বিশ্বে সেই একই চরিত্র তার সফলতা অর্জনে তৃপ্ত।
কমলনয়ন কবি হতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেননি। তবে অন্য সমান্তরাল বিশ্বে সম্ভাবনাময় পদ্মাক্ষ কবি হতে পেরেছিলেন। আবার কমলনয়ন নবদ্বীপে এসে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পদতলে আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মহাপ্রভুর দর্শন পাননি। তবে অন্য আরেক সমান্তরাল বিশ্বে রাজীবলোচন মহাপ্রভুর দর্শন পেয়ে তাঁর সাথে পুরীধামে গিয়েছিলেন। এ সবই সম্ভাবনা। আমরা এই সম্ভাবনাগুলো দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু অন্য সমান্তরাল বিশ্বে সেগুলো ঘটে চলেছে।
এই উপন্যাস কোনো সাধারণ উপন্যাস নয়। এই উপন্যাসকে নিয়ে বলার আরও অনেক কিছুই আছে। তবে সেসব ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।লেখক সন্মাত্রানন্দ-এর নাম এতদিন শুধু শুনেছি, এই প্রথম তার লেখা পড়লাম। মুগ্ধ হয়েছি বললেও মনে হয় কম বলা হবে। এই ধরনের লেখা বারবার রচিত হয় না। সাধুভাষায় রচিত এই উপন্যাস এক অসামান্য সৃষ্টি।
পাঠকদের বলবো একটু সময় নিয়ে এই উপন্যাসটি পড়ে ফেলুন। অসম্ভব ভালোলাগা ছড়িয়ে যাবে অন্তরে।
❝কমলনয়ন রহস্যময় ভবিষ্যতের দিকে হাঁটিয়া চলিয়াছে, আর তাহার মাথার উপর এই সকল কিছুর ভিতর পরিব্যাপ্ত অথচ কোথাও ধরা না-পড���া আকাশ পলকহীন দৃষ্টি মেলিয়া চাহিয়া আছে। নিম্নে এই অধরা আকাশকে ধরিবার, অনায়াত শূন্যকে একটিবারের জন্য স্পর্শ করিবার আকাঙ্খায় এই ছায়াচরাচর ঋতম্ভরা হইয়াও নিতান্ত অসহায়ার ন্যায় অধীর হইয়া পড়িয়া আছে....❞
কখনো কখনো আমাদের মনে চিন্তা আসে, জীবনের স্রোত যদি অন্য দিকে বইত, তাহলে কেমন হতো? হয়ত সমান্তরালভাবে চলছে অনেকগুলো জীবন? কেমন হতো যদি হঠাৎ দেখা হত আমাদের অন্য সত্ত্বার সাথে? -এসব নিয়েই ছায়াচরাচর। অন্যধাচের একটা বই। চমৎকার!
ছায়াচরাচর উপন্যাস যে সময়ের পটভূমিতে লেখা তা হল ১৬ শ শতক। নীল রং কভার বলে দিয়েছে এই বই আসলে মধুসূদন সরস্বতীর জীবনের বিবিধ উপাখ্যান নিয়ে রচিত।এই উপন্যাসের ব্যক্তিচরিতের তুলনায় যেন সময়ই নায়ক হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সময় আর বিবিধ পরিস্থিতিতে কি কি ঘটতে পারে বা পেরেছে সেইসব সম্ভাবনার কথা বলে উপন্যাস। উনসিয়া গ্রামের বালক থেকে কীভাবে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বেদান্ত বিদ দার্শনিক হয়ে উঠলেন মধুসূদন সরস্বতী বা কাহিনীর কমলনয়ন তাই উপন্যাসের প্রাণ। তবে তা নিতান্তই শুষ্ক ঘটনাবহুল নয়। যথার্থ কথাসাহিত্যিকের ন্যায় লেখক কাহিনীর মধ্যে রেখে দিয়েছেন নিজস্ব যুক্তি ও তাঁর দর্শন। তিনি আমাদের ভাবনার অবকাশ দিয়েছেন, প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছেন। এই সময়ে আমার অবস্থান বা যা কিছু আমি তাই যে চিরন্তন সত্য নয়, এই আমি যে মহাবিশ্বের বিবিধ সম্ভাবনার মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি সম্ভাবনা মাত্র এই বোধ প্রধান হয়ে ওঠে বইটি শেষ করার পর। ঠিক যেরকম কমলনয়ন, পদ্মাক্ষ, রাজীবলোচন একে অপরের সম্ভাবনা যা আমরা বিশ্বাস করি না সচরাচর। কথাসাহিত্যিক সন্মাত্রানন্দ আমাদের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে বলে গেছেন জীবনদর্শন। ছায়াচরাচর সময়ের দলিল কতখানি জানিনা তবে এটা ঠিক ও ভীষণ ভাবে সত্যি বর্তমানে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে যতখানি অস্বস্তি তৈরি করে ঠিক ততটাই আমাকে না হতে পারা সম্ভাবনা নিয়ে ভাবায়। সেইসব অভাববোধ হয়তো আমাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এইখানেই উপন্যাসের সার্থকতা। :)
জীবন অতীব ছোট। আমাদের জন্ম হয়, দেখতে না দেখতে আমরা বড় হয়ে ওঠতে থাকি আর তারপর একদিন টুপ করে সব শেষ হয়ে যায়। তবুও, এসবের মাঝেই কত সম্ভাবনা থাকে।
আমি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে না পেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি। আমার জীবনের লয় চলছে এক পথে। অন্য কোনো কিছুও আমি হতে পারতাম। হয়তো ডাক্তারি পড়তাম, বিদেশ চলে যেতাম কিংবা পুনরায় ভর্তি পরীক্ষায় বসার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকতাম। এই সবই সম্ভাবনা।
আড়াইশো পৃষ্ঠার এই উপন্যাসে সন্মাত্রানন্দ দেখাচ্ছেন যে, যা ঘটেনি কিন্তু ঘটতে পারতো, সেগুলোও কোথাও না কোথাও ঘটে চলেছে। একেবারে প্যারালাল ইউনিভার্সের মতো আরকি।
বাল্যে নিজের কবিত্বশক্তির দ্বারা রাজাকে মুগ্ধ করতে না পেরে কমলনয়ন জ্ঞানের অন্বেষণে বের হন। অদ্বৈতবাদকে খণ্ডন করতে গিয়ে তিনি নিজেই অদ্বৈতবাদী দার্শনিক হয়ে ওঠেন। রচনা করতেন থাকেন বহু গ্রন্থ, টীকা, ভাষ্য। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের কাছাকাছি কালের এই কমলনয়ন, ভারতীয় দর্শনের জগতে পরিচিত মধূসুদন সরস্বতী নামে।
এই উপন্যাস যদিও নির্দিষ্ট এক ব্যক্তি ও তার জীবনের সম্ভাবনাগুলো নিয়েই রচিত, কিন্তু, লেখকের রচনার গুণে এটি কেবলমাত্র একটি জীবনোপন্যাস হয়ে থাকেনি। হয়ে ওঠেছে স্বয়ং জীবন।
জীবনের ভিতর জীবন তার ভিতরে আবার অন্য জীবন। এক জীবনে না হতে পারা বা না পাওয়া বিষয়গুলি হয়তো অন্য কোনও সমান্তরাল বিশ্বে একই সময়ে অন্য কেউ ভোগ করছে। সে হয়তো আমি। কে জানে? আমাদের জীবনে এমন কিছু সন্ধিলগ্ন আসে যখন "জীবন নদী" তার বাঁক পরিবর্তন করে। সেই মুহূর্তে জীবনের স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে। লেখক সন্মাত্রানন্দ তাঁর এই উপন্যাসে বহু দার্শনিক গ্রন্থের প্রণেতা বিদ্যাবারিধি বাঙালি পণ্ডিত মধুসূদন সরস্বতী-র জীবন প্রবাহ আলোচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর জীবনের বিভিন্ন সম্ভাবনা-কে রূপায়িত করেছেন। যা শুধু মধুসূদন এর জীবন-কথাই নয় বরং প্রতিটি মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া এবং সম্ভাব্য জীবনের গবেষনালব্ধ জীবনমুখী কথা।
