১৯৮৪ সাল । যে ভয়াবহ ঐতিহাসিক বীভৎসতা, হিংস্রতা জন্ম দেয় আধুনিক যুগের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের। স্বজন হারানোর বেদনা, প্রতিশোধস্পৃহার আকাঙ্খা ছিনিয়ে নেয় তার মনুষ্যত্ব। বিচারের নামে প্রহসন তাকে বাধ্য করে নিজের যাবতীয় মানবিক সত্তা বিসর্জন দিয়ে জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে। বহু বছরের প্রস্তুতির পর সে ফিরে আসে, মনুষ্যরূপী পিশাচদের সংহার করতে। ভারতের অন্যান্য শহরে সফলভাবে তান্ডবলীলা চালিয়ে, পুলিশ-প্রশাসনকে ব্যর্থতার জ্বালায় ডুবিয়ে এবার সে এসেছে কলকাতায়। আর এবার তাকে চিরতরে থামাবার জন্য প্রাণপাত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সিআইডি অফিসার অধিরাজ ব্যানার্জি ও তার পুরো টিম। হাতে আছে তাদের মাত্র বাহাত্তর ঘন্টা। তারা কী সক্ষম হবে এই অজ্ঞাতপরিচয় ক্ষুরধার আততায়ীর হত্যালীলা থামাতে, নাকি এই প্রথমবার অফিসার অধিরাজের টিমকে হতে হবে অবর্ণনীয় হতাশা ও ব্যর্থতার সম্মুখীন?
সায়ন্তনীর গড়িয়ায় বাস। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির শখ। কবিতা ও গদ্য দুইই চর্চার বস্তু।ক্লাস সেভেনে প্রথম প্রকাশ সংবাদ প্রতিদিনের শনিবাসরীয় পাতায়'চশমা' ছোট গল্প। তারপর প্রতিদিন, বর্তমান, সুখী গৃহকোণ, আর ছোটদের পত্রিকা সাহানা আর বাংলা দেশের পত্রিকা ভোরের কাগজে লাগাতার লিখে যাওয়া।
অধিরাজ একটি আস্ত মাকালফল যার এগারো বছরের কিশোরীদের থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত কি করে অষ্টপ্রহর অবাঞ্ছিত অযাচিত sexualisation এর মোকাবিলা করতে হয়। নিতান্ত মানসিক রোগী বলেই এই ধারাবাহিকের বইগুলো শখ করে পড়ি। অসহ্য!!!
ঢাউস সাইজের বই। চরিত্রগুলোর সাথে বেশ একটা বোঝাপড়া হয়ে গিয়েছিল। তাই শেষ করে খারাপই লাগছে। প্লটটা ভালোই। তবে এত লম্বা করার কোন দরকার ছিল না। অনেক অসংগতিও রয়েছে। তবুও একবার পড়ে সময় খারাপ কাটেনি।
প্রথমেই বলে রাখা ভালো, এটি শুধুই পাঠপ্রতিক্রিয়া নয়। পাঠের আগে যে ঘটনা ঘটেছে তারও প্রতিক্রিয়া।
বইটি আমি প্রিবুক করি ১৮ই এপ্রিল, ২০২৪, বাংলা নববর্ষের অব্যবহিত পরে। বই হাতে পেলাম ২৪শে ডিসেম্বর, ইংরেজি নববর্ষের কিছু আগে। যদিও আমার মতে এ দায় সম্পূর্ণই প্রকাশকের। যে বইয়ের পাণ্ডুলিপিই প্রস্তুত নয়, তার প্রিবুক অর্ডার নেওয়া শুধু মূর্খামি নয়, অনৈতিক বলেই আমার মনে হয়।
