২০০৮ সালে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘গরিবি অমরতা’ দিয়ে বাংলা গল্পের পাঠককে চমকে দিয়েছিলেন সুমন রহমান। ‘নিরপরাধ ঘুম’ তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ। তিনি লেখেন খুব কম, কিন্তু মনে দাগ কাটার মতো করে লেখেন। সমকালের প্রখর ও মেধাবী পর্যবেক্ষণ হাজির আছে এই বইতেও। আমাদের জীবনের নীরবে এড়িয়ে চলা অংশ তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু। তাঁর গল্প একই সঙ্গে তীব্র ও সংবেদনশীল। এর পাশাপাশি অনিঃশেষ আতঙ্ক, শান্ত প্রবঞ্চনা আর বিপন্ন যৌনতা গল্পগুলোকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
জন্ম ১৯৭০ সালে, ভৈরবে। পড়াশোনা করেছেন দর্শনশাস্ত্র, উন্নয়ন অধ্যয়ন ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নে। প্রবন্ধ বেরিয়েছে দেশ-বিদেশের সুপরিচিত জার্নাল ও সাময়িকপত্রে। তাঁর ‘নিরপরাধ ঘুম’ গল্পটি কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় উঠে এসেছে। কমনওয়েলথ পুরস্কারের ইতিহাসে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা তথা ইংরেজি-ভিন্ন যেকোনো ভাষা থেকে এটি প্রথম ঘটনা। সুমন রহমান ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের গণমাধ্যম অধ্যয়ন ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক।
মাত্র ৬টা গল্প। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে তো টিপিক্যাল বইয়ের চেয়ে ছোটই, পেইজও অনেক কম (মাত্র ৯৪)।
বইটার দোষ শুধু এটুকই। ছোটগল্পের পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখতে আমার সবচেয়ে কঠিন লাগে৷ তবু এই বইকে শুধু তারা দিয়ে কী করে শেষ করে দেয়া যায়?! প্রথম গল্প "আমার যত ভণিতা, জিনিয়াকে নিয়ে"। শুরুতেই লেখক একটা ধাঁধায় ফেলে দিলেন। জিনিয়ার গল্পটা নাকি খুব সাদামাটা আর তাতে হিস্যা চায় প্রায় সবাই - এমনকি তার তিন মাসের বয়ফ্রেন্ডও। ভণিতা ইত্যাদি বাদ দিয়ে বললে গল্পটা জিনিয়ার সেলিব্রেটি হয়ে উঠার। এরপর আছে এই বইয়ের নাম গল্প "নিরপরাধ ঘুম"। আমার কাছে সবচেয়ে ইমোশনাল গল্প এটাই মনে হয়েছে। বীমা কোম্পানির কথকের বয়ানে "নীল হিজাব" গল্পটার শেষে শ্লেষের হাসি মুখে একটু ফুটবেই। "একটি রোহিঙ্গা উপকথা" গল্পে আশ্চর্য ভাবে আলাল রূপে মহাকবি আলাওলকে আরাকান থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনলেন। "হাবা যুবকের হাসি" খুব সুন্দর একটা গল্প, খুব সাহসীও বটে। শেষ গল্পটা আমার একটু কম প্রিয়, "সুপারহিরো পরিবারে একটা খুব অর্ডিনারি পাতাঝরা দিন"।
গল্পগুলো খুব পরিচিত সময়ের বলা যায়- বড় আকারের অ্যান্ড্রয়েড ফোন আছে, আছে ডেইলি সোপ অপেরা, ক্রসফায়ার, ফেইসবুক, রোহিঙ্গা, LGBTQ ও এসেছে। তবে কোথাও পাঠককে "educate" করার সচেতন চেষ্টা আমি দেখিনা লেখকের । কথাটা ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব কিনা জানি না - গল্পের চরিত্রগুলোকে মানবিক লাগে ঠিকই, তাই বলে অযথা খুঁচিয়ে পাঠকের চোখের পানি বের করারও কোন প্রয়াস নেই। story teller এর জায়গায় লেখক বেশ সফল হয়েছেন বলেই আমি রায় দিবো।
একটি ছোটগল্পের বইয়ের সবগুলো গল্প প্রায় ক্ষেত্রেই আপ টু দ্য মার্ক হয় না; এটি গল্পগ্রন্থের ভালো দিক নাকি খারাপ দিক, সেই আলোচনায় না যাই। তবে আমার মতো কুঁড়ে পাঠকদের জন্য ভালো দিক হলো, লম্বা সময়ের বিরতি দিয়ে গল্পগুলো পড়লেও মনোযোগ সেভাবে নষ্ট হয় না। (উপন্যাসের ক্ষেত্রে যা প্রায়শই ঘটে থাকে)
