করুণ আকুতি জানালেন ধনকুবের পিয়েরে উইনিং: মরতে বসেছে তাঁর নাতনি, ব্যর্থ হয়েছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, এখন কেবল একটা মিথ… অ্যালকেমির পুরনো এক পাণ্ডুলিপিই হয়তো পারে মিনতিকে বাঁচাতে। চমকে গেল রানা মেয়েটির নাম শুনে!
সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে রানা বুঝল, অনুরোধে ঢেঁকি গিলেছে। ওই পাণ্ডুলিপির অস্তিত্ব আছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ তো আছেই, ঝামেলা হিসেবে সঙ্গে জুটে গেছে কানাডিয়ান এক একরোখা সুন্দরী। কোনও এক গুপ্তসংঘও নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায় ওটার সাহায্যে… যে-কোনও মূল্যে।
একাধিকবার মরণফাঁদ পাতল তারা রানা-সেলেনার জন্য। উপযুক্ত জবাব দিল রানাও। কিন্তু ও জানত না, সব শেষ হয়ে গেছে ভেবে যখন সতর্কতায় ঢিল দিয়েছে একটু, তখনই চুপিসারে হাজির হয়ে যাবে শত্রুপক্ষের ভয়ঙ্করতম খুনিটা।
কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
কাহিনি সংক্ষেপঃ পিতৃ-মাতৃহীন একমাত্র নাতনি মিনতিকে নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়েছেন ধনকুবের পিয়েরে উইনিং। মস্তিষ্কের এমন এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে বাচ্চা মেয়েটা আক্রান্ত যে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার কোন কারিগরিই কাজে আসছেনা। অন্ধের যষ্টি একমাত্র নাতনিকে বাঁচাতে মি. উইনিং শরণাপন্ন হলেন সিংহহৃদয় বাঙ্গালী এজেন্ট মাসুদ রানা'র। হেনরিখ প্যানাসেলসাস নামের এক কিংবদন্তিতুল্য অ্যালকেমিস্ট রচিত প্রাচীন এক পান্ডুলিপিই নাকি বাঁচাতে পারে মিনতিকে। খড়কুটোর মতো এই বিশ্বাসটাকে আঁকড়ে ধরেই বৃদ্ধ মানুষটা সাহায্য চাইলেন রানা'র কাছে। মানবিক কারণে রানাও সাড়া দিলো সেই আহবানে।
বলতে গেলে প্রায় একটা অর্ধ-সমর্থিত সত্যের পেছনে দৌড়ানো শুরু করলো মাসুদ রানা। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স-এর এই এজেন্ট যখন অ্যালকেমিস্ট হেনরিখ প্যানাসেলসাসের হারিয়ে যাওয়া পান্ডুলিপির খোঁজ কেবল শুরু করেছে, ঠিক তখনই প্যারিসে অবস্থানরত সেলেনা বার্নহার্ট নামের এক নব্য অ্যালকেমিস্টের ওপরও হামলা হলো। হামলাকারীরা রেহাই দিলোনা রানাকেও। পোড় খাওয়া বাঙ্গালী এজেন্ট রানা যখন ব্যাপারটা তলিয়ে দেখলো, দেখা গেলো পুরো ব্যাপারটার পেছনেই রয়েছে 'ঈশ্বরের তরবারি' নামের এক প্রাচীন গুপ্তসঙ্ঘের যোগসাজশ। শুধু তা-ই না, ভ্যাটিকানের এক সম্মানিত আর্চবিশপ নিজের সর্বশক্তি নিয়ে লেগেছেন রানা ও সেলেনার পেছনে। ওদেরকে থামানোই যেন সেই আর্চবিশপের একমাত্র লক্ষ্য।
এলিক্সার অভ লাইফ বা অমৃতসুধার সাথে সম্পর্কিত একটা প্রাচীন পান্ডুলিপির অনুসন্ধান একটা পর্যায়ে জন্ম দিতে লাগলো একের পর এক রক্তস্নাত সংঘর্ষের ঘটনার। লাশ পড়তে লাগলো পাইকারি হারে। অভিযানটা যতোটা সহজ হবে বলে ভেবেছিলো রানা, ততোটা সহজ মোটেও হলোনা। নানা চড়াইউৎড়াই পেরিয়ে যখন রানা ভেবে নিলো সবই শেষ, ঠিক তখনই শত্রুপক্ষের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর খুনি ফ্র্যাজো পিছু নিলো ওর। পুরোপুরি সাইকোপ্যাথ এই খুনি যেন পালটে দিলো পুরো গল্পের গতিপথ। মুমূর্ষু একটা বাচ্চা মেয়েকে বাঁচাতে রানাও এসবের শেষ পর্যন্ত দেখে নেয়ার সংকল্প করলো। জমে উঠলো লড়াই।