এ-উপন্যাসের কেন্দ্রচরিত্র সাহসী, স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত এক মেয়ে, দীপা - দীপাবলী, যার নামের মধ্যেই নিহিত অন্ধকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আভাস। নিয়ত সংগ্রামরতা প্রতিমার মতো সেই মেয়ে দীপা, আর চালচিত্রে একের পর এক বর্ণাঢ্য ছবি। উত্তরবাংলার চা-বাগান, গাছগাছালি আর আঙরাভাসা নদী দিয়ে সে চালচিত্রের সূচনা। ক্রমান্বয়ে ফুটে উঠেছে পঞ্চাশের কলকাতা ও শহরতলি, কো-এডুকেশন কলেজ, মেয়েদের হোস্টেল, কফি হাউস, সমকালীন ছাত্র-আন্দোলন ও রাজনৈতিক পটভূমি, সর্বভারতীয় কর্মজীবনের পরিবেশ ও প্রতিকূলতার জীবন্ত চিত্রাবলি। স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি জীবনে স্বাধীকার অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রয়াসে মেয়েদের সাধ, সংকল্প ও সংগ্রামের এক জীবন্ত, ধারাবাহিক ছবি ফুটিয়ে তোলার জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে সমরেশ মজুমদারের সুদীর্ঘ, সুকল্পিত, সুবিন্যস্ত এই উপন্যাস।
Samaresh Majumdar (Bangla: সমরেশ মজুমদার) was a well-known Bengali writer. He spent his childhood years in the tea gardens of Duars, Jalpaiguri, West Bengal, India. He was a student of the Jalpaiguri Zilla School, Jalpaiguri. He completed his bachelors in Bengali from Scottish Church College, Kolkata. His first story appeared in "Desh" in 1967. "Dour" was his first novel, which was published in "Desh" in 1976. Author of novels, short stories and travelogues, Samaresh received the Indian government's coveted Sahitya Akademi award for the second book of the Animesh series, 'Kalbela".
সমরেশ মজুমদার-এর জন্ম ১০ মার্চ ১৯৪৪। শৈশব কেটেছে ডুয়ার্সের চা-বাগানে। জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলের ছাত্র। কলকাতায় আসেন ১৯৬০-এ। শিক্ষা: স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ। প্রথমে গ্রুপ থিয়েটার করতেন। তারপর নাটক লিখতে গিয়ে গল্প লেখা। প্রথম গল্প ‘দেশ’ পত্রিকায়, ১৯৬৭ সালে। প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’, ১৯৭৫-এ ‘দেশ’ পত্রিকায়। গ্রন্থ: দৌড়, এই আমি রেণু, উত্তরাধিকার, বন্দীনিবাস, বড় পাপ হে, উজান গঙ্গা, বাসভূমি, লক্ষ্মীর পাঁচালি, উনিশ বিশ, সওয়ার, কালবেলা, কালপুরুষ এবং আরও অনেক। সম্মান: ১৯৮২ সালের আনন্দ পুরস্কার তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি। এ ছাড়া ‘দৌড়’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার হিসাবে বি এফ জে এ, দিশারী এবং চলচ্চিত্র প্রসার সমিতির পুরস্কার। ১৯৮৪ সালে ‘কালবেলা’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার।
এই বই এর মেইন চরিত্রকে নায়িকা বলবোনা, সংগ্রামী নারীর প্রতীক বলবো। তার নাম দীপাবলি । যার চাঞ্চল্যতা আর আত্ম সম্মানবোধ আমাদেরকে বুঝতে শিখিয়েছে বাস্তবতাকে কীভাবে রঙিন সুতোয় বাঁধতে হয়! দীপাবলীর মা অন্জলি, ঠাকুরমা মনোরমা, বাবা অমরনাথ, ছোট বেলার বন্ধু খোকন, বিশু তারা আর কেউ নয়—-শত বছর পরেও মনে হবে এই সমাজেই আমরা থাকছি। দীপাবলির প্রতিটা কথা, কর্মউদ্দীপনা, সকল প্রতিকুলতাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলে, কীভাবে নিজের স্বপ্নগুলোকে ছুঁয়ে দেখা যায়,,,তা আমাদের জীবনের গল্প মনে হবে।
শৈশব সবসময় আনন্দের আর স্মৃতিতে পরিপূর্ণ। উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে আপনারও মনে হবে শৈশবেই আছি, সাথে থাকবে মায়ের বকুনি, শাসন আর বন্ধুদের চপলতা।
তখন বাল্যবিবাহ এর প্রথা চালু ছিলো। দীপার সুন্দর শৈশব কেড়ে নিয়ে জোর করে বিয়ে দেয়া হয়। সেখান থেকে ফুলশয্যার পরদিনেই বিধবা হয়ে চলে আসা। পাঠকের মনকে নাড়া দিবে এই জায়গাটুকু।
জীবন তো থেমে থাকেনা। বহমান নদীর মতো চলে। সকল বাধা পিছনে ফেলে ঘুরে দাঁড়াতে হয়! তখন কেউ না কেউ পাশে এসে দাঁড়ায়। বোঝাতে সাহায্য করে, জীবনকে দ্রুতগামী ট্রেনের মতো চালাতে হয়।দীপা পেয়েছিলো তার শিক্ষক কে,তার পালিত বাবাকে। যিনি দীপাকে বুঝিয়েছিলেন মেয়েরাও পারে। শুরু হলো জীবন যুদ্ধের এক মহা কাব্য। তিক্ত অভিজ্ঞতাকে মনের ভিতরে রেখে সে ম্যাট্রিক পাশ করলো ফাস্ট ডিভিশনে। এরপর জলপাইগুড়ি কলেজ, তারপর কলকাতা।
সেই কিশোরী হয়ে উঠলো স্বতন্ত্র, বিদ্রোহী নারী। সমাজকে তুড়ি মেরে দেখিয়ে দিলো, নারী কোন অংশে কম নয়!