এই বইয়ের নামগল্প, যেটি কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত হয়েছিল, পড়া ছিল আগেই। সুমন রহমান ভালো লেখক, তা জানতাম তখন থেকেই। বইয়ের বাকি পাঁচখানা গল্প পড়লাম প্রথমবারের মতো। ভালো লাগল সবক'টাই। সবচেয়ে ভালো লেগেছে 'সুপারহিরো পরিবারে একটা খুব অর্ডিনারি পাতাঝরা দিন'। দু'নম্বরে স্থান পাবে 'একটি রোহিঙ্গা উপকথা'। 'হাবা যুবকের হাসি' খুবই সাহসী একটি গল্প, যার আঙ্গিক ও বয়ান দারুণ। এগুলোর সাথে তুলনা করলে কিছুটা সাদামাটাই মনে হয় 'আমার যত ভণিতা, জিনিয়াকে নিয়ে' শিরোনামের গল্পটিকে। সবশেষে উল্লেখ করতে চাই হিজাবের আড়ালে একজোড়া চোখ জাহির করা রোকসানা কিংবা ফাতেমার গল্পটির কথা, লেখক যেটির নাম দিয়েছেন 'নীল হিজাব'। দারুণ লেগেছে এ গল্পটিও।
নিরপরাধ ঘুম পাঠশেষে আরো একটি বই যুক্ত হলো পছন্দের গল্পগ্রন্থের তালিকায়, সেই সাথে প্রিয় লেখকের তালিকায় স্থান পেলেন আরো এক সমকালীন গল্পকার।
ছোটগল্পের সংকলন পড়তে আমার বরাবরই অনীহা। কারণ আমার পাঠক মনের সিন্দুকে ‘ছোটগল্প সংকলনের বেশিরভাগ গল্পই ভালো হয়না’র আস্তরণ পড়েছে। তাই বলা চলে, ছোটগল্পের সংকলন আমি কিনি না। ‘নিরপরাধ ঘুম’ও আমি কিনিনি, উপহার দিয়েছে 'বইপোকাদের আড্ডাখানা' গ্রুপের একজন বিখ্যাত মেম্বার (মতান্তরে কুখ্যাতও বটে), যার রিভিউ পোস্টের অ্যাগেইনেস্টে কুটি কুটি টাকাওয়ালা মিডলক্লাস ফ্যামিলির লেখক মহল থেকে ভিডিও বিবৃতি আসে। এহেন হোমরাচোমরা ব্যক্তির কাছ থেকে গিফট পেয়েও জড়তার কারণে বইটা ধরা হয়নি। তবে একদিন সাহস করে হাতে নিয়েই ফেললাম বইটা। টার্গেট; স্রেফ একটা গল্প পড়বো৷ ওটা অ্যাভারেজের চেয়ে একটু বেশি ভালো হলেই আমি কন্টিনিউ করবো, নতুবা ‘সি ইউ নট ফর মাইন্ড’। দু পৃষ্ঠা এগুতেই আমি যখন দেখলাম লেখক লিখেছেন,
“পৃথিবী যে গোল, আমি সেটা প্রথম টের পাই মিডিয়া হাউসে চাকরি করতে আসার পর। শক্তির নিত্যতার সূত্রেরও প্রমাণ পাই একই সাথে। তবে এই নিত্যতার ফর্মুলায় 'শক্তি' মানে 'প্রডিউসার'। ওয়ান্স আ প্রডিউসার, অলওয়েজ আ প্রডিউসার। প্রডিউসার জন্মও নেয় না, ধ্বংসও হয় না।”
তখনি আমি হুকড হয়ে গেলাম। বুঝলাম, অভিনেতা অপূর্বর মত বছরের বছরের পর একই বস্তাপঁচা গল্পে কাজ করার যে বিরল প্রতিভাটা, ওটা ওনার নেই। উনি বরং শিল্পীর ইন্টেলেকচুয়াল মিনিং এ একটু অন্য টোনে লিখেছেন যেখানে প্রতিটা গল্পের ভাষা এবং উদ্দেশ্য স্পষ্ট হলেও পাঠকের মাঝে জ্ঞান দেবার কোন প্রচেষ্টা তার লেখায় দেখা যায়নি। দেখা যায়নি পাঠককে আবেগে ভাসিয়ে দু-ফোঁটা চোখের জলে নিজের নামটা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাও। উনি বরং চেয়েছেন, সোজাসাপ্টা গল্প বলে যেতে। সবগুলো গল্পেই উনি সেটা করতে পেরেছেন বলে আমি মনে করি।
তা সত্ত্বেও কেউ যদি আমাকে বলে, এ সংকলনের সবচাইতে ভালো লেগেছে কোন গল্পটা আমি নাম নেবো, ‘হাবা যুবকের হাসি’র। LGBTQ নিয়ে লেখা গল্পে আবেগ এমনভাবে উঠে এসেছে এই গোত্রের মানুষের সাইকোলজি বুঝতে না পারা আমিও তাদের মানবিক অনুভূতি অনুভব করতে পেরেছি। একজন লেখক হিসেবে পাঠকের সাথে এভাবে কানেক্ট করতে পারাটা যে লেখকের কত বড় গুণ তা বলাই বাহুল্য। এর পরের ভালোলাগার গল্প ‘আমার যত ভণিতা, জিনিয়াকে নিয়ে’। ওপরে বোল্ড করা কোটেশনটা এ গল্পটা থেকেই নেয়া। মিডিয়াপাড়ায় মানুষের দিনলিপির বর্ণনার পাশাপাশি সুমন রহমান নিজের দর্শন ডার্ক হিউমার মধ্য দিয়ে গল্পে বুনে গেছেন।
এরপর ‘নিরপরাধ ঘুম’, ‘একটি রোহিঙ্গা উপকথা’, ‘নীল হিজাব’ সবগুলো গল্প কি বোঝাতে চেয়েছে সেটা বুঝতে পারলেও ‘সুপারহিরো পরিবারে একটা খুব অর্ডিনারি পাতাঝরা দিন’ গল্পটা আমি বুঝতে পারিনি। তাই ওটা ভালো লেগেছে নাকি খারাপ লেগেছে সে বিষয়ে কথা বলা অর্থহীন।