তবে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার ফল বড় সাংঘাতিক। আমার সহকর্মীরা সাক্ষী আছেন, আমি যে দ্রুততায় ইকার্টের প্লাস্টিক র্যাপার ছিঁড়েছি, মানসী জয়সওয়াল, কিংবা রথীন দাশগুপ্তও এর চেয়ে দ্রুত অধিরাজকে বিবস্ত্র করতে পারতো না। এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
এর মাঝে অবশ্য গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। লেখিকা ফ্যানদের জন্য গ্রুপ বানিয়েছেন। সেই গ্রুপ জয়েনের উল্লাস এখনও আমার প্রোফাইলে জ্বলজ্বল করছে। যদিও নিষ্ক্রিয় হওয়ার জন্য বা অন্য কোনো অজ্ঞাত অপরাধে আমি এখন বিতাড়িত, তবু গ্রুপের উল্লেখ করলাম। কারণ ক্রমশ প্রকাশ্য।
রহস্যের মুখড়াটা দিয়ে রাখি। "কালরাত্রি"-র গল্প শুরু হয় ১৯৮৪-র সেই অভিশপ্ত ৩১শে অক্টোবরে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী খুন হওয়ার পরবর্তী শিখনিধন যজ্ঞে পরিবার পরিজন সব হারায় এক শিশু। জন্ম নেয় এক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। এই গল্প তারই প্রতিশোধ নেওয়ার উপাখ্যান।
এই বইটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং প্রশংসনীয় দিক হল, শিখহত্যার সেই ভয়াল বাহাত্তর ঘণ্টার ডিটেল্ড এবং গ্রাফিক বর্ণনা। দুর্বল হৃদয়ের মানুষের সেসব থেকে দূরে থাকাই ভালো। প্রসঙ্গত, আমাদের ইতিহাস বইগুলি (আমার বিদ্যে দশম শ্রেণী পর্যন্ত) সাধারণত ১৯৪৭ এর ১৫ই আগষ্টে এসেই শেষ হয়ে যায়। তাই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ডায়রি বেশ অচেনাই ঠেকে।
"খুব কাছে এসো না কোন দিন, যতটা কাছে এলে কাছে আসা বলে লোকে..." হিমুর মতো এখন আমারও বিশ্বাস হচ্ছে যে, ভালবাসলে কাছে যেতে নেই। কাছে যাওয়ার প্রথম ধাপ হল, অধিরাজের ছবি দেখা। সে ছবি ব্র্যান্ডন ফ্রেজারের মতো হোক, বা না হোক, আমার কল্পনার মতো তো একেবারেই নয়।
আর যে দ্বিতীয় ভুলটি করলাম, সেটি হল পূর্বোক্ত গ্রুপ জয়েন করা। সেই গ্রুপের ট্র্যাক জাস্টিফাই করতে অর্ণবের মতো একটা সুন্দর, ওয়েল-বিল্ড চরিত্রকে রীতিমতো খুন করা হল, বানানো হল একটা বিরক্তি উদ্রেককর "মেল শভিনিস্ট"। নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় কিছু চরিত্র ইন্ট্রোডিউস করা হল। এমনকি, অর্ণব অধিরাজের কেমিস্ট্রি দেখানো কিছু দৃশ্যও বেশ অপ্রাসঙ্গিক লাগলো।
আমি এককালে লোকজনকে ধরে বেঁধে অধিরাজ পড়তাম। ঊনবিংশ শতকের মিশনারিদের থেকেও বেশি টেনাসিটি নিয়ে প্রচার করলেও একটা ডিসক্লেইমার আমি সবসময় দিতাম, যে অধিরাজ একজন সুপারকপ। সে সব পারে। অ্যাকসেপ্ট দ্যাট, অ্যান্ড দেন স্টার্ট রিডিং। কিন্তু এত কিছু মেনে নেওয়া সত্ত্বেও দু একটা জায়গা এবারে বদহজম হয়ে গেল। বাইকে করে অর্ণবকে উদ্ধারের ঘটনাটি তার মধ্যে অন্যতম। অধিরাজকে নিয়ে মহিলাদের পাগলামির বিবরণ এবার একঘেয়ে লাগছে। অধিরাজের রূপবর্ণনাও রিপিটেটিভ।