তার বিধবা মা,ঠাকুরমা আর রমলা সেনের অনুপ্রেরণায় হয়ে উঠলো দায়িত্ববান। আকাশকে নিতে চাইলো হাতের মুঠোয়। দুর্গম পাহাড়কে অতিক্রম করা তার নেশা হয়ে গেলো।
মনোরমা বলেছিলেন",মাগো, জীবন হিমালয়ের চেয়ে বড়। সেখান থেকে যেটা খুঁজে নিতে চাইবে, সেটা খুঁজবে আন্তরিকভাবে।। কারও সাথে আপোষ করবিনা। আমার বয়সে কিছু খোঁজা যায়না, কিন্তু তোর বয়সটা ঠিকঠাক।”বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাতনীকে জড়িয়ে ধরিয়েছিলেন। এই কথাগুলোর মাধ্যমে নাতনীকে দেখতে চেয়েছিলেন আপোষহীন।
লেখক বাস্তবচিত্র আর নারীর শিকল ভাঙার গান দুটোকেই সুন্দর করে উপস্থাপন করেছে।
দীপাবলি তৎকালীন সমাজ নয়। আজকের অনেক সাহসী নারীর প্রতিচ্ছবি সে। তৎকালীন সমাজের অনিয়ম, ধর্মীয় গোড়ামির বিরুদ্ধে আপোষহীন এক চরিত্র।
“সাতকাহন ” এক নারীর দুর্দান্ত জীবনের খুঁটিনাটির গল্প এই বইটা পড়ে চলেন, জীবনকে জানি।
"ভালোবাসা হলো বেনারসি শাড়ির মতো, ন্যাপথলিন দিয়ে যত্ন করে আলমারিতে তুলে রাখতে হয়, তাকে আটপৌরে ব্যবহার করলেই সব শেষ।"
সাতকাহন - এক সাহসী নারীর সংগ্রামের চিত্র। তথাকথিত সামাজিক রাজনীতি, ধর্মীয় গোড়ামি, চাপিয়ে দেওয়া বদ্ধমূল চিন্তাধারার বিরুদ্ধে আপোষহীন এক চরিত্র দিপাবলী। যাকে বারো বছর বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিয়ের দ্বিতীয় দিনেই স্বামী হারিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে এসে তাকে দাড়াতে হয় এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে। জীবনের সূচনাতেই নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে লড়াই করতে হয় বাস্তবতার সাথে। প্রবল আত্মসম্মানবোধ দিপাবলী চরিত্রকে করেছে আকর্ষনীয়। তবে কখনো কখনো তাকে বেশ বিরক্তিকরও লেগেছে। নিজেকে বাকি পাচজনের থেকে আলাদা ভাবার মানসিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
অসম্ভব রকমের ভালো লাগার একটি উপন্যাস। এখনও ঘোরের মধ্যে আছি। কি নেই এতে! নারী জীবনের নানা সীমাবদ্ধতা,এক অসাধারণ নারীর একা পথচলা, হারিয়ে যাওয়া প্রেম,বিদ্রোহ, সংগ্রামের চিত্র থেকে শুরু করে সমকালীন ছাত্র আন্দোলন,রাজনীতি,সরকারি চাকরি জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক।
বই শেষ করে কত সময় যে চুপচাপ বসেছিলাম খেয়াল নেই। জীবন নিয়ে গভীরভাবে ভাবাবে এই বই। জীবনে বাঁচতে হলে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হবে। নিজেকে ভালো রাখার জন্য বাঁচতে হবে। নারী জীবনের জন্য দিপাবলী চরিত্র হতে পারে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। সমরেশ মজুমদারের এক অমর কীর্তি সাতকাহন।
১১ বছরের কিশোরী দীপা'কে যখন বিয়ে দেয়া হয় অসুস্থ একটি ছেলের সাথে, বাবা অমরনাথ তখন, এত অল্প বয়সী মেয়ের বিয়ে দেয়া নিয়ে দোটানায় ছিলেন, কিন্তু মা অঞ্জলি আর ঠাকুমা মনোরমা'র ইচ্ছেতে জোর করেই বিয়ে দেয়া হয় দীপাকে। বিয়ের দিন সে জানতে পারে অঞ্জলি আর অমরনাথ তার আসল পিতা-মাতা নয়। জন্মের পরপরই দীপা'র মা মারা যান, আর পিতা তাকে ত্যাগ করে সন্যাসী হয়। মাসী অঞ্জলি তাকে কোলে তুলে নেন, অমরনাথ দেন তাকে পিতা'র স্নেহ, ভালোবাসা। এরপর সেই কিশোরী দীপা, স্বামী কাকে বলে, সংসার কি বোঝার আগে ফুলসজ্জা'র রাতেই বিধবা হয়। শশুরের নোংরা লালসা'র হাত থেকে বাঁচাতে পরদিন বিকেলে গোপনে বাড়ী থেকে পালাতে সাহায্য করে কাজের লোক আনা। জলপাইগুড়ি থেকে একা ছোট্ট দীপা তাদের চা বাগানের কোয়ার্টারে ফিরে আসে মাঝরাতে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত ছোট্ট দীপাবলি এক রাতেই জীবনের অনেক বড় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে যায়... বুঝে যায় এই জীবনের শুধু এতটুকু পথ নয়, তাকে একা চলতে হবে বাকীটা জীবন।
সমাজের নানান কটুক্তি, মনগড়া সংস্কার আর বৈধব্যের বোঝা এড়িয়ে তাকে গড়ে নিতে হবে নিজের পথ। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে তার জীবন।