তবে শেষ গল্পের দর্শন যেমনই হোক, প্রতিটা গল্পের মতো এ গল্পেও ছিলো দারুণ এবং সহজ আধুনিক ভাষার ব্যবহার। সহজ ও আধুনিক কথ্য ভাষা ব্যবহার করলেও তার লেখাটা মোটেও হালকা হয়ে যায়নি বরং তা আমার মতো কম জ্ঞানসম্পন্ন পাঠককে আরো বেশি ছুঁতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে যারা লেখার মাঝে ইংরেজি শব্দ একেবারে দুচোখে দেখতে পারেন না তারা এ বইয়ের ক্ষেত্রে সাবধান। তবে ‘ওয়ান্স আ প্রডিউসার, অলওয়েজ আ প্রডিউসার’ টাইপের চলমান কথ্য ভাষার ডায়লগ যদি পাঠক নিতে পারেন তবে তারও আমার মতো সমস্যা থাকার কথা না। ভাষা ছাড়াও তার লেখার মাঝে সহজাত ভাবে এসেছে ডার্ক হিউমার এবং এই ডার্ক হিউমারের প্রয়োগ ছিলো একদম ঠিকঠাক।
সব মিলিয়ে বাংলা সাহিত্যে নতুন লেখকদের মাঝে ওনার মতো শক্তিশালী একজন লেখক আছেন অথচ পাঠক হিসেবে আমি ওনার নামই জানি না, এটা পাঠক হিসেবে আমার ব্যর্থতা। এরকম ব্যর্থতা যাতে আপনারা এড়াতে পারেন সে উদ্দেশ্যেই এই রিভিউ পোস্ট। এ জায়গায় আবারো কুখ্যাত ভাইটিকে ধন্যবাদ, বইটি গিফট করে আমাকে পড়ার আর আপনাদেরকে জানানোর সুযোগ করে দেয়ার জন্য। যারা বইটি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছেন তারা জেনে রাখুন, ২০১৮ সালে প্রথমা প্রকাশ থেকে বের হওয়ার ৯৪ পৃষ্ঠার এই বইটির ৬ টা গল্পের মুদ্রিত মূল্য ৩৩.৩৩ টাকা/গল্প।
ও ভালো কথা, সুমন রহমানের 'নিরপরাধ ঘুম' পড়ে আমার সে ‘ছোটগল্প সংকলনের বেশিরভাগ গল্পই ভালো হয়না’র আস্তরণে ১০০ লেবুর শক্তির ঘষা লেগেছে। ফলাফল, ময়লা প্রায় কিলিয়ার।
ও ভালো কথা ২, বইটি কিন্তু ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা ১৪২৪ পুরস্কারপ্রাপ্ত’।
নিরপরাধ ঘুম, লেখক সুমন রহমানের নতুন বই। প্রায় ১৯ টাকা দরে মোট ১৩৫ টাকার বিনিময়ে আপনি পাবেন সাত সাতটি ছোট গল্প। যা লেখা হয়েছে ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে।
গরিব পাঠক তাই বই কেনার আগে আর্থিক হিসাব এবং বই পড়া শেষে টাকা উশুল হয়েছে কিনা তার হিসাব নিকাশ করতে হয় বেশি। উশুল না হলে, সুখ না পেলে, লেখককে মৃদু বকা দিয়ে, বাপকে ধন্যবাদ জানাই এত দয়াবান হওয়ার জন্য। কিন্তু সুমন রহমানের এই বই কি আমাকে সুখ দিতে পেরেছে?
বইয়ের প্রথম এবং আমার দ্বিতীয় প্রিয় গল্প ছিল 'আমার যত ভণিতা, জিনিয়াকে নিয়ে'। একটা মিডিয়া হাউস আর তার সাথে জড়িত কয়েকটা প্রানের গল্প এটি। উত্তম পুরুষে লেখা গল্পটিতে মিডিয়া হাউসকে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এভাবে, "পৃথিবী যে গোল, আমি সেটা প্রথম টের পাই মিডিয়া হাউসে চাকরি করতে আসার পর। শক্তির নিত্যতার সূত্রেরও প্রমাণ পাই একই সাথে। তবে এই নিত্যতার ফর্মুলায় 'শক্তি' মানে 'প্রডিউসার'। ওয়ান্স আ প্রডিউসার, অলওয়েজ আ প্রডিউসার। প্রডিউসার জন্মও নেয় না, ধ্বংসও হয় না। রূপান্তর হয় কি না, তা অবশ্য পরিষ্কার বলতে পারব না।"
এই গল্পের অন্যতম চরিত্র জিনিয়া, যার স্বপ্ন থাকে নায়িকা হওয়ার। কিন্তু সে জানেনা রঙিন দুনিয়ার পেছনটা কত সাদাকালো। সে কি পারবে অবশেষে?
দ্বিতীয় গল্পের নাম 'নিরপরাধ ঘুম', প্রধান চরিত্র কাঠ ব্যবসায়ীর ছেলে রাশেদের কাছ থেকে 'কথিত গ্রেনেড উদ্ধার' করার পরে পুলিশ যখন বলে, "বাপের করত কাঠের ব্যবসা আর পোলায় করে লোহার ব্যবসা! বাপকা বেটা!" হাসতে গিয়ে প্রান যায় যায়। কিন্তু পুরো গল্পটা রীতিমত বিষণ্ণতায় ভরপুর।
এরপরের গল্পগুলো রীতিমত অন্ধকারচ্ছন্ন। এর মধ্যে 'নীল হিজাব' গল্পটি ইনস্যুরেন্স ব্যবসা, কাশেম বিন আবু বকর, মধ্যবিত্ত সমাজ ইত্যাদি নিয়ে বেশ ভালো লাগার গল্প হয়ে উঠেছে আমার।
আমার সবথেকে প্রিয় গল্প ছিল 'হাবা যুবুকের হাসি' গল্পটা। অনেকদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে খুঁজে পাওয়ার গল্প। কিন্তু শুনতে সাধারণ মনে হলেও অতটা সাধারণ না। লেখক এখানে রীতিমত 'ডার্ক' হয়ে উঠে।
