বৃষ্টির দিনে পিঠ জুড়ে হাওয়াই চপ্পলের গ্রাফিতি।পলকেই সামনে চলে আসে একটি বর্ষণমুখর সকালের শেষে স্কুল থেকে ফেরার দৃশ্য, দুই হাত কাঁধে ঝোলানো ভারী ব্যাগটা সামলানোতে ব্যস্ত,আর গ্রাফিতি মাঝে মাঝে সীমানা পেরিয়ে ব্যাগেও চিহ্ন এঁকে যায়।পরিবেশ পরিচিতি সমাজ ক্লাসের পিঠভর্তি গ্রাফিতি পরিচিত অনুভূতি বহন করে অথবা মনে করিয়ে দেয় বাংলা ক্লাসে রচনা না পারার কারণে অর্ধ শিক্ষার্থীর ক্লাসের বাইরে মুরগী হয়ে থাকা।পেঁচার সাথে পৃথিবীতে মৃতদের একাদশতম ভাষায় আলাপ সারা তৈমুর লঙ মনে করিয়ে দেয় শত ব্যথায়ও মুখে সূর্যমুখীর হাসি চড়িয়ে নির্বিকার থাকা বান্ধবী হাসনাহেনাকে।ক্রেমলিনের একাকিত্বে বিষন্ন শিক্ষক আমার মাধ্যমিকের বিজ্ঞানের অনীল স্যারের কথা স্মরণে আনে।কোনো সাদৃশ্য নেই, তবু বিস্মৃতির অতল গহ্বর থেকে এরা একে একে উঠে আসে।
আমি গোল কমলালেবু রঙের বৃষ্টি কল্পনা করি।হঠাৎ আমার চোখের সামনে কমলালেবু রঙের তীব্র বিস্তৃতিতে ধাঁধা লেগে যায়।আমি তাড়াতাড়ি পৃষ্টা উল্টায়।তারপর সেখানে আসে রুনু ফুফুর মৃত্যুতে দাদীর হালকা মেরুন রঙের চোখের জল।আমার ভাবনায় আসে প্রতি বছর সালমান শাহের মৃত্যু দিবস আমার সামনে একটা বিস্কিট রঙের দুপুরকে দাড় করাবে।আমি বিস্কিট রঙের দুপুরের কথা ভাবতে ভাবতে হয়ত একসময় এই রঙের কিছু একটা কিনে চোখের সামনে ঝুলিয়ে রাখবো।মাশরুর স্যারের সুইসাইড নোটে লেখা “আগামীকাল সকালের সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই” ভীষণ গাঢ় বিষন্নতায় ডুবে থাকা ধ্রুব সত্যকে আরো স্পষ্টতর করে তোলে।আমি বারবার পড়ে দেখেও বুঝতে পারি না, আমি কি বিমুগ্ধ নাকি বিষন্নতা ভর করেছে।
আপেক্ষিক সব সাদৃশ্যকে চিহ্নিত করে রেললাইনকে সমুদ্র নাম দেওয়া দেখে আমি ভেবে কুল পাইনা এদের মাঝে ভালো খারাপের তুলনায় আসলে বিজেতা কে! সমুদ্র না রেললাইন।আমি হিসেব কষতে বসি কে বড় ঘাতক! সমুদ্র? যেখান থেকে আবির কখনো ফেরেনি। নাকি রেলপথ? যেখানে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে চোখের সামনে কাঁটা পড়েছিল সেখানেই বেড়ে ওঠা ছোট্ট পরী।
আমি ফিরে যাই শৈশবে।ঘুম ভাঙার পর বাড়ির আঙিনায় কৃষ্ণচূড়ার লাল স্রোতে সূর্যের আলোয় সুতীব্র এক মোহে সকালটা আরো রঙিন হয়ে ওঠত আর সন্ধ্যার আঁধার নামার কালে কি এক বিষন্নতা এসে ভর করতো।সকালের চোখ ধাঁধানো লাল বিকেল হতে হতে মিয়ে যেত।আমরা একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের লাল চোখে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম।
“আত্নহত্যা মুলত সুস্বাদু বিস্কুট। তার ভেতরের ক্রিমটাই বেশি মজার,যেটা চেটে খেতে হয়।আমরা ওপরের দুই আস্তরণকে কখনোই বিশ্বাস করিনা। আমাদের সব বিশ্বাস ক্রিমের ওপর।সেই ক্রিমের লোভে মানুষ আত্নহত্যা করে। যা বেঁচে থাকা মানুষের বোধগম্যতার উর্ধ্বে”
আমি টের পাই বাবার মন ভার হওয়া মুখ দেখে,মা এর তীব্র ভৎসনায়, প্রেমিককে ছেড়ে আসার মূহুর্তে, জীবনের পরীক্ষায় হেরে গিয়ে কেন আমি বারংবার সেই ক্রিমের স্বাদ নিতে চাইতাম।