তবে একথা স্বীকার করতেই হবে যে, আহেলির চরিত্রের ডেভেলপমেন্ট আমাকে চমকে দিয়েছে। সেই ন্যাকা, পিক-মি মেয়েটি এবারে প্রায় একাই ফরেনসিক বিভাগের সব দায়িত্ব সামলেছে। অর্ণবের ডাউনফল হতাশ করেছে, কিন্তু পবিত্র আচার্য মন জয় করে নিয়েছে। তাঁর "ভাগনে"-টিও। প্রণবেশ লাহিড়ী তুরুপের তাস হতেই পারতেন। কিন্তু অধিরাজকে প্রিচারের দায়িত্বও নিতে হবে, তাই তাঁর চরিত্রটিকে বলি দেওয়া হল। তবে লেখিকা উপন্যাসের তিনটি শিখ নারীকেই অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে এঁকেছেন। যসমিত কৌর, কোমল সিং ভল্লা, এবং অফিসার টুইঙ্কল অরোরা। শেষোক্ত জনকে পাঠক ভালবাসতে বাধ্য।
গোয়েন্দা গল্পে কমিক রিলিফ নিয়ে বিদ্বজনেদের অনেক আপত্তি থাকলেও আমার জায়গাগুলো বেশ ভালো লেগেছে। কয়েকটা চেজিং সিন দুর্দান্ত। বিশেষ করে কৌশানীকে সঙ্গে নিয়ে অধিরাজ যেখানে "পার্কোর" এর খেল দেখায়, সেই অংশটি দমবন্ধ করে পড়ার মতো। অ্যাজ ইউজুয়াল, মার্ডার ওয়েপন এখানেও বিচিত্র। নৃশংসতায় "চুপি চুপি আসছে"-র স্লটার হাউসকে বলে বলে হারাবে "কালরাত্রি"-র *ইন্টেস্টাইনে রজ্জুভ্রম*।
অপরাধীর মনের গহীনের কথা অধিরাজ সিরিজের অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু যখন অপরাধীর বদলে লেখিকা নিজেই তার অপরাধের জাস্টিফিকেশন দিতে শুরু করেন, তখন ব্যাপারটা একটু কেমন ঠেকে। বিশেষ করে তার "সাচ্চা শিখ" হওয়ার প্রমাণ দেওয়া, আর নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন নিয়ে যখন পাতার পর পাতা ভরতে থাকে, তখন একটু বিরক্তি আসে বৈকি। তবে সব মিলিয়ে বইটিকে পাঁচে সাড়ে তিন অনায়াসে দেওয়া যায়। একটু মেদ কমলে (অন্তত শ'খানেক পাতা) হয়তো চার দিতেও দ্বিধা করতাম না।
আজ একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া লিখতে যাচ্ছি। কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখব বলা মুশকিল। কাহিনী সংক্ষেপ খুব ছোট করে বলবো। এবার কলকাতায় দেখা দিয়েছে এক নৃশংস খুনি, যে গলায় জ্বলন্ত টায়ার ঝুলিয়ে একাধিক মানুষকে মারছে। গলায় টায়ার দেওয়াটা ভ্রম মাত্র, আসলে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে অন্যভাবে। আসল মার্ডার ওয়েপন যে কী সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। একটা প্যাটার্ন লক্ষ করে বোঝা যাচ্ছে যে 1984 সালে প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর দাঙ্গায় যে শিখ হত্যা হয়েছিল, সেই দাঙ্গায় অংশগ্রহণ করা কিছু বিকৃত মনষ্ক মানুষের নিরীহ পরিবারকে টার্গেট করছে এই অতি নৃশংস খুনি। অধিরাজ এবং তার সাথে গোটা হোমিসাইড শাখা রাস্তায় নেমেছে এই খুনিকে আটকাতে। ফলস্বরূপ প্রাণ দিতে হচ্ছে গোয়েন্দা ও পুলিশ সংস্থার একাধিক কর্মীকে।