ছায়াচরাচর লেখকের শুধুমাত্র একটি উপন্যাস-ই নয়, আদতে এটি একটি জীবন নিয়ে গবেষণা। কমলনয়ন (মধুসূদন সরস্বতী) চরিত্র এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে লেখক এই চরিত্রের ব্যর্থতার জায়গাগুলো আঁকড়ে ধরে আরও তিনটি চরিত্র'কে(পদ্মাক্ষ, রাজীবলোচন, উৎপলদৃষ্টি) এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এই চরিত্রগুলো মূলত কমলনয়নের জীবনের বিভিন্ন সন্ধিলগ্ন যেখান থেকে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কমলনয়ন তথা মধুসূদন-কে "মধুসূদন সরস্বতী" হতে সাহায্য করেছে।
কিশোর কমলনয়ন রাজসভায় রাজার নিকট কবিতা পাঠ করে রাজাকে মুগ্ধ করতে পারেনি। অথচ সেদিন যদি রাজা কমলনয়নের কবিতায় মুগ্ধ হতেন? যদি তিনি কমলনয়ন-কে রাজসভায় কবি হিসেবে নিয়োগ করতেন? তাহলে কী হতো! কাল্পনিক চরিত্র পদ্মাক্ষ দেখিয়েছে সেই জীবন। সেই জীবনে পদ্মাক্ষ উন্মুক্ত আকাশের নীচে শুধুমাত্র প্রকৃতি নিয়েই কবিতা লিখে থেমে যাননি। বরং নারী হৃদয় জয় করে নারীর সুখ দুঃখের কথা লিখে কিভাবে পাঠকের বিশুদ্ধ হৃদয় জয় করা যায় তার পথ দেখিয়েছেন।
কবি জীবনের ব্যর্থতা নিয়ে ভক্ত হওয়ার বাসনায় কিশোর কমলনয়ন শ্রীগৌরাঙ্গের সাক্ষাৎপ্রাপ্তির লগ্নে তার সাক্ষাৎ না পাওয়ার যে বেদনা তা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। অথচ সে যদি তার সাক্ষাৎ পেত? তাহলে কী হতো? কাল্পনিক রাজীবলোচন সেই চরিত্রটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আবার কাশীধামে নদীবক্ষে বয়ে চলা সুরসাধক এনায়েত খাঁ-র নৌকায় যদি কমলনয়নের ঠাই হতো, তাহলে কী হতো? কাল্পনিক চরিত্র উৎপলদৃষ্টির মাধ্যমে কমলনয়নের সেই সুর-সাধনা লেখক পূর্ণ করেছেন। লেখক দেখিয়েছেন বাঁশির সুরের সঙ্গে কিভাবে জগৎ-হৃদয়ের প্রেম হয়, সুর-সাধনা করে কীভাবে সরস্বতী-র দর্শন পাওয়া যায়।
উপন্যাসের কমলনয়ন চরিত্র অর্থাৎ মধুসূদন সরস্বতী'র কৈশোরে গৃহত্যাগ থেকে শুরু করে নবদ্বীপ যাত্রা, নবদ্বীপ এর একটি টোলে ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন এবং তৎপরবর্তীকালে কাশীধামে অদ্বৈতবাদ গ্রহণ এবং তার প্রচার, প্রসার অবশেষে উনসিয়া গ্রামে নিজ জন্মভূমে চলে আসা পর্যন্ত লেখক উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র' কে আশ্রয় করে মনুষ্য জীবনের অসংখ্য গূঢ় রহস্য উন্মোচন করেছেন এবং ছোট ছোট গল্প বলে গেছেন। তন্মধ্যে মিথিলাফেরত পণ্ডিত রঘুনাথ মহাশয় এর ঘটনাটি অসাধারণ।
কাশীধামে বিধর্মীদের আক্রমণ প্রসঙ্গে রাজা প্রতাপদিত্য'র সাহায্য ফিরিয়ে সম্রাট আকবর এর সাহায্য প্রার্থনা মধুসূদন সরস্বতী'র বিচক্ষণতার প্রমাণ পাওয়া যায়। যদিও নাগা সন্ন্যাসীদের নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের জন্য মধুসূদন অনুতপ্ত ছিলেন। তিনি এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন। শব্দচয়ন এবং ঘটনাপ্রবাহের সৌন্দর্য বজায় রেখে লেখক এই বিষয়গুলো অতি সূক্ষ্মভাবে পাঠকমনে মানবিকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বিস্তার ঘটিয়েছেন।