“পেয়ারার ডালে পা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে ‘রোজাভেজে’র মতো একদিন আমিও ভেবেছিলাম বন্ধুগণ,’গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজের মধ্যে ভুলেই গিয়েছিলাম মরতে থাকাটাও জরুরি একটি কাজ।’ পড়তে পড়তে আরও গভীরভাবে ঝুলে পড়তে ইচ্ছে জাগে।কিন্তু মরার আগে মালবিকার বন, যেখানে সুগাঢ় মদের ভেতর জীবন লুকানো, তাকে খুঁজে বের করতে হবে।সেজন্য আমরা বেঁচে আছি বন্ধুগণ।….আমার বন্ধুরাই ঠিক করে দিয়েছে যে এবার আমার মরে যাওয়া উচিত।কারণ, বেঁচে থাকা নিছকই পাহাড় গুণে ক্লান্ত হওয়া ছাড়া কিছুই নয়।আমি ভাবি,মৃত্যু পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে।শিরীষের বুকে একটি আঁচড়ের দাগ ও মরা ছাতিমগাছের কোল থেকে মহাজাগতিক উড়োজাহাজের উড়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কিছু ঘটার সম্ভাবনা নিতান্তই শূন্য।সেই শূন্য সম্ভাবনার মাঝে যে দেয়ালঘড়ি এখনো বেজে চলেছে তার কাঁটা আঁকড়ে মানুষের বেঁচে থাকা।সম্ভাবনাটুকু শেষ হয়ে গেলেই মৃত্যু।”
বেঁচে থাকার মত ক্লান্তিকর কাজটা বয়ে বেড়াচ্ছি দুচোখ ভরে পৃথিবী দেখার স্বাদ আজও মিটেনি বলে।আকাশ ভরা তারা, পূণিমা চাঁদের নিচে হাওয়া খেতে খেতে রবীন্দ্র গান শুনে চোখ বোজা,শরতের আকাশে মেঘের ভেলা, বর্ষার আকাশ ভাঙা বর্ষণ……. কি করে এই সৌন্দর্য ছেড়ে দুম করে মরে যায়!
“একদিন তোর বাস আঁকা শেষ হবে।আমরা দুজন সেই বাসের কন্ডাক্টর হব।এটি দূরপাল্লার বাস।আমাদের বাস যাবে পাহাড়ের দিকে। সারি সারি পামগাছ এবং আনারস ক্ষেত পার করে বাস একদিন পাহাড়ে গিয়ে পৌঁছবে। তখন বাঘ কাঁপানো শীত। আমরা যাত্রী নামাতে নামাতে বলব—we all are bus conductor—Ticket please.”
ছোটবেলায় একবার বাস কন্ডাক্টর হওয়ার শখ চেপেছিল।বাসের সিড়ির পা-দানিতে দাড়িয়ে গ্রামের রাস্তার পাশের বিস্তৃত ধানক্ষেত, সরিষাক্ষেতে ফসলের বাতাসে দোল খাওয়া দেখতে পাওয়াটাও তখন সপ্নীল মনে হত। বাস কন্ডাকটর হওয়ার স্বপ্ন উন্নীত হই ট্রাভেলারে।একদিন দূরপাল্লার যানে চড়ে সারি সারি পামগাছ, সরিষাক্ষেত দেখতে দেখতে চলে যাব দূরের দেশে।
“বন্ধুহীন পাখিরা একা একা নিজের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে” আমি নিজেকে বন্ধুহীন পাখি ভাবতে শুরু করি।আমি জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা একা কথা বলি, মনের মাঝে চরিত্রের কাঠামো বানায়,ভালোবাসার জাল বুনে ঘর তৈরি করি।একটা বৃত্তের ভেতর বন্দী থেকে এরা কথোপকথন চালায়।
স্মৃতির জার্নালের মত বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছি আর বিস্মৃতিরা যেন পাইনবনের ছায়া হয়ে একে একে হাজিরা দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মনে অতীতের দুঃখ কষ্টের পাহাড় বুকশেলফের আবরণের মত ঠাঁই দাড়িয়ে থাকে।শেলফ থেকে একটা একটা করে বই বের করলে যেমন ভেতরকার কাহিনী বেরিয়ে আসে, মনের মাঝের স্তুপ থেকে দুঃখগুলোও সময়ে সময়ে এভাবে বেরিয়ে আসে।
“শেফালি কি জানে” আমার ক্লান্ত মনে প্রশান্তির ছায়া আনে।পৃথিবীতে নিজেকে ভীষণ একা মনে করা আমি নিশ্চয়তা ফিরে পাই।’শেফালি কি জানে’র প্রতি পাতায় পাতায় যেসব অদ্ভুত চিন্তার খেলা চলেছে, সেসব আমার কাছে অর্থ পেতে শুরু করে।বিস্কিট রঙের দুপুর, গোল কমলালেবু রঙের বৃষ্টি,তেহরানের বাগান,কিয়ারোস্তামির গাছ হয়ে যাওয়া,শেফালির জ্বর হলে কেন সে টোস্ট বিস্কুট খেতে চায়,এই মূহুর্তে পৃথিবীর রঙ ধূসর নাকি বাদামী ভাবতে আমার ভালো লাগে।বাস্তবতায় একটা ঘোরের বৃত্ত খুঁজে পাই আমি।আমার জানতে ইচ্ছে করে আরেকটি সুন্দর সকালের অপেক্ষায়, তপ্ত দুপুরের লুব্ধতায় আর রোদ মরে যাওয়া বিকেলের প্রশান্তিতে বেঁচে থেকে আমি যে বিষন্ন তবু আনন্দিত,শেফালি কি তা জানে!!!