পুলিশি তদন্তের দিক জানতে হলে বইটি পড়তে হবে। এবার আসি আমার ভালো ও খারাপ লাগার কিছু কথায়। খারাপ বলব না, তবে কিছু জিনিস আমার মেনে নিতে একটু কষ্ট হয়েছে। যেমন - 1. অধিরাজকে এইরকম ভীষণভাবে লেডি কিলারের পর্যায়ে না ফেললেই হতো। মানছি মানুষটি দেখতে অনিন্দ্যসুন্দর। কিন্তু তাই বলে অফিসের সব মেয়ে.....? 2. আধিরাজ, পবিত্র, অর্ণব, কৌশানী ও খোদ খুনি যেন অতিমানবের লেভেলে চলে যাচ্ছিলেন। এতটা দৌড় আর মারপিট বোধয় মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় শুধু action movie তেই সম্ভব। 3. একটি শিখ বাচ্চা ছেলের চোখ দিয়ে 1984 দাঙ্গার বিবরণ আছে, যেটা স্বভাবতই খুব দুঃখদায়ক ও অস্বস্তিকর। কিন্তু সেজন্য আমি এটাকে খারাপ দিকের পয়েন্টে রাখিনি। আমি এটা বলছি যে ওই বর্ণনাগুলো শেষের দিকে গিয়ে খুব একঘেয়ে হতে শুরু করেছে। তাই কিছু চ্যাপ্টার আমি প্রায় স্কিপ করে পড়তে বাধ্য হয়েছি। এবার আসি ভালো দিকে। 1. অধিরাজের টিম সবসময় হাসি মজা করে কাজ করতে অভ্যস্ত। তাই খুব গম্ভীর পরিস্থিতি পড়তে পড়তে হঠাৎ হেসে ওঠা হচ্ছে সেই সিরিজ পড়ার একটা অন্যতম অভিজ্ঞতা, সেটা এবারও ছিল। এর জন্য লেখিকার দক্ষতাকে কুর্নিশ। 2. ইনভেস্টিগেশনের ডিটেইলিং অত্যন্ত ভালো। প্রত্যেকটা পদক্ষেপ সাবধানে নেওয়া হয়েছে। এবং সবসময় যে পুলিশের সব আন্দাজ ঠিক হয়েছে সেটা কিন্তু নয়, যেটা রিয়েল লাইফ সিচুয়েশনের সাথে মেলে। 3. এই উপন্যাসে নতুন কিছু চরিত্র ও পুরনো চরিত্রদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে অর্ণবের চরিত্রটি অন্য রূপ নিয়েছে। তার সাথে পবিত্র, আত্রেয়ী ও আহেলি অনেকদিকে বাজিমাত করেছে। কৌশানী, টুইঙ্কল অরোরা নতুন চরিত্র হিসেবে মন জয় করেছেন। 4. লেখিকা তাঁর এই সিরিজে সবসময় কিছু সামাজিক বার্তা দিয়ে থাকেন। এবারে সেটা হয়েছে অর্ণবের মধ্যে দিয়ে। যখন দেখা গেল যে নতুন কলিগ মিস অরোরা একদিকে ডানপিটে, হুটহাট মেরে দেওয়া জাঁদরেল অফিসার, অন্যদিকে তিনি শিখ, তখন তাঁকে অবিশ্বাসের চোখে দেখতে থাকে অর্ণব। সেই অবিশ্বাস ভাঙাতে অধিরজ তাকে যেভাবে বোঝায়, সেটা খুবই সুন্দর ও উপভোগ্য, শিক্ষণীয় বটে। আর কোনো কথা বলার দরকার নেই। নিঃসন্দেহে পড়ে ফেলুন। তবে হ্যাঁ, এটা পড়ার আগে এই সিরিজে চুপি চুপি আসছে আর সর্বনাশিনী এই দুটি উপন্যাস না পড়া থাকলে পড়ে নেবেন, কারণ একাধিকবার এদের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। কোনো জায়গা বেশী একঘেয়ে লাগল স্কিপ করে পড়ুন, কিন্তু অবশ্যই পড়ুন।