শূদ্র হওয়ার দরুন ব্রাহ্মণ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি'তে টোডরমল চরিত্রের প্রতি যে অবিচার তার একটু বিস্তারিত সমালোচনা লেখকের কাছে প্রত্যাশা করেছিলাম। লেখক এখানে একটু তাড়াহুড়ো করেছেন।
এই বইটি সময় নিয়ে পড়তে হবে। কারণ, এর প্রতিটি অধ্যায়ের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে গভীর দর্শন। বারবার থেমে যেতে হবে। পাঠককে ভাবাবে।
লেখক সন্মাত্রানন্দের এই অমূল্য গ্রন্থখানির যে লাইনগুলো মনে গেঁথে গেছে - -
১। অপরিসীম দারিদ্র্য, প্রতিবন্ধকতা ও দুর্ভাগ্যের সহিত সংগ্রাম না-করিলে কাহারও চরিত্র গঠিত হয় না।
২।----কথাটা কে বলিতেছেন, ইহা সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ নহে। কী বলিতেছেন, তাহাও সময়ে সময়ে গুরুত্বপূর্ণ।
৩।----নাস্তিক বা আস্তিক নহি। কারণ, আমি নাস্তিক বা আস্তিক হইলাম, তাহাতে সত্যের কিছু যায় আসে না। সত্য যা, সত্য তাহাই।
৪।----সমাজটা মনেরই প্রতিফলন, কমলনয়ন! বাহিরে যুদ্ধ বাঁধিবার পূর্বে ব্যক্তির অন্তরেই রণক্ষেত্র রচিত হয়। অন্তরে সন্ধি স্থাপিত হইলে, বাইরে যুদ্ধ-অবসানের বিলম্ব হয় না।
ছায়াচরাচর:একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া **************************** (ছায়াচিত্র :এক) স্থান: দশাশ্বমেধ ঘাট।কাশী(বারাণসী) কাল:অপরাহ্ন। নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যায় না।আনুমানিক ১৫৬০ এর পরবর্তী কোন বৎসর। পাত্র:বঙ্গদেশ থেকে আসা তরুণ ব্রাহ্মণ এবং ঘাটে উপস্থিত নরনারী। অপরাহ্ণের অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা মিশে যাচ্ছে গঙ্গায়। উপস্থিত নর-নারীরা কেউ স্নানরত,কেউ জোড়া হাত ঠেকাচ্ছেন গঙ্গার উদ্দেশ্যে বা নিকটস্থ বিশ্বনাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে।একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে।বেজে উঠবে শঙ্খ - কাঁসর-ঘণ্টা।শুরু হবে সন্ধ্যারতি।ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে যাচ্ছে বাসার উদ্দেশ্যে।আলোক স্তম্ভের নীচে বসে এইসব দৃশ্যই দেখছিল ব্রাহ্মণ যুবক।হঠাৎ দশ-বারোজন ঘোড়সওয়ার দুর্বোধ্য ভাষায় গর্জন করতে করতে এসে উপস্থিত।মুহূর্তে যেন ঝড় বয়ে গেল। তরবারির আঘাতে মুন্ডচ্ছেদ হল অসংখ্য পুণ্যার্থীর,বল্লম এর আঘাতে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেল উদর; তরবারির আঘাতে রক্ত আর ঘিলু ছিটকে পড়ল ঘাটের চাতালে। প্রাণরক্ষার জন্য আলোক স্তম্ভের নীচে আশ্রয় নিল সেই যুবক। শেষ রক্ষা হবে কি? -------------------------------------------------------------আক্রমণ যেমন হঠাৎ এসেছিল তেমনই হঠাৎ থেমে ও গেল।শুধু হতভাগ্য নরনারীগুলির রক্তাক্ত দেহ ছড়িয়ে আছে এদিকে ওদিকে। সেই ব্রাহ্মণ যুবক বেঁচে গেছে নেহাতই বরাতজোড়ে। অশ্রুবিন্দু তে স্নান করছে মুখমণ্ডল। হিংসা আর হত্যা তাকে বিমূঢ় করে দিয়েছে।এত বিদ্বেষ কেন, হে শংকর?ততক্ষণে সূর্য ডুবে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। দশাশ্বমেধ ঘাট এর গঙ্গার জল শোণিতে রক্তিম।