ঠাকুমা মনোরমার আদেশে বিধবা'র সব বিধিনিষেধ মেনে নিলেও একসময় এই নিয়ে বিদ্রোহ করতে শুরু করে দীপা। মাধ্যমিক পরিক্ষায় ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়ার পর জলপাইগুড়ি কলেজে তাকে ভর্তি করিয়ে দেন অমরনাথ, বাবা অমরনাথ না বুঝে মেয়ে'র যে সর্বনাশ করেছেন, অনেকটা তার প্রাইশ্চিত্ত সরুপ চাইতো দীপা যা চায় তাই হোক। পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করুক। দীপার এই স্বপ্নের পেছনে একজনের ভূমিকা না বললেই নয়। তিনি হলেন সত্যসাধন মাস্টার। যিনি দীপার গৃ্হশিক্ষক ছিলেন। বৃদ্ধ শিক্ষক তাকে নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করতেন। দীপা'র মধ্যে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর, সকল বাধাবিপত্তি ডিঙিয়ে নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্য লড়াই করার বীজ তিনিই রোপন করেন। কিন্তু কলেজ পাশ করতেই তার পড়াশোনায় বাধ সাধেন অঞ্জলি। যিনি একসময় মায়ের স্নেহ দিয়ে বড় করেছেন, সম্পর্কে মাসী হলেও তখন সৎ মায়ের মতো আচরণ করতে শুরু করেন। সেই ছোট্ট বেলায় অন্ধকার নেমে আসা দীপার জীবনের পরবর্তী সময়ের নানান ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে এ-ই গল্প। নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সমাজের লোলুপ দৃষ্টি আর হিংস্র মনোভাব ডিঙিয়ে একা একটি মেয়ের লড়াই করে টিকে থাকার গল্প সাতকাহন।
ব্যাক্তিগত মতামতঃ- বইটা শুরু করার পর থেকে একটা আচ্ছন্নের মধ্যে ছিলাম যেনো। সেই সাথে নিজের উপর কিছুটা বিরক্ত। বার বার এটাই মনে হচ্ছিলো, এমন একটা কালজয়ী উপন্যাস শুরু করতে এত দেরী করলাম কেনো! সমরেশ মজুমদারে'র বই পড়া শুরু হয়েছিলো 'উত্তরাধিকার' দিয়ে। সেখানে চা বাগান আর প্রকৃতি নিয়ে যে বর্ননা ছি��ো তা'র রেশ রয়ে গেছে এখনো। সাতকাহনে'র শুরুটাও চা বাগান দিয়ে হলেও একবারের জন্যও দুটোকে এক বলে মনে হয়নি। বরং দুটোই যেনো আলাদা ভালো লাগা তৈরি করেছে। দীপার জীবনে সংকল্প ও সংগ্রামের সাথে একাত্ম হয়ে ছিলাম কিছুটা দিন। প্রিয় বইয়ের তালিকায় দেরীতে হলেও অবশেষে যোগ করলাম। সমরেশ মজুমদারের এক অনবদ্য সৃষ্টি এই সাতকাহন।
প্রায় সাড়ে সাতশো পৃষ্ঠার এই বই পড়া শুরু করেছিলাম এপ্রিল মাসে, রোজার মধ্যে। সবমিলিয়ে পাঁচ মাস লেগে গেছে এটা শেষ করতে। এই পাঁচ মাসে কত কী ঘটে গেছে। আমি এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে এসেছি, দেশে একটা যুদ্ধ লেগে বিজয় ও এসে গেছে, বইয়ের ধরণ খসখসে মলাট থেকে ডিজিটাল স্ক্রিনে ট্রান্সফার হয়ে গেছে; মাঝখানে কতদিন পড়ায় গ্যাপ ও পরেছে। কিন্তু সব কিছু শেষে যখনই বই টা হাতে নিয়েছি, তখনই একটা আরাম আরাম অনুভূতির সংস্পর্শ পেয়েছি। এত সুন্দর লেখকের লেখার ধরণ, শব্দ চয়ন, সংলাপ; মুগ্ধ হতে বাধ্য হয়েছি বারবার।
সাতকাহন এক অদম্য নারীর নিরন্তর গতিতে ছুটে চলার গল্প, নিজের আত্মসম্মানবোধ আর অধিকারের সাথে কোনোরকম আপোস না করে বেঁচে থাকার গল্প।গল্প শুরু হয় প্রধান চরিত্র দিপাবলীর একদম ছোটবেলা থেকে। উত্তর বাংলার চা বাগান, আঙরাভাসা নদী, গাছগাছালি দিয়ে সেই গল্পের সূচনা। এরপর একাধারে পঞ্চাশের কোলকাতা, সেই সময়ের বাঙালীদের মনোভাব, কুসংস্কার, সহ-শিক্ষা, মেয়েদের হোস্টেল, সমসাময়িক ছাত্র রাজনীতি সহ আরও গুরুত্বপূর্ণ একাধিক বিষয় উঠে এসেছে সাতকাহনে।
সমাজের নানা কটুক্তি, মনগড়া সংস্কার আর বৈধব্যের বোঝা এড়িয়ে দিপাবলীর নিজের পরিচয় তৈরির গল্প অনুপ্রেরনা হয়ে থাকবে আমার মতো হাজারো নারীর। বই টা পড়তে যেয়ে বারবার মনে হয়েছে কৈশরের শুরুতেই কেনো আমি এটা পড়লাম না! সব মিলিয়ে সাতকাহন তার নিজ জায়গা থেকে অসাধারণ একটা বই। শুধু ব্যক্তিগকভাবে আমার মনে হয়েছে গল্পের শেষ টা আরেকটু সুন্দর আর গোছানো হতে পারতো।
মাঝে মাঝে কোনো কোনো বই প্রচণ্ড ভাবতে বাধ্য করে তোলে। পড়তে পড়তে বই টা বুকের উপর উল্টো করে সেইজে ভাবা শুরু হয় তার যেন কোনো শেষ নেই। সাতকাহন সেরকম একটি বই।
বইটি দীপাবলীর বাল্যকাল থেকে বড়বেলার ছবি তুলে ধরে। সাধীনতার পরে, বাঙালি মেয়েদের গতানুগতিক জীবনধারা থেকে বাইরে বেড়িয়ে, দীপাবলী নিজের পায়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়। সেটা করতে অনেক বাধা পেরিয়ে, নিজের আদর্শের সঙ্গে কোনো সমঝোতা না করে সে সমাজের নিয়ম কানুনের সঙ্গে নানানভবে লড়াই করে যে ভাবে এগিয়ে চলেছে, সেটাই সমরেশ মজুমদার এই বইটি তে স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছেন|
পড়তে পড়তে মনে হয় আমরা যে যে জিনিস আজকাল ভীষন সহজ মনে মেনে নিতে পারি, সেগুলো একসময় ভাবলেও দশটা লোক দশরকম কথা শোনাতো। আবার কিছু কিছু জিনিস আজকের সমাজেও ভীষন ভাবে প্রযোজ্য। যদি কোনো বই তোমার দৈনন্দিন চিন্তাভাবনা কে নিয়ে মনে প্রশ্ন তোলে, তাহলে জেনো বইটি সত্যিই ভালো ছিলো ।