সুমন রহমানের ঠান্ডা হিউমার শুরু থেকেই আমাকে আকৃষ্ট করেছে। বেশিরভাগ গল্পের শেষ পরিণতি ঠিক করার স্বাধীনতা লেখক পাঠকের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, পেশায় শিক্ষক এই লেখক পুরো বইজুড়ে তার অযথা পাণ্ডিত্য জাহির করেননি। যা বেশ ভালো লেগেছে।
তবে পুরো লেখায় বাংলা ইংরেজির মাত্রাতিরিক্ত মিশ্রন রীতিমত চক্ষুযন্ত্রণার কারণ হয়েছে আমার। কিন্তু দিনশেষে প্রতি পৃষ্ঠার দাম প্রায় দেড়টাকা হলেও ৯৪ পৃষ্ঠার এই বইটি আমাকে বেশ সুখ দিয়েছে।
এ বছরে আমার পড়া অন্যতম সেরা গল্প সংকলন "নিরপরাধ ঘুম"। বইয়ের প্রতিটি গল্প সমাজের একেকটা ডার্ক সাইড কে তুলে আনছে। এখানে, গল্পের নায়ক নিজের ভাল লাগার মানুষকে বসের অফিসে পাঠাতে চায় কেননা এর সাথে প্রমোশন সম্পর্কিত কিংবা কেউ বা নিজের পরিচয় নিয়ে প্রতারণা করে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত প্রতারককারীর সাথেই। পেডোফিলিয়া, অটিজম, সমকামীতার মতন বিভিন্ন জিনিস মেটাফোর কিংবা সরাসরি গল্পে উঠে এসেছে। সুমন রহমান সাহেবের লেখা গল্পের গাঁথুনি চমৎকার। সুনিপুণভাবে তিনি ক্রসফায়ারের মতনও ভয়াবহ জিনিসটাকে গল্পের আকারে তুলে ধরছেন। দুর্দান্ত একটা বই। রেকমেন্ডেড।
সুমন রহমান গল্পকার হিসেবে স্বাতন্ত্র্যের দাবীদার।গল্পের বিষয়বস্তুে রয়েছে দারুণ বৈচিত্র্য, ন্যারাটিভ অত্যন্ত চমৎকার। মনে দাগ কেটে যায়।সুমন রহমান আরো পড়তে আগ্রহী।
‘গরিবি অমরতা’র পর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘নিরপরাধ ঘুম’ প্রকাশে সুমন রহমান সময় নিয়েছেন পাক্কা দশ বছর। ছয়টি ছোটগল্প সংযোজিত একটি গ্রন্থের জন্য সময়টা অত্যন্ত দীর্ঘ। পরবর্তী গল্পগ্রন্থের জন্যও যদি সুমন রহমান দশ কিংবা তারও বেশি বছর নেন তাতেও তাঁর ভক্তপাঠকদের অধৈর্য হওয়া মানাবে না। কেননা, ‘নিরপরাধ ঘুম’-এর মতো আদর্শ এক গল্পগ্রন্থের জন্য এত সময় লাগাটাকে সংগত বলেই মনে করি।
আমার কাছে এ গ্রন্থের সবচেয়ে ভালোলাগা গল্প ‘সুপারহিরো পরিবারে একটা খুব অর্ডিনারি পাতাঝরা দিন’। তারপর আসবে ‘একটি রোহিঙ্গা উপকথা’। তৃতীয়তে রাখব ‘নীল হিজাব’কে। এ তিনটির পাঠ-অভিজ্ঞতা অভূতপূর্ব। ‘হাবা যুবকের হাসি’ অত্যন্ত সাহসী একটি গল্প। সমকামিতাকে বিষয় করে এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের মধ্যে এর আগে শুধুমাত্র পারভেজ হোসেনকে কলম ধরতে দেখেছি। নামগল্প ‘নিরপরাধ ঘুম’-এর যত নামডাক শুনেছি (গল্পটি কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত ছিল, ইংরেজির বাইরে যেকোনো ভাষার গল্পের ক্ষেত্রে যা প্রথম) সে অনুযায়ী আহামরি লাগেনি। ‘আমার যত ভণিতা, জিনিয়াকে নিয়ে’ বাকিগুলোর তুলনায় ম্লান লাগলেও এ গ্রন্থ থেকে এটাকে বিযুক্ত করে নিয়ে বিচার করলে দেখেছি এটাকেও তখন বেশ ভালো বলে রায় দিতে হয়।
ছোটগল্পের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের মাঝে একটা বৈশিষ্ট্য যদি হয় যে, অল্প কথা এবং পরিমিত শব্দ ব্যবহার করে গভীর কোনো অর্থকে বোঝানো। তাহলে বলতে হয় এই গল্পগ্রন্থের বেশিরভাগ গল্পের মাঝেই সেই প্রভাবটি রয়েছে। প্রতিটি গল্প শেষ করার পরে কিংবা পড়া অবস্থাতেই লেখকের লেখা যেন আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে কিংবা নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি গল্পের আলাদা স্বকীয়তা গল্পগুলোকে আরো স্বতন্ত্র করে তুলেছে বলে মনে হয়। লেখক ছয়টা গল্প নিয়ে ছয়টা আলাদা জগৎ তৈরি করেছেন। এভাবেই এগিয়ে যায় গল্পের তরী, যার উপর স্বপ্নালুভাবে ভাসমান থাকে পাঠক।
'আরেকটা অদ্ভুত শব্দ। নদীর জল মচকাফুলের মত লাল...। সিগারেটের ধোঁয়া; টেরিকাটা কয়েকটা মানুষের মাথা; এলোমেলো কয়েকটা বন্দুক-হিম-নিস্পন্দ, নিরপরাধ ঘুম।'
- - জীবনানন্দ দাশ, 'শিকার'
আরেকটা বেশ চমৎকার ছোট ছোটগল্প সংকলন পেয়েছি!