এক কিশোর কবির যাত্রা থেকে শুরু হয়ে ছড়িয়ে পড়ে যে কাহিনি—তা কেবল ইতিহাস নয়, দর্শন নয়, কল্পনাও নয়—তা এক অপার ‘না-হওয়ার’ ভাষ্য।
ষোড়শ শতকের বাংলা, ভক্তি ও তর্ক, পাঠানের পতন ও মুঘল উত্থান—এই পটভূমিতে লেখক সৃষ্টি করেছেন এক বহুমাত্রিক চরাচর, যেখানে কমলনয়ন, পদ্মাক্ষ, রাজীবলোচন, উৎপলদৃষ্টি—প্রত্যেকে একেকটি বিকল্প আত্মপরিচয়। মধুসূদন সরস্বতীর জীবনের প্রতিটি সম্ভাব্য বাঁক এখানে একটি স্বতন্ত্র জীবন হয়ে উপস্থিত, যেন কালের ছায়ায় গড়ে ওঠা এক ছায়াময় সংসার।
এই উপন্যাসে গল্প আছে, কিন্তু তার গভীরে রয়েছে জিজ্ঞাসা। ভাষা আছে, কিন্তু তা যেন প্রার্থনার মতো মৃদু, ধ্যানের মতো গভীর।
‘ছায়াচরাচর’ পড়া মানে আত্মজিজ্ঞাসার এক নিঃশব্দ ভ্রমণ—যেখানে পাঠক নিজের ‘না-হওয়া’ সত্তার মুখোমুখি হয়।
এমন সাহিত্য চর্চিত হওয়া উচিত, পাঠ হওয়া উচিত, স্মরণে রাখা উচিত।
শূন্যবাদ নিয়ে এমন একটা উপন্যাস লেখা যায় তা অবিশ্বাস্য । খটমট ভাষা, লালিত্য বিহীন কিন্তু দৃঢ় উজ্জ্বল এক ব্যাক্তিত্ব মধূসূদন সরস্বতী। আমাদের মধ্যে অনেক আমি আছে . আর সেই সব আমিদের অনেক কল্পিত জগত ও আছে । এবং সেই কল্পিত জগতে Comfort zone কোথাও আমরা কমাতে রাজি নই । সময়েও নিরিখে কমলনয়ন বা পদ্মাক্ষ বা রাজীব লোচন হয়ে যে যার জগতে প্রতিনিয়ত কিছু খুঁজে চলেছে । কিছুতেই কিছু পূর্ণ থাকেনা। অবশেষে শুন্যতেই সব পূর্ণ । লেখক যে ভাষাশৈলী ব্যবহার করেছেন তা দেশ কাল পাত্রে সাথে মানিয়ে গেলেও শেষে একটা শব্দার্থ লিখে দিলে খুব ভালো হতো ।
বিজ্ঞানের তত্ত্ব অনেক আউড়েছি সারা জীবন, হলিউডি vfx এর চমকে কোনো সুদূর বিশ্বে কিংবা কোনো সমান্তরাল জগতে অনেক বিচরণ করেছি। কিন্তু তার সবটাই মেকি বা কখনও কখনও একটা সময় পরে অবাস্তব ঠেকেছে নিজের কাছেই। নিজের বিজ্ঞান চেতনা আবার আমাকে বুঝিয়েছে, না এটা বাস্তবে সম্ভব।
কিন্তু লেখকের এই বই পড়ে আমার একবারের জন্য সেই বিজ্ঞান কে প্রশ্ন করার ইচ্ছা জাগেনি, একবারের জন্যও অবিশ্বাস আসেনি। বরং ধ্রুপদী রাগের মতোই সূক্ষ্ম অথচ তীব্র এক প্রবাহী তরঙ্গে ভেসে যাওয়া কেবল।
আমি biased নই হয়তো। বস্তুত সন্মাত্রানন্দের লেখা প্রথম পড়লাম, অথচ অনেকটাই ছুঁয়ে আছে। আজ এক সপ্তাহ পরেও ঘোর কাটে না।