কালরাত্রি পাবলিশ হওয়ার কথা ছিল গত বছরের বইমেলায়। প্রায় এক বছর দেরি কেন হল, সেটা বইটা হাতে নিলে বোঝা যায় - প্রায় আটশ পাতার বই! আমার ধারণা লেখিকা স্বয়ং বুঝতে পারেননি বইটা এত বড় হয়ে যাবে।
তবে দের আয়ে দুরুস্ত আয়ে।
অধিরাজ সিরিজের এই নবতম উপন্যাস, সিরিজের শ্রেষ্ঠ লেখাও বটে। তবে আগে সমস্যার দিকগুলো আলোচনা করে নি।
এটা স্ট্যান্ডআ্যলোন গল্প বটে, কিন্তু আগের একাধিক কেসের রেফারেন্স বহুবার টানা হয়েছে, যার ফলে আগের গল্পগুলো পড়া না থাকলে পাঠক এই গল্প সম্পূর্ণরুপে এঞ্জয় হয়ত করতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, অধিরাজের রূপ গুণ বর্ণনা আর মেয়েদের তার প্রতি আকর্ষণের ডিটেলস প্রয়োজনের চাইতে বেশি দেওয়া হয়েছে। এতটা হয়ত না লিখলেও চলত। উই গেট ইট!
তৃতীয়ত, ভাষা তথা ন্যারেটিভ আরেকটু বেটার হতে পারত। কোথাও সন্দেহ হয় যে লেখিকা ইচ্ছেকৃত ভাবেই পেডেস্ট্রিয়ান ভাষা ইউজ করেছেন, কারণ উনি এর চাইতে ঢের সুন্দর ভাষা লেখার ক্ষমতা রাখেন যেটা ওঁর অন্যান্য বই পড়লে বোঝা যায়।
এবার ভাল দিকগুলো।
এই গল্প দুই ভাগে এগিয়েছে। একটা ভাগ হচ্ছে বর্তমান, যেটা একটা পুরোদস্তুর পুলিশ প্রসিডিউরাল। ১৯৮৪ সালের দাঙ্গায় সর্বস্ব এবং তার থেকেও অনেক বেশি খোয়ানো এক শিখ বালক, ২০১৮ সালে ফিরে আসে এক ভয়াবহ সিরিয়াল কিলার / মাস মার্ডারার হিসেবে। দিল্লি, কানপুর ও ব্যাঙ্গালোরে তার খেলা দেখানোর পর সে টার্গেট করে কলকাতা। আর জোডিয়াক কিলারের মতই সে প্রতিবার ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় পুলিশের দিকে। কীভাবে অধিরাজ আর তার টিম এই কিলারকে ধরল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা রয়েছে বর্তমান ভাগটায়। লেখিকা খুবই পরিশ্রম করে লিখেছেন এই ভাগটা - ছোট থেকে ছোট ডিটেলস বাদ দেননি। খুবই এনগেজিং লেখা, পড়তে ভাল লাগে।
তবে এই বইয়ের সেরা জিনিস হল, গল্পের দ্বিতীয় ভাগ, যেটা অতীতের বর্ণনা। সবচেয়ে অস্বস্তিদায়কও বটে। ৩১সে অক্টোবর, ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর উপর গুলি চালানোর পর থেকে, ৩রা নভেম্বর, আর্মি নামার আগে অবধি দিল্লিতে ঠিক কী চলছিল সেটার ভয়াবহ ডিটেলস দেখানো হয়েছে সেই শিখ বালকের চোখ দিয়ে। এ জিনিস এতটাই ভয়ানক, এতটাই কুৎসিত যে পড়তে পড়তে আপনার গা গুলিয়ে উঠবে। কংগ্রেস বেঙ্গলে ক্ষমতায় থাকলে এই বই পাবলিশ করতে দিত কিনা সন্দেহ আছে। ১৯৮৪র দাঙ্গা নিয়ে বাংলায় কোনো ফিকশন আছে কিনা আমি জানি না, তবে আমার পড়া এটাই প্রথম।