বইটার ফ্ল্যাপে লেখা কথা অনুযায়ী লেখকের এর আগের বই 'গরিবি অমরতা' বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিলো এবং নিজস্ব ভাষ্যমতে লেখক প্রায়ই প্রথম আলোতে গল্প প্রকাশ করেন। পেশায় অধ্যাপক এই লেখকের পড়াশোনা দর্শনশাস্ত্রে। যেটার ছাপ গল্পগুলোয় পেয়েছি আমি। বইটিতে 'আমার যত ভণিতা জিনিয়াকে নিয়ে, নিরপরাধ ঘুম, নীল হিজাব, একটি রোহিঙ্গা উপকথা, হাবা যুবকের হাসি, সুপারহিরো পরিবারে একটা খুব অর্ডিনারি পাতাঝড়া দিন' নামে ৬টি ছোটগল্প রয়েছে। গল্পগুলোর প্রেক্ষাপটে যেমন মিডিয়া হাউজ, ইন্সুরেন্স কোম্পানি, রোহিঙ্গা, ক্রসফায়ার, সেক্সুয়ালিটি, অটিজম ইত্যাদি সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন ছিলো, তেমনি গল্প গুলোর নিগূঢ় তথ্যও ছিলো বেশ অর্থবহ এবং ভাবনা-চিন্তার খোরাক। লেখকের লেখার ধরণ, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ইঙ্গিত আর হিউমারের ছলে গল্প বলা আমার ভালো লেগেছে। বইটা নিতান্তই হ্যাংলা পাতলা। আরও কিছু গল্প পেলে খুশি হতাম। নিরপরাধ ঘুম নামটা লেখক দিয়েছেন জীবনানন্দের একটি কবিতা থেকে। কেনো, সেই ইঙ্গিতও গল্পের শুরুতে আছে। পড়ে দেখতে পারেন। আশা করি ভালো লাগবে। গুডরিডসের হারুন ভাইয়া কে ধন্যবাদ বইটা সাজেস্ট করবার জন্যে। ওহ, এই বইটি নাকি কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরষ্কারের জন্য শর্টলিস্টেড হয়েছিলো। দারুণ!
১. আমার যত ভনিতা জিনিয়াকে নিয়ে: ৩/৫ আমরা সবাই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সোলমানের মত চরিত্রে অভিনয় করি। কখনো কখনো ভনিতা করি, কখনো কখনো সত্যিকার রূপে থাকি আবার কখনও কখনো এই দুয়ের মাঝামাঝি থাকি। আমাদের জীবনের গল্পগুলো যেমন শুধুমাত্র আমাদের গল্প নয়, আমাদের সাথে সম্পৃক্ত বাকি সবারও গল্প, ঠিক একইভাবে এই গল্পটি শুধু সোলমান বা জিনিয়ার নয়, তার সাথে সম্পৃক্ত সকলেরও। মিডিয়াপাড়ায় নতুন নায়িকাদের জীবনের সূচনা নিয়ে সবারই একটু আধটু ধারণা আছে। এরই একটি অন্ধকার গল্প এটি।
২. নিরপরাধ ঘুম: ৫/৫ গল্পের শুরুটা যেমন সুন্দর শেষটাও ততটা সুন্দর, গল্পের উপাদান তারচেয়েও ভয়ংকর, গল্পটা তারচেয়েও বেশি শক্তিশালী আর হৃদয়বিদারক।
৩. নীল হিজাব: ৩.৭৫/৫ ফিনিসিংটা বেশ হয়েছে। ফিনিশিংয়ের জন্য ১ তারা বোনাস।
৪. একটি রোহিঙ্গা উপকথা: ৩.৫/৫
৫. হাবা যুবকের হাসি Evolutionary Biology আর Biochemistry এর অল্প যতটুকু জ্ঞান আছে সে অনুযায়ী গল্পের বিষয়বস্তুকে আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। গল্পের মূল থিমের সাথে আমি একমত হতে পারিনি। দুঃখিত।
৬. সুপারহিরো পরিবারে একটা খুব অর্ডিনারি পাতাঝরা দিন: ৪/৫
বইয়ের সবগুলো গল্পের মধ্যে একটা সুন্দর মিল চোখে পড়লো–অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা।
ভিড়ের কণ্ঠ বাংলাদেশে সবথেকে জোরালো। একই ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণির অনেক মানুষের গলার নিচে, যারা একটু আলাদা তাদের গলা চাপা পড়ে যায়। সুমন রহমানের ‘নিরপরাধ ঘুম’ সংকলনে এমন কিছু কণ্ঠ, এমন কিছু চরিত্র উঠে এসেছে যাদেরকে সাধারণত ‘মূলধারার’ বাংলাদেশি ভাবা হয় না। এরা আমাদের গণতান্ত্রিক দেশের সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন। মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার কাগজে খুঁজলে পাওয়া যায়, তবে জীবনে খুঁজলে পাওয়া যায় না।
চরিত্রদের মধ্যে আছে–ব্যর্থ মানুষ, নারী (নির্দিষ্ট করে বললে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মুসলিম নারী), ওয়ার্কিং ক্লাস ক্রিমিনাল, রোহিঙ্গা শরণার্থী, সমকামী ব্যক্তি এবং অটিস্টিক ব্যক্তি। আমাদের পরিচিত গল্পগুলোতে এমন মানুষকে আমরা প্বার্শচরিত্র হিসেবে দেখি। সুমন রহমান এদের সবার মানবিক অংশটা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, এদের মাথায় চড়িয়েছেন প্রধান চরিত্রের রাজমুকুট। ক্ষমতাধর আর ক্ষমতাহীনদের মধ্যে তিনি ক্ষমতাহীনদেরকে বেশি ইন্টারেস্টিং হিসেবে ধরে নিয়েছেন। র্যাবের শুটআউটের গল্প দেখানো হয়েছে নিহত ‘সন্ত্রাসী’র দৃষ্টিতে। আরেক গল্পে বোরখা বা হিজাব যে নারীদের আড়াল করা (বা অদৃশ্য করায়) ভূমিকা রাখে সেটা দেখানো হয়েছে, এবং হিজাবী নারীর বুদ্ধিমত্তা আর ‘কায়দা করে বেঁচে থাকার ক্ষমতার প্রশংসা করা হয়েছে। শরণার্থীদের এখনকার নামেমাত্র জীবনের সাথে মধ্যযুগীয় ট্র্যাজেডির পরম্পরা দেখানো হয়েছে। অটিস্টিক একজন বালক এবং তাদের পিতামাতার জীবনের যে কোণাগুলো নিয়ে ভাবা হয় না, যেমন যৌনতা, ট্রিটমেন্টের যান্ত্রিক রুটিন, বাবা-মায়ের দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন–সেগুলো সব দারুণভাবে এসেছে।