এই একটা বই যার পাঠপ্রতিক্রিয়া না লিখলে বড়সড় একটা অপরাধ হয়ে যাবে। খটোমটো সাধুভাষায় সুললিত এক কাহিনী। জীবন যে কত সম্ভাবনাময়, তারই প্রতিচ্ছবি। হয়ত আমাদের এই জীবনের চারপাশে সমান্তরালে বয়ে চলেছে আরো কত সম্ভাবনা। কেমন হতো, যদি সেই সম্ভাবনাগুলি বাস্তবে রূপ পেত? কমলনয়ন কি আবেগশূন্য সন্ন্যাসী মধূসূদন সরস্বতী না হয়ে কি হতেন গৃহী কবি পদ্মাক্ষ? নাকি নিমাইয়ের পদপ্রান্তে আশ্রয় পাওয়া রাজীবলোচন? নাকি সুরের আবেশ উন্মাদ হয়ে যাওয়া অন্য কেউ? এমনই অনেক সম্ভাবনার সমান্তরালে গড়ে ওঠে ছায়াচরাচর। ঘোরের মাঝে ছিলাম পুরোটা সময়। কি ঝংকারময় সেই লেখনী। হৃদয়ের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে সুরের পরশ বুলিয়ে যায়। যেন সুমধুর কোন গান শোনার পরেও তার রেশ রয়ে যায়, তেমনই এক ভাবের জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। শেষে একটাই কথা মনে হয়- আহা জীবন! আহারে জীবন!
এই বইয়ের রিভিউ লেখার ক্ষমতা আমার নেই। তবে, সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্য পড়ে ধারণা হয়েছিল বাঙালি বোধ হয় সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে কলা এবং নান্দনিকতা ভুলে গেছে। বইটি পড়ে সেই ধারণা ভাঙলো।
ছায়াচরাচর – সময়ের ছায়ায় জীবনের নৃত্য সন্মাত্রানন্দ রচিত ছায়াচরাচর যেন এক আশ্চর্য ছায়াচিত্র – ১৬শ শতাব্দীর বাংলার ধুলোমাখা পথে, ক��লের আলো-আঁধারিতে নৃত্যরত এক অসংখ্য সম্ভাবনার জগৎ!
এই উপন্যাস পাঠকের মনে এক অদৃশ্য দৃশ্যকাব্য জাগিয়ে তোলে, যেখানে জীবনের 'কী হতে পারতো' র প্রশ্নগুলো কাব্যের ছন্দে মিলেমিশে যায়। লেখকের পূর্ববর্তী উপন্যাস নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা-এর মতোই, এখানেও ঐতিহাসিকতা দার্শনিকতার সঙ্গে মিলিত হয়ে এক পরাবাস্তব রোমান্টিসিজমের জন্ম দেয়, যা পাঠককে নিজের অসম্পূর্ণতার আয়নায় চেয়ে দেখায়। এই উপন্যাস মধুসূদন সরস্বতীর জীবনকে কেন্দ্র করে, কিন্তু জীবনী নয়। এ যেন এক কাল্পনিক মঞ্জরী, যেখানে ইতিহাসের ছায়া দর্শনের আলোয় প্রতিফলিত হয় । লেখকের কথায়, এটি "আমাদের অসম্পূর্ণতার অস্ফুট আর্তনাদ" – একটি যাত্রা, যা পাঠককে নিজের জীবনের সমান্তরাল পথগুলোর দিকে টেনে নিয়ে যায়।
কল্পনা করুন, এক কিশোরের স্বপ্ন – কবি হওয়ার, ভক্ত হওয়ার, সাধক হওয়ার – যা এক জীবনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অসংখ্য সমান্তরাল জগতে ছড়িয়ে পড়ে। ছায়াচরাচর ১৬শ শতাব্দীর বাংলা, নবদ্বীপ, কাশী, চন্দ্রদ্বীপের পটভূমিতে গড়ে ওঠে, যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র কমলনয়ন (মধুসূদন সরস্বতীর শৈশবরূপ) তার অসম্পূর্ণ যাত্রায় পা বাড়ায়। কিন্তু এখানে শুধু একটি জীবন নয় – সমান্তরাল অধ্যায়ে তার ছায়ামূর্তিরাও জন্ম নেয়: একজন কবি হয়ে ওঠে, অন্যজন শ্রীচৈতন্যের ভক্ত, আরেকজন সুরের সাধনায় মিলিয়ে যায়। এই যাত্রায় আকবরের দরবার, তুলসীদাসের সাধনা, কৃষ্ণভক্তির মোহ এবং অদ্বৈতবাদের দ্বন্দ্ব মিলেমিশে এক অতীন্দ্রিয় দৃশ্যকাব্য গড়ে তোলে। কমলনয়নের কলমে কৃষ্ণবিগ্রহ প্রাণ পায়, কাশীর ঘাটে মন ভাসে। এটি না হওয়ার বিষাদের গাথা, যা পাঠককে প্রশ্ন করে: "আমি কি চিরন্তন, না অসংখ্য সম্ভাবনার এক দৃশ্যপট?"
এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো যেন ছায়ার নৃত্য – সরল কিন্তু গভীর, ঐতিহাসিক এবং কাল্পনিকের মিশ্রণে জীবন্ত। কমলনয়ন (মধুসূদন সরস্বতী) এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র , যার স্বপ্ন অসম্পূর্ণতায় ছড়িয়ে পড়ে। কবি, নৈয়ায়িক, অদ্বৈতবাদী – তার যাত্রা জীবনের সব সম্ভাবনার প্রতীক। পদ্মাক্ষ: কমলনয়নের কবিমূর্তি, যে কবিত্বের পথে সফল হয়, কিন্তু তার ছায়ায় লুকিয়ে আছে বিরহের বেদনা। রাজীবলোচন: ভক্তির ছায়া, শ্রীচৈতন্যের প্রেমে মিলিয়ে যাওয়া, যা দাম্পত্য এবং বৈরাগ্যের মধ্যে দোলে। উৎপলদৃষ্টি (উৎপলনয়ন): সুরের সাধক, যার জীবন কল্পলতার জালে বাঁধা, প্রেম এবং শূন্যতার মিলনে। অন্যান্য: প্রমোদন পুরন্দর (পিতা, স্থিতিশীলতার প্রতীক), ভৈরবী (নারীসত্তার রহস্যময় রূপ), এনায়েত খাঁ (সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের ছায়া)। এরা যেন জীবনের বিভিন্ন পথের দর্পণ, যা পাঠককে নিজের ছায়াগুলোর সঙ্গে দেখা করে।
এই উপন্যাস যেন এক দার্শনিক নদী – তার জলে মিশে আছে অদ্বৈতবেদান্ত, নব্য ন্যায়, ভক্তিরস এবং তন্ত্রের অমৃত। মূল থিম জীবনের সমান্তরাল সম্ভাবনা: এক জীবনে না হওয়া পথগুলো অন্য জগতে বাস্তবায়িত হয়, যা অস্তিত্বের প্রশ্ন জাগায় – "আমি কি চিরন্তন?"। নারীসত্তা চিরন্তনীয়: কন্যা, মাতা, প্রণয়িনী হিসেবে ফিরে আসে, সমাজের কটাক্ষের মুখে বিরহ-পূর্ণতার অভিসার করে। প্রেম এবং দর্শনের দ্বন্দ্ব: অপার্থিব প্রেম (কৃষ্ণভক্তি, গৌরাঙ্গের মোহ) দাম্পত্যের সঙ্গে মিলে শূন্যতার পূর্ণতা খোঁজে। ইতিহাসের ছায়া: হিন্দু-মুসলিম সহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ভবিষ্যৎ ছবি – এটি বাংলার মধ্যযুগীয় সংস্কৃতিকে জীবন্ত করে। সব মিলিয়ে, এ যেন এক মানস বন্ধ্যাত্বের প্রতিষেধক – না হওয়ার বিষাদে জন্ম নেয় নতুন স্বপ্ন।
সন্মাত্রানন্দের শৈলী যেন এক কুহক-বাস্তবের জাল – সম্পূর্ণ সাধুভাষায় রচিত, কিন্তু তার ভারে ন্যুব্জ না হয়ে আলো-আঁধারির মধ্যে ভাসায়। 