কিছু স্থলে মনে হয়েছে দীপাবলী না বোঝার ভান করেছে। সেটা দিয়েই হয়তো সমরেশ মজুমদার আদর্শের জয়গান গেয়েছেন। মজার ব্যাপার কী, বাসে এক লোক আমাকে বইটা পড়তে দেখে টপ করে স্পয়লার দিয়ে দিয়েছিল, সেটা গ্রন্থ সমালোচনা হিসেবে। বেশ রসিক মানুষ তো বটেই। তারপরও বইটা পড়তে গিয়ে অলোক-বিচ্ছেদের পর্যায়টা যতটা আচমকা হবে ভেবেছিলাম, ততটা হয় নি। আর আমি বইটির ওরিজিনাল কপিই পড়েছি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি থেকে। কোনো ফটোকপি পড়ে লেখক বা প্রকাশককে ঠকাই নি।
মনোরমার প্রতি দীপাবলীর যে কাঠখোট্টা মনোভাব, চুলচেরা ব্যক্তি-বিশ্লেষণ, সেটা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। যেমন: আমার গোলুমোলুর সাথে সকালে ঝগড়া হলে বিকালে গলে যাই।
বইয়ের নাম: সাতকাহন লেখক: সমরেশ মজুমদার জনরা: সমকালীন উপন্যাস
🌼🌼রিভিউ: উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র দীপাবলী, ডাকনাম দীপা। বাবার নাম অমরনাথ। জন্মের পরেই গর্ভধারিণী মাকে হারায় দীপা। পরবর্তী সময়ে তার মাসি মা আর দাদি মনোরমার পীড়াপীড়িতে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে করতে বাধ্য হয় দীপা। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, বিয়ের পরের দিনই বিধবা হতে হয় তাকে। তাই বাধ্য হয়েই বাবার বাড়ি ফিরে আসে সে। আর পাঁচটা বাঙালি হিন্দু বিধবার মতোই জীবন কাটানোর কথা ছিল তার। কিন্তু নিয়তির কাছে হার না মেনে দীপা বেছে নিল স্রোতের প্রতিকূলের পথ। আর এই ক্ষেত্রে তাকে মনোবল দিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে তার মাষ্টার সত্যসাধন বাবু।
নিজের জীবনকে নতুন করে গড়তে, অজানার পথে যাত্রা শুরু করল সে। এক আত্মীয়ের সহায়তায় মাধ্যমিক শেষ করে কলেজে ভর্তি হয় দীপা। শুরুতেই কলেজের হোস্টেলে থেকে পড়াশোনার সুযোগ পায় সে। কলেজে পড়ার সময় বন্ধুত্ব হয় বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে, চেনা জানা হয় এক এক বার এক এক ধরনের মানুষের সঙ্গে। নানা প্রতিকূলতা আসে তার জীবনে কিন্তু তবুও সে এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সে এই লড়াই এ কি টিকে থাকতে পারে? আর ১২ বছর বয়সে তার জীবনে যে দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেটা ভুলে কী দীপা নতুন জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে? দীপার এই সংগ্রামী জীবনের কাহিনী জানতে হলে আপনাকে বইটি পড়ে দেখতে হবে।
🌼🌼পাঠ প্রতিক্রিয়া: বইটি আমি সেই আন্দোলনের সময় অর্থাৎ জুলাই তে শুরু করি। এরপর এর সাথে আমার যাত্রা শুরু হয়। দীপাবলির জীবনের এই সংগ্রাম আর সাথে আমিও যোগ দিই তার এই সংগ্রামকে দেখার জন্য। তবে বইটি যতজন মানুষ পড়েছে সবাই শুধু বইটিতে দীপার সংগ্রামের কথাই বলেছেন। যদিও মূল বিষয়বস্তু একটি মেয়ে হয়েও কিভাবে সংগ্রামী জীবনে টিকে থাকা যায়। তবে আমি আরো যেই জিনিষগুলো খেয়াল করি সেটি হলো সে সময়কার বাংলার মানুষদের অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা, মানুষের চিন্তাধারা, কলকাতার বাঙালি দের রিফিউজি বাঙাল দের প্রতি মনোভাব, নাট্যশিল্প ইত্যাদি। রাজনৈতিক আর ইতিহাস এই দুই বিষয়ের প্রতি আমার আগে তেমন কোনো আগ্রহ না থাকলেও আন্দোলনের সময় থেকে এবং বইটি পড়ার যাত্রায় আমার এর প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। শুধু তাই নয় তখনকার সময়েও উন্নত চিন্তাধারার যেই মানুষগুলো ছিল তাদের মধ্যে একজন সত্যসাধন মাষ্টার এবং মায়ার মা এই দুইজন চরিত্র কে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। মায়ার মা কে তো এক কথায় অসাধারণ লেগেছে।
তবে দীপাবলির সংগ্রামীর সাথে বিদ্রোহী হওয়ার দিকটাও এখা���ে উঠে আসে। অন্যায়ের ক্ষেত্রে আপোষ না হওয়া যেটা আমাকে ভীষণ কেড়েছিল। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দীপার বিদ্রোহী মনোভাব ভালো লাগেনি। যেমন: মেয়েরা কেনো মানুষের ভিড়ে গিয়েও চায়ের দোকানে বসে চা খেতে পারবে না। অন্যায় আপোষ করা এক জিনিস আর মেয়েদের কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকা আরেক জিনিস। সব ক্ষেত্রে দীপা যেভাবে যুক্তি দাঁড় করিয়ে ঠিক,ভুল,ন্যায়,অন্যায় ব্যাখ্যা করতে চাইতো সেটা আমার ভালো লাগেনি। এই ক্ষেত্রে দীপার দিল্লি যাওয়ার সময় ট্রেনে যেই বৃদ্ধার সাথে দেখা হয়েছিল উনি বলেছিলেন, "পৃথিবীর বেশিরভাগ জিনিসেরই যুক্তি খাটে না"। এ��� উক্তি কে আমি সমর্থন করি। সবকিছু আপনি যুক্তি দিয়ে খন্ডন করতে পারবেন না।