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ অনেকদিন পর মাসুদ রানা সিরিজের কোন বই পড়লাম যেখানে সহযোগী লেখক হিসেবে প্রিয় লেখক সায়েম সোলায়মানকে পেয়েছি। মাসুদ রানা'র এবারের উপাখ্যানে রানাকে অন্যান্য অনেকবারের মতো আবারো অসহায় কোন মানুষের সাহায্যের আবেদনে সাড়া দিতে দেখা গেছে। মিনতি নামটাই যেন এই অকুতোভয় বাঙ্গালী এজেন্টকে বাধ্য করে মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করতে। বরাবরের মতোই বিপদশঙ্কুল নানা পরিস্থিতিতে ভরপুর ছিলো এম আর নাইনের এবারের অভিযানটাও। 'ঈশ্বরের তরবারি' নামের ধর্মান্ধ এক গুপ্তসঙ্ঘের সাথে ওয়ান ম্যান আর্মির মতোই অসম সাহসিকতার সাথে লড়াই করতে দেখা গেছে রানাকে। সেই সাথে এই কাহিনিতে নিখাদ রোমাঞ্চের সাথে সমাবেশ ঘটতে দেখা গেছে প্রাচীন অ্যালকেমির অনেক বিষয়াদিরও।
৪০৪ পৃষ্ঠার প্রায় বিশাল কলেবরের এই বইয়ের প্রতিটা অধ্যায়েই রোমাঞ্চকর আবহের এতোটাই ছড়াছড়ি ছিলো যে মুগ্ধতা নিয়ে পড়ে গেছি একেবারে শেষটা পর্যন্ত। কাহিনির মধ্যে এতোটাই ডুবে গেছিলাম যে বইটা কখন শেষ হয়ে গেছে টেরও পাইনি। তবে একটা ব্যাপারে অপূর্ণতা রয়ে গেছে৷ আর সেটা হলো ফ্র্যাযো'র সাথে রানা'র দ্বৈরথের ব্যাপারটা। আরো একটু অ্যাকশন আশা করেছিলাম এই ব্যাপারটাতে। যাই হোক, কাহিনির সর্বশেষ ট্যুইস্টটাও একটা ধাক্কার মতো ছিলো আমার কাছে। এমনটা হতে পারে তা মোটেও আশা করিনি আমি। মোটমাট এটা বলা যায় যে, উপভোগ্য একটা রানা কাহিনির স্বাদ পেয়েছি 'গুপ্তবিদ্যা' পড়ে।
ইদানীং বেশ অনেকটা বিরতি দিয়ে মাসুদ রানা সিরিজ পড়া হয়। সায়েম সোলায়মান, ইসমাইল আরমান ও কাজী মায়মুর হোসেনের মতো শক্তিমান লেখকরা এখনো বেশ সুন্দরভাবে সহযোগীতা করে চলেছেন মাসুদ রানা সিরিজের স্রষ্টা প্রিয় কাজী আনোয়ার হোসেনের সাথে। তাঁদের এই জয়যাত্রা যেন অব্যাহত থাকে, এই কামনাই করি। 'গুপ্তবিদ্যা'-এর প্রচ্ছদটাও বেশ ভালো লেগেছে আমার। প্রচ্ছদশিল্পীকে সেজন্য জানাই ধন্যবাদ। আগ্রহী পাঠকরা চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন বইটা। আশা করি ভালো লাগবে।
গল্পটার ভিত্তি অত শক্ত না। অযথাই নিল রানা কেসটা। শুধু মিনতি নামটার জন্য। স্পয়লার না এটা, জানা যাবে বইয়ের শুরুতেই। তারপর একের পর এক আক্রমণ। মাসুদ রানার ছুটে চলা। এবং কেসের শেষ পর্যন্ত পৌঁছানো। রানা মারা যায়নি, সে কথা জানি আমরা সবাই। কাজেই, এটা আলাদা করে বলার কিছু নেই।
প্রণয় নেই সেভাবে। এই মাসুদ রানা খানিকটা শক্ত, অনেকটা পরিণত, আগের সেই তারুণ্য যেন খানিকটা কমে গেছে। তবু কিছু খটমটে কি নেই? আছে তো। এরকম কত গুপ্তবিদ্যাই তো জানে রানা। জানে যিশুর উত্তরসুরীর কথা (গুপ্তসংকেত - ডা ভিঞ্চি কোড), টাইটার গুপ্তবিদ্যার কথা (শেষ চাল - দ্য সেভেন্থ স্ক্রোল)-সহ হাজারটা গুপ্তধনের গল্প। কাজেই, অ্যালকেমি নিয়ে যে অবিশ্বাস, সেটা রানার সঙ্গে ঠিক গেল না। আমার মনে হলো আরকি। আগের মাসুদ রানার সেই উচ্ছলতাই নেই। কেমন দমবন্ধ একটা চরিত্র। তবু অনেক অনেক দিন পর মাসুদ রানা পড়ে ভালই লাগল।
মূল গল্পটা স্কট ম্যারিসনের লেখা। বেন হোপ সিরিজের "দি আলকেমিস্ট'স সিক্রেট"। অনুবাদও আছে বইটার, শাহেদ জামান করেছেন। অনুবাদ নিশ্চয়ই ভাল, তবে বইটাই অতটা আহামরি লাগেনি, মাসুদ রানার কনিটেক্সটে। বেন হোপের আবার পেশাই এটা, বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন কাজকর্ম করে সে। সেজন্য মোটা অঙ্কের টাকা পায়। সেই কনটেক্সট অনুযায়ী গল্পটা বোধ হয় ভালই লাগবে। তবে মাসুদ রানা পড়ার যে আবেদন, সেটা অন্যরকম। ডা ভিঞ্চি কোডের ল্যাংডনকে গুপ্ত সংকেতের মাসুদ রানা ছাড়িয়ে গেছে অনেকটাই। কারণ, মাসুদ রানা আমাদের ছোট বেলার নায়ক, অনেক আপন, অনেক পরিচিত। সেই আবেদন এখানেও পাওয়া যাবে কিছুটা।