আরেকটা ব্যাপার দেখে খুবই ভালো লাগলো। বর্তমান জীবনের বিষাদময় অভিজ্ঞতাগুলোর সাথে বাংলা বা বাংলাদেশ অঞ্চলের সাহিত্যের দীর্ঘ ধারার মধ্যে সংযোগ তৈরি করা হয়েছে। আমার প্রিয়তম দুটো গল্পে–‘নীল হিজাব’ এবং ‘একটি রোহিঙ্গা উপকথা’য় এই সংযোগ সবথেকে স্পষ্ট। এখানেও অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করার ব্যাপারটা দেখা যায়। বর্তমান বাংলা সাহিত্যের মূলধারায় ইসলামিক গল্প এবং আরাকান কাব্যকে খুব বড়ো অংশ মনে করা হয় না। সুমন রহমানের গল্পগুলোতে এই ধারাগুলো নিয়ে বেশ ইনট্রিগিং আলোচনা আছে। নীল হিজাবে যে তিনি ‘বোরখা বা হিজাব মানেই মূর্খতা বা দুর্বলতার চিহ্ন’ – এ ধরনের মোটা দাগ টানেন নাই, তা দেখে ভালো লেগেছে।
ভালো লাগে নাই খালি সমকাম প্রসঙ্গের গল্পটা। এখানে লেখক বারবার বলেন ‘সেক্সুয়ালিটি ইজ আ চয়েস’। আমি মনে হয় বুঝতে পারসি উনি কী বুঝাইতে চাইসেন। যে আমরা যেন সবাইকে যার যার সেক্সুয়ালিটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিই। কিন্তু স্লোগান চয়নে একটু ভুল হইসে। সেক্সুয়ালিটি আসলে চয়েস না। এই ভুল ধারণার কারণে পৃথি��ীজুড়ে বহু মানুষকে গে থেকে জোর করে স্ট্রেইট বানানোর চেষ্টা করা হয়। সেক্সুয়ালিটির কোনো নির্দিষ্ট কারণ বৈজ্ঞানিকেরা এখনও পরিষ্কার এক কথায় বলতে পারেন না। দৈহিক এবং মানসিক দুটোরই প্রভাব আছে বলে ধরা হয়। আর সমকামী চরিত্র লিখতে গেলে অনেক পুরুষ সাহিত্যিক প্রেমের দৈহিক আকর্ষণের ব্যাপারটা এড়িয়ে যান। এখানেও খানিকটা তাই হয়েছে। র্যাবোঁ আর ভারলেইনের সম্পর্কটাও আরেকটু সময় নিয়ে বিশ্লেষণ করা যেতো। যাই হোক, তাও ভালো সুমন রহমান সরাসরি সমকাম প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। আলভী আহমেদের মতো ধরি-মাছ-না-ছুঁই-পানি করেন নাই।
‘নিরপরাধ ঘুম’ বইটা আমাকে রেকমেন্ড করেছিলেন হারুন আহমেদ। তাকে ধন্যবাদ জানাই। মনে হয় তিনি সুমন রহমানের লেখার ধরন এবং প্রসঙ্গ দেখে ভেবেছিলেন আমার এগুলোতে আগ্রহ আছে। তার ধারণা ঠিকই ছিলো। সুমন রহমানের প্রোজের মধ্যে ইংরেজি-বাংলা-শুদ্ধ-আঞ্চলিক মেশানো একটা টান আছে যেটা আমার খুব পরিচিত। আমার আশেপাশের বেশিরভাগ মানুষ এই ভাষাতেই কথা বলে। এই ভাষার লেখা পড়তেও আমার ভালো লাগে।
খুব কম সময়ই এমন হয় যে, কোন গল্প গ্রন্থের প্রত্যেকটি গল্প ভালো লাগে। নিরপরাধ ঘুম এমনি একটা বিরল গল্প ���্রন্থ। গল্পের বিষয় বৈচিত্র্য, ভাষার ব্যবহার, সমকালীন কাহিনির প্রেক্ষাপট, লেখনী, যৌনতা, সামাজিক ট্যাবু ভাঙার চেষ্টা সব মিলিয়ে দুর্দান্ত একটা সংকলন। প্রতিটি গল্প নিয়ে আলাদা ভাবে বিস্তারিত বলা যেতে পারে, আলোচনা হতে পারে। নিরপরাধ ঘুম গল্পটি কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় উঠে এসেছে। কমনওয়েলথ পুরস্কারের ইতিহাসে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা তথা ইংরেজি-ভিন্ন যেকোনো ভাষা থেকে এটি প্রথম ঘটনা। নিরপরাধ ঘুম ক্রাউন সাইজের ছোট্ট একটা বই। গল্পগুলো বিভিন্ন সময়ে প্রথম আলোর বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত, তারই সংকলন বইটি। ছোট গল্প বাংলা সাহিত্যে অবহেলিত, সেই হিসেবে নিরপরাধ ঘুম একটা রত্ন।
'নিরপরাধ ঘুম' গল্পে শেষটায় একবার মনে হয় র্যাবের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে এসে ক্লান্ত রাশেদ স্রেফ স্বপ্ন দ্যাখে, যে স্বপ্নে তার মায়ের সাথে সাথে মৃত ভাই আর মৃত বাবা এসে উপস্থিত হয়। আবার মনে হতে থাকে এভাবে র্যাবের হাত থেকে মুক্তির চেয়ে টেম্পলেট নিউজ হয়ে ক্রস্ফায়ারে মরে যাওয়াটা বেশি বাস্তবসম্মত। তাহলে ঐ ঘুম আর স্বপ্নের দৃশ্য হয়ত স্বপ্ন নয়, মৃত্যুর পরের জগতে পারিবারিক রিইউনিয়ন।
'নীল হিজাব' গল্পের শেষে মনে হয়, ফাতেমাই হয়ত নীল হিজাব পরে তার বোন রোকসানা সেজে এসে ইন্স্যুরেন্স পলিসি খুলেছিল, হয়ত জেনে গিয়েছিল বোনের সপরিবারে আত্মহননের প্ল্যান। কিন্তু সাথের বাচ্চা মেয়েটা?
