মুখবন্ধ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের গুরুত্ববোধ থেকে এবং ভবিষ্যতের যে কোন আন্দোলনের সঙ্গে তাকে যথাযথভাবে যুক্ত করবার প্রয়োজনবোধ থেকেই এই সংকলনের উদ্যোগ। এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে সংবাদপত্রে প্রকাশিত যাবতীয় প্রতিবেদন, চিঠিপত্র, সাক্ষাৎকার, নিবন্ধ হতে বাছাইকৃত একটি অংশ। এই আন্দোলনের সময়সীমা নির্দিষ্ট করা কঠিন, কিন্তু বোধগম্য কারণেই একটি সময়সীমার ভেতরেই আমাদের থাকতে হয়েছে। … … … প্রকাশিত সকল লেখাগুলো খেয়াল করলে আমরা দুটি প্রধান ধারায় এগুলিকে ভাগ করতে পারি: একটি হল আন্দোলনের পক্ষে, অর্থাৎ যৌন নিপীড়ন ধর্ষণ ইত্যাদির বিপক্ষের ধারা; অন্যটি হল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্পষ্টতই বা অস্পষ্টভাবে আন্দোলনের বিপক্ষে, অর্থাৎ যৌন নিপীড়ন ধর্ষণ ইত্যাদির পক্ষের ধারা। এটা অবশ্য বলা দরকার যে, পুরো আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিভিন্ন স্তর, শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে যারা শাসক মূল্যবোধ থেকে বিষয়টিকে দেখেছেন, তাঁরা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছেন, আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের চরিত্র হনন করেছেন। তাঁদের সেসব বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে সবসময় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি, তারা বিভিন্ন কৌশলে কায়দায় আন্দোলনের শক্তি হরণ করবার চেষ্টা করেছেন। কোন কোন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন খেয়াল করলে এই ধারার ভূমিকা সেখানে স্পষ্টতই অনুভব করা যায়। আন্দোলনের সময় হঠাৎ করে জাবি ছাত্রীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে, তথ্য বিকৃত করে সংবাদ পরিবেশনে এবং সে সংবাদটি ফটোকপি করে বিশদ প্রচার যে খুবই পরিকল্পিত তা বুঝতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয়। কোন সংবাদপত্র যখন নিরীহ মেয়েদের কেন ধর্ষিত বানানো হচ্ছে এ জাতীয় যুক্তি বিন্যাস করে কিংবা কোন কোন লেখা বা সংবাদভাষ্যে যখন প্রেম বা স্বেচ্ছা যৌন সম্পর্কের সাথে ধর্ষণকে একাকার করা হয় কিংবা যখন মেয়েদের চলাফেরার স্বাধীনতাকে ধর্ষণের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তখন বুঝতে অসুবিধা হয়না যে এগুলির সঙ্গে ক্ষমতা, ধর্ষক, যৌন নিপীড়ক কিভাবে সম্পর্কিত। … … … আমরা ক্ষুব্ধ, প্রতিবাদী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমগ্র সমাজে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের যাবতীয় ঘটনায়; আমরা যাবতীয় বৈষম্যের ব্যবস্থাতে প্রতিবাদী। কিন্তু আমরা আনন্দিত, আশাবাদী ও অনুপ্রাণিত হই যখন দেখি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ সংগঠিত হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন সে কারণেই আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। আমরা মনে করি, আমাদের সমাজের সর্বত্র ঘরে, বাইরে, কর্মস্থলে, রাস্তায় নারীর উপর সহিংস আক্রমণকে রুখে দাঁড়ানোর যে অব্যাহত আন্দোলন তাতে এটি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় শক্তি যোগাবে। এ সংকলন গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেবার পেছনে এ আশাবাদটিই আমাদের শক্তি যুগিয়েছে।
অশুচি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নাট্যসংগঠন। নারী-নির্যাতন ও হয়রানি প্রতিরোধে মিছিল-মিটিং-এর আন্দোলনের পাশাপাশি প্রতিরোধের একটি প্রতীক হিসেবে পথনাটককে নতুন করে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে এই সংগঠনের জন্ম।