তবে এই বই পড়ার সময় আমাকে এক আপু বলেছিলো ওনার বইটির শেষটা ভালো লাগেনি কারণ পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ সুখী হওয়ার যোগ্যতা রাখে। জীবনে একটা না একটা সময় সে সুখী হয়। কিন্তু দীপাবলির ক্ষেত্রে লেখক সুখ জিনিসটা রাখেননি যেনো। এইসময় আমার হুমায়ূন এর কোথাও কেও নেই বইয়ের মুনার বলা একটি কথা মনে পড়ছে " কিছু কিছু মানুষের বোধহয় জন্ম হয় দুঃখ পাওয়ার জন্য।" কিন্তু সুখ একটা আপেক্ষিক জিনিস, এটি আপনার হাতে। দুঃখ আসবেই জীবনে, সুখী হতে হবে আপনাকে। সেই জন্য পথ বেছে নিতে হবে। দীপাবলির যেনো সেই পথ গুলো পেয়েও বার বার হাতছানি করেছে। তবুও বলবো সর্বোপরি বইটি পড়ে আমি শুধু সংগ্রামী আর বিদ্রোহী হওয়া শিখিনি। দেখেছি সেই সময়ের মানুষগুলোর জীবন ধারা, শিখেছি সঠিক সঙ্গ এর খুব প্রয়োজন যেনো এই সঙ্গ আমাকে জ্ঞান অর্জনের পথে সাহায্য করতে পারে এবং শিখেছি রাজনীতি আর ইতিহাসের উপর জ্ঞান রাখাটা ভীষণ প্রয়োজন বটে। মেয়ে হয়ে শুধু শাড়ী, চুড়ি মেকআপ এসব নিয়ে আমি আগে থেকেই কম উৎসাহ প্রকাশ করতাম। কিন্তু এই বইটা পড়ে আরো বুঝতে পারলাম এসব মেয়েলি জিনিসের পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসের উপর জ্ঞান অর্জন করা এবং রাখা ভীষণ জরুরী। পরিশেষে বলবো কোনো বই পড়ার সময় এর মূল বিষয়বস্তুর উপর শুধু নজর না রেখে বাকি দিকগুলোর উপর নজর রাখলে আপনি আরো ভিন্ন ভাবে সবকিছু আবিষ্কার করতে পারবেন বই এর ব্যাপারে।
🌼🌼পছন্দের উক্তি: ১.শোন মা তোমারে একটা কথা বলি, কখনও পিছন দিকে তাকাইবা না। তোমার চেয়ে নিচে যার স্থান তার সঙ্গে হৃদয়ের কথা বলবা না।
২. পুরুষমানুষ চিতায় উঠলেও যদি চোখ মেলার সুযোগ পায় তবে সেটা মেলবে মেয়ে মানুষের দিকে। ৩. আচ্ছা, অতীত কেন উদার হতে পারে না! কেন সে এমন ভাবে রক্তাক্ত করে চলে সমানে।
৪. বিদ্রোহ করতে গেলে নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হয়। নিজেকে প্রশ্ন কর তুমি তার কতটা উপযুক্ত।
৫. মৃত্যু কি সহজ, কি নিঃশব্দে আসে অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায় ------
৬. ভালোবাসা প্রতিমুহূর্তে প্রতিপালিত হতে চায়। তাকে আগলে রাখতে হয়।
৭.একজন বাঙালির হৃদয় যদি রবীন্দ্রনাথ হয় তবে তার মস্তিষ্ক বিবেকানন্দ হওয়া উচিৎ।
৮.তুমি পথিক, পথ তোমার। সেই পথ কোনো রাজা তৈরি করছেন না কোনো অসৎ ধনীর টাকায় তৈরি হয়েছে টা জানার কথা তোমার নয়। পথিকের কাজ পথ ধরে লক্ষের দিকে এগিয়ে যাওয়া
৯.ভালোবাসা হলো বেনারশী শাড়ির মতো, ন্যাপথোলিন দিয়ে যত্ন করে তাকে আলমারিতে তুলে রাখতে হয়, তাকে আটপৌর ব্যবহার করলেই সব শেষ।
🌼🌼বানান আর শব্দের ব্যবহার: বানান আমি মোটামুটি ভুল পেয়েছিলাম। তবে আমি বইটি জন্মদিনে উপহার পাই তাই ঠিক বলতে পারছিনা প্রিমিয়াম প্রিন্ট হতে পরে এটা। শব্দের ব্যবহার সাবলীল ছিল।
“মৃত্যু কি সহজ, কি নি:শব্দে আসে! অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায় l”
ছোট্ট দীপার দীপাবলি ব্যানার্জী হয়ে উঠার পিছনে রমলাসেনের সাথে দেখা হওয়াটা খুব খুব দরকার ছিলো। আমরা ছোট থেকে যতটা না নীতিবাক্য শুনে শুনে শিখি তারচেয়ে বেশি শিখি আমাদের সারাউনডিংসের মানুষের লাইফস্টাইল দেখে।তাই আমাদের প্রোপার আপব্রিঙ্গিংয়ের জন্য আমাদের চারপাশের মানুষগুলা খুবই বড় একটা ভূমিকা পালন করে। সত্যসাধন , মনোরমা, অঞ্জলী কিংবা অমরনাথের মতো মানুষরা হয়তো হুটহাট জীবনে গরম মশলার ফোড়ন দিবে কিন্তু দিনশেষে নিজের স্থিরতা, ব্যক্তিত্ববোধ আর সচেতনাবোধটুকুর লালন নিজেকেই করতে হয়। "ভালোবাসা হল বেনারসী শাড়ির মত, ন্যাপথালিন দিয়ে যত্ন করে আলমারিতে তুলে রাখতে হয়, তাকে আটপৌরে ব্যবহার করলেই সব শেষ।"
"তুমি পথিক, পথ তোমার। সেই পথ কোনো রাজা তৈরী করেছেন না অসৎ ধনীর টাকায় তৈরী হয়েছে তা জানার কথা তোমার নয়।পথিকের কাজ পথ ধরে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া।"
"অন্যের মতের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অবিরত করে যাওয়ার ফলেই তো অশান্তি হয়। মনে না নিয়েও তো মেনে নেওয়া যায়।"
জীবন যাপন করতে গিয়ে একসময় দীপার মনে হয়েছিলো যে তার সাথে যখন কিছু ঘটে না তখন একেবারেই ঘটে না ;আবার যখন কিছু ঘটে তখন একসাথে অনেককিছু ঘটে।সেই সময় আমার মনে হয়েছিলো ," আরেহ , দীপা আমার কথা বলছে কেনো?" কলেজে থাকাকালীন সাতকাহন পড়েছিলাম। অনেক বছর পর আরেকবার পড়লাম। তখন শুধু দীপাকে ফোকাসে রেখেই পড়েছিলাম। বাট এইবার দীপার পাশাপাশি সেই সময়কার সামাজিক,রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থাটাকেও পড়েছি। শেষেরদিকটা অযাচিত টেনে লম্বা করা এবং যত্ন করে দীপাবলিকে দুঃখবিলাশে উৎসাহিত করা মনে হলেও সর্বোপরি বইটা পড়ে একটা ভালোলাগা থেকেই যায়। এমন হেভিওয়েট বই পড়াশেষে মনে হয় ," ঈশ! এখন যদি অথরের সাথে কিছুক্ষণ বসে প্রতিটা চরিত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারতাম!" এজন্যই সমরেশ মজুমদারদের বই পড়তে বিরক্তি কাজ করে না। যখনই সামনের ঘটনা প্রেডিক্ট করে বসি ,তখনই একটা বড়সড় সারপ্রাইজ চলে আসে! The book is in my head and will be in my head for next couple of days for sure! 5/5⭐