'আলাপ' এবং 'বিস্তার' পর্যায়ে সজ্জিত, সময়ের তিন পট (কাশী, নবদ্বীপ, দিল্লি-আগ্রা) সমান্তরালে চলে, ভাষা কালানুসারে পরিবর্তিত হয়। কল্পলতায় কৃষ্ণবিগ্রহ প্রাণ পায় – এমন চিত্রময়তা পাঠককে কেমন যেন এক ঘোরের মধ্যে রাখে। এটি পরাবাস্তব রোমান্টিসিজমের জন্ম দেয়, যা পড়তে গিয়ে যেন সময় থেমে যায়, মন কাশীর ঘাটে ভেসে ওঠে – এক মনোজ্ঞ অভিজ্ঞতা! ছায়াচরাচরের সমান্তরাল মহাবিশ্বে- কখনও কমলনয়ন( মধুসূদন সরস্বতী) ,কখনও বা সে পদ্মাক্ষ, কখনও বা রাজীব লোচন,আর কখনও বা উৎপল দৃষ্টি। সেরকম ভাবে দেখতে গেলে আক্ষরিক অর্থে নির্দিষ্ট ভাবে কিছু না হতে পারাটাই যেন সবচেয়ে বড় কিছু হওয়া। কমলনয়ন থেকে মধুসূদন সরস্বতীর এই যাত্রাপথ ভারি আশ্চর্যের এবং মায়াময়। অদ্বৈত বেদান্তবাদ খণ্ডনের স্পৃহা নিয়ে তাঁর কাশী যাত্রা এবং তারপর অদ্বৈত বেদান্তবাদের প্রমুখ বক্তা হয়ে ওঠা, কিন্তু অন্তরে তাঁর প্রাণের কৃষ্ণকিশোর, যেখানে প্রেম এবং ভক্তিই যেন মূখ্য। সব দর্শন, যুক্তি যেন সেখানে ম্লান হয়ে ভক্তি আর ভালোবাসাই প্রধান হয়ে উঠেছে। একে কি দ্বন্দ্ব বলবো? জানি না। সবকটি সমান্তরাল পথ যেন এসে কোথাও যেন মিলতে চায়! কি জানি! আমাদের আধুনিক জীবনেও এই উপন্যাস খুবই প্রাসঙ্গিক বলেই মনে হয়েছে , আমরা যা হয়েছি, কখনও কি মনে হয় না যদি অন্যরকম কিছু হতাম, হয়তো ভালো হতো! জীবনের নানা বিকল্প সম্ভাবনার রাস্তাগুলো উন্মুক্ত হয়েছে এই উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে - তাকে আপনি সমান্তরাল মহাবিশ্বে ঘটে যাওয়া বলুন বা থিওরি অফ প্রোবেবিলিটি বলুন।
ছায়াচরাচর নিছকই একটি উপন্যাস নয়, এক আমন্ত্রণ – নিজের ছায়াগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে সময়ের ধ্বনিতে হারিয়ে যেতে। সন্মাত্রানন্দ এখানে বাংলার হারানো আত্মাকে ফিরিয়ে আনেন, মধুসূদন সরস্বতীর মতো অসম্পূর্ণ কবির মাধ্যমে আমাদের অসম্পূর্ণতাকে উদযাপন করেন। এই বইটি আপনার জন্য – এক মনোজ্ঞ যাত্রা, যা শেষ হয় না, ছায়ায় ছায়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
নাস্তিক পণ্ডিতের পর আবার একই ন্যারেটিভ... ভেবেছিলাম একঘেয়ে লাগবে। কিন্তু না, এইসব বই পড়লে সম্ভাবনার ঘূর্ণাবর্তে ঘুরে বেড়ানোর প্রবল বাসনা জাগে। জগৎ ভুল হয়ে যায়... এক আশ্চর্য tour-de-force.
(এ বইয়ের জন্য গুছিয়ে রিভিউ না লিখলে বইটির প্রতি অবিচার করা হবে, তাই আপাতত অতি সংক্ষেপে কাজ চালাচ্ছি। পরে লেখার ইচ্ছা রইল।)