এভাবে প্রায় সবকটি গল্প পড়ে শেষটা খোলা মনে হয়েছে; পাঠকের জন্যে যেন অল্পেকটু হলেও রেখে দেওয়া।
. গল্পকার সুমন রহমানের 'নিরপরাধ ঘুম' বইটা পড়লাম।বইটাতে মোট ৬ টা গল্প আছে।এবং প্রত্যেকটা গল্পেতেই আলাদা স্বাদ,আলাদা থট পাওয়া যায়(অবশ্য এ আর এমন নতুন কি যারা ভালো গল্প লেখেন তাদের জন্যে)। এই যে প্রথম গল্পটায় 'সোলমান' আর 'জিনিয়ার' মাধ্যমে অনেকগুলা বিষয় তুইলা ধরা যে পর্দার পেছনে আসলে কত কষ্ট করা লাগে,ঝাড়ি খাওয়া লাগে,তালে তাল মিলানো লাগে আবার জিনিয়ারে গল্পের 'ওবায়েদ হাসানের' সিরিয়ালে একটা পার্ট পাওয়ার লাইগা অপেক্ষা করা লাগে এবং এই অপেক্ষা-ঝাড়ি খাওয়ার ভিতরে যে পর্দার পেছনে কতটুকু সন্দেহ -সমস্যার মিশ্রণ থাকে,জিনিয়ারে ওবায়েদ হাসানের অফিসে যাওয়ার পেছনে সোলমানের অস্তিত্ব বিলীনের একটা বিষয় থাকে আর থাকে পর্দার পেছনে সেলিব্রেটিদের হুদাই সেলিব্রিটিগিরির ফোবিয়া-সুতরাং প্রথম গল্পে তিনি ঐ পর্দার পেছনকার কাহিনীগুলো তুইলা ধরার চেষ্টা করছেন। সুমন রহমানের গল্পের একটা চমৎকার বিষয় হইলো তিনি হুদাই গল্পে বকবকান না মানে গল্পের সৌন্দর্য, গভীরতা যাতে নষ্ট না হয় অযথা কথাবার্তা ব্যবহারে- সেদিকে ওনার একটা দৃষ্টি আছে।আরেকটা বিষয় হইলো তিনি সরাসরিই গল্পে ঢুইকা যান।ফলে পাঠকের আর ঐ খোঁজার পরিশ্রমটা করা লাগে না(হ্যাঁ, গল্প তাইলে এইখান থিকা শুরু) . যদি বিশেষ ভাবে বলতে হয় তবে আমার সবচে বেশি ভাল্লাগছে 'নিরপরাধ ঘুম' গল্পটা।গল্পের শুরু আর গল্পের শেষ বিশেষত শেষটা-কই থিকা কি রাশেদ কল্পনায় বাস্তবের সাথে নিজের চেতন আর অবচেতন মনে কথাবার্তা শুরু দিলো এবং একেবারে শেষ লাইনে তার 'মা' ও এর ভেতরে যোগ দিলো মানে চমৎকার এবং অদ্ভুত একটা গল্প ছিলো আমার জন্যে। গল্পের শুরুটা যেমন বর্তমানের প্রলেপ দিয়া শুরু হয় তেমনি আস্তে আস্তে তা অতীত-ভবিষ্যত-বর্তমানের কারসাজিতে গিয়া দাঁড়ায়। . নীল হিজাব-ধরেন আমার অতো ভাল্লাগে নাই(হয়তো আমি বাদে সবাইর লাগছে!) তবে কিছু কিছু জায়গা আছে মনে ধরার মতো।তবে গল্পটাতে একটা রহস্যাবৃত ব্যাপার আছে যেইটা এক্কেরে শেষে গিয়া ধরা দেয় (যাই হোক আরেকবার পড়ার ইচ্ছা রাখি) . তারপরের গল্পগুলান খারাপ না যেমন ধরেন 'একটি রোহিঙ্গা উপকথা'র কথা।একটা রোহিঙ্গা ছেলের বাংলাদেশের আসার মধ্যে দিয়া এবং একসময় সে এইদেশের আবহাওয়ার ভিতরে মিলায়ে যাওয়া এবং এর ভিতরেই শাহানা ও ওয়ালিউল মুক্তাদিরের মধ্যকার দ্বন্দ্ব (মানে ঐ অর্থে না), তাদের একজনে আরেকজনরে বুঝতে না পারার যে দ্বন্দ্বটা ফুটে ওঠে এবং এরই প্রেক্ষিতে তাগোর নিয়তি তাগোরে অন্যদিকে লইয়া যাওয়া এবং এরই মধ্যে একসময় সেই রোহিঙ্গা ছেলে আলালরে, আরাকান রাজসভার কবি 'আলাওল' এর মইধ্যে অতিকল্পনা করার ব্যাপার,হিস্ট্রির সাথে মেলানো-গল্পটারে এক অনন্য মাত্রা দাঁড় করায় অবশ্য আমার মনে হইছে গল্পটার দিকে সম্ভবত আরেকটু নজর দেয়া যাইতো,আরো ভালো হওয়ার ইচ্ছা গল্পটার কথাতেই আমি শুনতে পাই-যাই হোক প্রিয় গল্পকারের ইচ্ছা। . তারপর আসেন,'হাবা যুবকের হাসি' গল্পটার কথা।অন্য গল্পগুলা থিকা আলাদা এইটা এই অর্থে যে গল্প এইটা নর-নারী নিয়া না বরং গল্পটা হইয়া ওঠে নর-নর মিলা মানে সমকামীতা নিয়া।কিন্তু আকারে ইঙ্গিতে এইটা বোঝা যায় মানে যার যার মনোভাবে এবং শেষে গিয়া তা উজ্জ্বল হইয়া ওঠে।মাহাদী না শিমুলরে কইবার পারে, আর শিমুল না মাহাদীরে কইবার পারে।