মি. সমরেশ মজুমদার সাহেব আমার চিন্তা ভাবনার আঙ্গিক পরিবর্তন করে দিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে পড়তে পড়তে ধৈর্য হারা হয়ে গেছিলাম, ভাবতাম উপন্যাসের শেষটা অনেক সুন্দর অনেক পরিণত হবে, কিন্তু একদমই এমনটা ঘটাতে পারেন নি বা চাননি হয়ত লেখক, আমার মতে। তবে সম্পূর্ণ উপন্যাস জুড়ে দীপাবলির পাশাপাশি কয়েকটি চরিত্রকে হয়ত মজুমদার সাহেব বেশি বোল্ড বা হাইলাইটেড করতে চেয়েছিলেন যেমন পুরো লেখা জুড়ে মায়ার মা, উপন্যাসের শুরুতে দীপার মাস্টার সত্যসাধন বাবু, দীপার দুই বাল্যবন্ধু, দীপার প্রতিবেশীরা বা ধরা যাক দীপার কলেজজীবনে সমসাময়িক পরিবেশ পরিস্থিতি, দীপার প্রথম শশুরের দ্বিতীয় স্ত্রী, দীপার কলেজ জীবনের কিছু বন্ধু, দীপার প্রথম চাকরি জীবনের পরিচিত অর্জুন নায়েক, শেষের দিকের মি. সাহা, দীপার পছন্দের পুরুষদের মধ্যে অলোক সাহেব বা অলোকের বাবা এবং মা, দীপার কর্মস্থলের সহকারী সহ আরও অনেক সমসাময়িক চরিত্র এবং বিষয়।
(উপরের বর্ননায় অনেকের নাম মিস করে গেছি, শুধু মাত্র নামগুলো এই লেখার মুহুর্তে মনে না পড়ার কারনে)
তবে মুল বিষয় হচ্ছে, প্রথমা প্রকাশনার সাতকাহন উপন্যাসের দুটি পার্ট মিলিয়ে ৭২০ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসকে এত সংক্ষিপ্ত সারাংশ করা সম্ভব নয়, অন্তত আমার দ্বারা তো হবে না। বিশাল বিস্তৃত এই উপন্যাসের সময়কাল আমার মনেহয় সদ্য স্বাধীন ভারতের ১৯৫৫/৫৬ - থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধী প্রথম যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখন পর্যন্ত, আর যদি উপন্যাসের স্থানকাল অনুমান করি তা দার্জিলিংয়ের চা বাগান থেকে মুসৌরি থেকে দিল্লি থেকে কলকাতা সহ নেখালি গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত, আর চরিত্রায়নের দিক থেকে বললে মিনিমাম হাজার খানেক চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন সমরেশ সাহেব। আমার মতে সহজ বাংলায় বললে, ভয়ানক বিস্তৃত, ভয়ংকর সুন্দর, অসম্ভব অনুপ্রেরণাদায়ক এবং ইতিহাস সম্পর্কে একটা আবহ পাওয়া সম্ভব সাতকাহন উপন্যাসটা পড়ে।
বইটি আমার খালাতো বোনের কাছ থেকে ধার করে আনা, তবে এমনসব কালজয়ী বই প্রতিটা রুচিবাণ মানুষের সংগ্রহে থাকা উচিত।
দীপার ওপর মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত হয়েছি even though I admired her achievements.
Quotes
🠚 "এক ফোঁটা চোখের জল একশো ফোঁটা রক্তের চেয়ে দামি।"
🠚 "স্বপ্���ের সঙ্গে জীবনের মিল এক লক্ষে একবার হয় কিনা সন্দেহ।"
🠚 "পথ তুমি কার? পথিকের।"
🠚 "ইউ মাস্ট রিমেম্বার দ্যাট ইউ আর ফাইটিং এগেইনসট ডেস্টিনি। কখনও পিছন ফিরে তাকাইবা না।"
🠚 "স্বামী স্ত্রী সন্তান অথবা বন্ধুর মধ্যে যতক্ষণ অল্পস্বল্প সংঘাত হচ্ছে ততক্ষণ তারা একটা মানিয়ে নেবার আবহাওয়া তৈরি করে বাস করতে পারে। কিন্তু যখন ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত স্বার্থে আঘাত লাগে, নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে বলে ধারণা তৈরি হয়, তখন তার মানিয়ে চলার মুখোশটাকে একটানে ছিঁড়ে ফেলতে সে একটুও দ্বিধা করে না।"
🠚 "মেয়েরাই মেয়েদের এক নম্বর শত্রু।"
🠚 "বুকে দুঃখের আগুন যাদের নিরন্তর তাদের তো মিল থাকাই স্বাভাবিক।"
🠚 "ভালবাসাহীন জীবন অর্থহীন।"
🠚 "ভালবাসা এক জিনিস আর পরস্পরকে বুঝতে পারা আর এক জিনিস।"
🠚 "মানুষ যত ক্ষমতার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠে তত সে বন্ধুহীন হয়ে পড়ে।"
🠚 "যুদ্ধ অনেক রকমের হয়। সবাইকে যে একরকম যুদ্ধ করতে হবে তার কোনও মানে নেই।"
🠚 "শাসন শুনতে যতই খারাপ লাগুক যে-মানুষের জীবনে শাসন করার মানুষ না থাকে তার মতো অভাগা আর কে আছে।"
🠚 "জানো ভালবাসা হল সকালের মতো। স্বার্থর লম্বা ছায়া সূর্য ওঠামাত্র ছোট হতে আরম্ভ করে। সূর্য যখন মাথার ওপর তখন ছায়া পায়ের তলায়। ভালবাসার পূর্ণতা তখনই হয়ে যায়। তারপর যত বেলা গড়ায়, ছায়া লম্বা হয়, তত ভালবাসার আয়ু ফুরিয়ে আসে। পৃথিবীতে সবকিছুর মতো ভালবাসার আয়ু বড় ক্ষণস্থায়ী। ভালবাসাহীন সম্পর্ক বয়ে চলা যে কী কষ্টকর!"