বাকি বাঁধাই, অলংকরণ, প্যাকেজিং সবই ভাল। চরিত্রগুলোর মধ্যেকার কেমিস্ট্রি আর ডায়লগ উপভোগ্য। এই কেমিস্ট্রির জন্যই গল্প তরতর করে এগিয়েছে আর ছবি তথা প্রথমদিকের পাতাগুলো বাদ দিয়েও প্রায় সাতশ সত্তর পাতার মূল গল্প পড়তে কখনও বোর ফিল করতে হয় না।
যারা ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা নিয়ে ভালো, স্বাদু লেখা পড়তে চান, তারা এই বইটা ট্রাই করতে পারেন।গোয়েন্দাগিরির অংশ চাইলে এড়িয়ে যান। শুধু "ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ডায়রি" শীর্ষক চ্যাপ্টারগুলো পড়ে নিন। তবে মানসিক ভাবে দুর্বল পাঠকদের এই বই এভয়েড করাই ভাল, কারণ দাঙ্গার বর্ণনা এমন ভাবে দেওয়া আছে যে সেটা সাধারণ মানুষের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে বাধ্য।
৭৮৩ পাতার সুদীর্ঘ উপন্যাস হলেও কোথাও এক ফোঁটা বোরিং লাগেনি। শুধুমাত্র অধিরাজের সুপার হিউম্যান হয়ে ওঠাটাকে যদি ইগনোর করা যায় তাহলে বলাই যায় যে এরকম টানটান উত্তেজনাপূর্ণ থ্রিলার খুব কমই পড়েছি।
এত বাজে আর ফালতু বই এর আগে প্রকাশিত হয়েছে কিনা সন্দেহ। এই বই পড়া মানে অর্থ, সময় ও বুদ্ধির অপচয় করা। যেমন বিকৃত মানসিকতার লেখিকা তেমনি তার লেখা। এত জঘন্য একটা বই যারা ছেপেছে তাদেরও মানসিক স্থিতি নিয়ে প্রশ্ন জাগে। সারা বই জুড়ে শুধু পুলিশের ন্যাকামি আর অপদার্থতা। লেখিকাকে যত শীঘ্র সম্ভব রাঁচিতে পাঠানো উচিত। এই সব আবর্জনার জন্যই এবার বাংলা কোনো সাহিত্য অ্যাকাডেমি পায়নি। অখাদ্য। বদ্ধ উন্মাদের প্রলাপ ছাড়া কিচ্ছু না।
১৯৮৪ এক ঘটনা বহুল বছর ,সে বছর ইন্দিরা গান্ধীকে তার বিশ্বস্ত দেহরক্ষীদের মধ্যে দুজন শিখ দেহরক্ষী তাকে গুলি করে হত্যা করে, মৃত্যু হয় ইন্দিরা গান্ধীর, তার সাথে সাথে সারাদেশ জুড়ে শিখদের উপর এক কালরাত্রি নেমে আসে। সেই দুজন গাদ্দারকে শাস্তি দেওয়ার বদলে সারা শিখ জাতির ওপর নেমে আসে এক বিপর্যয়, শিশু ,মহিলা, বয়স্ক ,পুরুষ কেউই বাদ যায় না এই বিপর্যয়ের হাত থেকে। কিন্তু সবথেকে হাস্যকর ব্যাপার হলো যারা বা যাদের জন্য শিখদের এই অবস্থা তাদের সেই সময়ের সরকার তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে এবং সর্বত্র দেখানো হয়েছে সামান্য দাঙ্গা লেগেছিল এবং সেটিকে আয়ত্তে আনা গেছে। কিন্তু দিল্লিতে সেই বাহাত্তর ঘন্টা