জাহাঙ্গীরনগরে শৃগালের সংখ্যা বেশি দেখেই কিনা কে জানে, সেখানে ব্যাঘ্রশাবকের সংখ্যাও বেশি। ওদেরই এক দল নিজের ভার্সিটির মেয়েদের ধর্ষণ করে, ঐ ওখান থেকেই আবার আরেক দল দাঁড়ায় যায়—যারা প্রতিবাদ তো প্রতিবাদ, সেই পুরো ঘটনাটাকে রীতিমত দলিল বানায়ে ছাপায় ফেলে, কুড়ি কুড়ি বছর ধরে বাচ্চাগুলাকে অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য। আজ থেকে বিশ বছর আগে বসে দুশো পৃষ্ঠার দলিল বানায় ফেলা নিশ্চয়ই চাট্টিখানি কথা ছিল না।
এই বইয়ের শক্তিশালী দিক আমি যেটা দেখতেসি, অশুচির ছেলেমেয়েরা মার্জিনে-মার্জিনে নিজেদের মতামত লিখে গেলেও, আন্দোলনের পক্ষের-বিপক্ষের প্রায় সব খবরই তারা ছাপাইসে। ফলে মোটামুটি একট নন-বায়াজ্ড…অবশ্য, ধর্ষণের ঘটনায় বায়াজ্ড হবারই বা কী আছে, সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া তো দুটাই হতে পারে, হয় সেটা মানুষ দিবে, নয়তো অমানুষ দিবে—এই তো, তো, মানুষ কিংবা অমানুষেরা কী বলতো দুটারই একটা ধারণা পাওয়া গেসে।
তবে একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করতেসি, বিশ বছর আগে ফেসবুক—উফ না, মোবাইল ফোনই তো ব্যবহার করতো ক’টা মানুষ, সুতরাং সেই সময়ে আন্দোলনে কিছু একটা করতে চাইলে মানুষ এবং অমানুষ—দু দলকেই লুঙ্গি মালকোচা মেরে, শাড়ির আঁচল কোমরে বেঁধে মাঠে নামতে হত। এতে আন্দোলনটা অনেক স্পষ্ট ছিল—তুমি মানুষ হও আর অমানুষই হও, কিছু একটা করতে চাইলে তোমাকে স্মার্ট হতে হবে, এবং ঘর থেকে বেরিয়ে লাঠিসোটা দিয়ে ডাঙ মারতে হবে। কিছু একটা বলতে চাইলে তোমাকে খু-উ-ব ভালোমত জানতে হবে তুমি কী বলতে চাও—সেটা ইশতেহারে লিখে, প্রেস থেকে ছাপিয়ে হাতে হাতে বিলি করতে হবে। কিংবা তোমার কণ্ঠ জোরালো হতে হবে, শহিদ মিনারের নিচে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলার ক্ষমতা থাকতে হবে—ঐ যে, ঐ ছেলেটা ধর্ষণ করসে, আমি ঐ ছেলেটার শাস্তি চাচ্ছি। কিংবা অমানুষ হলেও, যদি প্রতিবাদ করতে চাও, জোরগলাতেই বলতে হবে, কই না তো আমি তো ধর্ষণ করি নাই, মনে হয় মেয়েটারই ক্যারেকটার খারাপ!
এবং সমীকরণটা সহজ—জাবির এই আন্দোলনকেই যদি উদাহরণ হিসেবে নেই—ওদের ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে আটশো মানুষ বলতেসে ধর্ষকের বিচার চাই, এর বিপরীতে ছাত্রলীগের…হয়তো একশোজন বলতেসে মেয়েগুলো ক্যারেকটারলেস—আটশোর বিপরীতে একশো—ফলে আন্দোলনটাকে ইতিবাচক দিকে নেয়া যাচ্ছে।
এখন সমস্যাটা হল, পৃথিবীতে মানুষ-অমানুষ ছাড়াও আরেক শ্রেণির জীব আছে—যাদের বলে অমেরুদণ্ডী। এদের সংখ্যাই কিন্তু বেশি, চতুর্দিকে চিলুবিলু করে এরা। এবং এদের না আছে লাঠি দিয়ে মাথায় দুইটা বাড়ি দেয়ার শক্তি, না আছে আঙুল উঁচিয়ে বলার মত কণ্ঠ, না আছে হাতে হাতে ইশতেহার বিলানোর উদ্যম। ফেসবুকে বসে সবাই যখন সমান ভাষা পেয়ে যায়, এবং ক্ষেত্রবিশেষে অমেরুদণ্ডীরা যখন অমানুষদের পক্ষ নিয়ে মেদুষ্টু-মেদুষ্টু বলে চেঁচাতে থাকে, তখন ওদের গলাটাই সবচাইতে জোরে শোনা যায়। যারা পিটাইতে পারে না তাদের হাতেও লাঠি থাকলে আন্দোলনের দিকটা ঠিক রাখা খুব মুশকিল হয়ে পড়ে, এবং—
যাকগে। আমি জানি না আটানব্বইয়ের এই ঘটনার আগে দেশের আর কোথাও মেয়েরা এভাবে আন্দোলন করসে কিনা…মনে হয় না আর কোথাও এমনটা হইসে। সেদিক দিয়ে আন্দোলনটাকে একটা মাইলফলক বলতে হবে। সেই সাথে সাধুবাদ জানাতে হবে তাদেরকেও—যারা দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে এই সংকলনটা বানাইসে।
কিন্তু এত কথার আড়ালে বারবার একটা জিনিস হারায়ে যাচ্ছে যে, আন্দোলনটা হইসিল জাহাঙ্গীরনগরের একশোজন মেয়ে ধর্ষিত হবার কারণে। একশোজন…একশোজন।
আমার দুই হাত তুলে উন্মাদ হয়ে যেতে ইচ্ছা করে, ছুটে গিয়ে পদ্মায় ঝাঁপ দিতে ইচ্ছা করে। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করে একটা ওয়াই ক্রোমোজম নিয়ে জন্মাবার কারণে।
চিৎকার করো মেয়ে, দেখি কতদূর গলা যায়। আমাদের শুধু মোমবাতি হাতে নীরব থাকার দায়।
গলার আওয়াজ শোনা যায়? এই আওয়াজ কতদূর যায়? দূর? বহুদূর? নাকি প্রতিধ্বনিত হয়ে সেই মেয়েটির কানেই ফিরে আসে?