🠚 "মানুষের পায়ের তলায় শেকড় আছে। পুরনো জায়গা থেকে শেকড় তুলে নিতে তার যেমন বেশি সময় লাগে না তেমনি নতুন জায়গায় সেই শেকড় বসে যেতেও দেরি হয় না।"
এক সময় মনে হত এই বই পড়ার আগে মৃত্যুবরন করলে জীবন অধরাই থেকে যাবে হ্যা ঠিক শুনছেন!! অনলাইন-অফলাইন বন্ধু-বান্ধব থেকে শুনতে ও দেখতে দেখতে এই বইটা সম্পর্কে আমার এক্সপেক্টেশন এরকমই ছিল, এক্সপেক্টেশন একশো তে একশো পুর্ন হয়নি বাট লেখক আমাকে মোটেও হতাশ করেননি প্রথমাংশে কয়েকবার ধৈর্য বিচ্যুতি ঘটছিল তখন এই বইয়ের পপুলারিটির জন্য আগ বাড়াতে দ্বিধা করিনি আরেকটা কথা না বললেই নয় এই বই অধ্যায়নের সময় অনেক চরিত্রগুলোর কিছু কিছু ঘটনা ও তার প্রেক্ষিতে বেরিয়ে আসা বাস্তবতাগুলো নিজের সীমিত অভিজ্ঞতার ভিতর থেকে মনে হয়েছে তখন মনে হয়েছে লেখক এই বিষয়টা যেন আমার জীবন থেকেই সংগ্ৰহ করেছেন এটা একটা রিয়েল রিয়েল ফিল দিয়েছে এবং এই রিয়েলিটি ফিলিং টা অন্য দশ টা উপন্যাস থেকে বেশ ডিফরেন্ট এবং উপস্হাপন ভঙ্গিটাও যথেষ্ট সাবলীল যা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছে , most important হলো দ্বিতীয় অংশে কখনোই ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি,আই থিংক মনে হয়েছে প্রথমাংশ কাঁচা ও দ্বিতীয় অংশ পাকা হাতের লেখা এ যেন দুই সমরেশ মজুমদার, উপন্যাসটিতে মা মারা যাওয়া ও অল্প বয়সে ই বিবাহ ও বিধবা হয়ে যাওয়া এক দীপার বেড়ে উঠা জীবনসংগ্রাম সফলতা এবং দ্বিতীয়বার বিবাহ এবং দাম্পত্য জীবনে কলহ ও অঘোষিত বিবাহ বিচ্ছেদের কথা উঠে এসেছে নিপুণ ভাবে
তবে এটা মনে রাখা উচিত প্রচলিত নিয়মের বাহিরে চলার অর্থই নারী স্বাধীনতা নয়!! দীপা চরিত্রটা যেহেতু এতো উদার তাই শেষে অলোক কে ক্ষমা করে দিলে উদারতার রক্ষা হতো এবং একটা সুন্দর সমাপ্তি হতো,বাট সমরেশ মজুমদার স্যারের উপন্যাসে এন্ডিং আমাকে কখনো প্রফুল্ল করেনি অন্যগুলোর তুলনায় এটা খারাপ না
This entire review has been hidden because of spoilers.
ভালোবাসা হলো বেনারসি শাড়ির মতো, ন্যাপথলিন দিয়ে যত্ন করে আলমারিতে তুলে রাখতে হয়, তাকে আটপৌরে ব্যবহার করলেই সব শেষ।"
সাতকাহন - এক সাহসী নারীর সংগ্রামের চিত্র। তথাকথিত সামাজিক রাজনীতি, ধর্মীয় গোড়ামি, চাপিয়ে দেওয়া বদ্ধমূল চিন্তাধারার বিরুদ্ধে আপোষহীন এক চরিত্র দিপাবলী। যাকে বারো বছর বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিয়ের দ্বিতীয় দিনেই স্বামী হারিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে এসে তাকে দাড়াতে হয় এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে। জীবনের সূচনাতেই নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে লড়াই করতে হয় বাস্তবতার সাথে। প্রবল আত্মসম্মানবোধ দিপাবলী চরিত্রকে করেছে আকর্ষনীয়। তবে কখ��ো কখনো তাকে বেশ বিরক্তিকরও লেগেছে। নিজেকে বাকি পাচজনের থেকে আলাদা ভাবার মানসিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
অসম্ভব রকমের ভালো লাগার একটি উপন্যাস। এখনও ঘোরের মধ্যে আছি। কি নেই এতে! নারী জীবনের নানা সীমাবদ্ধতা,এক অসাধারণ নারীর একা পথচলা, হারিয়ে যাওয়া প্রেম,বিদ্রোহ, সংগ্রামের চিত্র থেকে শুরু করে সমকালীন ছাত্র আন্দোলন,রাজনীতি,সরকারি চাকরি জীবনের চিত্র তুল�� ধরেছেন লেখক।
বই শেষ করে কত সময় যে চুপচাপ বসেছিলাম খেয়াল নেই। জীবন নিয়ে গভীরভাবে ভাবাবে এই বই। জীবনে বাঁচতে হলে মাথ��� উঁচু করে বাঁচতে হবে। নিজেকে ভালো রাখার জন্য বাঁচতে হবে। নারী জীবনের জন্য দিপাবলী চরিত্র হতে পারে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। বইটি পড়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম মনে হচ্ছে। সমরেশ মজুমদারের এক অমর কীর্তি সাতকাহন।
This entire review has been hidden because of spoilers.