এইভাবে ব্যক্তি থিকা ব্যক্তির মধ্যকার কিছু কথা না বলার অপূর্ণতাটা গইড়া ওঠে।একপ্রকার লোনলিনেস বিরাজ করে।যে যার মতো পরে গইড়া ওঠে,যে যার ভিতরে এইভাবে পইড়া থাকে। এইভাবে সুমন রহমানের গল্পের যে মেসেজটা এই কাঁটার মতো বিঁধে মানে বিঁধতে চায় পুরা অদৃশ্য চামড়া ভেদ করবার পারে না।ভেদ করবার সংগ্রাম চলে। . শেষ গল্পটা 'সুপারহিরো পরিবারে একটা খুব অর্ডিনারি পাতাঝরা দিন' শেষ হইয়াও একপ্রকার ধাঁধার মতো কাজ করে আমার মইধ্যে। গল্প যতটুকু না সা'দ-টুনির মইধ্যে গইড়া ওঠে তত টুকুই গইড়া ওঠে মিনু জ তার স্বামীর মইধ্যে। কিন্তু গল্পের কলকাঠি নাড়ে সা'দের ক্রিটিক্যাল অবস্থা। এবং একসময় অস্বস্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং আমি শেষ ও করি ঐ অস্বস্তি নিয়াই।পুরা গল্পের একটা আবছায়া থাকে অসহায়ত্ব। মিনু ও তার স্বামী থাকে তাগোর ছেলে সা'দের এই ক্রিটিক্যাল অবস্থা নিয়া এবং তারা সা'দের এই সমস্যাটার সমাধান চায় কিন্তু পায় না অথবা পায় তারা তা কিভাবে কইরা উঠবে তা বুঝতে পারে না।আর গল্পের আরেকটা মিস্টিক চরিত্র হইলো 'টুনি' যার উপস্থিতি কিনা পুরাপুরি বোঝা যায় না মনে হয় সেই সমস্যার মূল কিংবা মনে হয় সে না সমস্যা হইলো সা'দের বাইড়া ওঠার অসামঞ্জস্যতা। সুমন রহমান গল্পে ব্যক্তি থিকা ব্যক্তির এড়ায়ে যাওয়া বিষয়গুলান সম্ভবত গল্পের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করে।দোলাচাল রাখে।আর এইখানেই ওনার গল্পের একটা আলাদা স্বর ফুইটা ওঠে।'যৌনতা' নামক ব্যাপারটা ওনার গল্পে ঠাণ্ডাভাবে কাজ করে। . যাই হোক,আরো কত কী জানি চোখ এড়ায়ে গেছে অথবা এইগুলাই যে সহীহ বিষয়টা তা না।আমি যা বুঝলাম,নিলাম তাই নিজের সাথে বোঝাপড়া করা।যে পর্যন্ত এই লেখা কতটুকু কি হইলো আমি জানি না তবে এইটুকুন জানি যে পরবর্তীতে যখন আবার বিশদ আকারে সুমন রহমানের গল্প পড়তে বসমু তখন এই লেখা অল্প হইলেও আমার কাজে দিবে।আমি সেইদিনের দিকে তাকায়ে আছি। . প্রিয় সুমন রহমানের আর কোনো গল্পের বই আছে কিনা আমারে জানায়েন।মেলাতো শেষ আমি আরেক মেলার মধ্যবর্তী পর্যায়ে তা সংগ্রহ করবার খায়েশ রাখি। . ভালোবাসা সুমন রহমানকে,ভালোবাসা রইলো নিরপরাধ ঘুমের প্রতি।
এতটুকুন একটা বই, ৬টা মাত্র গল্প, এক বসাতেই ফুরিয়ে গেল। শুধু একেকটা গল্পের শেষে খানিক চোখ বুজে থাকা...
কিন্তু এই 'এতটুকুন সময়' যে কতদিন পাইনি বা আসেনি, যেন মনেই পড়ে না! থেকে থেকে মনে হয়; স্পাইরাল অব সাইলেন্সের ভেতর থেকে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা 'আমি'টাকে টেনেটুনে বের করে আনি। মাথার ভেতর কুটকুট করা শব্দগুলোও একে একে বেরিয়ে আসুক, তাতে উপকার কিছু হোক না হোক, শুধু শান্তির ঘুম হোক।
ভেবে ভেবেই দিন পার, কাজ আর হয় না। সেই ফাঁকে 'আমি'টা আরো বেশি গুটিসুটি মেরে কুণ্ডলী পাকিয়ে নীরবতার কুণ্ডলীর ভেতর ঢুকে পড়ে। ভেতরে আরো ভেতরে... আমি আর 'আমি'র খোঁজ পাইনা। ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি অথবা ভালো করে বলতে গেলে ঘুমানোর চেষ্টা করি।
কিন্তু এই মুহূর্তে যে তরল সুন্দর ঘুম পাচ্ছে, সেটা কি ক্লান্তির ঘুম? নাকি শান্তির ঘুম? নাকি নিরপরাধ ঘুম?
সবগুলো গল্পই চমৎকার। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে নাম গল্পটি - 'নিরপরাধ ঘুম'। শাহাদুজ্জামানের পরে এই প্রথম বর্তমান সময়ের কারো ছোটগল্প পড়ে এতটা ভালো লেগেছে।