কোন বাঙালির লিখিত বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস আলালের ঘরের দুলাল। ১৮৫৭ সালে এটি বই আকারে বের হলেও মাসিক পত্রিকায় ১৮৫৪ সালেই প্রকাশিত হয়েছিলো। প্যারীচাঁদ মিত্র বা টেকচাঁদ ঠাকুরের লেখা এই বই। এর আগেই অবশ্য হানা ক্যাথেরিন মুলেন্স ফুলমণি ও করুণার বিবরণ লিখেছেন (১৮৫২) তবে সেটি কোন বাঙালির লেখা নয়, তাছাড়া খৃষ্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে লিখিত এই উপন্যাস ছিলো একটি ইংরেজী গল্প/উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে, উপন্যাস হিসেবেও সেটিকে সফল বলা হয় না। প্যারীচাঁদ জীবনে একটিই উপন্যাস লিখেছিলেন, এটি দিয়েই তিনি বাংলা সাহিত্যে চির অমরত্ব লাভ করেছেন।প্রথম মানেই সর্বোৎকৃষ্ট হবে এমন নয়, সাহিত্য মানের বিচারে এই উপন্যাস হয়তো গড়পড়তা, কিন্তু ঐতিহাসিক মূল্য এর সুপ্রচুর।বইটা কিনে যখন বাসায় গেলাম বাবা বললেন আমাদের গ্রামের বাড়িতে এর নাকি একটি প্রাচীন কপি ছিল, আমার বাবার দাদা মানে আমার প্রপিতামহের সংগ্রহ করা। একাত্তর সালে আরও অনেক কিছুর মতো সেই বইটিও নষ্ট হয়ে গেছে। সে যাই হোক, কালীপ্রসন্ন এর হুতুম পেঁচার নকশা পড়ে উনিশ শতকের কলকাতার জীবনযাত্রার একটা ধারণা পেয়েছিলাম, তাই আরেকটু বর্ধিত হলো এই বই পড়ে।বাঙালির নবজাগরনের শতক হলো উনিশ শতক। বিখ্যাত বাঙালিদের বেশিরভাগের জন্ম, বেড়ে ওঠাই ঐ শতকে। সেকালে ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশ সাম্রাজ্য ছিলো বর্ধিষ্ণু, কলকাতা ছিলো তার কেন্দ্র, স্বাভাবিকভাবেই সেকালের বাঙালিরা অন্য অঞ্চলের মানুষের চেয়ে বেশি সুযোগ পেয়েছেন, সাফল্যও পেয়েছেন বেশি, তাই ঐ শতক নিয়ে আমার আগ্রহ চিরকালের, কিন্তু সেই সময়ের জীবনযাত্রা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ বই কমই মেলে। পরবর্তী সময়ের লেখকেরা ঐ সময়কে উপজীব্য করে অনেক ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন, তবে সে হলো পরের মুখে ভাত খাওয়া, প্যারীচাঁদ খোদ সে সময়ের মানুষ, তার অভিজ্ঞতাটা প্রত্যক্ষ, তাই তার চরিত্রগুলো বেশি জীবন্ত, বিশ্বাসযোগ্য। সেকালের বাবু কালচারের একটা প্রতিচ্ছবি এই বই। সামান্য পরিশ্রমে বিপুল বৈভব এর মালিক হয়ে বাবুরা যে কি রকম বিলাস ব্যসনে লিপ্ত ছিলেন, মোসাহেব আর ঠক বাটপারদের কবলে পড়ে বাবুদের বাবুয়ানা যে বেশিদিন টিকতো না তাও তো বেশ বোঝা গেলো। অবশ্য সত্যের জয় আর মিথ্যার পরাজয় এই উপন্যাস এর মূল আদর্শ, গুটিকতক আদর্শবাদী বাংলা সিনেমার নায়ক টাইপের চরিত্রের আমদানিও করা হয়েছে, তবু সব হয়তো একেবারে কষ্ট কল্পনা নয়। কুলীন ব্রাহ্মণ সমাজের দুরবস্থা, লোভী ধর্মব্যবসায়ী, বাটপার আইন ব্যবসায়ী, ঠক দালাল, আরামপ্রিয় অলস জমিদার, অবহেলিত নারী সমাজ, এমনকি অত্যাচারী নীলকর, মোটামুটি অনেক বিচিত্র চরিত্রই এসেছে এই উপন্যাসে। শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থার কথাও এসেছে, এসেছে ধর্মে মতির সুউপদেশও।ভাষায় হয়তো সেকালের ছাপ আছে, আছে ফারসি ও আঞ্চলিক শব্দের বাহুল্যও। তবু বুঝতে তেমন সমস্যা হয় না, পড়তেও না। বাংলা সাহিত্যের এই মাইলফলকটা সব বাংলা সাহিত্যপ্রেমীরই বোধহয় পড়া উচিত, ইতিহাসের কানাগলিও কিঞ্চিৎ ঘোরা হয়ে যাবে সাথে।ভালো লেগেছে।