এই বইতে কি আছে? ১৭ আগস্ট,১৯৯৮ থেকে শুরু করে ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দিন মিলিয়ে মোট ৩১ টি দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘটিত মিটিং মিছিল আর আন্দোলনের ছোট ছোট বর্ণনা।আরও আছে দি ডেইলি স্টার, মানবজমিন, ভোরের কাগজ, আজকের কাগজ, সংবাদ, বাংলাদেশ অবজার্ভার, জনকণ্ঠ, বাংলাবাজার পত্রিকা, দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, আজকের কাগজ ইত্যাদি পত্রিকায় ভুক্তভোগী ছাত্রী আর এদের পক্ষে সুবিচারের আশায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদন; বিখ্যাত মানুষদের এই ঘটনাগুলো সম্পর্কে করা মন্তব্য। সাথে এদের ভেতরেই কয়েকটা পত্রিকায় ছাপানো হয়েছিল ধর্ষকপন্থীদের দেয়া তথ্য: সবই নাকি নাটক আর সাজানো!!! এটি কোনো সাহিত্য বেষ্টিত বই নয়। ১৯৯৮ সালে জাবিতে ঘটা আন্দোলনের প্রতিবেদন আর তথ্যের সংকলন। ৯৮ এর শেষের দিকে গঠন হওয়া অশুচি দলটি দায়িত্ব নিয়ে এই সংকলনটি করেছিল।
একজন ধর্ষক তৈরি হওয়ার পেছনে আমি সমাজ, আইন কানুন,ধর্ম, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি নারী, নারীর পোশাক, চরিত্র, ঘটনাকালীন সময়ে নারীর অবস্থান এগুলোর ব্যাপারে কিচ্ছু বলবো নাহ। নানা মতের আর নানা রকমের মানুষের বাস আমাদের সমাজে। আমি ওদিকে যাবো না, মেলা ফ্যাসাদ।মানুষের হরেক রকমের দৃষ্টিভঙ্গি! যার যার দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ে থাকুক তারা। আমার কি!!!!?
আমি একটা সাধারণ কথা বলি, এমন অবস্থা কি আর একদিনেই হুট করে তৈরি হয়েছে!? একটা ধর্ষক একদিনেই তৈরি হয়?? একটা শিশু জন্ম গ্রহণ করে একদম নিষ্পাপ হয়ে, কোনো বোধ- চেতনা ,ধর্ম, সমাজ, নারী-পুরুষ কি, যৌনতা কি এসব কিছুর জ্ঞান ছাড়াই সে দুনিয়াতে আসে। ধীরে ধীরে বড় হয় আর জ্ঞানের খাতা ভরতে থাকে। আর এরই প্রেক্ষিতে কারও ভাই,কারও ছেলে,কারও বাবা, কারও স্বামী ধর্ষক হয়ে যায়; উত্তরাধিকার সূত্রে এই চক্র আবার কখনও বহমানও থাকে হয়তো। কিন্তু কেন?????আমি এর জন্য শুধু তার পরিবার বিশেষ করে তার মা আর বাবাকে দায়ী করে ছুটে পালাবো :) হ্যা,হ্যা, হ্যা......... আমি একশো বার বলবো।একশোবার বলবো আপনারাই দায়ী। আপনারা যা ভাবার ভাবুন, আমার কি!!!?
তারপর? তারপর আর কি? দেশ জুড়ে আবারো চলে- চিৎকার করো মেয়ে, দেখি কতদূর গলা যায়, আমাদের শুধু মোমবাতি হাতে নীরব থাকার দায়। চিৎকার করো মেয়ে, দেখি কতদূর গলা যায়, আমাদের শুধু ধ্বজা ভাঙ্গা রথে এগিয়ে চলার দায়।
আমি প্রায়ই বলি বাংলাদেশের আর কি দোষ, দোষ তো মানুষের! সেই হিসেবে ভার্সিটির আর কি দোষ, এটা তো এই দেশের একটা জায়গা মাত্র। মাটি আর কি দোষ করবে? দোষ সব মানুষের! খালি একটাই সমস্যা - জন্মের আগে মৃত্যু দিয়েছে, জন্মের পরে ভয়, সকালে - বিকালে শরীর আগলে-লুকিয়ে বাঁচতে হয়!
মুখবন্ধতেই সব বলে দেওয়া আছে। বছরদশেক আগে দেশের যেই অবস্থা ছিল, বর্তমানে যে তার ইঞ্চিখানেকও বদলায়নি, তা এই সংকলনটা পড়লেই বোঝা যায়৷ সময়োপযোগী সংকলন।