মধ্যে ভারত থেকে শিখ জাতি প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে যে কজন সেই সময় নিজেদের প্রাণ বা সেই মফ থেকে নিজেদের বাঁচাতে পেরেছিল তারা আজীবন সেই বাহাত্তর ঘন্টা কে কোনদিনও ভুলতে পারবেনা বলা ভালো পারেনি। প্রায় ৩২ বছর পর ভারতের নানান জনবহুল শহরে হঠাৎ এক শিখের আবির্ভাব ঘটে যারা সামনে থেকে তাকে দেখেছে তারা তাকে কোনোভাবেই মানুষ ভাবতে পারেনা ,কারন এত অস্বাভাবিক বলা ভালো ভয়ংকর কোন মানুষের পক্ষে হওয়া সম্ভব নয়। সে যেন সেই ১৯৮৪ সালের ধ্বংসলীলা থেকে উঠে আসা কোন মৃতদেহ, একের পর এক জনবহুল শহরে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কিছু পরিবার সে শেষ করে ফেলে এবং সব থেকে আশ্চর্যজনক ব্যাপার ঘটনাগুলি সে কিভাবে ঘটাচ্ছে বা আদৌ খুনি সে কিনা এটা পুলিশের খুঁজতে খুঁজ��েই পরিবার গুলি প্রায় শেষ এবং অন্য শহরে তার আগমন ঘটে। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একদিন বার্নিং শিখের আগমন ঘটে কলকাতায়। স্বাভাবিক ভাবে কলকাতার পুলিশ মহল নড়ে চড়ে বসে এবং সিআইডি হোম সাইডের উপর সম্পূর্ণ দায়িত্ব পড়ে যাতে তারা খুনিকে ও খুনের টার্গেট পরিবারগুলিকে বাঁচাতে পারে, এখান থেকে শুরু হয় আসল গল্প। বার্নিং শিখ ও সিআইডি home site এর অফিসার অধিরাজের মধ্যে টানটান যুদ্ধ। কি যুদ্ধের ফলাফল বা এই খুনিটি কে? যে হঠাৎ করে ৩২ বছর আগে ঘটনাটিকে আবার পুনরায় সৃষ্টি করছে বা তার টার্গেটই পরিবার গুলি কোন কোন পরিবার? অন্যান্য রাজ্যের বড় বড় পুলিশ অফিসাররা তাকে ধরতে পারেনি এবং সেই পরিবারগুলিকেও বাঁচাতে পারেনি উপরন্ত কয়েক হাজার নির্দোষ অফিসার এই বার্নিং শিখের হাতে মৃত্যুবরণ করেছে। অধিরাজের কি একই ভবিষ্যৎ সেটা জানতে হলে উপন্যাসটি পড়তে হবে।
লেখিকার অধিরাজ সিরিজ আমার সাথে সাথে আমার ঠাম্মারও খুব পছন্দের ,তাই আজকে আমি আমার পাঠ অনুভূতি না লিখে ঠাম্মার পাঠ অনুভূতি তুলে ধরব ,বা বলা ভালো তুলে ধরার চেষ্টা করব, আমরা ইতিহাসে পড়ে এসেছি অন্যান্য জাতিরা এসে হিন্দুদের উপর অত্যাচার করেছে এবং তাদের ভিত শক্ত করেছে কিন্তু আমরা ভুলে যাই আমরা হিন্দুরাও কম অত্যাচার করিনি এই দেশের অন্যান্য জাতের মানুষের উপর। দুজন গাদ্দারের জন্য সারা শিখ জাতির ওপর দিল্লিতে যে হত্যা লীলা সৃষ্টি হয়েছিল তা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই যে বইটা পড়ে জিনিসগুলো আবার উপলব্ধি হওয়া ঠিক এখানেই লেখিকা সফল। ভালো মন্দের বিচার আমি আপনাদের উপর ছেড়ে দেবো, যারা পড়েছেন জানাবেন কেমন লেগেছে বইটা পড়ে।