তীব্র জিদ,অপ্রতিরোধ্য,দুর্দমনীয় এমন কয়েকটি উপাদানের আদলে গড়া চরিত্র দীপাবলি। নারী কূলকে কেন্দ্র করে যেসব কুসংস্কার সমাজে ভিত্তি গেড়ে উঠেছে,সেসবের কাছে মাথা নোয়াতে অপ্রস্তুত দীপা।হিন্দু অধ্যুষিত সমাজের শৃংখল তাকে দমিয়ে দিতে ব্যার্থ হয়েছে ক্রমে ক্রমে। চা বাগানের কোয়ার্টার্স এ দীপার দুরন্তপনা শৈশব দিয়ে উপন্যাসের যজ্ঞ আরম্ভ হয়। রাতের প্রহর শেষ হতেই বাড়ির আঙিনা পেরিয়ে শিউলি ফুল কুড়োনোর দৃশ্যে আমারও শৈশবের স্মৃতি উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল অল্প কিছুক্ষণের জন্যে।মা,ঠাকুমার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিশু ও খোকনের সাথে মাছ ধরতে যাওয়া,গাছ থেকে চাপা ফুল পাড়া—এভাবেই সবুজের সমারোহের মধ্যে দীপা বড় হতে থাকে।বয়ঃসন্ধিকালের সিঁড়িতে পা দিতেই এক অসুস্থ ধনকুবের সাথে বলা যায় জোরপূর্বক বিয়ে দেয়া হয় এবং ফুলশয্যার রাতেই বিধবার আটপৌরে শাড়ি দীপার শরীরে জড়িয়ে ওঠে। এখানেই দীপার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।তখন একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে স্বাবলম্বী হয়ে তির্যক চোখের সমাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া। দিঘি থেকে নদী,নদী থেকে সমুদ্র এভাবে দীর্ঘ যাত্রা পাড়ি দিয়েও দীপা লালিত স্বপ্নের সাথে পরিচিত হতে পারেনি।জীবনের এ ভ্রমণে প্রায়ই সে ছিল সাদা পৃষ্ঠার মাঝে একটি বিন্দুর মত একা।মাঝে কিছু উড়ন্ত সম্পর্ক সৃষ্টি হলেও তা স্থায়ী হয়নি।একাকিত্বের যে গুল্মলতা মানসপটে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ওঠেছিল, উপসংহারে এসেও তা থেকে পরিত্রাণ পাইনি দীপা। মূলত দীপা চরিত্রটির নিঃসঙ্গতায় সাতকাহন উপন্যাসের প্রধান অলংকার।
"ভালোবাসা হলো বে��ারসি শাড়ির মতো, ন্যাপথলিন দিয়ে যত্ন করে আলমারিতে তুলে রাখতে হয়, তাকে আটপৌরে ব্যবহার করলেই সব শেষ।" আমার সবথেকে পছন্দের লাইন।
সাতকাহন - এক সাহসী নারীর সংগ্রামের চিত্র। দীপাবলী - তথাকথিত সামাজিক রাজনীতি, ধর্মীয় গোড়ামি, চাপিয়ে দেওয়া বদ্ধমূল চিন্তাধারার বিরুদ্ধে আপোষহীন এক চরিত্র।
মাঝে মাঝে কোনো কোনো বই প্রচণ্ড ভাবতে বাধ্য করে তোলে। পড়তে পড়তে বই টা বুকের উপর উল্টো কর��� সেইজে ভাবা শুরু হয় তার যেন কোনো শেষ নেই। সাতকাহন সেরকম একটি বই। পড়তে পড়তে মনে হয় আমরা যে যে জিনিস আজকাল ভীষন সহজ মনে মেনে নিতে পারি, সেগুলো একসময় ভাবলেও দশটা লোক দশরকম কথা শোনাতো। আবার কিছু কিছু জিনিস আজকের সমাজেও ভীষন ভাবে প্রযোজ্য।
প্রথম খন্ডটা আমার বেশি ভাল লেগেছে। দ্বিতীয় খণ্ডের কিছু কিছু জায়গায় দীপাবলির ব্যবহার বিরক্ত লেগেছে।
দীপাবলী নামের এক লড়াকু মেয়ের গল্প নিয়ে এই সাতকাহন উপন্যাসটি। খুব কাছের মানুষের ভুল আর লোভে যে ভয়ঙ্কর সময়ের মধ্য দিয়ে দীপাবলীকে কাটাতে হয়েছে, তা যেমন পাঠকের মনকে আর্দ্র করে, তেমনি কৈশোর পেরিয়েই যে একাকী লড়াই তাকে করতে হয়েছে, তা পাঠককে অভিভূত করে। সততা আর নিষ্ঠার অনেক মূল্য তাকে দিতে হয়েছে, কিন্তু তবুও যে সাহস সে দেখিয়েছে, তা এত বছর পরেও বিরল। হয়তো পুরোপুরি আদর্শ চরিত্র বলা যাবে না, কিছু আচরণ হয়তো ব্যাখ্যাতীত—কিন্তু যাকে একাকী একের পর এক লড়াই করতে হয়, তার কাজ সবসময় সরল হবে না, সেটাই স্বাভাবিক। প্রিয় লেখক গল্পটি খারাপভাবে শেষ করেননি, কিন্তু উপন্যাসটি শেষ করার পরও কিছুটা হাহাকার রয়েই যায়। এমন একটি সাহসী চরিত্র বাঙালি পাঠকদের উপহার দেওয়ার জন্য প্রিয় লেখকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক কে শেষ পর্যন্ত অনেক নিষ্ঠুর মনে হয়েছে। যদিও সার্বিক দিক বিবেচনা করলে দিপা ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে৷ নিজেকে মাঝে মাঝেই দিপার সাথে রিলেট করতে পারার জন্য পুরা বইটা পড়ার জার্নিটা আমার কাছে অন্যরকম একটা অনুভূতি অনুভব করার অভিজ্ঞতা দিছে। তবে মাঝে মাঝে দিপা কে কেনো কেউ কেউ দিপু বলিয়েছেন লেখক?🙂
This entire review has been hidden because of spoilers.
বই টা আমার কাছে যথেষ্ট ভালো লেগেছে।একটা মেয়ের ছোট থেকে বড় হওয়ার গল্প খুব সুন্দর করে লেখক তুলে ধরেছেন। জীবনের উত্থান পতন সবকিছু।আমার অনেক ভালো লেগেছে
এটা হল সেই রকম একটা বই যা পড়া শুরু করলে শেষ না করে উপায় নাই। আধুনিক মানসিকতার বই। সবার জন্য অবশ্যপাঠ্য। মহিলাদের সচেতন হতে এই বই অনেক সাহায্য করবে বলে আমি মনে করি।