বেশ গতিময়। কিছু অসহনীয় ন্যাকামি মার্কা ডায়ালগ আছে, বেশ কিছু জায়গায় টেনে লম্বাও করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা গেছে। তেমন কোন গোঁজামিলও নেই। সবচেয়ে বড় পাওনা হলো ১৯৮৪ সালের ইন্ডিয়াব্যাপী শিখ গণহত্যার মর্মান্তিক বিবরণ পাওয়া গেছে বইটায়। উপমহাদেশের লোকজনের মাঝে খুন-ধর্ষণের মত ভয়াবহ প্রবণতা দেখা গেছে মাঝে মাঝেই; ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশিদের উপর, ১৯৮৪তে ভারতে বিশেষত দিল্লিতে, এরপর মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে গুজরাটে। আপাত ম্যাদামারা দেখতে হলেও এ অঞ্চলের লোকের মাঝে যে পিশাচ লুকিয়ে আছে তা এসব গণহত্যা ও গণধর্ষণের ভয়ঙ্কর বিবরণ পড়লেই বোঝা যায়। লেখিকা এজন্য একটা ধন্যবাদ পেতে পারেন। তবে ইন্দিরা গান্ধীর দিকে বাড়াবাড়ি ভক্তি এবং খালিস্তান আন্দোলনের দিকে ব্যাপক বিরাগ লক্ষণীয়; ব্যক্তিগত অনুরাগ-বিরাগ উপন্যাসে না এলেই ভাল হতো।
অবশেষে পড়া শেষ হলো কালরাত্রি। লেখিকা লেখনী নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই তাও নিজস্ব প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করলাম।
আমার মনে হয়েছে, চাইলেই লেখিকা বইটার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩০০-৩৫০র মধ্যে শেষ করতে পারতেন। কোথাও যেন টেনে টেনে গল্পকে লম্বা করা হয়েছে। অধিরাজের রূপ আর গুন নিয়ে পড়তে পড়তে বিরক্ত লাগছিল একটা সময় পর। পাতার পর পাতা অর্ণব আর অধিরাজের কেমিস্ট্রি পড়ে অস্বস্তি লাগছিল।
প্রশংসার বিষয় বলতে গেলে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ডায়েরি চ্যাপ্টার গুলো খুবই ভালো।পড়তে পড়তে অনুভব করা যায় এমনকি চোখের সামনে ভেসে উঠবে কি হয়েছিল তখন এতো সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন লেখিকা।
নিজস্ব মতামত। আপনাদের পড়ে ভালো লাগতেই পারে তাই চটে যাবেন না।
অধিরাজ সিরিস এর সবকটি গল্পই আমার খুব পছন্দের। যদিও কালরাত্রি বইটি কিনবার আগে কয়েকটি নেগেটিভ রিভিউ পড়েছিলাম। কিন্তু বইটা শেষ করার পর মনে হলো ভাগ্যিস ওই নেগেটিভ রিভিউগুলোকে পাত্তা না দিয়ে বইটি কিনে নিয়েছিলাম। এতো সুন্দর ভাবে লেখিকা গল্পটিকে উপস্থাপন করেছেন যে কোনো কথা হবে না। আমারতো দারুন লেগেছে। বিশেষত এই সিরিজের প্রত্যেকটি চরিত্রকে লেখিকা এতো সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন যে কোনো কথা হবে না । শুধু একটাই কথা অধিরাজ ব্যানার্জী এর সৌন্দর্জের বর্ণনতা আমার মনে হয় একটু বেশি একঘেয়েমি হয়ে যাচ্ছে।